ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

১৪তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১৪

#কলমে_তাসনিম_লিজা

​---- কপি নিষিদ্ধ

​শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো দুটো প্রিয় মানুষের মুখের পানে। শ্রাবণ সত্যিই ভেবেছিল চলে গিয়েছেন তারা। পাশে মেঘের দিকে তাকায় শ্রাবণ। মেঘ মুচকি হাসলো। অতঃপর বললো,

​---- সারপ্রাইজ! মা-বাবা আজ থেকে আমাদের সাথেই থাকবেন। কোথাও যাচ্ছেন না তারা৷ তার সাথে মা-ও জব ছেড়ে দিয়েছেন।

​শ্রাবণ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় মা-বাবার দিকে। বাবা তো না, মানে থাকবেই না। আর মা তার জব ছেড়ে দিলো? শ্রাবণ নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

​---- আপনারা কি আমার সাথে মজা করছেন? যে ক্যারিয়ারের জন্য মা দূরত্ব বাড়ালো, আপনাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হতো, আজ তার ইতি টানলেন?

​সুমনা রহমান এগিয়ে আসলেন ছেলের দিকে। দুহাতে গাল আঁকড়ে ধরলেন। ওনার কান্না পাচ্ছে ভীষণ। নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে বলেন,

​---- মানুষ সংসার, সন্তান সামলেও জব করে। আর আমি আমার কলিজার টুকরাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম সন্তানের কাছে তার মা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি তোদেরকে সময় দিতে চাই। ছোটবেলা তো আর ফিরে আসবে না, এখন না হয় মিলেমিশে থাকবো। সুখ-দুঃখ একসাথে উপভোগ করবো।

​শরীফ শিকদার আসেন ছেলের আরেক পাশে। বলেন,

​---- সবসময় নিজের ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। অন্যের আনন্দ-ইচ্ছের কোনো মূল্য দিইনি, আর বুঝিওনি। স্বার্থপরতার শেষ ধাপে বোধহয় চলে গিয়েছিলাম। আমরা ভুল করেছি শ্রাবণ। আমি চাই আমরা একসাথে থাকবো। আর তোর ইচ্ছেই পূর্ণ হবে। আমরা এই বাড়িতে হাসি-আনন্দে একসাথে বাঁচবো।

​শ্রাবণ কী বলবে বুঝতে পারলো না। ছেলেমানুষ হয়েও কান্না পাচ্ছে তার। আগলে নিলো দুজনকে দুহাতে জড়িয়ে৷ মায়ের ও বাবার কপালে চুমু খেলো একে একে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘ মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো তাদের অভিমান ভাঙার অন্তিম মুহূর্ত। তখনই হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেন সুমনা রহমান। একহাতে ছেলেকে, আরেক হাতে মেঘকে আগলে নিলেন। বলেন,

​---- এটাই তো আমার শান্তির নীড়। আমি ছেড়ে যাই কী করে বলো তো? কখনোই যাবো না।

​---- আমি তো তোমাদেরকেই চেয়েছিলাম মা-বাবা। টাকা-পয়সা তো চাইনি৷ আর তোমরা কি না টাকা-পয়সাকে আমার চেয়ে বড় মনে করেছ। ঠিক আছে, আমি আর দিচ্ছি না কোথাও যেতে। আমি তোমাদেরকে চাই, আর কিছুই না।

​---- যাবো না আমরা তোদেরকে ছেড়ে কোথাও।

​মুহূর্তটা সুন্দর করে উপভোগ করলো তারা। সুমনা রহমান কিচেনে গিয়ে কফি বানিয়ে নিয়ে আসলেন। শ্রাবণ ও তার বাবা কফিভক্ত। মেঘও খায় মাঝে মাঝে মাথা ধরলে। চার মগ কফি এনে খেতে খেতে গল্প করতে লাগলো সবাই। মেঘ আড়চোখে শ্রাবণকে দেখছিল শুধু। বোঝা মুশকিল যে ছেলে মা-বাবা দূরে যাওয়ায় কতটা রেগে গিয়েছিল তাদের উপর, সেই ছেলে দশ বছরের বাচ্চাদের মতো হাসছে, কথা বলছে। ভালোই লাগছে মেঘের। পরিবার বলতে তো শুধু তার বাবা ছিল। আর এখন তার সবই আছে মনে হচ্ছে। শুধু বাবার জন্য খারাপ লাগছে। মিস করছে মেঘ তার বাবাকে।

