#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ২৫
#তাসনিম_লিজা
-----কপি নিষিদ্ধ!
বালিশের নিচে সাইলেন্ট ফোনের তীব্র কাঁপুনিতে বিরক্ত হলো শ্রাবণ। চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তিকর শ্বাস ফেললো সে। তার উন্মুক্ত বক্ষপটে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে মেঘ। দিনদুনিয়ার কোনে খেয়াল নেই বললেই চলে। শ্রাবণের বিরক্তের রেশ তখনই কেটে যায় মেঘ নামক রমনীর মুখশ্রী দর্শনে। চুলের ভাঁজে আলতো হাত বুলিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা নিজের চোখের সামনে মেলে ধরে শ্রাবণ। অচেনা নাম্বার এতো সকালে কে ফোন দিতে পারে? মা বাবার আবার কোনো সমস্যা হলো না তো? তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করলো,
---- হ্যালো মিস্টার শ্রাবণ শিকদার।
শ্রাবণ গলার স্বর চিনতে পারলো না। বললো,
---- আসসালামু আলাইকুম! কে আপনি? কেন কল দিয়েছেন?
হাসির শব্দ এলো ফোনের ওপাশ থেকে। শ্রাবণ বুঝলো না তার সাথে কি মশকরা করার জন্য এই সাঝ সকালে ফোন দিয়েছে? কিঞ্চিত রাগ হলো তার। বললো,
---- গলার স্বর শুনে তো ভালোই বয়স মনে হচ্ছে। কারোর প্রশ্নের উত্তরের পরিবর্তে হাসি দিচ্ছেন কেন? আমি কি আপনার সাথে ফান করছি নাকি?
ওপাশের ব্যক্তিটির কোনো শব্দ পেলো না খানিকক্ষণ। শ্রাবণ কল কাটতেই নিবে তখনই গম্ভীর গলার স্বর ভেসে আসলো,
---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। এতো তাড়া কিসের তোমার? বাবা মায়ের কথা মনে আছে তো? মামার বাড়ি গিয়েছে তারা। বাই দা ওইয়ে শ্রাবণ তোমার মা বাবা আসলেই মামার বাড়ি গিয়েছে তো? এতো বছর পর এক হয়ে ও তুমি কি তাদের আদর স্নেহ, মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকা দুজন মানুষ আবার ভুলক্রমে মামার বাড়ির বদলে জমের বাড়ির দিকে রওনা দিইনি তো?
---- মুখটা সামলে কথা বলুন ভালো মানুষের বাচ্চা।
কিসের রাগ আমার উপর? কে আপনি? কিসের শত্রুতা আপনার আমার সাথে?
---- রিলাক্স রিলাক্স! এতে হাইপার হচ্ছো কেন? বাহ এতো প্রশ্ন? একসাথে সব জানা যায় বুঝি? ধৈর্য্য ধরো শ্রাবণ। তোমার বাবা মা জমের বাড়ির খুবই নিকটে চাইলে ফেরাতে পারি। কিন্তু, আমার লাভটা কি?
শ্রাবণের রাগ তিরতির করে বাড়তে লাগলো। হাত মুষ্টি বদ্ধ করে ফেললো। ইচ্ছে করছিলো কয়েকটা ঘুষি দিতে পারলে ভালো হতো। মনের রাগ মনেই দমিয়ে রেখে বললো,
---- ফালতু কথা রেখে, আপনার কথা সত্যি হলে, আমার বাবা মায়ের সাথে কথা বলতে দিন। নয়তো আপনার এই অহেতুক কথার কারনে অনেক পস্তাতে হবে আপনাকে ৷
লোকটা বিনাবাক্যে ফোন নিয়ে গেলো। কন্ঠস্বর শুনে থমকালো শ্রাবণ।
---- বাপ আমাদের বাঁচা। ওরা আমাদের আঁটকে রেখেছে। তোর মা'কে কষ্ট দিচ্ছে। ত..
শ্রাবণ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- বাবা! বাবা কে তোমাদের আঁটকে রেখেছে?
মা কোথায়? বাবা তোমরা চিন্তা করো না আমি তোমা...
---- বিশ্বাস হলো তো এখন?
শ্রাবণ এলোমেলো ভঙ্গিতে অস্থির চিত্তে বলে উঠলো,
---- আমার মা বাবাকে কেন আঁটকে রেখেছেন?
কি উদ্দেশ্য আপনার? আর কে আপনি?
---- একই প্রশ্ন কেন বারবার করো বলোতো? যায় হোক কেন আঁটকে রেখেছি সেটাই বলতে চাচ্ছি। তুমি শান্ত হও আগে। নয়নকে ছেড়ে দাও। নয়তো নয়নের মতোই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তোমার প্রিয় দুজন মানুষ। যাদেরকে তুমি জীবনের সবচেয়ে আপনজন মনে করো। ভালোবাসো। তাদের মুখখানা দেখতে পারবে তো?
শ্রাবণের কাছে এখন সবই স্পষ্ট হলো। কলে থাকার পরও কারোর কাছে নাম্বারটা সেন্ড করলো সাথে টেক্সট করলো। লোকেশন ট্রেক করার জন্য। শান্ত স্বরে বললো,
---- সেটা সম্ভব নয়। প্রমাণ এখন পুলিশের কাছে।
আমার চাওয়া বা না চাওয়াতে কিছুই আসে যায় না। বোকার মতো আমায় ব্যবহার করে লাভ নেই মিস্টার কায়সার মির্জা। বাবা হয়ে গুন্ডা ছেলের জন্য নিজের মনুষ্যত্ব ভুলে গিয়ে আমায় ব্ল্যাকমিল করছেন? ভালো মানুষের লিস্ট থেকে অবশেষে অবসর নিলেন।
তীব্র হুংকার ওপাশ থেকে,
---- আমার ভালো মানুষ হয়ে থাকা বা খারাপ সেটা নির্ভর করে কেবল আমার সিদ্ধান্তের উপর। তুমি আমার একমাত্র ছেলেকে কষ্ট দিবে, তার ক্যারিয়ার, জীবন সব ধ্বংস করে দিবে সেটা তো আমি বাবা হয়ে দেখতে পারি না। উপায়হীন, আমি আমার ছেলেকে আমার চাই। তা সম্মানের সাথে আমার বাড়িতে দেখতে চাই। তার দায়িত্ব তোমার। নয়তো তোমার বাড়ির সামনে তোমার বাবা মায়ের মৃত লাশ পাবে। তখন বুঝতে পারবে বাবা মায়ের থেকে সন্তানকে আলাদা করলে কতটা কষ্ট লাগে।
শ্রাবণ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো তার বাবা মাকে নিয়ে তিক্ত কথাগুলো। শান্ত স্বরে বললো,
---- ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি। আর হ্যা আমার বাবা মায়ের গায়ে যদি একটা ফুলের টোকা ও লাগে না.. তাহলে আপনার ছেলের অবস্থা খুবই ভয়ংকর হবে।
---- আমার ছেলেকে পেয়ে গেলে আমার কাউকে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই। নয়নকে আমার কাছে এনে দাও। আমি নয়নকে আর এই দেশেই রাখবো না।
শ্রাবণ কল কেটে দিলো। একপলক মেঘের দিকে তাকিয়ে বেড থেকে নেমে দ্রুত শাওয়ার নিয়ে রেডি হলো। তার মধ্যে বাবা মায়ের জন্য তেমন কোনো অস্থিরতা দেখা গেলো না। কাউকে ফোন দিয়ে বাইরে থেকে দরজা লক করে দিলো। নিচে এসে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলো অজানা এক গন্তব্যস্থলে।
______________________
---- ভাইয়া এই নাও মেডিসিন খেয়ে নাও। আমি রেখে গেলাম।
অবাক হলো দিব্য। মেয়েটা সবসময় ভোরে ঘুম থেকে ওঠে তার জন্য খাবার রেডি করে। খাওয়ার আগের, পরের মেডিসিন নিজে খাইয়ে দেয়। কারন দিব্যর এসব ভালো লাগে না। আর আজ মেডিসিন গুলো রেখেই মুখ ভার করে চলে যাচ্ছে তার দোয়েলপাখিটা?
---- আমাকে খাইয়ে দিবিনা?
দিব্যর কথায় দোয়েল মন খারাপ থাকায় মুখ ফস্কে বলে উঠলো,
---- আমি কেন খাইয়ে দিবো? আমাকে তো অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছো। আমি পারবো না। তুমি বিয়ে করো তোমার বউ মানে, আমার ভাবি তোমায় খাইয়ে দিবে। আমি আর এই দায়িত্ব পাল...
দোয়েল আর বলেত পারলো না। ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে, চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো দিব্যর দিকে। দিব্য নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দোয়েলের কথা শুনছে। দোয়েল অবাক হলো। রাগ করলো না কেন তার ভাই? সে তো মেঘকে ভালোবাসে। মন খারাপ ও তো হওয়ার কথা। তাকে অবাক করে দিলো আরো কয়েক ধাপ। দিব্য বললো,
----- তুই চাইলে তোর জন্য একটা মানুষ আনতেই পারি। কি বলিস?
অবাকতার স্বরে বলে উঠলো দোয়েল,
---- মানে তুমি বিয়ে করবে? সত্যি?
দিব্য মলিন হাসলো। বললো,
---- আমার কাছে আমার চেয়ে তোর মুখের হাসিটা
ইম্পর্ট্যান্ট পাখি। সবাই ভালো থাকলে আমার কোনো অসুবিধে নেই। আমি বিয়ে করবো। তার পুরো দায়িত্ব তোর আর তাসিরের। সাথে মেঘ ও শ্রাবণের। কি পারবি তো?
দোয়েল যেনো স্বপ্ন দেখছে। সত্যি তার ভাই চাই নাকি সবই মিথ্যা? আনন্দের সহিত সাথে সাথে বলে উঠলো দোয়েল,
---- আমি আজই মেয়ে দেখবো আমার ভাইয়ার জন্য। বেস্ট ভাবি আনবো আমি।
হাসলো দিব্য। দোয়েল মেডিসিন খাইয়ে দিলো। হাসি মুখে বেরিয়ে গেলো কথাটা তাট বাবাকে জানাতে হবে। অবিশ্বাস্য ঘটনা না বললে হয়? দিব্য ও হাসলো।
__________________
---- আমাদের জানাসনি বলে আমরা রাগ করবো এটা ভেবে থাকলে ভুল ভেবেছিস তাসির। বরং না জেনে ভালোই হয়েছে। নয়তো বিয়ে দেখে বিয়ে না করার জন্য কান্না করতাম। অন্তত চোখের পানি তো বেঁচে গেলো।
রাতুলের কথাতে তাসির বললো,
---- এটা বিয়ে নারে ভাই এটা হলো আমাকে কষ্ট দেওয়ার এক নতুন পদ্ধতি আমার বাবা মায়ের।
নয়তো বউকে রেখে আমাকে একা দিন রাত কাটাতে হবে কেন?
---- আহারে বেচারার ঘুম হয়নি।
আফসোসের সাথে বললো রামিম। রিফাত বললো,
---- আমরা ভাই সিঙ্গেল। আমাদের সামনে বিয়ের নাম তুলিস না। একদিন প্রেম করলে দ্বিতীয় দিনই ব্রেকআপ হয়ে যায়। বিয়ে করলে বোধহয় চারদিন যাবে কোনোমতে। বাদ দে এসব। শ্রাবণ কেন ডেকেছে এখানে? কাউকে তো দেখতেই পাচ্ছি না।
তাসির চারদিকে চোখ বুলালো। অতঃপর বললো,
---- ও না আসলে কিভাবে বলবো বল তো?
পুলিশের গাড়ি আসলো একটা। পাঁচ ছয়জন নামলো গাড়ি থেকে। তাদের দেখে তাসির এগিয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো,
---- কি হয়েছে এখানে অফিসার?
ওসি সাহেব বললো,
---- শ্রাবণ শিকদার কোথায়?
তাসির বললো,
---- এখনো আসেনি। আমাদের বলেছে আসতে।
তখনি একটা বাইক এসে থামলো তাদের সামনে।
শ্রাবণ দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসলো। চিন্তিত স্বরে বললো,
---- আপনি শিউর বাবা মা এখানে আছে?
ওসি সাহেব বললো,
---- এখান থেকেই কল গিয়েছে। চলো ফাস্ট তবে সাবধান!
---- আমার বাবা মায়ের যেনো কিছু না হয় অফিসার। আমি বারবার বলছি প্লিজ নি কেয়ারফুল!
---- আমরা চেষ্টা করবো শ্রাবণ। টেনশন করবেন না।
---- আমি যাবো আপনাদের সাথে। আমি ভরসা পাচ্ছি না। ওরা৷ যদি কিছু করে..
সাথে সাথে বললো ওসি সাহেব,
---- আমরা কোনো রিস্ক নিতে চাচ্ছি না শ্রাবণ। সরি তোমায় এখানেই ওয়েট করতে হবে।
এই চলো সবাই।
শ্রাবণ বাধ্য হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। বাড়িটা পুরনো। বাহির থেকে বোঝার উপায় নেই যে এখানে মানুষ আছে । একদম নিস্তব্ধ নিরিবিলি জায়গা। শান্তি৷ পাচ্ছে না শ্রাবণ।
হঠাৎ অনেকগুলো এলোমেলো গুলির শব্দ হলো। ভয়ে আৎকে উঠলো শ্রাবণ। তার বাবা মায়ের যেনো কিছু না হয়। দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে, যেতে নিলে শক্ত করে হাত চেপে ধরলো তাসির। বললো,
---- অফিসার বারণ করেছে তো।
শ্রাবণ হাত ছাড়িয়ে নিলো। বললো,
---- মা বাবার কিছু হলে ফিরিয়ে দিতে পারবি?
তাসির চুপ হয়ে গেলো। বাকি তিনজন আর কিছুই বলার সাহস করলো না। শ্রাবণ দৌড়ে গেলো ভেতরে। বাড়িটা দুতলা। পুলিশের বারণ তুচ্ছ করে ভেতরে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমান পড়ে আছে ফ্লোরে। পুলিশ এরেস্ট করেছে কায়সার মির্জাকে। কিছু গুন্ডা ছেলেপেলে পালিয়ে গিয়েছে। তারা আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলো। একজম কনস্টেবল চেইক করে বললো,
---- ওনারা কেউ বেঁচে নেই।
শ্রাবণ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো কায়সার মির্জার দিকে। তিনি খানিকটা মাথা নাড়িয়ে বললো,
---- আ'আমি কিছুই করিনি শ্রাবণ। আমি তো ভয় দেখিয়ে তোমার মাধ্যমে আমার ছেলেকে জেল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে একটা ছেলে গুলি মেরে পালিয়ে গেলো আমি বুঝতেই পারিনি।
শ্রাবণ নিস্তেজ হয়ে বসে পড়লো বাবা মায়ের লাশের সামনে। রক্তের ফুয়ারা ছুটেছে। কথা বলার মতো শক্তিটুকুও নেই বোধহয়। কত অভিমান, কত রাগ করেছে তাদের উপর। এই বয়সে এসেও ছোটদের মতো বাবা মায়ের সাথে থাকার কি নিদারুণ তৃষ্ণা তার। সব শেষ হয়ে গেলো। হঠাৎ কাঁধে কারোর হাত পড়লো। বসলো কেউ পাশে। হাতটি ধরে সাহস দিলো কেউ, আবার কেউ একজন কেঁদে উঠলো। শ্রাবণ কাঁদছে না। নিষ্ঠুর মানুষ দুজন আজ শহর ছেড়ে নয় দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো। তাকে একলা এতিম করে। এতোদিনের মিথ্যা এতিমের মতো ট্যাগটা আজ সত্য হলো।
---- আমরা ভাবতেও পারিনি শ্রাবণ এমনটা হতে পারে। আসার আগেই কেউ...
আর কথা বলতে পারলো না ওসি সাহেব। শ্রাবণ না কাঁদছে না কিছু বলছে। স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক চোখে বাবা মায়ের দিকে। একই জায়গায় দু-তিনটে করে গুলি করেছে। বাঁচার কোনো চান্সই দেয়নি তারা। তাসির নিজেকে সামলে শ্রাবণকে ওঠানোর চেষ্টা করলো পারলো না। এম্বুলেন্স ডাকা হয়েছে লাশ দুটোর পোস্টমর্টেম করতে হবে।
কয়েকজন লোক আসলো লাশ নেওয়ার জন্য। শ্রাবণ বাবা মায়ের হাত ধরে রাখলো। তাসির চেষ্টা করলো বললো,
---- শ্রাবণ পাগলামি করিস না। ছেড়ে দে আংকেল আন্টির হাত। জোর কাটানোর সময় শেষ ভাই।
আমরা এখন নিরুপায়।
---- ছেড়ে দে ভাই।
রাতুল, রামিম ও রিফাত কান্নার কারনে কথা বলতে পারছে না। ছোট থেকে দেখে আসছে মা বাবাকে কতটা ভালোবাসতো শ্রাবণ। বাবা মায়ের আলাদা হওয়াটা ও ছেলেটা মেনে নিতে পারেনি আর আজ কিভাবে মানবে? মন মানবে শেষ বিদায় দেওয়া?
অনেকক্ষণ শ্রাবণের ফোন বেজেই চলেছে। সেদিকে
কোনো খেয়াল নেই তার।
রাতুুল শ্রাবণের থেকে ফোনটা নিলো মেঘফুল নামটা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে। সাহস হচ্ছে না রিসিভ করার। রেখে দিলো সাইলেন্ট করে৷
---- শ্রাবন আটকিয়ও না। নিয়ে যেতে হবে লাশ দুটো।
শ্রাবণ আকস্মিক চিৎকার করে উঠলো,
---- আমাকে কেন আটকালেন অফিসার? আমি কিভাবে বাঁচবো তাদের ছাড়া। আমাকে তো তাদের খুনি বানিয়ে দিলেন। আপনার বাধ্য হতে গিয়ে আমি যে আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটায় হারিয়ে ফেললাম।
আমার বাবা মাকে ফিরিয়ে দিন অফিসার৷ কেন আমার মা বাবাকে বাঁচাতে পারলেন না? কেন ওরা এভাবে পড়ে আছে? আমি তাদের অযোগ্য সন্তান। ওরা আমাকে অসহায় কন্ঠে বলেছিলো বাঁচাতে কিন্তু, ওরা তো আমাকে মেরে পালিয়ে গেলো।
আমি ছাড়বো না অফিসার আমি তাকে ছাড়বো না।
জানো'য়ারের বাচ্চাককে আমি নিজের হাতে মার..
---- শান্ত হন শ্রাবণ। আমরা আসার আগেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো।
শেষের কথাগুলো চিৎকার করে বলে উঠলো শ্রাবণ। অঝোর ধারায় বৃষ্টির মতো চোখের পানি কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো৷ সাথে কান্না করছে সবাই। বাবা মায়ের লাশ দেখা যে কতটা ভয়ংকর আর সাথে শ্রাবণের পাগলের মতো বাবা মাকে জড়িয়ে ধরে করা আর্তনাদে রুমটা ভয়ংকর রকমের ভারী হয়ে উঠলো।
চারজন মিলে জোর করে সরিয়ে আনলো মা বাবার লাশের থেকে। শ্রাবণ পাগলের ন্যায় কান্না করছে। চিৎকার করছে। ছুটে যাচ্ছে তাদের কাছে। সারিফ শিকদার ও সুমনা রাহমানের লাশ নেওয়া হলে শ্রাবণকে নিয়ে পিছু গেলো সবাই।
______________
মেঘ অস্থির হয়ে আছে। একের পর এক কল করেই যাচ্ছে শ্রাবণ কল তুলছে না। বাবা মা ও নেই পুরো বাড়িতে একা সে। তারউপর শ্রাবণ কল রিসিভ করছে না ভয় লাগছে। এতো সকালে কোথায় যেতে পারে?৷ তার বন্ধুদের কারোর নাম্বার ও নেই। কি করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না মেঘ। বাবা মায়ের নাম্বারটা অব্দি নেই। পরোক্ষণে মেঘ তার বাবার কাছে ফোন দিলো৷ কিছুক্ষণ বাদেই রিসিভ হলো,
---- আসসালামু আলাইকুম বাবা। কেমন আছো?
ওপাশ থেকে জাহিদ আহমেদ মৃদুস্বরে বললেন,
---- ওয়ালাইকুম আসসালাম আম্মাজান। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো মেঘ,
---- বাবা আমার শশুরের নাম্বারটা দাও তো,
উদ্ধিগ্ন গলায় বলে উঠলেন জাহিদ আহমেদ,
---- এতো অস্থির হচ্ছিস কেন? কিছু হয়েছে?
---- না বাবা কিছু হয়নি। নাম্বারটা দাও আমাকে।
---- আমি সেন্ড করছি।
---- আচ্ছা বাবা রাখি পরে কথা বলবো তোমার সাথে।
---- আমাকে জানাবি।
---- জ্বি বাবা।
তৎক্ষনাৎ কল করলো মেঘ ফোন বাজতেছে। কেউ রিসিভ করছে না। দ্বিতীয়বারের মধ্যে রিসিভ হলো,
---- আসসালামু আলাইকুম! বাবা কখন বাড়িতে আসবেন আপনারা?
---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি তাসির মেঘ।
আমরা বাসায় আসছি তারপর কথা হবে।
অবাক হলো মেঘ। বলে উঠলো ঝটপট,
---- কি হয়েছে বাবার ফোন আপনার কাছে আর আপনার বন্ধু কোথায়? কল দিচ্ছি রিসিভ করছে না কেন?
---- এখন বলা সম্ভব না। বাসায় এসে বলছি। আর শ্রাবণ আমার সাথেই আছে।
কল কেটে দিলো তাসির। মেঘের কাছে সবকিছু এলোমেলো লাগছে। অপেক্ষা করা ও কষ্টকর হচ্ছে। তবুও অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে দরজার দিকে।
আধঘন্টা পর কলিংবেলের শব্দে দ্রুত পায়ে দরজা খুলে দিলো মেঘ৷ হাসি মুখে তাকাতেই হাসিটা মিলিয়ে গেলো মেঘের। শ্রাবণের সার্ট জুরে রক্ত, চোখগুলো ফুলে রক্তিম হয়ে আছে। মেঘ দেখলো শুধু শ্রাবণ না বাকি চারজনেরই একই অবস্থা।
---- কি হয়েছে? আপনার এ অবস্থা কেন? আবার মারামারি করেছেন আপনি? আর আপনারা ও??
তাসির শ্রাবণকে নিয়ে ভেতরে আসলো। সাথে রিফাত রাতুল ও রামিম বসলো সোফায়। তাসির মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাসির বললো,
---- মেঘ আংকেল আন্টি আর নেই। তুমি প্লিজ ওকে সামলাও। ও পাগলামি করছে।
মেঘ স্তব্ধ হয়ে গেলো। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। ফ্যালফ্যাল করে শ্রাবণের দিকে তাকায়,
শ্রাবণ চুপচাপ হয়ে গেছে। দুজন মানুষ কি করে একসাথে নাই হতে পারে?
---- মেঘ নিজেকে শক্ত করো৷ তুমি শক্ত না হলে শ্রাবণকে সামলাবে কে?
---- বাবা৷ মা তো ওনার মামার বাড়ি গিয়েছিলো। মরে যাবে কেন? মজা করছেন আপনারা?
চলবে,,,,,,