#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ২৩
#তাসনিম_লিজা
---- কপি নিষিদ্ধ!
---- আসছি বাবা নিজের খেয়াল রেখো। আমিনা আপু ভালো থেকো তোমরা।
আমিনা কান্না করার অবস্থা। গতবার ও যখন ঢাকা যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছিলো তখনও মেয়েটা কান্না করেছে। আজ ও একই অবস্থা। মেঘ গালে হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরলো। জাহিদ আহমেদ মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
---- সাবধানে যাবে। আর হ্যা একা একা আসার চেষ্টা করবে না আম্মাজান। শ্রাবণকে বলেবে আমি
গ্রামে আসবো। বুঝেছো?
মেঘ শ্রাবণের দিকে তাকায়। অতঃপর বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
---- মনে থাকবে বাবা।
---- আসি বাবা। আপনি কিন্তু যাবেন আমাদের দেখতে।
---- ইনশাল্লাহ বাবা। সাবধানে যেয়ে আমাকে জানাবে কিন্তু।
---- অবশ্যই।
মেঘকে গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে ও বসে পড়লো ড্রাইভিং সিটে। বেরিয়ে গেলো গাড়িটা স্বপ্ন নীড় বাড়িটার এড়িয়ে ছেড়ে। জাহিদ আহমেদ তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ আমিনা ও ।
---- আমিনা ভেতরে যা। আর চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর বাবা আছে তো তোর সাথে।
আমিনা বুঝতে পারে মেঘ সব জানিয়ে দিয়েছে তার বাবাকে। আমিনা মাথা নাড়ালো হ্যা বোধক।
ভেতরে চলে গেলো সে।
_____________________
---- ওরা আসতেছে কেন? কয়েকটাদিন মেয়েটা থেকে আসুক বাবার বাড়িতে। ওর খারাপ লাগবে তো।
সুমনা রাহমান এর কথায় সারিফ শিকদার বলেন,
---- গ্রামের চেয়ারম্যান ও তার ছেলের সাথে ঝামেলা হয়েছে যার কারনে তোমার ছেলে থাকতে চাইছে না। যদি আবার ও প্রতিশোধ নিতে নতুন করে ঝামেলা করে। মেঘকে নিয়ে চিন্তিত ও।
সুমনা রাহমান স্বামীর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলেন,
---- ছেলেটা আমার সব দিকেই খেয়াল রাখে। ও এমন কি করে হলো বলো তো? একা থাকার পর ও পরিবারকে কিভাবে আগলে রাখতে হয় তা বেশ ভালো করে জানে। হাসবেন্ড হিসেবে মেয়েরা আমার ছেলের মতো ছেলেই চাই বুঝেছো?
লেকপারে এসে দুজন হাঁটছে। নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। শীতল হাওয়ায় মনটা ও শান্ত লাগছে।
সারিফ শিকদার একটা কাটের চেয়ারে বসলেন সুমনা রাহমান কে নিয়ে। এই বয়সে হাঁটতে একটু বেশিই কষ্ট হয়। তারপর বলেন,
---- তুমি একদম ঠিক বলেছো। শ্রাবণ হয়েছে তার দাদুর মতো। বাবাকে ও দেখতাম মায়ের খেয়াল রাখতো। আমি কাজের চাপে তোমার সাথে রুড বিহেভিয়ার করতাম। আমার কথার অবাধ্যতা আমি মেনে নিতে পারতাম না৷ হঠাৎ এমন হওয়ায় নিজের উপর নিজেই ভীষণ অবাক হয়েছিলাম।
বাট, সময় ঘনিয়ে আসার পর বুঝলাম তুমি আমার কাছে কতটা ইম্পর্ট্যান্ট।
----- থাক পুরনো কথা। যা চলে যায় তা আর ফিরে আসে না।
---- কিছু আক্ষেপ তো রয়েই যায়।
---- চাইলে ও কিছু করার নেই। তবে সামনে যে সময়টা তা সুন্দর করে তোলা যায়। আমরা বরং জীবনটাকে সহজ করে সুন্দর করে কাটিয়ে দিবো। অতীত তো থাকেই থাকনা মনে পড়ে কষ্ট পেয়ে লাভ কি?
---- এই আইসক্রিম খাবা?
---- ঠান্ডা লাগবে তো।
---- আমার জন্য ভাবছো কেন? একদিন খেলে কিছুই হবে।
সুমনা রাহমান বারণ করলেন। বললেন,
---- কোনো প্রয়োজন নেই অসুস্থ হওয়ার। ভালো থাকাটা সহ্য হচ্ছে না বুঝি? আমি আইসক্রিম খাই না। এককালে ছিলো পছন্দ এখন আর নেই।
জোর করলেন সারিফ শিকদার। বলেন,
---- তোমার পছন্দ আমি এড়িয়ে যেতে পারি না সুমনা।
সুমনা রাহমান আগের ন্যায় বারণ করে বলেন,
---- জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে প্রাধান্য দিতে হলে ছোট ছোট প্রিয় জিনিস ত্যাগ করাই ভালো। আমি আমার সবচেয়ে আপনজন, প্রিয় মানুষটাকে আগে মূল্য দিতে চাই বাকি সব মিথ্যা।
---- আমি পারিনি সুমনা তোমার ভালোবাসার মান রাখতে। পারিনি সম্মান দিতে। কেবল দূরে ঠেলে দিলাম। তোমার স্বপ্নকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলাম। ভালোবাসার অমর্যাদা করলাম। সন্তান থেকে বঞ্চিত করলাম।
হাহাকারময় কন্ঠে বলতে লাগলেন সারিফ শিকদার। সুমনা রাহমান মৃদু ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
---- থামো তো। এটা পাবলিক প্লেস এখানে এভাবে বলছো যে লোকে শুনলে কি ভাববে বলো তো? আর আমি বলেছি তো পুরনো কথা ভুলে যাও।
ধমকে কাজ হলো। সারিফ শিকদার চুপ করে শুনলেন। সাথে বলেন,
---- ঠিক আছে আর বলবো না।
একজন মহিলা ফুল বিক্রি করতে করতে এদিকেই আসছিলো। চোখ এড়ালো না সারিফ শিকদার এর। দ্রুত ওঠে দাঁড়ান তিনি৷ পা চালিয়ে এগিয়ে যান বেলি ফুলের মালা কেনার আশায়। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সুমনা রাহমান। প্রথম না বুঝলে ও পরে বুঝে মুচকি হাসেন তিনি। লোকটার বুড়ো বয়সে প্রেম জেগেছে মনে।
ততোক্ষণে চলে আসেন সারিফ শিকদার। বসেন সুমনা রাহমান এর পাশে। হাতটা ছুঁইয়ে নিজের দিকে আনেন। মালাটা হাতে বেঁধে দেন পরম যত্নে। সুন্দরী রমনীর হাতটাতে ফুলটা বেশ মানিয়েছে। আলগোছে লোক চক্ষুর আড়ালে হাতে চুমু খেলেন তিনি। বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকান সুমনা রাহমান। বলেই বসলেন,
---- বুড়ো বয়সে কি শুরু করলে তুমি?
সারিফ শিকদার হাতের দিকেই মনোনিবেশ করে বললেন,
---- বউকে ভালোবাসা অপরাধ নই প্রেয়শি।
---- বাসায় যাবো চলো।
---- চলো যায়।
মনে মনে খুশি হন সুমনা রাহমান। হয়তো দেরিতে তবে টাকার চেয়ে কিছু সুন্দর সময় আর ছোট্ট অনুভূতি গুলোই অনেক দামী হয়। যার কাছে হয়তো টাকা কিছুই না।
_____________________
---- বাস জার্নি করতে পারো না। আসার সাহস হলো কি করে মেঘফুল?
মেঘ জানালার বাহিরে তাকিয়ে আছে। ঠান্ডা শীতল বাতাস পারছে না মেঘকে এলোমেলো করে দিতে। শ্রাবণ তাকাচ্ছে না মেঘের দিকে। হয়তো ঘোর লেগে যেতে পারে আর এই মুহুর্তে সে কোনো সমস্যা চাই না। গাড়ি এক্সিডেন্ট হওয়ার চান্স থাকে। মেঘ জানালার বাহিরে দৃষ্টি রেখেই জবাব দিলো,
---- কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা চোখে পড়লে আমরা
যা সহ্য করতে পারি না তাও কিভাবে জানি সহ্য করে নিই। আমি জানি না আমি কিভাবে আসলাম। সত্যিই অবাক কান্ড আসলাম কিভাবে আমি?
মেঘের এই উদাসীনতা আর তার কন্ঠে এমন অবাকতা দেখে শ্রাবণের বুঝতে বাকি নেই মেঘের দুর্বলতা ঠিক কোথায়। মেঘ সত্যিই শ্রাবণে আঁটকে গিয়েছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে প্রশ্ন করলো শ্রাবণ মেঘকে,
---- এটা কি ভালোবাসার লক্ষণ না? একটা মানুষের পাশে অন্য একটা মানুষকে আমরা তখনই সহ্য করতে পারি না যখন মানুষটা হয় প্রিয় মানুষ।
মেঘ তাকালো নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে শ্রাবণের দিকে। বললো,
---- হয়তো বা। আমার সত্যিই আপনার পাশে কাউকে সহ্য হয় না। আপনার এড়িয়ে যাওয়াটা ও সহ্য হয় না। আপনি আমায় তাবিজ করেছেন মিস্টার শ্রাবণ শিকদার?
কপালে ভাঁজ পড়লো মেঘের। ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে চোখ দু'টো ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ সামনের দিকে একপলক তাকিয়ে মেঘের দিকে তাকালো। হাসলো শব্দ করে। বললো,
---- মানুষ যত্ন যেখানে পাবে সেখানেই বাসা বাঁধবে
তুমি ও ঠিক তাই করেছো মেঘফুল। শ্রাবণ শিকদার অলওয়েজ মিসেস শ্রাবণ শিকদারের পাশে এভাবেই থাকবে। থাকতে চাই আমৃত্যু। শুধু আপনি বিশ্বাসের সহিত হাতটি ধরে তার সাথে আপনার জীবনটা কাটিয়ে দিলেই হবে।
মেঘ মুগ্ধ হলো শ্রাবণের কথায়। বড্ড গুছিয়ে কথা বলতে পারে লোকটা। কারোর অপছন্দের তালিকায় নামটা থাকবেই না তার। মেঘ বললো,
---- যত্নের লোভ দেখিয়ে তো বউকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন আপনি৷ অবশ্য থাকতে বাধ্য সে। কারোর ইচ্ছেতে না নিজের ইচ্ছেতেই । আর হ্যা বিশ্বাস অবিশ্বাস আমি সত্যিই বুঝি না। আমি কারোর সাথে আপনাকে দেখলে সোজা আবার ও চলে আসবো। তারপর আপনি প্রমান দিয়ে আমাকে নিয়ে যাবেন। এটাই আপনার পানিশমেন্ট বুঝলেন?
শ্রাবণ হাসে। বড্ড শান্তি লাগছে তার। মেঘের হাতটা এনে নিজের বুকের পা পাশে রাখলো। সামনের দিকে দৃষ্টি রেখেই বললো,
---- আপনি আমার এই খানে আছেন মেঘফুল। আপনাকে ছেড়ে দিতে হলে আমার প্রাণ থাকবে?
এখানটাতেই তো সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা থাকে। দেখুন তো আপনার উপস্থিতিতে আমার হার্ট কতটা বিট করছে। প্রতিটা স্পন্দনে শুধু আপনি মিশে আছেন। এই বিট করা যদি বন্দ হয় তাহলে আমি বাঁচবো? আমি তো শ....
হাত সরিয়ে নিলো মেঘ৷ শ্রাবণের কথার মধ্যে বলে উঠলো,
---- বাজে কথা বন্ধ করুন। হারিয়ে কেন যাবেন। সব ঠিক থাকবে। আমি মানুষ হারাতে ভয় পাই। প্রিয় মানুষ থাকতে হয়। আপনার তো থাকতেই হবে। মরুন সমস্যা নেই তবে আমার মরনে পর।
---- বেঁচে থাকতে চাই তো। খুব করে তোমার সাথে বেঁচে থাকতে চাই।
মেঘ নিঃশব্দে শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরলো। মাথা ঠেকালো শ্রাবণের প্রশস্ত কাঁধে। শ্রাবণ নিঃশব্দে সায় জানালো। মেঘ ধীর গলায় বললো,
---- এই জীবনের হায়াত আছে যতোদিন আপনার পাশে থাকবো ততোদিন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
---- ইনশাআল্লাহ!
সেই যে নীরবতায় ডুব দিলো দুজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলো মেঘ। একহাতে মেঘকে আগলে রাখলো অন্য হাতে ড্রাইভ করতে লাগলো শ্রাবন। আর মাত্র আধ ঘন্টা বাকি। এই তো শেষ হলো তাদের সুন্দর লং জার্নি।
__________________
---- দোয়েল শুনে যা তো একটু।
দোয়েল ফোনটা অফ করে ভাইয়ের রুমে আসলো
বললো,
---- হ্যা ভাইয়া বলো। কিছু লাগবে তোমার?
দিব্য উঠে বসলো। ইশারা করলো পাশে বসার জন্য
দোয়েল কথা না বাড়িয়ে বসলো৷ তাকালো প্রশ্ন বিদ্ধ চাহনিতে। দিব্য মৃদু হাসলো। বললো,
---- বোনটা আমার কবে এতো বড়ো হলো বলতো?
দোয়েল বুঝলো না বললো,
---- কি হয়েছে তোমার হঠাৎ ভাইয়া?
দিব্য দোয়েলের গাল টেনে হাসি মুখে বললো,
---- আজ তোকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। যেহেতু মা নেই নিজের দায়িত্ব নিজেকেই সামলাতে হবে ৷ রেডি থাকবি বুঝলি দোয়েলপাখি।
মুহুর্তের মধ্যে ঘোর অন্ধকার নামলো দোয়েলের মুখশ্রী জুড়ে। দাঁড়িয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। অবাক হয়ে বলে উঠলো সে,
---- কি বলছো এসব? আমি বিয়ে টিয়ে করবো না।
তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি। এসব বাজে মজা করবা না ভাইয়া।
কাঁদো কাঁদো গলায় বললো দোয়েল শেষের কথাগুলো।
দিব্য জোর করে হাতটা টেনে বসালো নিজের পাশে। মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়েলের মাথাটা নিজের কাঁধে ঠেকিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
---- কিছু করার নেই পাখি। মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে বাবা মা ভাইকে ছাড়তেই হবে। দেখতে আসলে তো আর বিয়ে হয়ে যায় না। আমি চাই আমরা পাখিটা একটা ভালো মানুষের সাথে বাকি জীবনটা কাটাক।
দোয়েল কান্না করছে। সাথে বারণ ও করছে।
---- আমি তোমাকে আর বাবাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। এসব কথা বন্ধ করো৷ আমার জাস্ট অসহ্য লাগছে।
---- মা আসবে তো বাড়িতে।
---- মা আমাদের ভালোবাসে না ভাইয়া।
---- ওভাবে বলিস না। তার অন্যায়ের শাস্তি সে পাচ্ছে আর পাবে ও। সন্ধ্যা তো হয়েই এলো৷ বাবা ও এসে পড়বে। যা রুমে গিয়ে রেস্ট কর।
দোয়েল চলে গেলো। দিব্য দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। পাখিটা অনেক আদররে সেই মানুষটা যত্নে রাখবে তো? বিশ্বাস করা কি ঠিক হবে তার উপর? যদি কষ্ট পাই তাহলে তো ভাই হয়ে মুখ তুলে তাকানো যাবে না বোনের দিকে ।
__________________
---- এখনো আসছে না কেন? একটা কল করো তো শ্রাবণকে।
কলিংবেল বেজে উঠলো তৎক্ষনাৎ। সুমনা রাহমান ছুটলেন সদর দরজার দিকে। হাসি মুখে তাকালেন তিনি। শ্রাবণ ঘুমন্ত মেঘকে কোলে করে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
---- এসে গিয়েছিস আয় আয় ভেতরে আয়। মেঘের কি হয়েছে?
শ্রাবণ ভেতরে যেতে যেতে শুধালো,
---- ঘুমিয়ে পড়েছে মা। ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে হয়নি তাই এভাবেই নিয়ে আসলাম।
---- ভেতরে নিয়ে যা।
শ্রাবণ তাদের রুমে আসলো মেঘকে নিয়ে। শুইয়ে দিলো বেডে। মেয়েটা তার বিপরীতে দেখছে সে। ঘুম ভাঙোইনি মেয়েটার এতোদূর আসার পর৷ খানিকক্ষণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর ছন্দপতন ঘটলো মায়ের কথায়।
---- শ্রাবণ আসবো?
---- এসো মা।
তিনি দূর থেকেই বললেন,
---- কেন মেয়েটা এমন সিদ্ধান্ত নিলো শ্রাবণ?
শ্রাবণ ফের তাকালো মেঘের দিকে। সেইদিকেই দৃষ্টি রেখে বললো,
---- তেমন কিছু না মা। সামান্য ভুল বুঝাবুঝি হয়েছিলো। আপাতত সব ঠিক। তুমি কোনো চিন্তা করো না।
চিন্তিত মুখশ্রী জুড়ে হাসির দেখা মিললো। সব ঠিক মানে টেনশনের কোনো কারন নেই।
---- আচ্ছা তুই ফ্রেশ হয়ে আয় আমি খাবার রেডি করছি। আর মেঘের ঘুম ভাঙলে ও খেয়ে নিবে।
---- হুম।
শ্রাবণ ওয়াশরুমে চলে গেলো। সুমনা রাহমান ও বেরিয়ে গেলেন।
আধঘন্টা পর শ্রাবণ সাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে।
জামাকাপড় পড়ে নিজেকে গুছিয়ে বাইরে বের হয়। সারিফ শিকদার বসে আছেন সোফায়। চা খাচ্ছেন তিনি আয়েশ করে। শ্রাবণকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
---- সব ঠিকঠাক তো বাপ?
---- ইয়েস। তো যা বলেছিলাম সব কমপ্লিট?
সারিফ শিকদার হাসলেন। বলেন,
---- আমার বাপজান বলেছে আর আমি শুনবো না এটা হয় কি করে? সব ঠিকঠাক। তোর মা তো অনেক খুশি হয়েছে রে। মেয়ে মানুষ টাকাতে নয় যত্নে খুশি হয়।
---- মা কোথায় গেলো?
---- রুমে গিয়েছে চলে আসবে।
---- কি নিয়ে কথা হচ্ছে বাবা ছেলের?
---- তেমন কিছুই না মা। বসো তো।
তাড়া দেখালেন সুমনা রাহমান। বলেন,
---- খেতে আয় আগে।
---- মেঘ ঘুম থেকে উঠুক তারপর খাবো।
সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান মুচকি হাসলেন।
এতে অবশ্য শ্রাবণের কিছুই যায় আসে না। কিন্তু,
দূর থেকে মেঘ কথাটা শুনে অবাক হয়। সদ্য ঘুম ভেঙে বাইরে এসে দাঁড়ালো মেঘ। সে তো গাড়িতে ছিলো বাড়িতে আসলো কবে? টেরই পেলো না? তার ভাবনার মধ্যে সুমনা রাহমান এর চোখ গেলেন মেঘের দিকে। শ্রাবণকে ইশারা করে দেখালেন। শ্রাবণ এক সেকেন্ড ও দেরি করেনি সবার মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়ালো। মেঘের দিকে হাঁটা দিলো।
---- ঘুম থেকে উঠে পড়েছো? যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।
মেঘ রুমের ভেতরে আসলো মৃদু রাগ দেখিয়ে বললো,
---- মা বলেছে খাওয়ার জন্য, আপনি এখানে আমাকে টানলেন কেন?
শ্রাবণের নির্লিপ্ত কণ্ঠ,
---- দুজনে একসাথে খাবো বলে।
---- যদি আমার ঘুম না ভাঙতো তাহলে কি উপোস থাকতেন? দুপুরে ও তো খাননি আমাদের বাড়িতে।
শ্রাবণ মুচকি হেসে বললো,
---- তুমি ও তো আমি খাইনি বলে খাওনি। তাহলে এখন আমাকে শাসন করার মানে কি ম্যাডাম?
---- যা পাগলামি করছেন, আপনাকে তো সবাই বউ পাগল বলবে মিস্টার শ্রাবণ শিকদার!
শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। বললো,
---- বউকে ভালোবাসলে, আগলে রাখলে, সম্মান দিলে যদি বউ পাগল শুনতে হয়, তাহলে শ্রাবণ শিকদার বউ পাগল।
---- ট্যাগটা লাগাতেই চাইছেন নামের পাশে?
মেঘ প্রশ্ন করলো। শ্রাবণ সুন্দর করে বললো,
---- ইয়েস ম্যাম ! শ্রাবন ইজ ট্রুলি ক্রেজি অ্যাবাউট হিজ ওয়াইফ; মে দিস টাইটেল স্টে বিসাইড হিজ নেম ফরএভার।
মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে।
শ্রাবণের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলো না। অদ্ভুত দৃষ্টি তার আঁটকে রাখার বাহানা কেবল। চোখ নামিয়ে বললো
---- আপনি খেয়ে নিন। আমি এখন খাবো না রাতে খেয়ে নিবো।
---- ঝটপট পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে আসো। একসাথে খাবো দুজনে। নো এক্সকিউজেস।
শ্রাবণ বেরিয়ে যায় রুম থেকে। মেঘ কথা শুনলো নিজের কাজে মগ্ন হলো। রাতই হয়ে গিয়েছে প্রায়।
__________________
পাত্র পক্ষের সামনে বসে আছে দোয়েল। পাশে তার বাবা ও ভাই আছে। শুধু এক ভাই নয় দুইপাশে তার দুই ভাই আছে। ফাইয়াজ ও এসেছে তাদের বাড়িতে। হয়তো দিব্য ডেকেছে। দিব্য ও অসুস্থ অবস্থা ডয়িংরুমে উপস্থিত। নার্ভাস দোয়েল কে এসেছে তার কিছুই জানা নেই।
---- তোমার নাম কি মা?
চমকালো দোয়েল। কাঁপা কাঁপা গলায় শুধালো,
---- জ্বি দীপান্বিতা দোয়েল।
---- সুন্দর নাম।
---- আর কারোর কোনো প্রশ্ন করার আছে?
কেউ একজন প্রশ্ন করলো। কন্ঠ অচেনা দোয়েলের
তার মধ্যে মহিলাটা বললো,
---- আমাদের সবই জানা। এবার আমার বাড়িতে আমার মেয়ে করে নিতে পারলেই হয়। যদি কারোর কোনো অমত না থাকে।
দোয়েলের বুকটা ধক করে উঠলো। আজ মানে?
কি বলছেন তারা? তার অসুস্থ ভাইকে রেখে কিভাবে যাবে সে? কিন্তু, ভাইয়া যে বললো শুধু দেখতে আসবে। সবাই মিথ্যা বললো? বড়দের সামনে মুখের উপর কিছুই বলার সাহস করতে পারলো না দোয়েল। তার মধ্যে ফাইয়াজ বলে উঠলো,
---- আমরা কিন্তু আপনাদের ছেলের ইচ্ছে রেখেছি। আমার বোনকে আপনাদের ছেলের হাতে তুলে দিচ্ছি। ও আমার বোনকে কখনো কষ্ট দিতে পারবে না। যদি শুনেছি তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।
একজন মধ্য বয়স্ক লোক বললো,
---- নিশ্চিন্ত থাকো তোমরা। আমার ছেলে দোয়েল কে ভালোবাসে। তাই তো ছেলেটা এতো পাগলামি করছে। সামনে যে এক্সাম সেইদিকে অব্দি খেয়াল নেই। মাথায় ভুত চেপেছে যেভাবেই হোক বিয়েটা হতেই হবে। একটা মাত্র ছেলে আবদার না রেখে যায় কোথায়?
দিব্য বললো,
---- আকদ অবশ্যই হবে। তবে আমার বোন আমার বাড়িতেই থাকবে। আপনার ছেলের পড়াশোনা শেষ হোক। আর আমাদের বাড়ির অবস্থা ঠিক হোক তারপর না হয় আনুষ্ঠানিকতার সাথে বিয়েটা হবে৷
---- আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
ছেলের মায়ের কথায় সবাই খুশি হলো। কিন্তু, ছেলেটা ভার মুখে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলো। দোয়েল শান্তি পেলো কিছুটা। আপাতত সে বাড়িতে থাকতে পারবে ভেবে। কিন্তু, কে সে? তার প্রতি এতো দুর্বল। সত্যিই তাকে কেউ চাই? তাও বাবা মায়ের কাছ আবদার করে?
চলবে,,,,,,