ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুখের নেশায়

পর্ব 29

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃ আসরিফা সুলতানা জেবা
৪৭+৪৮
পর্ব___৪৭

বাতাবিলেবু গাছের ফাঁক দিয়ে কচি রাঙা রৌদ্র আসছে। বাগানের একপাশে শেষ আয়োজন চলছে সুফিয়া বেগমের। সকালে দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাক করলে উনাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফিনাইলের উদ্ভট গন্ধে মাখা চার দেয়ালের মাঝে তিনি নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিরতরে হারিয়ে যান ক্ষিতি হতে। মেদিনীর মোহ-মায়া তো তখনই ত্যাগ করেছেন যখন দিনের পর দিন,মাসের পর মাস পঁচে পঁচে মরণ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন বিছানায় কাতরে। সেই সময়টা তে বিশ্রী গন্ধে কেউ উনার রুমে পা রাখত না। এমনকি মিনা পর্যন্ত না। রাখত শুধু একটা মানুষ। চৈত্রিকা অবাক হতো সাফারাতকে দেখে কতই না নির্দ্বিধায় লোকটা সুফিয়া বেগমের ঘরে যেত। চৈত্রিকাও যেত তবে শেষ দিকে যাওয়া হতো না আর। গেলেই গরগর করে বমি করে দিত। সুফিয়া বেগমের লাশ আনার পর চৈত্রিকা একটা বার'ও সাফারাতকে দেখতে পায় নি। এমনকি বাড়িতেই আসে নি। হসপিটালে থাকতে ফোন করে শুধু এতটুকুই জানায়,সুফিয়া এহমাদ আর নেই। চৈত্রিকার উনার মৃ*ত্যুর কথা শুনে চমকে নি বরং সেই মুহুর্তে স্তব্ধতায়, বিমূঢ়তায় বাক হারা হয়ে পড়ে পুরুষালি গম্ভীর স্বরে সুফিয়া এহমাদ নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই। যাকে কখনও দাদি বাদে অন্য নামে ডাকতে শুনে নি,দাদির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে দেখে নি সেই মানুষটাই উনার নাম উচ্চারণ করেছিল। কিছু একটা ছিল সাফারাতের কন্ঠে। বিয়োগের ছাপ,কষ্ট ছিল না। একদম সাবলীল, স্বাভাবিক, ঠান্ডা ছিল কন্ঠটা।

চৈত্রিকা ফোন হাতে নিল। সাফারাত কোথায় জানতে হবে ওর। আজ বড্ড রহস্যময় লাগছে সাফারাতকে। চৈত্রিকার মনে হচ্ছে সে কিছু একটা মিস করছে। কিছু একটা তার আড়ালে রয়ে গেছে। সাফারাত! সাফারাতকে আরেকটু বুঝার বাকি রইল কি?দ্রুত ডায়াল করলো সাফারাতের নাম্বারে। অপর পাশের মানুষ টা সঙ্গে সঙ্গে কল টা রিসিভ করলো। গম্ভীর স্বরে বললো,
' চিন্তা করবেন না চৈত্র। চিন্তা করলে আমাদের সন্তানের ক্ষতি হবে। আমি আসছি। '
'চৈত্রিকার কন্ঠে বিস্ময়,প্রবল উত্তেজনা--' কোথায় আপনি?'
সাফারাত আশে পাশে তাকালো। তৎপরে চাইল মা'য়ের কবরটার দিক। উত্তপ্ত, সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস উন্মুক্ত অন্তরিক্ষের তলে বিসর্জন দিয়ে বলে উঠল,
' আম্মুকে জানাতে এলাম বহু বছর পর তার অপরাধীর পতন ঘটেছে। আসছি। '
কল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তৎক্ষনাৎ। চৈত্রিকা বড়সড় ঝটকা খেল। ফোন হাতে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। তার সজাগ মস্তিষ্ক নানাবিধ কল্পনায় ব্যস্ত। মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো,

' সাফারাত? সাফারাত জানে?নাকি আমার বুঝার ভুল?এ কেমন রহস্য?'

বাড়ির প্রবেশদ্বার হতে কারো গলার আওয়াজ কর্ণে আসছে। উচ্চ চিৎকার, চেচামেচির তীক্ষ্ণ শব্দ। মৌসুমি দৌড়ে গেলেন সেদিকে। ধীর পায়ে চৈত্রিকাও গেল। তব্দা খেল না সে। এটাই যেন স্বাভাবিক। মা'য়ের মৃ*ত্যুতে ছেলের আগমন স্বাভাবিক নয় কি?মাথার সমস্ত চুল সাদা মাঝে এক দু'টো কালো চুল পাহাড়ের ন্যায় উঁচু হয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সবাইকে। হয়ত বুঝাতে চাইছে নির্দয়হীন,নিকৃষ্ট মানুষ টা এখনও পুরোপুরি বুড়ো হয় নি। দারোয়ানের উপর তীব্র রাগ ঝাড়ছেন আধবয়স্ক লোকটা। কেন উনাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। দারোয়ান বার বার একই বুলি আওড়াচ্ছেন--' স্যারের আদেশ অমান্য করতে পারবো না আমরা। আপনি ঢুকতে পারবেন না। '

বাক্য দু'টো যেন দারোয়ান চাচার মুখস্থ। কি সুন্দর করে আওড়াচ্ছেন, কোনো হকচকানো কিংবা আমতাআমতা ভাব নেই। খুবই তুখোড় প্রত্যেক টা শব্দমালা। মৌসুমি কে দেখে ফারুক এহমাদ হাঁক ছাড়লেন। এগিয়েও গেলেন মৌসুমি। জেদ দেখিয়ে বললেন,
' গেট খুলো। ঢুকতে দাও ভাইকে। '

দারোয়ান আনতস্বরে জানালেন সাফারাতের অর্ডার ছাড়া পারবেন না। চৈত্রিকা ধিমে গতিতে হেঁটে এসে আরেকটু গলা বাড়িয়ে দেখতেই চোখে পড়ল একটা দশ অথবা এগারো বছরের ছেলে বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে একটা সুন্দর চৈত্রিকার মা'র বয়সী মহিলার সাথে। মহিলার চুলগুলো ঈষৎ লালচে কালার। ফারুক এহমাদের সাথে এসেছেন তারা বুঝতে বাকি নেই চৈত্রিকার। ছোট্ট ছেলেটা মাম্মা বলে ডেকে উঠল মহিলা টাকে। নিমিষেই চৈত্রিকার বিস্ময় আকাশ ছুঁয়ে ফেললো। ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ফারুকের দিক। যেই লোক সাফারাতের মা'কে বয়স করে বাচ্চা নেওয়ার কারণে দিন-রাত অবজ্ঞা করেছে,মার*ধর করেছে সেই লোকের একটা দশ বছরের বাচ্চা আছে। আর সিয়ার মৃ*ত্যুর নয় বছরও হয় নি তাহলে এই বাচ্চা টা?মানে ফারুকের দ্বিতীয় বিয়ের পূর্বেই এই বাচ্চা টা হয়েছে। ছি!একটা মানুষ এত জঘ'ন্য হতে পারে? চৈত্রিকা যেন নিজের শাশুড়ির কষ্টটা অনুভব করতে পারছে। দিনকে দিন কতটা ধোঁকা পেয়েছিলেন সেই নারী। হয়ত জানতেন স্বামী পরকীয়ায় জড়িয়ে অবৈধ বাচ্চার বাপও হতে যাচ্ছেন যা তিনি কাউকে জানান নি। হয়ত লজ্জায়। কিংবা অতীব কষ্টে।

মৌসুমির কর্কশ কন্ঠে চৈত্রিকা সম্বিৎ ফিরে পায়। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন--'এই মেয়ে তুমি বললে নিশ্চয়ই ঢুকতে দিবে। বাড়ি তো এখন তোমার। সব লুটে নিয়েছ ছেলেটাকে মায়া জাদু করে। এখন দারোয়ানকে বলো ভাই-ভাবী কে ঢুকতে দিতে। '

গিরগিটি! হ্যাঁ মৌসুমির জন্য এই শব্দ টা শব্দভান্ডার থেকে খুঁজে বের করলো চৈত্রিকা। ক্ষণে ক্ষণে বর্ণ পাল্টায় এই মহিলা। চৈত্রিকা মুখ লুকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসল। ফারুক এহমাদ, উনার ওয়াইফ এবং ম'রা বাড়িতে আসা কয়েকজন মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওর দিকে। মুহুর্তেই নিজের নরম,কোমল মন লুকিয়ে শক্ত রূপ ধারণ করলো চৈত্রিকা। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে কঠোর কন্ঠে বলে উঠল,

' যেই লোক নিজের প্রথম স্ত্রীর,নিজের অংশ, সন্তানের আগুনে পুড়ে যাওয়ার খবর শুনে ম'রার খবর শোনার অপেক্ষা করে,তার মতো নিকৃষ্ট মানবের অপবিত্র পদধূলি পড়তে দিব না আমি এই বাড়ির ভিটে তে। এটা আমার সিয়া মা'র গড়া রাজ্য। কলঙ্ক মুক্ত প্রত্যেকটা দেয়াল। '

চৈত্রিকার মুখের আদল বদলে গেছে। ফর্সা বদন রক্তিম হয়ে উঠেছে। মৌসুমি,ফারুক নিস্তব্ধ। সবার দু'ঠোঁট আলগা হয়েছে বেশ। তন্মধ্যে গেটের কাছে একটা গাড়ি আসতেই দারোয়ান দৌড়ে গেট খুলে দেয়। সোজা গ্যারেজে না গিয়ে গাড়িটা চৈত্রিকার কাছ ঘেঁষে থেমে যায়। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সাফারাত। আঁড়চোখে এক নজর তাকায় গেটের দিক। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। কপালের শিরাগুলো দপ দপ করে উঠে। রাগ নিবারণের নিমিত্তে অভ্যাসবশত শক্তপোক্ত পেশিবহুল হাত খানা মুঠো হয়। মুষ্টিবদ্ধ হয় পাঁচ আঙ্গুল। ধূসর রঙা দু'চোখ তীব্র দাহে জ্বালা করে উঠল। ঘাড় বাঁকিয়ে কাঠ কাঠ গলায় দারোয়ানের উদ্দেশ্যে বললো সাফারাত,

' গেট লাগান। '

দারোয়ান গেট লাগিয়ে দিল ফারুকের মুখের উপর। ফারুক ডাকলেন সাফারাতের নাম ধরে কিন্তু তা সাফারাতের শ্রবণগ্রন্থিতে পৌঁছালো কি-না সন্দেহাতীত। কেননা চৈত্রিকার হাত আঁকড়ে ধরে বড় বড় পা ফেলে অতিক্রম করে ফেলেছে অনেকখানি রাস্তা। চৈত্রিকা নিরবে,নিশ্চুপে বাধ্য মেয়ের মতোন স্বামীর পাশে হেঁটে চলেছে। কানাঘুঁষা, ফিসফিস শুরু হয়ে যায় চারদিকে। লোকমুখে ঢেড় নিন্দার বাহার চলছে। চৈত্রিকা মেয়েটাই হয়ত স্বামীকে উস্কে দিয়েছে, নয়ত আপন বাপকে কেন বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না৷ এত খারাপ ছেলে যে কি-না বাপকে মা'য়ের লাশ দেখতে দিচ্ছে না আরো কতো কি!

চৈত্রিকা শুনলো, বিনিময়ে হাসলো। সমাজের মানুষ সত্যের গভীরতা জানে?জানে সাফারাতের উপর হওয়া অত্যা'চার- জুলু*মের কথা?একজন গর্ভবতী নারীর নৃ*শংস ভাবে আগুনে পুড়ে মর'বার ঘটনা মনে সজীব রেখেছে?নাকি এটা জানে সেই নারীর মৃৃ*ত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না বরঞ্চ কারো উদ্দেশ্য হাসিলের শিকার হয়ে খু*ন হয়েছে?
____________

সুফিয়া বেগমের দাফন কার্য সম্পন্ন হয়েছে বিকেলের দিকে আসরের নামাযের পর পরই। সাফারাত সর্বশেষে এক মুঠো ভিজে মাটি কবরের উপর দিয়ে সরে এলো। বেরিয়ে এলো কবরস্থান ছেড়ে। তার পা জোড়া আর থামল না,একটা বারও পিছু ঘুরে তাকালো না মাটিতে সমাহিত সুফিয়া বেগমের কবরটার দিকে। সদ্য দেওয়া মাটি ভিজে গিয়েছে তুমুল বর্ষনে। সাফারাতের সাদা পাঞ্জাবি বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে সুঠাম দেহে লেগে আছে। দিহান গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ভিজছে। জুবুথুবু অবস্থা তার। হিমেল হাওয়া বইছে। গা কাটা কাটা দিয়ে উঠছে। সাফারাতকে একান্ত সময় কাটাতে দিয়ে অপেক্ষা করছিল সে। সাফারাত এসে তার পাশে দাঁড়াতেই বলে উঠল,

' এখন চৈত্রিকাকে সবটা জানাবি তো?'
' জানানোর সময় হয়ে গিয়েছে। অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে সবটা জানার অধিকার আছে উনার। '
দিহান থতমত খেয়ে গেল। চোখ দুটো বৃহৎ আকৃতির করে জিজ্ঞেস করলো,

' আপনি?তুই চৈত্রকে এখনও আপনি বলে সম্বোধন করিস তাও নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে?'

সাফারাত মুখ উঁচিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে পারল কেবল। কারণ বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা তেছড়াভাবে চোখের কোলে এসে পড়তে আরম্ভ করে। সাফারাত আবারও অম্বর পানে মুখ উঁচিয়ে ধরে। তবে এবার নেত্রদ্বয় বুঝে রাখে। অধর কার্নিশ ক্ষীণ বাঁকিয়ে বলে,

' আপনি সম্বোধন টা বেশ প্রিয়। এই সম্বোধনে সুখ পাই। আপনি বলে সম্বোধন করা সেই নারীতে রয়েছে সুখ। আমার চৈত্র মাসের মাঝে অসীম সুখ খুঁজে পাই আমি। '

দিহান হাসলো। বললো,
' তোর সুখের সমাপ্তি না হোক। '
______________

চৈত্রিকা থম মেরে বসে আছে সোফায়। ফাহমিদা মেয়েকে বার বার বুঝাচ্ছেন। হুট করে কি হলো চৈত্রিকার তিনি বুঝতে পারছেন না। মৌসুমি, চাচী নিজ নিজ রুমে। মিমের শাশুড়ির শরীরটা খারাপ বলে সে চলে গিয়েছে সুফিয়া বেগমের লাশ নিয়ে যাওয়ার পর পর। ফারুককে এই বাড়িতে প্রবেশ করতে না দিলেও জানাযার সময় ছেলে হিসেবে উনাকে চুপি চুপি দেখানো হয় শেষ বার মা'য়ের মুখটা। সব-ই চলছে সময়ের নিয়মে। কিন্তু চৈত্রিকার হঠাৎ এহেন মৌনতা ফাহমিদার ভয় করছে। এক দৃষ্টে চেয়ে আছে মেয়েটা মেঝের দিক। ফাহমিদা সাফারাতকে ফোন করে জানায়। সদর দরজা পাড় করে ছুটে আসে সাফারাত। চৈত্রিকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে ভিজা শরীরে। অধৈর্য স্বরে বলে উঠল,
' কি হয়েছে চৈত্র? চুপ করে আছেন কেন আপনি?'

চৈত্রিকা দৃষ্টি তুলে সাফারাতের দিকে নিক্ষেপ করলো। জাগতিক সকল বাস্তবতা, দিক বিদিক ভুলে হামলে পড়ল সাফারাতের বুকে। অকস্মাৎ কান্ডে সাফারাত পড়ে যেতে নিয়ে এক হাত মেঝেতে সাপোর্ট হিসেবে রাখে। সামলে নেয় নিজেকে। অন্য হাতে শক্ত করে চৈত্রিকার পিঠ আঁকড়ে ধরে আবদ্ধ করে নিজের মাঝে মোলায়েম দেহ খানি। ফাহমিদা চলে গেলেন। মেয়ের যে এখন প্রয়োজন তার প্রিয় মানুষ টার। চৈত্রিকার ফুঁপানোর শব্দ শোনা গেল না। নতুন করে সাফারাতের পাঞ্জাবি অশ্রুজলে ভিজল না। স্রেফ চুপটি মেরে বুকে পড়ে রইল মেয়েটা। সাফারাত গাঢ় স্বরে ডাকল,

' চৈত্র! '

এক ডাকেই মাথা তুলে আঁখিদুটি নিবদ্ধ করলো সাফারাতের মুখের দিকে চৈত্রিকা। স্থির দৃষ্টি। হাতের ইনজেকশন সিরিঞ্জ টা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,
' আপনি জানতেন দাদি মা'র খু/নি?'
সাফারাত চমকালো না। দুর্বোধ্য হাসল। নিরলস ভঙ্গিতে জবাব দিল,
' জানতাম। শুধু সুফিয়া বেগম নয় আরো একজন আছে মা'য়ের খু*নী যার নামটা আপনার কল্পনার বাহিরে। '

চৈত্রিকার হৃদস্পন্দন থমকে গেল ক্ষীণ সময়ের জন্য। তার জানার খাতায় শুধু অপরাধী দাদি তাহলে আরেকজন? কে সে?একটা মানুষকে মা*রার পিছনে এতজনের হাত?

পর্ব___৪৮

মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমাতে হচ্ছে আজ সুদূর জার্মানিতে। চারটে লাগেজ টেনে বাহিরে নিয়ে গেল সার্ভেন্টরা। চৈত্রিকা আস্তে আস্তে নিচে নেমে এলো। ধীরস্থির চোখ বুলালো বাড়িটার চারদিকে। আনাচে-কানাচেতে, দেয়ালে নিজের গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বাড়িতে হইচই নেই। আছে কেবল নিস্তব্ধ, নীরবতা। এ যেন পরিণত হয়েছে এক মৃ'ত বাড়িতে। সুফিয়া বেগমের মৃ'ত্যুর প্রায় একটা মাস ফুরিয়ে এসেছে। বদলে গেছে সবকিছু। একেকটা সেকেন্ড ছিল পরিবর্তনের। উন্মোচিত হয়েছে অনেক অপ্রকাশিত সত্য, যা শুধু সীমাবদ্ধ চৈত্রিকা অবধি। মিনা কাঁদো কাঁদো মুখে দৌড়ে এলো। একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। চৈত্রিকা হাত বাড়াতেই আহ্লাদে কেঁদে উঠল ও। জড়িয়ে ধরে বললো,

' একেবারে চলে যাইতেছেন ভাবী। আর আইবেন না?এত বড় বাড়িতে কেমনে থাকমু একা একা? মা'ও মই'রা গেল। শাস্তি পাইল নিজের পাপ কর্মের। চাচীও পাগল হইয়া গেছে। চাচা জেলে। '

' একেবারে যাচ্ছি কে বললো?আপাতত এমনি যাচ্ছি। হয়ত আবারও ফিরে আসব। চাচী কে নিয়ে এসেছেন উনারা?আর মৌসুমি ফুপি,জেরিন ওরা এসেছে? কাউকে দেখছি না যে?'

' চাচীরে ফুপু প্রিয়ন্তী আফার রুমে লইয়া গেছে। মাইয়াডা তো কথা কই না। যদি শেষ বেলা মা'র লগে কথা কইয়া দেশ ছাড়ে আরকি!এ বয়সে কি হইল আফার লগে?বাবা-মার পাপ কর্ম সন্তানের উপর দিয়া গেল। একটা গেল ম'ইরা। আরেকটা ধ*র্ষ'ণ হইল। '

চৈত্রিকার সারা মুখশ্রী মলিন বিবর্ণ হয়ে এলো। এমনিতেই যার জীবনে বসন্ত এলেও রং ছুঁয়ে দিতে পারে না,গায়ে আবির মাখিয়ে দিয়ে যেতে হয় অক্ষম তার জন্য বিবর্ণ তা-ই শ্রেয়। বাবা-মা'র অপকর্মের ফল কি-না জানে না চৈত্রিকা তবে খুবই অন্যায় হয়েছে প্রিয়ন্তীর সাথে। কারণ মেয়েটা সদ্য ফোঁটা কোমল,নিষ্পাপ একটা গোলাপ ছিল। মিনা কে ছেড়ে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে প্রিয়ন্তীর রুমের সামনে আসল ও। দরজায় করাঘাত করতেই ভিতর থেকে আওয়াজ এলো --' কে?'
মৌসুমির গলা শুনে চৈত্রিকা ছোট্ট করে জবাব দিল--' আমি ফুপি।'
মৌসুমি দরজার এক পার্ট মেলে দিলেন। চৈত্রিকা ঘরে ঢুকেই দেখে প্রিয়ন্তী রেডি হয়ে জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। অপরদিকে ওর মা মেঝেতে বসে আঙ্গুল গুণছে,বিড়বিড় করছে। এগুলো এখন উনার নিত্যকার অভ্যেস। চৈত্রিকা সেদিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে প্রিয়ন্তীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ডাকল ক্ষীণ স্বরে।

' প্রিয়ন্তী!'
প্রিয়ন্তী ফিরে তাকালো। ছোট্ট চঞ্চল মেয়েটা আজ নিস্তেজ। চোখের নিচে কাজল লেপ্টে আছে। এই কাজল ধুয়ে ফেললে উঠবে না। কবে উঠবে তা-ও জানা নেই। ভয়াবহ সেই দিনের পর হতে প্রতি রাতে নির্ঘুমের ফলস্বরূপ এই কাজল চোখের নিম্ন অংশের অনেকখানি জায়গা দখল করেছে। হালকা গোলাপি রঙের একটা হিজাব বেঁধেছে মেয়েটা। মিষ্টি লাগছে বেশ। গলার কাছে অজস্র দাগগুলো লুকায়িত হয়েছে। আলতো হাতে প্রিয়ন্তীর এক হাত আঁকড়ে ধরল চৈত্রিকা। রিনঝিনে কন্ঠ। জিজ্ঞেস করলো,

' তোমার মা'য়ের সাথে কথা বলেছো?'
প্রিয়ন্তী মৌন মুখে রইল। ঘাড় নাড়ালো। চৈত্রিকা মৃদু হেসে বললো,
' ঠিক আছে। কথা শেষ করে নিচে আসো। ফ্লাইটের সময় হয়ে যাবে। '
' ভাইয়া? '
' উনি অফিসের কাজগুলো গুছিয়ে আসছেন। রাস্তায় আছেন। '
' আচ্ছা। '

চৈত্রিকা নিজের রুমে ঢুকল। বিছানায় বসে নত মস্তকে সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছাড়ল। মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে একটা বার স্মরণ করে নিল বিগত একটা মাসের দিন গুলো। ঘটে যাওয়া একেকটা ঘটনা।
দাদির মৃ'ত্যু'র পনেরো দিনের মাথায় চাচা অবৈধ ব্যবসার কারণে গ্রেফতার হন। সিয়াকে মারার পিছনে উনার কোনো হাত নেই। কিন্তু তিনি ও পৃথক দু'জনে মিলে অবৈধ, মাদক/দ্রব্যের বিজনেস করতেন যার কারণে উনাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এতে অবশ্য সাফারাতের হাত আছে। বহুদিন ধরে চাচার কর্ম সম্মুখে আনার চেষ্টা করছিল সে ও দিহান। পরিবারের ঝামেলায় সবাই এতটাই মগ্ন ছিল প্রিয়ন্তীর চলাচলের বিষয় টা নিয়ে মাথা ঘামায় নি কেউ। প্রিয়ন্তী খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যায়। যার ফলে জীবনের রঙ বিলীন হয়ে যায় পঞ্চদশেই। গোলাপের সকল পাপড়ি ঝরে পড়ে মৃত্তিকায়। গ্যাং রে*পড হয় মেয়েটা। সেই সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে তবুও প্রিয়ন্তী বাড়ি ফিরে নি। তখনই সর্বপ্রথম টনক নড়ে সাফারাতের। উম্মাদ,উদভ্রান্ত ছুটে যায় স্কুলে,কিন্তু সেখানেও গিয়ে দেখে স্কুল বন্ধ। সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেস করলে জানায় স্কুল সেই দুপুরেই ছুটি হয়ে গিয়েছে। পুরো শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষ পর্যন্ত বিধস্ত, বস্ত্রহীন অবস্থায় মিলে প্রিয়ন্তীকে এক পরিত্যক্ত, জনপূর্ণহীন স্থানে। প্রিয়ন্তীর তখন শ্বাস চলছিল অল্প স্বল্প। সাফারাত সেদিনও কাঁদে নি। চাচী নিজের ছেলেমেয়ে,স্বামীর পরিণতি,পরিবারের বিচ্ছিন্নতা সইতে না পেরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। উনাকে বাড়িতে রাখা হয় না। ট্রিটমেন্টের জন্য মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চৈত্রিকা অবাক হয় সাফারাতকে দেখে যেই মানুষগুলো ওকে ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে তাদেরই ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে। মা'য়ের এক আদেশে, চাওয়ায় এত গুরুত্ব?

রুমে কারো পায়ের শব্দে চৈত্রিকার সকল ভাবনা দূর হয়ে গেল। কল্পনার, চিন্তার সুতোঁতে টান পড়ল। সাফারাত গায়ের জ্যাকেট খুলে এক নজর তাকালো চৈত্রিকার দিকে। চৈত্রিকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবলোকন করে উঠে আসতে নিলে সাফারাত গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

' আপনি বসুন চৈত্র। আমি আমার কাপড় বের করে নিব। প্রিয়ন্তী রেডি?'
' হুম। আপনার জন্য আমি লেবুর শরবত নিয়ে আসছি। বাহিরে গরম ছিল আজ। একটু পরেই আবারও জার্নি করতে হবে। '

সাফারাত হাতের তোয়ালে রেখে চৈত্রিকার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। গরমে ঘাম ঝরছে ললাট বেয়ে। চৈত্রিকার দু'হাতের ভাঁজে চুমু খেল। গাঢ়, গভীর ছিল উষ্ণ ওষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়া। দৈবাৎ কন্ঠে প্রশ্ন করে,
' আপনি আমাকে খু*নি মানেন?'
ভড়কে গেল চৈত্রিকা। হকচকালো তৎক্ষনাৎ। বক্ষস্থল কেঁপে উঠল। মাথা দুলিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠল,
' না। আমি আপনার উপর সেদিন সন্দেহ করি নি। আপনার জায়গায় থাকলে আমি এর চেয়েও কঠিন হতাম। আরো কঠোর শা*স্তি দিতাম। আগুনে পুড়িয়ে মারতাম। যেমন করে পুড়েছিল সিয়া মা'র দেহ টা। '

সাফারাত তুখোড় দৃষ্টি জ্ঞাপন করলো চৈত্রিকার চেহারার দিকে। দুই কপোল ফুলে আছে। চিকনচাকন গড়নের মেয়েটার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শরীরের পরিবর্তন হয়েছে। মোটা হয়েছে একটুখানি। গালে লালের আস্তরণ। সাফারাত সরব করে বলে উঠল,

' এত উত্তেজিত হবেন না। রক্তিম রূপে আপনাকে দারুণ লাগে চৈত্র মাস। তবে আমি যে চাই আমার সন্তান গম্ভীর হোক,শান্ত হোক। তাই আপনার রক্তিম হওয়া বারণ। '

চৈত্রিকা বিস্ময়কর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। আরো একটা সাফারাত? না,না। এরকম গম্ভীর মানুষ আর সহ্য করতে পারবে না ও। এবার একটা চঞ্চল মানুষ আসুক। ওর বাচ্চা টা অস্থির,চঞ্চল স্বভাবের যেন হয়।
_______________

জার্মানির রাজধানী বার্লিন। বৃহত্তম একটা নগরী। হাজারো রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টেন্ট খ্রিস্টানদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে চৈত্রিকা ও প্রিয়ন্তী। এয়ারপোর্টে মানুষের সমাগম অত্যাধিক। তবে সবই দু'জন থেকে ভিন্ন। তাদের চেহারার গঠন,গায়ের রঙ,ড্রেসআপ, ধর্ম,ভাষা সবকিছুই ভিন্ন। তবে অচেনা এ দেশে চৈত্রিকার চেনা মানুষ বলতে এই মুহুর্তে শুধু সাফারাত ও প্রিয়ন্তী। এয়ারপোর্টের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে দু'জন। সাফারাত এই শহরেরই একজন পরিচিত জার্মান ড্রাইভারের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত।

জার্মানির আবহাওয়া পূর্বাভাস পাওয়া যায় না সহজে। প্রায়শই এখানে ঝরঝরে বৃষ্টি হয়। ঝড়ও হয়। এমনকি বজ্রধ্বনি সিজনের প্রারম্ভে ঘনঘন সংঘর্ষ হয়। এমনই এক পরিবেশ, আবহাওয়ার দেখা মিলছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে যাচ্ছে পিচ ঢালা রাস্তায়। ঠান্ডা,হিমেল হাওয়া বইছে। চৈত্রিকা গায়ের জ্যাকেট টা ভালো করে টেনে নিল। চেনা সুবাসে মুগ্ধ হয়ে গেল মন। গা থেকে খুলে অতি যত্নসহকারে প্রিয় মানুষ টা জড়িয়ে দিয় গেছে ওর অঙ্গে।

বাংলাদেশ ছেড়ে আসার মুহুর্তে চৈত্রিকার মনে হচ্ছিল মিম,মাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম যে ব্যতিক্রম। তাদের নিজস্ব জীবন আছে,সংসার আছে। তবে সাফারাত বলেছে ফাহমিদাকে খুব শীগ্রই এখানে নিয়ে আসবে। সাফারাত এখানকার নাগরিকত্ব পেলেও চৈত্রিকা ও প্রিয়ন্তীর পাওয়া এখনও অনিশ্চিত। বিজনেস আগে থেকে এখানে সেট থাকায় সাফারাত আবারও এখানে ফিরে আসে। এখানে থেকেই বিজনেস সামলাবে। বাংলাদেশ ফিরে গেলেও সবসময় থাকার মন মানসিকতা আর নেই তার। চৈত্রিকাও চায় সাফারাত সকল প্রতা/রণা, কষ্ট ভুলে যাক। নতুন করে বাঁচুক। হয়ত এজন্যই এদেশে থাকার চিন্তা ভাবনা।

আলো বেগম, সিনথিয়া,আয়ান,আয়মান সবাই সুফিয়া বেগমের মৃ'ত্যুর পর পরই জার্মানি চলে আসে। আলো কাল রাতেও ফোন করেছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো সাফারাত ফোন টা ধরতে দেয় নি। প্রথমে ব্যপক চমকায় চৈত্রিকা পরমুহূর্তে এটা শুনে খুশি হয় আলো জানেন না ওদের ফ্লাইট কবে, উনি হঠাৎ দেখলে সারপ্রাইজড হবেন।

সাফারাত ফিরে আসে গাড়ি নিয়ে। তবে তার পড়নের গেঞ্জি টা হালকা ভিজে গেছে বৃষ্টির ফোঁটায়। চুল লেপ্টে কপালে পড়ে আছে। চৈত্রিকার বুক টা ধ্বক করে উঠল। কি করে বুঝাবে সে এই পুরুষকে ঠিক কতটা মোহনীয় লাগছে এই অভ্যন্তর বেসামাল করা রূপে?প্রিয়ন্তী গাড়িতে বসে পড়লে সাফারাত চৈত্রিকাকে ইশারা করল বসতে। চৈত্রিকা বসল না। বরং বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শরীরের ওড়না টা খুলে সাফারাতের মাথায় দিয়ে দিল। কপালে ভাঁজ পড়ল সাফারাতের। ঠোঁটে ফুটল মৃদু হাসি। চৈত্রিকা চারপাশে নজর বুলিয়ে চট করে গাড়িতে বসে পড়ল। গায়ে বড়সড় একটা জ্যাকেট থাকার কারণে ওড়নার প্রয়োজন নেই। জার্মানির এই বার্লিন শহরে এসে এক অজানা সুখে সিক্ত হয়ে পড়ল ওর মন, অন্তর। নিঃশ্বাস ফেলেও যেন শান্তি মিলছে। সাফারাত পাশে বসে সিটে মাথা রেখে চোখ বুঁজল। অনেক ধকল গেছে এই একটা মাস। চৈত্রিকার কাগজপত্র রেডি করা এবং শেষ সময়ে এসে প্রিয়ন্তীর ভিসা রেডি করতে অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে।

প্রিয়ন্তী বাহিরের দিকে চেয়ে নতুন দেশ,নতুন পরিবেশ,বার্লিনের সৌন্দর্য দেখতে বিভোর,অন্তঃপ্রবিষ্ট। এই সুযোগ টা লুফে নিল চৈত্রিকা। সাফারাতের বুকে মাথা রাখল। চক্ষুদ্বয় বুঁজে রেখেই ওকে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল সাফারাত। শ্রবণগ্রন্থির নিকটস্থে দু ঠোঁট ছুঁয়ে ফিচেল স্বরে বললো,

' নতুন দেশে রোমাঞ্চকর হাওয়া লেগেছে?আহ্!এখন তো আমার লাভ-ই লাভ। ডজন ডজন বাচ্চার বাপ হবো। জার্মানির চ্যান্সেলর আমাকে এওয়ার্ড দিবেন ডজন বাচ্চা-কাচ্চার বাপ হওয়ার জন্য। '

চৈত্রিকার কর্ণ গহ্বর গরম,তপ্ত হয়ে আসলো। রাঙা হয়ে উঠল মুখ। তবুও সাফারাতের বুকে মাথা রেখে উপলব্ধি করতে থাকে এক আকাশ সমান সুখ।
______________

জনবহুল শহুরে এলাকা হলেও গাড়ি টা এমন একটা বাড়ির সামনে থামল যেখানে আশেপাশে মাত্র দু'টো বাড়ি। তাছাড়া খোলা রাস্তা ছাড়া কিছুই নেই। চৈত্রিকা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সামনের দিকে দৃষ্টি মেলতেই দেখে সিনথিয়া, আলো,আয়মান ছাতা নিয়ে এগিয়ে আসছে। আয়মান মাঝ পথেই দৌড় দিল। ঝাপটে ধরল চৈত্রিকাকে। হঠাৎ আক্রমণে চৈত্রিকা বেসামাল হয়ে পড়ে যেতে নিলে আঁতকে উঠে সকলে। আতংকিত চোখে তাকায়। দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সাফারাত পিছন থেকে চৈত্রিকাকে জড়িয়ে ধরলো। আয়মান অপরাধী দৃষ্টিতে চেয়ে মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সিনথিয়া অনবরত বকছে ওকে। চুপচাপ গম্ভীর মুখে ছেলেটা মা'য়ের বকবকানি হজম করছে নয়ত বা এক কান দিয়ে ঢুকাচ্ছে অপর কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে। আলো চৈত্রিকার কপালে চুমু খেল। খুশিতে কেঁদে দিলেন উনি। আয়মানের মাথায় হাত বুলিয়ে চৈত্রিকা আদুরে কন্ঠে বললো,

' চলো আয়মান। '

আয়মান এক পাও নড়লো না। সাফারাত ওর চুলে আঙ্গুল চালনা করলো। মায়াময় কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
' কি হলো স্মার্ট বয়?মামি মণি ব্যাথা পায় নি। তাহলে আপসেট কেন?মাম্মা বকেছে বলে?'
আয়মান শান্ত, গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
' নো। আমার কারণে সুখ ব্যাথা পেতে যাচ্ছিল তাই। '
চৈত্রিকা,প্রিয়ন্তী, সাফারাত অবাক চাহনি নিক্ষেপ করলো। আলো বেগম আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
' সুখ?সে কে?'
আয়মান ব্যথিত চক্ষে তাকালো। কন্ঠনালিতে গম্ভীরতার ছাপ রেখেই প্রতুত্তর করে,
' মামি মণির পেটে যে আছে তার নাম-ই তো সুখ। মাম্মা বলেছে ও আমার সুখ। তাই আমি ওকে সুখ বলে ডাকব। '

সিনথিয়া জিভ কাটল। ছেলে ওকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিবে ভাবতেই পারে নি। এত গম্ভীর, বজ্জাত ছেলে ওর পেটে কেমনে হলো!সাফারাত শান্ত শিষ্ট আয়মানের দিকে তাকিয়ে বললো,
' ছেলে হবে নাকি মেয়ে তা জানা হলো না,তার আগেই তুমি সুখে ভাগ বসিয়ে দিলে স্মার্ট বয়। নামটা পছন্দ হয়েছে। আসলেই ও সুখ নিয়েই আসবে এই ধরণীতে। '

#চলবে,,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 29 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন