ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

২০তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —২০

#কলমে_তাসনিম_লিজা

---- কপি নিষিদ্ধ!

মেঘের নিস্তেজ শরীরটা শ্রাবণের বুকে লেপ্টে আছে। শরীরে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মনে হলো শ্রাবণের কাছে তবুও ছাড়ছে না ছেলেটা মেঘকে। আমিনা বার বার জলপট্টি দেওয়ার জন্য পানি নিয়ে আসছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না পানি অব্দি গরম হয়ে যাচ্ছে।

ডক্টরের নাম্বার ও নেই আমিনার কাছে। সেই যেতে হবে অনেকদূর। এদিকে জাহিদ আহমেদের কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না সব মিলিয়ে টেনশনে ভরপুর অবস্থা। শ্রাবণ ও চেনে না এখানকার কিছুই। আবার বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিকে শুধু বৃষ্টি পড়ার শব্দ এবং তীব্র বাতাস বয়ছে।

আমিনা চিন্তিত স্বরে বললো,

---- চাচাজান সেই কবে বলেছে চলে আসবে। কিন্তু,

এহনো তো আসলো না। আমার অনেক ডর লাগতাছে ভাইজান। চাচাজান আবার বিপদে পড়লো না তো?

একদিকে মেঘ, অন্যদিকে মেঘের বাবা। দুজনের জন্যই টেনশন হচ্ছে শ্রাবণের। মেঘের অবস্থার অবনতি হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। ঢাকা হলে এতো ভয় লাগতো না শ্রাবণের কিন্তু, এটাতো গ্রাম। এখানে কোনো উপায় পাচ্ছে না সে। হঠাৎ কি ভেবে বললো,

---- এখান থেকে সরকারি হসপিটাল কতদূর আপু?

আমিনা আরো চিন্তিত হলো৷ বললো,

---- সে তো অনেক দূর। আর রাস্তা ও তেমন একটা ভালো না। তবে বাজারে একটা ডাক্তার আছে।

চাচাজানের বন্ধু হয়। এখন তো সে থাকবে ও না। বাড়িতে চইলা গেছে। আটটা বাজলেই দোকান বন্ধ করে চইলা যায়। ডাকলে ও আসবে না।

রাত এগারোটা বাজে। এখন গ্রামের মানুষ গভীর নিদ্রায় মগ্ন। জাহিদ আহমেদ তার আগে রওনা দিয়েছে গ্রামের উদ্দেশ্যে দু'ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। এখনো আসার নাম নেই ওনার। নিরুপায় হয়ে মেঘকে আগলে রেখে চোখদুটো বন্ধ করে রইলো শ্রাবণ। নিজেকে এতোটা অসহায় লাগছে কেন আজ? রাতটা কি এভাবেই কাটবে? কষ্টে ছটফট করবে তার মেঘফুল? সহ্য হচ্ছে না শ্রাবণের। আমিনা চলে গেলো। যাওয়ার আগে খেতে বলছিলো শ্রাবণকে বারণ করে দিলো শ্রাবণ। আমিনা আর কথা বাড়াইনি। মেঘের যা অবস্থা কারোরই খাওয়ার কথা নই।

হঠাৎ বাইরে শব্দ হলো। বৃষ্টির মধ্যে কারোর কথা শুনা যাচ্ছিলো হালকা। আমিনা বের হলো সতর্কতার সাথে। হয়তো চাচাজান আর নয়তো চোর ডাকাত আসার সম্ভাবনা থাকতে পারে। পা বাড়ালো ডয়িংরুম পেরিয়ে সদর দরজার দিকে। দরজা খোলে উঁকি দিলো আমিনা। জাহিদ আহমেদ দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে গিয়েছেন তিনি। গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছেন আর ডেকে যাচ্ছে আমিনাকে।

আমিনা দ্রুত চাবি নিয়ে আসলো গেইটের তালা খুলার জন্য। বললো,

---- চাচাজান আপনি এসেছেন? আমি তো চিন্তায় শেষ। একটু দাঁড়ান আমি খোলতাছি গেইট৷

তাড়াহুড়ো করে গেইট খুললো আমিনা৷ জাহিদ আহমেদ বলেন,

---- আমিনা আমার আম্মাজান কোথায়? ও কেন আসছে কিছু জিজ্ঞেস করেছিস ওকে?

ভেতরে আসলো জাহিদ আহমেদ। আমিনা বললো,

---- জানি না কি জন্য আইছে। এখন তো ভাইজান ও আইছে। আপামনির জামাই। আর আপামনি তো জ্বরে অচেতন হইয়া আছে।

তিনি আর কথা বাড়ালেন না। মেঘের রুমের সামনে এসেই থামলেন জাহিদ আহমেদ। শ্রাবণের চোখ বন্ধ ছিলো জাহিদ আহমেদ এর শক্ত কন্ঠে বলা কথাগুলো শুনে চোখ মেলে তাকালো সে,

---- আমার মেয়েকে ছাড়ো শ্রাবণ। আগে আমার কথার জবাব দাও। আমার মেয়ে কেন কাউকে কিছু না বলে তোমার বাসা থেকে চলে আসছে? তাও একা একা?

শ্রাবণ ছাড়লো না বরং শক্ত হাতে আগলে নিলো মেঘকে। জাহিদ আহমেদ এর দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বললো,

---- আমি জানি না বাবা। মেঘের জ্ঞান না ফিরলে কিছুই বলতে পারবো না। আপনি প্লিজ ডক্টরকে ফোন দিন৷

আরো কঠোর হলেন জাহিদ আহমেদ। তেড়ে আসলেন

শ্রাবণের দিকে। মেঘের হাত ধরলেন তিনি। বলেন,

---- আমি জানি আমার মেয়ে কেমন। ও সহজে সেই জায়গা ত্যাগ করে না যেই জায়গা তার বাবার

কথাতে যায়। ও কষ্ট পেয়েছে তোমার থেকে আর বাধ্য হয়েছে তোমার থেকে দূরে আসতে। ছাড়ো আমার মেয়েকে। আমি ভুল করেছি তোমার হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিয়ে।

শ্রাবণের রাগ হলো। তবুও নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। বললো,

---- আপনি ভুলে যাবেন না আমি ওর হাসবেন্ড হই।

আর আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। কজ আমার থেকে দূরে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। পারলে ডক্টরকে নিয়ে আসুন। আমার মেঘ কষ্ট পাচ্ছে।

ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তাকালেন জাহিদ আহমেদ। শ্রাবণ ফের বললো,

---- বিয়ে দিয়ে আমার কোনো উপকার করে ফেলেননি আপনি শশুর আব্বা। ভাগ্যক্রমে বিয়েটা না হলে ও আমি আমার মেঘফুলকে ঠিকই নিজের করে নিতাম। আর সেটা আপনার থেকে ভালো কেউ জানবেই না। তাই না বাবা?

---- ভদ্র ভাবে কথা বলো শ্রাবণ।

শ্রাবণ ভদ্র ভাবেই বললো,

---- আমার দাদু ও একই কথা বলছিলো। আপনি শুনেছেন? তাহলে আমি কেন শুনবো? যেখানে

সে আমার একমাত্র বিয়ে করা বউ।

রেগে হাসফাস করতে করতে বের হয়ে গেলেন জাহিদ আহমেদ। বাইরে থেকে শশুর ও মেয়ের জামাইয়ের কথোপকথন শুনে অবাক হয় আমিনা। কেউ কারোর থেকে কম নই বাব্বাহ!

জাহিদ আহমেদ ফের ভেজা অবস্থাতেই বের হয়ে গেলেন বাহিরে। আমিনা পেছন থেকে তাকিয়ে রইলো। ইচ্ছে করছিলো জিজ্ঞেস করার পরোক্ষণে মনে পড়লো হয়তো ডাক্তার আনতে গিয়েছে। এতো রাতে পাবে কি?

______________________

নিউজ : বিশেষ প্রতিবেদন!

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অন্যতম ও প্রভাবশালী শিল্পপতি কাইসার মির্জার ছেলে নয়ন মির্জাকে ঘিরে সামনে এসেছে একের পর এক ভয়াবহ অভিযোগ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক তরুণীকে হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ আরও রয়েছে, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একাধিক ব্যক্তির মুখ বন্ধ রাখা হয়েছিল।

চাঞ্চল্যকরভাবে এই ঘটনায় একজন ফরেনসিক চিকিৎসক, কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং একজন সিআইডি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা প্রভাব, ক্ষমতা ও অর্থের বিনিময়ে মামলার তথ্য গোপন এবং প্রমাণ নষ্টে সহায়তা করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে নিজের কিছু অপরাধ স্বীকার করার পর নয়ন মির্জাকে গ্রেফতার করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেফতারের সময় চালাকি করে সে এক পুলিশ সদস্যকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ওই পুলিশ সদস্য।

তবে পালানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি নয়ন মির্জার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অভিযোগ ও প্রমাণ আদালতে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা, প্রমাণ গোপন, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হত্যা, এসব অভিযোগে একাধিক মামলা হতে পারে।

নিউজটা দেখে কায়সার মির্জা দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন। বলেন,

---- ড্যাম ইট! ছেলেটা আমার সব শেষ করে দিলো। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সম্মান, নাম, পরিচয়, সব মাটিতে মিশিয়ে দিল। কুলাঙ্গার একটা! নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছে। থাক এবার জেলে পচে! ওর জন্য আর একটা টাকাও খরচ করবো না আমি।

নয়নের মা কেঁদে উঠলেন টিবির দিকে তাকিয়ে নিজের ছেলেকে দেখে। স্বামীকে বলেন,

---- এমন কথা বলো না। ছেলেটা আমার একটু অবাধ্য। তাই বলে কি ওকে জেলে ফেলে রাখবো? টাকা কি তোমার কম?

রেগে ফুঁসে হাত ছুঁড়লেন স্ত্রীর মুখের দিকে। থাপ্পড় দিতে গিয়ে ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন,

---- একটা কথা ও বলবে না তুমি আমিরা। ও শুধু তোমার জন্য এই বাজে পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ছেলেকে শুধরানোর বদলে উসকিয়ে গিয়েছো। কিছুই হবে না ভেবে উড়িয়ে দিয়েছো আমার কথা। এখন বোঝো কেমন লাগে।

ভয়ে দূরে সরে যান কয়েক পা আমিরা মির্জা। হ্যা ঠিকই বলেছেন কায়সার মির্জা। ছেলেকে আসকারা দিয়ে এতদূর এনেছে নয়নের মা। সব কিছুতেই সায় দিয়েছেন তিনি ছোট থেকেই। তাই নয়ন কোনো ভয় পায় না। সাপোর্ট পাচ্ছে সে অন্যায় করলে কিছুই আসে যায় না৷ মা তো পাশেই আছে।

কাঁদতে কাঁদতে চলে যান আমিরা মির্জা। সত্যিই তিনি ছেলেকে শাসন করেননি৷ এখন ছেলের এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করছেন৷ অনুশোচনা হচ্ছে। তবে কিছুই করার নেই ওনার৷ সত্যিটা প্রমান হয়ে গিয়েছে। কিছু আইনকানুন ও কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির রায় দেওয়া বাকি শুধু। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বসে পড়লেন কায়সার মির্জা। বড় আদরের একমাত্র সন্তানের এমন পরিণতি দেখা যে কতটা কষ্টকর তা বোধহয় তিনি হারে হারে টের পাচ্ছেন৷ বুঝতে পারছেন বিষাদময় অনুভূতি।

__________________

---- শ্রাবণকে ফোনে পেয়েছিস?

---- না রে পাইনি তো। কোথায় আছে কি করছে কিছুই তো জানি না। আংকেল ও বললো বাসায় ফিরেনি৷ এতো রাতে কোথায় গেলো ছেলেটা? মেঘ কে পাইনি নাকি?

রাতুলের কথায় তাসির হতাশ হয়ে৷ বললো,

---- ওকে একা ছাড়াটায় আমাদের ভুল হয়েছে।

আবার ও ফোন দে তো আংকেলকে। জিজ্ঞেস কর

শ্রাবণের সাথে কথা হয়েছে কিংবা ও কোথায় আছে জানে কি না!

রাতুল তৎক্ষনাৎ কল দিলো সারিফ শিকদার এর ফোনে। রিসিভ হলো,

---- আসসালামু আলাইকুম আংকেল শ্রাবণ মেঘকে পেয়েছেন?

সারিফ শিকদার নিশ্চিন্ত হয়ে বলেন,

---- হ্যা রাতুল ওরা গ্রামে আছে। মেঘদের বাড়িতে।

এই তো কয়েক মিনিট আগে জানতে পারলাম।

জাহিদ আহমেদ ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন। চিন্তা করছিলেন তারা ও।

সস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লো রাতুল বললো,

---- ওহ আচ্ছা তাহলে নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো। আচ্ছা আংকেল আমি এখন রাখছি পড়ে কথা বলবো।

দ্রুত ফোন রেখে তাসির, রামিম ও রিফাতকে বললো,

---- ওরা ঠিক আছে ব্রো। ব্যাটা এক দৌড়ে একদম শশুরবাড়িতে চলে গিয়েছে। মেঘ নাকি আগেই গিয়েছিলো। কিন্তু, কেন একা শ্রাবণকে না জানিয়ে চলে গেলো?

তাসির শান্ত হলো। বললো,

---- হয়তো তাদের মধ্যে মান অভিমান চলছে থাক বাদ দে। ওরা ঠিক আছে এই অনেক। বাসায় চলে যা তোরা। অনেক রাত হয়েছে।

---- ওকে। সব ঠিক তো আমরা ও ঠিক।

সবাই সবার বাসায় চলে গেলো।

_____________________

---- তাড়াতাড়ি আসো ভাই। আমার মেয়েটার অবস্থা বেশি ভালো না।

ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই ডাক্তার নিয়ে হাজির হলো জাহিদ আহমেদ। ডাক্তার বলেন,

---- আগে আপনি জামাকাপড় পাল্টে আসেন। নয়তো আপনার ও জ্বর ঠান্ডা লাগতে বেশি সময় লাগবে না। দ্রুত যান। আমি দেখছি আপনার মেয়েকে।

জাহিদ আহমেদ শুনলেন না। উৎকন্ঠিত হয়ে বললেন,

---- আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না। আমার মেয়েকে দেখো আগে।

রুমে আসলো ডাক্তারকে নিয়ে জাহিদ আহমেদ।

শ্রাবণ একই ভঙ্গিতে মেঘকে আগলে রেখেছে। মেঘের কোনো হুস নেই জ্বরের তোপে।

জাহিদ আহমেদ খানিকটা ধমকে বলে উঠলেন শ্রাবণকে।

---- এই ছেলে ওকে ছাড়ো। ডাক্তার আসছে দেখতে দাও ওকে।

শ্রাবণ সাথে সাথে বলে উঠলো,

---- দেখার জন্য আমি আছি বাবা। ডক্টরকে বলুন

ভালোভাবে চিকিৎসা করতে।

বিরক্ত হলেন জাহিদ আহমেদ। শ্রাবণ ধীরে আলতো হাতে শুইয়ে দিলো মেঘকে। উড়নাটা সারা শরীর ডেকে দিয়ে কম্বল টেনে দিলো গলা অব্দি।

ডাক্তার সাহেব মেঘের কপালে হাত দিতে নিলে থামিয়ে দিলো শ্রাবণ। অবাক হলেন ডাক্তার সহ জাহিদ আহমেদ ও। জাহিদ আহমেদ ফের ধমকালেন। বললেন,

---- কি শুরু করেছো তুমি? আমার মেয়েটা অসুস্থ ডাক্তার সাহেবকে দেখতে দাও জ্বর কতটুকু।

শ্রাবণ ডাক্তারের দিকে তীক্ষ্ণ চাহনি দিলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

---- জ্বর দেখার জন্য কারোর গায়ে হাত দিতে হয় না। বিশেষ করে মহিলাদের তো না-ই। আপনি ডক্টর হয়েছেন কেন? জ্বর হাতে নয় থার্মোমিটারে মাপতে হয়। এনেছেন?

ডাক্তার সাহেব ব্যাগ হাতরে দ্রুত বের করলেন। শ্রাবণ সেটা নিয়ে সুন্দর করে নিজেই চেইক করার জন্য মেঘের মুখে দিয়ে দিলো। তারপর ডক্টর যখন দ্রুত স্টেথোস্কোপ কানে গুঁজে মেঘের বুকের কাছে রাখতে গেলেন হার্টবিট চেইক করার জন্য সেখানে ও বাধ সাধলো শ্রাবণ। সরিয়ে নিলো সে তারপর শশুরের দিকে তাকিয়ে বললো,

---- বাবা আপনি জামাকাপড় চেইঞ্জ করে আসুন।

খারাপ দেখাচ্ছে তো আপনাকে।

হকচকালো জাহিদ আহমেদ। নিজের দিকে চোখ বুলালো একবার৷ ছেলেটা পাগল নাকি কোথায় খারাপ দেখাচ্ছে? তবুও যখন বলছে, তাহলে পাল্টানো দরকার। কথা না বাড়িয়ে জামাকাপড় পাল্টাতে চলে যান।

তারমধ্যে ডাক্তার সাহেব বলেন,

---- আমাকে দেখতেই দিচ্ছেন না রোগির কন্ডিশন কেমন? আমি বুঝবো কিভাবে?

শ্রাবণ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,

---- যেখানে আমি আজ পর্যন্ত আমার মেঘফুলের হার্টবিটের শব্দ পেলাম না সেখানে আপনি কিভাবে সাহস করলেন? আপনার তো লাইসেন্স ক্যান্সেল করা উচিত। বাই দা ওইয়ে ওসব শুনতে হবে না আপনার। আপনি মেডিসিন দিন দ্রুত।

---- জ্বর তো অনেক একশো দুই। আমি বৃষ্টি থাকার কারনে মেডিসিন নিয়ে আসছি সাথে করে।

শ্রাবণ কথা না বাড়িয়ে নিয়ে নিলো মেডিসিন। তারপর বললো,

---- রাতটা পার হলেই হবে। কালকেই আমরা চলে যাবো এখান থেকে। আপনি এখন আসুন ডক্টর।

চিকিৎসার নাম করে আমার বউকে টাচ করার চেষ্টা করেন আপনি। আপনার বউয়ের কাছে খবরটা পৌঁছাতে হবে।

গম্ভীর গলায় বললো শ্রাবণ। ডাক্তার সাহেব বললো,

---- কিসব বলেন আপনি? মেঘ আমার মেয়ের মতো। জাহিদ আমার বন্ধু। আর জ্বর হলে কপাল চেইক করবো না? হার্টবিট চেইক করবো না?

---- সরি আংকেল। ওসবের দরকার নেই।

ডক্টর রাগ হলেন মনে মনে। পাগল উপাধী ও দিলেন শ্রাবণকে। তারপর জাহিদ আহমেদ এর কাছ গেলেন তিনি। এদিকে আমিনা এসে পানি নিয়ে আসলো। শ্রাবণ মেঘকে জোর করে কোনোরকমে মেডিসিন খাইয়ে দিলো।

জাহিদ আহমেদ আর আসলেন না মেঘের রুমে। আমিনা দরজা চাপিয়ে নিজের রুমে চলে যান।

শ্রাবণ মেঘকে বুকে আঁকড়ে ধরেই ঘুমিয়ে গেলো।

_____________________

ঘুম ভাংতেই চোখ পিটপিট করে তাকালো মেঘ।

শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। দমবন্ধ লাগছে

মেঘের। কারোর বাহুবন্ধনে আবিষ্কার করলো নিজেকে। সে তো একা থাকার কথা কে তাকে এভাবে ঝাপটে ধরলো? কারোর বুকে আদুরে বিড়ালের মতো লেপ্টে আছে মেঘ। স্মেলটা চেনা ভীষণ মেঘের। চট করে মাথা তুলে তাকালো মেঘ।

শ্রাবণ এসেছে এখানে? কিভাবে কখনো? মাথাটা ভীষণ ভার লাগছে। চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে মেঘ।

পুরনো কথা মনে হতেই যন্ত্রণা রাগে রুপ নিলো।

হাতটা ঝাড়ি মেরে নিজের উপর থেকে সরিয়ে নিলো সে। আকস্মিক ঘটনায় ঘুম ভেঙে গেলো শ্রাবণের। ভীষণ পাতলা ঘুম তার। ছোট্ট শব্দ ঘুম ভেঙে যায়। মেঘ উঠে বসলো কিছুটা দূরে সরে। শ্রাবণ তার পর পরই উঠলো। মেঘকে উঠে বসতে দেখে শ্রাবণ যেনো শান্তি পেলো। লম্বা শ্বাস নিলো।

বললো,

---- তুমি ঠিক আছো তো মেঘফুল?

বলেই হাতটা কপালে ঠেকাতে নিতেই হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো মেঘ। রেগেমেগে বলে উঠলো,

---- কেন এসেছেন আপনি? প্রতিশোধ তো ভালোই নিয়েছেন আপনারা দুজন। আমার জীবনটা নিয়ে এভাবে না খেললে ও পারতেন শ্রাবণ শিকদার।

শেষের কথাটুকু বলতে মেঘে গলা ধরে আসলো।

মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে আবারও বললো,

---- আমি আপনাকে মুক্তি দিলাম। যা করার করবেন আমি বারণ করবো না। আপনি আমার চোখের সামনে থেকে এই বাড়ি থেকে চলে যান প্লিজ। আমার অসহ্য লাগছে আপনাকে।

শ্রাবণ হতবাক! কি বলছে মেঘ এসব? কারা দুজনের কথা বলছে মেয়েটা? শ্রাবণ তো তার মেঘফুল ছাড়া কাউকে পাশে চায় না। কেন এসব কথা বলছে? শ্রাবণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- আমাদের তো বিয়েই হলো চার পাঁচ দিন তার মধ্যেই মুক্তি চাচ্ছো? আমি তোমায় কষ্ট দিচ্ছি? কি হয়েছে তোমার মেঘ?

মেঘ তাচ্ছিল্যের হাসলো। বললো,

---- এই যে আমাকে এতো ভালোবাসেন বলেন এগুলো সবই আপনার অভিনয়। আপনি তো অন্য নারীতে আসক্ত। আমাকে বোধহয় সেইদিন মিথ্যা আপনার বউ বলে পরিচয় দিয়েছিলাম। সেইজন্যই আপনি প্রতিশোধ নিতে আমার সাথে বিয়ে নামক খেলাটা খেললেন। আমার জীবন, আমার স্বপ্ন, অনুভতি, সব সব কিছু আপনি ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমি হাসি মুখে মেনে নিলাম আপনার সব সত্যি। তবে দয়া করুন আমার উপর। আমার চোখের সামনে থেকে চলে যান। আপনার ওই সুন্দর মুখের আড়ালে একটা কুৎসিত মুখ আর খারাপ চরিত্র....

টাসস...

---- খবরদার মেঘ আমার চরিত্র সম্পর্কে একটা বাজে কথা ও বলবে না তুমি। আমি যদি চরিত্রহীন হই তাহলে সেটা তোমার জন্য। তুমি আমার স্ত্রী। আমি খারাপ হলে তোমার জন্য। আমি যেমনই হই শুধুই তোমার জন্য। তুমি ব্যাথিত আমার জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারী নেই। কে বলেছে তোমায় এসব বাজে কথা? তোমার বাবা? আজ দেখলাম তো ওনি আমায় সহ্যই করতে পারছে না। জানি তো আমি ওই দিব্য ভাইয়া হয়তো বুঝিয়েছে আমাদের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করে আমার থেকে তোমাকে আলাদা করতে। খোদার কসম মেঘ আমার থেকে তোমায় যে-ই দূরে সরাতে আসবে মৃত্যু ও তার জন্য কম হবে। তুমি আমার শুধুই আমার। আজ এখন এই মুহুর্তে আমার বাড়িতে যাবে। আমি সবার ষড়যন্ত্র বুঝে ফেলেছি।

মেঘ গালে হাত দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। বারবার শ্রাবণের গর্জে উঠা কন্ঠে

কেঁপে কেঁপে উঠছে। ভয় পাচ্ছে। নিজের মনের মধ্যকার ভয় দমিয়ে আবার ও বললো,

---- জোর গলায় কথা বললেই সব মিথ্যা হয়ে যায় না। কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনি? নিজে কালকে একটা মেয়ের সাথে হাতে হাত রেখে মাঠের দিক দিয়ে হাটঁছিলেন না? বলুন মিথ্যা বলতে পারবেন না আমি আপনাকে নিজের চোখে দেখেছি। আর সেই মেয়েটি ও কে আমি জানি। কনক সেই মেয়েটি যে আপনাকে পছন্দ করে। আর এটা ও আমি বুঝে গিয়েছি আপনি আমায় নই ওই মেয়েকেই ভালেবাসেন। আপনি আমার জীবনটা এলেমেলো করে দিলেন৷ আপনি কেন করলেন এমন? কি করেছি আমি?

শ্রাবণের এতোক্ষণে সবকিছু ক্লিয়ার হয়। বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। জোর করে মেঘের চোয়াল আঁকড়ে ধরলো। মুখে হাসি টেনে বললো,

---- আমার থেকে দূরে থাকুন আপনি বলা মেয়েটি তাহলে আমার থেকে দূরে থাকার অপরাধে এতোকিছু করলো? পাগলি মেয়ে ওটা কনক নয়,

ওটা আমার মামাতো বোন সি আই ডি অফিসার তাসফিয়া রাহমান। তদন্তের কারনে একটু অভিনয় করতে হলো আমাদেরকে ৷ নয়নকে এরেস্ট করা হয়েছে। বেচারির জামাই আছে বাচ্চাকাচ্চা ও আছে। আমার এতো সুন্দর একটা বউ থাকতে আমি কেনো যাবো ওর কাছে? আমি কাউকে ঠকায়নি।

আমি আমার মেঘফুলকে ভালোবাসি তাকেই চাই।

মেঘ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে।

তারমানে সে ভুল বুঝেছিলো শ্রাবণকে?

চলবে,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন