ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

৮ম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ৮

#কলমে_তাসনিম_লিজা

------ কপি নিষিদ্ধ!

---- তোর নব জীবনের সুন্দর সূচনা হোক!

আর আমার ধ্বংস হোক!

ভালোবাসি!

না বলা ভালোবাসা।

আফসোস তুই জানতেই পারলি না তোর জন্য একটা হৃদপিণ্ড ছটফট করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

জীবনের মায়া ত্যাগ করে বাবা মায়ের কথার বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ সময় ভেবে টেক্সট করলো এই কয়েক লাইন মেঘের নাম্বারে। অতঃপর এলোমেলো পায়ে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে লাগলো মাঝরাস্তায় এসে। বড় বড় গাড়ি যাচ্ছিলো সে সময়টাতে। তেমন কোনো হেলদোল নেই দিব্যের মধ্যে । কেউ পাশ কাটিয়ে চলে গেলো তো কেউ পারলো না৷ হঠাৎ, বড় একটা গাড়ি এসে বিষাদে মগ্ন দিব্যকে এক ধাক্কায় রাস্তার কিনারায় এনে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ফুটপাতের কাছ এসে পড়ে মাথা ফেটে যায় তখনই। অতঃপর রক্তের শ্রোত বইতে লাগলো। মৃত্যু যেনো দুয়ারে এসে দাঁড়ালো তার । তবুও বিরবির করলো দিব্য,

---- তোমরা চেয়েছিলেন না মুক্তি! আমি আজ তোমাদেরকে টেনশন মুক্ত করে দিলাম। বেঁচে থাকলে দেখা হবে। না থাকলে আফসোস হবে তোমাদের। আমি ও চা..

তখনই চোখের সামনে কারোর মুখ ভেসে ওঠে দিব্যর। কেউ ছুটে আসছে তারই দিকে। আস্তেধীরে ঝাপসা হয়ে এলো দিব্যর অক্ষিযুগল। অতঃপর নিদ্রায় ডুব দিলো সে।

________________

ঝটপট ঘোমটা তুলে দাঁড়িয়ে গেলো মেঘ। সবাই যেনো কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। শ্রাবনের ও জানার আগ্রহ জন্মেছিলো দিব্য ছেলেটা কোথায়? সে বিয়েতে উপস্থিত ছিলো না কেন? কিন্তু, সেই সময় আর হয়ে উঠেনি। মেঘকে দাঁড়াতে দেখে শ্রাবণ ও দাঁড়িয়ে যায় মেঘের অস্থির মুখপানে তাকায়। বড়ো ভাইয়ার মতো দেখেছে মেঘ কথাটা শুনে অস্থির হয়ে কান্না করে দেয় সে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আহমেদ ও ফাইজা বেগম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। ভেবছিলেন হুমকি দিয়েছে ছেলেটা কিন্তু, সত্যি সত্যি ও এমনটা করতে পারলো? একপক্ষীক এতোটা গভীরভাবে ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবাসলো যে নিজের জীবনের পরোয়া করলো না? আফসোস করতে লাগলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। বিয়ে শেষ হলেও বিয়েতে যেন আনন্দর পরিবর্তে বিষাদে রুপ নিলো।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদ আহমেদ এসে ধরলেন বড় ভাইজানকে। কিন্তু, আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা দোয়েল আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না। সকলের সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বাবা মায়ের মুখোমুখি। তাচ্ছিল্যের হাসলো তৎক্ষনাৎ। চিৎকার করে বললো,

---- শান্তি পেয়েছো তোমরা বাবা মা? আমার ভাই মরে যাক সেটাই তো তোমরা চেয়েছিলে? ভাইয়া

তোমাদের মুক্তি দিয়েছে। মরে যাক সে বেঁচে থেকে কি লাভ ওর? কি এমন চেয়েছিলো সে? মেঘকেই তো চেয়েছিলো। এইটুকুনে আবদার কি রাখা যেতো না? কেন মা? মেঘ কি তোমার ছেলের জন্য পারফেক্ট ছিলো না? কেনো সহ্য করতে পারো না তুমি মেঘকে? নিজের ছেলের থেকে তোমার অহংকার দামি হয়ে গেলো? কিসের শত্রুতা তোমার মেঘের সাথে?

---- চুপ কর দোয়েল। আমি আমার ছেলের কাছে

যাবো। আমাকে নিয়ে চলো দোয়েলের বাবা।

মেঘ স্তব্ধ সাথে সকলে। মেঘ বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো দোয়েলের দিকে। এগিয়ে গেলো কয়েক পা। কাঁধে হাত রাখলো সে দোয়েলের। বললো,

---- কি বলছিস এসব তুই দোয়েল আপু? দিব্য ভাইয়া আমার জন্য....

মেঘের হাত ছিঁটকে দূরে সরিয়ে দিলো দোয়েল।

দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

---- আমার ভাইয়ার নাম মুখে নিবি না তুই। কেন করলি আমার ভাইয়ার সাথে এমন? তুই কেন বুঝিসনি ভাইয়া তোকে ভালোবাসে। আমার থেকে বেশি তোর খেয়াল রাখতো। তুই কিভাবে ভালো থাকবি সেই টেনশনে থাকতো। তুই জানিস তোকে ঢাকা শহর আনতে সাথে ভার্সিটিতে ভর্তির জন্য কতকিছু করেছে? ভাইয়াকে শর্ত দিয়েছিলো মা তোর ইচ্ছে পূরণ হতে হলে ভাইয়ার ইচ্ছে ত্যাগ করতে হবে। তোকে ভালোবাসি কথাটা জানানো যাবে না নয়তো তোকে মা..

থেমে গেলো দোয়েল। শ্রাবণ সহ তার বাবা ও বন্ধু গুলো নীরব দর্শকের মতো শুনছিলো শুধু। তারা তো জানতোই না এতোকিছু। মেঘ কান্নারত গলায় আবার ও বললো,

---- কি হয়েছে বল!

দোয়েল নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। বলল,

---- আমি কিছুই বলতে পারবো না। আমি ভাইয়ার কাছে যাবো। আমি আমার ভাইয়ের কিছুই হতে দিবো না। আর মা বাবা তোমরা কেউ আসবা না। তোমরা আনন্দ করো বিয়েতে। ছেলে মরে গেলে তোমাদের কি।

চলুন ভাইয়া আমাকে হসপিটালে নিয়ে যান।

---- দোয়েল আপু আমি যাবো। আমি দিব্য ভাইয়ার কাছে যাবো। আমাকে নিয়ে চলো।

দোয়েল থেমে গিয়ে ও দাঁড়ালো। পিছু ঘুরে মেঘকে বলল,

---- বেঁচে থাকতে বুঝলি না এখন আর গিয়ে কি হবে বল? তুই এখন অন্য কারোর স্ত্রী। সুন্দর করে সংসার কর। হসপিটাল তোর জন্য না এখন।

কিন্তু, শুনলো না মেঘ৷ শাড়িটা সামলে পিছু ছুটলো

দোয়েলের। শ্রাবণসহ সবাই গেলো পিছু পিছু। দিব্যর বাবা মা ও গেলো৷

____________________

অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল হওয়ায় ওটিতে নেওয়া হয়েছিলো দিব্যকে। প্রথমেই ডক্টর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মাথার অবস্থা খুবই ভয়ংকর! বাঁচার চান্স ও কম। তবুও আশার আলো দেখছেন তারা।

রেসপন্স করছে দিব্য। সে কিছু বলতে চাইলো। বিরবির করে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো আধভাঙ্গা গলায়, ডক্টর দিব্যর মুখের কাছে কান পেতে শুনলো,

---- ওরা আমার থেকে আমার মেঘপাখিকে কেড়ে নিয়েছে ডক্টর আমি মরে গেলে আমার মুখটা ও যেনো দেখতে না পারে আমার মা বাবা। আমি ও ওদের থেকে ওদের নামমাত্র ছেলেকে কেঁড়ে নিলাম। আমাকে বাঁচাবেন না প্লিজ! মরতে দিন আমায়।

ডক্টর অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো। আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না। তারা বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে আর ছেলেটা বাঁচতে চাইছে না। কতটা ক্ষত তার মনে সেটা বুঝতে বাকি নেই ডক্টরের। নার্স ডক্টর খানিকক্ষণের জন্য নীরব হয়ে এলেন। তখন একজন ডক্টর দিব্যর মাথার কাছটায় এসে মৃদু স্বরে ভরসা দিয়ে বলেন,

---- নাথিং উইল হ্যাপেন টু ইউ, ইয়ং ম্যান। ইউ উইল বি ফাইন। ইউ উইল গেট ওয়েল সুন। নিজেকে তুচ্ছ ভেবো না। আমরা চেষ্টার কোনো কমতি রাখবো না৷ এই তো তুমি ঠিক হয়ে যাচ্ছো। জীবন মানে পাওয়া না পাওয়ার মধ্যকারের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া এক বিপরীত শ্রোতের নদী। আমরা যা চাই তা পায় না আর যা চাই না তা এমনিতেই পেয়ে যায়৷ কারোর জন্য কারোর জীবন থেমে থাকে না। এখন যে পাগলামি করছো এক সময় হাসি পাবে মনে মনে। নিজেকে স্ট্রং করো৷ তুমি বাঁচবে কারোর জন্য না শুধু নিজের জন্য।

কিছু কথা কানে গেলে ও আর শুনলো না দিব্য। তাকে ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। ইমিডিয়েটলি

অপারেশন করতে হবে। ইতিমধ্যে শুরু ও হয়ে গিয়েছে।

বাইরে একটি মেয়ে অপেক্ষা করছে। মেয়েটি ভয় পাচ্ছে ভিষণ। দিব্যর অবস্থা এতোটা খারাপ ছিলো যে তাকানোর মতো অবস্থা ছিলো না। ভয় আর আতংকে ঘাবড়ে গিয়েছিলো মেয়েটি। এখনো যায়নি সে। একা ফেলে যেতে মন সায় দিচ্ছিলো না তার। তাই বাইরে চেয়ারে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলো। দিব্যর ফোনটা ছিটকে পড়েছিলো এক নরম জায়গায় তাই ভাঙেনি। সে দ্রুত যার নাম্বার পায় ফোন দিয়ে জানিয়ে দেয় মেয়েটি।

ঘন্টা খানেকের হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালের করিডোরে এলো সবাই। দোয়েল কান্না করছে। নার্সদের জিজ্ঞেস করছে দিব্য কোথায় কেমন আছে একজন চিনতে পেরেছে কারন দিব্যর গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম তাই পুলিশ বলায় সাথে সাথে বলে দিলো ওটিতে নেওয়া হয়েছে৷ ওটির নাম্বার বলতেই ছুটে গেলো সেইদিকে সবাই। তারমধ্যে শ্রাবণ ছাড়লো না মেঘের হাত। চেষ্টার কমতি রাখেনি মেঘ কিন্তু, শ্রাবণ ছাড়ে না। এটা যেনো তার অধিকার। অবশ্য বিয়ে করা বউ তার সে ছাড়া অন্য কেউ ধরবে নাকি? ভয় মনে তার দিব্যর এই

পরিনতির কাছে কি হার মেনে যাবে মেঘ? বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে অজানা ভয়ে।

---- কে তুমি?

মেয়েটি চমকে উঠলো। বলল,

---- আপনারা কি পুলিশ ভাইয়ার বাড়ির লোক?

দোয়েল সাথে সাথে জবাব দিলো,

---- হ্যা তুমি কে? এখানে তো ভাইয়াকে আনা হয়েছে।

---- ওই তো দিব্য ভাইয়াকে বাঁচিয়েছে হসপিটালে এনেছে।

ছেলেটার নাম আরিফ। দিব্যর ফাইফরমাশ কাটে।

ওর আন্ডারেই কাজ করে। মেয়েটির নাম দোয়া।

সে প্রাইভেট পড়ে বাড়ি আসছিলো। তখনই ঘটে এমন দুর্ঘটনা। দোয়েল সাথে সাথে বলে উঠলো,

---- তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমার ভাইয়া কেমন আছে এখন?

দোয়া চিন্তিত মুখে বললো,

---- জানি না আপু। ওটিতে নেওয়া হয়েছে সেই কখন কেউ তো বের হলো না।

বসে পড়লো দোয়েল। মেঘ সেই থেকে কান্না করে যাচ্ছে। সবকিছুর জন্য সে-ই দায়ী। তাকে ঘীরেই তো এতোকিছু। তার দোষটা কোথায়? ভাইয়েরা তো বোনের জন্য এতোটুকু করেই। সেখানে যদি দিব্য ভাইয়া ভালোবাসে তার তো বোঝা দায় হবে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আহমেদ, জাহিদ আহমেদ, ফাইজা বেগম বসে আছেন নীরবে কান্না করছন৷ টেনশনে বার বার তাকিয়ে আছে সারিফ শিকদার ও তাসির, রিফাত, রাতুল এবং রামিম। জীবন কতটা রং বেরংময় বোঝা সত্যিই কঠিন। নয়তো একটা মানুষ নিজের জীবন নিয়ে না ভেবে অন্যের জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারে? অন্যের জন্য না বরং মা বাবা তাকে বুঝলো না এই কারনে। অপেক্ষা আর অপেক্ষা শুধু। শব্দ নেই তবুও ভেতরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে একেকজনের।

দীর্ঘ সময় পর ডক্টর বের হলো। সবাই একসাথে ঘীরে ধরলো ডক্টরকে। দোয়েল সবার আগে জানতে চাইলো,

---- ডক্টর আংকেল আমার ভাইয়া কেমন আছে?

ভালো আছে তো? ঠিক হয়ে যাবে তো?

ডক্টর দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন,

---- যে নিজেকে বাঁচাতে চাই না তাকে চাইলে ও বাঁচানো যায় না। তবুও আম..

কথাটা যেনো বিস্ফোরণ ঘটলো সবার মাঝে। ফাইজা বেগম চিৎকার করে বলে উঠলো,

---- কি বলছেন আপনি আমার ছেলের কিছুই হবে না। আপনারা ভুল চিকিৎসা করেছেন। আমার ছেলেকে বাঁচান প্লিজ। যতো টাকা লাগে আমি দিবো আপনি আমার ছেলেকে বাঁচান। আপনার পায়ে পড়ি। আ...

----- রিলাক্স ম্যাম৷ এমন হলে তো আপনি ও অসুস্থ

হয়ে যাবেন। আর আমার পুরো কথা না শুনে চিৎকার করছেন কেন? পেশেন্ট এখন আউট অফ ডেঞ্জার! একটু সময় লাগবে ক্ষত সারতে। আপাতত আমরা আই সি ইউ তে সিফ্ট করছি। দ্যান কেবিনে দেওয়া হবে। তবে একটা কথা, পেশেন্টকে উত্তেজিত করার মতো কোনো ধরনের কথা বলবেন না।

ডক্টর চলে গেলো। তাদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো দিব্যকে। কাছে এগিয়ে যেতে নিলো ফাইজা বেগম। হাত ধরে আঁটকে দিলো জাহাঙ্গীর আহমেদ। রেগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন তিনি,

---- তোমার পাপের গড়া পূর্ণ হয়েছে ফাইজা। আমি আর চুপ থাকতে পারবো না। তোমার জন্য আমার ভাই ভাইয়ের মেয়ে এখন আমার ছেলে ও শেষ হচ্ছে। তোমার জন্য জাহিদ আজ ও তার মৃত শশুরকে নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করে৷

চমকে উঠলেন ফাইজা বেগম। সাথে সাথে বলে উঠলেন তিনি,

---- পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি? যা চলে গিয়েছে তা এখন নতুন করে তুলছো কেন? আমার ছেলেটার চিন্তা করো আগে। পুরনো কথা বাদ দাও।

ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে জাহাঙ্গীর আহমেদ,

---- চুপ থাকার কারনেই আজ আমার এই অবস্থা।

সবসময় মেরে ফেলার ভয় দেখাও। খারাপ বলে ভয় পেতাম তোমায় । যা খুশি তা-ই করতে পারো আস্তো একটা ডাকাতের বংশ। আমি আর ছাড় দিবো না।

পুরনো অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত পাওয়া জন্য রেডি থাকো তুমি।

রেগে গেলেন ফাইজা বেগম। বলেন,

---- বড্ড বাড়াবাড়ি করছো তুমি। তোমার সম্মানের কথা না ভেবে, সন্তানদের কথা না ভেবে আমাকে শাস্তি দিবে?

---- ভেবেই তো আজ এই অবস্থা। ছেলের মৃত্যুর মুখে মেয়ে আমাকে আর সহ্যই করতে পারছে না। আর সাথে ভাইয়ের মেয়ে ও অপরাধী হলো কারন ছাড়াই। আর কিছু বাকি আছে?

ফাইজা বেগম যেনো আসল রুপ দেখাতে লাগলো

বললো,

---- একদম বাড়াবাড়ি করবা না। আমি আমার বোনকে তোমার ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। তোমার ভাই শুনেনি। একটা মেয়ে ও জন্ম দিয়েছে তাতে কি হয়েছে আমার বোন ওকে ভালোবাসতো। ওই সামিয়ার থেকে দ্বিগুণ সুন্দরী ছিলো। আমার বোন আত্মাহত্যা করেছে তোমার ভাইয়ের জন্য। আর আমি তাদের সুখের সংসার দেখবো হ্যাহ! তাই তো অক্সিজেন পাইপ কেটে দিয়েছি। ভুল কি করেছি আমি? আমার বোনের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছি শুধু। আফসোস সাথে ওই মেঘকে মারতে পারলে আজ আমার এই দিন দেখতে হতো না৷ শত্রুর মেয়ের জন্য আমার ছেলেটা মরতে গিয়েছে ভাবা যায়?

থাপ্পড় মারলো সবার সামনে জাহাঙ্গীর আহমেদ ফাইজা বেগমকে৷ একটা দু'টো নয়। পরপর পাঁচ থেকে ছয়টা দিয়েছেন। জাহিদ আহমেদ কিছুটা দূরে ছিলেন মনমরা হয়ে। মেয়ের জন্য আর দিব্যর এই অবস্থার জন্য। কিন্তু থাপ্পড়ের শব্দ সবাইকে সজাক করে দিয়েছে। দ্রুত ছুটে আসলেন সারিফ শিকদার ও জাহিদ আহমেদ। আটকালেন জাহাঙ্গীর আহমেদকে। হঠাৎ কি নিয়ে সবার সামনে নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তুললেন তিনি? প্রশ্ন করতেই উত্তর দিলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ,

---- অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে সেটা থামে না বরং এর প্রভাব বেড়েই চলে। আজ হারে হারে টের পেলাম।

আর একটু অপেক্ষা করো সবাই সব পানির মতো ক্লিয়ার হবে। আর জাহিদ আমাকে মাফ করে দিস। তোর আর তোর মেয়ের সাথে আমরা অনেক অন্যায় করেছি। আমাকে মাফ করে দিস চাইলে শাস্তি ও দিতে পারিস। আজ আর বলতে লজ্জা লাগছে না।

দোয়েল শুধু দেখে যাচ্ছে। সে সব জানে আড়ালে শুনেছে হয়তো দিব্য ও জানে তার ধারনা নেই। নয়তো

মেঘকে ছাড়ার প্রশ্নই উঠে না। চুপ থাকার ছেলে দিব্য না। দোয়েল দোয়ার দিকে তাকালো। বলল,

---- তুমি এখন চলে যাও। আরিফ ভাইয়া ওকে তুমি দিয়ে আসো বাসা অব্দি। আর হ্যা তোমার নাম কি?

---- দোয়া রাহমান।

দোয়েল মৃদু হাসলো বললো,

---- খুব সুন্দর নাম। আমার ভাইয়ার জীবনটা তোমার জন্য বেঁচে গেলো। তোমার এই ঋণ কখনোই শোধ করতে পারবো না৷

দোয়া মৃদু হেসে বললো,

---- এভাবে বলছেন কেন আপু? একজন মানুষ বিপদে পড়লে আরেকজন মানুষ বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে এটাই তো স্বাভাবিক। আমি আসি তাহলে!

---- আচ্ছা আবার দেখা হবে৷

আরিফ দোয়াকে নিয়ে চলে গেলো। দোয়েল চাইনি তার পরিবারে ঝামেলা কেউ জানুক। এইদিকে ফাইজা বেগম চুপচাপ কিন্তু, ভেতরে ভেতরে তার স্বামীর এহেন কান্ডে অবাক হচ্ছে। এতো বছর চুপ থেকে হঠাৎ নিজেকে মহাপুরুষ দাবী করছে কেন? ভয় কোথায় উধাও হলো?

---- আমার হাত ছাড়ুন!

শ্রাবণ এদিক ওদিক সবদিকেই খেয়াল রাখছে।

দিব্যর বেঁচে ফেরা আর মেঘের দিব্যর জন্য কষ্ট পাওয়া যেনো শ্রাবণের মনে কালবৈশাখী ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। শ্রাবণ শান্ত আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মেঘের দিকে। কাজল লেপ্টে গিয়েছে। ঠোঁটে লিপস্টিক দেইনি। কান্নার তোপে কাঁপছে ঠোঁট জোড়া। যা ও হালকা মেক-আপ করেছিলো সেটাও উধাও হয়ে গিয়েছে। শ্রাবণ ধীর গলায় বলে,

---- আমার বউয়ের হাত আমি ধরবো তাতে তোমার

প্রবলেম কোথায়? আর এভাবে কান্না করছো কেন

দিব্য ভাইয়া তো বেঁচে আছে। আর ভুলে ও তার জন্য মনের মধ্যে ভালোবাসা জন্ম দিও না। তাহলে কিন্তু এই শ্রাবণ শিকদার সব ধ্বংস করে দিবে।

হতভম্ব হলো মেঘ। একটা মানুষ অসুস্থ। তাকে কত

সুন্দর করে আগলে রেখেছে। সম্পর্ক যা-ই হোক কান্না অবশ্যই আসবে কিন্তু, এতোটা গভীর ভাবনা লোকটার মনে আসলো কিভাবে? সে ও বলল,

---- আজাইরা কথা বাদ দিন। দিব্য ভাইয়া আমার বড় ভাইয়ার মতো হয়। আর এখানে কি হচ্ছে সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আর আপনি আমাকে জেলকানার আসামীর মতো ধরে রেখেছেন কেন? বিয়ে করেছন বলে কি আমায় কিনে নিয়েছেন? আমার স্বাধীনতা নেই?

---- না নেই। আমি তোমার স্বাধীনতা। আমি যেভাবে বলবো সেভাবেই চলবে। আমি তোমার হাসবেন্ড। বিয়ে হয়েছে আমাদের। ভুলে ও দিব্য ভইয়ার কথা ভাববা না।

রাগ হলো মেঘের বললো,

---- একটা মানুষ আমার জন্য মরতে যাচ্ছিলো আর আপনি বলছেন তার কথা ভাববো না?

--- না ভাববা না। বিয়ের আগে হলে ভাবা যেতো এখন তুৃমি পুরোটাই আমার৷ আমার মানে আমার। আমি তোমায় অন্য কারোর হতে দিবো না।

---- কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম আল্লাহ!

---- পাগল নয় বউ আমি আপনার হাসবেন্ড হই।

---- চুপ করুন আর দয়া করে হাত ছাড়ুন আমি কোথাও যাচ্ছি না। প্লিজ!

শ্রাবন মেঘের হাত ছাড়লো। পুলিশ আসলো তখন

ফাইজা বেগম সাথে সাথে আতঙ্কে জমে গেলো,

বলল,

---- এটা করো না তুমি দোয়েলের বাবা। আমার সন্তানদের সবাই অপমান করবে।

সবার সব মাথা উপর দিয়ে যাচ্ছে তাদের স্বামী স্ত্রীর কথোপকথন শুনে। পুলিশ এসেই জিজ্ঞেস করলেন,

---- স্যার এখন কেমন আছেন?

---- আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনাদের যে কাজে ডাকা হয়েছে।

---- জ্বি স্যার বলুন।

---- কি করছো তুমি?

---- চুপ থাকো ফাইজা। এতোদিন তো চুপই ছিলাম

আর নই।

সবার দৃষ্টি এখন দুজন দম্পতির উপরে। জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন,

---- চৌদ্দ বছর আগের কথা পুলিশ অফিসার। আমার ভাইয়ে সম্পর্ক করে, অনেক ঝামেলা করে বিয়ে করে পালিয়ে গিয়ে । সামিয়া নাম ছিলো ভাইয়ের বউ এর। সামিয়ার বাবা মেনে নেইনি কিন্তু, আমরা মেনে নিয়েছিলাম। সব কিছু ঠিকটাক চলছিলো। তারমধ্যে ঝামেলা বাঁধলো ফাহমিদা মানে আমার স্ত্রীর ছোট বোন। আমার ভাই বিবাহিত জানার পর ও পিছু নিয়েছিলো তাদের। ভাইয়ের একটি মেয়ে হয় নাম মেঘ।

তারপর ও পাগলামো করেছে অবুজের মতো ফাহমিদা।

অনেক কষ্টে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাই। আসলে ফাহমিদার মানসিক সমস্যা ছিলো। যখন যা চাইবে তাই দিতে হবে নইলে সে নিজেকে সহ্যই করতে পারতো না। অন্য দুনিয়ায় বসবাস করতো। বাস্তবতা তার কাছে বিষাদ ছিলো। তো হঠাৎ সে সুই'সাইড করে। সেই দোষ দেই ফাইজা জাহিদের উপর। তার জন্য নাকি ফাহমিদা মারা গিয়েছে। সেই প্রতিশোধ নিতে পাঁচ বছরের মেঘের কথা না ভেবে হসপিটালে অসুস্থ থাকা সামিয়াকে মেরে ফেলে। তার শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিলো সেই সুযোগটায় বেছে নেই ফাইজা লোকচক্ষুর আড়ালে সেই অক্সিজেন পাইপ কেটে দিয়ে বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেই। আর এখন মেঘকে ও মেরে ফেলার ভয় দেখায়। বাধ্য হয়ে নিজের ছেলেকে আমি বলি দিলাম। ইমোশনাল ব্ল্যাকমিল করে মেঘকে ফাইজা আর দিব্যর থেকে দূরে সরালাম। কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি এতে আমার বাবাটা মরার কথা ভাববে৷ আমি এখন তার চোখের সামনে দাঁড়াবো কিভাবে?

কান্না করে দেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। এই কথাগুলো তার গলায় রশির মতো আঁটকে ছিলো এতোদিন। বিশ্বাস না হলে ও প্রমান দেখান জাহাঙ্গীর আহমেদ। কিছু ফটো যা একজন নার্স তুলে তাদের ব্ল্যাকমিল করে আর তখনই জানতে পারে জাহাঙ্গীর আহমেদ এতোবড় একটা ঘটনা ঘটিয়েছেন তার স্ত্রী। লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে হয়েছে নার্সকে সম্মানের জন্য শুধু।

পুলিশ নিরদ্বিধায় এরেস্ট করলো ফাইজা বেগমকে

ফাইজা বেগম অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন জাহাঙ্গীর

আহমেদ এর দিকে। তিনি মুখে ফিরিয়ে নিলেন৷

মেঘ ও জাহিদ আহমেদ যেনো স্তব্ধ। এতোটা নিচে নামতে পারে একটা মানুষ ? আর এই মানুষটাকে কতটা আপন ভাবতো তারা। জাহিদ আহমেদ ভাবতেই শিউরে উঠছেন। দিব্য যদি পাগলামি করতো মেঘের জন্য তাহলে ফাইজা বেগম নিশ্চয়ই মেঘকে মেরে ফেলতে দ্বিতীয়বার ভাবতো না। সারিফ শিকদার জাহিদ আহমেদ এর কাঁধে হাত রাখেন, বলেন,

---- ভয় পেয়ো না যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। বোন আমার আজও বেঁচে থাকতো যদি কেউ না মারতো। আফসোস!

জাহাঙ্গীর আহমেদ এগিয়ে গেলেন জাহিদ আহমেদ এর দিকে। বলেন,

---- আমাকে মাফ করে দিস ভাই। ছেলে মেয়ের জন্য এতোদিন বুকে পাথরের মতো আগলে রেখেছি। বলতে চেষ্টা করেছি কিন্তু, পারিনি। আজ আর চুপ থাকতে পারলাম না৷ চুপ থেকে দেখলাম শুধু বিপদ বাড়ছে কমছে না।

---- তুমি মাফ চাচ্ছো কেন? যা করার তে করেছে ভাবি। এসব নিয়ে না ভেবে দিব্যকে নিয়ে ভাবো। ওর সুস্থ হওয়াটা আমাদের কাছ জরুরি।

---- এ্যাই মেয়ে একদম কাঁদবা না৷ শুধু তোমার মা না আমার ফুপি ছিলো সে আমাকে অনেক আদর করতো। তোমার বাবা নিয়ে নিয়েছিলো আমার থেকে। ভাবছিলাম পেলে আচ্চা মতো কথা শুনাবো কিন্তু, দুর্ভাগ্য ক্রমে এখন তিনি আমার শশুর আব্বা হয়ে গেলো।

---- মা কি জিনিস তা যার হারায় সে বুঝে।

---- থেকে ও তো বুঝি, না থাকার যন্ত্রণা। কেঁদো না মেঘ তোমার কান্না আমার বুকে এসে আঘাত করে। আর দিব্য ভাইয়া এখন সুস্থ আছে আমাদের এখানে না থাকায় ভালো। কজ আমরা নতুন...

---- বাজে কথা বন্ধ করুন। পরিস্থিতি দেখুন আপনি আর আমি আপনার সাথে কোথাও যাচ্ছি না। আমি যেখানে আছি সেখানেই থাকবো।

শ্রাবণ ঈগলের ন্যায় থাবা দিয়ে হাত ধরলো মেঘের

বললো,

---- দেখি কার বাপের সাহস আছে আমার বউকে আমার থেকে দূরে রাখার। বিয়ে করা বউ আমার

দরকার হলে নিজের বাড়িতে নিয়ে সারারাত তাকিয়ে থাকবো তবুও পরের বাড়িতে রাখবো না। নিজের মূল্যবান জিনিস অন্যের বাড়িতে রাখতে নেই

---- আমার বাপের সাহস আছে। আমি যাবো না মানে যাবো না।

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন