#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —১৯
#কলমে_তাসনিম_লিজা
---- কপি নিষিদ্ধ!
---- ওয়েলকাম, ব্রাদার… আর কিউটটটট ফুল, অভিনন্দন! অবশেষে আমার আস্তানায় পা পড়লো তোমার।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো শ্রাবণ। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে কিঞ্চিৎ হাসি। নয়ন অবাক ও বিরক্ত হলো। ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
---- ইন্টারেস্টিং তো! সবাই এখানে এসে ভয় পাই।
আর তুই হাসছিস? পাগল টাগল হয়ে গিয়েছিস
নাকি? বউকে হারাতে যাচ্ছিস বলে।
শ্রাবণ নিজেকে সামলে নিলো। হাত পা বাঁধা তার। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো চারপাশ। অতঃপর নয়নের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
---- বোকা ছেলে! তুই আমায় নই আমি নিজে এসেছি তোর এই নোংরা আস্তানায়।
নয়ন শব্দ করে হেসে উঠলো। অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
---- তাই নাকি? নিজেই যখন আসবি তাহলে তোর বউকে কি আমাদের দেওয়ার জন্য এনেছিস?
আর আগে বলবি না আমাদের এতো কষ্ট করা লাগতো না।
শ্রাবণ ও হাসলো। দ্বিগুণ শব্দ করে। বললো,
---- চেয়েছিলাম তুই আর সময় দিলি কোথায়? যাই হোক ডেকেছিস কেন? মেরে ফেলবি বলে ?
চেয়ারে বন্দি দুজনের চারপাশে দুবার চক্কর দিলো
নয়ন। চারপাশে বন্দুক হাতে কালো মাস্ক পড়া ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে আছে। নয়ন শ্রাবণের পাশের মেয়েটির কাছে এসে সামান্য ঝুঁকে। প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললো,
---- ইউ লুক সো বিউটিফুলআই, লাভ ইউর আইজ, ডুবেছি আমি তোমার চোখের ওই অনন্ত মায়ায়।
---- বেশি ডুবিস না আবার। মানে সাতার জানিস তো?
শ্রাবণের হেয়ালিপনা কথায় দুষ্টুমি করে বললো নয়ন,
---- কি যে বলিস না তুই। তোর পছন্দ আছে বলতে হয়। আমি সব ঝামেলা ভুলে যাবো শুধু তোর ফুল আমার হয়ে যাক তাহলেই হবে।
শ্রাবণ স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
---- ফাইন! আমি দিতে রাজি আছি। ওকে আমার তেমন ভালো ও লাগে না। শুধু শুধু টাকা টাকা করে আর তোর বাবার তো টাকার অভাব নেই। তুই রাখতেই পারবি৷ কিন্তু,
শ্রাবণের কথা নয়ন মনোযোগ দিয়ে শুনলো খুশি হয়ে। শেষের কথায় কিন্তু, মানে কি চাই শ্রাবণ ? বলল,
---- কিন্তু কি?
শ্রাবণ অবুঝের মতো বললো,
---- তুই তো ভালো না। একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক
ছিলো তোর। মেয়েটা তোকে কত ভালেবাসতো।
আর তুই মেয়েটার সাথে যা করেছিস তারপর মে'রে ও ফেলেছিস। আর টাকা দিয়ে সেটা ধামাচাপা ও দিয়ে দিয়েছিস। মানলাম সবটা। বাট
আমার ফুলের সাথে ও যদি এমনটা করিস তাহলে? আমি কিন্তু, তোর অবস্থা খারাপ করে দেবো।
রাগেনি নয়ন। বরং শ্রাবণকে বুঝ দিচ্ছিলো সে।
বলল,
---- আরে নাহ! ওই মেয়েকে আমার পছন্দ ছিলো না। এমনি টাইম পাস করার জন্য রেখেছিলাম।
শ্রাবণ কথার মধ্যে প্রশ্ন করলো। বললো,
---- কিভাবে মেরেছিস? কোনো প্রমান ছিলো না।
বোঝার উপায় ও নেই মেয়েটা কি মার্ডার হয়েছে নাকি সুইসাইড করেছে।
নয়ন শ্রাবণের পাশের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললো,
---- আজ বলতে দ্বিধা নাই রে। আমি সবচেয়ে ভালোবাসি তোর ফুলকে। আমি ভালো হয়ে যাবো ওকে পেয়ে গেলে। আর ওকে পেতে হলে যদি ঘটনাটা খুলে বলতে হয় আমি রাজি আছি বলতে।
তাহলে শোন,
মেয়েটির নাম ইশা। আমাকে জোর করছিলো বিয়ে করার জন্য। ওর পেটে আমার বাচ্চা ছিলো। ইশা সবাইকে বলে দিবে বলছিলো সেই কারনেই ওকে
সামান্যতম আদরযত্ন করে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মে'রে ফেলেছি। তার আগে ওকে ঘুমের ট্যাবলেট ও দিয়েছিলাম ড্রিংকের সাথে। ও বুঝতে পারিনি। ওকে রাতের অন্ধকারে হল রুমে
দিয়ে আসি। যারা দেখেছিলো তাদের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। আর বাচ্চা বল, আর মার্ডার বল এসব এখন টাকা হলেই ধামাচাপা দেওয়া যায়। জাস্ট কয়েক লক্ষ টাকা খাওয়াতে হলো এই আরকি। সব অফ।
শ্রাবণ ফের জিজ্ঞেস করলো,
---- কাকে কাকে খাইয়েছিস লক্ষ লক্ষ টাকা?
নিরদ্বিধায় বলে দিলো নয়ন কয়েকজন উপরমহলের সি আই ডি অফিসারের নাম ও ফরেনসিক ডক্টরের নাম। সাথে পুলিশ কর্মকর্তা ও আছে।
শ্রাবণ শান্ত স্বরে বললো,
---- তাসফিয়া আপি আমার কাজ কমপ্লিট হলো তো? এবার তোমার কাজ তুমি করো আমার ভালো লাগছে না আজাইরা কথা বলতে কোনো খুনির সাথে। সত্যিই বোকা একটা ছেলে ও৷
---- মানে কি? আপি মানে ও কে?
অবাক হলো নয়ন। শ্রাবণ ফের বললো,
---- তোর খেলা শেষ নয়ন। আপাতত তুই শান্তিতে রেস্ট নিতে পারিস, মনের আনন্দে। তুই এই পর্যন্ত যা যা বলেছিস, সবই এই ক্যামেরায় বন্দি হয়ে গেছে। আর তা সরাসরি লাইভ হয়ে চলে গিয়েছে বাইরে। এখন আর কিছুই লুকানোর নেই, তুই ফেঁসে গিয়েছিস নয়ন। ইউ আর আ লুজার!
সাথে নীকাব খুলে ফেললো তাসফিয়া রাহমান।
হাতের বাঁধন আগেই চেষ্টা করে হালকা করে রেখেছিলো শুধু সঠিক সময়ে হাতটা কাজে লাগাবে বলে। তারা দুজনের কেউই জ্ঞান হারাইনি
অভিনয় করেছে শুধু। তাসফিয়া ভয়ার্ত নয়নের দিকে তাকায়। নয়ন ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। যদিও মেঘকে সে দেখেনি কখনো। কিন্তু,
চোখ তার মনে গেঁতে গিয়েছিলো। তাসফিয়া টিসু নেই কিন্তু, নীকাব দিয়েই আলতো করে চোখ মুছলো। ভারী লাগছিলো হুবুহু মেঘের চোখের মতো করার জন্য মেক-আপ ব্যাবহার করেছিলো।
চোখ মুছতেই অন্যরকম হয়ে গেলো। তাসফিয়া হাসলো। বললো,
---- আমি আপনার ফুল নই নয়ন সাহেব আমি আপনার ফুলের মধ্যে থাকা কাঁটা। খবরদার
কেউ বন্দুক তুলবে না। গুলি করার চেষ্টা তে দূর!
তোমার স্বীকারোক্তি সব এখন উপরমহলের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। এই আস্তানা চারদিকে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে পালানোর কোনো পথ নেই তোমাদের।
তৎক্ষনাৎ নয়ন ঘান তাক করলো শ্রাবণের দিকে।
শ্রাবণের কোনো হেলদোল হলো না। সে হাসি মুখে বললো,
---- মারবি নাকি?
আগের সেই হাসি নেই নয়নের ঠোঁটে। এখন চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় আর পালানোর প্রচেষ্টা। হুংকার দিয়ে বললো নয়ন,
---- যদি আমি না পালাতে পারি তাহলে কিন্তু তুই বাসায় বউয়ের কাছে নই সোজা কবরে যাবি শ্রাবণ। আমাকে পালানোর ব্যবস্থা করে দে।
চারদিকে সবাই ঘান তাক করে রেখেছে। শ্রাবণ ও
তাসফিয়া একে অপরকে কিছু ইশারা করলো।
তাসফিয়া সুযোগ বুঝে নিজের সাথে করে আনা ঘান আড়ালে স্যুট করলো নয়নের হাত বরাবর।
সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলে নয়ন। তবে তার ঘান থেকে গুলি ছুঁড়ে শ্রাবণের হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে যায় গুলি। নয়ন ট্রিগার চেপে ধরে রেখেছিলো সতর্কতার সাথে। তাইতো ছিঁটকে পড়তে পড়তে ও
ছাড় দিলো না নয়ন শ্রাবণকে। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই নয়নের কপালে ঘান ঠেকালো তাসফিয়া। বললো,
---- যে যার জায়গা থেকে ঘান নিচে রাখো বলছি।
নয়তো নয়ন সাহেব সোজা উপরে। আর শ্রাবণ তুমি ঠিক আছো তো?
শ্রাবণ হাত চেপে ধরলো। বেশি একটা লাগেনি। গুলিটা হাতের পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছে। রক্ত বের হচ্ছে। তবুও বললো
---- আমার কিছুই হয়নি আপি।
শ্রাবণ কাউকে ফোন দিলো আসার জন্য। নয়ন রেগে বললো,
---- কাজটা একদম ঠিক করিসনি শ্রাবণ। তোদেরকে আমি দেখে নিবো।
শ্রাবণ জয়ের হাসি হেসে বললো,
---- দেখে নে এখনই পরে সুযোগ যদি না পাস। আমি তো আর যাবো না তোকে দেখতে। দেখ ভালো করে।
রেগে হাফাস করছে নয়ন কিছুই করতে পারছে না
সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ফোর্স আসে। এরেস্ট করে নয়নকেসহ বাকিদেরকে ও। তাসফিয়া শ্রাবণের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।
শ্রাবণকে আঘাত পেতে দেখে তাসির ছুটে এলো বিচলিত হয়ে বললো,
---- দেখেছিস এই ভয়টায় আমি পাচ্ছিলাম।
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ বললো,
---- আমার কথা রাখ মেঘ কে পৌঁছিয়ে দিয়েছিস বাসায়?
তাসির ভার মুখে বললো,
---- ও বোধহয় একাই চলে গিয়েছে। আমি পাইনি
ওকে। অনেক কেই জিজ্ঞেস করেছিলাম কেউ বলেনি কিছুই।
শ্রাবণ টেনশনে পড়ে গেলো। বললো,
---- আমার ফোন কোথায়?
এগিয়ে দিলো রাতুল। বললো,
---- আমাট কাছে এই নে৷
দ্রুত মেঘের নাম্বারে কল দিলো শ্রাবণ। ফোন অফ বলছে। মায়ের নাম্বারে দিলো। রিসিভ করতেই প্রশ্ন ছুড়লো শ্রাবণ। বললো,
---- মেঘ কোথায় মা?
সুমনা রাহমান চিন্তিত হয়ে বলেন,
---- তোর জানার কথা মেঘ কোথায় আমাকে বলছিস কেন? তুই না ওকে নিয়ে আসিস? মেঘ তো এখনো বাসায় ফিরেনি। আমি ভাবছি তোর সাথে আছে। তোকে তো কল করেছিলাম ধরলি না তো।
ভয়ে যেনো শ্রাবণের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো।
তাসির ধরে ফেললো সাথে সাথে। বললো,
---- তুই ঠিক আছিস? আমার সাথে চল গুলি লেগেছে তোর ইমিডিয়েটলি ট্রিটমেন্ট করাতে হবে।
শ্রাবণ পাগলের ন্যায় বললো,
---- ওসব পড়ে তাসির আমার মেঘ বাসায় ফেরেনি
কোথায় গেলো মেয়েটা? তোরা দেখিসনি কেন?
দিব্য ভাইয়ার বাসায় যাইনি তে আবার?
রক্তাক্ত অবস্থাতেই বেরিয়ে এলে শ্রাবণ তাসিরদের ফেলে। ওরা পিছনে পিছনে আসছে। শ্রাবণ বাইক স্টার্ট দিলো দ্রুত বেগে ছুটলো বাইকটা। শ্রাবণের এমন অবস্থা দেখে পিছু নিলো তারা চারজন ও। যে-ভাবে ফুল স্পিডে বাইক চালাচ্ছে ঝড়ের গতিতে শ্রাবণ ভয় জাগে বন্ধুদের মনে। হঠাৎ কিছু মনে হতেই বাইকটা থামালো রাস্তার একপাশে। ফোন বের করে কল করলো জাহিদ আহমেদ এর ফোনে। দুবারের মাথায় রিসিভ করলো তিনি,
---- বাবা মেঘ গিয়েছে ওই বাড়িতে?
জাহিদ আহমেদ সাথে সাথে বলেন,
---- না তো মেঘ আসেনি। আমরা তো বাসায় আছি
আসলে তো দেখতে পেতাম।
---- হসপিটালে যেতে পারে? একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন প্লিজ?
জাহিদ আহমেদ বলেন,
---- হসপিটালে কেউ নেই শ্রাবণ। দিব্যকে বাসায় আনা হয়েছে আজ বিকেলে। মেঘ হসপিটালে গিয়ে কি করবে। আচ্ছা কি হয়েছে বলোতো?
---- কিছু হয়নি বাবা। আমি পড়ে কথা বলছি।
শ্রাবণের মাথা পুড়াই পাগল পাগল অবস্থা হলো।
মানে মেয়েটা তো এখানকার কিছুই চেনে না। তাহলে কোথায় যাবে? বান্ধবী ও নেই। অস্থির হয়ে বসে পড়লো শ্রাবণ। ততোক্ষণে রাতুলরা ও চলে আসলো। তাসির দ্রুত এসে ধরলো শ্রাবণকে। চিন্তিত হয়ে বললো,
---- কিরে খারাপ লাগছে?
শ্রাবণ রাগ দেখালো মৃদু। বললো,
---- কি তখন থেকে আমাকে নিয়ে পড়ে আছিস তোরা? আমার মেঘকে খোঁজে পাচ্ছি না আমি। শুনছিস আমার মেঘ হারিয়ে গিয়েছে আমার থেকে। প্লিজ খোঁজে দে না ভাই। আমার কষ্ট হচ্ছে
ভীষণ। মাথা যন্ত্রণা করছে মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।
---- কি আবোলতাবোল বকছিস শ্রাবণ কিছুই হয়নি। আমরা আছি তো। ভয় নেই মেঘকে আমরা সবাই মিলে খোঁজে বের করবো। হয়তো কোথাও গিয়েছে।
শ্রাবণ অস্থির স্বরে বললে,
---- কতক্ষণ সময় ও বাইরে আছে দেখেছিস তুই?
চার ঘন্টা যাবত ও কোথায় থাকতে পারে? আমার ভয় হচ্ছে তাসির আমি শান্ত হতে পারছি না। আমার তো কোনো শত্রু নেই। তাহলে ও কোথায়?
শ্রাবণের মেঘের জন্য পাগলামি করতে দেখে তাসির ও বাকরুদ্ধ। কি বলবে আসলেই তাদের কারোর জানা নেই। একে অপরের দিকে তাকালো শুধু। কারোর মুখে কোনো কথা নেই শান্তনা দেওয়ার মতো।
পাঁচটা পেরিয়ে ছয়টা বাজতে চললো শ্রাবণ কি করবে, কোথায় খুঁজবে দিশেহারা লাগছে তার নিজেকে। বন্ধুদের রেখেই বাড়ির দিকে ছুটলো সে,
তাসির বারণ করছিলো এমন অবস্থায় বাইক না চালাতে কিন্তু, শুনে কে তার কথা। যেতে যেতে বির বির করে বলছিলো, আর অঝোর ধারায় চোখের
পানি পড়ছিলো শ্রাবণের। বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার।
---- কোথায় আছো মেঘ? একটা বার ফিরে এসে দেখে যাও, তোমার শ্রাবণ আজ কতটা নিঃস্ব! তুমি ছাড়া এই বুকের ভেতরটা মরুভূমির চেয়েও শুষ্ক হয়ে গেছে। লোকে বলে শ্রাবণ মানেই বর্ষণ, কিন্তু তারা জানে না তুমিহীন এই শ্রাবণের আকাশজুড়ে আজ শুধু হাহাকার আর তীব্র দহন। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি মেঘ, সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছি! প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মুহূর্ত তোমাকে খোঁজার এক অন্তহীন তৃষ্ণায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। চারপাশের এত মানুষের ভিড়ে আমি শুধু তোমার ওই মায়াবী মুখটা খুঁজে বেড়াই। অথচ কোথাও তুমি নেই!
মেঘফুল, তুমি তো আমার হৃদয়ের স্পন্দন, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারন । তাহলে এভাবে অন্ধকারে ফেলে কোথায় হারিয়ে গেলে? আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তুমি, তোমাকে ছাড়া আমি যে বড্ড অসহায়। আমি আর পারছি না এমন অবহেলা আর দূরত্ব সহ্য করতে। প্লিজ, ফিরে এসো! আমাকে এভাবে শাস্তি দিও না। তুমিহীন এই শ্রাবণ আজ বড্ড একাকী, বড্ড মেঘহীন। দোহাই তোমার, ফিরে এসো আমার জীবনে, আমার এই চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা হৃদয়ে।
বাসার দিকে রওনা দিলো শ্রাবণ।
____________________
---- আপমনি তুমি এহানে? কি হয়েছে তোমার?
---- আমি ঠিক আছি আমিনা আপু।
অবাক হলো আমিনা। ফের বললো,
---- চাচা আইলো না তোমার সাথে?
মেঘ ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। সামান্য বিরক্ত হলো।
বললো,
---- আমি বড়ো হয়েছি আমিনা আপু। একা একা আসতে পারি না আমি? আর খবরদার বাবাকে জানাবে না তুমি আমি যে বাড়িতে আসছি। প্লিজ আমাকে আর ডিস্টার্ব করো না।
আমিনা টেনশনে পড়ে গেলো। বিয়ের খবরটা তার জানা। কিন্তু, হঠাৎ আসার কারন আর না জানানো
নিয়েই বেশ চিন্তিত হলো। মনে হলো জানানো প্রয়োজন। তৎক্ষনাৎ হাতে থাকা বাটন ফোনটা মুখের সামনে তুলে ধরলো৷ খুঁজে খুঁজে চাচাজান নামে সেইভ করা নাম্বারটা বের করলো। টুস করে কল দিলো সেই নাম্বারে।
---- আসসালামু আলাইকুম চাচাজান!
---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমিনা হঠাৎ ফোন দিয়েছিস যে সব ঠিকঠাক আছে তো?
আমিনা জিজ্ঞেস করলো,
---- চাচাজান আপামনি কি আপনার সাথে আছে?
জাহিদ আহমেদ বুঝলেন না। বলেন,
---- মানে আমার সাথে থাকবে কেন? ও তো ওর শশুরবাড়িতে আছে। কি হয়েছে বলতো?
নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না আমিনা। মেঘ বারণ করার পর ও বললো,
---- আপামনি তো বাড়িতে আসছে। দেখে অনেক অসুস্থ মনে হচ্ছে। কিন্তু, আমায় না করে দিয়েছে ওই যে হ্যা বিরক্ত না করার জন্য।
চমকে ওঠলো জাহিদ আহমেদ। মেঘ একা একা কিভাবে গেলো বাড়ি অব্দি? যতোবারই এসেছে
হয়তো জাহিদ আহমেদ নয়তো দিব্য নিয়ে আসছে বা দিয়ে আসছে। ও তো বাসে ও যেতে পারে না।
থাকতেই পারে না আধঘন্টার বেশি আর সেখানে কয়েক ঘন্টা? বিস্ময়ের সহিত বললো,
---- ও বারণ করেছে আর তুই শুনছিস? এখনই
ওকে লেবুর শরবত বানিয়ে দে। আর আমি আসছি আজই।
---- আচ্ছা চাচাজান। আমি তাহলে রাখলাম।
জাহিদ আহমেদ শ্রাবণকে ফোন দিলো৷ একমুহূর্ত ও দেরি করলো না শ্রাবণ। বললো,
---- বাবা মেঘকে পেয়েছেন?
রাগ দেখালেন জাহিদ আহমেদ। বলেন,
---- কি বলেছো তুমি আমার মেয়েকে? ও আমার বাড়িতে চলে গিয়েছে একা একা। কখনো যায়নি ও। কি হয়েছে তোমাদের মধ্যে?
---- জানি না বাবা ও কেন এমন করলো। আপনি চিন্তা করবেন না আমি যাচ্ছি ওর কাছে।
শ্রাবণ আর কোনো বাক্য খরচ করলো না রেখে দিলো ফোন। বাড়ির রাস্তার উল্টো পথে চললো। মেঘের গ্রামের বাড়ি কোথায় তার জানা আছে। সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয়না৷ মেয়েটার সাহস দেখে অবাক হচ্ছে শ্রাবণ। তাকে পাগল বানিয়ে এভাবে লুকোচুরি খেললো? কিসের এতো রাগ অভিমান তার উপর? কেনো এতে বড় একটা রিস্ক নিতে গেলো? অজানা পথে বিপদের মধ্যে এমনি এমনি তো যাওয়ার কথা না। জাহিদ আহমেদ তো গ্রামে না। মেয়েটা রেগে আছে তার উপর। পাগলের ন্যায় দ্রুত ছুটলো সে। পথিমধ্যে দুবার বাইক থামাতে হয়েছে৷ দূরের রাস্তা হওয়ায় তেল শেষ হয়ে গিয়েছিলো। রাত প্রায় অনেক। তবুও থামার নাম নেই শ্রাবণের।
____________________
সারিফ শিকদার চিন্তিত মুখে বসে আছেন। পাশে সুমনা রাহমান ও আছেন। কি হচ্ছে মেয়েটা একা একা কেন গেলো প্রশ্নের শেষ নেই। ছেলেটা তো বাড়ি ও ফিরলো না।
অন্যদিকে জাহিদ আহমেদের কথাগুলো শুনেছিলো ওই বাড়ির সবাই। দিব্যর রুমেই ছিলো তখন জাহিদ আহমেদ। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করছিলো তখন সবই বলে দেন জাহিদ আহমেদ। দিব্য রেগে বলেছিলো, মেঘের যোগ্য নই শ্রাবণ। ও আগলে রাখতে পারবে না মেঘকে। বিছানা ছেড়ে উঠতে নিচ্ছিলো যেখানে সে দু কদম হাঁটার শক্তি নেই। জাহিদ আহমেদ বুঝিয়ে বলে তিনিই রওনা দেন জাহাঙ্গীর আহমেদকে বলে। তিনি বারণ করেনি বরং তাড়া দিলেন যাওয়ার জন্য। দিব্য নিজেকে সামলাতে পারছে না রেগেমেগে কি করবে বুঝতে পারছে না।
____________________
---- আপামনি চিন্তা করো না চাচাজান চলে আসতেছে।
জ্বরে অচেতন হয়ে আছে মেঘ। হওয়ারই কথা। পথে বৃষ্টিতে ভিজেছিলো জ্বর তার আগেই দেখা দিয়েছিলো। জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল করছিলো মেঘ৷ আমিনা কান পেতে শুনতে লাগলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। শুধু একটা নামই বুঝলো তা হলো শ্রাবণ। শ্রাবণ তো মেঘের স্বামীর নাম চাচাজানের মুখে শুনেছিলো আমিনা। বার বার জলপট্টি দিয়েই যাচ্ছে শরীরের যা তাপমাত্রা ছুঁয়া যাচ্ছে না এমন। ভয় হচ্ছে আমিনার। বাড়িতে কেউ নেই আমিনা আর মেঘ ছাড়া। মেঘ এসেই শুইয়ে পড়েছে। আমিনা ঘন্টা খানেক পর যেয়ে অবাক হয়ে সেই যে জ্বর কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে পারছেই না জ্বরটা যেনো ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলেছে। ভয়ে কয়েকবার ফোন দিয়েছিলো জাহিদ আহমেদ এর ফোনে কিন্তু, পাইনি। হয়তো আসতেছে গাড়ির মধ্যে। এদিকে ডক্টর ডাকতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বাড়ি খোঁজা এখন কঠিন হয়ে পরলো শ্রাবণের কাছে। সন্ধ্যা হলেই গ্রামের মানুষ ঘরবন্দী হয়ে যায় আর এখন তো অনেক রাত । তারউপর বৃষ্টি ও হচ্ছে। এলোমেলো পায়ে চারদিকে তাকিয়ে মানুষ খুঁজলো পেলো না শ্রাবণ তেমন কাউকে। ফের বাইক স্টার্ট দিলো কিছুদূর যেতেই অন্ধকারে একজনের দেখা মিললো। তৎক্ষনাৎ বাইক থামিয়ে বলে উঠলো সে,
---- একটু শুনবেন প্লিজ! স্বপ্ন নীড় বাড়িটা কোন দিকে বলবেন?
ছেলেটা তাকালো এলোমেলো ছন্নছাড়া শ্রাবণের মুখের দিকে। বললো,
---- আপনি কেডা?
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
---- আমি শ্রাবণ শিকদার। মেঘের হাসবেন্ড। মানে স্বামী।
ছেলেটা অবাক হয়ে শুধালো,
---- মেঘ আপা বিয়া কইরা ফালাইছে?
শ্রাবণের ধৈর্য ধরা মুশকিল হয়ে পরলো। আবার ও বললো,
---- ভাই প্লিজ বলে দিন একটু।
ছেলেটা কথা বাড়ালো না। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। তাই বলে উঠলো,
---- সামনে গিয়ে ডান দিকে দুই নাম্বার বাড়িটা মেঘ আপার বাড়ি।
---- থ্যাংক ইউ!
এক সেকেন্ড ও সময় নষ্ট করলো না শ্রাবণ বাইক স্টার্ট করলো সাথে সাথে। ছেলেটা শ্রাবণের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। তারপর চলে গেলো নিজ গন্তব্যে।
আমিনা বার বার গা মুছিয়ে দিলো মেঘের। মেঘ চোখ খোলার নামই নিচ্ছে না। আমিনা ভয় পাচ্ছে ভীষণ। রাত ও হলো বেশ। এদিকে চাচাজানের কোনো খোঁজ খবর নেই। একা একা কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
হঠাৎ বাইকের শব্দ পেলো আমিনা। কেউ গেইট খুলে ভেতরে আসলো। ভয়ে আৎকে উঠলো সে । দ্রুত ছুটলো বাড়ির গেইটের দিকে। তালা দেওয়া হয়নি এখনো। তারাহুরো করে কেঁচি গেইটটা লাগাতে নিলেই শ্রাবণ এসে বাধ সাধলো। অস্থির হয়ে বললো,
---- কি করছেন আপু? গেইট খুলুন। মেঘ কোথায়?
আমি মেঘের কাছে যাবো।
এলোমেলো চুল বৃষ্টিতে ভিজে কপাল জুড়ে লেপ্টে রয়েছে শ্রাবণের । কালো শার্টটা শরীরের সাথে আটশাট হয়ে লেগে আছে। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলো আমিনা। তারপর বললো,
---- আপামনিকে কি দরকার আপনার? চুরি করতে
আসছেন আপনি তাই না? আমি খুলবো না।
শ্রাবণ স্পষ্ট করে বললো,
---- আমি মেঘের স্বামী। আমাকে ভেতরে যেতে যাও। মেঘ কোথায়? মেঘ! মেঘ কোথায় তুমি? প্লিজ বেরিয়ে এসো।
আমিনা বিশ্বাস করলো কি না সন্দেহ। ফের বললো,
---- আমি বিশ্বাস করি না। আর আপামনি এখন আসতে পারবে না। আপনি চলে যান।
রাগ হলো শ্রাবণের। জোড় কাটাতে লাগলো সে।
গেইটটা আমিনা শক্ত করে ধরে রাখলো। শ্রাবণ বললো,
---- আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই যাই আসে না। আমি মেঘের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি। মেঘকে বলুন শ্রাবণ আসছে।
শ্রাবণ নামটা শুনে বড়ো বড়ো চোখে তাকালো আমিনা। বললো,
---- আপামনি বার বার জ্বরের ঘোরে শ্রাবণ নামটা নিচ্ছিলো। আপনি আপামনির বর? আসুন আসুন ভেতরে আমি আসলে বুঝতে পারিনি।
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ ছুটলো এই রুম ওই রুম। মেয়েটা জ্বর বাঁধিয়ে বসেছে।
---- আরে কোথায় যাচ্ছেন আপনি? দক্ষিণ দিকের রুমটা আপামনির।
শ্রাবণ যেনো ঝড়ের গতিতে ছুটলো দক্ষিণ দিকের রুমটাতে। ভেতরে যেতেই স্থির হয়ে গেলো সে মেঘের ফ্যাকাশে মুখটা দেখে। পরোক্ষণে ছুটলো মেঘের কাছে। ঘুমন্ত অবস্থায় বুকে টেনে নিলো শ্রাবণ মেঘকে। এলোমেলো ভাবে গালে কপালে চুমুতে ভরিয়ে দিলো। তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ক্ষীয়ৎক্ষণ। শ্রাবণের ভেজা শার্টের ঠান্ডা স্পর্শে কেঁপে উঠলো মেঘ। বেশিক্ষণ জড়িয়ে রাখতে পারলো না শ্রাবণ। মনটা শান্ত হলে ও মেঘের জ্বরের তাপমাত্রা অনেক। শ্রাবণের মনে হলো পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকে মেঘ। আলতো হাতে গাল চাপড়ালো শ্রাবণ মেঘের। বললো,
---- মেঘফুল ওঠো দেখো আমি এসে গিয়েছি। কেন করেলে এমনটা তুমি? কেন এতোটা পোড়াচ্ছো আমায়? কি চাও তুমি? চোখ খোলো মেঘ। প্লিজ মেঘ এতোটা নিষ্ঠুর হইও না আমার জন্য।
চলবে,,,,,,,,