​একাকিত্বের জীবন বেছে নিয়েছেন জাহিদ আহমেদ। মেয়েকে অবহেলা করে যদি দ্বিতীয় স্ত্রী আনতেন? তার চেয়ে বড় কথা, প্রিয় মানুষটার জায়গা অন্য কাউকে দেওয়া অসম্ভব। মেঘ শহরে আসলে অনেক কষ্ট পান জাহিদ আহমেদ। মেয়েই যে তার সব। মেঘের এই সুন্দর মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল তাদের সাথে তার বাবা থাকলে তিনিও খুশি হতেন। কিন্তু, এ হওয়ার নয়। সম্ভব না যে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মন খারাপ করে কফির মগ নিয়ে রুমে চলে যায় মেঘ৷

​সবারই চোখে পড়ে মেঘের মন খারাপ করে চলে যাওয়াটা। শরীফ শিকদার ইশারায় বলেন শ্রাবণকে চলে যেতে। সুমনা রহমানও বলেন,

​---- যা তো, দেখে আয় মেয়েটা কেন মন খারাপ করে চলে গেল?

​শ্রাবণ উঠে দাঁড়ালো। মন খারাপ করার তো কথা না, তাহলে? ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালো রুমের দিকে। বারান্দাই তার মন খারাপের সঙ্গী হলো। আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে মেঘ।

​---- বাবার জন্য খারাপ লাগছে? ডাকবো বাবাকে?

​মেঘ তাকালো নীরব দৃষ্টিতে। শান্ত স্বরে বললো,

​---- বাবা আমার জন্য একাকিত্বের জীবন বেছে নিয়েছে। আমার খুব খারাপ লাগে বাবাকে দেখলে। সবটা আমার জন্য হয়তো। আজ মা-বাবা আর আপনাকে দেখে আমার মা-বাবার কথা মনে পড়ছিল। বাবাকে মা ছাড়া, আমি ছাড়া কেমন অসহায় লাগছে। এই ভেবে খারাপ লাগছে।

​বারান্দার রেলিংয়ের উপর কফি মগটা রাখলো শ্রাবণ। বললো,

​---- আমি তাহলে বাবাকে কল দিচ্ছি, বলছি আপনার জন্য আমার মেঘফুল কষ্ট পাচ্ছে। আর আমি সেটা সহ্য করতে পারছি না। আচ্ছা মেঘ, বাবাকে একেবারের জন্য নিয়ে আসলে কেমন হয়? তোমার মন খারাপ চিরদিনের জন্য মুছে যাবে।

​মনে মনে হাসলো মেঘ। ছেলেটা কতটা সহজ করে বলে ফেললো কথাটা৷ কল দিতে নিলে থামিয়ে দিলো মেঘ। বললো,

​---- বাবা কালকে আসবে। আপনি কল দিবেন না। অযথা চিন্তা করবে আমার জন্য। আর বাবা কখনোই এখানে আসবে না। কারণ বাবা গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবে না। সেখানে আমার মায়ের হাজারো স্মৃতি জমে আছে। বাবা গ্রামে থাকলে নিজেকে কখনোই একলা মনে করে না। মনে হয় তার পাশে মা আছে। শুধুই আমার জন্য তার যতো মন খারাপ। ভেবেছিল কাছে রাখবে গ্রামে বিয়ে দিয়ে, কিন্তু বাবার সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলো না। আমি রয়ে গেলাম বাবার মতে মায়ের খুনির শহরে। হয়তো আজ সবটা স্পষ্ট কে কী করেছে, তবে আজও বাবা এই শহরটাকে সহ্য করতে পারেন না। এই প্রথম বাবা শহরে দীর্ঘ সময় থাকছে।

​---- তো কী চাও তুমি, বলো আমায়?

​মেঘ মৃদুস্বরে বললো,

​---- সবাই ভালো থাকুক, এইটুকুই চাওয়া।

​শ্রাবণ গ্রিলে পিঠ ঠেকিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে মেঘের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

​---- আর আমার ভালো থাকা?

​মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বললো,

​---- আমার ভালো থাকা মানে? আপনি তো ভালো আছেন। আর সবার মধ্যে আপনি আলাদা হতে যাবেন কেন?

​শ্রাবণ আবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। অতঃপর, আবেশমাখা স্বরে বলে উঠলো,

​---- আপনি আমার ভালো থাকা মেঘফুল, আর আপনি মন খারাপ করলে আমার মন এমনিতেই খারাপ হয়ে যায়৷

​মেঘ মাথা নত করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলো। এসব কথা তার কাছে লজ্জাজনক লাগে। অন্যরকম অনুভূতি অনুভব হয়, যেখানে সে অপরিচিত। তাড়াহুড়ো করে বললো,

​---- আমি আসছি৷

​---- পালিয়ে যাচ্ছো? বউ বলে পরিচয় দিয়েছো। বউ বানালামও। কিন্তু, বউ আমার মন বুঝলো না।

​মেঘ পিছু তাকালো। বললো,

​---- এমনি এমনি বলেছি বলে আপনি সত্যি সত্যি বিয়ে করবেন? কে বলেছে আপনাকে বিয়ে করতে? আমি আপনাকে বুঝতে পারবো না। আপনি আমার অপছন্দের কঠিন একটা সাবজেক্ট। সত্যিই বোঝা খুব মুশকিল।

​শ্রাবণ হাসলো। সাথে সাথে জোরে বলে উঠলো,

​---- ফেইল করলে টের পাবেন কিন্তু! কঠিনকে সহজ করে নিতে হবে। কঠিন আর অপছন্দ ভেবে এড়িয়ে গেলে আপনারই ক্ষতি মেঘফুল।

​---- এই টপার বয়, কঠিন সাবজেক্ট আমি এড়িয়েই যাই প্রতিনিয়ত। সহজগুলোই পারি না। পারলে বুঝিয়ে দিয়েন। নয়তো আপনার বউয়ের কারণে আপনার 'টপার' শব্দটায় কলঙ্ক লাগবে৷

​কথাটা বলে মেঘ দ্রুত রুমে চলে আসলো। এখানে থাকলে তার থেকে কয়েকগুণ এগিয়ে থাকবে ছেলেটা চাপাবাজিতে।

​মেঘের পিছু পিছু শ্রাবণও আসলো। শ্রাবণকে দেখে দ্রুত বইয়ে মুখ গুঁজলো মেঘ। যেন কোনো কথা বলার সুযোগ না পায় শ্রাবণ। শ্রাবণ শুধু মুচকি হাসলো। মেঘের এহেন কাণ্ডে হাসিই পেলো তার। রুমের বাইরে চলে গেল সে, কফি খাওয়া শেষ তাই। ​সত্যি সত্যিই পড়তে বসলো মেঘ। পড়তে তার ভীষণ ভালো লাগে। বিশেষ করে উপন্যাস হলে তো কথাই নেই। হঠাৎ মনে পড়ে গেল গত বছরের কথা। তার জন্মদিনে দিব্য তাকে হুমায়ূন আহমেদের 'কোথাও কেউ নেই' উপন্যাসটা দিয়েছিল। অনেক খুশি হয়েছিল মেঘ। পড়ে শেষ করে ফেলেছিল দু-তিন দিনের মধ্যে। তারপর সব নিজের কেনা। সবকিছু গ্রামেই পড়ে আছে। বড্ড মিস করে সে সেই দিনগুলোকে। সবাই কত ভালো ছিল, আপন ছিল। যতোই দিন যাচ্ছে ততোই মানুষ অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। মানুষ চেনা যায় না। মানুষ চেনা বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে। স্বার্থপরতায় মানুষ পাকাপোক্ত একদম। ​মেঘের হাত ঝলসে গিয়েছে সামান্য। সে চেয়েছিল সুমনা রহমানকে সাহায্য করতে, কিন্তু সবাই যেন একসাথে বারণ করলো। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আজ তারা বিরিয়ানি রান্না করবে, তাও ব্রয়লার মুরগির মাংস দিয়ে। কারণ একটাই, সবাই খেতে পারলেও মেঘের অ্যালার্জি গরুর মাংসে, সেদিকে খেয়াল রেখেছেন সারিফ শিকদার। নিজে গিয়ে ড্রাইভারকে সাথে করে অনেক বাজার করলেন। তার সাথে সুমনা রহমানকে কাজে হেল্পও করছেন। পেঁয়াজ-রসুনের খোসা ছাড়িয়ে দিচ্ছেন। পেঁয়াজের ঝাঁঝে কান্নাও করছেন। ঠোঁট টিপে হাসছেন সুমনা রহমান স্বামীর অবস্থা দেখে। তারপর আবার কুচি করলেন, ব্লেন্ড করলেন যা যা মশলা লাগে। শ্রাবণও হেল্প করতে চেয়েছিল, মেঘ বারণ করে বললো,

​---- আপনি যাবেন না। ওনারা নিজেদের মতো সময় কাটাক।

​শ্রাবণ মেঘ পড়ছিল বলে ডিস্টার্ব করেনি। হঠাৎ মেঘকে দেখে বললো,

​---- তাহলে চলো আমরা সময় কাটাই। একাকী, নিরিবিলি।

​মেঘ দু-পা পিছিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বললো,

​---- আ... আমি এখানে কাজ করছি। আমার সময় নেই। আপনি একলাই সময় কাটান।

​মেঘ এই বলে সোফার কুশনগুলো ঠিক করতে লাগলো। শ্রাবণ সোফায় বসলো, অতঃপর ফিচেল হেসে বললো,

​---- কাজ করো, নো প্রবলেম। আমি বসে তোমায় দেখি আর তুমি কাজ করো।

​মেঘ বিরক্ত হলো। চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকালো শ্রাবণের দিকে। রেগে আস্তে ধীরে বললো,

​---- আপনি সেইদিনের সেই ছেলেটা থেকে পাল্টে গেলেন কীভাবে? কী গম্ভীর, শান্ত, ভদ্রলোক ছিলেন। কত ভালো লাগছিল, প্রেমে প....

​শ্রাবণ গালে হাত দিয়ে শুনছিল তার নামে করা অভিযোগ। কিন্তু শেষের লাইন তাকে আটকে দিল মেঘের মুখাবয়বের মধ্যে। বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। ঝুঁকলো মেঘের দিকে। বললো,

​---- আপনি বড্ড ভালোবাসেন আমায়, আমি জানি মেঘফুল। আর আমাকে বলছো আমি চেইঞ্জ কেন? অবশ্যই চেইঞ্জ হবো। কার জন্য? তোমার জন্য। তোমার সাথেই আমার তো যতো দুষ্টু-মিষ্টি কথা হবে। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী মেঘফুল, তোমার সাথে রুড বিহেভিয়ার করবো কেন? তুমি যেন আমার ব্যবহারে কষ্ট না পাও, আমি সেইদিকেই খেয়াল রাখি। বাই দ্য ওয়ে, যদি চাও আমি আগের মতো থাকি, তাহলে হবো তোমার জন্য চেইঞ্জ। কী, হবো?

​মেঘ কী বলবে বুঝতে পারলো না। সত্যি কথাই তো বললো শ্রাবণ। তার সাথে প্রথম দিনের মতো করা আচরণ সে-ই তো মানতে পারবে না।

​---- এই মেয়ে, কাজল পরো না কেন?

​---- আপনার নিষেধাজ্ঞা ছিল তাই।

​নিজের কথায় নিজেই হকচকিয়ে উঠল মেঘ। অতঃপর বললো,

​---- আমার ইচ্ছে, তাই৷

​শ্রাবণ কিচেনের দিকে তাকালো, ফের মেঘের দিকে। বললো,

​---- আমি চাই না আমার মেঘফুলকে কাজলচোখে অন্য কেউ দেখুক। ওই চোখের কারাগারে কেবল আমিই বন্দি। সেই জেলখানার কয়েদি আমি ছাড়া অন্য কেউ হওয়ার ক্ষমতা রাখে না, বুঝলে?

