#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৯
#কলমে_তাসনিম_লিজা
----- কপি নিষিদ্ধ!
দিব্যকে একে একে দুই থেকে তিন মিনিট দেখার সুযোগ দিয়েছেন ডক্টর। দোয়েল, জাহাঙ্গীর আহমেদ, জাহিদ আহমেদ, সারিফ শিকদার, সাথে শ্রাবণের বন্ধুরা ও দেখে আসছে এক এক করে । কিন্তু, শ্রাবণ যেতে দিতে চাচ্ছে না মেঘকে একা একা। নিজে যেতে চাচ্ছে তবে মেঘ যেতে দিচ্ছে না। একপ্রকার নীরব যুদ্ধ দুজনের মধ্যে। কেউ কিছু বলছে না কারণ এখানে মেঘের কোনো দোষ দেখতে পাচ্ছে না তারা ৷ দোষ যার সে এখন এই মুহুর্তে এখানে উপস্থিত নেই। যায় হোক! শেষে দুজন মিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। একসাথে যাওয়ার অনুমতি নেই জোর করে নার্স কে বুঝিয়ে ভেতরে আসলো মেঘ ও শ্রাবণ। পরণে দু'জনেরই বিয়ের শেরওয়ানি ও শাড়ি পড়া। মেঘ আহত দৃষ্টিতে তাকালো দিব্যর দিকে। কড়া ডোজের মেডিসিন দেওয়া হয়েছে স্যালাইনের মাধ্যমে। আপাতত দিব্য অচেতন অবস্থায় আছে। হুঁশ নেই তার। পুরো মাথা জুড়ে বেন্ডেজ করা। হাতে বেন্ডেজ করা, তারপর পায়ে ও আঘাত পেয়েছে গুরুতরভাবে।
শ্রাবণ কষ্ট পাই দিব্যর জন্য। তার অবস্থা দেখে সবাই কাঁদছে। কিন্তু, শ্রাবণ বেশি কষ্ট পাই মেঘকে কাঁদতে দেখে। শব্দ করা যাবে না বিদায় নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে মেঘ দিব্যর জন্য। শ্রাবণ হাত চেপে ধরলো শক্ত করে। ফিসফিস করে বললো,
---- খবরদার! বারবার ওয়ার্নিং দিচ্ছি। কাঁদবে না মেঘ। আমার অসহ্য যন্ত্রণা হয়। হিংসে হয়৷
মেঘ এর ইচ্ছে হলো কয়েকঘন্টা লোকটা সাথে ঝগড়া করলে মনটা শান্তি লাগতো আফসোস সেই পরিস্থিতি এখন নেই। তাই মেঘ ও শান্ত স্বরে বললো,
---- অতিরিক্ত তো আপনি করছেন। একটা মানুষ অসুস্থ তাকে নিয়ে হিংসে হচ্ছে আপনার? ভালোবাসা একদম উথলে পড়ছে। এতোদিন কোথায় ছিলেন আপনি?
---- ইউ আর অ্যাবসলিউটলি রাইট মিসেস শ্রাবণ শিকদার। আপনার জন্য আমার ভালোবাসা সবসময় একটু বেশিই কজ আপনি আমার একমাত্র বউ। আগে ছিলাম না এখন এসে গিয়েছি।
---- সময় শেষ আপনারা এখন বাইরে যান।
মেঘ দিব্যর দিকে একপলক তাকিয়ে শ্রাবনের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে এলো আই সি ইউ রুম থেকে ৷
শ্রাবণ এসেই বললো,
---- বাবা আমি মেঘকে নিয়ে বাসায় যেতে চাচ্ছি।
আর দিব্য ভাইয়া এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালোর দিকে৷ আমরা এখানে থেকে কি করবো?
মেঘ অবাক চোখে তাকায় শ্রাবণের দিকে। কেমন নির্লজ্জের মতো কথাবার্তা বলছে ছেলেটা৷ তার মধ্যে সারিফ শিকদার বলেন,
---- মেঘ তো আমাদের সাথে যাবে না। ওর পড়াশোনা শেষ হবে আর তুই ও এক্সাম দিয়ে জব নিবি তারপর।
মেঘ খুশি হলো কথাটা শুনে। তবে শ্রাবণ খুশি হতে পারলো না। বাবার মুখের উপর বলে উঠলো,
---- কে বলেছে কথাটা বাবা? যে বলেছে সে ও কি বউ ছাড়া থেকেছিলো? যদি থেকে থাকে তাহলে আমায় আটকাবে নয়তো ভুলে ও আমাদের সামনে আসার সাহস না করে।
কেউ আর কথা বাড়ালো না। ছেলে এমন খাপছাড়া কথা বলবে আশা করেনি সারিফ শিকদার। জাহাঙ্গীর আহমেদ ও জাহিদ আহমেদ ও কিছু বলার সাহস পাননি। মেঘকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো শ্রাবণ। পিছনে গেলো একহালি বন্ধু গুলো ও । তাসির থাকতে চেয়েছিলো কিন্তু, বলার সাহস করতে পারেনি সে। দোয়েলের অসহায় মুখটা দেখে তার বড্ড মায়া হচ্ছিলো। তবে তার যে রাগ তেজ ভয় লাগছিলো তাসিরের। তাই সিদ্ধান্ত বদলে শ্রাবণদের সাথে চলে যায়। মেঘ চাইলে ও নিজেকে আঁটকে রাখতে পারেনি৷ বাবা, চাচা, মামার সামনে জোরজবরদস্তি করা ঠিক হবে না যেখানে তারা চুপ করে আছেন।
দোয়েল তাদের যাওয়ার পানে মুচকি হাসলো। আনন্দের না বিষাদের হাসি। তার ভাই যার জন্য এতোকিছু করলো সে এখন অন্যের ঘরের ঘরনী হয়ে বসে আছে। ভাইয়ের সেই মেয়েটির উপর আর কোনো অধিকার রইলো না৷ শুধু মা নামক মানুষটার জন্য । আফসোস লাগছে না দোয়েলের ওনার সত্যিই শাস্তি পাওয়া দরকার। মানুষটার মন পাথর দিয়ে তৈরি। ছেলের কষ্ট অনুভব করতে পারেন না তিনি। মরলে ও কিছুই যায় আসে না। উল্টো মারার হুমকি দিয়ে এতো বড় পঁচিশ বছর বয়সি ছেলেকে দমিয়ে রাখে। নয়তো আইনের দিক থেকে তার কাছে কোনো ব্যাপারই ছিলো না সবটা সামলে মেঘকে আপন করতে। শুধুই মা আর বাবার কথা ভেবে চুপ থেকে শেষে কি না নিজের জীবন শেষ করার চিন্তা আসলো তার ভাইয়ার মাথায়। আজ সেই মাথার অবস্থা নাজেহাল। হবেই তো সব সমস্যার মূল এই মাথা। যতো চিন্তা ভাবনা এখানেই তো হয়৷ আর মন তো অন্যজনে জায়গা করে নিয়েছে। বিবেকবুদ্ধি কাজ করবেই বা কি করে?
বেশ রাত হয়েছে। দোয়েল যাবে না কোথাও তাই তার জন্য আলাদা কেবিন রাখা হয়েছে। জাহাঙ্গীর আহমেদ ও জাহিদ আহমেদ ও যাবেন না। জাহাঙ্গীর আহমেদ জোর করে পাঠিয়ে দিলেন সারিফ শিকদারকে। এতো মানুষ থেকে কোনো লাভ হবে না। শুধু হসপিটালে ভীর সৃষ্টি করা হবে। তাছাড়া সারিফ শিকদার বাড়ির মেহমান। এখানে থাকাটা মানাই না। সারিফ শিকদার জোর করেন তবুও বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। বড় ভাইয়ের মতো তাই জোর করতে পারেননি তেমন। চলে আসলেন বাসায়। জাহাঙ্গীর আহমেদ মেয়ের কাছে যান। মাথায় আলতো হাত দিয়ে বলেন,
---- দোয়েল যা রেস্ট নে আমরা আছি এখানে।
দোয়েল ম্লান হাসলো। কিছুটা দূরে সরে গেলো তার বাবার কাছ থেকে। বললো,
---- আমার ভাইয়া সেইফ আমার কাছে। আপনি কেন থাকবেন? আপনারা তো মানুষ মারতে ও দ্বিধা বোধ করেন না। আমার ভাইয়া যদি আবার ও মেঘের জন্য পাগলামি করে তাহলে তো আপনারা রেগে যাবেন। যেমন মা করেছে। কাউকে বিশ্বাস করি না আমি। বরং একটা কাজ করুন আপনারা চলে যান আমি আমার ভাইয়াকে আগলে রাখবো আর কারোর প্রয়োজন হবে না আমাদের।
জাহিদ আহমেদ এগিয়ে আসলেন। দোয়েলের কাঁধে হাত রেখে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলেন।
আদুরে স্বরে বলেন,
---- আমার আম্মজান এতোটা ও অবুঝ না আশা করি। ভাইজান তোদের ভালোর জন্যই তখন চুপ ছিলো। কই আমার ও তো প্রিয়জন হারালো। আমি তো রাগ করতে পারছি না ভাইজানের উপর। কারন, সে ও তখন পরিস্থিতির স্বীকার ছিলো। উপায় ছিলো না। যদি উপায় থাকতো তাহলে আজ আমাদের কারোর এই দিনটা দেখতে হতো না।
দোয়েল কান্না করতে লাগলো হিঁচকি তুলে। বললো,
---- কাকাই আমার একটা মাত্র ভাই যে কি না আমায় বাবার চেয়ে বেশি আদর করে আগলে রাখে। তার একটা মাত্র আবদার কেন ওরা রাখতে পারেনি? আচ্ছা তুমিই বলো ভাইয়া কি খারাপ ছেলে? উগ্র? রাগী? বখাটে? নাকি..
---- দিব্য খুব ভালো একটা ছেলে দোয়েল। ওর সাথে কারোর তুলনা হয় না। ওর কথাতেই তো আমি মেঘকে ঢাকায় আসতে অনুমতি দিয়েছি। ওকে ভরসা করেই তোদের বাড়িতে পাঠিয়েছি।
---- তাহলে কেন ভাইয়া মেঘকে পেলো না? কাকাই তুমি বিয়েটা ভেঙে দাও। ভাইয়ার জ্ঞান ফিরলে যদি মেঘকে খোঁজে যদি আবার ও কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে?
হতাশ হলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ ও জাহিদ আহমেদ। বিয়ে হয়ে গিয়েছ চাইলে ও এখন ভাঙা সম্ভব না। তারউপর শ্রাবণের যে পাগলামি মেঘকে নিয়ে, বিয়ে ভাঙার কথাটা বলতেই তো পারবেন না তারা।
---- উপায় নেই রে মা। তুই দেখিস মেঘের থেকেও ভালো মেয়ে দিব্য পাবে। সবসময় আমরা যাদের চাই তারা আপন হয় না। বা আমাদের ভাগ্যে থাকে না। নয়তো এতো কাছে থেকেও দিব্য পায়নি মেঘকে। আর ভাইজান যদি বলতো আমি তো বারণ ও করতে পারতাম না। আমি জানতাম ভাইজান আমার মেঘের ভালো চাই। কিন্তু, পরিস্থিতি সব শেষ করে দিয়েছে।
---- পরিস্থিতি না কাকাই সব মা আর বাবা শেষ করেছে। আমার ভাইকে মারার পায়তারা করেছে তারা।
আফসোস তাদের প্ল্যান সম্পূর্ণ হয়নি। আর আমি জানি কেন এমন করেছে সময় আসুক আসল সত্যিটা সামনে বেরিয়েই আসবে। আমি শুধু একজনের অপেক্ষা করছি সে সামনে আসলেই সবটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। তোমরা রেস্ট করো কাকাই। আমি এখানে বসে থাকবো।
---- তুই ছোট মানুষ এখানে থাকা ঠিক হবে না।
---- ঠিক ভুলের তফাৎ আমার খুব ভালো করেই জানা আছে কাকাই। আমি আমার ভাইয়ের ক্ষতি চাই না। আর কাউকে কোনো ক্ষতি করতে ও দিবো না।
ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে কেবিনের দিকে অগ্রসর হয় জাহাঙ্গীর আহমেদ। মেয়েটা আর ছেলেটা একদম তার মায়ের মতো হয়েছে। সব কেনো এমন এলোমেলো হয়ে গেলো? তিনি তো এমন চাইনি। কাকে টানছে দোয়েল কেন পুরনো অতীত নিয়ে পড়ে আছে? পুরনো অতীত তো বিষাক্ত কার যে নজর লেগেছিলো তাদের উপর একমাত্র উপরওয়ালায় জানেন।
দোয়েল স্থির বসে রইলো করিডোরের চেয়ারে। নড়বে না সে একদম।
________________
---- জোর করা আমার একদম পছন্দ না। কি শুরু করেছেন আপনি?
এক হাতে ড্রাইভ করছে তো আরেক হাত শক্তপোক্ত ভাবে ধরে আছে মেঘের হাতখানা। মেঘ ছটফট করছে ছুটার জন্য। তাদেরকার মধ্যে প্রাইভেসি নষ্ট হবে বলে দুই বাইকে চারজনকে পাঠিয়ে দিয়ছে শ্রাবণ। শ্রাবণের চোখ সামনের দিকে রেখেই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো,
---- সবসময় ছাড়া পাওয়ার পায়তারা করো কেন?
আমি বাঘ না ভাল্লুক যে ধরলেই খেয়ে ফেলবো?
---- আপনি সবসময় নিজেরটা ভাবেন এটাই আমার ভালো লাগে না। এতো স্বার্থপর কেন আপনি?
---- তো আমি কি এখন দিব্য ভাইয়ার অসুস্থতার জন্য নিজের বউকে দান করে দিবো? নাকি তার সেবা করার জন্য রেখে আসবো? কোনটাকে স্বার্থপর বলছো তুমি?
মেঘ সত্যিই থম মেরে গেলো। শ্রাবণ শুধু বেশি ভাবে। পরিস্থিতি বুঝে কথাবার্তা বলতে হয় আর লোকটা তাকে নিয়ে আসার জন্য সবার সামনে নির্লজ্জের মতো কথা বলেছে। শ্রাবন আবার ও বলে,
---- আমি সবসময় হারিয়েই অভ্যস্ত! তাই ভয়টা আমার মনে সবসময়ই জেঁকে বসে। আমি চাই না তুমি আমার থেকে হারিয়ে যাও। আমি আমার মতো করে তোমায় আগলে রাখবো। হতে পারি আমি তোমার কাছে স্বার্থপর অথবা পাগল আই ডোন্ট কেয়ার!
---- কি করছেন আপনি সাবধানে চালান। সামনে গাড়ি আসছে।
গাড়িটা আর একটু হলে ধাক্কা লাগতো। ভিষণ ভয় পেয়ে যায় শ্রাবণ। নিজের জন্য না মেঘের জন্য।
আনমনে ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলো ক্ষনিকের জন্য।
পরোক্ষণেই ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় মেঘের দিকে। সামান্য ঝুঁকে গিয়েছিলো মেঘ। ভাগ্যিস সিট বেল্ট পড়েছিলো। গাড়িটা একসাইডে রেখে মেঘের চোয়াল আঁকড়ে ধরলো। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
---- তুমি ঠিক আছো মেঘ? লাগেনি তো? আই’ম রিয়েলি সরি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।
---- এতো অস্থির হওয়ার দরকার নেই আমি ঠিক আছি। ভয় পাচ্ছেন কেন?
সস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লো শ্রাবণ। মনে হলো এই পরাণ পাখি উড়াল দিলো বলে,
---- আমি নয়তো কি অন্য কেউ অস্থির হবে তোমার জন্য ?
শুধু ত্যারা ত্যারা কথাবার্তা বলা'ই মনে হয় লোকটার কাজ। হাত সরিয়ে নিলো মেঘ। বললো,
---- হ্যা অন্য কেউ'ই অস্থির হবে। আমার মতো মেয়ের আপনার সাথে থাকা ইম্পসিবল!
শ্রাবণ ফিচেল হাসলো। কানে কানে বললো,
---- ইম্পসিবলকে পসিবল করা আমার জন্য মোটেও কঠিন কাজ নই মিসেস শ্রাবণ শিকদার।
মেঘ কথা বললো না। মনে মনে রাগ হলো। তাই চুপ করে জানালার বাইরে চোখ রাখলো। অন্ধকারে শহরটা অন্যরকম সৌন্দর্যে মুখরিত হয়ে আছে । শ্রাবণ একমনে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিলো। থাক কিছুটা নীরবতা। তবুও শান্তি লাগছে শ্রাবণের কাছে। পাশে তো আছেই প্রিয় মানুষটা।
__________________
---- ইশ! পুলিশটার ফোন তো আমার কাছে রয়ে গিয়েছে। কি করবো এখন?
ফোনটা আনলক সে শুধু কল লিস্টে ডুকেছিলো৷ এখন ফোনের স্ক্রিনে ভালো করে তাকালো, অবাক হলো ভিষণ। বললো,
---- আরে এটা তো সেই বউটার ছবি। তাহলে ওই পুলিশের ফোনের ওয়ালপেপার দেওয়া কেন? গন্ডগোল মনে হচ্ছে। যাক গে তাতে আমার কি?
---- পড়তে বসে কি করা হচ্ছে শুনি?
দোয়া তড়িঘড়ি করে ফোনটা লুকালো। শুঁকনো ডুগ গিলে বললো,
----- প'পড়ছি আম্মু। তুমি এখানে কিছু বলবা?
আয়েশা রাহমান দুধের গ্লাসটা পাশে রেখে বলেন,
---- খেয়ে নিবি। তোর বাবা বলছিলো আজকে এতো লেইট হলো কেন?
ওঠে দাঁড়ায় দোয়া বললো,
---- আসলে একজন বিপদে পড়েছিলো তাই একা রেখে আসতে পারিনি। কয়েকজন মানুষের সাথে মিলে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাই একটু দেরি হয়েছে।
---- সে এখন কেমন আছে? আর তুই মেয়ে মানুষ কেন বিপদের মধ্যে যাস বলতো? জানিস না তোর বাবা এসব পছন্দ করেন না।
দোয়া মায়ের হাত ধরে বললো,
---- মানুষ বিপদে পড়লে চুপ থেকে দেখবো নাকি?
যেখানে একজন পুলিশ আহত হয়েছে। তাই রেখে আসতে পারিনি। এখন সে মোটামুটি সুস্থ আছে।
---- আচ্ছা সত্যিটা বলতে হবে না তোর বাবাকে। বলবি বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলিস। নয়তো রাগ করবে সে।
---- তুমি বলে দিও।
---- আচ্ছা খেয়ে নিস পুরোটা৷ আমি যায় তাহলে।
---- আচ্ছা আম্মু।
আয়েশা রাহমান চলে যেতেই রুমের দরজা লক করে ফেলে দোয়া। অনুমতি ছাড়ায় গ্যালারি চেইক করতে থাকলো। তেমন কিছুই নেই কয়েকটা ফটো ছাড়া। যাদের সে দেখেছে হসপিটালে৷ কিন্তু, কয়েকটা পিক আড়ালে তোলা৷ ওই বউ সাজে মেয়েটাকে কি পুলিশটা ভালোবাসে? ছ্যাকা খেয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলো না তো আবার?
---- না নাএসব কি ভাবছি আমি? সমস্যা এক্সিডেন্ট ও তো হতে পারে। যায় হোক বিনা অনুমতিতে কারোর পার্সোনাল জিনিসে হাত দিতে নেই। কালকে ফোনটা দিয়ে আসতে হবে। আর পুলিশটাকে একবার দেখে আসতে হবে। আহ! কি অবস্থাটাই না হয়েছিলো। আজরাইল বোধহয় খুব কাছে এসে ফিরে গিয়েছে।
দোয়া ফোন রেখে মায়ের কথা মতো দুধের গ্লাস খালি করলো। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে এসে শুইয়ে পড়লো।
_________________
মেঘকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে আসলো শ্রাবণ। তাসিরসহ সব বন্ধুরা ও উপস্থিত আগেই। কারন তারা বাইকে করে ফুল স্পিডে এসেছে৷ সুমনা রাহমান এগিয়ে আসেন। তাসির মিষ্টির প্লেট নিয়ে আসে। সুমনা রাহমান মিষ্টি হেসে মেঘের চিবুক উঁচিয়ে ধরলেন। অতঃপর সাথে সাথে বলে উঠলেন,
---- মাশাল্লাহ! ছোট্ট সামিয়ার মেয়ে কত বড় হয়ে গেলো। আজ থেকে আমি তোমার মা। ছেলের বউ না কিন্তু, মেয়ে হয়ে থাকবে আমার কাছে। সামিয়ার সাথে আমার খুব ভালো বন্ডিং ছিলো। সময় আর পরিস্থিতি সব শেষ করে দিলো। যায় হোক মিষ্টি মুখ করো।
এগিয়ে দিলো চামচ। মেঘ নিরদ্বিধায় মুখে নিলো একটু। তারপর শ্রাবণকে দিতেই সে হাসিমুখে খেয়ে নিলো।
---- ভেতরে আসো তোমরা।
সুমনা রাহমান বলতেই শ্রাবণ মেঘকে নিয়ে ভেতর আসলো হাতে হাত রেখে মুঠোবন্দি করে। ভেতরে আসতেই সুমনা রাহমান এগিয়ে গিয়ে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
---- মেঘ মন খারাপ করে থেকো না৷ যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে আমরা চাইলেও তা খণ্ডাতে পারবো না। দিব্য ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!
মেঘ বিনিময়ে ম্লান হাসলো। ঠিক হলেই ভালো নয়তো নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হবে। একটা মানুষ তার জন্য কতকিছু করেছে বিনিময়ে জীবন শেষ হয়ে যাবে নাহ! এমনটা কখনোই চাই না সে।
রাত বাজে বারোটা। ক্লান্ত শ্রাবণ। মেঘকে নিয়ে নিজের রুমে আসতে নিলে বাধ সাধলো একহালি বন্ধু গুলা। দরজায় লক করা। দরজার সামনে বসে আছ চারজন। মেয়ে নাই কাজটা তাদেরই করতে হবে কি আর করার? তাদের মধ্যে রাতুল বলে উঠলো,
---- আসছিস তাহলে? টাকা দে ভাই বউ নিয়ে বাসর ঘরে যা। আমরা অনেক কষ্টে সাজিয়েছি।
রামিম ও সায় দিলো,
---- হ্যা আমাদেরকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে তারপর রুমে যাবি।
রিফাত বললো,
---- এক টাকা ও কম নিবো না। পঞ্চাশ মানেই পঞ্চাশ।
শ্রাবণ তাকালো তাসিরের দিকে। বললো,
---- কিরে তুই কথা বলছিস না কেন? তুই ও বল?
আরো বেশি লাগবে?
তাসির এদিকসেদিক তাকিয়ে বললো,
---- আমি জানি না ভাই। ওদের আবদার রাখলেই হবে।
মেঘ এতো বড় বড় ছেলেদের কর্মকান্ড দেখছে। এদের দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না এদের স্বভাব কেমন। বাচ্চারা ও এদের থেকে যথেষ্ট ম্যাচিউর আছে। কিছুটা লজ্জা লাগছে মেঘের। শ্রাবন পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকা নোট আর একটা হাজার টাকার নোট বের করলো। তারপর এগিয়ে দিলো তাদের দিকে। বললো,
---- এই নে তোদের পঞ্চাশ হাজার টাকা। আর এক টাকা ও বেশি চাইবি না এখন চোখের সামনে থেকে দূর 'হ' তো। নয়তো সময় আমার ও আসবে তখন দেখবি শ্রাবণ কি করতে পারে।
চারজনের বোকা চাহনি শ্রাবণের হাতের দিকে। তাসির বললো,
---- ওরা তোর কাছ পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছে আর তুই কি দিচ্ছিস?
শ্রাবণ না বোঝার ভান করে বললো,
---- কেন এই পঞ্চাশ আর এই হাজার টাকা। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলাম। আর একটা কথা ও বলবি না। চুপচাপ যা এখান থেকে।
রাতুল হাহুতাশ করে বললো,
---- ভুলেই গিয়েছিলাম আমি ও কেমন ছেলে থাক!
আমাদের টাকা দিতে হবে না। তোর বউকে কিছু কিনে দিস। এই চল কষ্ট করলে নাকি কেষ্ট মিলে আর আমাদের মিলে হতাশা আর শূন্যতা।
মুখ কালো করে সবাই উঠে গেলো। তাদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেলো। মেঘ তাকালো শ্রাবণের দিকে। বললো,
---- বন্ধুদের সাথে এমন কিপ্টামি করে কেউ? কম করে হলেও পাঁচ হাজার টাকা দিতেন।
শ্রাবণ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
---- বউ বললে নিশ্চয়ই দিতাম। বলেনি তাই দিইনি। আসো ভেতরে আসো।
হাত ধরেই আনলো শ্রাবণ মেঘকে। সুন্দর গোছানো রুমটাকে তাজা ফুল দিয়ে সাজিয়ে আরো সুন্দর করে তুলেছে। নাক মুখ কুঁচকে ফেলে মেঘ। সাথে সাথে বলে উঠলো,
---- গোলাপে আমার এলার্জি। গোলাপ ফুলের স্মেইল আমি নিতে পারি না। আমি এখানে থাকবো না।
পুরো রুমটা সাজিয়েছে তার একা হালি বন্ধু গুলো
আর শ্রাবণ জানতো না মেঘের গোলাপ ফুলে এলার্জি। সাথে সাথে মেঘকে নিয়ে রুম থেকে বাহিরে চলে আসলো শ্রাবণ । নরম স্বরে বলে উঠলো শ্রাবণ,
---- আমি জানতাম না মেঘ বিষয়টা। জাস্ট একটু সময় দাও আমি সব চেইঞ্জ করে দিচ্ছি।
কথা বলার সুযোগ দিলো না শ্রাবণ মেঘকে। সোফায় বসিয়ে রেখে রুমে আসলো সে। বেডসিটে সুন্দর করে তাদের নাম লিখা ছিলো। লাভ সেইপের মধ্যে। সেটা আলাদা ভাবে তুলে ফেললো বেড থেকে। চারপাশে আরো কিছু ফুল ছিলো সব একটা বেডসিটের মধ্যে রেখে দিলো সে। নিজের মতো করে পুরো রুমটাকে গুছালো সে। সবসময়ই কাজের আন্টি পুরো ফ্ল্যাট পরিষ্কার করলে ও নিজের রুম গুছাই শ্রাবণ নিজেই। আজ ও তার ব্যতিক্রম হলো না নতুন করে সব পরিষ্কার করে বেডসিড পাল্টে ফেলে। পুরো রুমে স্প্রে করে গোলাপের স্মেলটা দূর করে ফেলে। দ্রুত বের হলো শ্রাবণ। মেঘকে নিয়ে আসলো রুমের মধ্যে।
অবাক হলো মেঘ। সব পাল্টে ফেলেছে। গোলাপের কোনো স্মেল পাওয়া গেলো না। ক্লান্ত থাকায় মেঘ মনমরা হয়ে বলে উঠলো,
---- আমি তো কোনো ড্রেসই আনি নাই। এখন ফ্রেশ হবো কিভাবে? এই শাড়িটা পড়ে আর থাকা যাচ্ছে না।
শব্দ করলো না শ্রাবণ। কাবার্ড খুলে বললো,
---- এখানে তোমার পড়ার জন্য জামাকাপড় আছে
যেটা ভালো লাগে পড়তে পারো।
অবাক হলো মেঘ। সাথে সাথে বললো,
---- এতো সব এখানে?
শ্রাবণ এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে ধীর গলায় বললো,
---- বউ শব্দটা যতোটা ছোট, তার দায়িত্ব ঠিক ততোটাই বড়ো। আমি চাই না আমার দিক থেকে তুমি অবহেলিত হও। আমি তোমায় ভালোবাসা বলো অথবা আর্থিক দিক, কোনো দিক থেকেই কষ্ট দিতে চাই না। যতোটুকু জানি ততোটুক অবশ্যই পালন করবো আর যেটুকু জানার অভাব প্লিজ এই বান্দার উপর দয়া করে মুখ ফুটে বলবেন। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবো।
কথাগুলো ভালো লাগলো মেঘের। তবে প্রকাশ করলো না সে। নর্মাল একটা ড্রেস নিলো। ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো মেঘ। শ্রাবণ বেডে বসলো। অপেক্ষা করলো মেঘের জন্য। জীবনটা আজ পরিপূর্ণ লাগছে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো, বিরবির করলো শ্রাবণ,
---- থ্যাংক ইউ, মম অ্যান্ড ড্যাড। অ্যালং উইথ ইউ, আই গট মাই বিলাভড পার্সন ব্যাক টু। আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনিথিং এনিমোর। দেয়ার’স নাথিং লেফট ফর মি টু উইশ ফর। মাই লাইফ ফিলস ফুলফিল্ড টুডে।
কিছুক্ষণ পর মেঘ বেরিয়ে আসলো। শ্রাবণ বেখেয়ালি তাকাতেই খানিকক্ষণের জন্য থমকালো! কি স্নিগ্ধ লাগছে তার প্রিয়তমাকে। ভেজা চুলের পানি ছিটকে পড়তেই ধ্যান ভাংলো শ্রাবনের। বললো,
---- এই অসময়ে শাওয়ার নিয়েছো কেন? ঠান্ডা লাগবে তো।
---- কিছুই হবে না। আমি কোথায় ঘুমাবো? ঘুম পাচ্ছে খুব৷
---- কেন আমার বুকে।
---- কি?
শ্রাবণ খানিকটা থতমত খেলো। সাথে সাথে বললো,
---- কেন আমার পাশে।
---- নাহ! আমি ফ্লোরে শুবো।
---- আমি কি পরপুরুষ নাকি আজব তো!
---- আমি আপনাকে মানি না।
---- কেন দিব্য ভাইয়াকে মেনে নিয়েছো বুঝি?
থেমে গেলো চুল মুছা। তাকালো বিরক্তিকর দৃষ্টিতে
শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণের অগ্নি দৃষ্টি। মেঘ নিজেকে সংযত করলো। বললো,
---- বাজে কথা বলবেন না। আমি হুটহাট কারোর সাথে মিশতে পারি না। মানিয়ে নিতে পারি না। সমস্যা হয় তাই বলছিলাম৷ কিন্তু, আপনি মানুষটা ভিষণ খারাপ। বাজে কথা কিভাবে বলেন?
শ্রাবণ কয়েক পা এগুলো। মেঘ পিছাতে লাগলো। মেঘ আবার ও বলে উঠলো,
---- বিয়ে করেছেন বলে যা কিছু তাই করবেন নাকি? এগুবেন না আমার দিকে।
শ্রাবণ বারণ মানলো না। পিছাতে পিছাতে দেয়ওয়ালে পিট ঠেকলো মেঘের। শ্রাবণ ও এসে থামলো। মেঘকে না ছুঁয়ে দেওয়ালে ভর দিলো। বললো,
---- আমি খারাপ হ্যা আমি খারাপ। কারন নিজের
জিনিস আগলে রাখতে গেলে একটু আধটু খারাপ হতেই হয়। আমি চাই না তুমি আমার থেকে দূরে থাকো। অন্য কারোর কথা ভাবো।
---- আমি তো ভাবতে চাই না আপনি কেন বারবার এখানে দিব্য ভাইয়াকে টানছেন?
শ্রাবণ রাগ দেখিয়ে বললো,
---- কারণ দিব্য ভাইয়া তোমার জন্য মরতে যাচ্ছিলো। আর তুমি তার প্রতি দুর্বল হচ্ছো। আমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছো। তুমি আমার বাড়িতে, আমার রুমে, আমার বেডে, আমার বুকে ঘুমাবে। ট্রাস্ট মি আমি তোমায় কিছুই বলবো না। শুধু এতোটুকুই। রাখবে প্লিজ?
চলবে,,,,,,,,,