#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৮
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
জুগস্পিটজ ক্যাবল কারের উচ্চতামাটি থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতায় উপরে উঠে যায়। যা প্রায় দুই কিলোমিটারের সমান। যেকোনো দুর্ঘটনায় এখান থেকে যদি কেউ নিচে পরে যায় তবে তার বেঁচে থাকার চান্স শুন্য।
যদি নিচে পরে যায় তো।
যখন কিয়াদের ক্যাবল কারটির উপরে হেলিকপ্টার আছড়ে পরে তখন কিয়ানদের ক্যাবল কারটি জুগস্পিটজ পাহাড়ের কিনারের দিকে ছিলো একপাশে। সেটাই যেনো ওদের বাঁচার আরেকটা রাস্তা হয়ে গেলো। খোদা নিজেই হয়তো চেয়েছিলো ওদের বাঁচিয়ে রাখতে। চেয়েছিলো হয়তো ওরা বেঁচে থাকুক।
ঠিক যেই সময়ে ওরা ভেবেই নিয়েছিলো যে ওরা এখান থেকে নিচে পরে যাবে। এটাই ওদের জীবনের শেষ সময় ঠিক সেই সময়েই ওরা একদম নিচে পরে না গিয়ে পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পরলো। পাহাড়ে আছড়ে পরে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পরতে পরতেই জুগস্পিটজ পাহাড়ের খাড়া পাথরের গায়ে একটা খাঁজ এ ওরা দুজন আটকে গেলো।
এতো উচু হতে পরে যাওয়াটাও কোনো সহজ ব্যাপার নয়। ওরা যেখানে পরেছে সেখানে খানিক বরফ জমে থাকলেও বরফের নিচে উপস্থিত রয়েছে মাটি আর পাথরের। বিভিন্ন জায়গায় কিছু কিছু মরা গাছ রয়েছে। যেগুলোর শুকনো ডালের একটা আচর লাগলেই সেই জায়গা চিরে রক্তে রঞ্জিত হবে সেই স্থান।
ওরা যখন গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পরে একটা খাঁজে আটকে গেলো তখন কোমলের জ্ঞান নেই। তবুও ওর হাতের বাধন অটুট। এক চুল পরিমাণ আলগা হয়ে যায়নি ওর হাত।
তবে কিয়ানের জ্ঞান থাকলেও বেশিক্ষন জ্ঞান থাকতে পারেনি ও। কোমলকে নিজের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রাখায় কোমলের তেমন কোনো বড় ক্ষতি হয়নি ঠিকই তবে কিয়ানের মাথা গিয়ে বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা একটা পাথরে আঘাত লাগে। মাথার কাছে সাদা বরফের কুচির অংশে লাল রক্তে ভিজে গেলো। এক হাত মাথার পিছনে নিয়ে ছুঁইয়ে সেটা চোখের সামনে এনে ধরলো কিয়ান। দেখলো ওর হাত পুরো রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। আস্তে আস্তে খুব কষ্টে বিষন্ন কন্ঠে বলল,
“ আমাকে ক্ষমা করে দিও স্বর্ণ। আমি যে তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না। এই পৃথিবীতে তোমার সাথে আমার ছোট একটা সংসার আর সাজানো হলো না। আমাদের বেবি পৃথিবীতে আসলো না। যার উছিলায় তোমাকে সুস্থ করতে চেয়েছিলাম সেই রুহ ও রয়ে গেলো খোদার হেফাজতে। এখান থেকে বেঁচে ফেরার যে আর কোনো উপায় নেই।”
চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে । আবার কি যেনো মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে কোমলকে উদ্দেশ্য করে বলে বসলো,
“ও বউ আমাদের যে এখনও বাসর করা হলো না।”
এই। বলেই ফিক করে হেঁসে দিলো কিয়ান। হয়তো জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। আবার হুট করে কেঁদে দিলো। বলল,
“আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও স্বর্ণ। আমি কিন্তু তোমায় সত্যি ভালোবাসতাম বুঝেছো। কিন্তু নিয়তির খেলায় সেই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা হেরে গেলো। বিধাতা আমাদের একসাথে থাকার তৌফিক দিলো না।”
একটু থেমে,
“ভালোবাসি স্বর্ণ। নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি তোমাকে। তোমাকে বাঁচাতে না পারার জন্য তোমার এই অধম স্বামীটাকে ক্ষমা করে দিও গো।”
কিয়ান শক্ত করে আগের চেয়েও আরো শক্ত করে কোমলকে জড়িয়ে ধরলো। ও অজ্ঞান হয়ে গেলে বা ওর কিছু হলেও যেনো কোমল ওর বাহুর মাঝেই থাকে। ধরেই নিলো এটাই হয়তো জীবনের অন্তিম ক্ষণ। এখানে পরে বেঁচে থাকার যেই আশা ছিলো সেটা যেনো মুহূর্তেই ধুপ করে নিভে গেলো। তুষারের মাঝে পড়ায় হয়তো বেঁচে যাবে ভেবেছিলো। কিন্তু রেসকিউ টিম ওদের খুঁজে বের করতে করতে বোধহয় ওরা মারা যাবে। কিয়ানের অবস্থা ভালো না। একটু পর পর চোখ বুঁজে আসছে। ও চেষ্টা করছে নিজেকে সজাগ রাখার তবে সেটা যেনো ওর দ্বারা কষ্ট কর হয়ে উঠেছে ভীষণ।
শেষবারের মতো কোমলের ঠোঁটে ছোট করে একটা শুকনো চুমু খেলো কিয়ান। এমন সিরিয়াস মুহূর্তেও ওর মাথায় একটা জিনিস কাজ করলো আর সেটা হলো মারা গেলে বউকে আর কোনোদিন চুমু খেতে পারবে না কিয়ান সেটা ভেবেই আরো দু একটা চুমু খেলো । জ্ঞান হারানো কোমলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রেখেই।
আস্তে আস্তে চোখের সামনে সমস্ত কিছু ঝাপসা হতে থাকলো ওর কাছে। কোমলকে জড়িয়ে রাখা অবস্থাতেই ওর ঠোঁটে ঠোঁট রেখেই কিয়ানও নিজের জ্ঞান হারালো।
অতঃপর,
সেখানে পরে গিয়ে বেঁচে যাবে ভেবেও দুজনেই জ্ঞান হারালো। আদতেই জ্ঞান হারিয়েছে নাকি মারা গিয়েছে সেটা বোঝা দুষ্কর।
_
চৌধুরী বাড়ির সকলে আজ তালুকদার বাড়িতে এসেছে। আজকে রাইসা আর তূর্যের ঘরোয়া ভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। খুব বেশি আত্মীয় স্বজন নেই। যাঁরা খুব কাছের তারাই এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছে।
রাইসার শরীর আগের চেয়ে কিছুটা ভারী হয়েছে। গা হাত পা ফুলে একদম লাড্ডুর মতো লাগছে। যত দিন বাড়ছে মাতৃত্ব যেনো আরো জেঁকে বসেছে রাইসার শরীরে। তূর্যের মা প্রথমে কোনো ভাবেই ওদের মেনে নিতে চায়নি। তিনি যখন জিজ্ঞেস করেছিলো কি আছে এই মেয়ের মাঝে যে তূর্য এই মেয়েটিকেই বিয়ে করতে চায় তার পরিবর্তে তূর্য বলেছিলো,
“ওর মধ্যে তোমার নাতি রয়েছে।”
ব্যস আর কিছু বলতে হয়নি ওকে। যেহেতু ওদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে সেহেতু এটা স্বাভাবিক। তূর্যের মা বুঝে গিয়েছেন কি কাহিনী হয়েছে। তিনিও ওদের হাঁসি মুখে মেনে নিয়েছে।
এতো সব ব্যস্ততার মাঝেও জাহরা চৌধুরী অনুষ্ঠানের এক কোনায় বসে অনবরত ফোন দিয়ে চলেছে কিয়ানের নাম্বারে। আজকে কথা হয়নি ছেলের সাথে। ফোন দিয়েও কোনো ভাবেই কোনো খোঁজ পাচ্ছে না ওর। চিন্তায় মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছে ওনার। কিয়ানের ফোন বন্ধ বলছে।
আরেকদিকে বিয়ের বর তূর্য। সেও সোফার এক কোনায় বসে অনবরত ফোন করে যাচ্ছে কোমলের নাম্বারে। ওর নাম্বারে রিং হচ্ছে তবুও ফোন কেউ তুলছে না। বার বার ফোন দিয়েই যাচ্ছে।
ফোনে পাবে কি করে? কোমলের ফোন তো কিয়ানের খালি এপার্টমেন্টে পরে রয়েছে। সেখানে তো কেউ নেই যে ফোন তুলবে। বেড সাইড টেবিলে রাখা সেই ফোন। ভাইব্রেশনের কারণে বার বার নড়ে চলেছে। এক সময় কাপতে কাপতে সেটি টেবিল থেকে নিচে পরে গেলো।
এবার তূর্য ফোন দিলে ওপর পাশ হতে বলল,
“আপনি যেই নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন সেটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পরে আবার চেষ্টা করুন।”
বিরক্ত হয়ে তূর্য ফোন ওর সামনের টেবিলে এক প্রকার ছুঁড়ে ফেললো। কপালে হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। কোমলকে ও ওর ছোট বোনের মতো ভালোবাসে। সব সময় কোমলকে ও সকল পরিস্থিতিতে সাহায্য করেছে। অনেক অন্যায়ও করেছে ও এই কোমলের জন্য। তূর্য কোমলের ব্যাপারে সকল কিছু জানতো। মেয়েটার এই নির্মম পরিস্থিতির কারণে ওর নিজের অনেক খারাপ লাগে। এখন চিন্তা হচ্ছে কোমল কেনো ওর ফোন তুলছে না? এমন একটা আনন্দের মুহূর্তে কোমলকে পাশে চেয়েছিলো তূর্য। মা ছাড়া আর এক কোমলই ছিলো ওর জীবনে। ওর আর কোনো ভাইবোন না থাকায় কোমলকে নিজের সবটুকু দিয়ে নিজের বোন ভেবে এসেছে।
রাইসা এগিয়ে এসে ওর শরীর ঘেঁষে বসলো। তূর্যের হাঁটুর উপর রাখা হাতের উপর নিজের এক হাত রেখে বলল,
“চিন্তা করো না সব ঠিক আছে। হয়তো ফোন কাছে নেই তাই ধরতে পারছে না।”
“কি ঠিক আছে বলোতো? এখন আবার বন্ধ বলছে ফোন। এমন কখনও হয় না তো। ভাইয়ার ফোন ও বন্ধ বলছে।”
তূর্য ওদের থেকে দূরে এক কোনায় বসে চিন্তিত জাহরা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। কিয়ানের ফোন বন্ধ বলছে তবুও তিনি ফোন দিয়েই চলেছে।
এমন সময় দরজা দিয়ে হুড়মুড় করে নাওফিল ভিতরে প্রবেশ করলো। ছেলেটাকে দেখে বিদ্ধস্ত লাগছে। চোখ মুখ কেমন ফুলে গিয়েছে। শার্টের হাতের বোতাম গুলো খোলা। সেই হাত দিয়েই আবারও চোখ থেকে গড়িয়ে পরা পানি মুছলো। প্রথমে চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে দেখে সেখানে কেউ নেই। পরে সিকিউরিটি গার্ডের থেকে ইনফরমেশন পেয়ে তালুকদার বাড়িতে এসেছে। এসেই চিল্লিয়ে জাহরা চৌধুরীকে ডাকতে লাগলো অনবরত। জাহরা চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো ওর দিকে। ওর কপালে হাত বুলিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,
“কি হয়েছে বাবা? এমন করছিস কেনো?”
“বড়মা কিয়ান..”
হেঁচকি উঠে যাচ্ছে ওর তবুও বলল,
“কিয়ান ভাইয়া কোমলকে নিয়ে জুগস্পিটজ পাহাড়ে ক্যাবল কারে করে ঘুরতে গিয়েছিলো। আর সেখানে একটা এক্সিডেন্ট হয়ে ওরা দুজনেই কাচ ভেঙে নিচে পরে যায়। এখনো ওদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। রেসকিউ টিম ওদের এখনো খুজে চলেছে।”
“আমার সোনা!”
এক চিৎকার করেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো জাহরা চৌধুরী। নিজের একটা মাত্র সম্বল যাকে ঘিরে বেঁচে ছিলো সেও যদি তিয়ানের মতো অকালে ওনাকে ছেড়ে চলে যায় তাহলে যে ওনার বেঁচে থাকাটাই বৃথা।
#চলবে
[ টপকে দিবো নাকি ওদের? কি বলো? ]