#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৭
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
কোমল ছলছল দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে রইলো কিয়ানের দিকে। যেকোনো সময় কেঁদে দিলো বলে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“তোমায় আমাকে এতো ভালো কে বাসতে বলেছে কিয়ান? আমার কপালে কি এই সুখ সইবে বলো? তুমি যে আমার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছো। আমার অস্তিত্বে মিশে গিয়েছো তুমি। তোমার ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার শক্তি যে আমার নেই।”
কিয়ান আরেকটু এগিয়ে এসে কোমলের চোখের পাতায় চুমু খেলো। কেমন ঘোর লাগা কন্ঠে দেখে উঠলো,
“জান?”
“হু?”
“প্লীজ। আই নীড ইউ।”
কোমল আবার মোচড়া মুচড়ি করতে লাগলো। কিয়ান এবার আরো এগিয়ে এলো কোমলের নিকট। ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও অবশিষ্ট রইলো না ওদের মাঝে। কিয়ানের গরম শ্বাস আছড়ে পড়ছে কোমলের চোঁখ মুখে। কোমলের শ্বাস প্রশ্বাসও ঘন হয়ে আসছে। ঢোক গিললো বেচারি।
কিয়ান আলতো করে কোমলের ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁট দিয়ে আঁকড়ে ধরলো। কোমল দুই হাত নিজের এক হাতের মুঠোয় নিয়ে অন্য হাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো যেনো নড়াচড়া করতে না পারে। ওকে আরো নিজের কাছে টেনে নিলো। যেনো নিজের ভিতরেই ঢুকিয়ে ফেলবে।
সেকেন্ডের কাটা পেরিয়ে মিনিটের কাটায় গেলে কোমলকে ছাড়ে কিয়ান। কোমলও যেনো বশ মেনে নিয়েছে কিয়ানের। ঠিক যেমন করে বশ মেনে নেয় সাপ তার সাপুরের। কোমলের থেকে কোনো বাঁধা না পেয়ে কিয়ান যেনো ওর উত্তর পেয়ে গেলো।
নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো কিয়ান। স্থান কাল ভুলে গেলো নিমিষেই। কোমলের পরনের গোল ফ্রকের পিছনের পিঠের কাছের চেইন খোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে সেটি টান দিবে তার পূর্বেই বাজখাঁই আওয়াজে টি টেবিলের উপরে রাখা ওর ফোন বেজে উঠলো। বিরক্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনে দেখলো বাংলাদেশী একটা নাম্বার থেকে কল এসেছে। নাওফিল দিয়ে সেভ করা নাম্বার। এমন সময়ে এই ফোন কলের জন্য বিরক্ত হলো বটে তবুও ফোন তুলে কানে ধরলো কিয়ান। ওপাশ থেকে ভেসে এলো নাওফিলের শান্ত কন্ঠস্বর,
“হ্যালো বস?”
কিয়ান বিরক্তি নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বলো। কি সমস্যা। তোমার কি কোনো টাইম সেন্স নেই?”
নাওফিল অবাক হয়ে বলল,
“সেকি বস! রোজ তো এই সময়েই আপনাকে আমি কল করি। আপনার ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করার জন্য। তাহলে আজকে আপনার মনে হলো যে আমি ভুল টাইমে কল দিয়েছি?”
“বাজে কথা বন্ধ করো। আর অবশ্যই তোমার টাইম সেন্স খারাপ বুঝেছো?”
“আরে বস আপনাকে গুরুত্ব পূর্ন কিছু কথা বলার ছিলো…হেলো…হেলো…”
তবে ওর কথা কিছুই শুনলো না কিয়ান। খট করে কল কেটে দিলো। কল কেটে পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগী হবে তার আগেই নাওফিল আবার কল দিলো। কিয়ান বিরক্ত হয়ে কানে ফোন তুলে বাজখাঁই কন্ঠে বলল,
“কি সমস্যা তোমার? বিরক্ত করছো কেনো বার বার। আরেকবার কল দিলে তোমাকে মেরে ফেলবো আমি। বেয়াদব। টাইম সেন্স নেই কোনো সে নাকি আবার আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
“বস আপনার মা আপনাকে কলে পাচ্ছে না। তাই আমাকে বলল আপনাকে যেনো একটু জানিয়ে দেই তাকে কল করার জন্য। তার নাকি কিসের গুরুত্বপুর্ন কথা রয়েছে আপনার সাথে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি যোগাযোগ করে নেবো। এখন বিজি আছি।”
অতঃপর আবার খট করে ফোন কেটে দিলো। এবার আর কোনো ভুল করলো না কিয়ান। ফোন টাকে সুইচ অফ করে টেবিলের উপর রেখে দিলো।
কোমলের দিকে ফিরতেই কোমল নিজ উদ্যোগে কিয়ানের ঠোঁটে ঠোঁট মিলালো। দু হাতের সাহায্যে কিয়ানের শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো। কিয়ানের শার্টের বোতাম খুলে সেটাকে অপর পাশের সিটে ছুঁড়ে মারলো তবে সেটি সিটে না পরে গড়িয়ে নিচে পরে গেল।
কিয়ানকে সিটের উপর শুইয়ে নিজে কিয়ানের পেটের উপরে চড়ে বসলো। কিয়ান হাত বাড়িয়ে কোমলের ড্রেসে হাত বাড়াতে যাবে তার আগেই টি টেবিলের কোনায় রাখা ল্যান্ড লাইন ফোনটা মৃদু আওয়াজে বেজে উঠলো। আর তাতেই এবার দুজনেরই মেজাজ চড়াও হলো।
এই ল্যান্ড লাইন ফোন মূলত ট্যুরে আসা যাত্রীদের জন্যই বরাদ্দ। যেনো বাহিরের কন্ট্রোল রুম থেকে ওদের সাথে ইমার্জেন্সী যোগাযোগ করা যায়। বিপদ আপদ তো আর বলে আসে না? এই কারণেই এটা এখানে রাখা।
তবে এখন এই ল্যান্ড লাইন ফোন কেনো বাজছে সেটাই ওরা বুঝতে পারছে না। কোনো সমস্যা তো হয়নি এখানে তাহলে এই ফোন কেনো বাঁজছে। তখনই ওদের কানে আসলো হেলিকপ্টারের পাখা ঝাপটানোর আওয়াজ । হাত বাড়িয়ে অল্প পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখলো একটা হেলিকপ্টার ওদের ক্যাবল কারের কাছেই একদম প্রায় উপরে ঘুরঘুর করছে। তবে এটা দেখে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কেমন যেনো দেখে নিয়ন্ত্রণ হীন মনে হচ্ছে।
তবুও ব্যাপার টাকে পাত্তা দিলো না কিয়ান। শোয়া অবস্থাতেই হাত বাড়িয়ে ল্যান্ড লাইন থেকে ফোন তুলে কানে ধরলো। কানে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো কন্ট্রোল রুমের গার্ডের বিচলিত কন্ঠস্বর,
“স্যার? আপনাদের ক্যাবল কারের উপরে একটা হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রণ হীন হয়ে পড়েছে দয়া করে….”
ভদ্র লোকটি হয়তো আরো কিছু বলছিলো তবে সেটা শোনার ভাগ্য আর হয়নি কিয়ানের। তীব্র এক ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠলো ক্যাবল কারটি। হেলিকপ্টারটি আছড়ে পড়লো ওদের ক্যাবল কারের উপরে। তবুও ক্যাবল কারটি তার হতে বিচ্ছুত হলো না। তবে কাচ ভেঙে দুজনেই ছিটকে বাহিরে পরলো। ক্যাবল কারে ঝাঁকুনি লাগার সাথে সাথেই কিয়ান ল্যান্ড লাইন ফেলে রেখে কোমলকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছিলো। ক্যাবল কারের কাচ ভেঙে দুজনেই ছিটকে শূন্যে ভাসতে লাগলো। দুজনেরই শরীরে বিভিন্ন জায়গায় জখম হয়েছে। কাঁচের টুকরো লেগে কেটে গিয়েছে। হেলিকপ্টারটি ওদের আগেই নিচে পরে গিয়েছে। তবে হেলিকপ্টারের পাইলট প্যারাসুট নিয়ে জাম্প দিয়েছে কপ্টারটি ক্রাস করার আগেই।
যেহেতু ক্যাবল কারটি মাটি হতে প্রায় দুই কিলোমিটার উচ্চতায় উপরে ছিলো তাই এখান থেকে নিচে পরলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। প্রায় শূন্য বলাই চলে। দুজন দুজনকে জাপটে ধরলো। যেনো এটাই ওদের জীবনের শেষ জড়িয়ে ধরা একে অপরকে। বাতাসের ধাক্কায় মনে হচ্ছে একে অপরের থেকে ছিটকে যাবে। এই শেষ সময়েও ওরা যেনো দুজনে একসাথে থাকতে চাইলো। কেউ কাউকে ছাড়ল না।
বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিলো দুজনেই। তবে একে অপরকে ছেড়ে দিলো না। কোমল কিয়ানকে বলল,
“আমাদের ওর বাবুর বাবা মা হওয়া হলো না কিয়ান?”
কোমল কেঁদে দিয়েছে। ওর সাথে এবার কিয়ানও কেঁদে দিলো। হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করে বলল,
“যদি পরের জন্ম বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে সেই জনমেও খোদা যেনো তোমাকে আমার করেই দেয়। এই জনমের সকল চাওয়া পাওয়া নাহয় সেই জনমেই পূরণ করবো।”
“পরের জন্ম বলে যে কিছুই হয়না কিয়ান।”
জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে যেনো এই কঠিন সত্যতা দুজনকে মনে করিয়ে দিলো যা কিছু অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে জীবনে সেটা ওরা আর পূরণ করতে পারবে না। একটা না হওয়া সংসারের আফসোস করেই এই পৃথিবী ছাড়তে হবে ওদের। বাতাসের ঝটকায় শ্বাস নেয়াও যেনো কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে ওদের কথোপকথন ওরা দুজন ব্যতিত বোধহয় বাতাসও শুনতে পাচ্ছে না। কিয়ান বলল,
“পর কাল তো রয়েছে। সেই কালেই যেনো তোমাকে আর আমাকে খোদা একসাথে থাকার তৌফিক দান করে। আমি যে বড্ড ভালোবাসি তোমায় স্বর্ণ। হয়তো নিজের জীবনের থেকেও বেশি।”
“আমিও তোমায় ভালোবাসি কিয়ান। সত্যি তোমাকে আমিও ভালোবাসি।”
“আমাদের কপালে বোধহয় কবরটাও জুটবে না স্বর্ণ। যদি কবর আমাদের কপালে থাকতো। তাহলে আমি হয়তো চাইতাম দুজনকে এক কবরে দাফন দেয়া হোক। তবে সেটা যে খোদার নীতির বাহিরে। ইসস.. খোদা যদি এক কবরে দুজনকে দাফন করার অনুমতি দিতো তবে আমি তোমার সাথেই নিজেকে দাফন দেয়ার আর্জি জানাতাম।”
#চলবে
[ জানিনা কিভাবে কি লিখেছি। তবুও নিজের বেস্ট টা দেয়ার চেষ্টা করেছি। ]