​মেঘ উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেড়ে। বললো,

​---- আপনি না করেছিলেন, আমি মেনে নিয়েছিলাম। কারণ আমি একটা ভুল করেছিলাম তাই।

​---- ভুল তো আর শুধরালেন না মেঘফুল। এখনো তো সেই শ্রাবণ নামের ট্যাগ নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর হ্যাঁ, কাজল পরবেন শুধু আমার জন্য। আমি দেখবো আপনাকে।

​---- আপনি ঠিক আছেন? কী শুরু করেছেন, মা-বাবা শুনছে তো!

​শ্রাবণ তাদের দিকে একপলক তাকালো, অতঃপর বললো,

​---- তারা অবুঝ, বুঝলে? প্রেমে পড়েনি, কেবল সংসারই করেছিল। তাদেরকে ভাবছি প্রেম শেখাবো। আমাদের দেখে না হয় একটু-আধটু শিখবে।

​---- অসভ্য লোক!

​চলে যায় রুমে। এই ছেলেটা যেখানে থাকবে, লজ্জায় পড়তে হয় মেঘকে সেখানেই। শ্রাবণ সোফায় গা এলিয়ে বাবা-মায়ের রান্না দেখছে আর তাদের দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটি। একে অপরকে সাহায্য করছে। সুমনা রহমান নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে সারিফ শিকদারের ঘেমে নেয়ে যাওয়া মুখটা অতি যত্ন করে মুছে দিচ্ছেন। শ্রাবণ যেন আনন্দের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। তাদের এই দৃশ্যগুলো তার ফোনে ক্যাপচার করতে লাগলো তাদের আড়ালে। পরিবার হলো শান্তির জায়গা। সেখানে দূরত্ব, অশান্তি, ঝগড়া-ঝামেলা একটা বাচ্চার উপর কতটা প্রভাব ফেলে। সেটা কেবল তারাই জানে,

যারা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।

_________________

​---- কোথায় গিয়েছিলিস তুই?

​তাসির আগের ন্যায় ফোনেই মনোনিবেশ করলো। রাতুল আবারও বললো,

​---- এই, তুই কি প্রেম করছিস? এমন না তো যে শ্রাবণের মতো হঠাৎ কাউকে বিয়ে করে ফেলবি?

​তাসির হাসলো। তাকালো তিনটি উৎসুক মুখশ্রীর দিকে, যারা ঈগলের ন্যায় তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাইকে শান্ত করতে বললো,

​---- আমি বিয়ে করলে ঢাকডোল পিটিয়ে সবাইকে জানিয়েই করবো। আর প্রেম! প্রেম আমার কপালে ঝাড়ুর বাড়ি দিয়েছে রে। চাইলেও সম্ভব না। শ্রাবণের কপালের সাথে কপাল টক্কর দিতে হবে, বুঝলি তোরা?

​---- তাহলে প্রেমে পড়ছিস কে, বল তো? না বললে ছাড়ছি না।

​রিফাত এমন ভাব করলো যেন আজ জেনেই ছাড়বে সে তাসিরকে।

​---- আরে থাম তো! বল কবে বিয়ে করছিস? আঙ্কেল-আন্টি জানে?

​---- তোর শালী আছে?

​তাসির বোকার মতো চাহনি দিল তাদের দিকে। কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।

​---- তোরা ভাব, আমি যাই। বিয়ের ব্যবস্থা যদি হয় কোনো এক কালে, তখন জানবি।

​---- আরে শুন, আমরা তো এমনি জিজ্ঞেস করেছি। যাই হোক, প্লিজ বল না কে মেয়েটি?

​---- আরে গুড বয়রা দেখছি প্রেম নিয়ে ব্যস্ত! তা তোরা যদি প্রেম করিস, আমরা কী করবো তাহলে? আর পড়াশোনায় ফার্স্ট হবে কারা? আর তোর ব্রিলিয়ান্ট বন্ধু এক্সামের আগেই বিয়েতে ছক্কা মেরে দিল? মারবেই তো, ভদ্র সেজে থাকা আর কতদিন? বলিস, আমরাও একটি ছক্কা মারতে চাই।

​নয়নের কথায় রেগে ফুঁসে উঠল তারা চারজন। তাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভদ্র শয়তান, যার উপরে ইউনিভার্সিটিতে কোনো শয়তান নেই। রাতুল রেগে বলে উঠল,

​---- তাসির, হাড্ডির স্মেল পেয়ে কুত্তা হাজির হয়ে গেল রেস্টুরেন্টে? কীভাবে সম্ভব, এতদিন তো দেখা পেলাম না? আজ আমরা খেতে আসলাম, ওমনিই হাজির হতে হলো?

​---- রাতুল! তুই আমায় কুত্তা বললি?

​নয়নের কথায় রামিম রাতুলকে ধমক দিয়ে বললো,

​---- এভাবে বলছিস কেন রাতুল? তার একটা সম্মান আছে না? শ্রাবণ নেই তো কী হয়েছে, আমরা আছি তো। কুত্তা বলছিস কেন? কুকুর বলবি। আর কুকুরের তো সম্মান আছে, অযথা তার জন্য নষ্ট হচ্ছে।

​---- রাতুল, রামিম তোরা কিন্তু বেশি করছিস। এর ফল যে ভালো হবে না, তা খুব ভালো করেই জানিস।

​রিফাত মাংস খেয়ে হাড্ডিটা নিজের সামনে তুলে ধরলো। অতঃপর বললো,

​---- আরে তোরা উল্টাপাল্টা কথা বলছিস কেন? আমি জানি ও কেন আসছে। এই যে আমার হাতের হাড্ডিটা খাওয়ার জন্য।

​নয়ন অপমানিত হয়ে রেগে টেবিলে পাঞ্চ মারলো। চিৎকার করে বলে উঠলো,

​---- আমার সাথে লাগতে আসছিস তোরা? শ্রাবণের পাওয়ারে, তাই না? শ্রাবণের সাথে তো আগের হিসেবই বাকি, আরো অ্যাড হলো। চিন্তা করিস না, তোদের আর তোদের নেতাকে আমি একদম খেয়ে দেবো।

​তাসির জোরপূর্বক চুপ ছিল এতক্ষণ। আর সহ্য হলো না তার। এমনিতেই চারদিকে সবার কৌতুহলী চোখ, কী হচ্ছে এখানে দেখার জন্য তাকিয়ে আছে।

​তাসির নয়নের কয়েকজন বন্ধুদের দিকে তাকালো, যেগুলো ওত পেতে আছে তাদের উপর আক্রমণ করতে। তাসির এক ঝটকায় নয়নকে এনে নিজের জায়গায় বসালো। জোর করে চিকেন ফ্রাই নয়নের মুখে চেপে ধরলো। রাগে ক্রোধান্বিত হয়ে বলে উঠলো,

​---- তোর খিদে পেয়েছে বললেই তো হয়। আমরা কি বারণ করতাম? নে, আগে খেয়ে নে, তারপর নেতাকে খাওয়ার চিন্তা করিস। আমরা কেউ কারোর নেতা-খেতা না, আমরা পাঁচজন একে অপরের ভাই, বুঝলি? খা, সবগুলো খাবি।

​সাথের ছেলে দুটো আটকাতে গেলে রামিম ও রাতুল ধরে ফেলে। ওয়েটারগুলো ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়। সবাইকেই চেনা তাদের। এখন কী হবে, সেটাই দেখার বিষয়। পুলিশ ডাকা যাবে না।

​---- ছাড় তাসির। আমাকে রাগিয়ে মোটেও ভালো করছিস না।

​তাসির চেপে ধরে বললো,

​---- তোকে রাগলেই সুন্দর লাগে নয়নপরী। একদম নায়িকার মতো লাগে। হুদাই রাগিস না, তাই একটু সুন্দর করার চেষ্টা করছি। শ্রাবণ নেই বলে তার নামে যা কিছু তাই বলে দিবি, আর আমরা চুপ করে থাকবো? ভুল ভেবেছিস তুই। ও আমাদের জন্য আর আমরা ওর জন্য এটাই আমাদের বন্ধুত্ব। আমাদের মধ্যে কাউকে কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করলে, সেই ক্ষতি অটোমেটিক তারই হয়ে যাবে।

​ছেড়ে দিল তাসির। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিল নয়ন। চোখ দিয়ে ভস্ম করে দেবে এমন অবস্থা তার। যেতে গিয়ে শুধু বললো,

​---- সময় হোক, সঠিক জবাব পেয়ে যাবি। সারপ্রাইজ!

​---- আরে যা, দেখবো নে কোন বা...

​---- রাতুল, ভাষা সংযত করে কথা বল। ওদের সাথে কথা বলে আমাদের মুখ কেন নষ্ট করবো?

​তাসিরের কথায় চুপ হয়ে গেল রাতুল৷ কিন্তু রাগে ফুঁসছে তারা।

____________________

​---- তুমি এখানে? আবার এসেছো! ভাইয়া দেখলে তো ঝামেলা হতে পারে। আর এখন তো রাত, এই সময় তোমায় আসতে দিল তোমার বাবা-মা?

​দোয়া পাশে ইশারা করলো সাথে সাথে। দোয়েল তাকালো পাশে একজন মহিলা। সালাম দিল দোয়েল।

​---- আসসালামু আলাইকুম আন্টি।

​---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি তাহলে দোয়েল?

আজ সারাদিন তোমার কথাই বলছিল দোয়া।

​দোয়েল মৃদু হাসলো। বললো,

​---- জ্বি আন্টি, আমি দোয়েল। বসুন আপনারা।

​দোয়ার আম্মু তাড়াহুড়ো করে বললেন,

​---- না মা, বসবো না। দোয়া আসতে চাচ্ছিলো, আর ওর মুখে তোমাদের কথা শুনে আমারও ইচ্ছে জেগেছে দেখার। তোমার ভাই কেমন আছে?

​দোয়েল দাঁড়িয়ে গেল, বললো,

​---- আসুন আন্টি, আমি নিয়ে যাচ্ছি।

​---- চলো আম্মু।

​আইসিইউ রুমের ভেতরে আসলো তারা। ফাইয়াজ কবেই চলে গিয়েছে। দিব্য সজাগ, তাকায় প্রথমে। দোয়ার দিকে চোখ পড়লো তার। মেজাজটা বিগড়ে গেল তৎক্ষণাৎ। আবার আসলো কেন মেয়েটা? ফের মনে হলো না, ঠিক হয়নি এভাবে বলা। দোয়েল বললো,

​---- ভাইয়া, ওনি হচ্ছে দোয়ার আম্মু, তোমায় দেখতে আসছেন।

​---- আসসালামু আলাইকুম আন্টি।

​---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো এখন?

​---- আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।

​তিনি সুন্দর করে বললেন,

​---- জীবনে যতো ঝড়ই আসুক, ভেঙে পড়ো না, কেমন? জীবন একটাই, তাও ছোট্ট! সুন্দর করে বাঁচার চেষ্টা করো।

​---- ওনি তো ছ্যাঁকা খেয়ে এমন করেছেন।

​দোয়ার এমন কথায় দিব্য স্তব্ধ! মানে কার সামনে কী বলতে হয়, মেয়েটি কি এইটুকুও জানে না? ইচ্ছে করছে শোয়া থেকে উঠে গিয়ে মেয়েটার গাল দুটোকে লাল করে দিতে। তার ভাবনার মধ্যে দোয়ার আম্মু ধমক দিলেন,

​---- এই মেয়ে, এসব কী ধরনের কথাবার্তা বলছিস? সরি বল এখনি।

​দোয়েল ভয় পাচ্ছে দোয়ার মায়ের সামনে না আবার দিব্য কিছু বলে বসে। দোয়া বিরক্ত হয়ে বললো,

​---- সত্যি কথা বলেছি, সরি বলবো কেন?

​চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন