ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

১৮তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ১৮

#কলমে_তাসনিম_লিজা

----- কপি নিষিদ্ধ!

খাবার টেবিলটা নিস্তব্ধতায় মোড়া। কেউ কথা বললো না। নাম মাত্র মুখে নিলো খাবার মেঘ। তারপর সবার আগেই ওঠে পড়লো। শ্রাবণ খেয়াল করলো কিছুই বললো না। হাসিখুশি সবাই আজ কেমন স্তব্ধতায় থমকে গিয়েছে। হাসি মিলিয়ে সেখানে জায়গা করে নিলো টেনশন। শ্রাবণ নিজের মতো খেয়ে উঠে পড়লো। যেতে নিলে বাধ সাধলো সারিফ শিকদার। বললো,

---- কি হয়েছে আমাদের বলা যাবে?

---- দিস ইজ আ প্রাইভেট ম্যাটার বিটুইন আস,

ড্যাড। উই উড বি হ্যাপি ইফ ইউ ডোন্ট ইন্টারফেয়ার ইন দিস।

কথাগুলো বলে চলে গেলো শ্রাবণ। সারিফ শিকদার কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। সুমনা রাহমান ও চিন্তিত। কত সুন্দর দুজন একসাথে ছিলো হঠাৎ কি হতে পারে? ছেলেটা ও অবুঝের মতো কথা বলছে। মেয়েটা ও কিছুই বলছে না।

দুজনেই মুড অফ করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। জামিলা বেগম ও পাশে দাঁড়িয়ে আছে মন খারাপ করে।

দম বন্ধ লাগছে মেঘের। লাইট অফ করে ঘরটাকে হালকা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখে পড়া টেবিলেই স্থির হয়ে বসে আছ। শ্রাবণ খেয়াল করলো মেঘের মন খারাপ। পাশে এগিয়ে গিয়ে বসলো চেয়ারে।

থমকালো মেঘ খানিকটা। তাকালো ফ্যালফ্যাল করে। বললো,

---- কিছু বলবেন?

শ্রাবণ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে।

শান্ত স্বরে বললো,

---- কষ্ট হচ্ছে? কিন্তু, কেন?

মেঘের নত দৃষ্টি। বলতে চাইলেও শ্রাবণের অবহেলা

তাকে বাঁধা দিলো। জেদ চেপে বললো,

---- কষ্ট কিসের? আমার তো কষ্ট পাওয়ার কোনো কারন নেই। পাওয়ার কথা?

শ্রাবণের একই চাহনি। ফের বললো,

---- আমি কি অন্যায় করছি তোমার সাথে? তুমি চাওনি আমি হীন শান্তি জীবন? তাহলে কেন এতো মন খারাপ। জাস্ট আনসার দাও বিরক্ত করবো না।

মেঘ কলম দিয়ে খাতায় অযথা আঁকিবুঁকি করছে।

শ্রাবণের কথায় সায় দিয়ে বললো,

---- হ্যা আপনি ঠিক বলেছেন। আমি আপনি হীন শান্তিময় জীবন চেয়েছিলাম। আমি পাচ্ছি শান্তি। আপনি এতো উতলা হচ্ছেন কেন?

শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে ফেললো। মেয়েটা জেদি।

মনের কথা কখনোই মুখ ফুটে বলবে না। বলবে না ভালোবাসি না তবে, আপনাতেই অভ্যস্ত আমি। আমার ভালো থাকা আপনার জন্য। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে গেলো। বললো,

---- অবশ্যই উতলা হবো। কারন আমি চাই না তুমি আমার কারনে বিন্দু পরিমান কষ্ট পাও। তোমার কষ্টে কেউ একজন ভীষণ কষ্ট পাই।

শ্রাবণ নিজের ফোন ওয়াচসহ ওয়ালেটটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে মেঘের কন্ঠস্বর ভেসে এলো কানে,

---- যেখানে যান সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসবেন। ভয়

মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

শ্রাবণ ক্ষীণ হাসলো। চলে গেলো রুম ছেড়ে। মাকে বলে বের হয়ে গেলো ফ্ল্যাট থেকে। মেঘ বেডে এসে বালিশে মাথা রেখে ফ্যানের দিকে আনমনে তাকিয়ে রইলো। ভাবতে লাগলো, তার ভুল কি?

