#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_৩০
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
কেবিনের ভিতর থমথমে নিস্তব্ধতা। খানিক সময় আগেই এখানে বয়ে গিয়েছে এক বড় সর তাণ্ডব। কেবিনের সমস্ত জিনিস লণ্ড ভণ্ড হয়ে রয়েছে। স্যালাইনের প্যাকেট, বিছানার চাদর, বালিশ ঔষধ পত্র সকল কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারপাশে।
কেবিনের এক কোনায় সাদমান চৌধুরী, রেহানা চৌধুরী আর জাহরা চৌধুরী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিয়ান তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রাগে কাপছে। চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে বাবা মায়ের দিকে। রাগে চোয়াল কাপছে ওর।
“এগারো মাস ধরে আমি হসপিটালে ভর্তি আর তোমরা আমার বউয়ের খবর জানো না? ওর কোনো খবর নেই তোমাদের কাছে? আমার এতো খারাপ অবস্থা হয়েছে তাহলে না জানি আমার স্বর্ণের কি হয়েছে! ও কি তোমাদের দায়িত্ব ছিলো না মা?”
কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছে না। কিয়ান আবার বলল,
“আমি জানি তোমরা আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছো। বলো কোথায় আমার স্বর্ণ?”
কিয়ান এবার নিজের মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো। জাহরা চৌধুরীর দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অসহায় সুরে অনুরোধ করে বলল,
“প্লীজ মা! বলো কোথায় আমার স্বর্ণ?”
জাহরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিয়ানের অসুস্থতার কথা ভেবে তিনি এখন পর্যন্ত ঘটা সমস্ত ঘটনা লুকিয়ে গিয়েছেন। ভেবেছিলেন কোমলের কথা বললে ছেলে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এখন অবস্থা বেগতিক হচ্ছে দেখে তিনি ভাবলেন ছেলেকে সব ব্যাপার খুলে বলবে। বোঝাবে ছেলেকে।
জাহরা চৌধুরী কিয়ানকে নিয়ে সোফার উপর বসিয়ে নিজেও বসলো ওর পাশে। কিয়ানের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজেই কিয়ানের হাত দুটো নিজের হাতে নিলেন। চোখ নামিয়ে হাতের দিকে রেখে অসহায় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“বলবো। সব বলবো তোকে। তার আগে কথা দে তুই কোনো বাজে রিয়েক্ট করবি না।”
“আমার স্বর্ণের এমন কি হয়েছে মা? যে আমার তোমাকে কথা দিতে হবে?”
“আগে কথা দে পরে বলছি।”
“স্বর্ণ ঠিক আছে তো মা?”
এই কথার কোনো জবাব দিলো না জাহরা চৌধুরী। তিনি শুধু তাকিয়ে রইলো কিয়ানের দিকে। কিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাকে বলল,
“কথা দিলাম।”
জাহরা চৌধুরী ছেলের কথায় ভরসা পেলেন যে কিয়ান কোনো বাজে রিয়েক্ট করবে না। তিনি বলা শুরু করলেন,
“তোদের যখন খুঁজে পাওয়া গেলো। তখন তোর অবস্থা অনেক খারাপ ছিলো। উন্নত চিকিৎসার জন্য তোকে আমরা সিঙ্গাপুর নিয়ে আসলাম। তবে কোমলের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কেনোনা তুই ওকে নিজের শেষ সময় পর্যন্ত আগলে রেখেছিলি। তোকে সিঙ্গাপুর নিয়ে আসার আগে আমরা জার্মানির একটা হসপিটালে ভর্তি করালাম তোদের দুজনকে।
এলিজার সেকি হোম্বি তোম্বি। তার মেয়ে নাকি তোর জন্যই অসুস্থ। অথচ কোমলের থেকে তোর অবস্থা বেশি শোচনীয় ছিলো।
তোকে সিঙ্গাপুর নিয়ে আসার পরও আমরা কোমলের খোঁজ খবর নিয়েছিলাম। চারদিন পর ওর জ্ঞান ফিরলে ও তোকে খুঁজতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলো। তোকে না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে পরে। আর সেই রাগে একজন ওয়ার্ড বয়ের উপর আক্রমণ করে দেয়। কোনো রকমে ছেলেটিকে বাঁচিয়ে নেয় সকলে। কোমলকে আটকে রাখা হলো যেনো ও কাউকে আঘাত করতে না পারে। ও কিছুতেই মেনে নিতে চাইছিল না যে তোর অবস্থা ভালো না। তুই কোমায় চলে গিয়েছিস।
আর সবচেয়ে বেশি অবাক লেগেছিল কি জানিস?”
কিয়ান মায়ের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। যা দেখে জাহরা চৌধুরী বলল,
“এলিজা নিজে কোমলকে মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করালো। সেখানে গিয়েই কোমল আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ঠিক তার দুই চারদিন পর ডক্টর মালিথা মেন্টাল হসপিটালে এলেন পুলিশ সহকারে। জানালেন কোমল এখন পর্যন্ত একশো তিন জনকে খুন করেছে। তাও বাজে ভাবে। এবং তার সমস্ত প্রমাণ পুলিশের কাছে ছিলো। তুই যখন ওকে চেকআপের জন্য নিয়ে গিয়েছিলি কোমলের বলা সমস্ত কথা তিনি রেকর্ড করে রেখেছিলেন। ডক্টর মালিথা জানিয়েছেন আর যাই হোক একজন সাইকো কখনও জেলের বাহিরে থাকতে পারে না। ওর চিকিৎসা হলে পুলিশ কাষ্টরিতে থেকেই হবে।
সেখান থেকে বেরিয়ে এলো আরেক রহস্য। পুলিশের মাধ্যমে ওর টেক কেয়ার করতো যেই আইলিন আন্টি আর ওর ড্রাইভার তাদেরকে আটক করা হলো। পুলিশের ভয়ে তারাও সমস্ত কিছু গড়গড় করে বলে দিলো। ওদের দুজনের কথায় আমরা সবাই অনেক অবাক হয়েছিলাম জানিস? একজন মানুষ এতোটা নিকৃষ্ট কি করে হতে পারে?”
কিয়ান অবুঝ চাহনিতে তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। জাহরা চৌধুরী আবার বললেন,
“এবার যা বলবো তার জন্য মনকে শক্ত কর বাবা। জানিস? কোমলকে কে দিনের পর দিন ড্রাগ দিয়ে অসুস্থ করে রেখেছিল? ওর মা এলিজা। নিজের অতীতের জন্য ও তোকে আমাদের পরিবারকে দায়ী করে। অথচ জানিস ও যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিল তখন থেকেই ও একটু অস্বাভাবিক ছিল। কিছু হলেই উত্তেজিত হয়ে পড়তো। একে ওকে আঘাত করে বসত। এই জন্যই ওর সাথে বাড়ির কারো কোনো মিল ছিলো না। তোরা যেটা জানিস যে বাড়ির কেউ ওকে মেনে নেয়নি। সেই সব মিথ্যে। সবাই ওকে মেনে নিলেও ও ছিলো চরম উগ্র। তারপর হুট করে স্বামীর মৃত্যুতে ও সব দোষ তোর উপর চাপিয়ে দিলো।
কোমলকে দিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার বাসনা ওর সেদিন থেকেই ছিল যেদিন ও এই বাড়ি থেকে গিয়েছিল। সেদিন ও বলে গিয়েছিলো স্পষ্ট ভাষায়,
“আমি ফিরবো। এই পরিবার আমি ধ্বংস করে দেবো। আর তোমরা আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।”
সময়ের ব্যবধানে সবাই এলিজার সেই রূপ ভুলে গেলো। ভাবলো মেয়ের জন্য হয়তো ও ভালো হয়েছে। বিকৃত মস্তিষ্ক মেয়ের কথা ভেবে হয়তো শান্ত হয়েছে। তবে সবার ধারণা ভুল করে দিয়ে ওর এই নোংরা খেলায় কোমলকে নিজের দাবার গুটি বানালো এলিজা। কোমল শুধু আর শুধুই মাত্র এলিজার খেলার একটা গুটি মাত্র।
আর তোদের উপর যেই হেলিকপ্টারের অ্যাটাক হয় সেটাও এলিজাই করিয়েছিল। ভেবেছিলো তোদের দুজনকেই একসাথে মেরে ফেলবে। মেয়ের জন্য একবারও মন পোড়েনি ওই ডাইনির।
এই সকল কিছু যখন জানাজানি হলো তখন এলিজাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো। অথচ ওর মাঝে কোনো অনুশোচনা ছিলো না। উল্টো ওকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন ও হাসছিল হো হো করে। যেনো বড্ড মজা পেয়েছে ওকে পুলিশ ওকে ধোর নিয়ে যাচ্ছে বলে।”
জাহরা থামলেন এই পর্যন্ত বলে। কিয়ানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন অভিব্যক্তি। টবে ব্যর্থ হলেন তিনি ছেলের অভিব্যক্তি বুঝতে। কিয়ান শুধু শান্ত স্বরে প্রতিবারের ন্যায় একটাই কথা জিজ্ঞেস করলো,
“আমার স্বর্ণ এখন কোথায় মা?”
জাহরা চৌধুরীর বুক চিরে বেরিয়ে এলেন হতাশার শ্বাস। তিনি রুদ্ধসরে বলল,
“কোমল এখন জার্মানির একটা পুলিশ কাস্টোরিতে রয়েছে। ওখানে মেন্টালি যেই অপরাধীরা আছে তাঁদের রাখা হয়। ওকেও সেখানে রাখা হয়েছে। ওর মেন্টাল কন্ডিশন ঠিক হয়ে গেল ওকে কোর্টে তোলা হবে।”
একটু থেমে জাহরা চৌধুরী আবার বললেন,
“জানিস বাবা? মেয়েটা না সারাদিন শুধু তোর কথাই জিজ্ঞেস করে সকলকে। সারাদিন তোর কথা আওড়াতে থাকে। বলে শুধু, আমাকে তোমরা কিয়ানের কাছে নিয়ে চলো। ও আমাকে ছাড়া আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
এই পর্যায়ে এসে কিয়ান ডুকরে কেদে উঠল। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তোমরা পুলিশকে আটকালে না কেনো মা? ওরা যদি আমার স্বর্ণকে আঘাত করে। আজ পর্যন্ত এতো ক্ষতি করার পরেও আমি ওর গায়ের একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেইনি মা। সবসময় ভেবেছি মোমের মতো শরীর যদি কোনো ক্ষতি হয়। আর ওরা না জানি আমার স্বর্ণের সাথে কি কি করেছে?”
“সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা।”
জাহরা চৌধুরী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন। ছেলের কান্নাতেও যের তার বুক ফেটে যায়।
#চলবে
[ খুব শীঘ্রই অন্তিম পর্ব চলে আসবে এটার। রেসপন্স করবে সকলে। ]