#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ২১
#তাসনিম_লিজা
---- কপি নিষিদ্ধ!
---- নিয়ে যা এসব খাবার, খাবো না আমি।
জেলের মধ্যে খাবার দিয়েছিলো সকালে রুটি। কিন্তু, নয়ন কাল থেকেই খাচ্ছে না কিছুই। রাগে ফুঁসছে সে। ফের হিসহিসিয়ে বললো একা একা,
---- তোর সামান্য একটা নাটকের কারনে আমি সারাজীবন জেলবন্দি হয়ে থাকবো সেটা তুই ভাবলি কি করে শ্রাবণ? আমার অধ্যায় শেষ ভেবে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিস, খাচ্ছিস, সবাইকে আমিমুক্ত করেছিস ফাইন শ্রাবণ ফাইন! আমি বেশিদিন এখানে নেই রে পাগল। আমি ফিরছি খুব শিগগিরই তোর জীবনে কালবৈশাখী ঝড় হয়ে।
জাস্ট ওয়েট!
---- কি তখন থেকে বিরবির করছিস রে? খেলে খা নইলে উপোস থাক আমি নিয়ে যাচ্ছি।
একজন কনস্টেবল খাবার নিয়ে চলে গেলো। নয়ন এতে আগ্রহ দেখালো না৷ তার রুচিতে বাঁধে এসব খাবার খেতে। শুধু ভাবছে সে এখনো তার বাবা মা আসছে না কেন? রাত পেরিয়ে সকাল হলো কেউ আসলো না? মা তো আসবেই ভেবেছিলো নয়ন।
আজব তার ভাবনা মিথ্যা হলো? স্থির হয়ে বসে রইলো ফ্লোরে।
_____________________
মেঘের আকস্মিক আলিঙ্গনে শ্রাবণ যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখে বিস্ময় স্পষ্ট, অথচ বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন সৃষ্টি হলো । কারণ এই প্রথমবার মেঘ নিজে থেকে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। স্বপ্ন দেখছে না তো শ্রাবণ? নিজের হাতে নিজেই চিমটি কাটলো সে। ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে এলো তার। নাহ! সত্যি। শ্রাবণ একমুহূর্ত ও দেরি করলো না দুহাতে আবদ্ধ করে নিলো পরম আবেশে তার মেঘফুলকে। মেঘ শ্রাবণের বুকে মাথা ঠেকিয়ে মিনমিনে স্বরে বলে উঠলো,
---- আমাকে অবহেলা করবেন না প্লিজ। আমি সহ্য করতে পারছি না আপনার এই অহেতুক এড়িয়ে যাওয়া। আমি আপনাকে ভালোবাসি কি না জানি না তবে আপনাকে আমার লাগবেই। আপনাকে আমার প্রতি মুহুর্তে লাগবে। আপনি আমার অভ্যাস। আপনি আমার শান্তি। আই'ম সরি আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। আরো একটা সরি আপনাকে আমি ওইদিন কথা শুনিয়েছিলাম। তারপর বুঝলাম এভয়েড করলে সেই ব্যক্তিটির কেমন লাগে।
মুহুর্তটা শ্রাবণের কাছে স্বপ্নই লাগলো। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুলের ভাঁজে চুমু খেলো শ্রাবণ। অতঃপর ধীর গলায় বললো,
---- নট সরি ডিয়ার মেঘফুল। তোমার ভুল অন্যায় কেবল আমার কাছেই হোক। আমি সব মেনে নিতে পারবো।
মেঘ ওভাবেই বললো,
---- এতো ভালোবাসেন কেন? এতো ভালো কেন আপনি? আমি তো আপনাকে না বুঝে যা নয় তা বলে দিয়েছি।
---- ভালো কি না জানি না তবে আমি আমার বাবার মতো হতে চাই না। বউ হচ্ছে ফুলের মতো, তাকে যত্ন করতে হয়। ভুল করলে শুধরিয়ে দিতে হয়। বুঝিয়ে বলতে হয়। ছেড়ে দেওয়া বা রাগ দেখিয়ে কাপুরুষের পরিচয় দেওয়াটা নিছকই বোকামি ছাড়া কিছুই না। পরিবার শান্তির জায়গা।
অশান্তি নট এলাউ আমার জীবনে!
---- আমি সত্যি লাকি আপনাকে পেয়ে। বোকার মতো ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলাম কি করে?
শ্রাবণ হাসলো শব্দহীন। হাতের বাঁধণ শক্ত হলো।
বললো,
---- চাইলে ও অসম্ভব ম্যাম। আ....
---- শ্রাবণ!
বাইরে থেকে জাহিদ আহমেদ এর গলার স্বর শুনে
থেমে গেলো শ্রাবণের কথা বলা। মেঘ ছেড়ে দিলো শ্রাবণকে। দ্রুত দরজা খুলে দিলো। জাহিদ আহমেদ মেঘকে সুস্থ দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে হাসি মুখে বলে উঠলেন,
---- আম্মাজান আমার সুস্থ হয়েছেন?
মেঘ বিনিময়ে হাসলো। হ্যা বোধক মাথা নাড়ালো।
জাহিদ আহমেদ তৎক্ষনাৎ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
---- আম্মাজান একা একা কেন এসেছেন গ্রামে? তাও আমি শহরে থাকার পর ও?
শ্রাবণ জাহিদ আহমেদ এর দিকে তাকিয়ে আছে।
বাবা মেয়ের কথোপকথন শুনছে নীরবে। মেঘ কি বলবে সব তো মিথ্যা। কোনো অভিযোগ নেই তার শ্রাবণের প্রতি। মিথ্যা বলার ও তো উপায় নেই। তবুও মেঘ ক্ষীণ স্বরে বললো,
---- বাড়ির জন্য মন খারাপ করছিলো বাবা।
জাহিদ আহমেদ শ্রাবণের দিকে তাকালো। শ্রাবণ
বুকে হাত গুঁজে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। এমন যেনো সে কিছুই শুনছে না। কিছু তো একটা হয়েছিলো। মেয়েটা বলতে চাচ্ছে না তাহলে আর কি করার? তিনি বলেন,
---- ঠিক আছে। আর কখনো যেনো এমন না হয়।
শ্রাবণকে বলবে নইতো আমি আছি তো নিয়ে আসবো।
---- আচ্ছা বাবা।
---- ফ্রেশ হয়ে দুজন খেতে আসো।
---- হুম।
---- নিজের বেলা ষোল আনা আর আমার বেলা চারআনা। বড্ড সেয়ানা তোমার বাপটা বুঝলে মেঘ?
মেঘ অবাক হলো। বললো,
---- বাবা কি করেছে আপনার সাথে? এভাবে বলছেন কেন?
মেঘের কথা শ্রাবণ ফের বললো,
---- তেমন কিছুই না। জাস্ট কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলো আর কি। বাদ দাও তো ফ্রেশ হয়ে আসো। খুব খিদে লেগেছে। সেই গতকাল সকালে খেয়েছি। আমাকে ও কষ্ট দিয়েছো, নিজে ও কষ্ট পেয়েছো। শুনো মেয়ে অন্যায় করলে অন্যায় কারীকে কষ্ট দিও নিজেকে নই।
মেঘ খানিকটা লজ্জা পেলো। জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ছুটলো। শব্দ করে হেসে উঠলো শ্রাবণ। মনটা হালকা লাগছে। জীবন যেনো থমকে গিয়েছিলো তার। কিভাবে যে এতোদূর এসেছে সে নিজে ও জানে না। বৃষ্টিতে ভিজে নিজেরই কেমন লাগছে। ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। ফোন চার্জে দিয়েছিলো সে দ্রুত আনলো। বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো প্রায় রাতে।
মেঘের এমন অবস্থা দেখে সব ভুলে বসেছিলো সে।
সবাই একেরপর এক কল দিয়েছিলো৷ শ্রাবণ আগে তাসিরকে কল করলো, একবার দিতেই রিসিভ হলো তাসির ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
---- আমাদের তো হার্ট অ্যাটাক করে মতে হতো রাতে। একটিবার জানানোর কি প্রয়োজন ছিলো না তোর?
শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। বন্ধু গুলো দুষ্টু হোক আর যাই হোক একেকজন একেকজনের প্রাণ।
বললো,
---- না জানলে নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারতিস বুঝি?
---- আংকেলকে কল দিয়েছিলাম রাত্রে। তোরা ঠিক আছিস জেনে তারপর বাসায় আসছিলাম।
তাই আর টেনশন করার মতো কিছুই রইলো না। তো দুজন ফিরবি কবে বল? নাকি শশুরবাড়িতে থাকবি কিছুদিন? মেঘ তোর সাথে রাগ করেছিলো নাকি?
শ্রাবণ ধীরে ধীরে উত্তর দিলো,
---- থাকাটা নির্ভর করছে মেঘের উপর। ও যদি থাকতে চাই আমি বারণ করবো না। আর বাকিটা
এমনিই।
বলতে চাচ্ছে না শ্রাবণ মেঘের রাগের কারন। বুঝতে পারছে তাসির। রাগ নই এটাই ঠিক তাদের পার্সোনাল কথা না জানাই ভালো। তাসির হাসি মুখে বললো,
---- ঠিক আছে দুজন সুন্দর সময় কাটা। নিজদের মধ্যকার দূরত্ব মিটিয়ে তারপর আসিস। রাখি তাহলে আর একটু ঘুমাবো।
---- বাই।
একে একে সবগুলোকে জানালো শ্রাবণ। তারপর বাসায় কল করলো। শ্রাবণ জানে জাহিদ আহমেদ জানিয়ে দিবেন। শ্রাবণ কল করার মধ্যেই কল আসলো সুমনা রাহমান এর। রিসিভ করলো শ্রাবণ।
---- বলো মা।
---- তুই ঠিক আছিস তো বাবা?
সুমনা রাহমান এর অস্থিরতা দেখে শ্রাবণ বললো,
---- আমি ঠিক আছি মা। তোমরা টেনশন করছো কেন? মেঘের বাবা তোমাদের জানাননি আমাদের কথা?
---- হ্যা জানিয়েছেন। তবুও তোর জন্য টেনশন হচ্ছে। মেঘের কি অবস্থা? মেয়েটা নাকি জ্বর বাঁধিয়েছে। ওকে নিয়ে চলে আয়। আমি আছি তো।
শ্রাবণ মৃদু স্বরে বললো,
---- মা মেঘ চাইলে আসবো। আর হ্যা তোমরা টেনশন করো না আমাদের জন্য। আমি চাই তোমরা নিজেদের মতো সময় কাটাও। দুজন মিলে রান্না করো। বাবাকে বলো ঘুরতে নিয়ে যেতে।
আমাদের কথা কিছু সময়ের জন্য মন থেকে মুছে ফেলো তো। আমি জানি তোমার মন ভালো নেই।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন সুমনা রাহমান। ছেলের কথাই খুশি হলেন ও বটে। তবে হাতাশার স্বরে বলেন,
---- আমাদের সময় শেষ বাবাই। আমরা এখন সেই সময় আর ফিরে পাবো না। নিজেদের রাগ ক্ষোভ প্রকাশ করে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমার এখন তোর জন্য টেনশন হয়। তুই যেনো ভালো থাকতে পারিস। তোরা না থাকলে আমার মনটা হাহাকার করে। চলে আয় বাবা।
---- সময় মাত্রই নামমাত্র। আমি চাই তোমরা ভালো থাকো। পুরনো দিনের মতো। যেখানে নেই ঝগড়া মনোমালিন্য, নেই কোনো দূরত্ব। আমি রাখছি।
কথা বলার সুযোগ দিলো না শ্রাবণ। বাবার নাম্বারে কল করলো সে। দুবার দেওয়ার পর রিসিভ হতেই
সারিফ শিকদার বলেন,
---- মেঘ কেমন আছে শ্রাবণ?
শ্রাবণ বললো,
---- ভালো আছে বাবা। তুমি কি বিজি?
---- না তো কেন?
---- মা কোথায়?
---- কিচেনে।
---- যাও তো সেইদিনের মতো দুজন একসাথে রান্না করো। আজ তো শুক্রবার নামাজ শেষ করে মাকে নিয়ে একটু ঘুরবে। আগে যেভাবে একসাথে ঘুরতে
মায়ের পছন্দের ঝালমুড়ি কিনে দিবা। আর একটা
কাঠগোলাপ কিনে দিও। আমার মা ভীষণ পছন্দ করে।
বাকরুদ্ধ সারিফ শিকদার। ছেলেটা সব জানে মায়ের পছন্দ সম্পর্কে। সবসময় কেবল তর্ক আর ঝগড়া দেখেছে। আলাদা জীবনযাপন করতে দেখেছে আর আজ নিজেকে অনেক ছোট লাগছে। তিনি বলেন,
---- অবশ্যই যাবো। তোর মাকে বড্ড অবহেলা করেছি বাপ আর করবো না। শেষ সময় না হয় বুড়ো বুড়ি একসাথে বাঁচবো হাসি আনন্দে।
কল রেখে দিলো শ্রাবণ। তার উপলব্ধি হলো এই যে মেঘের প্রতি মেঘের কথায় দূরত্ব বাড়িয়ে সে মেঘের কষ্টটা বুঝতে পেরেছে। একটা মেয়ে সব সহ্য করতে পারে অবহেলা না। তার মা ও একই কষ্ট পেয়েছে তার বাবার থেকে। তাই তো দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
মেঘ শ্রাবণ তার বাবাকে বলা কথাগুলো শুনছিলো মুগ্ধ হয়ে। শ্রাবণকে চেনা অসম্ভব। কোন ধাঁচের লোকটা? এতোটা কেয়ারিং একটা মানুষ হয় কিভাবে? মায়ের কষ্টটা কত সুন্দর করে বুঝতে পারলো সে।
---- ভেজা চুলে দাঁড়িয়ে না থেকে এদিকে আসো।
আবার জ্বর বাঁধিয়ে বসবে নাকি? আমি কিন্তু এমনিতেই তোমার জ্বরের তোপে পুড়ে গিয়েছি। আর তুমি তে আমাকে আগেই পোড়াচ্ছো।
মেঘ ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। শ্রাবণের কথামতো তার সামনে এগিয়ে এলো। শ্রাবণ টাওয়ালটা নিয়ে ধীরে ধীরে চুলগুলো মুছে দিলো। টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো পেঁচিয়ে নিজের দিকে ফেরালো মেঘকে। কপালে আলতো করে চুমু খেলো। আবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
---- কি জাদু করেছো বলোতো? তুমি ছাড়া শ্রাবণ শূন্য। অন্ধ লাগে নিজেকে। চারদিকে কত মানুষ অথচ তুমি আমার চোখ।
চিবুক নামালো মেঘ। বললো,
---- আপনি শাওয়ার নিয়ে নিন। আমি বাবার জামাকাপড় নিয়ে আসছি।
মেঘ নত দৃষ্টিতে দ্রুত চলে গেলো রুমের বাইরে।
শ্রাবণ যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো স্থিরচিত্তে।
কিছুক্ষণ পর মেঘ তার বাবার নতুন পান্জাবি পাজামা নিয়ে আসলো। শ্রাবণ ততোক্ষণে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছে। কড়া নাড়লো মেঘ। হালকা দরজা খুলতেই এগিয়ে দিলো সে। তারপর
আমিনার কাছে গেলো। কি রান্না করছে কে জানে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শ্রাবণ প্রথমবার আসছে তাদের বাড়িতে।
মেঘকে দেখে আমিনা অবাক বলে উঠলো,
---- কি ব্যাপার আপামনি তুমি এহানে আইছো যে,
চাচাজান জানলে বকবে আমারে।
মেঘ কি কি রান্না হলো দেখছিলো। গরুর মাংস ও
আছে। মেঘ খুশি হলো শ্রাবণের গরুর মাংস পছন্দ। তার মা বলেছিলো। সাথে অনেক আইটেম রান্না করা হয়েছে
---- চিন্তা করো না তো আপু। আমি ঠিক আছি।
জ্বর ও নেই। আর তুমি জানো না আমার জ্বর একদিনের বেশি থাকে না। আজব জ্বর হয়। আচ্ছা আমিনা আপু তুমি টেবিলে সাজিয়ে রাখো আমি ওনাকে নিয়ে আসছি। আর বাবাকে ও বলতে হবে।
---- ঠিক আছে তুমি যাও।
মেঘ আগে বাবার রুমে গেলো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললো,
---- বাবা খেতে আসো।
---- আসছি আম্মজান। শ্রাবণ কে নিয়ে বসো।
---- ঠিক আছে বাবা।
মেঘ পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে। পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটা এলোমেলো ভিজে চুল কপালে উপর লেপ্টে আছে। তার থেকে মুখে উপর গড়িয়ে পড়ছে পানির ফোঁটা। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেঘ। অদ্ভুত এতো সুন্দর লাগছে কেন ছেলেটাকে?
ছেলেটা পাগল নাকি নিজেই ছেলেটার জন্য পাগল বুঝে পাচ্ছে না মেঘ।
---- কি ব্যাপায় মিসেস প্রেমে পড়ে গেলেন নাকি?
তাহলে ও তো দেখছি পাঞ্জাবিই হবে আমার জন্য নিত্যদিনকার একমাত্র পোষাক। কি বলেন,
চমকে উঠলো মেঘ। ছিহ! বেশরমের মতো তাকিয়ে ছিলো সে আর সেটা শ্রাবণ বুঝে ও ফেলেছে। কি লজ্জার বিষয়। মেঘ আমতা আমতা করে বললো,
---- পাঞ্জাবিতে আপনাকে অন্যরকম লাগছিলো তাই...
শ্রাবণ সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো। একদম কাছে।
বললো,
---- তাই প্রেমে পড়ে গিয়েছেন?
মেঘ যেনো পালালেই বাঁচে। তাড়াহুড়ো করে বললো,
---- বাবা! বাবা বলেছে খেতে যেতে। আসুন আপনি।
বলে আর পাই কে মেঘকে। শ্রাবণ হাসে মেয়েটা শান্ত কে বলেছে? মেয়েটাকে একেক সময় একেকরকম লাগে। এই শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে। এই রাগী তো এই দুরন্তপনা।
পিছু গেলো শ্রাবণ। অনেকগুলো আইটেম রান্না হয়েছে। আর সব করেছে আমিনা ও আরেকজন এসে সাহায্য করেছে। মানুষ সংখ্যা মাত্র আমিনাকে নিয়ে চারজন রান্না হলো আট দশজনের। অবাক হলো বেশ শ্রাবণ। শ্রাবণ বসতেই জাহিদ আহমেদ নিজে পরিবেশন করলেন
শ্রাবণের পাতে তুলে দিলে তাদের পুকুরের পাঁচ ছয় কেজি ওজনের মাছের মাথা। সাথে আরো অনেক।
শ্রাবণ বাঁধা দিলো বললো,
---- বাবা আর দিবেন না। আপনি আমাকে জামাই না ভেবে বউয়ের ভাইয়ের ছেলে ভাবুন। আর আমি নিজেই নিয়ে খেতে পারবো।
জাহিদ আহমেদ খুশি হলেন। শ্রাবণ মাথাটা বেছে বেছে সব মেঘের প্লেটে তুলে দিলেন। মেঘ অবাক হয়ে বললো,
---- আপনি না খেয়ে আমাকে দিচ্ছেন কেন?
শ্রাবণ ধীর কন্ঠে কানে কানে বললো,
---- বুদ্ধি বাড়বে মাথা খেলে। আমি চাই না আমার বউ আমাকে ছেড়ে চলে না যাক।
মেঘ লজ্জায় মুখ লুকানোর তীব্র চেষ্টা করলো। শ্রাবণ আবার ও মাছ বেছে দিলো নিজে ও খাচ্ছে। ব্যাপারটা জাহিদ আহমেদ এর কাছে ভালো লাগলো। আমিনা ও মিটি মিটি হাসছে। জাহিদ আহমেদ তাড়া দিয়ে বললো,
---- কি ব্যাপার শ্রাবণ তুমি মাংস নিচ্ছো না কেন?
শ্রাবণ বললো,
---- আপনি ও তো নেননি কেন?
জাহিদ আহমেদ ভার মুখে বলেন,
---- আমার মেয়েটা খেতে পারছে না আর আমি তার সামনে বাবা হয়ে খাবো? আমি পারবো না।
শ্রাবণ একই ভঙ্গিতে বললো,
---- সেটাই তো বাবা৷ আমার বউ খেতে পারছে না আর আমি খাবো? ইম্পসিবল বাবা। কাউকে দিয়ে দেন তরকারি আমরা তো কেউ খাবো না।
---- ঠিক বলেছো।
মেঘ বললো,
---- আমি খেতে পারবো না বলে আপনি ও?
শ্রাবণ বললো,
---- তোমার বাবার কাছে তুমি যতোটা আপন, আমার কাছে তার থেকে বেশি আপন। আর এটা তো সামান্য না খেলে কেউ মারা যাবে না।
মেঘ শ্রাবণের সেই দু'দিনের করা যত্নের কথা মনে পড়লো। তারপর যে কি অসহনীয় যন্ত্রণা হতো বলার বাহিরে। আজ নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।
জাহিদ আহমেদের মনটা শান্ত হলো। রাতে তো যা নই তা বলে ফেলেছে ছেলেটাকে। অথচ তার মেয়কে তার মতোই কেউ একজন যত্ন করে আগলে রাখছে। এটাই তো বাবারা চাই। বাবার মতো কেউ যত্ন করুক কেউ।
খাবার খাওয়া শেষ হলেই জাহিদ আহমেদ আমিনাকে বললো,
---- আমিনা এসব তোর বাড়িতে দিয়ে আয় আগে।
---- আচ্ছা চাচাজান।
আমিনা খুশি হয়ে চলে গেলো খাবারগুলো বক্সিং করতে।
শ্রাবণ রুমে আসলো। মেঘ বললো,
---- আজই চলে যেতে হবে?
মেঘের মন খারাপ চলে যাওয়ার কারনে৷ কারন শ্রাবণ তো বলেছে চলে যাবে তাই। শ্রাবণ তাকালো মেঘের মুখের দিকে। মন খারাপরা তার মেঘফুলের মুখে এসে ভীড় জমিয়েছে৷ শ্রাবণ কাঠিন্যে গলায় বললো,
---- অবশ্যই যাবো।
মেঘ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো শ্রাবণের দিকে। না ও করছে না মেঘ। শ্রাবণের হাসি পেলো হাসি চেপে রেখে বললো,
---- যাও রেডি হও।
মেঘ যেতে নিতেই হাত ধরে হেঁচকা টানে নিজের কাছে এনে জড়িয়ে ধরলো। চিবুক উঁচুিয়ে বললো,
---- হ্যা রেডি হতে বলেছি কারন আমরা তোমার সুন্দর গ্রামটা ঘুরে দেখতে চাই। দেখাবে?
হাসি ফুটলো মেঘের ঠোঁটে। সেই সাথে শ্রাবণ ও হাসলো।
---- আপনি চাইলে অবশ্যই।
______________________
---- বাবা মেঘ ঠিক আছে তো? কেন এসেছিলো মেয়েটা একা একা?
শুইয়ে শুইয়ে দিব্য মেঘের টেনশনই করে গিয়ছিল রাত থেকে। কি হয়েছে তাদের মধ্যে? শ্রাবণ মেঘের খেয়াল রাখে তো? মেঘকে বুঝবে তো? জাহাঙ্গীর আহমেদ ছেলের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে শুধালেন,
---- মেঘ ঠিক আছে দিব্য। তুই এই নিয়ে কোনো টেনশন করিস না। মেঘ শ্রাবণের দায়িত্ব, আগলে রাখা সব। হয়তো সামান্য মনোমালিন্য হয়েছে তাই মেয়েটা রাগ করে চলে গিয়েছে। এখানে আসা ও তো বারণ মেয়েটার।
অবাক হলো দিব্য বললো,
---- নিশ্চয়ই আমার জন্য তাই না বাবা? আমি তো রেগে ছিলাম আমার কষ্ট হয়েছিলো তাই অনেক কথা, অনেক হুমকি দিয়েছিলাম। তবে বিশ্বাস করো বাবা মেঘ কষ্ট পাক তা আমি কখনোই চাই না। যেখানে মেঘ নিরদ্বিধায় শ্রাবণকে মেনে নিয়েছে সেখানে আমি কিভাবে অধিকার কাটায় বলো? এখন একটাই অপশন আমি মেঘের বড়ো ভাই। ওর কিছু হলে আমি প্রতিবাদ করবো। ওর ভালো থাকাটাই আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট বাবা।
অমায়িক হাসলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। এটাই তো ওনার ছেলে। বুঝদার এবং বুদ্ধিমান। বললেন,
---- আমি এটাই চেয়েছিলাম বাবা। তুই ভালো থাক। দেখবি উপরওয়ালা মেঘের চেয়ে ভালো একজন তোর সাথে জুড়ে দিবেন। জীবনসঙ্গিনী আমরা নয় ভাগ্যে থাকতে হয় আমরা যাদেরকেই চাই না কেন।
আচ্ছা শোন আমি অফিস যাবো কিছুক্ষণ পর। দোয়েল খাবার নিয়ে আসলে কোনো বাহানা দেখাবি না খেয়ে তারপর মেডিসিন নিবি। মেয়েটা আমার কাছে তোর নামে অভিযোগ করেছে।
মুচকি হাসলো দিব্য। তার বোনটা মায়ের মতো খেয়াল রাখছে তার। শুধু ধমক দিতে পারছে না বড় ভাই বলে। নয়তো বাকি আর কিছুই রাখেনি কথা শুনানোর। দিব্য বললো,
---- আচ্ছা বাবা আমি খেয়ে নিবো।
মুচকি হেসে চলে গেলেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। দিব্য
ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভাবলো,
মেঘপাখিটা আজীবন মনবন্দি হয়ে থাকবে এই মনের ঘরে কল্পনার শহরে। বাস্তবতা তো তাকে চোখের দেখা ও পাপ লাগবে। সে অন্যজনের অমূল্য সম্পদ।
চলবে,,,