তার এমন হঠাৎ খারাপ লাগার কারন কি? অন্য কারোর সাথে কেনো লোকটাকে সহ্য হচ্ছে না?

কেন তার অবহেলা পরম যন্ত্রণায় শিক্ত করে তার হৃদপিন্ডটাকে । এমন তো হয়নি কখনো? তাহলে কি শ্রাবণের কথা-ই ঠিক? মায়ায় পড়ে গেলো মেঘ শ্রাবণের ? মেঘ তো মানে শ্রাবণ তার হাসবেন্ড তার সবকিছু। তার পরিচয়। তার বেচে থাকার কারন। তাহলে আজ কি মন স্বীকার করলো শ্রাবণহীন মেঘ শূন্য। মেঘের জীবন শ্রাবণকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তার নাম আসলে কি তা মেঘের জানা নেই। দোটানায় পড়ে আছে মেঘ। না পারছে বলতে না পারছে দূরে থাকতে। কেন শ্রাবণ তার সাথে আগের মতো বেহায়াপনা করে না? কেন তার বারণে একই কাজ করে না? অজানা কারনে মেঘের চোখ ফেটে কান্নার ফোয়ারা ছুটছে। ভাবতে ভাবতে আর কাঁদতে কাঁদতে মেঘ একসময় ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলো।

সুমনা রাহমান এসেছিলেন দরজা খোলা ভেবে ।

মেঘ ঘুমিয়ে আছে দেখে ডিস্টার্ব করলো না। দরজা চাপিয়ে শব্দহীন পায়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে৷ কি যে হলো তাদের মনটা খচখচ করছে সুমনা রাহমান এর। কি হয়েছে জানার আগ্রহ খুব। কিন্তু, ছেলে মেয়ে কেউই বলতে চাচ্ছে না৷ এতোই কি প্রাইভেসি যে মা বাবাকে বলার মতো না? বুঝে আসছে না সুমনা রাহমান এর। ওনার স্বামীকে বললে বলেন ওদেরটা ওদেরকে বুঝতে দাও। আমাদের এর মধ্যে যেতে বারণ করেছে শ্রাবণ।

তারপর আর কিছুই বলার থাকে না সুমনা রাহমান এর।

__________________

---- আসসালামু আলাইকুম স্যার৷ অনেকদিন পর আসলেন। কিছু চেইকে সাইন করার ছিলো। আর কিছু ফাইল ছিলো৷ প্লিজ দেখে নিবেন কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।

---- ওয়ালাইকুম আসসালামু! আব্দুল্লাহ ভাই আপনি দেখেছেন ফাইলগুলো?

শ্রাবণের কথায় মুচকি হাসলো আব্দুল্লাহ। বললো,

---- জ্বি স্যার আমি দেখেছি সব ঠিকঠাক আছে।

শ্রাবণ ও হাসলো। কি সুন্দর হাসি যার হাসিতে আব্দুল্লাহ ও আরো হেসে উঠলো। শ্রাবণ বললো,

---- আব্দুল্লাহ ভাই আপনি কেন শুধু শুধু আমায় লজ্জায় ফেলেন বলুন তো? যে মানুষটা আমার অবর্তমানে নিজের মতো অফিস সামলাচ্ছে । সৎ থেকেছে সবসময়। একটা টাকা বেশি নেওয়ার চেষ্টা করেনি কখনো। তার থেকে বেশি আমি বুঝবো? ইম্পসিবল! আপনি চেইকবই দিন আমি সাইন করে দিচ্ছি। আর ফাইলগুলোতে আমার মনে হয় না ভুল কিছু আছে।

---- তবুও স্যার!

শ্রাবণ বললো,

---- বিশ্বাস শব্দটা আপনার সাথে যা-ই আব্দুল্লাহ ভাই। আপনি সেই সম্মানটাই ডিজার্ভ করেন। তাই

আমি আপনার প্রাপ্য সম্মানটাই দিতে চাই। অবিশ্বাস করার মতো কিছুই নেই। চেইক দেওয়া মানে আপনাকে অসম্মান করা।

আনন্দে বুকটা বরে উঠলো আব্দুল্লাহ মাহমুদ এর।

দশ বছর যাবত কাজ করে এই অফিসে আব্দুল্লাহ মাহমুদ। শ্রাবণের দাদুর বেঁচে থাকার সময় থেকে। সবসময় অনেক আদর করতেন শ্রাবণের দাদু। কারন আব্দুল্লাহ ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য একজন লোক। কখনোই লক্ষ লক্ষ টাকা দেখে মনের মধ্যে লোভ জন্মাইনি তার মনে। এজন্য সবাই তাকে সম্মান করে। সবার মধ্যমনি বলা যায় আব্দুল্লাহ মাহমুদকে।

খুশি হয়ে সাইন করা চেইক ও ফাইল নিয়ে বলেন,

---- আমি কফি পাঠাচ্ছি স্যার।

---- ঠিক আছে।

আব্দুল্লাহ চলে গেলো। শ্রাবণের মন ভালো নেই।

অশান্ত লাগছে মনের মধ্যে। তার মেঘফুল ভালো নেই। এখানে তার ভুল বা অন্যায়টা কোথায়? সে তো আগলে রাখতে চাই তার ফুলকে। কিন্তু, সে তো তার যত্নে বিরক্ত হচ্ছে। কেন করছে মেয়েটা এমন? তাকে না বুঝুক ভালো না বাসুক তাকে দূরে সরিয়ে কেন দেই মেয়েটা? এই যে সকালে খাইনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে শ্রাবণ। তার জোর করায় মেঘের দমবন্ধ লাগুক এটা ও চাই না শ্রাবণ। সে ভালো থাকুক জাস্ট এইটুকুই চাওয়া।

---- মে আই কাম'ইন স্যার?

শ্রাবণের ভাবনা চ্যুত হলো। বললো,

---- কাম'ইন!

কফি নিয়ে আসলো একজন। হাসি মুখে কফি নিলো শ্রাবণ। বললো,

---- আব্দুল্লাহ ভাইকে বলবেন স্যার ডেকেছেন। ইমিডিয়েটলি দেখা করার জন্য।

---- ওকে স্যার।

চলে যায় লোকটি। ফোনটা হাতে নিলো শ্রাবণ। মেঘকে একটা কল দিতে ইচ্ছে হলো৷ কল লিস্ট

চেইক করে নাম্বার নই, মেঘফুল নামটাই চোখে পড়লো। হাসি ফুঠলো সামান্য। কল দিলো তৎক্ষনাৎ । একবার দুই বার তিন বার বেজে গেলো মেয়েটা কল রিসিভ করলো না। শ্রাবণের সামান্যতম হাসি টেনশনে রুপ নিলো। ফের মায়ের ফোনে কল দিলো। সাথে সাথেই রিসিভ হলো। শ্রাবণ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- আসসালামু আলাইকুম মা। মেঘ কোথায়? কি করছে ও কল দিচ্ছি রিসিভ করছে না কেন,?

কথা বলার সুযোগই পাচ্ছেন না সুমনা রাহমান। তিনি ছেলেকে শান্ত হতে বলেন,

---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। এতো কথা একসাথে জিজ্ঞেস করলে বলবো কিভাবে? শান্ত হয়ে শোন তো আগে।

---- বলো মা আমি শুনছি শান্ত হয়ে।

মনে মনে হাসলেন সুমনা রাহমান। ছেলেটা একদম বাবার মতোই হয়েছে। তবে ফিলিংসটা একদম বাবার বিপরীতে । তবে বাসায় কথা নেই মেঘের সাথে। আর এখন এতো অস্থিরতা কিসের? তিনি বলেন,

---- মেঘ ঘুমাচ্ছে দেখলাম। কল দিলে পাবি কি করে?

অস্থির মন খানিকক্ষণের মধ্যে শীতল হলো। মেঘ তাহলে ঠিক আছে। শ্রাবণ কি না কি ভেবে বসে ছিলো। শ্রাবণ মৃদু স্বরে বললো,

---- ঠিক আছে মা নিজের ও মেঘের দিকে খেয়াল রেখো। আমি রাখছি তাহলে। আর দেরি হবে না বিকেলেই চলে আসবো। মেঘকে বলে দিও৷

---- আচ্ছা বাপ তাড়াতাড়ি চলে আসবি। টেনশন হয় আমাদের। রাখছি তাহলে।

---- হুম।

---- স্যার ডাকছিলেন?

আব্দুল্লাহ মাহমুদ তাড়াহুড়ো করে আসলেন শ্রাবণের কেবিনে। শ্রাবণ মুখে হাসি বজায় রেখে বললো,

---- বসুন আপনি।

সামনের চেয়ারে হাসি মুখে বসলো আব্দুল্লাহ মাহমুদ। তারপর কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালো শ্রাবণের দিকে। বললো,

---- কোনো সমস্যা হয়েছে স্যার ? আমি কোনো ভুল করে ফেলেছি?

---- না আপনি কিছুই করেননি। আপনাকে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় চলে যাবো ভাবছি।

আব্দুল্লাহ মাহমুদ তনু মনু করে বললো,

---- কিন্তু স্যার আপনি তো অনেকদিন পর আসলেন। আজ এখনই চলে যাবেন?

শ্রাবণ হাতে কলম নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

---- বিয়ে করেছি ভাই, বউকে না দেখলে শান্তিই লাগে না মনের মধ্যে। আই হোপ আপনি খুব ভালো করেই জানেন।

লজ্জামাখা হাসি দিলেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ। বললেন,

---- ঠিকই বলেছেন স্যার। প্রথম প্রথম আমার ও একটু কষ্ট হয়েছিলো। তারপর আপনার দাদু আমায় নিজ থেকেই ছুটি দিয়েছিলো। ভীষণ খুশি হয়েছিলাম আমি।

শ্রাবণ মৃদু হাসলো। বললো,

---- তো, আমার কি ছুটি প্রাপ্য না?

---- অবশ্যই স্যার কেন হবে না? আপনার অফিস আপনি যা বলবেন।

---- উহুম! বলো এটা আমাদের অফিস। একেকজন যেভাবে পরিশ্রম করে নিজের কাজের মতো, আমার তো না আসলে ও চলে। দাদু মানুষ চিনতে ভুল করেননি। সঠিক মানুষ আছে বলেই

আজ এতদূর এগিয়ে যেতে পেরেছি আমরা। যাই হোক! ম্যানেজার আংকেলকে আমি সব বুঝিয়ে দিয়েছি। কিছু ফাইল কমপ্লিট করে রাখবেন। আমি সুযোগ পেলেই আসবো। এখন আপনি আসতে পারেন।

---- ওকে স্যার আমি আসি তাহলে।

---- অব কোর্স !

আব্দুল্লাহ মাহমুদ চলে যান। রয়েসয়ে বসলো শ্রাবণ। ফোন দিলো কাউকে, রিসিভ ও হলো খানিকক্ষণের মধ্যে।

---- আসসালামু আলাইকুম সি আই ডি অফিসার

ইন্সপেক্টর তাসফিয়া রাহমান।

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ আসলো। হাসি থামিয়ে সিরিয়াস হয়ে কঠোর ভঙ্গিতে বললো ইন্সপেক্টর তাসফিয়া রাহমান,

---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। ইন্সপেক্টর তাসফিয়া রাহমান বলছি। ইয়েস, টেল মি, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?

শ্রাবণ ও কম গেলো না। সে ও বললো,

---- ম্যাম আমার একটা মাত্র বউয়ের দিকে একটা

কাপুরষ কু'নজর দিয়েছে। প্লিজ তার নজর থেকে আমার বউকে রক্ষা করুন।

তাসফিয়া হেসে উঠলো। বললো,

---- ওরে বজ্জাত বিয়ে করে ফেলেছিস আর আমি জানি না?

শ্রাবণ ও হাসলো। বললো,

---- সরি এক্সিডেন্টলি হলো আর কি।

তাসফিয়া চিন্তিত স্বরে বলে,

---- কিন্তু কাহিনিটা কি বলতো?

শ্রাবণ দাঁত কিড়মিড় করে বললো,

---- আপি নয়ন একটু বেশিই উড়ছে এবার আর ছাড় দিচ্ছি না। তার জন্য তোমার হেল্প লাগবে।

ক্যান ইউ হেল্প মি?

---- অবশ্যই! ও তো আমাদের স্বীকার। ধরার জন্য সুযোগ খুঁজতে ছিলাম। ও নিরিহ মেয়েটাকে খুন করে সুইসাইড বলে চালিয়ে দিয়েছে। নেহাৎ টাকার পাওয়ারে উপর মহলে সাথে যুক্ত হয়ে কেইসটা অফ করে দিয়েছি। তা কি ভেবেছিস? প্ল্যান..

---- সব ভাবাভাবির সময় শেষ। এখন শুধু কাজ করে দেখানোর সময় হয়েছে। তাহলে শোনো.....

...............!

----- বাহ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো। আমি আছি তোর পাশে। শুধু আমি নই, আমাদের পুরো টিম আছে। তোর সাথে। অন্যায়কারীরা পার পেয়ে যাবে তা কি করে হয় বল?

---- হুম তবে একটু রিস্ক হবে। ওকে তাহলে রাখছি। আর হ্যা এই কেইসটা সল্ভ করো তারপর তোমায় দাওয়াত দিচ্ছি।

মৃদু রাগ দেখালো তাসফিয়া। বললো,

---- থাক ভাই তোকে আর বলতে হবে না। আমি নিজেই যেতে পারবো।

হাসলো শ্রাবণ। বললো,

---- তাহলে তো আর বলতেই হয় না। চলে এসো।

---- রাখছি।

---- ঠিক আছে ।

ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালো শ্রাবণ। সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলো অফিস থেকে।

___________________

ফাইজা বেগম ছাড়া পাওয়ার কথা শুনে কেউ খুশি হলো না। দোয়েল ও দিব্য কেউই চাইনি এই মানুষটা ছাড়া পাক! বেজায় রেগে আছে জাহাঙ্গীর আহমেদ তার ভাইয়ের উপর। তিনি বলেন,

---- তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস জাহিদ? এতো বড় একটা অপরাধ করার পর ও তুই ওকে ছেড়ে দিচ্ছিস?

জাহিদ আহমেদ বলেন,

---- আমি চাই না আমার মেয়ের মতো দোয়েল দিব্য মা ছাড়া থাকুক। উপর দিয়ে রাগ দেখালে ও মনে মনে ঠিকই কষ্ট পাচ্ছে। তাদেরকে তো কোনো অবহেলা করেনি ভাবি। আর আমার যা হারিয়ে গিয়েছে তা চাইলে ও ফিরে পাবো না। আমার এ-ই

মাফ করাই হবে তার অনুশোচনা। ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করে অনুতাপে পুড়বে নিজের অপরাধে।

---- কাজটা একদম ঠিক করোনি কাকাই। আমরা

চাইনি ওনি ফিরে আসুক। মা ছাড়া বাঁচা যায়।

---- দোয়েল ঠিক বলেছে কাকাই তোমার কাজটা একদম ঠিক হয়নি। এমন খুনি মায়ের প্রয়োজন নেই।

জাহিদ আহমেদ দিব্যর মাথা হাত বুলিয়ে বলে,

---- আমি জানি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল। আর এটা ও জানি ভাবিকে তোদের দরকার। আমি না হয় এইটুকুই করলাম তোদের জন্য। আমি আর এই বিষয়ে কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা।

চারদিন হলো হসপিটালের বেডে পড়ে আছে দিব্য

এর মধ্যে কিছু বড় পদের অফিসার এসে দেখে গিয়েছেন। বলেছেন সুস্থ না হওয়া অব্দি তার কোথাও যাওয়া চলবে না। এদিকে দিব্য বাসায় যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে পড়েছে। শান্তি পাচ্ছে না হসপিটালের চার দেওয়ালের বন্দি জীবনে। যেতে দিচ্ছে না ডক্টর। এতে রিস্ক আছে।

____________________

শ্রাবণ বাসায় আসলো বিকেলে। সুমনা রাহমান রান্না করছেন জামিলা বেগমকে সাথে নিয়ে। শ্রাবণ কে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

---- এসে গিয়েছিস?

---- হ্যা মা। মেঘ কোথায়?

---- ও তো এখনো বের হয়নি রুম থেকে। যা রুমে।

---- ঠিক আছে মা।

শ্রাবণ চলে গেলো রুমের দিকে। মেঘ এখনো বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। না খেয়ে থাকার কারনে শরীর এমনিই দুর্বল ও ক্লান্ত ছিলো।

বিকেল হওয়ার ধরুন আলো কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। শ্রাবণ ফোন ওয়ালেট রেখে পরণের কোটটা খুলে তাকালো মেঘের মুখ পানে। মুখটা শুঁকিয়ে আছে। চোখের পানি শুঁকিয়ে আছে গালে।

বলিশ সরে গিয়েছে মাথার কাছ থেকে। শ্রাবণ আলতো হাতে মেঘের মাথাটা উপরের দিকে তুলে

বালিশ ঠিক করে দিলো। গাল দুটোতে হাত বুলালো। এলোমেলো চুলগুলো যত্ন করে সরিয়ে দিলো কপালের উপর থেকে। তার জন্য মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। এ কেমন আচরণ? তার কারনে মেয়েটার অস্বস্তি হয় দম বন্ধ লাগে। আবার তাকে ছাড়া মেয়েটার কষ্ট হয়। কি চাই সে?

শ্রাবণ মুগ্ধ হয়ে দেখছে মেঘের ঘুমন্ত মুখ খানা। এখনো মন খরাপ করে আছে মেয়েটা। হঠাৎ

মেঘের কন্ঠ ভেসে আসলো,

---- আপনি এসে গিয়েছেন?

দূরে সরে আসলো শ্রাবণ। মেঘ উঠে বসলো চুলগুলো হাত খোঁপা করে মাথায় উড়না টেনে নিলো তৎক্ষনাৎ।

শ্রাবণ শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বললো,

---- কেউ একজন অপেক্ষা করছিলো। না এসে যাই কোথায়? আর যাই হোক তার কিছু হোক সেটা শ্রাবণ চাই না।

মেঘ বললো,

---- আমি বাবার কাছে যাবো।

কপালে ভাঁজ পড়লো শ্রাবণের। তাকালো মেঘের দিকে বললো,

---- বাবার কাছে মানে? তুমি কি দিব্য ভাইয়াদের বাসায় যেতে চাচ্ছো?

মেঘ আমতা আমতা করে বললো,

---- তাদের বাসায় গেলে সমস্যা কোথায় আপনার?

তারা তো বাসায় নেই। আমি একদিন থেকে চলে আসবো।

শ্রাবণ রাগ নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করছে। বললো,

---- দেখো মেঘ তুমি যা বলছো আমি তাই শুনছি।

প্লিজ এই বাড়ি থেকে এক পা ও বাইরের রাখার সাহস করো না। না হলে খুব খারাপ হবে।

মেঘ ফের বললো,

---- আপনি আমায় অবিশ্বাস করেন? ভয় পাচ্ছেন?

মুখোমুখি শ্রাবণ মেঘ। শ্রাবণ বললো,

---- উহুম তোমার প্রতি নয় ওই বাড়ি আর দিব্য ভাইয়ার প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। ওই বাড়িতে যাওয়া তোমার নিষেধ।

মেঘ এবার রেগে বলে উঠলো,

---- কেন এমন করছেন? আমি শান্তি চাই। প্লিজ!

দূরত্ব গুছিয়ে খানিকটা কাছে আসলো শ্রাবণ। চোয়াল আঁকড়ে ধরতে নিলে দু কদম পিছিয়ে গেলো মেঘ। কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে। শ্রাবণ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না মেঘের মনোভাব।

সেই যে রুম থেকে বের হলো আর আসলো না মেঘ

সুমনা রাহমানের সাথে ছিলো সে। রাতে যখন একসাথে সবাই খেতে বসলো তখন দেখা মিললো মেঘের। শ্রাবণ ও কথা বাড়ালো না। সবাই একসাথে খেয়ে উঠলো চুপচাপ। শ্রাবণ এসে শুইয়ে পড়লো। মেঘ ও কিছুক্ষণ বাদে রুমে আসলো। রাতটা কোনোরকমে কেটে গেলো কেউ কাউকে ডিস্টার্ব করলো না।

আজ খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো শ্রাবণ। ঘন্টা খানেকের মতো কারোর সাথে কথা বললো৷ অবশ্য আজ ও তার ব্যাতিক্রম হলো না মেঘের। আড়াল থেকে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি কথা শোনার।

তবে ব্যর্থ হলো প্রথমবারের মতোই। নিজের কাজে নিজেই অবাক হলো মেঘ। সময় শ্রোতের মতো বয়ে গেলো। ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় হলে মেঘকে রেখেই শ্রাবণ চলে গেলো। পিছু গিয়ে ও কোনো কাজ হলো না। তার আগেই শ্রাবণ বাইক নিয়ে ফুল স্পিডে বেরিয়ে গেলো। মেঘ অবাক হলো৷ তাকে ফেলে চলে গেলো শ্রাবণ? কখনো তো এমন করেনি সে। কষ্ট পাই মেঘ। তারমধ্যে সারিফ শিকদার মেঘকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলেন,

---- মেঘ মামুনি শ্রাবণের আজ একটা আর্জেন্ট কাজ আছে তাই তোমাকে সাথে নিতে পারেনি। গাড়িতে ওঠো আজ বাবার সাথে যাওয়া যাক?

--- জ্বি বাবা।

ভিষন্ন মনে গাড়িতে ওঠে বসলো মেঘ। ইচ্ছে ছিলো না যাওয়ার। শরীরটা ভালো লাগছে না। জ্বর জ্বর ভাব। শুধু ঘুম পাচ্ছে। কি এমন কাজ থাকতে পারে

শ্রাবণের? তাকে নেওয়াটা কি অপরাধ হবে? নাকি ওই গত কালকের মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাবে? শরীরের অস্থিরতা থেকে মনের অস্থিরতা বেশি হচ্ছে। কোথায় গেলো শ্রাবণ?

পুড়ো রাস্তা গেলো ভাবতে ভাবতে। আজ আর পার্কিং এড়িয়ায় আসেনি দেখে জিজ্ঞেস করলো

মেঘ,

---- বাবা আমরা কোথায় যাচ্ছি?

মেঘের কথায় সারিফ শিকদার বলেন,

---- আজ অন্যদিক দিয়ে যাবো মেঘ।

পাত্তা দিলো না মেঘ। সারিফ শিকদার এর থেকে বিদায় নিয়ে ক্লাসে আসলো সে। মনটা উসখুস করছে শ্রাবণের জন্য। কি লুকাচ্ছে তার থেকে।

---- এই বান্ধবী আমি এসে গিয়েছি?

মেঘ তাকালো। মাহিরা আসছে।

---- আসসালামু আলাইকুম মাহিরা।

মাহিরা মেঘের পাশে বসলো। বললো,

---- ওয়ালাইকুম আসসালাম মেহেরিন। তোমার সাথে গল্প করবো বলে আমার সময়ই যাচ্ছিলো না। কবে আসবো ভার্সিটি, কবে পাবো তোমার দেখা।

হাসলো মেঘ। মাহিরা আবার ও বললো,

---- আমার একটা জিনিস দেখার ক্রেভিং হচ্ছে।

মেঘের ও আগ্রহ জাগলো জানার, বললো,

---- কি মাহিরা?

মাহিরা মিষ্টি হেসে বললো,

---- দুলাভাইকে দেখতে চাই।

মেঘ ভড়াকালো। মিনমিন করে বললো,

---- কিভাবে দেখাবো আমার কাছে তো তার ছবি নেই।

মাহিরা অবাকবনে গেলো। বললো,

---- কি বলো তুমি? তোমার জামাইয়ের ছবি তোমার কাছে নেই? অবিশ্বাস্য লাগলো কথাটা।

মেঘ আবার ও বললো,

---- সত্যিই নেই। থাকলে অবশ্যই আমার একমাত্র বান্ধবীকে দেখাতাম বুঝলে?

মাহিরা কতক্ষণ ভাবলো, অতঃপর ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো,

---- এটা ডিজিটাল যুগ বুঝলেন ম্যাডাম? ফোন দাও দুলাভাইকে। তাও ভিডিও কল ৷

ফেঁসে গেলো মেঘ। না করবে কি না বুঝতে পারছে না। আপাতত এড়াতে হবে কথাটা। বললো,

---- দেখো মাহিরা ওনি একটা জরুরি কাজে গিয়েছে। আমি এখন ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করতে পারবো না। প্লিজ কালকে আমি তোমায় দেখাবো ওনার ছবি।

জোর করলো না মাহিরা বললো,

---- ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি কি জোর করছি নাকি কালকে দেখিও। ওই তো ম্যাম আসছে।

দু'জনেই সোজা হয়ে বসে পড়লো। ক্লাস করাই মনোযোগ দিলো।

____________________

---- শ্রাবণ ভাই ওরা কিন্তু আজ আক্রমণ করবে তোমাদের উপর। আমার যতোটুকু জানা তোমায় আর ভাবিকে ধরে তাদের আস্তানায় নিয়ে আসবে

তারপর..

---- বুঝেছি আমি ঠিক আছে আমরা রেডি আছি।

সময় মতো আমাদেরকে ওরা পেয়ে যাবে। আর তোকে যা বলেছি কাজ গুলো কমপ্লিট করে রাখবি।

---- অলরেডি শেষ।

---- গুড বয়।

---- কাজটাতে লাইফ রিস্ক রয়েছে শ্রাবণ।

তাসির চিন্তিত হয়ে বললো, শ্রাবণ বললো,

---- হোক তাতে যদি জানোয়ারটার ইতি ঘটে।

---- আরো তো কত পথ আছে একটু ভেবে দেখ,

রাতুলের কথায় হাসলো শ্রাবণ। বললো,

---- এই পথটাই আমার জন্য বেস্ট। সাপ ও মরবে লাটি ও ভাঙবে না ব্যাপারটা এমন।

---- নিজের কথা ভাবছিস না কিন্তু মেঘ?

রিফাতের কথায় শ্রাবণের মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না একইভাবে বললো,

---- আমার কিছু হলে মেঘের কিছুই হবে বলে মনে হয় না বাদ দে তো।

---- মেঘের উপর রেগে আছিস নাকি?

রামিম বলেই তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ তাকালো চারজনের দিকে। বললো,

---- তোরা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিস বলতো?

আমি আছি এক টেনশনের মধ্যে আর তোরা ভাবছিস আমার পার্সোনাল বিষয় নিয়ে।

---- ওসব বাদ দে তোরা। সময় হোক তারপর যাবি

শ্রাবণ আর হ্যা আমরা আশেপাশে আছি। আপু আসছে তো ?

শ্রাবণ কল দিলো। ওপাশ থেকে বললো,

---- জাস্ট ফাইভ মিনিটস শ্রাবণ আমি চলে এসেছি

প্রায়।

---- ফাস্ট আপি। সময় খুবই কম।

---- ওকে।

____________________

ছুটির সময় হলে মাহিরা ও মেঘ দুজনেই বের হলো ক্লাস রুম থেকে। শ্রাবণের কথামতো দাঁড়িয়ে থাকে মেঘ। শ্রাবণ আসছে না আজ ও লেইট হচ্ছে। মাহিরা আজ একা ফেলে যাইনি মেঘকে। মেঘ বললো,

---- অনেক দূর থেকে আসো তুমি। চলে যাও আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো।

মাহিরা হাসি মুখে বললো,

---- তোমার পাশে থাকা প্লাস দুলাভাইকে একনজর দেখে তারপর যাবো।

মেঘ কথা বলতে বলতে হঠাৎ চোখ গেলো মাঠের দিকে। চোখ দুটো মুহুর্তের মধ্যে বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে মেঘ। রেগে মাহিরার হাত মুঠো থাকা অবস্থায় চেপে ধরলো। মাহিরা ব্যাথা পেয়ে তাকালো মেঘের দিকে

বললো,

---- লাগছে মেহেরিন। তুমি ঠিক আছো তো?

মেঘ চমকালো। বললো,

---- সরি মাহিরা। মাহিরার হাত ছেড়ে দিলো মেঘ।

তাকিয়ে আছে মাঠের দিকে। শ্রাবণ একটি মেয়ের সাথে হাসতে হাসতে কথা বলছে। হাত ধরে পার্কিং এড়িয়ায় যাচ্ছে। মেয়েটাকে চেনার উপায় নেই। তারই মতো কালো বোরকায় আবৃত করে রেখেছে নিজেকে । হয়তো গত কালকের কনক মেয়েটা। তাকে না নিয়ে ওই মেয়েটার সাথে হাসতে হাসতে ঘুরে বেড়াচ্ছে? মেঘ স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক। শ্রাবণ! হ্যা এটা শ্রাবণই। উপায় নেই ভুল বলার । ভাবলো না কিছু মেঘ। শুধু মাহিরার উদ্দেশ্যে বললো,

---- চলো মাহিরা আমি তোমার সাথে গেইট অব্দি যাবো।

---- কিন্তু তোমাকে তো নিতে আসবে।

মেঘ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,

---- তার এখন সময় নেই। চলো।

মেঘ মাহিরার সাথে চলে গেলো উল্টো দিকে। কান্না পাচ্ছে অনেক।

দুজনে দুদিকের রাস্তা। মাহিরা উঠার পর মেঘ আরেকটা রিকশা ডাকলো। বললো,

---- মামা বাস স্টেশন চলুন।

চলবে,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন