#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —১৭
#কলমে_তাসনিম_লিজা
----- কপি নিষিদ্ধ!
সারিফ শিকদার দ্রুত থানায় ফোন করলেন কোনো উপায় না পেয়ে। শ্রাবণের থানায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু, থানা থেকে জানানো হলো,
শ্রাবণ গিয়েছিলো সেই সন্ধ্যায় তারপর বেরিয়ে গিয়েছিলো। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে জানেন না তারা। তবে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে ফোন রেখে দেন।
রাত বাজে দুটো এখনো আসেনি ছেলেটা। সুমনা রাহমান কান্না করছেন ছেলের জন্য। অপরাধীর মতো মাথা নত করে নীরবে কেঁদে যাচ্ছে মেঘ। কি থেকে কি হলে গেলো হঠাৎ বুঝে উঠতে পারছে না সে। আফসোস ওই তিক্ত কথাগুলো না বললে বোধহয় এখন এমন একটা মুহুর্ত আসতো না। প্লিজ ফিরে আসুন আপনি। আমি কখনোই আপনার সাথে এমন বিহেভিয়ার করবো না। আমি বুঝতে পারিনি আপনি এতোটা কষ্ট পাবেন। আমি চাই না আপনি কষ্ট পান। আমি কেবল একটু দূরত্ব চেয়েছিলাম ব্যস এটুকুই। এতোটা দূরত্ব চাইনি আমি।
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে হলো। তিন জোরা চোখ তখন দরজার দিকে। সারিফ শিকদার যাওয়ার আগে দ্রুত পায়ে দৌড়ে গেলো মেঘ। তারাহুরো করে দরজা খুলতেই শ্রাবণের দেখা মিললো। কিন্তু,
একি অবস্থা শ্রাবনের? মেঘের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দৃষ্টিতে স্পষ্ট ভয়। তোতলানো স্বরে বললো,
---- আ'আপনার এ অবস্থা কেন? ঠিক আছেন আপনি?
শ্রাবণ মেঘের কথার কোনো জবাব দিলো না। কেবল একপলক রক্তাভ অক্ষিযুগলের দিকে তাকিয়ে সে পাশ কাটিয়ে চলে আসলো ভেতরে। শ্রাবণের এমন আচরণে কষ্ট পাই মেঘ। কপালের একপাশ কেটে গিয়েছে। ঠোঁটের কোণে রক্তের জমাট বেঁধে শুঁকিয়ে আছে। চুল এলোমেলো। এ্যাশ কালার শার্টটাতে রক্তের ফোঁটায় ভর্তি একেবারে। মেঘের সাথে অবাক হলো সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান ও। সুমনা রাহমান বলেন,
---- কি হয়েছে বাপ তোর? রক্ত কেন এতো? মারামারি করেছিস তুই?
সারিফ শিকদার ও চিন্তিত স্বরে বলেন,
---- কি হয়েছে হঠাৎ? এসব কি শ্রাবণ?
শ্রাবণ একবার তাকালো মা বাবার দিকে। বললো,
---- তেমন কিছুই না। তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো।
রুমে চলে গেলো শ্রাবণ। সুমনা রাহমান মেঘের দিকে এগুলেন। কাঁধে হাত রেখে বলেন,
---- মেঘ মা তুমি জিজ্ঞেস করে দেখো তো কি হয়েছে? রেগে আছে মনে হচ্ছে ছেলেটা। যাও রুমে যাও। চিন্তার কোনো কারণ নেই আর।
মেঘ নিঃশব্দে চলে গেলো রুমে। সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান নিজেদের রুমে চলে যান।
মেঘ রুমে এসে শ্রাবণকে পেলো না। ওয়াশরুমে শ্রাবণ। শরীরে যা অবস্থা তাতে শাওয়ার না নিলে
হবে? ইশ! কি একটা অবস্থা করেছে নিজের। কি এমন হয়েছিলো? গুন্ডা ছেলেটা কি আবার আক্রমণ করতে চেয়েছিলো শ্রাবণের উপর? মেঘ
এর মনটা ছটফট করতে লাগলো। হাসফাস করতে করতে সময় পেরুলো বোধহয়। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হতেই তাকালো মেঘ। মুখের অনেক জায়গায় আঘাত পেয়েছে শ্রাবণ। হাতে ও পেয়েছে।
মেঘ এগিয়ে গেলো কয়েক পা। সব বাদ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- আমার উপর রেগে আছেন আপনি তাই না?
শ্রাবণ নিজের মতো করে নিজের কাজে মগ্ন হয়ে বললো,
---- অন্যায় করেছো বুঝি?
মেঘ ফের বললো,
---- কথা ঘুরাচ্ছেন কেন?
শ্রাবণ তাকালো স্থির দৃষ্টিতে মেঘের চোখ বরাবর।
চেহেরায় তেমন পরিবর্তন দেখা গেলো না। বললো,
---- শ্রাবণ শিকদার কথা রাখতে পছন্দ করে মিসেস শ্রাবণ শিকদার। আপনি শান্তিতে থাকুন এই চাওয়াটাই আমার জন্য অনেক। আমি দূরত্ব বাড়িয়ে দিলাম আপনার জন্য। তাহলে কিসের এতো অস্থিরতা আপনার? রেগে থাকার মতো কারন দেখছি না তো আমি।
মেঘ তাকাতে পারলো না এলোমেলো পলক ফেলে চোখ নামিয়ে নিলো । তৎক্ষনাৎ বলতে নিলো,
---- আমি আমা..
---- থাক তোমার আর কিছুই বলতে হবে না। আমি সবই বুঝেছি। আমি ওভার পসেসিভ হয়ে গিয়ছিলাম। বুঝতে পারিনি অপরদিকের মানুষটার
ফিলিংস।
---- শুনুন তো আমার কথাটা।
শ্রাবণ হাত দিয়ে থামিয়ে দিলো। বললো,
---- বলছি না আমার থেকে তোমার ভালো থাকাটা
আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। সো আমি চাই না কোনো ঝামেলা হোক। আমি তোমায় কষ্ট পেতে দেবো না।
শ্রাবণ বেডে এসে শুইয়ে পড়লো। মেঘ হতবাক! করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের মুখের পানে
যে জোর করে চোখ বন্ধ করে আছে। কপালের জায়গাটা লাল হয়ে হালকা ফুলে গিয়েছে। ঠোঁটের কোণের ও একই অবস্থা। কোনো কথা না ভেবে ড্রয়ারে মলম খুঁজতে লাগলো মেঘ। কিছুক্ষণ হাতরে পেয়ে ও গেলো সেটা। বড় বড় পা ফেলে শ্রাবণের এদিকটায় এসে হাঁটু মুড়ে বসলো সে ৷ কাঁপা কাঁপা হাতে খানিকটা মলম নিয়ে কপালে লাগিয়ে দিতে নিলে হাত ধরে ফেলে শ্রাবণ। ঘুমোইনি সে। দেখছিলো শুধু মেঘের কর্মকান্ড। মেঘ চমকে ওঠে, শ্রাবণ হাত ছেড়ে দিয়ে বললো,
---- যেখানে আমার ছোঁয়ায় তোমার অস্বস্তি হয় তোমার। সেখানে তুমি নিজ থেকে সেই সমস্যাটা বাড়াতে চাচ্ছো কেন মেঘফুল? আমি কিন্তু মোটেও চাই না আমার মেঘফুল কষ্ট পাক। ঘুমিয়ে পড়ো নয়তো সকালে উঠতে দেরি হবে ভার্সিটি যেতে হবে তো।
মেঘের মুখটা ছোট হয়ে গেলো। তার কথা-ই তাকে ফেরত দিচ্ছে শ্রাবণ। সে তো সরি বলতেই নিচ্ছিলো কিন্তু, শ্রাবণ শুনলো কই? অভিমান জমলো মনে। থাক কথাটা তার অজানাই থাক।
মেঘ এসে পাশেই শুইয়ে পড়লো। শ্রাবণের মারপিট করে শরীর এমনিতেই ক্লান্ত লাগছিলো। তাই সময় লাগেনি চোখ বুঁজে আসতে। অন্যদিকে মেঘ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো।
___________________
ঘুম ভাঙতেই ঘুম উবে গেলো শ্রাবণের। মেঘ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। শ্রাবণকে জেগে থাকতে দেখো চোখ সরিয়ে নিলো মেঘ।
উঠে পড়লো সে । শ্রাবণ আটকালো না। সে নিশ্চুপ রইলো। মেঘ খুব মিস করছিলো শ্রাবণের পাগলামি গুলো। তবে এই শ্রাবণকে তার মোটেও ভালো লাগছে না। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে অন্য কেউ এই ছেলেটা। তার শ্রাবণ তো এমন না।
ফ্রেশ হয়ে এসে বাইরে বেরিয়ে গেলো মেঘ। মাথা ভর্তি হাজারো ভাবনারা কিলবিল করছে। শান্তি পাচ্ছে না মেঘ। মেঘ যেতেই শ্রাবণ ও ওঠে বসলো।
কপালটাতে হালকা ব্যাথা হচ্ছে। ঠোঁটের কোনটা ও
নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। সময় দেখলো ন'টা বাজে।
ফ্রেশ হতে চলে গেলো ওয়াশরুমে। মেঘকে দেখেই
শুধালেন সুমনা রাহমান,
---- মেঘ কিছু বলেছে শ্রাবণ?
মেঘ কি বলবে? শ্রাবণ তো তার সাথে কথা-ই বলতে চাই না।
---- না মা।
---- কি যে হলো ছেলেটার? হাসিখুশি ছেলে আমার
হঠাৎ এমন হলো কেন?
---- জানি না মা।
---- কি নিয়ে কথা হচ্ছে শুনি?
সারিফ শিকদার আসলেন। সুমনা রাহমান বলেন,
---- শ্রাবণের কথা বলছিলাম মেঘকে ও কিছুই বলে নি।
---- জোর করো না তোমরা। ওর ইচ্ছে হলে বলবে।
হয়তো বলা যাবে না তাই বলছে না। শ্রাবণ ঠিক আছে তো মেঘ?
---- হ্যা বাবা এখন ঠিক আছে একটু।
---- আচ্ছা ঠিক আছে সবাই খেতে আসো তো।
ভার্সিটিতে যেতে হবে তো।
মেঘ বললো,
----- আমার খেতে ইচ্ছে করছে না বাবা আপনারা খেয়ে নিবেন।
---- না খেলে হবে?
সুমনা রাহমান এর কথা শুনলো না মেঘ। রুমে চলে আসলো। চারদিকে তাকালো মেঘ চোখ গেলো বেলকনিতে। কি করছেন ওনি?
শ্রাবণ কারোর সাথে কথা বলছে। মেঘ একটু সামনে গেলো। কোনো কথা শুনতে পেলো না সে।
মেঘকে দেখে ফেললো শ্রাবণ। তাকালো তার দিকে। বললো,
---- কিছু বলবে?
---- জ্বি খেতে যেতে বলেছেন বাবা মা।
শ্রাবণ কল কেটে দিলো। বেরিয়ে এলো বেলকনি থেকে। সোজা বাহিরে চলে গেলো। মেঘ মন খারাপ করে তাকিয়ে থাকে। রেডি হয়ে নিলো সে ভার্সিটি
যাওয়ার জন্য।
শ্রাবণ খেতে বসে। সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান বারবার শ্রাবণের রুমের দিকে তাকান। ওনারা ভেবেছেন মেঘ আসবে না চাইলেও শ্রাবণ নিয়ে আসবে। কিন্তু, শ্রাবণ খেয়ালই করছে না মেঘকে। সুমনা রাহমান বলেন,
---- শ্রাবণ মেঘ যে আসেনি দেখেছিস তুই? ও না খেয়ে এতোক্ষণ থাকতে পারবে? মাথা ঘুরে পড়ে যাবে তো মেয়েটা।
শ্রাবণ তাকালো বাবা মায়ের দিকে। অতঃপর বললো,
---- কেউ যদি খেতে না চাই জোর করে খাওয়াবে নাকি তোমরা? মেঘ খেতে চাচ্ছে না হয়তো।
সারিফ শিকদার অবাক হোন ছেলের এহেন কথায়,
---- কি বলছিস তুই শ্রাবণ? মেঘ তোর বউ হয়।
তুই ওকে নিয়ে আসবি। জোর করবি তা না করে
এভাবে কথা বলছিস?
শ্রাবণ বিরক্ত হলো। বললে,
---- আমি তো বারণ করিনি বাবা। ও খেতে চাচ্ছে না। তো এখানে আমার কি করার বলো তো?
---- তোরা কি কোনো কারনে কেউ কারোর সাথে কথা বলছিস না? রাগ করেছিস?
---- না মা রাগ করবো না কেন? সবই ঠিক আছে।
---- তুই এমন করছিস কেন? তুই তো এমন ছিলিস না।
শ্রাবণ হাত ধুতে ধুতে বলে উঠলো,
---- মানুষ সবসময় এক থাকে না মা। অনেক সময়
নিজেকে পরিবর্তন করতে হয়।
ততোক্ষণে মেঘ রেডি হয়ে চলে আসলো। শ্রাবনের সাথে বের হলো। পিছু গেলো সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান এর থেকে বিদায় নিয়ে। মেঘ আর কথা বললো না। শ্রাবণ বিরক্ত হচ্ছে তার কথায় এই ভেবে।
বিরক্তি বোধহয় ভার্সিটিতে আসার পর কেটে গেলো শ্রাবণের। মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরলো।
চারিকে চোখ বুলিয়ে মেঘের ক্লাসের দিকে হাঁটতে লাগলো। মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে।
---- আমার জন্য বিরক্ত হতে হবে না আপনাকে আমাকে ওরা যদি মেরে ফেলে। ব্যাপারটা ভালোই হবে তাই না?
শ্রাবণ ইগলের ন্যায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে চারদিকে। ওভাবেই বললো,
---- মরার শখ হলে আমিই মারতে পারি অযথা কাউকে কষ্ট করে মারতে হবে না।
মেঘ ফের বললো,
---- অন্য কেউ মারলে কষ্ট হবে না। কিন্তু, আপনি মারলে আমার কষ্ট হবে। আপনার শাস্তি ভয়াবহ। আমি অনুভব করছি।
শ্রাবণ তাচ্ছিল্যের হাসলো। বললো,
---- কথাটা তো আমার বলা উচিত। তুমি কেন নিজের দিকে টেনে নিচ্ছো মেঘফুল?
---- কারন আম...
---- ক্লাসে যাও। আমি ব্যাথিত কেউ আসলে কোথাও যাবে না। ক্লাস শেষ করে এখানে দাড়িয়ে থাকবে।
মেঘকে কথাগুলো বলে চলে গেলো শ্রাবণ। মেঘ হতাশ হলো। তার কথাটা শুনতেই ছেলেটার যতো সমস্যা। ক্লাসের ভেতরে চলে গেলো মেঘ। শ্রাবণ ও কোথাও একটা গেলো।
____________________
---- দয়া কর বাবা আমাকে প্লিজ ছাড়িয়ে নে। আমি আর কখনোই কারের উপর নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দিবো না। আমি মেঘ আর তার বাবার কাছে ক্ষমা চাইবো।
ফাইয়াজ নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো,
---- আপনার কপাল ভালো জাহিদ আংকেলের মতো একজন ভাই পেয়েছেন। যার কি না আপনার ফাঁ'সির শাস্তি দাবি করার কথা ছিলো। সে আপনার উপর থেকে সব অভিযোগ উঠিয়ে নিয়েছে। কেন জানেন? আপনি যাদেরকে নিজের মতো চালিত করার চেষ্টা করেছিলেন তাদের ভালোর জন্য। নিজের মেয়ে মা হারা হয়ে অনেক কষ্ট পেয়েছে তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। আপনি তো সয়তান হলে ও মায়ের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ মা। সেই সুবাদে দুটো ছেলে মেয়ের জন্য আপনাকে মুক্তি দিচ্ছে। কালকে আপনার জামিন হবে।
আসি।
---- ও বাবা শুন না একটু আমার কথা?
ফাইয়াজ থামলো বললো,
---- আমি আপনার কেউ না। আমার সাথে আপনার কোনো কথা থাকতে পারে না। আপনি টেনশন করবেন না মুক্তি পাচ্ছেন তো। আর হ্যা আমাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিবেন না প্লিজ! এতে তারা কষ্ট পাই। অনেকসময় ভাবে আমি আপনাকে বলি এমন বিহেভিয়ার করতে। প্লিজ আমাকে তাদের কাছে ছোট করার চেষ্টা করবেন না।
মাথা নিচু করে মন খারাপ করে ফেলেন ফাইজা বেগম। ছেলেটা তার মাকে বড্ড ঘৃণা করে। তবুও আসছে সে এই অনেক। ফাইয়াজ আবারও বললো,
---- আমি আসতাম না বুঝলেন? দিব্য অসুস্থ। আপনার হাসবেন্ড চাইনি আপনি বের হোন। তিনি আসার কথা ও না। আর জাহিদ আংকেল তিনি আপনার মতো মানুষ নামক খুনির সাথে কথা বলবে? ভুল! তাই আমিই আসলাম দুঃখ নামক সুখবরটা দেওয়াড জন্য।
ফাইজা বেগম লজ্জায় আড়ষ্ট। ছেলের কথাগুলো তো ঠিক। স্বামী আসবে না। ওনার সাথে ও কম অন্যায় করা হয়নি ফাইজা বেগমের। আফসোস সব হারিয়ে বুঝা হলো সবাই ভালো ছিলো শুধু তিনি ছাড়া।
চলে গেলো ফাইয়াজ। পিছু ডাক দেওয়ার সাহস হলো না ফাইজা বেগম এর।
__________________
শ্রাবণ দুটো ছেলেকে ভার্সিটির পিছনে এনে হাত পা বেঁধে রেখেছে। শ্রাবণের সাথে তার চার বন্ধু ও আছে। তাসির একটা ছেলের চুল মুঠো করে টেনে
ধরে জিজ্ঞেস করলো,
---- বল কে পাঠিয়েছে তোকে? কে বলেছে শ্রাবণকে মারার জন্য? ওই নয়ন্না?
---- নাম বিকৃত করবি না তাসির।
শ্রাবণের কথায় তাসির রেগে বললো,
---- ওই সয়তানটা এটারই যোগ্য। আর কি করলে সামান্যতম লজ্জা লাগবে ওর? এক কাজ করি ওদের মেরে এখানে পুঁতে ফেলি। কেউ জানবে না আর এদিকটাতে আসবে ও না।
ছেলে দুটো ব্যাথায় ছটফট করছে। কারন তাদের কিছু করার আগে রিফাত রাতুল ও রামিম তারা বক্সিং করা শিখেছে দুটো ছেলের মাধ্যমে। নাক মুখ দিয়ে ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। তবুও মুখ খুলতে নারাজ ছেলে দুটো। মেরে ফেলার কথা বলতেই দুজন দুজনের দিকে তাকালো। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। এদিকে ও মৃত্যু ওইদিকে ও মৃত্যু কোথায় যাবে তারা? দুজনের মধ্যে একজন আর নিজেকে চুপ রাখতে পারলো না প্রাণের ভয়ে।
বললো,
---- আমায় মাফ করে দেন ভাই। আমার ঘরে বউ বাচ্চা আছে। আমি টাকার জন্য এমন করেছি। গরিব তো তাই ভালো মন্দ বিচার না করে এমন করেছি।
তেতে উঠলো রাতুল। থাপ্পড় দিতে গিয়ে ও থেমে গেলো। চোয়াল চেপে ধরে বললো,
---- তাই বলে কি তুই মানুষ মারবি? শ্রাবনকে যে পিছন থেকে মারতে আসছিলি যদি সত্যি সত্যি ছুরিটা লেগে যেতো? ও না দেখলে তো তোরা ওকে মেরে দিয়ে চলে যেতিস। তখন তোরা এই অভিনয় করার বদলে হাসতিস। অবশ্যই মরতে হবে তোদের। মারপিট করা বাহ কোথা থেকে শিখেছিস ডিসুম ডুসুম?
ছেলেটি বললো,
---- শিখিনি এমনিতেই মারতে পারি। আমাকে ছেড়ে দেন। আমি আর জীবনে ও এমন কাজ করবো না।
---- নাম বল তারপর তোদের মুক্তি।
এবার মুক্তি পাওয়ার আশায় বলে উঠলো ছেলেটি,
বাঁধা দিতে চাইলো পাশের ছেলেটি কিন্তু, শুনলো না ছেলেটি।
---- ওই নয়ন স্যার টাকা দিয়ছে আমাদের শ্রাবণ নামক ছেলেটির ছবি দিয়ে বলেছে মারার জন্য।
টাকার লোভে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। দয়া করে আমাদের মারবেন না।
---- চলে যা।
তাসিরসহ সব বন্ধু তাকালো শ্রাবণের দিকে। তাসির বললো,
---- মাথা ঠিক আছে তোর? ওদেরকে ছেড়ে দিবি তুই? আমি পুলিশকে ফোন করছি।
---- নিজের হাতে মারলে শান্তি লাগতো। ছেড়ে দিবি না ওদেরকে।
রাতুলের সাথে সহমত পোষণ করলো রিফাত। বললো,
---- ভালো সাজার নাটক করছে সয়তানের দল।
রামিম ও বাদ গেলো না বললো,
---- আমার হাতে তুলে দে ওদেরকে। আচ্চা মতো পিটিয়ে বক্সিং ও শিখে যাবো।
শ্রাবণ বারন করলো তাসিরকে। বললো,
---- দরকার নেই তাসির। অনেক হয়েছে এসব।
ওদের ছেড়ে দে।
বাধ্য হয়ে বাঁধন খুললো রিফাত ও রাতুল। সাথে কিল ঘুসি ফ্রিতে দিচ্ছে। বড্ড সাহস ওদের। মারতে চলে আসে।
ছেলেদুটো দৌড়ে পালালো। ভয়ে তটস্থ ছিলো তারা। চারজনই শ্রাবণের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। রাতুল বললো,
---- কি করতে চাচ্ছিস তুই?
শ্রাবণ গাছে পিট ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। এবার সে সিরিয়াস হয়ে বললো,
---- খুব বেড়েছে ও। এবার আর সেই পুরনো পুতুল পুতুল খেলা হবে না। এবার হবে আসল খেলা।
রেডি থাক নয়ন তোর সিনেমা এখানেই স্থগিত করা হবে। চল ক্লাসে যেতে হবে। স্যারের সাথে কথা আছে।
কারোরই মাথায় কিছু ডুকলো না। খোলে না বললে বুঝবে কি করে? চলে গেলো তারা।
___________________
---- এই যে মেহেরিন তোমার কি মন খারাপ?
পাশের মেয়েটির কথায় আচমকা চমকে ওঠলো মেঘ। এখানে সবাই মেহেরিন নামেই চিনে যতোটুকু মানুষ তাকে চেনে। বললো,
---- নাহ এমনি!
---- আমি মাহিরা। আমরা ফ্রেন্ড হতে পারি? তুমি খুব শান্ত আর আমার শান্তশিষ্ট মেয়েই পছন্দ।
মেঘ হাসলো। বললো,
---- অবশ্যই।
মাহিরা খুশি হলো। বললো,
---- তাহলে প্রতিদিন তুমি আমার সাথে বসবে। আর আমরা অনেক মজা করবো। ফুসকা খাবো,
আইসক্রিম খাবো। ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখবো। ঠিক আছে?
সায় দিলো মেঘ।
---- আচ্ছা মাহিরা।
মাহিরা আবার ও বললো,
---- যদি কিছু না মনে করো তাহলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
মেঘ বললো,
---- তুমি কি ম্যারিড?
মেঘ সরাসরি বললো,
---- হ্যা তুমি?
মাহিরা হাহুতাশ করে বললো,
---- জামাই তো দূর মেহেরিন বয়ফ্রেন্ড ও নাই কপালে। মানে আমি পিউর সিঙ্গেল।
মেঘ হাসলো মাহিরা কথা বলার স্টাইল দেখে। কতটা দুঃখী সেটা তার কথায় ফুটিয়ে তুললো। মেঘ সান্তনা দিয়ে বললো,
---- কষ্ট পেয়ো না মাহিরা। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি চান তুমি সৎ থাকো। হয়তো তিনি তোমার ভাগ্যে সৎ ও চরিত্রবান একজন মানুষ রেখেছেন। বয়ফ্রেন্ড নেই এটা নিয়ে
দুঃখ পাওয়ার মতো কিছুই তো আমি দেখছি না।
মাহিরা খুশি হলো মেঘের কথায়। বললো,
---- একদম ঠিক বলেছো মেহেরিন। কত সুন্দর চিন্তাভাবনা তোমার। আর আমি কি না একটা অবৈধ রিলেশনের জন্য হাহুতাশ করছিলাম? আসলে সবাই বলে তো আমার বয়ফ্রেন্ড আছে তোর নেই এটা যেনো লজ্জাকর একটা বিষয় না থাকলে অপমান করে। হাসে আমাকে নিয়ে। অথচ
এটা পাপ। এটা কেউ বুঝলো না।
মেঘ ভরসা দিয়ে বললো,
---- তাদের কথা শুনবে না তুমি। তুমি ঠিক পথেই আছো। বাজে সম্পর্কে জড়িয়ে নিজেকে কষ্ট না দেওয়ায় ভালো। সময় হয়ে গিয়েছে আজ। কাল কথা বলবো ঠিক আছে?
---- আচ্ছা। তুমি অনেক ভালো কিউটের ডিব্বা।
---- এই যে সুন্দরী রমনী তুমি আরো বেশি কিউট।
সাবধানে যাবে কেমন।
---- ঠিক আছে মেহেরিন আমি তাহলে আসি এখন।
---- আচ্ছা।
মেঘের মনটা হালকা লাগলো। তার এই হঠাৎ মিলতে না পারার কারনে শ্রাবণের সাথে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিজের এই বদ অভ্যাসটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। সবার সাথে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করছে সে। শ্রাবন অনেকক্ষণ যাবত।
শ্রাবণ আসতে নিলে পেছন থেকে ডাক পড়লো,
---- শ্রাবণ ভাইয়া।
তাকালো শ্রাবণ তাড়াহুড়ো করে। মেঘ অপেক্ষা করছে তারজন্য।
কনক দাঁড়িয়ে আছে। পরনে বোকরা। হিজাব বাঁধা। নিকে পরিপাটি করে রেখেছে অন্যরকম ভাবে। মেকআপ ও নেই মুখ জুড়ে। চোখ সরিয়ে নিলো শ্রাবণ। বললো,
---- কিছু বলবে?
কনক আকুতি ভরা কন্ঠে বললো,
---- দেখো শ্রাবণ ভাইয়া আমি তোমার জন্য নিজেকে চেইঞ্জ করে ফেলেছি। সর্ট ড্রেসআপ সাজসজ্জা ছেড়ে থ্রিপিস পড়েছি। বোরকায় নিজেকে আবৃত করেছি। নামাজ পড়ছি। সবকিছু শিখছি। এবার তো প্লিজ আমাকে মেনে নাও আমি তোমার বউয়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিবো তারপর ও প্লিজ.....
শ্রাবণ বিরক্ত হলো। তবুও বললো শান্ত স্বরে,
---- বোকা আপু নিজেকে পুরপুরি চেইঞ্জ করলে আমাকে দ্বিতীয়বার একই কথা বলতেন না। ইসলাম আমাদের এমন অসভ্যতা শেখায়নি। যেখানে অন্যের জামাইয়ের দিকে নজর দেওয়া, বুঝলেন আপু? আগে নিজেকে সঠিকভাবে পরিবর্তন করুন তারপর দেখবেন আমি ভুল আপনার জন্য। আসি।
মেঘ দূর থেকে লক্ষ করেছিলো। কয়েক পা এগিয়ে
যেতে নিলেই শ্রাবণ চলে আসে। শ্রাবণ মেঘকে দেখে বললো,
---- সরি দশমিনিট লেইট করে ফেলেছি। চলো।
হাত ধরতে নিলে হাত সরিয়ে নিলো। শ্রাবণ অবাক নয়নে তাকালো মেঘের দিকে। মেঘের চোখ চিকচিক করছে। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি
শ্রাবণ ফের প্রশ্ন করলো,
---- কি হয়েছে এমন করছো কেন?
মেঘ তাকালো না শ্রাবণের দিকে। দূরত্ব বজায় রেখে বললে,
---- আপনি হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন তাই আমি চাচ্ছি না আপনার কোনো অসুবিধা হোক।
শ্রাবণ শুনলো না ফট করে হাত ধরলো। মেঘ ছাড়াতে নিয়ে ও পারলো না। শ্রাবণের গম্ভীর স্বরে থেমে গেলো মোচড়ামুচড়ি বন্ধ হয়ে গেলো।
---- যা বলেছো শুনেছি। এই মুহুর্তে যদি একটু আমার অবাধ্য হয়েছো তাহলে বাসায় গিয়ে বুঝতে পারবে এর পানিশমেন্ট কতটা ভয়ংকর হয়। আমাকে রাগিও না মেঘ।
পুরোটা পথ নীরবে আসলো দুজনে। বাসায় আসলো চুপচাপ। রুমে এসেই মেঘ রেগে বলে উঠলো,
---- আপনি ওই মেয়েটির সাথে কি কথা বলছিলেন
আমাকে দাঁড় করিয়ে?
শ্রাবণ দেখলো মেঘের ক্রোধান্বিত মুখশ্রী। প্রখর
অধিকারবোধ। চোখ ছোট ছোট করে তাকালো শ্রাবণ। দু পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মুখোমুখি। বললো,
---- মেয়েটির সাথে কি বলেছি তা আমি তোমায় বলতে যাবো কেন? কে তুমি?
মেঘ নিজের জায়গায় অটুট রইলো। বললো,
---- আমি আপনার স্ত্রী। আমার জানার রাইট আছে আমার স্বামী কোন মেয়ের সাথে কথা বলছে, কারোর সাথে রিলেশন আ...
---- হুসসস!
আঙুল ছুঁয়ে দিলো শুষ্ক ঠোঁট জোড়ায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শ্রাবণের। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ হাসি।
বললো,
---- আমি জানি আমি কেমন। আমার সাথে কাউকে জড়িয়ে কিছুই বলবে না তুমি । আমার সাথে যে জুড়ে আছে সবটা জুড়ে সেই আমায় বুঝে না সেখানে অন্যকারোর সঙ্গ আমার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আপনজন না বুঝলে পর বুঝবে সে এক্সপেক্ট শ্রাবণ করে না।
স্থির হয়ে গেলো মেঘ। মেঘের চোখে নিবদ্ধ হলো
তার অবাক চাহনি। চলে গেলো শ্রাবণ। মেঘ সস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার মানে ওই মেয়েটার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
ফ্রেশ হয়ে খেতে আসলে মেঘ এলো না। সুমনা রাহমান বলেন,
---- শ্রাবণ কি হচ্ছে এসব? মেঘ আসছে না কেন? তুই গুরুত্ব দিচ্ছিস না মেয়েটাকে। আমাদের এসব ভালো লাগছে না কিন্তু,
শ্রাবণ সোজাসাপ্টা ভাবে বললো,
---- ও খেতে চাচ্ছে না তো আমি কি করবো?
সারিফ শিকদার বলেন,
---- মান অভিমান থাকতেই পারে তাই বলে এতোটা
অবহেলা?
শ্রাবণ তাকালো বাবার দিকে। বললো,
---- তোমার অবহেলা মনে হলে ও এটাই ঠিক। সে আমার কারনে বিরক্ত আমি চাচ্ছি না সে ডিস্টার্ব হোক।
---- মেঘ কষ্ট পাচ্ছে শ্রাবণ। বুঝিস তুই মেঘকে?
মেয়েটার মুখের কথা শুনে তোর এমন আচরণ দেখে আমি অবাক হচ্ছি।
---- কি চাচ্ছো তোমরা?
সুমনা রাহমান বলেন,
---- মেঘকে নিয়ে আয়।
---- আমার মতো ভুল করিস না বাপ।
শ্রাবণ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো। রুমের দিকে যেতে লাগলো। মেঘ মন খারাপ করে পড়ার টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে।
---- মেঘ!
মেঘ মাথা তুলে তাকালো। বললো,
---- জ্বি বলুন।
শ্রাবণ বললো,
---- খেতে চলো।
মেঘ অভিমানী স্বরে বললো,
---- আমার খিদে নেই। আপনি কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?
শ্রাবণ নিজেকে শান্ত করলো। বললো,
---- আমার কষ্ট বুঝো নাকি? বুঝলে তো এতোক্ষণ
এখানে বসে থাকতে না। চলো আমার সাথে।
মেঘ জেদ ধরেই বললো,
---- মা বাবার কথা শুনে আসছেন। আপনাকে কষ্ট করতে হয়েছে তার জন্য সরি। আমার খিদে নেই।
শ্রাবণ তড়িৎ এগিয়ে আসলো। হেঁচকা টেনে নিয়ে আসলো রুমে বাইরে। মেঘ হকচকিয়ে উঠলো।
---- ছাড়ুন! বলছি তো খাবো না।
সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান দাঁড়িয়ে গেলেন
সুমনা রাহমান বলেন,
---- মেঘ কি হয়েছে? সকালে না খেয়ে চলে গেলে। এখনো খেতে আসো নি। শ্রাবণ কিছু বলেছে? বলো আমায়?
মেঘ মাথা নত করে রাখলো। বললো,
---- কেউ কিছুই বলেনি মা আমার খেতে ইচ্ছে করছে না তাই আসিনি।
---- চুপচাপ বসো মেঘ খেয়ে তারপর উঠবে। আর আমার ছেলে কি বলেছে তা খাওয়ার পর জানা যাবে।
সারিফ শিকদার এর কথায় বসলো মেঘ। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। তার কথায় শ্রাবণের এতোটা পরিবর্তন আশা করেনি মেঘ। সেই কারনেই তার গলা দিয়ে খাবার নামছে না। এই দুদিনে লোকটার আচরণে এতোই অভ্যস্ত হয়েছে যে এখন অবহেলা সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে বলতে আমাকে অবহেলা করবেন না প্লিজ। কোথাও একটা ভীষণ পুড়ছে। কষ্ট হচ্ছে।
চলবে,,,,,