#ভালোবাসাটা_যে_হয়ে_গেল
#লেখিকা: আসরিফা সুলতানা জেবা
#পর্ব___৮
রিনির শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। শক্ত বুকে হাত রেখে ধাক্কা দিয়ে দুই শরীরের মাঝে দূরত্ব আনার প্রয়াস করল। তার প্রয়াসকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে মসৃণ কোমরে আঙ্গুল দাবিয়ে দেয় অন্তর। বেদনায় আহ্ সূচক ধ্বনি বেরিয়ে এলো কণ্ঠনালি হতে। বিমর্ষ সুরে বলল,
" ব্যথা পাচ্ছি আমি,অন্তর।"
অন্তর কোমরের বাঁধন শিথিল করল,ছাড়ল না। তার তপ্ত নিঃশ্বাস বেসামাল উচাটন সৃষ্ট করছে হৃদয়কুহরে। দৃষ্টির দাবদাহে জ্বালাতে জ্বালাতে বলল,
" চলে এলে কেন?"
রিনির দৃষ্টি অন্তরের আগুনে প্রজ্জ্বলিত চোখে অকম্পিত, স্থির। বুকের ধুকপুকানি নিয়ে নড়ে উঠে অধর জোড়া,
" চলে আসব না,তাহলে কী করব? আপনার ডিভোর্স পেপার পাঠানো পর্যন্ত আপনাদের বাড়িতে বসে থাকব? "
" ডিভোর্স কে দিচ্ছে তোমাকে?"
নির্লিপ্ততা উপচে পড়ছে অন্তরের রাশভারি কণ্ঠে। রিনির
গৌরবর্ণের ত্বক হতবিহ্বলতার চাঁদোয়ার আড়ালে ঢাকা পড়েছে। কণ্ঠস্বর জুড়ে আধিপত্য খাটায় বিস্ময়,
" মানে?"
কোমর থেকে হাতটা ধীরে ধীরে সরিয়ে আনে অন্তর। দু হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ে দৈবাৎ। হাঁটুর ওপর বসে রিনির হাত দুটো পুরে নেয় মুষ্টিমেয়। ঠোঁটে তার দুর্বোধ্য হাসি। কণ্ঠে সহজ-সরল স্বীকারোক্তি,
" মানেটা খুব সোজা। আমি তোমাকে ছাড়ছি না,ছাড়ব না,কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে ছাড়াতেও পারবে না।"
রিনি বাকরুদ্ধ,আশ্চর্য। শ্বাসরুদ্ধভাবে জানতে চাইল," কেন?"
অন্তর তার হাত দুটো টেনে নিজের খরখরে গালে ছোঁয়াল। তার গালের উষ্ণতায় রিনির হাত থেকে আরম্ভ করে কম্পন ছড়িয়ে পড়ল সর্ব অঙ্গে। হাত দুটি ছাড়িয়ে আনতে উদ্যত হতেই চেপে ধরল অন্তর। টেনে বসাল রিনিকে নিজের মুখোমুখি। কেমনতরো নেশাড়ু গলায় উত্তর দিল,
" ভালোবাসাটা যে হয়ে গেল। অন্তর ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে দিতে পারবে,তার ভালোবাসাকে না।"
রিনির সমস্ত কায়া অবশ হয়ে আসছে। বদন জুড়ে অবিশ্বাসের ছাপ। অনুভব করল তার কপালে কপাল ঠেকিয়েছে অন্তর। নিঃশ্বাসের তাপে চক্ষুযুগল মুদে আছে তার। শ্রবণে এলো অসহিষ্ণু কণ্ঠস্বর,
" চোখ খুলো।"
রিনি কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না। মাথা ঘুরছে,হৃদয়ের তীব্র কাঁপুনিতে শরীর নিস্তেজ লাগছে। অন্তর তাকে ভালোবাসে! বাক্যটি দোর্দণ্ডপ্রতাপে দেহের প্রতিটি কণায় অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। পিটপিট করে চোখ মেলে সে। মাদকতা ভরপুর অনিমেষ চাহনি লুটপাট করে নেয় তার চোখজোড়াকে। স্তম্ভিত,অনড় একে-অপরের দৃষ্টি। পলক ফেলা যেন বড়োই অ-পরাধ। সিগারেটে পোড়া ঠোঁট দুটির অবস্থান পদ্মপাতার মতো প্রকম্পিত অধরযুগলের অতি সামান্য তফাতে। এক ইঞ্চি এগোলোই অনায়াসে মিলন ঘটবে তাহাদের। রিনি সইতে পারল না,তার চোখের পল্লব নেতিয়ে পড়ল। অন্তর ওর ঘাড়ের পেছনে হাত গলিয়ে দূরত্ব ঘুচাতে মরিয়া হলো। নাকে নাক ঘষে তৃষিত স্বরে বলল,
" উপলব্ধি শব্দটা কারো জীবনে জলদি চলে আসে,কারো জীবনে দেরিতে। আমি তোমাকে ভালোবাসি তা বড্ড দেরিতে উপলব্ধি করেছি। বিদেশে যাবার আগে যে অনুভূতিগুলো আমার ভিতর তচনচ করে দিচ্ছিল সেগুলোকে তোমার সান্নিধ্যে তৈরি হওয়া মোহ ভেবে অবহেলা করেছি। ভেবেছি দূরে চলে গেলে কে-টে যাবে মোহ। কিন্তু ভুল ছিলাম আমি,সেগুলো কোনো মোহ ছিল না। বরং অনুভূতিগুলো ছিল ভালোবাসা হওয়ার সুপ্ত বীজ যা চারায় পরিণত হতে ভীষণ দেরি করে ফেলল। লোকে বলবে আমি পাগল,বউয়ের জন্য নিজের স্বপ্ন ছেড়ে ছুঁড়ে চলে এসেছি। হ্যাঁ, আমি সত্যিই পাগল। দূরদেশে তোমার বিরহে পাগল হয়ে ম-রার চেয়ে তোমার কাছে এসে ম-রতে রাজি আমি। ভালোবাসি তোমাকে আমার বউ।"
রিনির শ্বাস-প্রশ্বাস উঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। বিদ্রোহ লেগে গেছে শরীরের কোষে কোষে। ভালোবাসার মানুষটার মুখে ভালোবাসি শোনার মতো শ্রবণসুখ বুঝি পৃথিবীতে আর হয় না। খড়কুটোর বানের জলে ভেসে যাওয়ার ন্যায় তারও ভেসে যেতে ইচ্ছে করল অন্তরের উদ্দাম ভালোবাসার মাত্রায়। পরমুহূর্তে ঘুমন্ত অভিমান-জেদ,কষ্টগুলো সজাগ হয়ে হানা দিল মস্তিষ্কে,হৃৎপিণ্ডে। অন্তরকে ঠেলে উঠে পড়ল। আচানক ধাক্কায় তাল হারাতে গিয়ে নিজেকে সংযত করে অন্তর। প্রশ্নাত্মক তার দৃষ্টি। রিনি তার থেকে দূরে সরে গিয়ে কঠোর গলায় বলল,
" আমি আপনাকে ভালোবাসি না,অন্তর নেওয়াজ। বাবার ভয়ে বিয়েটা করেছি বলে সংসারটাও করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমাকে ফেলে যাওয়ার পর আমি মুক্তি পেয়েছি আপনার কাছ থেকে। একদিন আপনি বলেছিলেন ভালোবাসা ছাড়া সংসার হয় না,আজ আমি বলছি সত্যিই ভালোবাসা ছাড়া দুটো মানুষের একসাথে থাকা সম্ভব না। দয়া করে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিবেন। "
অন্তর আহত দৃষ্টিকে তাকায়। কাঠিন্যতা ভেসে উঠে চোখে-মুখে।
" মিথ্যা বলছ তুমি।"
রিনি তার দিকে পিঠ রেখে পরনের জামা খামচে ধরে। বিদ্রুপের স্বরে বলে,
" ভালোবাসি না বলায় আপনার ইগোতে লেগেছে? একদিন বলেছেন আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা নেই, আজ বলছেন ভালোবাসেন আমাকে। সবই আপনার মর্জি তাই না? আমি আপনার খেলনা নই যে মন চাইলে আমাকে নিয়ে খেলবেন,মন চাইলে ছুঁড়ে ফেলবেন। কান খুলে শুনে রাখুন অন্তর নেওয়াজ,আমি আপনাকে ভালোবাসি না,বাসি না,বাসি না। "
কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা কাঁপে ওর। জল নামে চোখ ছাপিয়ে। এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে বাড়ির অভ্যন্তরে চলে যায় সে। অন্তর হাত মুঠ করে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে অপলক। রিনির প্রত্যাখ্যাত বর্শার ফলা হয়ে বিঁধছে তার বুকে, রক্তাক্ত করছে ভয়াবহভাবে।
সালেহা স্বামীর পিঠে হাত বুলিয়ে ব্যগ্র গলায় বললেন," অন্তরের আব্বা শান্ত হোন আপনি। এত উত্তেজিত হইলে শরীল খারাপ হইব আপনার।"
শামসুল হক খেঁকিয়ে উঠলেন," কেমনে শান্ত হমু আমি,কেমনে? তোমার পোলা বজ্জাতটা আমার লাখ লাখ টাকা নষ্ট কইরা নিজের মনের আঁশ মিটাইতে পড়তে গিয়া না পইড়া চইলা আইছে। বউ কি দুনিয়ায় আর কারো নাই? ওরই আছে? "
" আপনের বন্ধু আমার বউরে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগছে। আমি কি বিদেশে বসে নিজের বউয়ের বিয়ে উপভোগ করতাম? "- বাবা-মায়ের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বাবাকে কটাক্ষ করল অন্তর।
" ক্যান উপভোগ করতে সমস্যা কই আছিল? বউরে ছাইড়া বিদেশে পড়তে যাবার বেলা বউয়ের কথা মনে আছিল না?"
" ছিল। কিন্তু ওকে যে এত ভালোবাসি সেটা বুঝতে পারি নি। এখন বুঝেছি,এখন আমার বউকে লাগবে। "
" মগের মুল্লুক পাইছেন আব্বাজান? আনোয়ার দিব না মাইয়ারে এই বাড়িতে।"
" সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল আমি বাঁকা করতে পারি। সেটা করতে চাইছি না। ভদ্রভাবে শ্বশুরের কাছ থেকে বউকে আনতে চাচ্ছি। আপনিসহ চলেন আমার সাথে। "
" জ্বী-নে পাইছে তো আমারে। আমার লাখ লাখ টাকা তুমি পানিতে ভাসায় দিয়া আমারে হুকুম করবা তোমার বউ আইনা দিতে,আমি আইনা দিমু?"
অন্তর বিরক্ত হয়ে বলল,
"হ্যাঁ, দিবেন। এত টাকা টাকা করছেন কেন? বাপ-দাদার কাঁড়ি কাঁড়ি জমি-জমা,চালের আড়ত,মাছের চাষ,কাপড়ের ব্যবসা আপনার। কে খাবে আপনার এত টাকা? আমি না? আমি ছাড়া আপনার কি আরো ছেলে-মেয়ে আছে? আম্মা,ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেইখো আব্বার কোনো লুকায়িত ছেলে-মেয়ে আছে কি-না। "
ছেলের কথায় সালেহা বিচলিত চোখে দেখলেন স্বামীকে। হাহাকার করে বললেন," সত্যি কও অন্তরের বাপ তুমি অন্য বিয়া করছ? "
শামসুল হক হকচকিয়ে গেলেন," তুমি তোমার পোলার কথা বিশ্বাস করতাছ,সালেহা? ও একটা বদের হাড্ডি। ভালা মাইনষের মুখোশ পইরা থাহে। ভিত্রে ভিত্রে শয়তান। আমার পোলা এমন ফাজিল হইব আমি জীবনেও কল্পনা করি নাই।"
বক্র হাসল অন্তর। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল," অন্য কোনো ছেলে-মেয়ে না থাকলে ভালো। আমি জানি আব্বা, আপনি সৎ চরিত্রের মানুষ। জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন আম্মারে। যেহেতু অন্য কোনো ছেলে-মেয়ে নাই আপনার সব তো আমারই। ধরে নিন,আমার টাকাই আমি নষ্ট করেছি। তবুও আপনার মন না মানলে আমি ইনকাম করে ভবিষ্যতে আপনার টাকা দিয়ে দিব। এখন রিনিদের বাড়িতে চলেন আমার সাথে। "
অন্তরের প্রথম কথাগুলো শুনে ব্যাপক খুশি হলেন শামসুল হক,পরমুহূর্তে দপ করে নিভে গেল তার চেহারার উজ্জ্বলতা। কর্কশ কণ্ঠে বললেন, " যাব না আমি। তোমার লাইগা কম বেইজ্জতি হয় নাই আনোয়ারের সামনে।"
" যাবেন না?"
" না।"- নিজের কথায় নিশ্চল থাকলেন শামসুল হক।
" ঠিক আছে। আম্মা কাপড়চোপড় গোছাও তোমার। "
সালেহা হতবাক হলেন," কেন রে আব্বা?"
" তোমার বাপের বাড়িতে দিয়ে আসব তোমাকে। "
বিস্ময় ঝরে পড়ল সালেহার গলায়," বাপের বাড়িতে দিয়া আইবি ক্যান?
অন্তর মায়ের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাঁকা হেসে শামসুল হককে উদ্দেশ্য করে বলল," আমাকে যে আমার বউ থেকে দূরে রাখবে আমি তাকে তার বউ থেকে দূরে রাখব। হিসাব সমান সমান।"
শার্দূলের মতো জ্বলে উঠলেন শামসুল হক," ফাইজলামি করো? তোমার বউ তোমার দোষে গেছে গা,এহন তুমি আমার বউরে আমার থাইকা দূর করার ধান্ধা করো?"
" হ্যাঁ করি,তো?"- নিস্পৃহ ভাব অন্তরের।
শামসুল হক স্ত্রীকে কড়া হুকুম করলেন,
" এক পা-ও নাড়াইবা না। নাড়াইলে ফেরত আনমু না। সারাজীবন বাপের বাড়িতেই থাকবা।"
বাপ-ছেলের যুদ্ধের মধ্যে ফেঁসে গিয়ে অসহায় অনুভব করতে লাগলেন সালেহা। শামসুল হক ও তার প্রেমের বিয়ে। বিয়ের পর কখনো লম্বা সময় থাকতে দেন নি বাপের ভিটেতে। একবার বাবার অসুস্থতার কথা শুনে গিয়ে একটা রাত থেকেছিলেন তিনি,পরের দিন শামসুল হক তাকে হম্বিতম্বি করে নিয়ে এলেন। নিশুতিতে বুকের মাঝে নিয়ে বললেন," তোমারে ছাড়া আমার ঘুম আইয়ে না সালেহা। আমারে ছাইড়া কোনোদিন কোনোখানে থাইকো না।"
তারপর থেকে তিনি কোথাও রাত কা-টান নি। অন্তর এসব কথা জানে। বাপ যে মা পাগল,মাকে ছাড়া দুদণ্ড থাকতে পারে না ছোটো থেকে দিব্যি টের পেয়েছে সে। তাই তো আজ মোক্ষম সুযোগ পেল বাপকে রাজি করানোর।
সালেহা ছেলের পক্ষ নিয়ে ব্যাগ বের করে কাপড় গোছাতে আরম্ভ করলেন। রিনির অভাবে ছেলের মলিন হয়ে যাওয়া চেহারাটা ওনার সহ্য সীমার বাইরে। স্বামীকে ভালো চেনে তিনি,ঠিক ঠিক মেনে নিবে। কাপড় গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি ছেলের সাথে। অটোতে ছেলের পাশে বসার পর বললেন,
" চিন্তা কইরো না আব্বা। তোমার বাপে রাজি হইয়া যাইব।"
" জানি। আব্বা তোমাকে ছাড়া থাকতেই পারবে না।"- মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল অন্তর।
সালেহা খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন," কিন্তু তোমার এভাবে আইয়া পড়া ঠিক হয় নাই আব্বা। মেলা টাকা নষ্ট হইল তোমার আব্বার। তুমি আমারে ফোনে কইতা তোমার রিনিরে লাগব,আমি ওরে বুঝাইতাম। "
অন্তর সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল," টাকা হারিয়ে গেলে আমি কোনো একদিন সেটা ফিরিয়ে আনতে পারব,এর চেয়ে দ্বিগুণ কামাতে পারব। আমার রিনি অন্যের হয়ে গেলে আমি তাকে কোথায় পাব,আম্মা? পৃথিবীতে রিনি এক পিসই এবং সে আমার। "
" তোমার স্বপ্ন? "
" আমার বিসর্জন দেওয়া স্বপ্ন আমি পরবর্তীতে পূরণ করতে পারব,কিন্তু রিনিকে ত্যাগ করে আমি বাঁচতে পারব না। দূরত্বে তৈরি করে আমি যখন বুঝলাম রিনিকে ভালোবাসি তখন আমার ভিতরে এমন ছটফট শুরু হলো যা রিনি ব্যতীত কিছুতেই থামবে না বুঝে গিয়েছিলাম। পাগল পাগল লাগছিল নিজেকে। ভীষণ যন্ত্রণায় তড়পাতে থাকে বুকের ভেতরটা। আমি জীবনে সুখী হতে চাই,আম্মা। রিনিকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে ম-রতে চাই না। তোমার মুখে ওর বাবার ওকে নিয়ে যাওয়া শুনে কল দিই আমি ওর বাবাকে। শ্বশুর মশাই আমাকে কড়া গলায় বললেন, আমার কাছে মেয়েকে দিবেন না। একবার দিয়ে পস্তাচ্ছে। এখন, বিয়ে দিবেন অন্য জায়গায়। ব্যাস,নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না আর। হাতের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় টিকেটের টাকা ম্যানেজ করতে দেরি হয়ে গেল। আব্বাকে বললে দিত না,বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে এলাম। আমি রিনিকে ডিভোর্স না দিলেও শ্বশুর মশাই ঠিকি মেয়েকে ভুলিয়ে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করে ফেলবেন। দূরে থেকে কিছুই করতে পারতাম না আমি। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই, আমার বউ আমি কাউকে দিব না। আব্বাকে নিয়ে যাব,সসম্মানে দিলে দিল,নইলে জোর করে নিয়ে আসব।"
ছেলের কথাগুলো বিমুগ্ধ হয়ে শুনলেন সালেহা। এতটা ভালোবেসে ফেলেছে তার ছেলেটা রিনিকে! এক রাত কেটে গেলেও নিজের জেদে অটল রইলেন শামসুল হক। হেরফের হলো না তার সিদ্ধান্তের। বাবাকে ছাড়া ওই বাড়িতে পা রাখলে হাঙ্গামা হয়ে যাবে। তার জাঁদরেল শ্বশুর ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দিবে তাকে। বাবাকে সাথে নিয়ে গেলে মানলে মানল,নয়তো তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে হলেও রিনিকে নিজের ঘরে,নিজের বুকে নিয়ে আসবে অন্তর। প্রথমে ভালোভাবে চেষ্টা করা যাক। একবার কাছে নিয়ে আসলে রিনি যে অভিমানে তাকে রাতে ফিরিয়ে দিয়েছে সে অভিমান গলে যাবে।
________________________________
সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কিছুক্ষণ থামে,কিছুক্ষণ বাদে ফের শুরু হয়ে যায়। রিনি ভর্তির জন্য এপ্লাই করতে শহরে এসেছে ওর গ্রামের তিনটে মেয়ের সাথে। আনোয়ার নিয়ে আসতে চাইলে সে বাঁধা দিয়ে বলে, আমি ওদের সাথে যেতে পারব আব্বা। অসুস্থ শরীরে যেতে হবে না আপনাকে। মেয়ের কথার বাইরে গেলেন না তিনি। বাজারে এসে সিএনজিতে তুলে দিলেন। গ্রাম থেকে শহরে যেতে মিনিট চল্লিশের মতো সময় ব্যয় হয়। এপ্লিকেশনের কাজ সমাপ্ত করে সঙ্গীদের সাথে সিএনজি স্টেশনে এলো ও। হঠাৎ পরিচিত মুখ দেখে শুধাল,
" শাহেদ ভাই? "
শাহেদ সিএনজির জন্য প্রতীক্ষায়। বৃষ্টির দিন বলে সিএনজির সংখ্যা কম। মাত্র একটি সিএনজি যাত্রী ভরতি হয়ে ছেড়ে গেল। খালি সিএনজি আসতে বিলম্ব হবে একটুখানি। রিনিকে দেখে শাহেদের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল।
" তুমি শহরে? "
" ভর্তির কাজে এসেছিলাম। "- রিনরিন স্বরে উত্তর দেয় ও।
" ওহ! বাড়িতে যাইবা?"
রিনি ছোট্ট করে বলে," হ্যাঁ। "
তাদের কথোপকথনের মাঝে একটি বাইক দুজনের শরীর ঘেঁষে থামল প্রায়। ভয়ে কয়েক কদম লাফিয়ে সরে গেল রিনি। বাইকের মালিককে দেখে সাথের মেয়েগুলো জোরেশোরে বলল,
" আরে অন্তর ভাই!"
রিনি হতভম্ব হয়ে পড়ল। মুখ সাদাটে হয়ে গেল অন্তরকে এখানে দেখে। ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। সেই খরশান দৃষ্টিতে রিনির হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে গলায় উঠার উদ্রেক। সেদিন অন্তরকে ফিরিয়ে দিয়ে পুরোটা রাত কেঁদেছে ও। তাতেও কিছুতেই গলছিল না মনের অভিমান। থেকে থেকে মনে পড়ে যায় কত নিষ্ঠুরভাবে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অন্তর,কত নির্দয়ভাবে তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে এই বাক্যখানি বলে তার হৃদয় ফালাফালা করে দিয়েছিল মানুষটা।
অন্তর হাতের হেলমেট বাইকের ওপর রেখে শাহেদের দিকে এগিয়ে গেল। শাহেদের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
" আমার বউয়ের সাথে তোর কী কথা? মাই-র খেয়ে আক্কেল ঠিকানায় আসে নি?"
শাহেদ তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে রিনিকে একবার দেখে নিয়ে জবাব দিল," তোর বউ হওয়ার আগে রিনি আমার কাজিন।"
অন্তরের ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসির দেখা মিলল," তুই ওকে কাজিন মানিস না-কি? মুখে বলিস কাজিন,মনে মনে বউ করার স্বপ্ন দেখিস। ওদিন শুধু ঘুসি মে--রেছি, সামনে কলিজাটাই টেনে বের করে আনব আমার বউয়ের কথা চিন্তা করলে। "
আলতো ধাক্কা দিয়ে কাঁধ ছাড়ল শাহেদের। ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে শাসাল তাকে। লম্বা লম্বা পদক্ষেপে রিনির হাতের কব্জি চেপে ধরে বলল," চলো। "
আকস্মিক স্পর্শে অপ্রতিভ হলো রিনি। পাশে তাকিয়ে দেখল ওর সাথের মেয়েগুলো মুখ টিপে হাসছে। প্রতিবাদ করে বলল,
" কী হচ্ছে? হাত ছাড়ুন,যাব না আমি।"
অন্তর হাত সরাল না। সজোরে টান মে-রে কাছে এনে ফিসফিস করে হু-মকি দিল,
" ভালোই ভালোই না গেলে কোলে তুলে নিয়ে যাব।"
স্টেশনে সিএনজির অপেক্ষারত মানুষজনের সংখ্যা কম নয়। অনেকজন আঁড়চোখে দেখছে তাদের। সবার তো জানা নেই ওরা স্বামী-স্ত্রী। কেউ কেউ বাজে ভাবে দেখছে বিষয়টিকে। রিনি কথা না বাড়িয়ে অন্তরের পেছনে বাইকে চড়ে বসল। উপায় না পেয়ে অন্তরের কাঁধ আঁকড়ে ধরতে হলো পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে। কিছু পথ যাওয়ার পর রিনির খেয়ালে আসে অন্তর তাকে বাড়ির পথে না গিয়ে অন্য পথে যাচ্ছে। চেঁচামেচি শুরু করে দিল ও। তার চিল্লানোতে বাইক থামাতে বাধ্য হলো অন্তর। ক্রোধে কপালের রগ ফুলেফেঁপে উঠল তার।
" চিল্লাছ কেন? "
" আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?"- চেঁচিয়ে বলে রিনি।
অন্তরের রাগ কমে না। বরং বাড়ে প্রশ্নের তোড়ে," যেখানে মন চায় নিয়ে যাচ্ছি। নিজের স্বামীর সাথে যেতে তোমার আপত্তি। আগ বাড়িয়ে শাহেদের সাথে কথা বলতে আপত্তি নেই। ওর সাথে কী তোমার? "
রিনি তার অভিমানী মনটাকে জিতিয়ে দিয়ে তির্যক গলায় জবাব দেয়," অনেক কিছু। "
" খু**ন হবা কিন্তু। "- ঝাঁজালো হয়ে উঠে অন্তরের কণ্ঠ।
রিনি ভিতরে ভিতরে মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে থাকে। বাইরে সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে ক্ষুরধার চাহনিতে চোখ রেখে বলে,
" হলে হবো।"
অন্তরের চোখের দৃষ্টি শীতল হয়ে গেল। ঠোঁটের কার্নিশে ফুটে উঠল ফিচেল হাসি। দেহের মাঝের শূন্যস্থান পূরণ করে রিনিকে বন্দি করে নিল বাহুবন্ধনে। হাত রাখল বাইকের ওপর, রিনির দুপাশে। মুখের ওপর ঝুঁকে বলল,
" খু**নটা তাহলে অন্যরকমভাবে করি? অত্যন্ত যত্ন করে করব খু**নটা।"
শরবিদ্ধ হরিণের মতো ছটফট করছে রিনি। শিউরে উঠেছে তার সর্বাঙ্গ। মিলেমিশে একত্রিত হচ্ছে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস। বাইকের সাথে সেঁটে আছে ও। আরেকটু হেললে পেছনে পড়ে যাবে,সামনে যেতে পারবে না কেননা সম্মুখে অন্তরের বুকের দেয়াল। কাটা-কাটা গলায় গলায় বলল,
" আপনাকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম,ভদ্রতার আড়ালে আপনি একটা চ-রিত্রহীন গুণ্ডা। "
অন্তর ফিচেল হাসি বজায় রেখে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিল রিনির কটাক্ষ। এক চোখ টিপে,ছন্দময় স্বরে বলল, " শুধু বউয়ের জন্য। "
তাজ্জব বনে গেল রিনি। লোকটার নিকটে শ্বাস গলায় আটকে যাচ্ছে ওর। নিস্তার পাওয়ার জন্য খোঁচা দিল,
" নামকরা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করা, গ্রামের মানুষের চোখে সুযোগ্য পাত্র,মেম্বার সাহেবের একমাত্র ছেলে অন্তর নেওয়াজ বউয়ের পেছনে ঘুরলে জাত চলে যাবে আপনার। আমাকে যেতে দিন।"
অন্তরের ঠোঁটের হাসি এবার চওড়া হলো। মুখ নিয়ে আসল ওর কানের অতিশয় কাছে। কানের লতিতে দাঁতের ছোঁয়া পেতেই বরফ ন্যায় জমে গেল রিনি। শুনতে পেল নিস্তরঙ্গ ঝিলের মতো শান্ত, মোহনীয় স্বর,
" উঁহু, বরং বউয়ের পেছনে না ঘুরলে জাত চলে যাবে আমার।"
#চলবে~
( আগামীকাল সমাপ্তি পর্ব দিব। ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)