ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

১৫তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১৫

#কলমে_তাসনিম_লিজা

----- কপি নিষিদ্ধ!

দিব্যর বোধহয় এতোটা ধৈর্য্য ছিলো না আজ সে যতোটা ধৈর্য্য নিয়ে সামনে থাকা ছটফটে মেয়েটার কথা হজম করছে। দোয়ার আম্মু আয়েশা রাহমান

এবার কড়া দমক দিলেন,

---- এই শিক্ষা দিচ্ছি আমরা তোমায়? বয়সে বড় হয় ও তোর। সাহায্য করে এভাবে কথা বললে তোর প্রতি ওর ভালো দিকটা মুছে গিয়ে ওর মনে ঘৃণা সৃষ্টি করবে। সাহায্য করে কি হলো?

দোয়া কিছু বলতে যাবে তখনই দোয়েল এসে দোয়ার হাত ধরলো। কানে কানে বিরবির করে বলল,

---- প্লিজ এসব এখন বন্ধ করো। ভাইয়া রেগে গেলে তোমার আম্মুর সামনে তোমায় অপমান করবে তুমি তা চাও?

মাথা নাড়ালো দু'দিকে। চাই না সে। তাই চুপ করে রইলো দোয়া। আয়েশা রাহমান এটা সেটা জিজ্ঞেস করলেন দিব্যকে। দিব্য কথার উত্তর দিলে ও তীক্ষ্ণ

দৃষ্টি তার দোয়ার দিকে ৷ যে বারবার বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। আয়েশা রাহমান সাথে করে নিয়ে আসা ফলমূল দোয়েলের হাতে দিলেন। বড়দের পাননি তারা। তাই দিব্যকে ও দোয়েলকে বলে বের হয়ে যান আয়েশা রাহমান।

---- ডিজগাস্টিং!

দিব্যর কথায় নাক মুখ কুঁচকে ফেলে দোয়েল। বেশ রেগে আছে তার ভাই। দোয়েল মিনমিন করে বলে,

---- ভাইয়া রেগে যাচ্ছো কেন? ছোট মানুষ...

---- ওই মেয়েটা বারবার শুঁকিয়ে যাওয়া ক্ষতকে জীবন্ত করে তুলছে। একবার হাতের নাগালে পাই,

তারপর বোঝাবো এই দিব্য আহমেদ কি!

দোয়েল আর কিছুই বলার সাহস পেলো না। বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। মেয়েটার সাহস ও বড্ড বেশি। আর তার ভাই তার চেয়ে শতগুণ বেশি, আর দেখা না হোক তাদের। পরে দেখা যাবে ঝগড়া করতে করতে একজন আরেকজনের চুল ধরে বসে থাকবে।

_____________________

---- কেমন হয়েছে রান্না?

সারিফ শিকদার সবার আগে বলে উঠলেন,

---- একদম অমৃত। তোমার হাতের রান্না স্বাদ বরাবরই অসাধারণ।

কোমল হাসলেন সুমনা রাহমান। স্বামীর কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়াই তো সবচেয়ে আনন্দের একটা মেয়ের জন্য । শ্রাবণ মেঘ খাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। তার মধ্যে শ্রাবণ খেতে খেতে বললো,

---- অবশ্যই মজাদার রান্না হবে । কারন বাবা ও যে হেল্প করেছে।

---- হ্যা আমি মশলাপাতি সুন্দর করে দিয়েছি বলে আর একটু ভালো হয়েছে। তবে তোর মায়ের হাতের রান্না সবসময়ই প্রশংসনীয়।

---- ভীষণ ভালো হয়েছে মা। ক্রেডিট কিন্তু দুজনেরই।

---- ঠিক বলেছো মেঘ। তোমার বাবা সাহায্য না করলে সত্যিই এতো ভালো হতো না।

---- আমাকে কিন্তু রান্না শেখাতে হবে মা। আমি রান্না করা পছন্দ করি তবে ভালে হয়না তেমন।

---- অবশ্যই শেখাবো। আমার একমাত্র মেয়েকে আমি না শেখালে কে শেখাবে বলো? তবে আমি যতোদিন বেঁচে আছি আমি নিজের হাতে সংসার ও রান্নাবান্না সবদিকটাই সামলাবো।

মেঘ হঠাৎ বলে উঠলো,

---- আপনার কষ্ট হচ্ছে না মা জবটা ছেড়ে দিয়ে?

শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ তাকালো মায়ের দিকে। সারিফ শিকদার ও। সুমনা রাহমান চমৎকার হাসলেন সাথে সাথে। বলেন,

---- কষ্ট কেন হবে শুনি? সব কিছুরই একটা শেষ আছে৷ আমি তো প্রথমেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এখন আমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আফসোস আগে যদি বুঝতে পারতাম।

---- তোমার খারাপ লাগলে আমি জোর করবো না

মা। তোমাদের ইচ্ছে তবে আমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভুলেও ভেবো না তোমরা৷

---- যাচ্ছি না বাপ। আমরা একসাথেই থাকবো।

খাওয়া দাওয়া শেষ হলে মেঘ রুমে চলে আসে। শ্রাবণ ও আসে। সুমনা রাহমান সবকিছু গুছিয়ে রাখেন এবারও হাতে হাতে কাজ করে দিলেন সারিফ শিকদার। সুমনা রাহমান বারণ করেন কিন্তু সারিফ শিকদার শুনে না।

শ্রাবণ মেঘের পাশে বেডে এসে বসতে না বসতেই ফোন বেজে উঠলো। মেঘ নজর বুলালো ফোনের দিকে। শ্রাবণ রিসিভ করলো। তাসির কল দিয়েছে।

---- হ্যা বল! কোথায় ছিলিস তুই?

ওপাশ থেকে শ্রাবণ বলে উঠলো চিন্তিত কন্ঠে,

---- নয়নমনি জেল থেকে ছুটি পেয়েছে আজকে।

সাবধানে থাকবি। সয়তান তো কখন কি করে বসে বলা যায় না। আর হ্যা মেঘ যে তোর বউ সেটা ও যেনো কোনো ভাবেই জানতে না পারে।

মুহুর্তের মধ্যে শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। তার বুঝে আসে না একটা অপরাধীকে তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি না পেয়ে মনে হয় দু'দিনের জন্য মামার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসছে। সবই টাকার পাওয়ার। আইন এখন টাকার কাছে নত। আর টাকা যার কাছ আছে তার কথাই চলে। এই যে নয়ন ছেলেটা একটা মেয়েকে ফাঁকা ক্লাসরুমে নিয়ে জোর করে মেয়েটার সম্মানহানি করার চেষ্টা করছিলো। ভাগ্য ভালো ছিলো একটা ছেলে দেখে নিয়েছিলো তৎক্ষনাৎ সবাই একসাথে যায়। কিন্তু,

কেউ সাহস করে কিছু বলতে পারেনা। সবাই মুখ বন্ধ রাখলে ও শ্রাবণ আচ্চা মতো পিটিয়েছিলো।

তারপর তাসির পুলিশকে ফোন দিয়ে মেয়েটির জবানবন্দিতে জেলে নেওয়া হয় নয়নকে। নয়নের বাবা কোটিপতি ভালো মানুষ হলে ও ছেলে একটা

অমানুষ হয়েছে৷ অনেকদিন হলো জেলে নয়ন। কিন্তু, বাবার টাকার কারনে বারবারই ছাড়া পেয়ে যায় সে।

---- কি হয়েছে?

বিচলিত হলো মেঘ৷ শ্রাবন তাকালো ফের কলে থাকা তাসিরকে বললো,

---- অযথা টেনশন করিস না কিছুই হবে না। আর হ্যা তোরা ওর সাথে বাড়াবাড়ি কিছু করিস না। আমি চাই না তোদের কোনো ক্ষতি হোক। আমি ও দেখবো কতদিন ও খোলা আকাশের নিচে থাকতে পারে।

---- আমাদের নিয়ে ভাবিস না আমরা আজ ছাড় দিইনি। ও তোকে অপমান করে।

---- আমি রাখছি পরে কথা বলবো।

---- ঠিক আছে।

রাগ হচ্ছে শ্রাবণের। একটা অমানুষকে টাকার বিনিময়ে কিভাবে ছাড়তে পারলো? তার থেকে তো

যে মেয়েটা জবানবন্দি দিয়েছিলো নয়নের বিরুদ্ধে তার জীবনের রিস্ক রয়েছে। ফের ফোন দিলো তাসিরকেই।

---- কিরে আবার কি হলো?

---- আরিশা মেয়েটি এখন কোথায়? ওর নাম্বার আছে তোর কাছে?

তাসির খানিকক্ষণ ভেবে বললো,

---- না তো। তবে ম্যানেজ করতে পারবো।

---- ফাস্ট তাসির। মেয়েটার লাইফ রিস্ক রয়েছে। নয়ন মেয়েটাকে মেরে ফেলতে ও দ্বিধা বোধ করবে না। ও মানুষ না ও একটা জানো'য়ার। জানিস না কি করেছিলো গতবছর?

তাসির ক্ষিপ্ত হলো। বললো,

---- ওই শালাকে ইচ্ছে করে মেরে পুতে দিই মাটির নিচে। তুই ভাবিস না আমি সবটা ম্যানেজ করছি। ও তো হলেই থাকে। সাবধান করে দিচ্ছি আমি।

---- ওকে ফাইন। আমাকে আপডেট দিবি। আর ওর উপর নজর রাখবি। আমি কালকে আসবো।

---- সবে বিয়ে করেছিস। দুজন একাকি সময় কাটাবি তা না পড়তে চলে আসবি?

---- রাখছি।

কল রেখে ফোনটা রাখলো পাশে। শ্রাবণ তাকালো

মেঘের দিকে। মেয়েটা চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। টেনশন করছে কারোর কোনো বিপদ হলো না তো আবার? শ্রাবণ বললো,

---- ভয় পাচ্ছো কেন?

মেঘ কৌতূহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

---- কি হয়েছে বলুন তো? সব ঠিক আছে তো?

আর আরিশা কে? কি হয়েছে মেয়েটির?

শ্রাবণ দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। আরিশার সাথে হওয়া পুরো ঘটনাটা বললো। ভয় পেলো খানিকটা মেঘ।

বললো

---- যদি আপনার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে?

আর মেয়েটির সাথে অন্যায় হয়েছে তা কলেজ কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না? মেয়েটির পক্ষে কেউ আসবে না? সবাই মিলে একসাথে প্রতিবাদ করলে এদের মতো অমানুষ গুলো সাহস পেতো না এমন কুৎসিত কাজ করার৷

রাগ হচ্ছে মেঘের। কি সুন্দর ছেড়ে দিয়েছে অপরাধীকে। কম হলে কয়েকবছর জেল কাটা উচিত ছিলো। আবার ভার্সিটিতে কিভাবে পড়াশোনা করছে? প্রিন্সিপাল... কথাটা মাথায় আসতেই তাকালো মেঘ শ্রাবণের দিকে। বললো,

---- বাবা তো প্রিন্সিপাল তাহলে ওই ছেলেকে বের করছে না কেন? সবাই চুপ কেন? আপনারা কিভাবে একটা অমানুষকে সহ্য করছেন? ওরা তো শিখতে যায় না, তারা ভালো ছেলে মেয়েদের কে খারাপ বানাতে যায়। মেয়েদের উত্যক্ত করতে। এতে সবাই ভয়ে থাকে। মানসিক সমস্যা হয় তাদের।

শ্রাবণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে মেঘের রেগে ফুঁসে ওঠা, তীক্ষ্ণ চাহনি তার দিকে রেখে কথা বলা। জেদ রাগ অবশ্যই হওয়ার কথা। মানুষ সব দেখেও কেন চুপচাপ থাকবে? প্রতিবাদ শব্দটা এখন বিলুপ্তির পথে। ভুলে বসেছে কারোর বিপদে এগিয়ে আসা। পারলে সবাই তামাশা দেখায় ব্যস্ত হয়ে যায়। সাথে ভিডিও করা তো আছেই।

শ্রাবণ মেঘের হাতের উপর হাত রাখলো। বললো,

---- মেঘফুল শান্ত হও।

মেঘ থেমে গেলো। ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে সে। তবুও বললো,

---- অন্যায় দেখে কিভাবে চুপচাপ থাকে মানুষ?

শ্রাবণ মেঘের আর একটু কাছে এসে পাশাপাশি বসলো। মাথাটা এলিয়ে দিলো মেঘের কাঁধে। চমকে কেঁপে উঠলো মেঘ। নড়লো না তবুও।

---- মেয়েটি আপাতত সেইফ আছে। আর কে বলেছে চুপ থাকতে? বলে যাও তুমি আমি শুনছি তো৷

মেঘ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চাইলে ও নড়তে পারছে না।

ছেলেটা এতো কাছে আসছে কেন অহেতুক?

তার যে অস্বস্থি হয় কতবার বলবে? মেঘ ধাতস্থ হয়ে বললো,

---- আপনি বারণ মানেন না কেন? প্লিজ সরুন।

মেঘের কথা শুনলো না। ওভাবেই মাথাটা রেখে চোখ বন্ধ করে বললো,

---- সবসময় নিয়ম মানতে হয় না মেঘফুল। কিছু সময় অনিয়মে চলতে হয়। এই যে বারণ শব্দটা এই ক্ষেত্রে বড্ড কষ্টকর মনে হচ্ছে। নিজস্বার্থে এতোটুকু তো চাইতেই পারি। যেখানে আমি শান্তি পাই, আমি সেখানেই তো থাকবো।

দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো মেঘ।

পুরুষালি শক্তির কাছে পেরে উঠলো না। বাধ্য হয়ে উঠতে নিলে হাত ধরে ফেললো শ্রাবণ।

---- খবরদার মেঘফুল পালানোর চেষ্টা করবে না।

তুমি আমার পবিত্র এক ফুল যাকে ছুঁয়ে দিলে আমার গুনাহ বা অন্যায় হবে না। তবে সেই ফুল যদি নাই চাই সেটা আমার দিক থেকে পজিটিভ। আমি শুনছি তোমার কথা। আমি তোমায় টাচ করবো না। শুইয়ে পড়ো।

মেঘ থামলো। সাথে সাথে বললো,

---- আমি ঘুমাবো না পড়তে বসবো। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

শ্রাবণ মৃদু হাসলো। তবে শুইয়ে পড়লো না সে ও একটা বই নিয়ে পড়তে লাগলো বেডে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে। মেঘ গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলো। শ্রাবণের দৃষ্টি বার বার মেঘের দিকেই যাচ্ছে। তাকে এড়িয়ে যাওয়াটা একটু কষ্ট লাগছে তবে এই ভেবেই সে নিজেকে শান্তনা দিচ্ছে যে ফুল ছুঁতে গেলে কাঁটার আঘাত পাওয়াটাই স্বাভাবিক। তার দিক থেকে এমন আচরণ অবাক করার মতো বিষয় নয়।

রাত দশটা বাজে। সবকিছু দিনের আলোর মতোই

লাগছে। তাসির, রাতুল, রিফাত, ও রামিম ওরা মাত্রই হল থেকে আসলো। অনুমতি নিয়ে গিয়েছিলো তারা। আরিশা মেয়েটাকে সাবধান করে আসছে। মেয়েটা সাহসি কিন্তু, বিপদের কাছে অসহায়। ওরা কত মানুষ যদি আবারও ক্ষতি করার চেষ্টা করে? তাই কয়েকদিন বের হতে নিষেধ করেছে তাসির। সবকিছু ঠিকঠাক হলে তারপর পড়াশোনা, ক্লাস করা।

একে একে নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেলো।

তাসির মনে করলো, কল দিয়ে বিরক্ত না করে টেক্সট দিয়ে জানিয়ে দিলো সব ঠিকঠাক আছে। চিন্তার কোনো কারন নেই এই মুহুর্তে।

তাসিরের টেক্সট পড়ে তারপর নিশ্চিন্ত হলো শ্রাবণ। মেঘ সব গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে একপাশে গুটিসুটি মেরে শুইয়ে পড়লো৷ মেঘকে এমন লাগছে যেনো সে এখন শ্রাবণকে ভয় পাচ্ছে। শ্রাবণ একটা শব্দ ও খরচ করলো না। মেঘের পাশে দূরত্ব বজায় রেখে শুইয়ে পড়লো কপালে হাত টেকিয়ে সোজা হয়ে।

____________________

আজ ভার্সিটিতে যাবে শ্রাবণ মেঘ ও সারিফ শিকদার। মেঘকে বারণ করেছিলেন সুমনা রাহমান কিন্তু, মেঘ শুনেনি। সে জানে মেঘ না গেলে শ্রাবণ ও থেকে যাবে। আর শ্রাবণের সাথে সে একাকি থাকতে চাই না। অস্বস্তি হয় খুব৷ ভার্সিটি গেলে অন্তত তার থেকে দূরে থাকা যাবে। আর বিকেলে তার বাবা আসবে তখন কোনো সমস্যা হবে না।

একই গাড়িতে তিনজন। ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছেন।

পাশেই সারিফ শিকদার। ব্যাক সিটে নীরবে বসে আছে শ্রাবণ ও মেঘ। মেঘ রাতের পর থেকে নিজেকে শ্রাবণের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে শুধু। শ্রাবণের খারাপ লাগলো বিষয়টা। তবে মনের মধ্যে পুষে রাখলো না। মুচকি হেসে উড়িয়ে দিলো অনুভুতিহীন বাতাসের স্নিগ্ধতায়।

গাড়ি এসে থামলো ভার্সিটির পার্কিং এড়িয়াতে।

মেঘ দ্রুত নামলো। সারিফ শিকদারকে বলে একা একাই চলে যেতে লাগলো। শ্রাবণ এতে খুশিই হলো। কেউ না জানুক শ্রাবণের একমাত্র মেঘফুল এই লজ্জাবতী মেয়েটা। শ্রাবণ জানে না সত্যিই মেঘ অন্যরকম সবার থেকে। আজ অব্দি মেঘের কোনো বান্দুবি হয়নি। ও একটু অন্যায় বা ভুল দেখলেই কেন জানি তার সাথে সম্পর্ক রাখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে সে। আর এখানে তো মাত্র কদিন হলো আসছে সে।

সারিফ শিকদার চলে যান তার অফিস কক্ষের দিকে। শ্রাবণ খানিক্ষন অপেক্ষা করতে লাগলো বন্ধুদের জন্য । তারা কেউই আসেনি। হঠাৎ পেছন থেকে কাঁধে হাত পড়লো কারোর। শ্রাবণ স্থির হয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। অতঃপর বাঁকা হেসে বলে উঠলো,

---- সয়তান কি আবার ও সয়তানি করতে আসছে ?

জেলে যাওয়ার ইচ্ছে কি এখনো রয়ে গিয়েছে?

বলেই এক ঝটকায় ছুঁড়ে মারে নয়নের হাতখানা।

নয়ন হালকা গুঙিয়ে উঠে। নিজেকে সামলে সয়তানি হাসি দিলো বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে। বললো,

---- শ্রাবণ তোর ত্যাজ আমি কমিয়ে দিতে পারি তুই জানিস?

শ্রাবণ চুল গুলো দুহাতে ঠিক করতে করতে বললো,

---- তোর মতো জানো'য়ার আমায় হুমকি দিচ্ছে?

আরে তোকে তো মানুষের সাথে নয়, বরং পশুর সাথে মানায়। এখানে কি করছিস তুই? আমাকে রাগাবি না একদম হাড্ডি গুড্ডি ভাঙতে না চাইলে চলে যা চোখের সামনে থেকে।

নয়ন অপমানিত বোধ তো করলোই না উল্টো হাসলো শব্দ করে। কোনো রকমে হাসি থামিয়ে বললো,

---- ওই দিন যেভাবে মেয়েটাকে আমার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলিস। আমি তো ভেবেছিলাম তোর গার্ল ফ্রেন্ড। কিন্তু, না এখানে তো দেখছি গার্ল ফ্রেন্ড হচ্ছে একটা, বউ হচ্ছে আরেকটা। তুই এতোগুলা পাস কই আর আমরা চাইলেই জেলে পাঠানোর ধান্দা করিস।

রেগে নাক বরাবর ঘুষি মারলো শ্রাবণ নয়নকে।

দুইটা ছেলে এগিয়ে আসতো নিলে নয়ন বারণ করে দিলো। ওঠে দাঁড়ালো। আবার ও বললো,

---- আরো মার ভাই। আমি অভ্যস্থ এখন মার খেয়ে।

আমার না একটা ইনফরমেশন দেওয়ার ছিলো তোকে। পড়ে বলবি আমাকে জানাসনি কেন?

---- চোখের সামনে থেকে যা নয়তো কিছু একটা হয়ে যাবে জানো'য়ার।

---- হবে তো অনেক কিছুই হবে। জানি তোকে মারতে পারবো না। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু, তোর প্রাণভোমরার দেখা তো আমরা পেয়ে গিয়েছি।

যদি শেষ......

বাকি কথা কমপ্লিট করার সুযোগ হলো না নয়নের।

শ্রাবণ এক সেকেন্ড ও সময় নষ্ট করলো না গলা চেপে ধরলো তৎক্ষনাৎ। চোখের সামনে শ্রাবণের ভয়ংকর রুপ, রক্তাভ লাল চোখ যেনো মনে হলো আজরাইল বুঝি অতি নিকটে। চোখ দুটো মারবেলের মতো বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। দুইটা ছেলে শ্রাবণের দুহাতে টানছে। নয়ন নিজের দুহাত দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজেকে শ্রাবণের থেকে ছাড়ানোর জন্য। শ্রাবণ রেগে হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে চেপেই রেখেছে তার শক্তি যেনো একশো গুন বেড়ে গিয়েছে। চিৎকার করতে পারছেনা নয়ন। শ্রাবণ হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

---- আমার প্রাণভোমরা নিয়ে কথা বলার আগে নিজেরটা ভাবা উচিত ছিলো তোর। যা মরে যা তুই তোর মতো কীট পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকা অন্যায় হবে।

---- এই শ্রাবণ পাগল হয়ে গিয়েছিস? ছাড় ওকে।

ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে স্টুডেন্টদের ভীড় জমেছে।

তাসির, রাতুল, রিফাত ও রামিম এসে অনেক কষ্টে ছাড়ালো নয়নকে শ্রাবণের হাত থেকে। শ্রাবণ বার বার এগিয়ে যাচ্ছে মারতে। নয়নের অবস্থা খারাপ কাশতে কাশতে দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ভয়ে সে তাড়াতাড়ি সেই জায়গা ত্যাগ করলো ছেলে দুটোর সাহায্যে ।

---- পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই? মেরে ফেললে জানিস না কি হবে?

শ্রাবণ তাসিরের হাত থেকে নিজের হাত ঝাঁড়ি মেরে সরিয়ে নিলো। ক্ষোব্দ দৃষ্টিতে তাকালো তাসিররে দিকে বললো,

---- ও আমার মেঘফুলের দিকে হাত বাড়িয়েছে। আমাকে হুমকি দিচ্ছে। কতবড় সাহস ওর দেখেছিস তুই? ওর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার

নেই। আমি ওকে না মেরে শান্তি পাবো না। আমার মেঘফুলের দিকে হাত বাড়াতে নিচ্ছিলো ও।

রাতুল বললো,

---- ও কিছুই করতে পারবে না শ্রাবণ। তুই থাকতে তোর মেঘফুলের কোনো কিছুই হবে না। শুধু শুধু ওই সয়তানটার সাথে লাগতে গিয়েছিস।

---- বাদ দে তো আয় আমার সাথে। রাতুল সবাইকে

বল চলে যেতে এখানে কোনো নাটক সিনেমা হচ্ছে না।

---- না আমি কোথাও যাচ্ছি না তাসির। ওরা আমার মেঘের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। আমাকে ওকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

তাসির শান্তনা স্বরুপ বললো,

---- তুই ভয় পাচ্ছিস? নয়নকে ভয় পাচ্ছিস? ও কিছুই করতে পারবে না। টেনশন করছিস কেন?

---- আমি হলে সমস্যা ছিলো না তাসির। আমার মেঘফুলের দিকে কেউ তাকাবে তাও তার ক্ষতি করার চেষ্টায় আর আমি শান্ত হবো কি করে?

শ্রাবণ ভয় পাচ্ছে। সে দেখেছিলো আরিশার অবস্থা

মেয়েটার ভীত চেহেরা। আর নয়নের কুৎসিত হাসি

তার মনে প্রত্যেকটা মেয়ের জন্যই ভয় ছিলো তার।

আর সেখানে তার প্রিয় মানুষ তার বউ, মেঘফুলের দিকে চোখ গিয়েছে তাদের প্রতিশোধ নিতে তো তারা উৎপেতে থাকবে সুযোগের।

তাসির বুঝিয়ে টুঝিয়ে নিজের সাথে শান্ত নিরবিলি জায়গা নিয়ে আসলো। রাতুল পানি আনলো।

পানি খেলো শ্রাবণ মেঘের কথা শুনে তার গলা শুঁকিয়ে আসছিলো।

---- আসার সময় নিয়ে আসবি ক্লাস করা শেষ হলে নিয়ে যাবি। টেনশন কিসের? আর আমরা আছি না। সবসময় খেয়াল রাখবো।

মেঘ ক্লাস করছিলো। শ্রাবণ নামটা কানে আসতেই মনোযোগ সরে গেলো পেছনের দিকে। দুটো মেয়ে বলাবলি করছিলো শ্রাবণ আজকে অনেক মারামারি করেছে ভার্সিটির গুন্ডা ছেলেটা নয়নের সাথে। আর একটু হলেই নয়ন নামক গুন্ডাটার পরাণ পাখি আকাশে উড়াল দিতো। তার নাকি প্রাণ ভোমরা আছে। সেই কথার কারনেই এতোকিছু।

তারমানে রাতের বলা নয়ন ছেলেটার সাথে মারপিট করেছে শ্রাবণ। কি হয়েছিলো তার আসার পরে? এভাবে মারপিট না করে ভার্সিটি থেকে বের দিলেই তো হয়। মেঘ আগ্রহ নিয়ে পেছনে তাকালো। বললো,

---- আচ্ছা এই নয়ন নামক ছেলেটাকে ভার্সিটি থেকে বের করছে না কেন? এমন মানুষ রাখলে তো মেয়েরা নিরাপদ ভাবে চলাফেরা করতে পারবে না।

একটি মেয়ে বললো,

---- সবই টাকার পাওয়ার। ওর বাবার অনেক টাকা

তারউপর উপর থেকে বারণ করা ওই সয়তানকে

বের করা যাবে না। আর একটি বছর শেষ হলেই বিদায় হবে আপদটা।

মেঘ বুঝলো শ্রাবণের ক্লাসমেট নয়ন। তাই তো এতো শত্রুতা।

ক্লাস শেষ করে বাইরে আসতেই চোখ পড়লো শ্রাবণের উপর। বাইরে তারই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অগোছালো লাগছে শ্রাবণকে আজ। সাথে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। অপরদিকে শ্রাবণ মেঘকে দেখেই তার হাতটা খপ করে ধরে ফেললো। কোনো কথা বলার সুযোগ দিলো না সে। মুখে মাস্ক লাগিয়ে দ্রুত নিয়ে যেতে লাগলো পার্কিং এড়িয়ায় না গিয়ে উল্টো গেইটের দিকে যেতে লাগলো।

যে শ্রাবণ কখনোই ভয় পেতো না সে এখন মুখে মাস্ক পড়ে মাথা নুইয়ে। মেঘ চুপ থাকতে পারলো না। অবাক হয়ে বলে উঠলো,

---- এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? আর আপনি মাস্ক পড়েছেন কেন?

---- কোনো কথা বলো না চুপচাপ চলো আমার সাথে। যা বলার বাসায় গিয়ে বলবো।

---- কিসের জন্য এতে ভয় পাচ্ছেন আপনি?

শ্রাবণ থামলো। রিকশা ডেকেছে তাসির। মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক। বললো,

---- তোমাকে হারানোর ভয় আজ আমায় এমন ভাবে জেঁকে ধরেছে নিজেকে দিশেহারা লাগছে।

---- আপনি আজ মারপিট করেছেন তাই না? আর ওরা আমায় মারার হুমকি দিয়েছে। তাই আপনি

ছেলেটাকে একেবারে মেরে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। কেন পাগলামি করছেন আপনি? আপনি জানেন একটু এদিকসেদিক হলে আপনার কি হতো? আপনার সুন্দর জীবন মা বাবা ক্যারিয়ার সব হারিয়ে ফেলতেন আপনি।

---- সব হারাতে রাজি আছি আমি। শুধু তোমাকে আর মা বাবাকে না।

---- রিকশা এসে গিয়েছে।

শ্রাবণ রিকশার হুড তুলে দিলো। তারপর মেঘকে উঠতে সাহায্য করলো। নিজেও পাশে বসলো মেঘের। তাসিরসহ সব বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় তারা।

মেঘ শুধু শ্রাবণকে দেখছে যে কি না তাকে নই,

রাস্তায় চোখ বুলাচ্ছে বারবার এপাশ ওপাশ করে দেখছে।

---- কি দেখছেন আপনি এভাবে?

দেখতে দেখতেই বললো শ্রাবণ,

---- ওরা আক্রমণ করার চেষ্টা করতে পারে।

---- আপনার ভীতু আচরন দেখে আমি অবাক হচ্ছি শুধু।

---- আমার জন্য নয় মেঘ তোমার জন্য ভয় হচ্ছে।

তোমার কিছু হলে আমি বাঁচবো কিভাবে?

মেঘের ইচ্ছে হলো আর একটু জ্বালাতে,

---- সমস্যা কি আমি মারা গেলে আরেকটা বিয়ে করবেন।

তৎক্ষনাৎ তাকালো শ্রাবণ রাগান্বিত দৃষ্টিতে। মেঘ ভীত হলো। শ্রাবণ দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

---- আর একটা কথা বলে দেখো মুখ একদম শেলাই করে দেবো। ফাজিল মেয়ে কোথাকার।

মেঘ রেগে গেলো ফাজিল বললো তাকে? সেও বললো,

---- আপনি ফাজিল। আমি তো আপনাকে বুদ্ধি দিয়েছিলাম।

শ্রাবণ এবার বলে উঠলো,

---- বুদ্ধি? তো বলেন তো বউ, কি করিলে বউ আমায় ভালোবাসবে? আমার হয়ে থাকবে? আমার জন্য...

চলবে,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন