#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১২
#কলমে_তাসনিম_লিজা
---- কপি নিষিদ্ধ!
---- হঠাৎ কি এমন হলো যে ওরা আপনাকে এই বন্দি জেলকানায় এনে ফেললো? অপরাধের ধাপ কি পূর্ণ হয়ে গিয়েছে? এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে?
ফাইজা বেগম অপমানবোধ করলেন। ছেলের দিকে তাকান নীরব দৃষ্টিতে। অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে ওনার চেহেরায়৷ কিন্তু, তাকালো না ফাইয়াজ। দৃষ্টি তার অন্যত্রে। ফাইজা বেগম বলেন,
---- ওরা আমার বোনকে মেরে ফেলেছে। আমি কি চুপ করে থাকবো?
হাসলো ফাইয়াজ। এবার তাকালো সে মায়ের মুখ পানে। যে চোখে কেবল ঘৃণা স্পষ্ট। বললো,
---- বোনের জন্য কত মায়া ছিলো আপনার। অথচ ছেলে ধ্বংস হচ্ছিলো সেদিকে আপনার খেয়াল ছিলো না। আর হ্যা, আপনার বোন ওদের কারনে মারা যায়নি। ওনার নিজের রোগ'ই ওনাকে মরতে বাধ্য করেছে। আর আপনি নিজের রাগ বোনের দোহায় দিয়ে ঝাড়লেন নিষ্পাপ একজন মায়ের উপর। এতিম করলেন ছোট্ট বাচ্চাটাকে। তার মধ্যে আমি নিজেকে দেখতে পাই৷ অনুভব করতে পারি তার কষ্ট। ঠিকই আছে, আপনি এখন যোগ্যস্থানেই এসেছেন।
ফাইজা বেগম হতবাক হলেন। বললেন,
---- আমি তোকে আমার কাছে রাখতে চেয়েছিলাম তুইই তো থাকতে চাসনি। এতে আমার কি দোষ?
আমি তোকে ভালোবাসি৷ তুই আমার একমাত্র সন্তান।
ফাইয়াজ বললো,
---- কিভাবে থাকি বলেন? খুনি মায়ের সাথে থাকা যায়? আমার তো আপনাকে মা বলতে লজ্জা লাগে। সন্তান হ্যাহ! আর এখন কি করলেন? দিব্যর জীবনটা শেষ করে দিলেন। আপনি সত্যিই পাথর। আপনার মনে দয়া মায়া কিছুই নেই। তারা দুজন ভাই বোন আপনাকে আপন করে নিয়েছিলো আর আপনি তাদের এই প্রতিদান দিলেন? ছিহ!
কান্না করে দিলেন ফাইজা বেগম। বলেন,
---- আমি কি ভুল করেছি? আমি শুধু চেয়েছিলাম দিব্য বড় ঘরে বিয়ে করবে। ওর সম্মান আদর যত্ন সব পাবে। আমি চাই আমার সন্তানেরা ভালো থাকুক। তোকে কাছে চাইলাম দূরে সরে গেলি। মা হারা দিব্য ও দোয়েলকে আগলে নিয়েছি আপন করে তারাও ভুল বুঝলো আমায়।
---- ভুল করেননি আপনি অন্যায় করেছেন৷ টাকা আর রাগটায় আপনার কাছে আপন আর কিছুই আপনার কাছে ম্যাটার করে না৷ টাকার কারনেই তো আমায় একা ফেলে চলে এসেছেন। আর আজ রাগের কারনে আপনার এই অবস্থা। এখন দেখুন টাকা দিয়ে বাহিরে আসতে পারেন কি না। আমি কোনো অন্যায়কারীকে সাহায্য করতে পারবো না।
মাফ করবেন আমায়।
---- ফাইয়াজ শুন বাবা আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি ভেবেছিলাম ওদের কারনে মারা গিয়েছে আমার বোন। আমি তো শুধু মেঘকে আর তার মাকে সহ্য করতে পারি না। আর নয়তো আমার কাছে তুই দিব্য আর দোয়েল আমার কলিজার টুকরা। আমি তোদেরকে হারাতে চাই না। তোরা আমায় ঘৃণা করিস না। আমি তোদের ভিষণ ভালোবাসি। আমি খারাপ নই। আমি আমার বোনের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি।
কথাগুলো বলতে বলতে জেলকানার সিঁকল হাতরে নিচে বসে পড়লো ফাইজা বেগম কাঁদতে কাঁদতে। অন্যদিকে ফাইয়াজ শুনে ও না শুনার মতো চলে গেলো। অনেক অভিমান মায়ের উপর তার। বাবা মারা যাওয়ার পর মা'ই ছিলো তার সব৷ কিন্তু, মা ছেলের কথা না ভেবে টাকা দেখে দিব্যর
বাবাকে বিয়ে করে। দিব্য দোয়েলের মা রোড এক্সিডেন্টই মারা যায় তৎক্ষনাৎ। তখন দোয়েল বেশ ছোট ছিলো মাত্র এক বছর । জাহাঙ্গীর আহমেদ এর বাবা মা ছিলো না। আর জাহিদ ও বেশ ছোট ছিলো। তার উপর সামিয়াকে নিয়ে তখন পালিয়ে গিয়েছিলো বিয়ে করে। দিশেহারা হয়ে বিয়ে করলো ফাইজা বেগমকে জাহাঙ্গীর আহমেদ । কাজের সুত্রে দেখা হয়েছিলো অফিসে। ফাইজাকে বাড়িতে আনার পর থেকে তিনি সন্তানদের কোনো অবহেলা করেনি। নিজের না বলে অবজ্ঞা করেনি। বরং আগলে রেখেছে মায়ের মতো। বড় হওয়ার পর শাসন ও করেছে। কখনো তারা বুঝতে পারেনি এটা তাদের সৎমা হয়। দিব্য তো মা বলতে পাগল ছিলো। মায়ের কথা মানতো। ফাইয়াজকে আনার কথা বললে জাহাঙ্গীর আহমেদ কখনোই বারণ করেনি। বরং ফাইজা বেগমের ছেলে মেয়ের প্রতি এমন ভালোবাসা দেখে খুশি হন তিনি। ফাইজা বেগম ফাইয়াজকে আনতে চাইলে ফাইয়াজ আসেনি। ধীরে ধীরে মায়ের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিলো। নানু বাড়িতে থাকতো ফাইয়াজ। তাই তার খালামনি কেমন ছিলো সেটা তার খুব ভালো করেই জানা আছে। সামিয়াকে যে ফাইজা বেগম মেরেছে সবটা আড়াল থেকে শুনেছিলো দিব্য। বাবা মায়ের কথোপকথন ও তর্ক শুনে সবটাই শেয়ার করেছিলো ফাইয়াজের সাথে। দিব্য ফাইয়াজের থেকে পাঁচ বছরের ছোট। দিব্য এতোকিছু তখন বোঝেনি তাই কাউকে বলার মতো না পেয়ে ফাইয়াজকেই জানালো। তখন থেকেই ফাইয়াজ আরো দূরত্ব বাড়িয়ে দিলো মা নামক ফাইজা বেগমের সাথে। আজ ও সে আসলো না।
উপায়ান্তর না পেয়ে পুলিশের সাহায্যে কল দেওয়ালো ফাইয়াজের নাম্বারে। বাধ্য হয়ে এসে আবার ও চলে যায় ফাইয়াজ। সে এখন তার বাবার রেখে যাওয়া বিজনেস সামলায়। বাবা মারা যাওয়ার পর দখল করে রেখেছিলো দুই চাচারা।
তখন ছোট বিদায় ভয় পেতো সে। বড় হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে ভুলেনি। বাবার কষ্টের গড়া বিজনেস নিজের আয়ত্তে এনেছে সে। কিছুটা আইনের মাধ্যমে বাকিটা যে পথে গেলে সবাই ভয় পায়। সেই পথেই। মারার হুমকি দিয়ে তার প্রাপ্যটা বুঝে নিয়েছে সে। তার আর পিছু হটার প্রয়োজন নেই। ফাইজা বেগম এককোণে বসে কান্না করেই যাচ্ছেন। সব থেকে ও আজ পাশে কেউ নেই ওনার। কে তাকে মুক্ত করবে? সেকি তার সংসারে ফিরে যেতে পারবে? সন্তানরা কি তাকে আপন করে নিবে আগের মতো? এগুলো ভেবেই আরো ভেঙে পড়ছেন ফাইজা বেগম।
____________________
----- মেঘ মন খারাপ?
মেঘ সোফায় বসে ছিলো স্থির চিত্তে। হয়তো কিছু একটা ভাবছিলো। শ্রাবণ মেঘের প্রয়োজনীয় যা কিছু দোয়েলদের বাড়িতে রাখা আছে ওইগুলো আনতে গিয়েছে। সুমনা রাহমান এসে পাশে বসলেন তবুও টের পেলো না মেঘ। কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলো মেঘ। পাশে তাকাতেই সস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লো। হয়তো ভয় পেয়েছে। সুমনা রাহমান মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
---- ভয় পেয়েছো তুমি?
মেঘ ঘাবড়ে গিয়েছিলো। দ্রুত মাথা নাড়ালো দু'দিকে। বললো,
---- না মা তেমন কিছু না৷ আকস্মিকতায় একটু চমকে ওঠেছিলাম। কিছু বলবেন?
বাড়িতে কেউই নেই। শ্রাবণের বন্ধু গুলো চলে গিয়েছে। সারিফ শিকদার ফের হসপিটালে গিয়েছে। বাকি রইলো মেঘ ও সুমনা রাহমান। মেঘের কথায় সুমনা রাহমান বলেন,
---- আমি জানি আমার ছেলেটা পাগলামি করছে তোমার সাথে। কিন্তু, ও তোমায় ভালোবাসে ও ভয় পায় তোমাকে হারানোর তাই এমন করেছিলো। ওর কথায় মনে কষ্ট পুষে রেখো না কেমন?
---- আমি মন খারাপ করিনি। এমনিতেই একা বসেছিলাম। আপনারা কি সত্যিই কাল চলে যাবেন?
মনমরা হয়ে গেলেন সুমনা রাহমান। বলেন,
---- ছেলের জেদ তার বাবার মতোই। ও এই বাড়ি ছেড়ে যাবে না। আর তোমার বাবা তার নিজ বাড়ি ছেড়ে আসবে না। আবার আমার ওই বাড়ি থেকে হসপিটাল খুবই কাছে। আমি কোথায় যাবো বলো? আমি তো চেয়েছিলাম এতগুলো বছর পর আমরা একসাথে হলাম। একসাথে থাকবো কিন্তু,
তা আর হবে বলে মনে হচ্ছে না।
মেঘের ও খারাপ লাগলো। মানুষ গুলো ভালো। ওরা না থাকলে একা একা লাগবে। কিন্তু, তারই বা কি করার? মেঘকে ভাবতে দেখে সুমনা রাহমান আবারও বলেন,
---- আমরা চলে যাচ্ছি তো কি হয়েছে? তোমরা একে অপরের খেয়াল রাখবে। কেউ কাউকে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিও না। শ্রাবণ কিছু বললে আমায় জানাবা। তবুও আমার ছেলেকে ছেড়ে কোথাও যাবা না। ঠিক আছে?
মেঘ জোরপূর্বক হাসলো। বললো,
---- আচ্ছা মা। আমি যাবো না কোথাও। তবে আপনাদের মিস করবো। আপনার ছেলে কিছু বললে সোজা আপনাদের কাছে চলে যাবো। আর আমার বাবা তো অনেক দূরে থাকে।
হঠাৎ বাবার কথা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো মেঘের। মেঘের সাথে বিয়ে থেকে শুরু করে এই অব্দি একটা কথা ও হয়নি তার বাবার সাথে । তার উপর কি রেগে আছে তার বাবা? সে-ই তো অভিমান করে বসেছিলো। বিয়ে নিয়ে একটা কথা ও বলেনি। এমনকি কাছে এসে বলেনি আমি চাই তুই বিয়েটা কর। আমার কথাটা রাখ। সে তো না করতো না। যে বাবা তার আবদার কখনোই অপূর্ণ রাখেনা সে কি করে তার বাবার আবদার অপূর্ণ রাখবে?
---- অবশ্যই আসবে তুমি। ওটা তে তোমার নানু বাড়ি। রাগ অভিমান কেন ইচ্ছে করলেই চলে যাবা।
বিনিময়ে হাসলো মেঘ। নানা ধরনের পুরনো কথা বলতে লাগলেন সুমনা রাহমান। তার মায়ের স্মৃতি
বিয়ে তাদের মধ্যকার দূরত্ব সব। মেঘ ও মনোযোগ দিয়ে শুনতেছে।
___________________
শ্রাবণ দিব্যদের বাড়িতে যায়নি। জাহিদ আহমেদ
কে শুধু বলেছেন মেঘের বই এবং ফোনটা যেনো নিয়ে আসে। জাহিদ আহমেদ ও সেগুলোই আনে।
দোয়েল ফের হসপিটালে চলে যায়। এবং জাহাঙ্গীর আহমেদ ও জাহিদ আহমেদ ফিরে আসে বাড়িতে। শ্রাবণকে ভেতরে যেতে বলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ কিন্তু, যাইনি সে। বাইরেই বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কিছুক্ষণ পর জাহিদ আহমেদ নিয়ে এলো বেশি কিছু না
একটা প্যাকেট করে নিয়ে এলো। শ্রাবণের হাতে তুলে দিয়ে বললো,
---- আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো বাবা। ও একটু অন্যরকম কিন্তু অনেক ভালো। এতে তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়ে গেলো আমার মেয়েটা আমার উপর
অভিমান করে বসে আছে। আমি ও তার সামনে দাঁড়াতে পারছি না।
শ্রাবণ ভরসা দিয়ে বললো,
---- নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি। আমি আপনার মেয়েকে কখনো কষ্ট পেতে দিবো না। আর হ্যা আপনি আমাদের বাসায় গেলে মেঘ খুশি হবে।
এই বাসায় মেঘের আসা নিষেধ। তাই প্লিজ যাবেন আপনি।
---- অবশ্যই যাবো আমি।
---- আমি তাহলে যাই।
---- সাবধানে যেয়ো।
শ্রাবণ চলে গেলো বাইক স্টার্ট করে। তাকিয়ে রইলো জাহিদ আহমেদ শ্রাবণের যাওয়ার পানে।
যতো টেনশন সব মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের সাথে দেখা করা উচিত ওনার।
_____________________
কলিংবেলের শব্দে তাড়াহুড়ো করে এসে দরজা খুলতেই দেখা মিলল শ্রাবণের ঘর্মাক্ত মুখখানার।
মেঘকে দেখেই ক্লান্ত চেহেরা নিমিষেই হাস্যজ্জল হয়ে গেলো। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
এগিয়ে দিলো মেঘের ফোনটা। বললো,
---- এই নাও তোমার ফোন। আর বইগুলো ও এনেছি।
ফোনটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসলো। ভেতরে আসার জন্য সরে দাঁড়ালো। বললো,
---- ভেতরে আসুন আগে।
শ্রাবন ভেতরে আসলো। সোফায় এনে রাখলো সে বইগুলো। মেঘ কোনো কথা না বলে দ্রুত কিচেনে গেলো। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিয়ে আসলো আগে। এগিয়ে দিলো শ্রাবণের সামনে৷ বললো,
---- আগে পানি খান। আর এতোগুলা বই একসাথে একা আনার কি খুব প্রয়োজন ছিলো?
শ্রাবণের ভালোই লাগছে মেঘের শাসন করা। সে তো তাই চাই। পানির গ্লাস নিলো মেঘের হাত থেকে
অতঃপর পুরো গ্লাস খালি করে আবার ও এগিয়ে দিয়ে বললো,
---- একমাত্র বউ, একমাত্র আবদার করেছে না রেখে যায় কোথায় বলো?
মেঘ স্বাভাবিক ভাবে বললো,
---- তাই বলে একা একা আনবেন?
---- কোনো সমস্যা হয়নি তো।
মেঘ কিছু বলতে নিবে তার আগেই সুমনা রাহমান এলেন ডয়িংরুমে। টি-টেবিলের উপর বই দেখে শুধালেন,
---- এতো বই কার এগুলো?
মেঘ বললো,
---- আমার বই এগুলো মা। দেখুন না এইসব কিছু একা একা ওই বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে।
সুমনা রাহমান মুচকি হাসলেন। বললেন,
---- ছেলে মানুষের জন্য এই কাজ কিছুই না মেঘ।
আচ্ছা শ্রাবণ যা তুই আগে শাওয়ার নিয়ে নে। মেঘ
বইগুলো গুছিয়ে রাখো। আমরা তো বিকেলেই চলে যাবো।
শ্রাবণ মেঘ দু'জনেই অবাক হলো। শ্রাবণ মা বাবাকে অনেক দিন পর পেয়েছে আবার ও চলে যাবেন তারা? মেঘের একা থাকা তাও শ্রাবণের সাথে এটা ভেবেই মন চাচ্ছে বারণ করতে। কাল তো যাওয়ার কথা তাহলে আজ কেন? সুমনা রাহমান শ্রাবণ ও মেঘের মনমরা চেহেরা দেখে বলেন,
---- আমার ইমারজেন্সি যেতে হবে। আর তোর বাবা ও মন খারাপ করে আছে। ভেবেছিলাম একসাথে থাকবো সবাই। কিন্তু, তা আর হলো কই বল?
আজকেই যেতে হবে আমাদের।
---- আর কয়েকটা দিন ছুটি নেওয়া যায় না মা?
মেঘের কথায় সুমনা রাহমান বলেন,
---- না রে মা। আমার যেতেই হবে। ভয় পাবে না আমার ছেলে আছে তো। আমার ছেলে তোমায় আগলে রাখবে। আর শ্রাবণ তুই ওর উপর রাগ দেখাবি না। কোনো ঝামেলা করবি না। না জেনে বুঝে দোষারোপ করবি না। যাই হোক না কেন আগে পুরোটা সত্যি জেনে নিবি তারপর জাজ করবি৷
শ্রাবণ মাথা নুইয়ে ছিলো। এখনো একই ভাবে আছে। সেভাবেই বললো,
---- আমি বুঝেছি মা। কিন্তু, তোমরা না গেলে ও পারতে। দশটা বছরে একটা দিন ও আমাদের সাথে থাকার মতো তোমাদের সময় থাকে না? এতো টাকা দিয়ে কি করবে তোমরা বলো তো?
বাবা জব করে দাদুর ফ্যাক্টরি থেকে মাসে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আসছে তুমি ও করছো মানে সুন্দর সময় সম্পর্ককে নষ্ট করে টাকা দিয়ে কি করবে?
বুড়ো বয়সে খাবে বলে? তেমাদের কি ছেলে নেই?
নাকি ধরে নিয়েছো সে মারা গিয়েছে?
---- শ্রাবণ কি বাজে বকছিস?
---- আমি ঠিকই বলেছি। আমার উপর তোমাদের ভরসা নেই। যে সময় আমার পাশে তোমাদের প্রয়োজন ছিলো সেই সময় তোমরা টাকার পিছু ছুটেছো। ভাবোনি আমি একা একা কষ্ট পেতাম।
মায়ের ভালোবাসা বাবা আদর স্নেহ কেমন তা আমি সত্যিই জানি না। দাদু আগলে না রাখলে আমি হয়তো ভুল রাস্তায় চলে যেতাম। আমি ও বোকার মতো কিসব বলছি বলো তো? ছোট থাকতেই দূরে থেকেছো এখন আমার কারোর প্রয়োজন নেই এখন না আসলে ও চলবে। যেতে পারো তোমরা আজই। আমাদের নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না। আমি বাবা নই যে রাগের মাথায় দূরে সরিয়ে দিবো। আমি শ্রাবণ শিকদার! হারিয়ে
অভ্যস্ত সে, তাই খুব ভালো করেই আগলে রাখতে জানে আপনজনদের। মেঘ রুমে আসো তো একটু।
শ্রাবণ সুমনা রাহমান কে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। মেঘ দু'জনের দিকেই বার বার তাকাচ্ছে। শ্রাবণের অসহায়ত্ব খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে সে। সুমনা রাহমান কান্না করছেন নিঃশব্দে। মেঘ কি বলবে বুঝতে পারলো না। সে রুমের দিকে এগুলো। শ্রাবণের মনে কষ্ট জমে আছে তাই তো সব উগ্রে দেওয়ার চেষ্টা করছিলো
রাগের তোপে। মা বাবার সাথে থাকাটা অন্যায় না কিন্তু পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সবাই দূরে রয়েছে।
শ্রাবণ রুমে এসে কাবার্ড খুলে নিজের জামাকাপড় বের করলো। মেঘের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজের কাজ করতে করতে বললো,
---- ওনারা চলে যাক তুমি আটকাবা না।
তারপর শ্রাবণ একটা প্যাকেট বের করলো। বেশ বড়সড় প্যাকেটটা দেখে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো মেঘ। কিসের হতে পারে? শ্রাবণ আবার ও বললো,
---- এই প্যাকেটটা মায়ের হাত দিয়ে এসো। জিজ্ঞেস করলে বলবে এতোদিন যাবত আমার একাউন্টে পাঠানো চার ভাগের দুই ভাগ এখানে। আর বাকিটা আমি মায়ের একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছি।
মেঘ অবাক নয়নে তাকালো। প্যাকেটটা হাতে নিলো। এক কেজির থেকে অনেক বেশি হবে। আন্দাজে বলছিলো মনে মনে। প্রশ্ন করলো মেঘ।
---- এতো ওজন এখানে কত টাকা?
শ্রাবণ সহজ ভাবে বললো,
---- বারো লক্ষ টাকা। বাকি বারো লক্ষ আমি একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছি৷ দশ বছরে তিনি আমায় প্রতি মাসে বিশ হাজার করে চব্বিশ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছেন। আমি চেয়েছিলাম তাদেরকে, তাদের টাকাকে না।
---- মা কষ্ট পাবেন তো?
---- কষ্ট পাবেন কেন? আমি তো কষ্ট দেখছি না তাদের। তারা তো এই নোট গুলোর পিছনেই দৌড়াচ্ছে। তারা বরং খুশি হবে।
----- কিন...
শ্রাবণ ওয়াশরুমে চলে গেলো। মেঘের হতবাক দৃষ্টি
শ্রাবণের চলে যাওয়ার পানে। এখন কি করে এগুলো ফিরিয়ে দিবে সে? কেমন লজ্জা লাগছে।
সে নিজে দিলেই তো পারতো। এতো বড় একটা কাজ দিয়ে দিলো। রাগ হচ্ছে মেঘের৷ মা তো কষ্ট পাবে। কি আর করার যেতে লাগলো সুমনা রাহমান এর কাছে।
দরজায় লক করলো তৎক্ষনাৎ। একটু দেরি হলো খুলতে। হয়তো কাঁদছিলেন তিনি। ঠোঁটে হাসি টেনে
বলেন,
---- কিছু বলবে মেঘ?
মেঘ প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে মিনমিন করে বললো,
---- এটা দিতে বলেছে আপনার ছেলে।
তিনি প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
---- কি আছে এতে?
মেঘ স্পষ্ট করে বললো,
---- আপনি ওনাকে যে টাকাগুলো দিয়েছিলেন এই দশবছর যাবত তার হাফ এখানে আর বাকিটা আপনার একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছেন।
চুপ হয়ে গেলো সুমনা রাহমান। চোখরা ছলছল করে উঠলো ওনার। ছেলে তাহলে ভালোই কষ্ট পাচ্ছে। এতো গভীর যে টাকাগুলো ও নেওয়ার আগ্রহ নেই তার। অবশ্য দোষ তো তাদেরই। কি করবেন তিনি? জোরপূর্বক হাসলেন তিনি বললেন,
---- আচ্ছা তুমি এখন যাও।
মেঘ চলে এলো শ্রাবণের রুমে। কি যে হবে এই পরিবারটিতে উপরওয়ালায় জানেন। কোথাও শান্তি নেই। মান অভিমান রাগ ক্ষোভ সবার মনে পুষে রেখেছে যখন ইচ্ছে তা শুধু সম্পূর্ণ করছে।
মেঘের ভাবনার মধ্যে শ্রাবণ বেরিয়ে আসলো। মেঘকে ভাবতে দেখে কয়েক পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
---- মা কিছু বলেছে?
মেঘ তাকালো শ্রাবণের দিকে। বললো,
---- তিনি কষ্ট পেয়েছেন কাজটা আপনি ঠিক করেননি।
শ্রাবণ নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। মিররে মেঘকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে দেখে বললো,
---- আমার কষ্ট কেউ বোঝার চেষ্টা করেছে? আমি তো ভুল করিনি। আমার তো টাকার প্রয়োজন নেই। যা ছিলো তা পাওয়া হইনি। তাই আমার ওই কাগজের নোট গুলোর প্রয়োজন নেই।
---- বিষয়টা টাকার নয় কষ্ট পাওয়ার কথা বলছি আমি।
---- মেঘ এই টপিক এখানেই অফ করো আমার ভালো লাগছে না।
মেঘ কঠিন স্বরে বললো,
---- কেন অফ করবো? আপনি তো দেখছি প্রতিশোধ নিতে উস্তাদ!
চুল গুলো সামান্য আঁচড়ে নিচ্ছিলো শ্রাবণ। মেঘের কথায় মেঘের দিকে তাকালো সে। একদম গম্ভীর স্বরে বললো,
---- মেঘ যা জানো না তা নিয়ে প্লিজ তর্ক করো না।
আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি তোমার সাথে মোটেও তর্ক বা ঝগড়া করতে চাই না।
মেঘ তাচ্ছিল্যের হাসলো। বললো,
---- একটা কথা কি জানেন? যারা যাদেরকে বেশি ভলোবাসে তারাই বেশি কষ্ট দেয়। আঘাত করে।
আপনি ও তার ব্যতিক্রম না বুঝলেন? পাল্টা প্রতিশোধ নিচ্ছেন ভালোবেসে আগলে রাখার বদলে। চেষ্টা না করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।
চলবে,,,,,,