#ভালোবাসাটা_যে_হয়ে_গেল
#লেখিকা: আসরিফা সুলতানা জেবা
#পর্ব____৬
বৃষ্টির তোড় বেড়েছে। বাইরে কোথাও বাজ পড়ার ভয়ংকর আওয়াজে ঈষৎ কেঁপে উঠেছে অন্তরের শরীর,মন। ধড়ফড়িয়ে উঠল তার শক্তপোক্ত বুক। কাঁচ ন্যায় ভেঙে তচনচ হয়ে গেল তার মোহ,ঘোর। হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল দেহের প্রবল উত্তেজনা। হৃদ জমিন লুণ্ঠন করে নিল একমুঠো বিস্ময়। রিনির ঘুমন্ত মুখ থেকে চোখ সরিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল সে। এলোমেলো হাতে খামচে ধরল চুল। ভাবনায় এলো কতটা ভয়ানক এক কাণ্ড ঘটাতে যাচ্ছিল সে। যার প্রতি ভালোবাসা নেই তাকে কি-না কেবলমাত্র শারীরিক টানে ছুঁয়ে দিতে যাচ্ছিল! তার ব্যক্তিত্ব এহেন কোনোকালে ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অলি-গলিতে কত মেয়ে তার সান্নিধ্য পেতে চেয়েছে, কত মেয়ে যেচে গায়ে পড়ে প্রেম নিবেদন করেছে,কখনো কারো সমুখে নত হয়ে পড়ে নি তার তেজোবান পুরুষ সত্তা। ভালোবাসা বিহীন ছুঁয়ে দেখে নি কোনো নারী শরীর। কৌশলে প্রত্যাখ্যান করেছে প্রতিটি মেয়েকে। অথচ কিশোর থেকে যৌবন পর্যন্ত ঘুম পাড়িয়ে রাখা শরীরী কামনাটা পাগলা ষাঁড়ের মতো জেগে উঠেছে পাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা কলেজ পাড় করা মানবীর সমীপে। অন্তর উপলব্ধি করতে পারছে রিনির নৈকট্যে থাকতে থাকতে মেয়েটির জন্য তার মোহ জন্মে গেছে। শারীরিক আকর্ষণে অনিয়ন্ত্রিত মন ঝুঁকে পড়ছে বারংবার। স্রেফ মোহের বশীভূত হয়ে দেহের ক্ষুধা মেটাতে,দুর্বার উত্তেজনা দমাতে সে রিনির নাজুক গায়ে দাগ লেপে দিতে পারবে না। দুর্দমনীয় অস্থিরতাকে বশে আনয়নে বিছানা থেকে নেমে ছোটোখাটো ঘরটির এমাথা-ওমাথায় পায়চারি করতে লাগল ক্রমাগত। মিনিট দশেক পর ঘরের কোণে স্থির থাকা স্টিলের ওয়ারড্রবের ড্রয়ারগুলো একে একে খুলে কাঙ্ক্ষিত জিনিসের সন্ধান পেয়ে যায় সে। কাঁথাটা হাতে নিয়ে ঢেকে দেয় রিনির কম্পনরত শরীর। হারিকেনের আলোয় আরেকবার দেখে নেয় ঘুমের ঘোরে নিমজ্জিত হওয়া মেয়েটির তৈলাক্ত মুখখানি। ফোঁস করে নিঃশ্বাসকে মুক্ত করে সে। পুনরায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ে রিনির পাশে। দৈবাৎ হৃদয়ের গহীনে হামলা করা মোহ-কামনার দ্বিধাদ্বন্দে চোখের ঘুম উড়ে যায় তার। টালমাটাল ভাবনায় কেটে যায় প্রহর। রাত্রি অবসান হওয়ার আগে কানে ভেসে আসে গোঙানোর শব্দ। পিলে চমকায় সে। পাশ ফিরে ব্যাকুল হয়ে। রিনি ছটফট করছে,আকুল হচ্ছে ঘুমের মাঝে। অন্তর তার চওড়া হাতটি অতি সন্তর্পণে ছোঁয়ায় মেয়েটির গলার একপাশে। নিমিষেই সে যেন তেতে উঠে তার হাতটি। জ্বর এসেছে রিনির! আকস্মিক জ্বর কেন এলো! মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগল তার। ঝড়বৃষ্টি তাণ্ডবের রাতে সে ডাক্তার কোথায় পাবে? শার্টের খোলা বোতামগুলো লাগিয়ে দরজা খুলে বসার ঘরে এলো। বসার ঘরে সবেমাত্র হারিকেন হাতে প্রবেশ ঘটেছিল আনজুর। অশনি ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে গেছে তার। শুকিয়ে যাওয়া গলাটাকে জলে ভেজাতে যাচ্ছিলেন, তক্ষুনি রিনির কামরা থেকে দীর্ঘ পুরুষ অবয়বকে বের হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল তার কণ্ঠস্বর,
" কে?"
অন্তর ধীর পায়ে আলোতে এগিয়ে আসে," মা,আমি।"
" কখন এলে?"-আনজু চমকালেন দ্বিগুণ। তাকিয়ে রইলেন অবাক চোখে।
অন্তর কোনো শরম ছাড়াই নিস্তরঙ্গ গলায় বলল," রাতেই এসেছি। "
পরপর অস্থির হয়ে বলে," রিনির খুব জ্বর। এই সময় ডাক্তার পাব না। আমাকে এক বালতি পানির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?"
মেয়ের জ্বরের কথা শ্রবণ হতেই আঁতকে উঠলেন আনজু। ব্যগ্র হয়ে উঠে গলা," হায় হায় কী কও? ও বৃষ্টিতে ভিজে নাই। অমন জ্বর কেমনে আইল? তুমি খাড়াও,পানি আনতেছি আমি। "
রিনিদের বসার ঘরের একপাশে শৌচাগার স্থাপন করেছে তার আব্বা। মেয়েমানুষ রাত-বিরেতে বাইরে যাবে, বাইরে গোসল করবে এতে তার ব্যাপক অসম্মতি। সন্ধ্যায় পানি এনে বালতি ভরে রেখেছিল রিনি। ছোটো বালতিতে জল ভরে নিলেন আনজু। অন্তর এগিয়ে এসে বলল,
" আমাকে দিন মা। "
তার পিছু পিছু ঘরে ঢুকলেন তিনি। মেয়েকে জ্বরে কাতরাতে দেখে বড়োই মায়া হলো তার। অন্তর টেবিলের ওপরের বই-খাতার স্তূপ নিচে রেখে ওখান থেকে টেবিল ক্লথটি দুই ভাঁজ দিয়ে বিছানায় রাখে। কমজোর শরীরটাকে তার পেশিবহুল হাতের ওপর তোলে নিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর শুয়ে দেয়। মাথাটা রাখে ক্লথের ওপর। ফলপ্রসূ রিনির দীঘল, ঘন,রেশমের ন্যায় চুল ছুঁয়ে দেয় গৃহতল। অন্তর হাঁটু গেড়ে বসে মগ দিয়ে পানি দিতে থাকে তার মাথায়। একটু পর পর গাল ছুঁয়ে পরখ করতে থাকে জ্বরের উত্তাপ।অলকচূর্ণ ছুঁয়ে গড়িয়ে যাওয়া পানি চোখের পাতা ছুঁতেই রিনি পল্লব ঝাঁকিয়ে আঁখিদুটি মেলে। সিঁথানের পাশে মাকে দেখে নিস্তেজ কণ্ঠে উচ্চারণ করে,
" উনি কোথায় আম্মা?"
আনজু বুঝলেন কার কথা জিজ্ঞেস করছে মেয়েটা। বললেন," তোর কাছেই। "
অন্তরকে বললেন," তুমি এদিকে বসো জামাই। আমি পানি দিচ্ছি ওর মাথায়।"
অন্তর শুনল শাশুড়ির আদেশ। রিনির পাশে বসে মলিন সুরে প্রশ্ন করল,
" শরীর বেশি খারাপ লাগছে? "
মাথা দু'ধারে নাড়ায় ও। এক হাত বাড়িয়ে অস্পষ্ট কণ্ঠে আবদার করে," আমার কাছে আসুন।"
আক্কেলগুড়ুম হয়ে যায় সে। শাশুড়ির সম্মুখে রিনির নির্লজ্জ বায়নায় জড়িয়ে যায় দ্বিধায়৷ আনজু পরিস্থিতি সামলাতে বলেন," এই ঘরের হারিকেনের কেরোসিন শেষ হইয়া যাইতেছে মনে হয়। নিভনের আগে আমি আরেকটা হারিকেন নিয়া আইতেছি। তুমি ততক্ষণ থাহো ওর লগে।"
আনজু ঠিকই বলেছেন। হারিকেনের সলতেটেটা ধিমিয়ে পড়েছে। দ্যুতি বিলি করা আগুনটা নিভে যাবে যেকোনো সময় ঝুপ করে। রিনি ঠোঁট ভেঙে কাছে ডাকল পুনশ্চঃ,
" আসুন না কাছে।"
অন্তর হাসল। মুচকি হাসি তার পুরু ঠোঁটে। সজ্ঞানে থাকলে রিনি কি তাকে এমন করে ডাকতে পারত? কখনোই না। ম-রেই যেত লাজে। সে শরীর এগিয়ে নিয়ে এক হাত রাখল রিনির শরীরের অপরদিকে,বিছানার ওপর। মিশল না দুজনের দেহ। আবছা আলোয় ঝুঁকল মুখের ওপর। বদনে গরম নিঃশ্বাস পড়তেই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে রিনি। তার ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে ঠেকায় অন্তরের খড়খড়ে গালে। নিমিষেই জলোচ্ছ্বাসের তীব্র ঝাপটা এসে লুটপাট করে ফেলে অন্তরকে। অপ্রকৃতস্থ হয় সে। বেকাবু হয়ে পড়ে দহনস্পর্শে। সজাগ দৃষ্টিতে তাকায় রিনির পানে। আটকে যায় ক্ষীণ লাল হওয়া চোখের দৃষ্টিতে। শুনতে পায়,
" শুনুন, মিস্টার অন্তর।"
অন্তর বেতাল স্বরে বলে," বলো?"
জ্বরের ঘোরে দিশাহীন রিনি নিঃসংকোচ আবদার করে," বেল খাব। "
" এখন?"
" হ্যাঁ, এক্ষুনি। নিয়ে আসুন না।"
" এখন বেল কোথায় পাব? সকালে এনে দিই?"
রিনি একরোখা গলায় বলল," এখুনি খাব। মফিজ ভাইদের গাছে বেল আছে। নিয়ে আসুন। "
অন্তরের বুকের ভেতরের ভয়ংকর যন্ত্রটা শান্তি দিচ্ছে না তাকে। রিনির স্পর্শ, সান্নিধ্য উম্মাতাল করে তুলছে তার মন,মস্তিষ্ক, শরীরকে। উসকে দিচ্ছে বার বার তার অস্তিত্বকে। এ কেমন ভয়াবহ জ্বালায় পড়ল সে! রিনির বায়না যে ফেলতে পারছে না কিছুতেই। তার গালের ওপর রাখা নাজুক হাতটির ওপর নিজের হাত চেপে বলল,
" নিয়ে আসছি।"
আনজুকে ডেকে রিনির কাছে বসাল। সে বেল আনতে যাচ্ছে শুনে বিপন্ন গলায় বললেন,
" মাইয়াডার লগে লগে কি তোমারও মাথা খারাপ হয়ে গেছে জামাই? বাইরে ঠাডা পড়তাছে,বৃষ্টিও বাড়ছে। জ্বরের মইধ্যে থাকলে ও কত কথা-ই কয়। যাওয়া লাগব না তোমার। "
" কিছু হবে না মা। আমি যাব আর আসব। আপনি ওরে দেখে রাখুন।"
আনজুকে আর বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পড়ল অন্তর। বাতাসের দাপটে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে আছে জায়গায় জায়গায়। বৃষ্টি পড়ছে ঝুপঝাপ। মিনিটেই ভিজে তার বলিষ্ঠ গায়ের সাথে সেঁটে গেল পরনের শার্টটি। বর্ষণের তাণ্ডব সামলে,ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে মফিজদের বাড়িতে আসল। তন্দ্রায় আচ্ছন্ন পুরো গ্রাম। অসময়ে মানুষের ঘুম ভাঙা ঠিক হবে না। সকালে বেল পাড়ার কথা জানিয়ে দিবে মফিজ ভাইকে। গ্রামের প্রতিটি মানুষই তাকে চিনে,সমীহ করে। শাশুড়ি থেকে চেয়ে আনা হাতের ক্ষুদ্র টর্চ লাইটটি মফিজদের ঘরের বারান্দায় রাখল। বেল গাছটি উঠনোর এক পাশে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে লম্বা একটি বাঁশ হাতে তুলে নিয়ে তার সহায়তায় বেল পাড়ল অন্তর। বেলের ওপর করা বাঁশের আ**ঘাতের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে বর্ষণের তুমুল আওয়াজের মাঝে। কিছু বেল ফেটে গেছে মাটিতে পড়ে। সেগুলো সব সাথে আনা পলিথিনে পুরে বাড়ির দিকে রওনা হলো। সে জানেনা ঝড়-ঝঞ্ঝার এই আঁধারে জীবন বাজি রেখে কেন রিনির সামান্য একটি আবদার পূরণ করছে। কেবল জানে রিনির আবদারটুকু পূরণ না করতে পারলে দুদণ্ড শান্তিও মিলত না তার।
প্রভাতে ঘুম ভেঙে অর্ধ উদোম দেহ দেখে রিনি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। চোখ সরিয়ে ফেলে তৎক্ষনাৎ। অন্তর বুক ন**গ্ন রেখে ঘুমিয়েছে কেন? শার্ট কামরার ভিতরের তারটায় মেলে দেওয়া। ভেজা হালকা। ভিজল কী করে? রিনির এতটুকুন স্মরণে আছে রাতে তার জ্বর হয়েছিল,তার মাথায় পানি দিচ্ছিল মা ও অন্তর মিলেঝুলে। তারপর কী হলো কিচ্ছুটি মনে নেই। বক্ষদেশের ওপর ওড়না মেলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। জ্বর ছেড়ে গেছে ঘণ্টা খানেক আগে। তাকে দেখে আনজু কপালে হাত দিয়ে বললেন,
" মায়ের সেবা করতি আইয়া তুই নিজেই জ্বর বাঁধায় ফেলছস। হাত-মুখ ধুইয়া ঘরে আয়। "
রিনি হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে এসে টেবিলের ওপর এক ঝুড়ি বেল দেখতে পেয়ে চোখ সরু করে বলল,
" এত বেল কে দিয়ে গেল আম্মা?"
আনজু চারকোনা ক্ষুদ্র টেবিলটার ওপর মাত্র বানানো তেলের পিঠা ভরতি বোলটা রেখে বললেন," রাইতে জ্বরে যে জামাইরে মফিজদের গাছের বেল খাইবি কইলি মনে নাই? সে তোর লাইগা ঠাডা,ঝড়-বৃষ্টির মইধ্যে গিয়ে বেল পাইড়া আনল। পাখির কাছে তুই কইলি পোলাডা বিয়াডা মানে না। তয় আমার যে রাইতে তার হাবভাব দেইখা মনে হইল হেয় তোর লাইগা জান দিতে পারব। তোর আব্বা জীবনে আমারে এক গ্লাস পানি ঢাইলা খাওয়াইল না। আর তোর জামাই তোর সেবা করল সারা রাইত আবার বেল আনল। আমি কইলাম তুই বেল খাইবি না,জ্বরে হুদাই পাগলামি। তারপরেও পাগলের মতো ছুইটা গেল। যহন আইছে তার পুরা শরীল ভেজা,চোখ-মুখ সাদা হইয়া গেছে। "
মায়ের কথা শুনে রিনি প্রস্তরীভূত হয়ে গেল। এত কষ্ট,যন্ত্রণা দিয়েছে সে জ্বরের ঘোরে মানুষটাকে? মা যে জানে না মানুষটা অত্যধিক ভালো, রিনিকে ক'দিন, ক'মাস পর চিরতরে ছেড়ে যাবে বলে অপরাধবোধ থেকে তার সকল শখ-বায়না পূরণ করছে। তাই বলে বজ্রপাতের মাঝে বেল পেড়ে আনাটা খুব বেশি হয়ে গেল না? শশব্যস্ত হয়ে ঘরে আসল সে। ততক্ষণে অন্তর বিছানায় উঠে বসেছে। রিনি তার অর্ধন**গ্ন শরীরে চেয়ে থাকতে পারল না বেশিক্ষণ। ভোঁতা যন্ত্রণা গ্রাস করে নিল তার প্রতিটি রোমকূপকে। তাকে দেখতে পেয়ে অন্তর ফ্যাকাশে মুখে হাসি ফুটিয়ে ফরমান জারি করল,
" তার থেকে শার্টটা দাও তো,বাচ্চা মেয়ে রিনি।"
রিনি হুকুম মানল না। জেদ চাপল তার মস্তিষ্কে। নিদারুণ যন্ত্রণা,দুঃসহ কষ্ট নিয়ে মেয়েটা রা-গের তোপে ন-গ্ন বুকে হাত রেখে ধাক্কা দেয় অন্তরকে। বেসামাল ধাক্কা থেকে বাঁচতে রিনির হাত ধরে থামাতে গিয়ে তাকে নিয়ে বিছানায় পড়ল অন্তর। তার অনাবৃত বুকের ওপর মিশল রিনির বুক। তফাত রইল না তিলার্ধ। বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলো দুজনে। প্রবল ভূমিকম্প অনুভব করল শরীর দুটি। বাড়ল নিঃশ্বাসের গতি। অন্তর সহসা কোমল শরীরটিকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে উঠে বসল। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় রিনির বুক ওঠানামা করছে হাপরের মতো। সেদিকে তাকানোর দুঃসাহস করল না সে। ভুলচুক হয়ে গেলে আজীবন অপরাধবোধ ঘুণপোকার মতো কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে তাকে। ধাতস্থ হতেই রিনি উঠে বসল। অন্তরও ফিরল তার দিকে,চোখ রাখল তার আরক্তিম মুখচ্ছবিতে। রিনির বদন নত। শরমে তাকাতে পারছে না ও। ঘূর্ণিঝড় বইছে বুকের ভেতর। অন্তর তর্জনী দিয়ে চিবুক তুলে ভ্রু কুটি করে বলল,
" হঠাৎ এমন রাগলে কেন?"
" আপনি রাতে পা-গলামি করলেন কেন?"
" কী পাগ-লামি করেছি?"- অত্যন্ত গাঢ় ও শান্ত স্বর অন্তরের।
রিনি থম ধরা গলায় বলল," বজ্রপাতের মাঝে বেল পাড়তে গেলেন কেন? যদি কিছু হতো?"
" কী হতো? ম**রে যেতাম?"
প্রশ্নটা তীর হয়ে বিঁধল রিনির বুকে। অসহনীয় জ্বলুনি ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কিন্তু অন্তরকে তা বুঝতে দিবে না ও। মানুষটা যে তাকে ভালোবাসে না,তাহলে নিজে কেন ছোটো হবে ভালোবাসা দেখিয়ে? হৃদয়ের দুর্বার অনুভূতি মনোভূমিতে দাফন করে বলল,
" আপনার বাপ গ্রামের মেম্বার। আপনার কিছু হলে আমাদের চৌদ্দগুষ্টিকে মামলা দিয়ে জেলে ভরত। "
রিনির কথায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অন্তর। হাত বাড়িয়ে তার নাক টেনে দিল আদুরে ভঙ্গিতে। হতাশার সুরে বলল,
" তুমি বড়োই জালিম। কষ্ট করে বেল আনলাম না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে। এখন আবার ভয় পাচ্ছ আমার কিছু হলে জে-লে চলে যেতে।"
মুখ কালো করে ফেলল রিনি," আমি জ্বরের ঘোরে আবদার করেছি বলে বেল আনতে হবে?"
অকস্মাৎ অন্তরের দৃষ্টি বদলে গেল। চাহনি প্রগাঢ় হয়ে গেল। নিজের দিকে তাকে অনিমিখ তাকিয়ে থাকতে দেখে রিনি ভড়াকাল,থমকালো। অধরযুগলকে একে অপরের থেকে আলগা করার আগে অন্তর দৃষ্টি অনড় রেখে বলল,
" তখন আমার মনে হয়েছে আমার জীবনের একমাত্র কাজ হলো তোমার জন্য বেল পেড়ে আনা। কাজটা না করলে আমি শান্তি পেতাম না। "
রিনি থম মে-রে গেল। অন্তরের কণ্ঠে কিছু একটা ছিল। কী ছিল? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল গায়ে শার্ট জড়িয়ে নিয়েছে অন্তর। বুকের কাছের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে অশান্ত স্বরে বলল,
" তোমার আম্মা কি সুস্থ হয়েছেন? বাড়িতে যাবে না? আমার পক্ষে শ্বশুর বাড়িতে রোজ থাকা সম্ভব নয়।"
" আমি থাকলে কী সমস্যা? "
" তুমি এখানে থাকলেই যত সমস্যা। তোমার শ্বশুর বার বার আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিবে। তার মতে তুমি-আমি একসাথে থাকলে ভালোবাসা-বাসিটা হয়ে যাবে।"
রিনি মিইয়ে গলায় বলল," আব্বা এমনটা বলেছেন?"
অন্তর মিথ্যা বলেন নি। শামসুল হক শুরু থেকেই তাকে রিনির কাছ ছাড়া হতে দেয় নি। উলটো শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন রিনির সাথে ভালো আচরণ না করলে এক কানাকড়িও দিবেন না বিদেশে যাবার জন্য। বাপের শর্ত মানলেও রিনির প্রতি যত্নগুলো অন্তরের হৃদয় থেকে এসেছে। মেয়েটার মায়া ঝরা মুখটা দেখলেই তার মন ভালো করার জন্য অজানা কারণেই উঠেপড়ে লাগত তার হৃদয়। সে ঠোঁটের কার্নিশে হাসি ঝুলিয়ে স্বগোতোক্তি করল,
"হ্যাঁ, তোমার শ্বশুর মশাই এমনটাই বলেছেন।"
_____________________________
শ্রাবণ মাস পদার্পণ করেছে প্রকৃতিতে। আমন ধান রোপণের কাজ চলছে রিনির শ্বশুর বাড়ির পেছনের বিস্তৃত জমিনগুলোতে। দিন-রাত শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টিতে পানিতে ঘাটের দু-তিন সিঁড়ি ডুব দিয়েছে। পুকুরে ঝলঝল করছে শ্বেত শাপলা। পুষ্করিণীর মাঝটায় বসেছে শাপলার মেলা। ঘাটে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে রেখেছে রিনি। আজ তার আনন্দে উড়ে বেড়াবার কথা ছিল। অথচ তার শরীরে ছড়িয়ে আছে অজস্র বোলতার হূল ফোটানোর অসহ্য যন্ত্রণা। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে। এ প্লাস পেয়েছে সে। দিনটির জন্য চাতকের ন্যায় প্রতীক্ষিত ছিল ও। ফলাফল জানার পর ওর অনাবিল আনন্দ হারিয়ে গেল যখন জানল অন্তরের ভিসা হয়ে গেছে। চলে যাবে সে। কথাটি তাকে জানিয়েছে তার শাশুড়ি। সেই মুহূর্ত থেকে রিনির ম-রে যেতে ইচ্ছে করছে। দমবন্ধ হয়ে আসছে। বুক উথলে যন্ত্রণা পরিণত হচ্ছে জলে। বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখ উপচে। অন্তরকে ভালোবাসার কথা জানাতে পারবে না সে। একজন তাকে এতগুলো দিনেও পছন্দ করল না,তার হৃদয়ে ওর জন্য ভালোবাসা জন্মাল না তাহলে সে কেন বেহায়া হতে যাবে? বরং অন্তর তাকে বিয়ে করে একটা ফালতু সম্পর্কে ফেঁসে গেছে। মানুষটিকে এবার মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। পাশে কারো ধপ করে আওয়াজ শুনে ভাবান্তর হলো না ওর। চিত্ত উন্মাতাল হয়ে পড়ল মানুষটির শরীরের ঘ্রাণে। অন্তর ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় দেহের কাছাকাছি বসে অন্যত্র মুখ ফেরানো রমণীর পানে। অধৈর্য্য গলায় বলে,
" আমার দিকে তাকাও। মুখ কালো কেন?"
রিনি প্রতুত্তরে প্রশ্ন করল," কোথায় গিয়েছিলেন?"
" আব্বা আমাকে দিয়ে মিষ্টি পাঠাল তোমাদের বাড়িতে। তার একমাত্র বউমা এ প্লাস পেয়েছে সেই খুশিতে তিনি সারা গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করছে। কোথায় ভর্তি হবে?"
" আব্বা পছন্দ করেন না মেয়ে মানুষের বেশি পড়া।"
" তুমি এখন শুধু তোমার আব্বার মেয়ে নও,শামসুল হকের পুত্রবধূ। তিনি তোমাকে পড়াতে চান।"
" সত্যি? "- বিস্মিত স্বর রিনির।
" হ্যাঁ, কোথায় ভর্তি হবে বলো?"
" শহরের কলেজেই অনার্স করব। দূরে কোথাও যেতে মন সায় দিচ্ছে না।"
রিনি মুখ ঘুরিয়ে বসল এবার। নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়েছে ও। মেকি হাসির ভান করে বলল,
" কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার অন্তর।"
অন্তরের ভ্রু জোড়া কপাল স্পর্শ করল এক লহমায়, " কেন?"
" আপনার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে সেজন্য। "
রিনির হাসি হাসি মুখে কথাটা অন্তরের সহ্য হলো না। মন পুড়ছে তার। কেন পুড়ছে তার হদিস পাচ্ছে না। স্বপ্ন পূরণের জন্য কতকাল অপেক্ষা করল, আজ সেই স্বপ্নকেই তুচ্ছ মনে হচ্ছে। কেন এমন অনুভব করছে তার সঠিক কারণ এখনও বের করতে সফল হয় নি সে। শুধু জানে রিনির প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়েছে যার ফলে বি-ষাক্ত লাগছে তার বহুদিনের লালন করা স্বপ্নকে। আকর্ষণের স্থায়িত্ব বেশিদিন হয় না। অন্তরের মন বলছে সে চলে গেলে এই মোহ কেটে যাবে। রিনিকে একটা নামহীন,ভালোবাসাহীন সম্পর্কের মাঝে আটকে যাওয়া চরম অন্যায় বলে বিবেচিত হয় তার। আচমকা জানতে চায়,
" রিনি তুমি কি মুক্তি চাও?"
রিনির শরীর আন্দোলিত হয়ে পড়ে। জামা খামচে ধরে। কণ্ঠে প্রবল কম্পন, " মু..মুক্তি?"
অন্তর নিজের অনুভূতি নিয়ে নিশ্চিত নয়। এদিকে ভিসা চলে এসেছে। স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
" আমি গিয়ে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিব। তোমার কাবিনের টাকাও শোধ করে দিব। সাথে মাসে মাসে তোমার পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছুর খরচ দিব। তবুও তোমাকে ভালোবাসাহীন একটা সম্পর্কে আটকে রেখে তোমার জীবন নষ্ট করার দায় নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারব না,বাচ্চা মেয়ে রিনি।"
#চলবে~
( আমি জানি আপনারা ভীষণ ভালো। তাই অন্তরকে বকাঝকা একটু কম দিবেন,ঠিক আছে? বেচারা ভালোবাসা উপলব্ধি করতে না পারলে কীভাবে থেকে যাবে বলেন? একটা মানুষের সাথে আজন্ম থাকার জন্য ভালোবাসা প্রয়োজন। তাহলে পৃথিবীর কারো আর তাদের আলাদা করার সাধ্য থাকে না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)