ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভালোবাসাটা যে হয়ে গেল

পর্ব 7

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

#ভালোবাসাটা_যে_হয়ে_গেল
#লেখিকা: আসরিফা সুলতানা জেবা
#পর্ব___৭

বছরের পর বছর মানুষ অপর একটি মানুষের সাথে একই সুতোয় বাঁধা থাকে কেবলমাত্র ভালোবাসার খাতিরে। ভালোবাসা বিহীন সম্পর্কে থাকা দুটি মানুষ হয়ে যায় নাটাই ছাড়া ঘুড়ি। যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো পলে নাটাই ছাড়া ঘুড়িটি উড়ে যায় দূর-দূরান্তে,চলে যায় দৃষ্টি সীমার বাইরে। রিনির ছোট্ট জীবনটিতে তেমনই দুর্বিষহ ঘটনা ঘটে গেল। যে মানুষটির জন্য তার হৃদযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বেতাল হয়ে যেত,মনের অলিন্দে হররোজ অনুভূতিরা হুটোপুটি করত সেই মানুষটি তাকে ভালোবাসে নি বলে ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে বহুদূর৷ অন্তর অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চতুর্থ দিবস চলছে আজ। বাড়ির হালহকিকত থমথমে। ভর দুপুরেই অমানিশার মতো নিস্তব্ধ থাকে বাড়িটি। রিনির শাশুড়ি হরহামেশাই চোখের জল ফেলেন একমাত্র সন্তানের দূরে যাওয়ার বিরহে। ছেলে চলে যাওয়ার আগ থেকেই গম্ভীর হয়ে আছেন শামসুল হক। অন্তর যেদিন চলে গেলেন বিদায় অব্দি দিলেন না তিনি। দরজা আটকে বসে ছিলেন ঘরে। আর রিনি! সে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিল তাদের শরীরী বিচ্ছেদকে। হৃদয় পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাকে বুকের পিঞ্জিরায় তালাবদ্ধ করে তার ফরসা, উজ্জ্বল মুখশ্রীতে ফুটিয়ে তুলেছিল হাসি। ঘর থেকে বের হবার আগে তার নিঃশব্দে হাস্যরত চেহারার দিকে নিষ্প্রাণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অন্তর বলে গেল,
" তোমার আমার যাত্রাপথ বোধহয় এতটুকুই ছিল। বিদায়,বাচ্চা মেয়ে রিনি। "

সেই মুহূর্তে রিনির চোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হলো। বুকের ভেতর কান্নার উদ্বেল ঢেউ তোলপাড় আরম্ভ করল। হামলে পড়তে ইচ্ছে হলো পরিপাটি হয়ে সম্মুখে উপস্থিত পুরুষটির প্রশস্ত বুকে। সর্বশক্তিতে জাপটে ধরে বলতে মনস্পৃৃহা জাগল, ভালোবাসি অন্তর। ভালোবাসি আপনাকে আপনার চেহারা আমার বুকে কাঁপন ধরানোর প্রথম প্রহর থেকেই। দুর্ভাগ্য, রিনি তা করতে পারল না। যেতে চাওয়া মানুষটিকে বেলাজ হয়ে আটকানোর সায় পেল না অন্তঃস্থল থেকে। কষ্টে জর্জরিত হৃদয় বলল,চলে যাক মানুষটি। যে ভালোবাসে তাকে আটকাতে হয় না,সে থেকে যায় আজন্ম। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্নার বহরকে আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় মত্ত হলো ও। গলায় দলা পাকানো কান্না গিলে কষ্টেসৃষ্টে বলেছিল," বিদায়। "

শ্বশুর বাড়িতে রিনির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঘরটিতে যেন এখনও অন্তরের শরীরের ঘ্রাণ ভাসে। হাস ফাঁস লাগে তার। অসহ্যকর পীড়ায় চুরচুর হয়ে যায় তার বুকের পাঁজর। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে রাতের মধ্যভাগেও সদর দরজা খুলে দৌড়ে যায় পুকুরঘাটে। ছটফট করতে করতে হৃদয় যখন ধীর হয় তখন ফিরে আসে ঘরে। আজও সইতে না পেরে বাহিরে আসল মিশমিশে অন্ধকারে। পুকুর পাড়ের কাছে আসতেই নিস্তেজ অক্ষিকোটরে ধরা পড়ল শ্বশুরের অবয়ব। হাত দুটো পেছনে আড়াআড়িভাবে রেখে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। দৃষ্টি সামনে। শ্বশুরকে দেখে রিনি শব্দহীন পা বাড়াতে নিল ঘরের ভেতরে। তার আগেই শামসুল হক টের পেয়ে গেলেন তার অস্তিত্ব,
" এদিকে আইয়ো বউমা।"
মাথায় আঁচলটা তুলে দিয়ে রিনি পা বাড়ায় সেদিকে। স্বল্প দূরত্বে থেমে যায় ওর পা দুটি। শামসুল হক সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
" আইজকাও ঘুমাইতে পারো নাই, বউমা?"
একরাশ লজ্জা স্বয়ং দখলদারিত্ব খাটাল রিনির মুখশ্রীতে। শ্বশুর যে প্রত্যহ ওর ঘাটলায় বসে থাকা দেখে ফেলেছে তা না বুঝার কোনো অবকাশ নেই। রিনরিনিয়ে বলে উঠে,
" প্রতিদিনই ঘুমাই আব্বা।"
শামসুল হক ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত রাখলেন তার মাথায়। বললেন,
" মিথ্যা কওয়া মহাপাপ,বউমা। "

রিনির মাথা নত হয়ে যায়। পরক্ষণেই শুনতে পায়," তুমি ওই অজাতটার লাইগা ক্যান কষ্ট পাও? ওই কি তোমারে ছাইড়া যাওনের বেলা কষ্ট পাইছে? পায় নাই। তোমারে বিয়া করাইয়া আনছিলাম বড়ো আশা কইরা যে অন্তর বিদেশে পড়নের জেদ বাদ দিব। বউয়ের মায়ায় পড়ব। একটা মাত্র পোলারে কিছুতেই বিদেশ যাইতে দিতে চাইতেছিলাম না।
কিন্তু আমি বুঝি নাই ওই একটা অজাত। ওর ভিত্রে কোনো মায়া-দয়া নাই। ওর কাছে ওর স্বপ্নডাই বড়ো। বাপ-মা, বউ ওর কাছে কিচ্ছু না। আমাদের বুইড়া-বুড়ির কথা বাদই দিলাম। অজাতটা কেমনে পারল ফুলের মতোন বউডারে ফালাইয়া যাইতে! তুমি কাইন্দো না,দুঃখ পাইয়ো না অজাতটার লাইগা। ও তোমারে কেমনে তালাক দেয় আমিও দেখমু। আরেকবার কইয়া দেখুক তালাকের কথা,ত্যাজ্য করমু আমি ওরে। "

অন্তর চলে যাবার আগের দিন দুপুরে তুমুল হট্টগোল বেঁধেছে বাপ-ছেলের মাঝে। ছেলেকে নিজ কামরায় ডেকে নেন শামসুল হক। জানতে চান,পড়া শেষ করে কবে আসবে,রিনিকে কবে নিবে। সেই কথার প্রতুত্তরে অন্তর জানায় সে গিয়ে রিনিকে তালাকনামা পাঠাবে,অহেতুক অপেক্ষায় রাখতে চায় না রিনিকে। তার কথা শুনে গলা চড়ে যায় শামসুল হকের। কথা কাটাকাটির সূচনা হয় বাপ-ছেলের। উচ্চ আওয়াজে আশেপাশের বাড়ির মানুষেরা ছুটে আসে,শুনতে পায় তাদের কথাবার্তা। তারপর থেকে শামসুল হক কথা বন্ধ করে দেয় ছেলের সাথে। অন্তরও অটল থাকে নিজস্ব জেদে।

রিনি অধোবদনে বলে," আব্বা,উনি যা চান করতে দেন। জোর করে সংসার হয় না,ভালোবাসা হয় না। "

কথাটা বলার সময় অপরিসীম ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে ও। দু চোখ ভেসে যেতে থাকে জলে। শামসুল হকের চোখ ভিজে আসে৷ হা-হুতাশ করে উঠেন তিনি,
" ও একদিন বুঝব কী হারাইছে। হেইদিন কাইন্দা কূল পাইব না অজাতটা। ঘরে চলো। "

গ্রামগঞ্জে কার বাড়িতে কী ঘটেছে,কে কী পরেছে, কী খেয়েছে তার গুঞ্জন হতে সময় লাগে না। রিনি ও অন্তরের বিষয়টিও ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায়,হাট-বাজারে। আনোয়ার প্রায়শই বাজারে বসে চা খান,আড্ডায় মশগুল হন। দিন কয়েক শরীরের হালচাল ভালো ছিল না তার। বাজারমুখো হতে পারেন নি বহুদিন। আজ শরীরে শক্তি অনুভব করতেই চলে এলেন বাজারে। দোকানের বেঞ্চিতে বসতেই দোকানদার তাকে ডেকে বললেন,
" কথা কি সইত্য আনোয়ার ভাই? "
কপাল কুঁচকে এলো উনার," কোন সইত্যের কথা কইতেছ,হাশিম ভাই? "
" তোমার ছোডু মাইয়াডারে যে বিয়া দিলা মেম্বারের পোলার লগে,এহন নাকি তালাক হইয়া যাইব?"
আনোয়ার চমকালেন," তোমারে কে কইল এ কথা?"

হাশিম মিয়া ভারাক্রান্ত ভাব ফুটিয়ে তুললেন চেহারায়।অনর্গল বলে গেলেন," এইসব কী লুকায় থাহে কও? আমরাই হুনছি অন্তররে নিজ মুখে কইতে বিদেশে গিয়া তালাক দিব রিনিরে। আহারে,কত সুন্দর ফুলের মতো একটা মাইয়া আমাগো রিনি। বড়ো বাড়িতে বিয়া দিয়াও কপালে সুখ জুটল না। মন খারাপ কইরো না আনোয়ার ভাই, তালাক হইলেও মাইয়াডারে ভালা জায়গায় বিয়া দিতা পারবা। বহুত সুন্দর তোমার মাইয়া। একটু টাকা-পয়সা খাটাইলে যেকোনো পোলা বিয়া কইরা নিব।"
__________________

কলপাড়ে কাপড় ধুচ্ছিল রিনি তখন পাশের বাড়ির দুজন মহিলা আসল কলসি নিয়ে পানি নিতে। সম্পর্কে অন্তরের চাচাতো ভাবি-বোন হয়। ও পানি ভরতি বালতিটি একপাশে সরিয়ে তাদের সুযোগ করে দিল পানি নেওয়ার। অন্তরের চাচাতো বোন কল চেপে কলসিতে পানি ভরছে। ভাবি ওর দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,
" রিনি শুনো।"
কাপড় ধোয়া থামিয়ে মাথা উঁচিয়ে তাকায় ও। সাড়া দেয় নির্বিঘ্নে," জি ভাবি?"
" দেখতে তো চাঁদের লাহান তুমি। শইলে ধরলেই মনে হয় র-ক্ত বাইর হইব। এমন বউই চায় ব্যাডারা। তইলে অন্তর ছাইড়া গেল ক্যান তোমারে? তোমার মইধ্যে কি কোনো সমস্যা আছে যার কারণে আমার দেবর কোনো তৃপ্তি পায় নাই? "
আচমকা কর্ণগোচর হওয়া কটুক্তিতে রিনির পৃথিবী দুলে উঠল। বেদনার্ত হয়ে পড়ে দৃষ্টি জোড়া। চিকন অধরের ফাঁক গলে বের হয়ে আসে অস্পষ্ট স্বর,
" কী বলছেন, ভাবি!"

" ভুল কী কইলাম কও? ব্যাডা মানুষ বউরে তালাক তহনই দেয় যহন বউয়ের মইধ্যে তৃপ্তি পায় না। অন্তর হইল শহরে পড়াশোনা করা মানুষ,কত্ত স্টাইল করা মাইয়াগো লগে ওর চলাফেরা। একবার আইছিল ওর কতগুলো পোলা-মাইয়া বন্ধু এইহানে দাওয়াত খাইতে তখন দেখছিলাম। এমন মাইয়াদের লগে চলা পোলার কি গ্রামের মাইয়াতে রুচি হইব? চাচা জোর কইরা ওরে তোমার লগে বানছিল বলে নইলে ও যে থাকবার মানুষ না আমরা জানতাম। বিদেশে গিয়া পড়ব,অন্য বেডির লগে থাকব,তোমার মতো মাইয়া দিয়া আর ওর কী কাম কও? জানি আমার কথায় দুঃখ পাইতাছ,কিন্তু এডিই সত্য। "

রিনির মনে হচ্ছে কেউ সপাটে চাবুক মা-রছে তার শরীরে। তীব্র ব্যথায় চিনচিন করছে শরীরটা। নিরুত্তর রইল ও। কাপড়গুলো কোনোরকমে ধুয়ে উঠোনের তারে দ্রুত হাতে ছড়িয়ে ঘরে চলে এলো হনহনিয়ে। বিছানায় উপুড় হয়ে অপমানে-তিরস্কারে,ক্লেশে সৃষ্ট অশ্রুগুলোকে বিসর্জন দিতে লাগল অবাধে। বিছানার চাদর খামচে কেঁদে উঠল ডুকরে। অন্তরের প্রতি একরাশ অভিমান,রাগ চারা হয়ে জন্মাল মনোভূমিতে। বেদনায়,লাঞ্ছনায় পিষ্ট রিনির হৃদয় অন্তরকে স্বার্থপর উপাধি দিতে বিলম্ব করল না। নিজ স্বার্থে মানুষটা তাকে বিয়ে করল,ছেড়ে চলে গেল। একটাবারও ভাবল না গ্রামের মানুষজন রিনির ওপর আঙ্গুল তুলবে,তাকে গঞ্জনার সমুদ্রে ডুবিয়ে মা-রবে।

সূর্যের উত্তাপ কমে এসেছে। বিষণ্ন এক অপরাহ্ন নেমেছে মেদিনীতে। মৃদু হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে গাছের পাতা। এই অবেলায় নিজের জন্মদাতাকে শ্বশুরের ভিটেয় দেখে যারপরনাই অবাক হয় রিনি। তার শ্বশুর তাকে তলব করা মাত্র চপল পায়ে ছুটে এসেছে সে মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে। বাবাকে শ্বশুরের মুখোমুখি বসে থাকতে দেখে বিমূঢ় হয়। তার চেহারায় কাঠিন্যতা,চোখ-মুখ দৃঢ়। মেয়েকে দেখে আনোয়ার গমগমে কণ্ঠে বলে উঠলেন,
" কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নে। "
শামসুল হক তেজী গলায় বললেন," বউমা কোত্থাও যাইব না। তোমার বাড়িতে বেড়াইতে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু একেবারে যাইব না ও ওর শ্বশুর বাড়ি ছাইড়া। "

" ও শ্বশুর বাড়িতে থাকব কোন কারণে? তোমার পোলা ওরে তালাক দিব কিছুদিন পর। আমাদের বন্ধুত্বের মান রাখতে গিয়া মাইয়ার জীবন বরবাদ করছি আমি। তোমার কথায় বিশ্বাস করছি বিয়ার পর সব ঠিক হইয়া যাইব। কিন্তু তোমার ওই বজ্জাত পোলা আমার মাইয়ারে ফালাইয়া চইলা গেছে, আবার কয় তালাকও দিব। আমার মাইয়া কি জলে ভাইসা আসছে যে তোমার পোলার কাছে আকুতি-মিনতি কইরা থাকতে হইব? ওরে নিয়া যামু আমি। তোমার পোলারে কইবা জলদি তালাকনামা পাঠায়তে। আমার মাইয়ারে আমি ওর চেয়ে ভালা পোলার কাছে বিয়া দিমু। "

বাবার ক্রুদ্ধ কণ্ঠে রিনির চোখ ছাপিয়ে আষাঢ়ের ঢল নামল। চোখের কোণা দিয়ে জল গড়িয়ে চোয়াল বেয়ে গ্রীবাদেশে পৌঁছাল। শামসুল হক ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোলায়েম স্বরে জানতে চাইলেন,
" তুমি কি তোমার বাপের লগে যাইতে চাও,বউমা?"

কিয়ৎক্ষণ চুপ রইল রিনি। তৎপরে অন্তরের ওপর হওয়া অভিমানে মাথা ওপর নিচ করে জানাল চলে যেতে চায় সে তার বাবার সাথে। বুকটা ছিড়েখুঁড়ে এক উষ্ণ, প্রলম্বিত নিঃশ্বাসকে মুক্তি দিলেন শামসুল হক। উঠে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

" তোমারে আটকানোর কোনো উপায় নাই। তোমারে আটকায় রাখলে অন্যায় হইব। আমার পোলা নিজের জীবন ঠিকই গুছাইয়া নিতেছে,তুমি ক্যান এক জায়গায় আটকে থাকবা? যাও চইলা যাও তোমার বাপের লগে। মাঝে মাঝে মন চাইলে আইয়ো আমাদের বুইড়া বুড়ি দুইডারে দেখতে। "

সালেহা হাতে হাতে সব গোছগাছ করে দিলেন রিনিকে। গোছগাছের ফাঁকফোকরে আটপৌরে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছছিলেন বারংবার। যাওয়ার সময় রিনি তাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করে গেল। মেয়েটা যাওয়ার সাথে সাথে মেম্বার বাড়িটাকে গ্রাস করে নেয় অপরিসীম শূন্যতা। শামসুল হক হাঁটতে গেলেন বাহিরে,সালেহা দুপুরে শুকানো কাপড়চোপড় ভাঁজ করছিলেন। তন্মধ্যে সকল নির্জীবতাকে ক্ষণিকের জন্য তাড়িয়ে দেয় সালেহার বাটন ফোনটির কর্কশ শব্দ। ইতিউতি করে তিনি ফোনটা হাতে নিয়ে দেখেন বিদেশি নম্বর থেকে কল। ঠাহর করলেন অন্তর ফোন দিয়েছে। এদিক-ওদিক চেয়ে ফোনটা রিসিভ করলেন তিনি। শামসুল হকের সাফ নিষেধ আছে অন্তরের সাথে যেন যোগাযোগ না করে এ বাড়ির কেউ। কিন্তু তার মমতা ভরা হৃদয় ছেলেকে অগ্রাহ্য করতে পারে না মোটেও।
" কেমন আছ,আম্মা?"
অন্তরের নিষ্প্রভ কণ্ঠে ঘাবড়ে গেলেন সালেহা," তোর কি শরীল খারাপ? গলা এমন লাগতাছে ক্যান?"
" ক্লান্ত একটু। বাড়ির সবাই ভালো আছে?"
" আর ভালো থাকা!"
মায়ের মনমরা,শোকে আচ্ছন্ন কণ্ঠ শুনে অন্তর ফোনের ওপাশ থেকে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল," কী হয়েছে? "
" রিনিরে নিয়া গেছে ওর আব্বা।"
" নিয়ে গেছে মানে?"-চমক সমৃদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে অন্তর।
ঈষৎ চটলেন সালেহা ছেলের ওপর," এক্কেবারে নিয়া গেছে। না নিয়া কী করব? তুই কি ওর লগে সংসার করবি? তোরে কইছে জলদি তালাক দিতে,ওরে অন্য জায়গায় বিয়া দিব ওর বাপে। "

চোখের ওপর হাত দিয়ে শুয়েছিল রিনি নিজ কামরায়। আনজু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম সুরে ডাকলেন,
" ঘুমাইতেছস রিনি?"
মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে কাষ্ঠ হাসল ও। বলল," না। কিছু বলবা?"
" তোর আব্বা ডাকে তোরে। "

অন্তরদের বাড়ি থেকে চলে এসেছে দিন পনেরো পার হয়ে গেল। সেখান থেকে আসার পর আব্বা তেমন কথা বলে নি তার সাথে। আজ হঠাৎ আয়োজন করে ডাকায় যৎসামান্য হতবাক হলো ও। গায়ের ওপর ওড়নাটা ভালোভাবে পেঁচিয়ে আব্বার ঘরে গেল।
" ডাকছিলেন আব্বা?"
আনোয়ার বিছানায় বসে মেয়েকে কাছে ডাকলেন,
" এদিকে আইয়ো আম্মা। বও এহানে। "

বিছানার এক প্রান্তে বসল রিনি৷ বাবার মুখ জুড়ে মলিনতা চক্ষুগোচর হলো ওর। আনোয়ার বালিশের কাছ থেকে ফোনের একটা বাক্স এগিয়ে দিয়ে বললেন,
" এইডা নাও। আব্বা কিনে আনছি তোমার লাইগা। ঘরে একা একা থাহো সারাক্ষণ। ফোন দিয়া বান্ধবী,বইনদের লগে কথা কইবা। "

রিনি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে পড়ে। যেই আব্বা মেয়ে মানুষ ফোন চালানোর ঘোর বিরোধিতা করত আজ তিনি মেয়ের জন্য এন্ড্রয়েড ফোন কিনে এনেছে! বাবা কি তাকে অন্তরের সাথে জোর করে বিয়ে দেবার জন্য অনুশোচনায় ভুগছেন? তার মনোজগতে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর যেন অতর্কিতে দিলেন আনোয়ার,

" আমারে তুমি ক্ষমা করো আম্মা। বন্ধুর আবদার আমি ফালাইতে পারি নাই। ঠিক হইয়া যাওয়া বিয়া ভাঙলে আমার মানসম্মানে টান পড়ত। আমাদের যুগে বাপ-মা যার লগে বিয়া দিত মাইনা সংসার করতাম আমরা। অন্তর যে বিয়ার পরও ঠিক হইব না বুঝি নাই। ভাবছিলাম সময়ের লগে মাইনা নিব তোমারে। যেই মানসম্মানের চিন্তা করছিলাম ওইডা এমনেও গেল। আইজ বুঝলাম আমি কত বড়ো অপ-রাধ করছি নিজ মাইয়ার লগে। নিজের মাইয়ার জীবন নিজের হাতে বরবাদ করছি। "

বাবার ছলছল চোখ দেখে রিনির বুক ধ্বক করে উঠল। ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলল," আপনার কোনো দোষ নেই, আব্বা। এগুলো বোধহয় আমার ভাগ্যে ছিল। ভাগ্যের সাথে কেউ লড়াই করে জিততে পারে না। দয়া করে আপনি নিজেকে দোষ দিবেন না। আমি একদম ঠিক আছি। "

" অন্তর তালাকনামা পাঠায় দিলে আমি তোমারে ভালো ঘরে বিয়া দিমু, ভালোমতো ছেলের খোঁজ নিয়া তারপর বিয়া দিমু। "

অন্য কারো বউ হওয়া রিনির পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। তার মন-প্রাণ সর্বাঙ্গ জুড়ে অন্তর নেওয়াজের বসবাস। আমৃ-ত্যু ওই মানুষটাকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিতে চায় সে। আকুলিবিকুলি করে বলল,
" একটা কথা বলতাম আব্বা।"
মেয়ের মায়াবী গড়নের চেহারায় ভীতসন্ত্রস্ত ভাব দেখে আনোয়ার কণ্ঠ অত্যন্ত কোমল করলেন। সাহস দিলেন মেয়েকে,
" কও আম্মা।"
রিনি বাবার প্রশ্রয়ে নির্দ্বিধায় বলল," নতুন করে বিয়ের কথা বাদ দেন। আপাতত আমি সামনে পড়তে চাই। অনার্স করতে চাই। "
" কই করবা অনার্স? "
" শহরের কলেজে।"
" আইচ্ছা, তুমি যা কইবা তা-ই হইব। ভর্তি হইতে কত টাকা লাগে জানাইয়ো আমারে।"

বাবার সমর্থনে নির্মল ভালো লাগায় ছেয়ে গেল রিনির মন। আনজু খুশি হলেন স্বামীর পরিবর্তনে। মেয়েটার মনের দুঃখটা কমে গেলে তখন নাহয় শাহেদের সাথে বিয়ের জন্য বুঝাবে তাকে। আপাতত পড়ুক।
____________________________

বিদ্যুৎ চলে গেছে কিছুক্ষণ পূর্বে। গরমে ঘরের ভেতর টেকা মুশকিল। ইদানীং ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে গ্রামে। আনজু গিয়েছে তার বোনের বাড়িতে। আজকের রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল দুপুর নাগাদ চলে আসবে। আনোয়ার এখনও বাজারে আছেন। ঘরের দরজা লাগিয়ে হারিকেন নিয়ে বাড়ির পেছনে আসল রিনি। তাপদাহে শ্বাস আটকে আসছিল তার ঘরে। এদিকটায় বাতাস প্রচণ্ড। ধানের জমিন পার করে,পুকুরের জল ছুঁয়ে সাঁই-সাঁই করে কোমল হাওয়া ছুঁয়ে দিচ্ছে রিনির তনুমনকে। হারিকেনটা একপাশে রেখে গাছের গুঁড়ির ওপর বসল সে। খোঁপা খুলে মুক্ত করল চুলগুলোকে। আনজু সবসময় বলেন চুল খুলে পুকুর পাড়ে না আসতে। কিন্তু রিনির উতলা মন যে এ মুহূর্তে মায়ের বাধা শুনতে ত্যাড়ামি করছে। প্রভঞ্জনে উড়ছে ওর চুলগুলো। আঁধারের মাঝে হারিকেনের স্বল্প আলোতে পুকুরপাড়ের বীরদর্পে থাকা তাল গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে গা ছমছম করে উঠল। ভয়কে মনের ঘরে জায়গা না দিয়ে বসে রইল সাহস জুগিয়ে। দৈবাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করতেই পিলে চমকে উঠল ওর। হিম হয়ে গেল শিরদাঁড়া। ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই কণ্ঠনালি ছিটকে বেরিয়ে এলো একটি নাম
" অন্তর!"

রিনির মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। অন্তর কোত্থেকে আসবে এখানে? তার কোর্স সম্পন্ন করতে দু বছর লেগে যাবে। আর নিজের স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিয়ে সে কখনোই আসবে না। প্রতিক্ষণ অনিয়ন্ত্রিত মন হৃদয়ের অর্গল খুলে অন্তরকে আসতে দেয় বলেই বুঝি এমনতরো স্বপ্ন দেখছে ও জেগে জেগে? বিস্ময়ের তোড়ে উঠে দাঁড়াল সে। সামনের পুরুষটিকে নিজের দিকে অগ্রসর হতে দেখে ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল। পিঠ গিয়ে ঠেকল মোটাতাজা কড়ুই গাছটিতে। অন্তরের চুল উষ্কখুষ্ক, অবিন্যস্ত, চোখ দুটি কোটরে,চোয়াল শক্ত,বলিষ্ঠ দেহে সফেদ শার্ট যা কনুই অব্দি গোটানো। ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে রিনির ডান দিকে গাছের ওপর বলিষ্ঠ হাতের থাবা বসাল সে। অন্য হাতে সুগঠিত, লতার মতো বাঁকানো কোমরটি জড়িয়ে ধরে হেঁচকা টানে নাজুক শরীরটিকে মিশিয়ে নিল প্রশস্ত বক্ষে।

রিনির অঙ্গে অঙ্গে তরঙ্গ খেলে গেল। হৃদযন্ত্রটা অভদ্রভাবে লাফাতে লাগল। মুখের ওপর উষ্ণ নিঃশ্বাস, কোমরে পুরুষের শক্ত হাতের ছোঁয়া জানান দিল অন্তরের উপস্থিতি সত্য। কীভাবে সম্ভব? মুখ তুলে অবিশ্বাস্য সুরে বলল,
" আপনি সত্যিই এসেছেন?"

অন্তরের চোখের দৃষ্টি অস্বাভাবিক। ক্রোধান্বিত চাহনি। কোমরের বাঁধন দৃঢ় করে আরও কাছে,অত্যধিক কাছে টানল রিনির শরীরটাকে। দৃষ্টি মুখের ওপর অনড় রেখে গর্জে উঠল মেঘের মতো,

" স্বামী তালাক না দিতেই শাহেদের কাছে বিয়ে বসার জন্য বাপের হাত ধরে নাচতে নাচতে চলে এসেছ?"

#চলবে~

( আর হয়তো দুটি পর্ব। অতঃপর ছোট্ট গল্পটি খতম। ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 7 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন