ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

১৩তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১৩

#কলমে_তাসনিম_লিজা

------ কপি নিষিদ্ধ!

মেঘের কথায় শ্রাবণ কোনো প্রত্যুত্তর করলো না।

মেঘ ফের বললো,

---- আপনি খাবেন না?

ফোন হাতে নিয়ে কিছু একটা দেখলো শ্রাবণ। মেঘ

তাকিয়ে আছে শ্রাবনের দিকে। মা ছেলের মনোমালিন্যের কারনে হয়তো সুমনা রাহমান আসবে না বলতে খেতে। তাই মেঘই কথাটা বললো। মেঘের কথায় শ্রাবণ ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো,

---- ইচ্ছে নেই। তুমি খেয়েছো?

মেঘ বললো,

---- না আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমি আর মা। ঠিক আছে আপনার খেতে হবে না। আমি মা'কে বলে আসছি।

শ্রাবণ তাকালো মেঘের দিকে। মেঘ চলে যেতে নিলে হাত ধরে ফেললো তৎক্ষনাৎ। ফোনটা বেডে ছুঁড়লো। সাথে সাথে বলে উঠলো শ্রাবণ,

---- কি বলতে যাচ্ছো তুমি মা'কে ?

মেঘ ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। বললো,

---- মা'কে বলবো যার জন্য অপেক্ষা করেছেন তিনি, সে খাবে না এতে আটকানোর কি আছে? আর ভাববেন না আপনি খাননি বলে আমি না খেয়ে থাকবো অবশ্যই খাবো। আর মা'কে ও খাওয়াবো। কি একটা ছেলে হয়েছে, মা বাবাকে আগলে রাখার চেষ্টা না করে নিজে ও তাদের মতোই আচরণ করছে। আপনাদের মধ্যে তফাতটা কোথায় বলুন তো?

শ্রাবণ মেঘকে আরো কাছে টেনে নিলো। কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব কেবল। চেহেরায় স্পষ্ট গাম্ভীর্য। ভারী গলায় বললো,

---- মেঘ বিষয়টা আমার, তুমি কেন এমন করছো?

আমি তো ওনাদের রাখতে চেয়েছি। ওনারা থাকছে কোথায় বলো?

মেঘ দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে সাথে রেগে বলে উঠলো,

---- আপনি ও তো কম নই। বাবা মায়ের সাথে আপনার নিজের বাড়িতে যাচ্ছেন না কেন? আমি চাই সবাই একসাথে থাকুন। আর বিষয়টির সাথে আমি ও ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে আছি। নিজের জেদ বজায় রাখতে চাচ্ছেন। অথচ, অন্য কারোর জেদ সহ্যই হচ্ছে না আপনার। আপনি তো বড্ড স্বার্থপর মানুষ।

মেঘের কথায় রাগ হলো শ্রাবণের। রাগের তোপে আচমকাই নিজের কাছে ঠেনে নিলো একদম। মুখোমুখি তারা দু'জন। শ্রাবণ কিছুটা ঝুঁকে আছে তীক্ষ্ণ চাহনি তার। মেঘ ও বিরক্ত হচ্ছে। বুঝতে পারছে না শ্রাবণের ভাবগতি। মেঘ বিরক্তকর স্বরে বললো,

---- ছাড়ুন তো আমায়।

শ্রাবণ রাগের কারনে ছাড়লো না বরং আর একটু শক্ত হলো হাতের বাঁধন। হাতে ব্যাথা পাচ্ছে মেঘ।

শ্রাবণ হিসহিসিয়ে বললো,

---- আমি ওনাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। ওরা আমায় ভালোবাসে না ভাসেনি কখনো ৷ যদি বাসতো ওরা আমার মরণাপন্ন অবস্থাতে ও আমায় একা ফেলে নিজেদের রাগ দমিয়ে আমার কাছে আসতো। কিন্তু, তারা নিজেদের ইগো নিয়ে এতোই পসেসিভ যে আমি তাদের কে হই তা-ই ভুলে গেলো। দাদু ভাই এখানে এই ফ্ল্যাটে থাকতো। আমি সারাজীবন এখানেই থাকবো। কোথাও যাবো না আমি। তুমি ওদের হয়ে আমায় ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা বলছো? ওই বাড়িতে আমার বিষাক্ত কিছু স্মৃতি আছে যা আমায় মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে। যা আমি মনে করলে নিজেকে সামলাতে পারি না। বাবা মায়ের সাথে বাজে বিহেভিয়ার করি। মনে হয় তারা আমার কেউ না। আমার মাথা কাজ করে না। আমি কি করবো বলো বলো মেঘ? আমি কি তোমায় নিয়ে বাঁচতে পারবো না? আমার অপরাধ কোথায়? তারা জেনেশুনে সব ভুলে থাকতে পারলে ও আমি মেনে নিতে পারিনা। আমি শুধু চেয়েছিলাম তাদেরকে আর তোমায় নিয়ে বাঁচতে। তারা চলে যেতে চাচ্ছে যাক। তুমি আটকাবা না। আমি আর তুমি আমরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে বাঁচবো। আমাদের কারোর প্রয়োজন নেই। মায়ের দরকার নেই তোমার। মা নেই এই সত্যিটা মনে রাখবা সবসময় আন্ডার্স্ট্যান্ড ?

মেঘ হতভম্ব! কথাগুলোর থেকে শ্রাবণের মুখের এক্সপ্রেশন দেখেই ভয় পেয়ে যায়। তাও চোখের সামনে একদম। কথাগুলো সত্যি। শ্রাবণ বাবা মায়ের ঝগড়া আলাদা থাকা প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিলো। ভয় পেতো বাবা মা বলে ডাকতো। তার এতোটাই মগ্ন তাদের ঝগড়া আর জব নিয়ে ছেলের কথা ভুলেই বসেছিলো। শ্রাবণ একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো। তাকে অদ্ভুত ভয় ঘীরে রেখেছিলো। তখন শ্রাবণের দাদু শ্রাবণকে নিয়ে তাদের বাড়ি থেকে এই নতুন তৈরি করা বিল্ডিংয়ের একটা ফ্ল্যাটের উঠেন। সেখানেই শ্রাবণের চিকিৎসা হয়। আস্তে ধীরে ঠিক হয়ে উঠে আর তার দাদুর সাথে এখানেই থেকে যায়। তবে পুরনো কথা মনে হলে অন্যরকম হয়ে যায় শ্রাবণ। নিজেকে কন্ট্রোল রাখার তীব্র চেষ্টা করে সে। এখন মা বাবা একসাথে ভালো আছে দেখে ততোটা খারাপ লাগেনি কিন্তু, মেঘের অতিরিক্ত বলাতে পুরনো কথার ফুয়ারা ছুটলো শ্রাবণের। রাগ নিবারন করা মুশকিল হয়ে গেলো তার।

মেঘ শান্ত স্বরে বললো,

---- আমার লাগছে ছাড়ুন প্লিজ!

শ্রাবণ ছেড়ে দিলো তৎক্ষনাৎ! বসে পড়লো সে বেডে। দু'হাতে কপাল হাতরে চুলগুলো খামছে ধরলো। মাথা নুইয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো কিছুক্ষণ। মেঘ গেলো না দু'হাতের বাহু ব্যাথায় টনটন করে উঠলো। দাঁড়িয়ে রইলো সে। শ্রাবণ আহত দৃষ্টিতে তাকায় মেঘের দিকে, যে নিজের হাতের ব্যাথায় নাক মুখ কুঁচকে ফেলেছ। বার বার হাতে হাত বুলাচ্ছে। শ্রাবণ দাঁড়ালো। ফের কাছে এসে অপরাধী গলায় বললো,

---- সরি মেঘ আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি। প্লিজ! আমি বুঝতে পারিনি...

মেঘ থামিয়ে দিলো। বললো,

---- আমি কিছু বলেছি আপনাকে? আপনি খেতে আসুন। নয়তো আমাদের খাওয়া ও হবে না। বাবা বাইরে খাবেন বলে মা কে জানিয়ে দিয়েছেন। চলে গেলো মেঘ বাইরে। শ্রাবণ দেওয়ালে ঘুসি মারলো। রাগ হচ্ছে অনেক। নিজের উপর না তাদের উপর বুঝলো না। যতো কিছুই হোক না কেন মধ্যে থেকে মেঘ কেন কষ্ট পায়? নিজেকে অপরাধী লাগছে শ্রাবণের।

মেঘ যতোটুকু চিনেছে তাতেই অনেক। মেঘ খাবার

গরম করলো ফ্রিজ থেকে বের করে। সুমনা রাহমান মেঘ খেতে পারেনি বলে, আলাদা করে রান্না করে রেখেছেন। সব টেবিলে এনে সাজিয়ে রাখতেই অবাক হয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে। ডাইনিং টেবিলে এসে উপস্থিত সে সবার আগে। স্থির হয়ে বসে আছে। মেঘ কোনো কথা না বলে খাবার গুলো রেখে সুমনা রাহমান এর রুমের সামনে এগিয়ে গেলেন। দরজা খোলা তাই সামান্য উঁকি দিলো। সুমনা রাহমান বসে কিছু একটা করছিলেন। বাইরে থেকেই মেঘ বললো,

---- মা আসবো?

সুমনা রাহমান চমকে হাতে থাকা কিছু একটা আড়াল করে ফেললো তৎক্ষনাৎ। ফিরে তাকালো দরজার দিকে। বললো,

---- অনুমতি নিতে হবে না ভেতরে আসো। কিছু বলবে?

কয়েক পা বাড়ালো মেঘ। থেমে গেলো আবার। বললো,

---- খাবেন না?

---- আমার ইচ্ছে করছে না মেঘ। তুমি আর শ্রাবণ খেয়ে নাও। নতুন এসেছো আর দেখে কোথায় আমি তোমায় ডেকে খাওয়াবো আর তুমি আমায় ডাকছো। কাজ করছো।

মেঘ কাছ আসলো সুমনা রাহমান এর। হাত ধরলো সাহস করে। বললো,

---- আমার তো মা নেই। মা না থাকার কষ্টটা আমি বুঝি মা। আমি কাজকর্ম মোটামুটি পারি। আর এটা তো পরের বাড়ি না। আমি থাকতে মা'কে কেন কাজ করতে হবে? আপনার ছেলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। প্লিজ চলুন।

সুমনা রাহমান বলেন,

---- ও আমার উপর রেগে আছে মেঘ। ওকে আমরা অনেক কষ্ট দিয়েছি অবহেলা করেছি। ও তো রাগ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, আমি আর ওর সামনে যেতে চাচ্ছি না। শ্রাবণ আমায় দেখলে আরো কষ্ট পাবে। আমাকে বরং খাবার পাঠিয়ে দাও। আমি রুমেই খেয়ে নিবো।

---- একসাথে খাই?

---- আমি ঝামেলা চাচ্ছি না মেঘ।

মেঘ সায় দিলো। বাইরে চলে এলো। ডাইনিং স্পেসে আসতেই শ্রাবণের কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

---- আসেনি তাই না?

মেঘ বললো,

---- আসেনি এমন না। মা রুমে খাবে। আমি দিয়ে আসছি।

মেঘ শ্রাবণের প্লেটে খাবার দিয়ে শাশুড়ীর জন্য খাবার বেড়ে নিলো। দ্রুত দিয়ে আসলো শাশুড়ীর রুমে। সুমনা রাহমান এর কথায় বেড সাইড টেবিলের উপর রেখে আসলো। শ্রাবণ খাচ্ছে না। মেঘ জিজ্ঞেস করলো,

---- খাচ্ছেন না কেন?

শ্রাবণ স্বাভাবিক ভাবে বললো,

---- আমার পাশে বসো।

মেঘ বাধ্য মেয়ের মতো শুনলো বসলো। শ্রাবণ ভাত মেখে সকালের ন্যায় মুখের সামনে তুলে ধরলো।

মেঘ তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,

---- আমি খেতে পারবো তো।

শ্রাবণ মেঘের ডান হাতটা ছোঁ মেরে নিজের সামনে এনে মেলে ধরলো। হাতের এক আঙুলের মাথায় লাল হয়ে গিয়েছে। ফর্সা হাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। শ্রাবণ দেখেছিলো আগেই রুম থেকে বের হওয়ার সময়। তখন আবার ও রুমে যায় সে অয়েন্টমেন্ট আনতে। এখন বের করলো। বললো,

---- হাতের এই অবস্থা করে খেতে পারবে?

মেঘ কিছুই বললো না চুপ করে রইলো। শ্রাবণ বা হাতেই সুন্দর করে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিলো।

বললো,

---- কোনো কথা শুনতে চাইনি। খেয়ে নাও ঝটপট!

আমায় আবার বের হতে হবে।

মেঘ খাচ্ছে বাধ্য হয়ে। তবে ভাবনায় মগ্ন সে অনত্রে

মা বাবা চলে যাবে আর শ্রাবণ বাইরে বের হয়ে যাবে? যাওয়ার সময় পাশে থাকবে না? রাগটা অনেকটায় গভীর বুঝতে পারে মেঘ ৷ বলে,

---- আপনি কি বাবা মার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেন?

তাকালো শ্রাবণ মেঘের দিকে পলকহীন। মেঘ ভয় পেলো। উল্টাপাল্টা তো আর বলেনি সে। শ্রাবণ বললো,

---- তাদের চলে যাওয়া আমার জন্য কতটা কষ্টকর

সেটা কেবল আমিই জানি। চোখের সামনে দেখতে চাচ্ছি না। ওনারা চলে গেলে আমাকে জানাবে আমি চলে আসবো।

খাওয়া শেষে উঠে পড়লো শ্রাবণ। হাত ধুইয়ে রুমে না গিয়ে বাইরে চলে গেলো সে৷ মেঘ দরজা লক করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সব গুছিয়ে রুমে চলে যায়। কিছুই ভালো লাগছে না। ওইদিকে না জানি কি অবস্থা। বাবা কি করছে এখন? কল দিতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। বেলকনিতে গিয়ে কল দিল বাবার নাম্বারে। কিছুক্ষণ রিং হতেই কল রিসিভ করলো জাহিদ আহমেদ। খানিকক্ষণ নিরবতা বয়ে গেলো দুজনের দিক থেকে। মেঘ চুপ থাকতে পারলো না। বাবা বোধহয় কথা বলতে চাচ্ছে না। মেঘ বললো,

---- আসসালামু আলাইকুম বাবা। আমার সাথে কি রাগ করেছো? কোনো ভুল করেছি আমি?

ওপাশ থেকে নরম স্বরে বলেন জাহিদ আহমেদ।

---- ওয়ালাইকুম আসসালাম আম্মাজান। আমি রাগ করেনি। আমি তোকে অনেক ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছি। নিজেরই নিজের উপর রাগ হচ্ছে। তোর উপর জোরপূর্বক নিজেদের ইচ্ছে চাপিয়ে দিয়েছি। সেই জন্য কথা বলতে সাহস করতে পারছিলাম না।

---- আমি রাগ করিনি বাবা। আমি জানি তুমি যা

করেছো আমার ভালোর জন্যই করেছো। আর আমি ভুল নয় সঠিক মানুষটাকেই পেয়েছি। তুমি অযথা নিজেকে অপরাধী ভেবো না। আমি ভালো আছি। আর সবচেয়ে বেশি ভালো থাকবো যদি আমার বাবা ভালো থাকে।

খুশি হলেন জাহিদ আহমেদ। মনটা হালকা হলো ওনার। ফের মেঘ বললো,

---- আচ্ছা বাবা দিব্য ভাইয়া এখন কেমন আছে?

ভয়ের কোনো কারন নেই তো? আর দোয়েল আপু ও কোথায়? ওরা সবাই ঠিক আছে তো?

নিমিষেই টেনশন এসে ঘিরে ধরলো জাহিদ আহমেদ কে। তিনি চিন্তিত কন্ঠে বলেন,

---- ওরা ভালো আছে আম্মাজান। আমি চাই তুমি

ওদের কথা ভেবো না। আমি আছি তো। আর হ্যা শ্রাবণ যা বলবে তাই শুনবে। ওরা সবাই ভালো মানুষ। হ্যা এটা ঠিক সারিফ ভাইজান আর ভাবির মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। এখন তোদের বিয়ের উসিলায় সব ঠিক হয়েছে।

মেঘ বুঝলো তাহলে তাদের বিয়ের কারনে তারা দুজন এক হয়েছে। শ্রাবণ এজন্যই আরো বেশি রেগে আছে। তার জন্য না বরং মেঘের বাবার কথার জন্য।

---- আচ্ছা বাবা আমি সব শুনবো। আর তুমি নিজের খেয়াল রেখো। সুযোগ পেলে আসবে কিন্তু?

---- আচ্ছা আম্মাজান আমি কালকেই আসবো।

টেনশন করিস না। তোর বড়বাবা একা তাই পাশে থাকতে হচ্ছে।

---- আচ্ছা তাহলে রাখছি।

---- আচ্ছা আম্মাজান।

ফোনটা রেখে রুমে এসে বসে বইগুলো শ্রাবনের বুকসেল্ফে রেখে দিলো সাজিয়ে। এখন অপেক্ষা সারিফ শিকদার কখন আসবেন। তারা তো চলে যাবেন। সেই বিষাদময় দৃশ্যটা কিভাবে দেখবে সে?

__________________

---- আপনি এখানে? দেখতে এসেছেন আপনার মা আমায় ও ধ্বংস করে দিলো। মা ভেবেছিলাম, ভরসা করেছিলাম। সত্যি আমি বোকা তাই না ফাইয়াজ ভাইয়া?

দিব্যর কথায় ফাইয়াজ দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বললো,

---- দোষ তো মিসেস ফাইজা আহমেদের নয়। দোষ তো তোমার। যে মানুষটা ছেলে মেয়ের ভালো মন্দ না বুঝে নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দেয়, মৃত্যুর হুমকি দেয়, মরতে বাধ্য করে সে আবার ভরসার মানুষ হয় কি করে? আমি তোমার সাথে সহমত হতে পারছি না দিব্য। যাই হোক! সব ভুলে যাও। নিজেকে অবহেলা করা নিছকই বোকামি ছাড়া কিছুই না। সুস্থ হও তাড়াতাড়ি।

দিব্য ম্লান হাসলো। বড় ভাইয়ের মতো সবসময় সাপোর্ট করে ফাইয়াজ। দিব্য বললো,

---- অবশ্যই ভাইয়া। সুস্থ তো হতেই হবে। আপনি বসুননা। দোয়েল আসেনি?

ফাইয়াজ বসলো চেয়ার টেনে। দিব্যর হাত ধরে বললো,

---- এই যে ভুলভাল কাজ করো দোয়েল যে কষ্ট পাচ্ছে সেটাকি বুঝো?

---- আর এমন হবে না।

---- মনে থাকে যেনো। দোয়েল এসেছে সে একটু রেস্ট নিচ্ছে। আমার সাথে দেখা হয়েছিলো। আসতে চেয়েছিলো আমি-ই বারণ করে দিয়েছি।

দিব্য কিছু একটা ভাবলো। অতঃপর বললো,

---- আপনি কি গিয়েছিলেন থানায়? কি অবস্থা ওনার? নিশ্চয়ই কাঁদছিলেন? আপনি কি বের করার ব্যবস্থা করেছেন?

ফাইয়াজের স্বাভাবিক চেহেরাটা মুহুর্তের মধ্যে অস্বাভাবিক হয়ে গেলো। অতঃপর রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,

---- কোনো খুনিকে আমি কেন ছাড়ানোর চেষ্টা করবো? সাহায্য অবশ্যই করবো শুধু ভালো এবং অন্যায়ের পার্থক্য বুঝে। ওনি অন্যায় করেছেন। ওনার পানিশমেন্ট অবশ্যই পাওয়া উচিৎ। তার একটা অন্যায়ের কারনে একটা প্রাণ চলে গেলো। আর আমি তাকে কেনো সাহায্য করবো? মা বলে কি অন্যায় করে বেঁচে যাবে? আইন সত্যের পক্ষে।

দিব্য আর কিছুই বললো না। কথাগুলো তো ঠিকই

ভুল তো কিছুই বলেনি ফাইয়াজ। ওনার শাস্তি পাওয়া উচিৎ। তারা আরো কথোপকথন চালিয়ে যেতে লাগলো।

____________________

---- কি ব্যাপার তাসির আসেনি কেন?

শ্রাবণের কথায় রাতুল বললো,

----- ওর নাকি জরুরি কোনো কাজ আছে তাই আসেনি। বাই দা ওইয়ে, বউ রেখে এখানে কি করছিস তুই? আর ডেকেছিসই বা কেন?

শ্রাবণের মুখখানা থমথমে। বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে।

রাতুলের কথার জবাব দিলো না সে। অন্য কথা বলে উঠলো,

---- তাসির আসলে বলবি আমার সাথে যেনো দেখা করে। আমি আসছি এখন।

---- চলে যাবি?

রামিমের কথায় শ্রাবণ বাইক স্টার্ট করতে করতে বললো,

---- হ্যা যেতে হবে। পরে দেখা হবে আসি।

চলে গেলো শ্রাবণ। বুঝলো না তারা তিনজন হঠাৎ কি হলো শ্রাবণের? কিছুই তো খোলাসা করে বললো না। রিফাত বললো,

---- আমি শিউর আন্টি আংকেল কে নিয়ে ডিপ্রেসড শ্রাবণ। আমাদেরই বা কি করার বল? যেখানে ছেলের কথা বাবা মা শুনছে না সেখানে আমাদের কথা শুনবে?

---- সবাই একসাথে হলেই ভালো। ছেলেটা উপর দিয়ে যতোটা ভালো, ভেতর থেকে ততোটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে।

---- আমরা আর থেকে কি করবো বল? মহান গুরু দুজনের কেউই নেই।

রাতুলের কথায় রামিম ও রিফাত বাইক স্টার্ট করলো। বললো,

---- তাহলে যাওয়া যাক! অজানা গন্তব্যে। স্টার্ট নাও!

তিনিজনেই বাইক নিয়ে বের হয়ে গেলো ঘুরতে।

__________________

সারিফ শিকদার আসেন বাসায়। সুমনা রাহমান ইতিমধ্যে তাদের সাথে আনা জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়েছেন। মেঘ মন খারাপ করে দাাঁড়িয়ে আছে। দেখছে শুধু দুজন মানুষের থমথমে মুখখানা। তারা ও খুশি হয়নি নিজেদের ছেলে আর ছেলের বউকে একা রেখে যেতে। বাবা ছাড়বে না ওইবাড়ি, আর ছেলে ছাড়বে না এই বাড়ি। সারিফ শিকদার লাগেজটা নিয়ে মেঘের সামনে আসলেন। মলিন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

---- মেঘ মামুনি শ্রাবণ কোথায়?

মেঘ তাকালো দুজনের দিকে। একদিনেই কেমন আপন করে নিয়েছেন। আর আপনই তো মামা মামি হন তারা। মেঘ বিষন্ন স্বরে বললো,

---- আপনারা চলে যাবেন বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। আপনাদের ফিরে এসে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না আপনার ছেলে।

----- থেকে গেলে হয় না?

সুমনা রাহমানের বিষাদমাখার কন্ঠস্বর। কেবল অনুরোধ! সারিফ শিকদার বলেন,

---- আমি চেয়েছিলাম ছেলে আর ছেলের বউ আমার বাড়িতে থাকুক কিন্তু, শ্রাবণ তো তা চাচ্ছে না। এতে আমার কি করার?

---- আমি বলতে চাচ্ছি আমি এই বাড়িতেই থাকতে চাই৷ আমার ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে। আর নিতে পারছি না আমি। ওর হাহাকার আমার মনে তীব্র আঘাত করে। অপরাধী লাগে আমার নিজেকে। মা হয়ে সন্তানকে শুধু দূরে সরিয়ে রেখেছি আমি আর পারবো না।

মেঘ খুশি হলো। না গেলেই ভালো হবে। সারিফ শিকদার তার কথায় অটুট। বলেন,

---- তাহলে আমি যাই। তুমি এখানেই থাকো। শ্রাবণ খুশি হলে আর কি চাই তোমার?

---- আমি আপনাকে নিয়ে আমার ছেলের কাছে থাকতে চাচ্ছি।

আগের ন্যায় সারিফ শিকদার বলেন,

---- আমি তো চেয়েছিলাম। কিন্তু, তোমার ছেলে তা চাচ্ছে না তো।

---- বাবা থেকে যান না? দুজনের জেদ বজায় রাখলে দিনশেষে কেউই ভালো থাকতে পারবেন না। প্লিজ বাবা। সন্তানের জন্য এইটুকু করা কি খুব অন্যায় হবে? এটা তো অন্যায়ের পর্যায়েই পরে না।

লাগেজটা হাত থেকে খসে পড়লো সারিফ শিকদার এর। বিনিময়ে হাসি ফুটলো মেঘে ও সুমনা রাহমান এর। মেঘ ছুটে এসে লাগেজটা নিয়ে নিলো। একপাশে রেখে কৃতজ্ঞতা স্বরুপ বললো,

---- ধন্যবাদ বাবা আপনার ছেলে অনেক খুশি হবে।

---- তাহলে আমার ইচ্ছে পূর্ণ হলো। আমি ও আমার ছেলের জন্য জবটা ছেড়ে দিবো। এটাই আমার ফাইনাল ডিসিশন। টাকার পিছনে ছুটে ভালোবাসা মায়া মমতা কিছুই পায়নি আমার ছেলেটা।

সারিফ শিকদার বলেন,

---- তোমার ইচ্ছে। আমি চাই সবাই ভালো থাকুক।

রুমে চলে গেলেন সারিফ শিকদার। আনন্দে জড়িয়ে ধরলো মেঘ সুমনা রাহমানকে। আনন্দটা বিশেষ করে নিজের জন্যে। মা পাবে সে। মায়ের আদরের অভাববোধ বোধহয় জীবনের সবচেয়ে বড় অভাব।

আজ তা পূর্ণ হলো মেঘের।

---- অনেক অনেক ধন্যবাদ মা। আমি অনেক খুশি হয়েছি আজ।

দু'হাতে আগলে নিলেন সুমনা রাহমান মেঘকে। বুঝেছেন তিনি। বলেন,

---- দু'জনেরই মায়ের উপর রাগ ছিলো মিটেছে এবার? খুশি তো?

---- অনেক খুশি মা। আপনার ছেলে ও অনেক খুশি হবে। আপনার জন্য আমার হাতে ব্য...

থেমে গেলো মেঘ। অতিরিক্ত আনন্দে আত্মহারা হয়ে শ্রাবণের সাথে ঘটে যাওয়া দুপুরের কাহিনিটা মুখ ফস্কে বের করে নিজেই জিভে কামড় বসালো।

---- কি শ্রাবণ তোকে হাতে ব্যাথা দিয়েছে? কি করেছে ও? আসুক আজ ও।

মেঘ তাড়াহুড়ো করে বললো,

---- না না মা ওনি কিছুই করেনি। মা'মানে হাত জোর করে অনুরোধ করেছে আপনাদের যেনো আটকানোর চেষ্টা করি।

মৃদু হাসলেন সুমনা রাহমান। বলেন,

---- আচ্ছা আমরা তো যাচ্ছি না এই খুশি খবরটা তাকে জানিয়ে দাও। নয়তো বাড়িতে আসবে না।

মেঘের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসলো। বললো,

---- না মা জানানো যাবে না সারপ্রাইজ। বলবো চলে গিয়েছে এসে সারপ্রাইজ হয়ে যাবে।

---- ঠিক আছে আমি তাহলে এগুলো আবার গুছিয়ে রাখি। তুমি রুমে যাও পড়তে বসো।

---- জ্বি মা।

কাজের আন্টি আসেনি। শ্রাবণের বিয়ের দিন সকালে দু'দিনের ছুটি নিয়েছেন তিনি। গতকাল আর আজ আসেনি। কালকে আসবে।

__________________

---- আপনি এখানে?

তাসির পাশে এসে বসলো নিঃশব্দে। বললো,

---- দেখতে আসছিলাম দিব্য ভাইয়াকে। ঘুমিয়ে আছে।

দোয়েলের মন ভার! সে বললো,

---- সব কিছু হয়েছে আপনার বন্ধুূর জন্য। তারা যদি র্যাক নাম কুৎসিত কাজটা না করতো তাহলে আজ হয়তো আমার ভাইয়া এখানে থাকতো না। আর না শ্রাবণ ভাইয়ার সাথে মেঘের দেখা হতো!

তাসির বুঝতে পারলো দোয়েল তাদের উপর বেশ রেগে আছে। কিন্তু, তাদেরই বা দোষ কোথায়? তারা কি জানতো এমন কিছু হবে? হয়তো ভাগ্যে ছিলো শ্রাবণ মেঘের। তাই তো পবিত্র বন্ধণে আবদ্ধ হলো তারা দুজন। তাসির সুন্দর করে গুছিয়ে বললো,

---- দেখো দোয়েল আমরা চাইলে সবাই কে-ই দোষারোপ করতে পারি। কালকে থেকে আজ অব্দি যা দেখলাম, বুঝলাম, তাতে দিব্য ভাইয়ার এহেন অবস্থার জন্য তাদের দোষ দেওয়াটা আমি ভুল মনে করছি। তোমার মা বাবা চাইনি। তোমার ভাই প্রতিবাদ করেনি। ভালোবাসলে প্রিয় মানুষটার হাত শক্তপোক্ত করে ধরতে হয়। নইলে মৃত্যু অব্দি হাতে হাত রেখে বাঁচার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যাবে। যেমনটা দিব্য ভাইয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছে। হ্যা সে ভালোবাসে। সত্য তার মায়া। কিন্তু, আগলে রাখার মতো সাহস সে করতে পারেনি।

---- চুপ করুন আপনি। আপনি জানেন? ভাইয়াকে মেঘকে মারার ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রেখেছে। আর মেঘ বেঁচে আছে কিন্তু, অন্যের হয়ে। আর আমার ভাইয়া সহ্য করতে পারেনি অন্যের সাথে তাই তো এমন জঘন্য একটা কাজ করতে গিয়েছিলো। কতটা অনুভূতি শূন্য হলে মানুষ এমন করতে পারে? আদোও ভালোবাসা বুঝেন? কাউকে ভালোবেসেছেন?

তাসির পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে অশ্রুশিক্ত দোয়েলের চোখ পানে। এ যেনো বৃষ্টির ফোয়ারা

ছুটেছে। ইচ্ছে করলো ছুঁয়ে দিতে সেই বৃষ্টির কার্নিশে। চেয়ে ও পারলো না সাহসে কুলালো না তাসিরের। সে শুধু বললো,

---- কাঁদবে না দোয়েল। ভালো না বাসলে কি ভালোবাসার মানে বুঝা যায় না? তাহলে তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?

থেমে গেলো দোয়েলের কান্না। তাকালো স্থির দৃষ্টিতে। জবাব দিতে পারলো না। মাথা নত করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলো দোয়েল । তার নত হওয়ায় তার মুখের উত্তর বলে দিচ্ছে। তাসির ক্ষীণ হাসলো। ফের বললো,

---- নিজেকে সামলাও দোয়েল। নিজে এমন ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদলে তোমার ভাই তো আরো কষ্ট পাবে। তোমার বাবা ও কষ্ট পাচ্ছেন৷ এখন তোমার উচিত সবার খেয়াল রাখা। বুঝলে? সব ভুলে যাও।

---- আপনাকে বুঝাতে হবে না। আপনি চলে যান।

---- চলে তো যাবোই। তবে একদিন নিয়ে চলে যাবো একেবারে, যেনো ফিরে আসতে না হয়।

তাসিরের আনমনে বলা কথাগুলো দোয়েল বুঝলো না সাথে সাথে বলে উঠলো ভ্রুঁ কুঁচকে,

----- মানে?

থতমত খেলো তাসির। তাড়াহুড়ো করে বললো,

---- কিছু না। খেয়েছো?

দোয়েল রাগ দেখালো। বললো,

---- আপনি কে? আপনাকে বলতে যাবো কেন শুনি?

---- আমি কে? কিছু হতে কতক্ষণ?

---- মানে কি সব আবোলতাবোল বলতে এখানে আসছেন আপনি?

তাসির নিজের কথায় নিজেই বারবার অবাক হচ্ছে

কথা এড়িয়ে যেতে বললো,

---- সরি। আচ্ছা আমি তাহলে আজ যাই। আবার আসবো।

দোয়েলের ঝটপট উত্তর,

---- আসতে হবে না আপনাকে।

তাসির যেতে যেতে বললো

---- আমার দরকার না চাইলে ও আসতে হবে। হসপিটালেই সুযোগ টিকিট বিহীন আসার ।

কথার মানে সব মাথার উপরে দিয়ে গেলো দোয়েলের। পাগল টাগল হলো নাকি? আগে তে এমন ছিলো না। বড় ভাইয়ের মতো দেখলে সালাম দিলে সুন্দর করে উত্তর দিতো সালামের। আর এখন বাকি তিনটের মতো বিহেভিয়ার করছে। ধ্যাত!

____________________

মেঘ কল দিয়ে জানালো সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান চলে গিয়েছেন। শ্রাবন ফিরে আসে তবে মুখটা ফ্যাকাশে। চোখগুলো লাল টকটকে। মেনে নিতে পারেনি তারা চলে যাবে। মেঘ দরজা খুলতেই শ্রাবন কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চলে যেতে নিলে মেঘ পিছন থেকে বলে উঠলো,

---- মা বাবার জন্য কান্না করেছেন তাই না?

শ্রাবণ রেগে বললো,

---- আমার মা বাবা কেউ নেই। আমি তাদের জন্য কেন কাঁদবো ? তারা আমার আপন কেউ নই।

---- আপনি অস্বীকার করছেন?

মেঘ সামনে এগিয়ে এলো। শ্রাবণ ফের বললো,

---- আমি নই তারা করছে।

---- আমরা কখন করলাম আজব তো?

---- বুঝলে সুমনা ছেলে আমাদের ত্যাজ্য মা বাবা করে দিতে চাচ্ছে।

শ্রাবণ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো মেঘের দিকে,

চলবে,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন