#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৯
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
সেকেন্ডের কাটা পেরোয়, মিনিটের কাটা পেরোয়, পেরোয় ঘণ্টার কাটা। এমন করেই দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস আর মাস থেকে বছর পেরোয়। গুণে গুণে সেই বিভীষিকাময় দিনের ঠিক তিন বছর পেরিয়ে গেলো। সময় আর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তারা বয়ে চলে নিজেদের আপন গতিতে।
জার্মানির একটা পুরোনো গ্রাম। চারপাশে হালকা তুষারপাত হচ্ছে। পাকা রাস্তারা সেই ছোট গ্রাম টাকে ছাড়িয়ে লোকালয়ে গিয়ে মিশেছে।
এখানে ছোটো ছোটো গলি গুলোও যেনো কোনো শিল্পীর তৈরি একটা চিত্রকর্ম। যেখানে চিত্রকর্মী তার সকল প্রতিভা ঢেলে দিয়েছেন। পাহাড় বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পর্যন্ত চলে গিয়েছে বিভিন্ন কাঁচা পাকা রাস্তা।
পাহাড়ের খাঁজে তৈরি কাঠ আর ইটের তৈরি নান্দনিক বাড়ি ঘর। রয়েছে বিভিন্ন পাথরের সরু রাস্তা। এখানে বেশিরভাগ রাস্তাই সরু আর পাথরের তৈরি। আর ঘরগুলো বেশিরভাগ কাঠের।
নদীর পাড়ে রয়েছে কিছু পুরোনো কাঠের ঘর। অনেক পাঁকা দেয়ালে রঙিন চিত্র একাই। কাঁচের তৈরি জানালায় ছোট ছোট তুষাতের কনা উড়ে উড়ে এসে পড়ছে।
এমনই এক পাহাড়ের খাঁজে গড়ে ওঠা কাঠের ছোট একটা বাড়ির বেদ রুমের জানালার ধারে মাঝারি সাইজের একটা নান্দনিক কারুকার্য করা কাঠের টেবিলের উপর হাতে একটা ডায়েরি নিয়ে বসে রয়েছে বাড়ির একমাত্র কর্তী গোল্ডমেরি। বাড়িতে ও ব্যতিত বসবাস করে ওর স্বামী জাকি আর একটা ছোট চার মাসের প্রিন্সেস লুনা। তবে জাকি এখন বাহিরে রয়েছে কাজে।
এখান থেকে দূরে একটা বাজারে কফি সপে ওয়েটারের কাজ করে জাকি। পার্ট টাইম জব। এছাড়াও বাড়ির সামনে ছোট উঠোনে বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। সেখান থেকে যা ফলন হয় সেটা বিক্রি করে ওদের তিনজনের এই ছোট সংসার দিব্যি সুখেই যায়।
গোল্ডমেরি জানালা দিয়ে অনিমেষ তাঁকিয়ে রয়েছে জানালার কাঁচ গলিয়ে বাহিরে ঝরতে থাকা সাদা বরফ কুচির দিকে। জীবন বড়ই রহস্যময় আর অদ্ভুত বটে।
নাহলে এই কিয়ানের স্বর্ণ থেকে গোল্ডমেরি আর কিয়ানকে জায়রিন চৌধুরী কিয়ান থেকে জাকি হয়ে থাকতে হতো না বছরের পর বছর। ওদের এই পরিচয় বদলের খেলাটা খুব সহজ ছিলো না। অনেক স্ট্রাগেল করতে হয়েছে নিজেদের এই ছোটো সংসারটা গোছাতে।
গোল্ডমেরি ওরফে কোমল টেবিলের উপর বসে ডায়েরিতে লেখা ওদের অতীতের জীবন কাহিনী পুনরায় পড়বে বলে স্টোর রুম থেকে বের করেছে। মাঝে মাঝেই এই ডায়রি পরে নিজেদের অতীত সম্পর্কে পড়ে ও। যেনো কোনোদিন এই বিষাদে মোড়ানো অতীত না ভুলে যায় সেই কারণে মাঝে মাঝে কিয়ান বাড়িতে না থাকলে মাঝে মাঝে এটি পড়ে।
কিয়ান আর কোমলের সাত মাসের একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান রয়েছে। যার নাম লুনা। কিয়ান অনেক শখ করে মেয়ের নাম রেখেছে লুনা। যার অর্থ চাঁদ। মেয়ে নাকি তার চাঁদের একটি খন্ড। যে ওদের কোলে এসে ধরা দিয়েছে।
হাতের ডায়েরি খুলে মনে মনেই পড়তে শুরু করলো সেই ডায়েরি। এই ডায়েরি ও নিজের হাতে লিখেছে। নিজের জীবনে ঘটা এই অদ্ভুত কর্মগুলো যে কখনো ভুলবে না কোমল।
___অতীত___
সেই ক্যাবল কারের এক্সিডেন্টের ঠিক এগারো মাস পর।
সিঙ্গাপুরের সিটি হসপিটাল। রোজকার দিনের মতোই এখানে বিভিন্ন লোকজনেরা এসেছে নিজেদের লোকেদের সাথে দেখা করতে। অনেক রোগীকে ওয়ার্ড বয়রা এম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে করে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। কাউকে নিচ্ছে ইমার্জেন্সিতে আবার কাউকে নিয়ে যাচ্ছে রেগুলার ওয়ার্ডে। অনেকে আবার নিজেদের রোগীকে চেকআপ করিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হসপিটাল থেকে।
জাহরা বেগম মাত্রই হসপিটালে ঢুকেছেন। হাতের ব্যাগে করে তিনি হটপটে গরম খাবার নিয়ে এসেছেন। সাথে দুটো হট ওয়াটার পটে করে নিয়ে এসেছেন গরম দুধ আরসাথে গরম পানি। হসপিটালে সাদমান চৌধুরী রয়েছেন তার সাথে রয়েছেন রেহানা চৌধুরী। শমসের চৌধুরী আরো দুমাস আগে গত হয়েছেন। মূলত রেহানা চৌধুরীর জন্যই এই গরম দুধ আর পানি।
খাবারের ব্যাগ হাতে নিয়ে তিনি ঢুকে পড়লেন একটা বড় বিলাসবহুল কেবিনে। যেগুলোকে এক প্রকার ভিআইপি কেবিনও বলা চলে। ভিতরে একটা ডাবল বেডে একপাশে রেহানা চৌধুরী শুয়ে রয়েছে আর একটা ছোট সোফায় সাদমান চৌধুরী বই হাতে বসে বসে বই পড়ছে।
ইংলিশ নোবেল সাদমান চৌধুরীর পছন্দের বই। সেই একটি ইংলিশ নোবেল বই পড়ছেন তিনি।
জাহরা চৌধুরী গিয়ে সোফার সামনে পাতানো ছোট টি টেবিলের উপরে খাবারের ব্যাগ রাখলেন। হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি সামান্য এই টুকু পথ আসতে। এখানেই একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন সাদমান চৌধুরী। সেখান থেকেই স্বামীর আর শ্বাশুড়ির জন্য ভাত মাছ মাংস রান্না করে এনেছেন তিনি।
এখান থেকে তাদের এপার্টমেন্ট যেতে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। যদিও তারা গাড়িতেই আসা যাওয়া করেন তবুও চারতলা পর্যন্ত উঠে করিডোরের শেষ প্রান্তে আসতে কষ্টই হয়েছে ওনার। লিফটে প্রচুর ভিড় থাকায় সিঁড়ি বেয়ে আসতে হয়েছে ওনাকে।
কেবিনের ওয়াশরুমে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসলেন তিনি। এগিয়ে গেলেন ডাবল বেডের পাশেই রাখা আরেকটা সিঙ্গেল বেডের দিকে। যেখানে তার বুকের ধন। তার মানিক তার শেষ সম্বল কিয়ান শুয়ে আছে।
সেদিন অনেক খোজা খুঁজি করার পর ওদের দুজনকেই রেসকিউ টিম ওদের খুঁজে পায় পাহাড়ের খাঁজে। সেখান থেকে উদ্ধার করে দুজনকেই জার্মানির একটা হসপিটালে ভর্তি করানো হয়। তবে কিয়ানের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় ওকে সাদমান চৌধুরী আর জাহরা চৌধুরী মিলে সিঙ্গাপুর নিয়ে এসেছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য।
সেই উচু স্থান হতে পরে গিয়ে বেঁচে গেলেও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগার কারণে কিয়ান কোমায় চলে যায়। আজ এগারো মাস ধরে ও কোমায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত ওর জ্ঞান ফেরেনি।
জাহরা চৌধুরী দেখেন মাঝে মাঝে কিয়ানের চোখের পাতা পিটপিট করে নড়ে। কি জানি কোমায় থেকেও কাউকে স্বপ্নে দেখে নাকি ছেলেটা?
তিনি একটা ছোটো টাওয়েল ভিজিয়ে এনে এগিয়ে গেলো কিয়ানের বেডের দিকে। কিয়ানের মুখমন্ডল মুছিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ কিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কপালে একটা চুমু একে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলো।
দুটো প্লেটে করে খাবার নিয়ে একটা দিলেন সাদমান চৌধুরীকে। তিনিই বই এক পাশে রেখে হাত ধুয়ে খেতে বসলেন।
আরেকটা প্লেটে দুধ আর পাঁকা আম দিয়ে ভাত মাখিয়ে একটা চামচ সহ দিলেন রেহানা চৌধুরীকে। তার লিভারে সমস্যা রয়েছে যার কারণে তার জন্য ঝাল খাওয়া নিষিদ্ধ। সেই জন্যে সবসময় তার জন্য ঝাল ছাড়া খাবার তৈরি হয়ে থাকে।
রেহানা চৌধুরীকে উঠে বসতে সাহায্য করলেন। তিনি ঊঠে বসে চামচের সাহায্যে খাবার খেতে লাগলো।
স্বামী আর শ্বাশুড়ীকে খাবার দিয়ে তিনি একবার কিয়ানের স্যালাইন চেক করে দেখলেন সব ঠিকঠাক রয়েছে।
তাই তিনিও খাবার নিয়ে বসলেন। তবে সেই খাবার আর মুখে তুলতে পারলেন না জাহরা চৌধুরী। প্রথম লোকমা মুখে দেয়ার আগেই ওনার চোঁখ গেলো কিয়ানের হাতের দিকে। কিয়ানের হাতের দিকে তাকিয়ে ওনার হাত আর চললো না। খাবার রেখে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এগিয়ে গেলেন কিয়ানের মাথার নিকট।
স্পষ্ট ভাবে ওর হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো কিয়ানের হাতের আঙ্গুল নড়ছে। নিজের ভুল ভেবে চোখ ডলে আবার তাকালো। নাহ সত্যিই দেখছেন তিনি। নিজে কিয়ানের হাত আঁকড়ে ধরলো। ওনার চোঁখ চকচক করতে লাগলো খুশিতে।
“বাবা? মাকে শুনতে পাচ্ছো তুমি? আমি তোমার মা। শুনতে পাচ্ছো?”
তবে কিয়ান কোনো উত্তর দিলো না। কিছুক্ষন পর কিয়ান আস্তে ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই জাহরা চৌধুরী হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দিলো কেবিনে এক প্রকার।
“দেখো কিয়ানের বাবা। আমার কিয়ানের জ্ঞান ফিরে এসেছে। তুমি এক্ষুনি ডক্টরকে ডাকো।”
সাদমান চৌধুরী তৎক্ষণাৎ দৌড়িয়ে গেলেন ডক্টর ডাকতে। ডক্টর এসে ওকে চেকআপ করে বললেন,
“কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার সাদমান। আপনার ছেলে এখন সুস্থ আছে।”
“ও কোনো কথার বলছে না কেনো?”
“আসলে এতোদিন কোমায় থাকার কারণে ওনার মস্তিষ্কে সেটার প্রভাব পড়েছে। ওনাকে একটু রিল্যাক্স হতে দিন। ও একাই কোথা বলবে।”
ডক্টর কেবিন ঠেকে বেরিয়ে গেলে সত্যি কিছুক্ষণ পর কিয়ান নিজেই অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার স্বর্ণ কোথায়?”
ছেলের কথায় উপস্থিত তিনজনই ঢোক গিলে নিলো। স্বর্ণের কথা তারা কি করে জানাবে কিয়ানকে? কিয়ানের এই কোমায় থাকার অবস্থায় যে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। সময়ের সাথে বিরাট পরিবর্তন এসেছে সকলের।
#চলবে
[ বলোতো কোমলের কি এমন হয়েছে যে সবাই ভয় পেয়ে গেলো? ]