#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১৬
#কলমে_তাসনিম_লিজা
----- কপি নিষিদ্ধ!
---- পেয়েছিস ওদেরকে?
---- না ভাই। ওরা তো আসেইনি পার্কিং এড়িয়ায়।
---- আ'আমায় মারতে চেয়েছিলো ও, ওকে তো আমি আর ছাড়ছি না। প্রতিটা কাজে ও আমার পিছু পড়ে আছে। আমাকে ঠিক ভুল শেখাতে আসে ও । ওর বাপেরটা খাই নাকি পড়ি? এবার ওকে আর ছেড়ে দেবো না আমি৷ এমন ভাবে মারবো কেউ টের পাবে না।
---- বড় ভাই শান্ত হোন। আমরা আছি তো। সময় এসেছে এবার। ওই সুন্দরী ভাবিকে তুলে আনার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? আপনি ও শান্তি পেলেন,
শ্রাবণ ভাই শাস্তি পাবে আর আমরা ও মজা মাস্তি করবো।
নয়ন গলায় হাত বুলালো। হাসলো নিঃশব্দে। বলল,
---- কাজটা একান্তুই আমার বুঝলি? মেয়েটাকে আমার মনে ধরেছে। আহ চোখ দুটো দেখেছিস তোরা? এজন্যই তো পাগল হয়েছে শ্রাবণ। আমি ও না হয় একটু পাগল হলাম। তোরা ওর দিকে ভুলেও তাকাবি না। ভাগ্যিস আড়াল থেকে নজর রেখেছিলাম।
---- আচ্ছা ভাই।
গলা ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে তবুও হাসছে নয়ন। দেখতে শ্রাবণের মতোই সুন্দর, হাইড ও একই। কিন্তু, স্বভাব চরিত্র সব শ্রাবণের বিপরীতে। অপছন্দের তালিকায় প্রথম নয়নের নামটাই আসে প্রত্যেকটা স্টুডেন্টের মনে এবং মুখে।
____________________
মেঘ শ্রাবণের দিকে তাকাতে পারলো না। অন্যদিকে ফিরে আমতা আমতা করে বললো,
---- আ'আমি কি করে বলবো?
শ্রাবণের কথায় রিকশাওয়ালা মামা বলেন,
---- কিছু মনে না করলে একটা কথা কই মামা?
শ্রাবণ নিরদ্বিধায় বললো,
---- অবশ্যই মামা বলুন।
রিকশাওয়ালা মামা গাড়ি চালাচ্ছেন সামনের দিকে মনোযোগ দিয়ে। তারপর বলেন,
---- আমি যখন তোমার মামিকে পছন্দ করতাম তখন, সে ও আমায় অপছন্দ করতো । অনেক কষ্ট পেতাম। তারপর একদিন গাড়ি চালাতে চালাতে রাত হয়ে যায়। আমি আবার ভয় পাই না আর জানি বউ আমার জন্য অপেক্ষা করবে না কারন, সে তো আমায় পছন্দ করে না। রাত তহন দুইডা বাজে বাড়িতে গিয়ে দেহি বউ, বউ আমার জেগে আছে ঘুমাইনি। আমারে দেখেই হাউমাউ করে কাইন্দা দিলো। আমি তো টাস্কি খেলাম। কিছুক্ষণ বুঝতে পারলাম না কি হলো ব্যাপারটা। তারপর বউ আমার কানতে কানতে বললো, আমার সাথে নাকি আর খারাপ ব্যবহার করবো না। অবহেলা করবো না। আমি যেনো এমন আর না করি। সবসময় যেনো তাড়াতাড়ি আইসা পড়ি। আমারে ছাড়া তার কিছুই ভালো লাগে না। তাই বলি বউরে সময় দিতে হয়। হুটহাট ভালো সবাই বাসতে পারে না। আমি তো তোমার মামিরে প্রথম দেখাই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু, সে পারেনি। পারছে যহন আমার অনুপস্থিতি অনুভব করছে বুঝলা। আর আজ ও আমার হাত ছাড়েনি। সারাক্ষণ ভয়ে থাহে আমার কোনো বিপদ হইলো না তো,
---- বেশ ইন্টারেস্টিং তো মামা। আমি কি তাহলে অযথা টেনশন করছিলাম?
---- কিসের টেনশন মামা?
মেঘ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। শুনছ সে তবুও এমন ভাব করছে সে এসব শুনেইনি। শ্রাবণ তাকায় মেঘের দিকে তারপর হাহুতাশ করে বললো,
---- লাভ ইজ ওয়ান-সাইডেড, আঙ্কেল। মাই ওয়াইফ ডাজ়ন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড!
রিকশাওয়ালা মামা বুঝেনি। মেঘ বুঝলো তাকালো একবার। ফের চোখ ফিরিয়ে নিলো শ্রাবণের দুঃখী মুখটার থেকে। তারমধ্যে রিকশাওয়ালা মামা বলেন,
---- কিছুই তো বুঝলাম না মামা?
শ্রাবণের খেয়াল নেই সে কার সাথে কি বলছে। ফের বললো,
---- সরি মামা। বললাম বউ বুঝে না আমাকে। আপনার কপালের মতোই আমার কপালখানা। যদি শেষে আমার কপালটা আপনার মতো লটারি লাগে তাহলে আর টেনশন নেই।
হাসলেন রিকশাওয়ালা মামা। মেঘ খানিকটা রাগ রেখিয়ে বললো,
---- কি শুরু করেছেন আপনি?
শ্রাবণ মন বার করে বললো,
---- অভিযোগ করছি বুঝলা? কাউকে বলার মতো পাইনা। মানে....
---- পাগল হয়ে গিয়েছেন আপনি।
---- তোমার জন্যই তো।
---- আপনার তো সামনে এক্সাম এমন পাগলামি করলে সামনে কি হতে পারে ভেবে দেখেছেন?
শ্রাবণ সুবিধাবাদীর মতো বললো,
---- সব দোষ তোমার হবে। তুমি ঠিক থাকলে আমি ও ঠিক। নয়তো ফেল করলে সবাই বলবে ওই যে টপার ছেলে ফেল করেছে ওই ছেলের বউ যাচ্ছে।
---- ফালতু কথা বন্ধ করুন। আমি যথেষ্ট ঠিক আছি। আপনার কারনে পাগল হওয়ার সম্ভবনা আছে।
---- নো প্রবলেম মিসেস! দুজনে একসাথে পাগল হলে ভালোই হবে।
মেঘ কটমট করে তাকালো। চোখ দেখে বুঝলো
মেঘ ভীষণ ক্ষেপেছে।
ফোন এলো শ্রাবণের। মুহুর্তের মধ্যে সিরিয়াস হয়ে গেলো। রিসিভ করে বললো,
---- কি অবস্থা ওইদিকের? শা'লা মরেনি? একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছে।
মেঘ হা করে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। কি বলছে শ্রাবণ? মেরে ফেলতে মানে ওই গুন্ডাটা?
ওপাশ থেকে একজন বললো,
---- শ্রাবণ ভাই ও তো আপনাকে রেখে আপনার বউয়ের দিকে নজর দিয়েছে। সাবধানে রাখবেন ভাবিকে। আমার মতে, কিছুদিন ভার্সিটিতে আসতে দিবেন না। ও অন্য কিছু ভাবছে, এখনো কিছুই বলেনি প্ল্যান সম্পর্কে।
শ্রাবণ ক্রোধে ফেটে পড়ছে। পারলে এখনোই কিছু করে ফেলবে মনে হলো নয়নকে। মেঘ ভয় পেয়ে যায়।
কি হলো আবার?
---- ওর উপর নজর রাখবি শুধু। টাকার কথা ভাবিস না টাকা পেয়ে যাবি তোরা। আর ও যেনো ঘুনাক্ষরে ও বুঝতে না পারে তুই আমার হয়ে কাজ করছিস ওদের দলে।
----- কোনো উপায় নেই বুঝার। আমি ওদের হয়েই কাজ করছি। আর খুব তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝামেলা শেষ করো।
শ্রাবণ হাসলো। বললো,
---- পাপের গড়া পূর্ণ হয়েছে বুঝলি। ওর সময় ও ফুরিয়ে এসেছে। এই একটা ভুল ওর জীবনটা একদম রাতের অন্ধকারের মতো নিভিয়ে দিবে সব আলো। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ! রাখ ফোন।
---- আচ্ছা ভাই।
---- আবার কি করতে চাচ্ছেন? কেন এসবে জড়াচ্ছেন? আপনার কিছু হলে আমা...
শ্রাবণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো। বললো,
---- থেমে গেলে কেন? বলো তোমার..
মেঘ নিজেই থমকালো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার কথা শোনার অপেক্ষারত শ্রাবণের মুখাবয়বের দিকে। কি বলবে বুঝে পেলো না সে। ভ্রুঁ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণ, কি দেখছো? মেঘ মাথা নত করে ফেললো। একটা শব্দ ও উচ্চারণ করলো না। শ্রাবণ মনে মনে হাসলো। তবে রিকশাওয়ালা মামার কথায় ঠিক। সময়ে নিজস্বার্থে হারাতে হয়। কেউ যদি অপেক্ষা করে? তাহলেই তো মনের দূরত্ব গুছে যাবে। বাড়ির সামনে এসে রিকশা থামালো রিকশাওয়ালা। ভাড়া মিটিয়ে নামলো দুজন। মেঘ শ্রাবণ চললো তিনতলায়। তিনতলা পুরোটায় তাদের বাসা। বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া।
কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে দিলো কাজের আন্টি জামিলা বেগম। দুজনকে দেখেই চমৎকার হাসলেন তিনি। ভেতরে আসতে না দিয়েই বলে উঠলো,
---- শ্রাবণ বাবা বউ তো মাশাল্লাহ।
মেঘ নীকাব খুলে ফেলেছিলো গরমের কারনে।
খানিকটা থতমত খেলো সে। শ্রাবণ বললো,
---- আন্টি আগে ভেতরে আসতে দিন। তারপর না হয় দেখবেন।
---- ওহ হ্যা আসো বাবা। ভুলে গেছিলাম।
ভেতরে এসেই মেঘের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বললো,
---- তোমার নাম কি বউ?
---- জ্বি মেহেরিন মেঘ।
আবার ও হাসলেন জামিলা বেগম। বলেন,
---- যেমন সুন্দর তুমি, তেমন সুন্দর তোমার নাম।
আচ্ছা যাও তোমরা ফেরেশ হও গিয়ে আমি ঠান্ডা লেভুর শরবত বানিয়ে আনতেছি।
মেঘ মৃদু হেসে চলে গেলো। শ্রাবণ বললো,
---- আন্টি ওর নাম মেঘ ওকে বউ না বলে মেঘ ডাকবেন।
---- আচ্ছা বাবা তা-ই ডাকবো। তুমি ও যাও এহন।
বলেই দ্রুত হাঁটলেন কিচেনের দিকে। শ্রাবণ মুচকি হাসলো। নিজের বাড়ি এবং আপন মানুষ মনে করে কাজ করেন তিনি। শ্রাবণের মনে হয়নি তার মা দূরে ছিলো। সবসময় তাগাদা দিয়ে বলতো খাবার খাওয়ার জন্য। কোনটা কি লাগবে রেডি করে রাখতো। সে ও রুমে চলে গেলো।
___________________
দিব্যকে আজকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। আজ মোটামুটি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করছে সে। দোয়েল কলেজে যায়নি। তারমধ্যে অনেকবার কল দিয়েছিলো মেঘ। কেন জানি ধরতে ইচ্ছে হয়নি দোয়েলের। রিসিভ করলে যদি সে উল্টাপাল্টা কিছু বলে ফেলে এই ভয়ে। কিন্তু, এতে তো ওর কোনো দোষ নেই। সরল মনে আমার ভাইকে নিজের ভাই এবং তার স্নেহ ভালোবাসাকে ভাইয়ের মতোই মনে করেছে। অথচ ভাইয়া কতটা খেয়াল রাখতো তার। কোনটা পছন্দ, কোনটায় তার আগ্রহ, কি তার স্বপ্ন সব জানে দিব্য অথচ জানলো না মেঘের তার প্রতি কি অনুভূতি ছিলো। হয়তো নিয়তি এমনই ছিলো। আফসোসের একটা ভাঙা মন নিয়ে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে দিব্যকে। না হলে কেউ যদি সেই মনে আসে তাকে মেঘ নামক একতরফা ভালোবাসার স্মৃতি মুছে দিতে পারে তাহলে বোধহয় মুক্তি পেতো সে।
ফোনের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো দোয়েল।
সামনেই দিব্য ঘুমাচ্ছিলো। দোয়েল কেবিনে থাকা চেয়ারে বসে আছে। ইচ্ছে করছে কল দিতে মেয়েটাকে। অনেক ভালোবাসে সে মেঘকে। কত আদুরে ছোটবোন তার। কখনোই খারাপ বিহেভিয়ার করেনি মেঘের সাথে দোয়েল। সেদিন করেছিলো নিজে ও কষ্ট পেয়েছে আর মেঘ ও কষ্ট পেয়েছিলো। তবুও মেয়েটা ফোন দিলো ধরলো না সে। নাহ কল দিলে মেয়েটা খুশি হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কল দিতে গিয়ে বুঝলো ফোনে ব্যালেন্স নেই। নজর গেলো দিব্যর ফোনের দিকে।
তৎক্ষনাৎ ধীরে নিয়ে আসলো ফোনটা। কল দিলো মেঘের ফোনে। বাজতে লাগলো অনেকক্ষণ যাবত।
মেঘ ওয়াশরুমে গিয়েছে। ফোন বাজতেছিলো তাই
শ্রাবণ যাবে কি না ভেবে এগিয়ে গেলো ফোনের দিকে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই কপালে ভাঁজ পড়লো তার। দিব্য ভাইয়া নামে সেইভ করা নাম্বারটি। মেঘ বিবাহিত জেনে ও দিব্য ভাইয়া অসুস্থ অবস্থায় কেন ফোন করলো? দিব্য ভাইয়া তো মেঘকে চাই, আর শ্রাবণ চাই না মেঘের সাথে দিব্যর যোগাযোগ থাকুক। নাহ! রাগ হলো শ্রাবণের। তার মেঘফুলকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে তার কাছ থেকে কেঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা সে কখনোই তা হতে দিবে না।
কল কেটে দিলো শ্রাবণ। নাম্বারটি ব্লক লিস্টে ফেলে দিলো যত্ন করে। হাসি ফুটলো শ্রাবণের ঠোঁটে। বিরবির করে আওড়ালো,
---- আমার মেঘফুলের দিকে যে-ই বাজে নজরে তাকাবি, তাকে আমি ধ্বংস করে দেবো। অনেক হয়েছে আর না। দিব্য ভাইয়া আপনি আমার বড় তাও একজন পুলিশ অফিসার। আপনি আগে সুস্থ হোন তারপর আপনার সাথে দেখা হবে। আর নয়ন তোর ক্যারিয়া না শুধু তোর জীবনের ও ইতি ঘটবে এবার।
দোয়েল কষ্ট পেলো। হয়তো মেঘ রাগ করেছে তাই তাড কলটা রিসিভ করেনি। দ্বিতীয়বার দেওয়ার সাহস করলো না সে। বসে রইলো মনমরা হয়ে।
---- কি করছেন আপনি? আমার ফোন আপনার হাতে কি করছে?
এগিয়ে দিলো ফোনটা মেঘের দিকে। সাথে চেহেরাটা কাঠিন্যে করে বললো,
---- ফোন প্লাস সিম দুটোই ফেলে দিবে। আমি নতুন করে ফোন কিনে আনবো। যেখানে আমি আর আমার বাবা মা এবং তোমার বাবা ব্যথিত কেউ থাকবে না।
হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে মেঘ। বলে কি এসব শ্রাবণ? সাথে সাথে বলে উঠলো মেঘ,
---- আমি বলেছি আমার নতুন ফোন লাগবে? কেন হুটহাট এমন বিহেভিয়ার করেন? আমি এটাই রাখবো। আমার এতো নতুন ফোনের প্রয়োজন নেই। আমাকে নিয়ে কেন এতো সমস্যা আপনার?
---- কারন আমি চাই না আমার মেঘফুলের দিকে কেউ বাজে নজরে তাকাক। কেউ আমার থেকে বেশি ভালোবাসুক।
মেঘ তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
---- আপনার যত্নে আমার বিরক্ত লাগে। তবুও কেন এতো আগলে রাখেন আমায়?
শ্রাবণ অসহায় চোখে তাকিয়ে ম্লান কন্ঠে বললো,
---- স্বাভাবিক মেঘফুল! ভালোবাসো না তো তাই। মায়ায় পড়ে দেখো নিজেই ছটফট করবে আমার জন্য। আমার খেয়াল রাখা, আমার যত্ন করার জন্য, তখন নিজেই মন খারাপ করবে। আমায় খুঁজবে।
---- প্লিজ আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমার ব্যাপারে আপনি কোনো ইন্টারফেয়ার করবেন না। আমি দম ফেলতে পারছি না। আমার অস্বস্তি হয় আপনাকে দেখলে। আমায় বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ!
শ্রাবণ মেঘের করুন মিনতি শুনলো অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে। চুপচাপ সরে এলো মেঘের সামনে থেকে।
কাবার্ড থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে গেলো। মেঘ বসে পড়লো বেডে। ফোন চেইক করলো কিছুই পেলো না। রেখে দিলো সে। ভালো লাগছে না কিছুই। জামিলা বেগম আসলো। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে বললো,
---- আসবো মেঘ?
---- আসুন আন্টি।
ভেতরে এসে একটা গ্লাস এগিয়ে দিলেন তিনি।
বলেন,
---- দেরি হইয়া গেলো সমস্যা নেই খাইয়া নেও তো।
মেঘ গ্লাসটা হাতে নিলো। জামিলা বেগমের কথা
মতো খেতে লাগলো। সুন্দর করে হাসলেন জামিলা বেগম। গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন মেঘ। আরেক গ্লাস শ্রাবণের জন্য রেখে দিলো তারপর যাওয়ার সময় বললো,
---- মেঘ মা শ্রাবণ বাবা কিন্তু সোনার টুকরা ছেলে।
ওর মতো ছেলেকে স্বামী পেয়ে তোমার কপাল সত্যিই ভালা। আমারে মায়ের মতো সম্মান করে। বাজে নেশা করে না। সুন্দর করে কথা বলে। ওরে কোনোদিন ছাইরা যাইওনা। বুঝলা? আর হ্যা খাইতে আসো তোমরা।
মেঘ মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝালো। মানে বুজেছে মেঘ। হাসি মুখেই বেরিয়ে গেলো জামিলা বেগম। মেঘ নিজেকে কেমন অপরাধী লাগছে। বেশি বলে ফেললো না তো আবার? ভাবলো না আর সে। শ্রাবণ বেরিয়ে এলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। তাকালো না মেঘের দিকে। মেঘ একপলক তাকালো সুন্দর মুখটায় যেনো অমাবস্যা নেমে এলো। কষ্ট পেয়েছেন ওনি? রাগ করার মতো কথা কি বলেছে সে? শুধুই সবকিছু থেকে তাকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। মেঘ নিজের মতো করে থাকতে চাই ব্যাস এইটুকুই তো৷
চোখের সামনে দিয়ে শ্রাবণ বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। মেঘ কিছুটা অবাক হলো। অন্যসময় হলে মেঘকে বলতো খেতে যাওয়ার জন্য। হাতটি ধরার বাহানা করতো আর এখন? পরোক্ষেণেই মনে পড়লো সে তো বারণ করেছে। থাক ভালোই হয়েছে। মা বাবার সামনে লজ্জায় পড়তে হবে না আর। অহেতুক পাগলামি থেকে মুক্তি মিলেছে।
মেঘ বের হলো ডয়িংরুমে আসতেই চোখ গেলো ডাইনিং টেবিলের দিকে সবাই এসে গিয়েছে। সুমনা রাহমান মেঘকে দেখেই বলে উঠলেন,
---- কি ব্যাপার মেঘ এতো দেরি করেছো কেন?
সবাই অপেক্ষা করছি তো তোমার জন্য।
মেঘ সামান্য হাসলো। বললো,
---- সরি মা বুঝতে পারিনি।
বলেই শ্রাবণের পাশের চেয়ারটাই বসলো মেঘ। শ্রাবণ যেনো দেখলোই না কেউ যে পাশে এসে বসেছে। সে নিজের মতো নিয়ে খেতে লাগলো। এতে মেঘ কেন সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে তার বাবা মা। একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। কেউ'ই বুঝতে পারছে না।
মেঘ ধীরে খেতে লাগলো। জামিলা বেগম মেঘকে খাবার বেড়ে দিলো। তারপর নিজেও বসলো সবার সাথে। শ্রাবণ নাম মাত্র কিছুটা খেলো। তারপর শব্দহীন ভাবে উঠে পড়লো। কোনোদিনক তাকালো না সে। রুমে চলে গেলো। শ্রাবণ যেতেই সুমনা রাহমান মেঘকে জিজ্ঞেস করলেন,
---- কি হয়েছে মেঘ? শ্রাবণ এমন বিহেভিয়ার করছে কেন? কথা বলছে না।
মেঘ নিজেই বুঝতেছে না কিছুই। তার কথায় কি এমন হয়েছে ? কতবারই তো বারণ করে কই তখন তো এমন করে না? মেঘ ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বললো,
---- না মা কিছু হয়নি তো।
সারিফ শিকদার বলেন,
---- তোমার ছেলে আজ মারামারি করেছে। আমি অবশ্য ভুল দেখছি না বিষয়টা। কাজটা ঠিকই করেছে। এই বিষয় নিয়ে হয়তো মুড অফ।
সুমনা রাহমান চিন্তিত মুখে বলেন,
---- কারনটা এমন হলে আমাদের সাথে কথা বলবে না?
মেঘের ভালো লাগলো না এমন পরিস্থিতি। ওঠে পড়লো খাবার খাওয়া ছেড়ে। সোজা রুমের দিকে যেতে লাগলো। বাকি তিনজনে তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার দিকে। হঠাৎ কি হলো তাদের? থাক তাদের মধ্যে ঝামেলা হলে তারাই মিটিয়ে নিক।
মেঘ রুমে আসলো। শ্রাবণ ল্যাপটপে কি জানি করছিলো। সেদিকে খেয়াল না করে বললো,
---- আপনি এমন করছেন কেন?
শ্রাবণের দৃষ্টি নিবদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে।
ওভাবেই উত্তর দিলো,
---- কেমন করছি আমি?
---- আপনি মা বাবার সাথে কথা বলেননি তারপর খাবার না খেয়ে উঠে পড়েছেন।
---- আমার মা বাবা, আমি কথা বলবো কি না সেটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর খাবার খাওয়াটা ও আমার ইচ্ছের উপর নির্ভর করে। সেটাতে কারোর হস্তক্ষেপ করা আমি পছন্দ করি না।
মেঘের অশান্তি লাগছে এমনভাবে কথা বলছে কেন? কষ্ট লাগলো মেঘের। কোনো কথা বাড়ালো না মেঘ। রুম থেকে সোজা বেলকনিতে চলে গেলো। রুমের দরজাটা ও বাইরে থেকে লাগিয়ে দিলো।
শ্রাবণ তাকালো দরজার দিকে। তারপর নিজের কাজে মনোনিবেশ করলো।
ঘন্টাখানেক মেঘ বেলকনিতেই বসে রইলো। তার ভালো লাগছে না কিছুই। বাবা আসবে বিকেলে আর কিছুক্ষণ পর হয়তো। সেই অপেক্ষায় আছে সে।
শ্রাবণ তার কাজ শেষ করে কারোর সাথে ফোনে কথা বলে বাসা থেকে রেডি হয়ে বের হয়ে গেলো।
একবার দেখার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু, তার ফুল তাকে বারণ করেছে অবাধ্য কিভাবে হতে পারে শ্রাবণ?
মনের ইচ্ছে মনেই দমিয়ে রেখে বেরিয়ে যায় শ্রাবণ।
জাহিদ আহমেদ আসছে। জাহাঙ্গীর আহমেদ ও আসবেন বলেছিলো কিন্তু, আসতে পারেনি। কারন একটাই, ছেলে জানতে পারলে কষ্ট পাবেন। মেঘ
তার বাবাকে পেয়ে ভীষণ খুশি। জামিলা বেগম এলাহি আয়োজন করে রেখেছেন আগেই। সবাই জানতেন বলতে তা নই, শ্রাবণ জানিয়ে দিয়েছে জামিলা বেগমকে।
সারিফ শিকদার সুমনা রাহমান ও জাহিদ আহমেদ
মেঘকে নিয়ে জামিলা বেগমসহ সবাই গল্প করলেন। তারপর জোর করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করলেন। বাধ্য হয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সন্ধ্যার আগেই তিনি বেরিয়ে যান। যাওয়ার আগে তিনি মেয়েকে বার বার জিজ্ঞেস করেন এখানে সে ভালো আছে কি না? শ্রাবণকে তো পায়নি তিনি। মেঘ বরাবরই হ্যা বলেছে সে ভালো আছে।
রাত হলো অনেক বারোটার বেশি। মেঘ অপেক্ষা করছে কখন আসবে শ্রাবণ। বারবার ডয়িংরুমে যাচ্ছে সে। জামিলা বেগম চলে গিয়েছেন বিকেলে। সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। তারা হয়তো ভেবেছে শ্রাবণ এসে গিয়েছে। শ্রাবণ তো লেইট করে না। আর এখন সে বিয়ে করেছে লেইট করার তো কথা-ই না। ফোন দিয়েছিলো মেঘ বন্ধ বলছে। টেনশন হতে লাগলো মেঘের। হঠাৎ মনে পড়লো রিকশাওয়ালা মামার কথা। আচ্ছা শ্রাবণ ইচ্ছে করে দেরি করছে না তো? তাকে রিয়ালাইজ করাতে চাইছে না তো? এভাবে কি সম্ভব? একটা মানুষের অনুভূতি আসবে নাকি টেনশন আসবে এহেন পরিস্থিতিতে? শ্রাবণ এতোটা অবুঝের মতো কাজ করতে পারলো? আর টেনশন করলো না মেঘ। ধরে নিলো ইচ্ছে করেই শ্রাবণ বাইরে রয়েছে।
তবে সেটা বেশিক্ষণ রইলো না। ফোন বেজে উঠলো মেঘের। অচেনা নাম্বার তবুও কি মনে করে ধরলো মেঘ। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো তাসির,
---- মেঘ শ্রাবণ কি বাসায় আছে? ওর ফোন অফ কেন? একটু দাও তো ওর কাছে।
মেঘের মনটা অস্থির হয়ে উঠলো। শ্রাবণ তো তাদের সাথেই থাকে। আর তারা এভাবে কথা বলছে কেন? মেঘ চিন্তিত কন্ঠে বলে,
---- তাসির ভাইয়া ওনি তো বাসায় ফেরেনি। আর ফোনে ও পাচ্ছি না। আমি ভেবেছিলাম আপনাদের সাথে আছে। কোনো বিপদ হলো না তো আবার?
প্লিজ আপনার একটু দেখুনা না ওনি কোথায়?
---- শান্ত হও মেঘ আমরা দেখছি। আসলে ভয়টা সকালে যা হয়েছিলো নয়ন চুপ করে থাকার ছেলে না।
একজন্যই ভয়টা লাগছিলো। আচ্ছা আমরা জানাবো ওকে পেয়ে গেলে।
---- প্লিজ আমাকে জানাবেন আগে।
মেঘ দৌড়ে শশুর শাশুড়ীর রুমে গেলো। নক করলো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলেন সুমনা রাহমান। মেঘের চোখে পানি দেখে অবাক হলেন বললেন,
---- কাঁদছো কেন মেঘ? শ্রাবণ কিছু বলেছে?
মেঘের অনেক কান্না পাচ্ছে। কথা বলতে পারছে না ঠিক করে। সব হয়েছে তার জন্য। নিজেকে সামলে বললো,
---- মা আপনার ছেলে এখনো ফেরেনি। তাসির ভাইয়া ফোন দিয়েছিলেন ওনাদের সাথে ও নেই।
আমার ভয় করছে মা সকালে যা হয়েছে তারপর ওরা যদি ওনার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে তাহলে?
চলবে,,,,,,,,,