ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

৭ম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ৭

#কলমে_তাসনিম_লিজা

------ কপি নিষিদ্ধ!

সারিফ শিকদার কি বলবেন? বলার মতো অবশিষ্ট কিছুই কি রেখেছেন ওনি আর ওনার বাবা ? তবুও তিনি অনুরোধ করেন,

---- আমি সবই জানি জাহিদ। তুমি ও কি বাবার মত হতে চাচ্ছো? মেয়ের ভালো চাও না?

উপস্থিত জাহাঙ্গীর আহমেদ ছোট ভাইয়ের কথার অপেক্ষায় রয়েছেন। জাহিদ আহমেদ বলেন,

---- আমি আমার মেয়ের জন্য একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন চাই। যেখানে পরিবার শব্দটাই নেই সেখানে আমি কোন পরিবারের হাতে তুলে দিবো আমার মেয়েকে বলেন?

সারিফ শিকদার কি বলবেন কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। সত্যিই তো কোন পরিবারের হাতে তুলে দিবে জাহিদ তার মেয়েকে? সারিফ শিকদার ভরসা সমেত বলেন,

---- আমরা এক হলে তুমি বিয়েতে রাজি তো?

জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন,

---- জাহিদের কিছুই বলতে হবে না। পরিবার ঠিক থাকলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিবো তাদের। পুরনো কথা মনে রেখে লাভ নেই তবে পরিবারই কিন্তু আসল।

জাহাঙ্গীর আহমেদ এর কথার উপর কোনো কথা বলার সাহস করলেন না জাহিদ আহমেদ। সারিফ শিকদার বলেন,

---- আমি আজ রাতের মধ্যেই সব ঠিক করে ফেলবো ভাইজান। আমি চাই কালকেই তাদের দুজনের বিয়েটা হোক।

জাহিদ শিকদার অমত পোষণ করলেন। বলেন,

---- কি বলেন আমার মেয়ে মাত্রই পড়াশোনা শুরু করেছে। আরো বছর চারেক পর। আমি চাই না আমার মেয়ে কারোর উপর নির্ভরশীল হওক।

---- ওদের তো বয়স হয়েছে বিয়ের। আর বিয়ে হলেই তো সংসার হয় না। আমি চাই কাগজে কলমে ধর্ম মোতাবেক বিয়েটা হওক তারপর না হয় মেঘ মামুনির পড়াশোনা শেষ হলে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবো। সেটা ওদের ইচ্ছে।

---- মন্দ বলেনি কিন্তু সারিফ। আমার ও একই মত কি বলিস জাহিদ?

জাহিদ মনমরা হয়ে বলল,

---- এই ওই একই হলো। বিয়ে তো বিয়েই। তার আগে আমার মেয়ের মতামত নিতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত!

---- মেঘ মা তোর কথার উপরে কোনো কথা বলবে না। আমি জিজ্ঞেস করবো ওকে। আর সারিফ তুমি কোনো চিন্তা করো না। বিয়ে কালকেই হবে। রাতে চলে এসো। আমরা সব আয়োজন রেডি করে রাখবো।

হাসি ফুটে উঠলো সারিফ শিকদার এর মনে। তিনি

খুশিতে দাঁড়িয়ে যান। বলেন,

---- আমি তাহলে মিষ্টির ব্যবস্থা করছি।

সারিফ শিকদার একা মানুষ। কাজের লোক আছে তবে রাতে থাকে না। তাই তিনি নিজেই মিষ্টি আনার ব্যবস্থা করছেন। বাঁধা দিলেন না জাহাঙ্গীর আহমেদ। তবে জাহিদ আহমেদ একটু ব্যথিত হলেন। পুরনো স্মৃতি ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে। এই বাড়িটা ও তার পরিচিত। শেষ বারের মতো সামিয়াকে নিয়ে এসেছিলো সে। মেনে নেইনি সামিয়ার বাবা। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলো সাথে ত্যাজ্য উপাধি দিয়ে চিরতরে বিদায় জানিয়েছিলেন নিজের একমাত্র মেয়েকে। আর আজ তার মেয়েকে অতি আদরে বরণ করার জন্য উতলা হয়ে উঠেছেন তারই ছেলে। বুঝার কোনো উপায় নেই শেষ সময়ে এসে কেন ওনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন? মেয়ের প্রতি করা অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত কি এমন হয়?

মিষ্টি মুখ করলেন সাথে পুরনো গল্প জুড়ে দিলেন তিনজনে বসে।

_________________

---- মেঘ ফাস্ট বেলকনিতে আসো।

ঠুং করে টেক্সট আসলো মেঘের ফোনে। দোয়েল ঘুমিয়ে গিয়েছে। সে খুবই ঘুম কাতুরে। একই নাম্বার তার মানে শ্রাবণ বাসার নিচে আসছে? দ্রুত পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মেঘ। ধীরে বেলকনির দরজা খুললো। গ্রিলে হাত রেখে নিচে তাকাতেই দেখা মিললো কালো প্যান্ট শার্ট পরিহিত সুদর্শন ছেলেটাকে। যে চাতক পাখির ন্যায় বেলকনির দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকায়। বিপরীতে শ্রাবণের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে আটকা পড়ে মেয়েটা । দূর থেকে অপলক চাহনিতে তাকিয়ে আছে শ্রাবণ। আবার ও একটা টেক্সট আসলো,

---- যেভাবে তাকিয়ে আছো সেভাবেই তাকিয়ে থাকবে নড়বে না একদম। রুমের ভেতরে যাওয়ার কথা ভুলেও ভেবো না।

রাগ হলো ভিষণ। রিপ্লাই দিলো মেঘ,

---- লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বসে আছেন আপনি

বাসার সামনে এসেছেন কেন? চাচিমা বা দিব্য ভাইয়া দেখলে আমার স্বপ্নের দাফন হয়ে যাবে। কি চান আপনি?

রিপ্লাই দিলো সাথে সাথে শ্রাবণ,

---- আপনাকে চাই প্রিয়তমা। আপনাকে না দেখলে

গলা নয় আমার আত্মা শুঁকিয়ে আসে। আমি মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করি। একি রোগ বাঁধিয়ে দিলেন আমায়? আপনাকে তো মনের জেল কানায় বন্দী করা উচিৎ।

রাগ হলো মেঘের। রাগী মুখময় নিয়ে তাকাল বাইরে শ্রাবণের দিকে। স্পষ্ট আলোই দেখা মিললো

শ্রাবণের মুচকি হাসি। তার প্রতি সব ধারনা মুছে গেলো শ্রাবণের এহেন আচরণে।

---- আপনি সত্যিই অসভ্য। এমন বেহায়াপনা করে কেউ ?

---- আমার তীব্র ইচ্ছে আপনি ও আমার প্রতি এমন বেহায়াপনা হন প্রিয়তমা। আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসবেন। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো।

---- হ্যা আপনিই হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসার চেষ্টা করছেন। আমি এসব পছন্দ করি না শ্রাবণ ভাইয়া

আপনি চলে যান। আমার বিপদ বাড়াইয়েন না।

---- আমার মনে লাল বাতি ধরিয়ে আপনি কি করে সবুজ বাতির অপেক্ষা করেন? সিগন্যাল তো আমি

চাচ্ছি। আর সেটা বিপদসংকেত নয় মিসেস ভালোবাসার সংকেত। আর হ্যা! পসেটিভ! নট নেগেটিভ!

---- আমার পড়াশোনা আপনি করতে দিবেন না?

আমাকে কেন সমস্যায় ফেলছেন? আমি আপনার

মিষ্টি কথা ভুলছি না তো।

---- আমার কথায় মিষ্টি নেই ম্যাম ভালোবাসা আছে কেবল। মিষ্টি তো দোকানে। যদি বলো আমি নিয়ে আসি। আনবো?

---- আমি ও পাগল। আপনার সাথে টেক্সট করি কেন? আপনার জায়গা আমার ফোনের ব্লক লিস্টে। গুড বাই!

সত্যি সত্যি ব্লক করে বেলকনি থেকে চলে গেলো মেঘ। দরজাটা লাগিয়ে ফেললো সাথে সাথে। কষ্ট পায়নি শ্রাবণ বরং মৃদু হাসলো সে। বাইক স্টার্ট করে চলে গেলো তার নিজ গন্তব্যে।

পাশের রুম থেকে তীব্র ঝংকার তুলে কেউ কিছু ভাঙলো। দোয়েল সহ ঘুম থেকে উঠে বসে পড়লো।

মেঘ বুঝতে পারলো দিব্যর রুম থেকে কিছু ভাঙার শব্দ এসেছে। যাবে কি না কিছুই বুঝতে পারলো না। মেঘ জিজ্ঞেস করলো দোয়েলকে,

---- এই আপু দিব্য ভাইয়ার রুমে কিছু হয়েছে। চল যায়।

কাঁচা ঘুম দোয়েলের। সে যেনো বেজায় রেগে গেল

সাথে সাথে বলল,

---- সব তোর জন্য হয়েছে মেঘ। তোর জন্য আমাদের পরিবারটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার ভাইয়া তোর জন্য আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছে। ভেঙে ফেলুক সব তাতে তোর কি? তুই ছেলেদের সাথে কথা বল ভালো করে। আমাদের জীবনটায় অশান্তিতে ভরপুর করে রেখেছিস

তুই।

আধঘুমন্ত অবস্থায় যা নয় তাই বলে ফের বসা থেকে শুইয়ে গেলো দোয়েল। তৎক্ষনাৎ ঘুমিয়ে পড়লো সে। মেঘের মনটা ভেঙে গেলো। সামান্য একটা বিষয়কে এতো বড় করে দেখছে কেন? দোয়েল আপুর ও তো ছেলে ফ্রেন্ড আছে তখন তো দিব্য ভাইয়া রাগ দেখায় না তার বেলাই যতো রাগ। শুইয়ে পড়লো মেঘ। ভাবলে ভাবার শেষ নেই।

---- কি করছিস রাত দুপুরে দিব্য?

দিব্য কথা বলছে না রাগে থরথর করে কাপছে সে।

দরজাটা খোলা ছিলো তাই ভেতরে এসে পড়ে ফাইজা বেগম। ভাগ্যিস জাহাঙ্গীর আহমেদ ও শারিফ আহমেদ এখনো ফিরেনি বাসায়।

ফাইজা বেগম আবার ও বলেন,

---- এসব ভাঙচুর করছিস কেন? কি হয়েছে তোর? কেন পাগলামি করছিস?

---- আমার মেঘকে লাগবে মা মেঘকে চাই আমার।

আমি কোনো অপশন চাই না কেবল মেঘকে চাই।

যা সন্দেহ তাই সত্যি হলো। ফাইজা বেগম মনে মনে রেগে ফেটে পড়ার অবস্থা। দুধ কলা দিয়ে তাহলে এতোদিন কালসাপ পুষছিলো তিনি। ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে কয়েকটা থাপ্পড় দিতে। কিন্তু, না এখন সেই সময় নয়।

---- এটা সম্ভব নই দিব্য। মেঘের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। আর তুই খুব ভালো করে জানিস তোর বাবা কেমন? কথা দিলে সেটা রাখতে নিজের ক্ষতি হতেও দু'বার ভাবে না। আর আমাকে রাগাবি না তাহলে পরিবারটা আর পরিবার থাকবে না।

---- বিয়ে মাই ফুট! আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না। আমি বলেছিলাম তো বাবাকে কেন শুনেনি জানো শুধু তোমার জন্য। আমার ইচ্ছের কি কোনো দাম নেই তোমাদের কাছে? জীবনে যা করতে বলেছো তাই করেছি৷ তোমাদের ইচ্ছেতে পুলিশের জব নিয়েছি। তোমাদের ইচ্ছেতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছি। আর রইলো আমার জীবনের শেষ চাওয়া আমার মেঘ, আমার ভালোবাসা। ওকে আমি আমার করেই ছাড়বো। অনেক চুপ করে আছি আর না। যা ইচ্ছে করো তোমরা৷ আমি আমার চোখের সামনে আমার ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হাতে তুলে দিতে দেখবো তা ভাবলে কি করে তোমরা?

---- ঠিক আছে যা ইচ্ছে কর আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে একটা-ই কথা আমার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে। পারবি তো?

এখানেই থামতে হয় দিব্যকে। বাবা মাকে ভালোবাসা কি অন্যায়? নাকি প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়া অন্যায়? দিব্যর মাথা গরম হয়ে যায় দ্বিগুণ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

---- কাউকে মরতে হবে না। তবে যেনে রেখো তোমরা, আমি মেঘকে না পেলে আমার লাশ দেখার জন্য রেডি থেকো।

রুম থেকে বেরিয়ে যায় দিব্য। ছাঁদে চলে যায় সে।

দোয়েলের রুম আর দিব্যর রুম পাশাপাশি এবং বেলকনি ও কাছাকাছি হওয়ায় শ্রাবণকে দেখেছে

দিব্য। কিন্তু মেঘ কি বলেছ বা তার এক্সপ্রেশন কেমন ছিলো তা জানা নেই দিব্যর।

ফাইজা বেগম হার মানার মহিলা নন। যা ইচ্ছে বলুক দিব্য তবুও তিনি চান না মেঘ এই বাড়ির বউ হওক। তিনি মেঘকে এমনিতেই সহ্য করতে পারে না। তারউপর ছেলের বউ ভাবা তো দূরের কথা।

_________________

সকাল হতে না হতেই ফাইজা বেগম চিল্লাফাল্লা শুরু করছেন ৷ দিব্যর নাকি হাত কেটে গিয়েছে। সেই কাটা হাত নিয়ে না খেয়ে বেড়িয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে সে ৷ দোয়েল মনমরা হয়ে বসে আছে সোফায়। মুড অফ তার। মেঘ কিচেনের দিকে যেতে নিলে বাধ সাধলো ফাইজা বেগম। বলল,

---- আজ তোকে কোনো কাজে হাত দিতে হবে না।

তোর বাবা আর বড়বাবাকে ডেকে নিয়ে আয় নাস্তা করবে একসাথে।

মেঘ সাহস করে বলল,

---- চাচিমা ভাইয়ার কি হয়েছে?

ফুরফুরে মেজাজে খানিকটা রাগে আভাস মিলছে,

তিনি কিটকিটে কন্ঠে জবাব দিলেন,

---- যা বলেছি তাই কর। সে জাহান্নামে যাক তাতে তোর কিছুই জানতে হবে না। যা বলছি কর ।

মেঘ আর কিছুই বললো না৷ দোয়েল তার উপর রেগে আছে। দিব্য ভাইয়া ও এখন চাচিমা ও। কেন এমন করে তারা? কষ্ট হয় তো মেঘের। যাদের বাসায় আছে তারা যদি মন খুলে কথা না বলে সেখানে থাকা যায় নাকি?

মেঘ ফাইজা বেগম এর কথা মতো দুজনকে ডেকে আনলো। খাবার টেবিলে নীরবে খেয়ে উঠে পড়ল দোয়েল। পাশে মেঘ ছিলো কথা বলেনি সে মেঘের সাথে। বাকিরা টুকটাক কথা বলছিলো তাও কাজের ব্যাপারে। খাওয়া দাওয়া শেষ হলে দোয়েল নিজের রুমে গিয়ে রেডি হতে লাগলো। অপরদিকে মেঘ শিড়ির কাছে যেতেই ফাইজা বেগম বলেন,

---- মেঘ তোকে আজ ভার্সিটি যেতে হবে না।

হঠাৎ বারণ করছে কেন? প্রশ্ন করলো মেঘ,

---- কেন চাচিমা? দোয়েল আপু তো যাবে।

স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো ফাইজা বেগম।

---- কারণ ছাড়া তো বারণ করছি না মেঘ। কিছুক্ষণ পর জানতে পারবি। এখন যা রুমে গিয়ে রেস্ট কর।

মেঘ কোনোকিছু ভাবলো না। চলে গেলো দোয়েলের রুমের দিকে। ফাইজা বেগম সেদিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলেন,

---- যাক অবশেষে আমার ছেলের জীবন থেকে মেঘ নামক আপদটা বিদায় হলো। আজ কোনোরকম শুভ কাজটা শেষ করলে বিদায় করে দিবো। কিসের এই বাড়িতে রাখা রাখি? দিবো না আমি। বিয়ে হলে শশুরবাড়িতে থাকতে হয়। অন্যের বাড়িতে নয়।

---- আপু আমার উপর রাগ করে আছিস?

দোয়েল কথা বলল না৷ সে নিজের মতো করে বোরকা হিজাব বেঁধে নিলো। যাওয়ার সময় কেবল বলল,

---- যা করবি ভেবে চিন্তে করবি। আমার ভাইয়া কেমন তা একটু মনে করার চেষ্টা কর। এতোটা ও অবুঝ নই তুই মেঘ৷ নেহাৎ বারণ তাই সত্যিটা বলতে পারছি না। কিন্তু তুই কেন বুঝতে পারছিস না?

---- কি বুঝবো আমি?

---- কিছু না।

রেগে চলে গেলো দোয়েল। মায়ের কারনে বাধ্য হয়েছে যেতে আজকে ভার্সিটিতে। এক প্রকার তর্ক হয়েছে। ফাইজা বেগম বিষয়টা জানেন জেনেশুনে ছেলের মনে কষ্ট দিতে দু'বার ভাবছে ও না। সেটাই বলেছিলো দোয়েল কিন্তু, উপহার স্বরুপ পেয়েছে দুগালে দুটো থাপ্পড়। সেজন্য আরো রেগে আছে দোয়েল৷

________________

---- মামা দেইখা যাও কেডা আইছে।

শ্রাবণ রেডি হচ্ছিলো ভার্সিটি যাওয়ার জন্য। মেঘ চলে যাওয়ার আগে তাকে যেতে হবে সেই আশায় দ্রুত করছিলো। পরোক্ষণে কাজের আন্টির কথা শুনে রুম ছেড়ে ডয়িংরুমে আসলো। চক্ষু তার চড়াকগাছ। মনে পড়ছে না তার এই দশ বছরে বাবা মা কে একসাথে দেখেছে বলে। অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে শুধু। কি সুন্দর দুজন মিলেমিশে আছে কথা বলছে। এতোটা পরিবর্তন কিভাবে? নিজেকে সামলিয়ে বলে উঠলো শ্রাবণ,

---- আপনারা এখানে কেন এসেছেন?

শ্রাবণের কথা শুনে তাকালো সারিফ শিকদার। উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষনাৎ। শ্রাবণের কাছে এগিয়ে এসে বলল,

---- আমি এসেছি একটা আবদার নিয়ে। আবদার নয় বরং তোমার দাদুর শেষ ইচ্ছে। তোমার ফুপুর মেয়ের সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি আমি।

হাসলো শ্রাবণ। কথা রাখার মানে বোঝেন তারা? সে সাথে সাথে বলল,

---- আপনারা আদোও কথা রাখতে জানেন? দাদু তো আপনাদের একসাথে থাকার কথা বলেছিলো।

মরার সময় তো কথা দিয়েছিলেন কই আপনারা তো এখনো আলাদাই রয়ে গেলেন। সেখানে আমি কথা রাখবো কেন?

সুমনা রাহমান এগিয়ে আসলেন ছেলের সামনে। গালে আলতো হাত দিয়ে বলেন,

---- আমরা তোর ইচ্ছে পূর্ণ করতে চাচ্ছি বাবা। তুই

মেঘকে ভালোবাসিস তাই না?

বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো দু'জনের দিকে। তারা জানলো কিভাবে?

---- আপনারা জান.....

---- আমরা জানিয়েছি আংকেল আর আন্টিকে।

সারপ্রাইজ আজকে তোর বিয়ে। আমরা রেডি।

চারজন চলে এসেছে শ্রাবণের ফ্ল্যাটে। হাতে হাতে শপিং ব্যাগ। শ্রাবণের বুঝতে আর বাকি রইলো না এই এক হালি গুলোই সব বলে দিয়েছে তার মনের কথা।

তারমধ্যে সারিফ শিকদার বলেন,

---- অনেক ভেবে দেখলাম আলাদা থেকে লাভ নেই

শুধু নিজেদের ইগোকে প্রশ্রয় দিয়েছি। শেষ সময়ে এসে সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই। তুই কি তোর সাথে আমাদের নিবি শ্রাবণ?

---- আমি ও চাই আমার স্বামী ছেলে, ছেলের বউ নিয়ে থাকতে তাড়িয়ে দিস না শ্রাবণ!

বাবা মায়ের অনুরোধে ভেতরে ভেতরে গলে শেষ।

এমন একটা দিনই তো চেয়েছিলো শ্রাবণ। তবে আরো স্পেশাল হলো তার প্রিয় মানুষটাকে পাবার আনন্দে। রাগ অভিমান ভুলে গেলো মেঘ নামক প্রিয় রমনীকে পাবার আনন্দে। সে মৃদু হাসলো। দু'হাতে সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমানকে এগিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। দুপাশে এসে দাঁড়ালো এক হালি গুলো ও। শ্রাবন বললো,

---- আমি তো এটাই চেয়েছিলাম আপনারা আমার পাশে ছায়ার মতো থাকুন। আমি নিজেকে একা ভাবতাম। খুব খারাপ লাগতো আমার।

---- এই খুশিতে একটা সেলফি হয়ে যাক!

তাসির সেলফি তুলে সবাইকে ফ্রেম বন্দী করে ফেললো সুন্দর মুহুর্তটাকে।

শপিং ব্যাগ আনার পর বড় একটা লাগেজ আনালো সারিফ শিকদার এর ড্রাইভার। সেটা খুলে দেখাতে লাগলো শ্রাবনকে । সুমনা রাহমান ও সারিফ শিকদার মিলে ছেলে ও ছেলের বউয়ের জন্য বিয়ের শপিং করেছেন। দিনটা যেনো স্বপ্ন মনে হলো শ্রাবণের কাছে। বাবা মায়ের কাছে সন্তান যতোই বড় হোক না কেন ছোট-ই রয়ে যায়। বাবা মায়ের পছন্দ দারুন। ম্যাচিং ম্যাচিং শাড়ি ও পাঞ্জাবি এনেছেন। তা ও হোয়াইট কালার। আজ আর ভার্সিটি যাওয়া হলো না। ফ্ল্যাটে খাওয়া দাওয়ায় এবং আনন্দে মেতে উঠলো সবাই।

________________

---- বড়বাবা আমায় ডেকেছো?

---- হ্যা মেঘ৷ বস আমার পাশে।

বসলো মেঘ৷ বলল,

---- এবার তো বলো।

মনে মনে ভেবে তারপর বলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ,

---- আমরা তোর বিয়ে ঠিক করেছি এবং আজই। তোর বাবা চাই, আমি চাই এখন তোর ইচ্ছে বল? আমি জানি তুই তোর বাবার কথার উপর কথা বলবি না।

আকাশ ভেঙে পড়লো মেঘের উপর। তৎক্ষনাৎ বিছানার ছাদর কামছে ধরলো। কি বলে এসব? বিয়ে! বাবা কি জানে না তার ইচ্ছের কথা? আর আজ বিয়ে আজই জিজ্ঞেস করতে আসছে রাজি কি না? রাজি না হলে কি বিয়ে ভেঙে দিতে পারবে? আর বাবা কোথায়?

---- বাবা কোথায় বড়বাবা?

ধীর গলায় বলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ।

---- যা বলার আমার সাথে বল মেঘ। জাহিদকে আমি যা বলবো জাহিদ তাই শুনবে৷ আর ও চাই তুই এই বিয়েটা কর৷ এখন বল তুই তোর বাবার ইচ্ছে রাখবি না?

বাবা তার স্বপ্নের কথা ভুলে এই ভুল সিদ্ধান্তটা কিভাবে চাপিয়ে দিতে পারলো তার উপর? রাগ হলো সবার প্রতি মেঘের। বলল,

---- যা ইচ্ছে করো তোমরা। আর আজই সব ঠিক করে আজ জানালে আমার উত্তর কি হতে পারে বড়বাবা?

রুম থেকে বেরিয়ে গেলো মেঘ। বাইরে কেমন অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মেঘের মনে মেঘ জমেছে। আঁধারে ছেয়ে গিয়েছে তার মুখয়বব। রুমে চলে যায় মেঘ।

_______________

---- আমি না বলা অব্দি বাড়িতে আসার কথা ভুলে ও ভেবো না দিব্য। মেঘের বিদায় আর তোমার ঘরে

ফেরা হবে।

ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের সহিত বলল দিব্য,

---- বিয়েতেই কি সব সমস্যা শেষ হয়ে যায়? তাহলে বিয়ের পর কেন বিচ্ছেদ হয় বাবা? তুমি আমায় ব্লেকমিল করে কি করতে পারবে? আমি ওকে অন্যের সাথে ভালো থাকতে দিবো না।

---- তুমি যা ইচ্ছে করো আমার কোনো সমস্যা নেই

দিব্য। আর যদি বাড়াবাড়ি করো তাহলে তোমার মেঘকে তুমি চোখের দেখা ও দেখতে পাবে না বুঝতেই পারছো তুমি, আমি কি বুঝাতে চাচ্ছি?

---- ইচ্ছে করছে তোমাদের পুঁতে ফেলি। কেন খেলছো আমার জীবন নিয়ে? আমি মরে যায় সেটাই তো তোমরা চাইছো? মেঘকে না পেলে আমি ও হারিয়ে যাবো ধরনীর বুক থেকে তখন যেনো তোমাদের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি ও না পড়ে।

---- যা ইচ্ছে তাই কর। তবুও আজ বাড়িতে আসবি না। মেঘ জানে না বিষয়টা অজানাই থেকে যাবে। কথাটা যদি ওর কানে যায় তাহলে ওরই বিপদ।

ওপাশ থেকে কল কেটে দিলো দিব্য। জাহাঙ্গীর আহমেদ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন,

---- আমাকে মাফ করে দিস বাবা৷ তোর বাবা চাইলে ও কিছুই করতে পারবে না। তোর মা যে মেঘকে বাঁচতে দিবে না আর আমার ভাইয়ের প্রাণ মেঘ৷ আমি চাই না কেউ খারাপ থাকুক। শুধু তুই মধ্য থেকে কষ্ট পাচ্ছিস আর আমি বাবা হয়ে শুধু দেখে যাচ্ছি কোনো উপায় পাচ্ছি না৷ আমি সত্যিই ব্যর্থ!

__________________

দোয়েল আসছে। মেঘের আশেপাশে ও যায়নি সে।

মায়ের রুমে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ফাইজা বেগম ভিষণ খুশি। পার্লার থেকে মেয়ে আনা হয়েছে। খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে মেঘকে। মেঘের ফোনটা নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছে। যেনো দিব্য কিছু বলতে না পারে। একদম মেঘপরী লাগছে। দিব্য দেখলে সাথে সাথে বলে উঠতো। বরযাত্রী এসে গিয়েছে। লোকসংখ্যা বলতে শুধু সারিফ শিকদার ও একহালি বন্ধু গুলো

আর বর শ্রাবণ। সাদা শেরওয়ানিতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে শ্রাবণকে। প্রশংসায় পঞ্চমুখ বন্ধুদের কাছে। বার বার ছেলেকে দেখছেন সারিফ শিকদার। নিজেই চোখ ফেরাতে পারছে না। শ্রাবণ ভেতরে এসে মনে মনে বলল,

---- ডিয়ার প্রিয়তমা আপনাকে নিজের করে নিতে এসে গিয়েছি আমি। বেহায়াপনার লাস্ট স্টেজ বলা যায়। আপনি আর আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। চাইলো ও এই শ্রাবণ শিকদারের থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারবেন না। মিসেস শ্রাবণ শিকদার আজ আপনি সত্যিকারের আমার হবেন।

ওইদিকে মেঘের মুখে হাসি নেই। বলা নেই কওয়া নেই তার সাথে কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এর মধ্যে চাচিমা ছাড়া কেউ তার সাথে দেখা বা কথা বললো না। সবাই কি চাইছে? কি হচ্ছে এসব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে মেঘের।

সময় গড়ালো। বিয়ে পড়ানোর আয়োজন শুরু হলো। ডয়িংরুমে আয়োজন করা হয়েছে বিয়ের। বড়ো করে ঘোমটা দেওয়া হয়েছে মেঘের। পাশেই বসে আছে শ্রাবণ। আজকে হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ শ্রাবন। কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করেছে। মেঘকে কবুল বলার জন্য বলা হলে মেঘ চুপ করে থাকে। আশেপাশে তার বাবার উপস্থিতি টের পাচ্ছে না। বাবা কোথায় তার? ভিষণ কষ্ট হচ্ছে কান্না করে দিলো মেঘ৷ শ্রাবণ হয়তো বুঝলো। আলতো হাতটা মেঘের হাতের উপর রাখলো শ্রাবণ কিন্তু মেঘ তৎক্ষনাৎ সরিয়ে নিলো। এক'বার দু'বার তিন'বারের মধ্যে বাধ্য হয়ে কবুল শব্দটা উচ্চারণ করলো কান্নারত কন্ঠে। পরোক্ষেনে শ্রাবণের গলার স্বর শুনে থমকে গেলো। কান্না ও থেমে এলো। তার মানে তার সাথে শ্রাবণের বিয়ে হচ্ছে? কিভাবে সম্ভব?

---- আংকেল দিব্য ভাইয়া এক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা খুবই আশংকাজনক।

চলবে,,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন