#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —২৬
#তাসনিম_লিজা
---- কপি নিষিদ্ধ!
পুরো ঘটনা জানার পর মেঘের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। তার মানে মামার বাড়িতে যাওয়ার সময় ওনাদের কিডন্যাপ করা হয়েছিলো আর তারা কেউ জানতেই পারেনি। কিন্তু, শ্রাবণের মামারা তো ফোন করে জানাতে পারতো তার ওই বাড়িতে যায়নি। এতোটা নিষ্ঠুর তারা? এই বাড়িতে আসার পর মনেই হয়নি এটা তার শশুরবাড়ি আর দুজন প্রিয় মানুষ ছিলেন তার শশুর শাশুড়ী। মা বাবার মনে করেছে মেঘ। নিজের মেয়ের মতো এ কয়টাদিন আগলে রেখেছিলো। আজ আর কেউ বলবে না খেতে আয় তোরা, কেউ আর একসাথে হাসিখুশি আর খুনসুটি করে রান্না করবে না। কেউ বলবে না মেঘ আমার মেয়ে না ওটা খেতে পারে না আমরা ও খাবো না। মেয়েটা কষ্ট পাবে।
মেঘের পা ভেঙে আসলো। অবশ হয়ে আসলো পুরো শরীর। একসাথে দু'টো মানুষের চলে যাওয়া যেনো মস্তিষ্ক সহ্য করতে পারেনি। ডলে পড়তে নিলে শ্রাবণ দ্রুত এগিয়ে গেলো মেঘের কাছে। আজ দুজন পুরোপুরি এতিম হয়ে গেলো। বাবা মা নামক ছায়াটা মাথার উপর থেকে সরে গেলো।
---- তাসির পানি দে। ফাস্ট হারানোর জন্য বাকি আর কিছুই নেই মেঘ ছাড়া আমি আর নিতে পারছি না তাসির। মরন আমার কেন হলো না।
তাদেরকে কেন আমার ভুলের শাস্তি দিচ্ছে তারা?
আমাকে মারতে পারলো না কেন? মেঘ চোখ খোলো, এই মেয়ে কি হলো তোমার?
মেঘ সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। শ্রাবণ কোনোরকমে সোফায় এনে শুইয়ে দিলো। তাসির পানি আনলো।
সবাই চিন্তিত হলো। শ্রাবণ নিজের অবস্থা ভুলে গিয়ে মেঘের চোখে মুখে পানি দিতে লাগলো। চোখ খুলছে না কেন মেয়েটা? মেঘেট গাল চাপড়াতে লাগলো শ্রাবণ,
---- এই মেয়ে চোখ খোলো। মেঘ!
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে চোখ মেলে তাকালো মেঘ। ধীরে ধীরে ঝাপসা থেকে স্পষ্ট হলো সবকিছু
শ্রাবণের দিকে তাকিয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মেঘ। শ্রাবণ জড়িয়ে নিলো মেঘকে নিজের চোখই পানিতে টইটম্বুর। মেঘের কান্নায় সবাই চুপ করে রইলো,
শ্রাবণ আটকালো না৷ কাঁদুক কাঁদলে যদি কষ্টটা কমে।
তাসির বললো,
---- শ্রাবণ কি শুরু করেছিস বলতো? মেঘ কাঁদছে তুই কাঁদছিস আচ্ছা কাঁদলে কি ফিরে আসবে আংকেল আন্টি? প্লিজ নিজেদের শক্ত রাখ। এখন কাঁদার সময় নয়। আসল খুনিকে ধরতে হবে।
শ্রাবণের যেনো কোনদিকেই খেয়াল নেই। সবকিছু অন্ধকার ও নিস্তব্ধ লাগছে।
হঠাৎ কারোর পায়ের শব্দ হলো। তাকালো সাবই দরজার দিকে। তাসফিয়া রাহমান আসে। চোখে মুখে বিষন্নতা। কান্না করেছে মেয়েটা। ধীর পায়ে শ্রাবণের পাশে বসলো। কাঁধে হাত রেখে বললো,
---- ভেঙে পড়িস না ভাই। মানুষ মরণশীল একদিন মরতেই হবে। তবে যে এমন একটা ঘৃণ্য কাজ করেছে তাকে আমরা খুঁজে বের করবোই। আমার ফুপিকে মেরে ফেলেছে ওরা এমনি এমনি তো ছেড়ে দিবো না।
অতঃপর মেঘের হাতে হাত রেখে বললো,
---- এই যে তোমার তো শ্রাবণকে সামলানোর প্রয়োজন সেখানে তুমিই ভেঙে পড়েছো? তাহলে শ্রাবণকে কে দেখবে বলো তো? কেঁদো না তোমরা
ফুপি আর আংকেলকে যারা মেরেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আমার।
মেঘ কেঁদেই যাচ্ছে হিচকি তুলে। কথা বলার মতো অবস্থা নেই মেয়েটার। শ্রাবণ আগলে রেখে চুপ করে আছে। আশেপাশে কত মানুষ তবুও কেউ নেই এটাই বোধহয় মা বাবা। সবাই থাকার পর শূন্য
লাগা। তাসফিয়ার সময় কম তাই আরো কিছু কথা বলে চলে যায়।
সময় গড়ালো তাসিররা একা ছেড়ে যাওয়ার সাহস করলো না। তারমধ্যে খবর পৌঁছালো গ্রামে ও জাহিদ আহমেদ রওনা দিয়েছে ইতিমধ্যে। ওনাকে মারা যাওয়ার খবর জানানো হয়নি। জাহাঙ্গীর আহমেদ, দিব্য ও দোয়েল এসেছে। তাসিরের মা বাবা ও আসছেন। রামিম রাতুল ও
রিফাতের মা বাবারা একেকজন একেক কাজে আঁটকে আছে তবে খোঁজ নিচ্ছেন তারা। শোক প্রকাশ করা, শান্তনা দেওয়া ছাড়া তো কোনো উপায় নেই ওনাদের।
দিব্য দেখছে শ্রাবণ প্রশস্ত বুকে বিড়ালের মতো লেপ্টে থাকা মেঘকে। যে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত।
চোখমুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। তাকালো না সে চোখ ফিরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। জাহাঙ্গীর আহমেদ
শ্রাবণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বলেন,
---- কি থেকে কি হয়ে গেলো বিশ্বাসই হচ্ছে না আমাদের। কি করবে বলো বাবা যা হওয়ার তা তো আর ঠিক করা যাবে না। মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় তো নেই আমাদের। আর নিজেকে একা মনে করবা না আমরা আছি তো তোমাদের পাশে। মেঘ কাঁদিস না মা। তুই মা বাবা পেয়েছিস ঠিকই কিন্তু, ভাগ্যে রইলো না তারা।
দোয়েল মেঘের কাছে বসলো। মেঘকে নিজের দিকে এনে বললো,
---- কাঁদিস না মেঘ। হয়তো ওনাদের আয়ুই ছিলো এতো দিন। আমরা আছি তো তুই একা না।
দিব্য কিছুই বলতে পারলো না। তার চোখ কেবল একটি মুখশ্রীতেই আঁটকে যাচ্ছে। না পেরে বেরিয়ে গেলো শ্রাবণের বাসা থেকে। অসুস্থ অবস্থাতেও জোর করে এসেছিলো সে। এখন তো তার মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে এখানে আসা।
আধঘন্টার মধ্যে জাহিদ আহমেদ আসলো হন্তদন্ত হয়ে। টেনশনের কারনে তিনি কথা বলতে পারছেন না। হাঁপাচ্ছেন তিনি। এসেই বলে উঠলেন,
---- কি হয়েছে এখানে? এতো মানুষ কেন? মেঘ কোথায়? কার কি হয়েছে? শ্রাবণ?
ডয়িংরুমের সোফায় চোখ পড়তেই আৎকে উঠেন জাহিদ আহমেদ। তৎক্ষনাৎ কাছে গেলেন। মেঘকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি,
---- মেঘ কি হয়েছে কাঁদছিস কেন? আর শ্রাবণের কি হয়েছে?
জাহাঙ্গীর আহমেদ এগিয়ে এসে নরম স্বরে বললেন,
---- জাহিদ শ্রাবণের বাবা মা আর বেঁচে নেই।
তড়িৎ তাকালো জাহিদ আহমেদ জাহাঙ্গীর আহমেদ এর দিকে, হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- কি বলছো তুমি ভাইজান? কালকে ও তো কথা হয়েছে আমার, শ্রাবণের বাবার সাথে। সব তো ঠিকঠাকই ছিলো। হঠাৎ?
নীরব কান্না এবং বিষন্ন মুখাবয়ব ব্যথিত কোনো শব্দ হলো না। বাড়িটা যেনো নিস্তব্ধতায় নিমিয়ে গেলো। একে একে অনেকে আসলো সান্তনা দিলো খানিকক্ষণ থেকে আবার চলে ও গেলো। সবার মধ্যে কনক ও তার বাবা আফসার খন্দকার ও আসেন। বন্ধু হন ওনার। চোখের কার্নিশে চিকচিক করছে পানি। কনক নিজেকে বোরকায় আবৃত করে কান্নারত চেহেরায় শ্রাবণের পাশে দাঁড়ালো।
পাশে মেঘকে দেখে তাকিয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। চোখে মুখে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। বোঝার উপায় নেই মেয়েটা রেগে আছে নাকি কাঁদছে আর না আনন্দে আছে। সময় নিয়ে ধীর গলায় বললো কনক,
---- শ্রাবণ ভাইয়া কষ্ট পেয়ো না। মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। আংকেল আন্টির মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না। যারা তোমার বাবা মায়ের সাথে এমন একটা জঘন্যতম কাজ করেছে তাদের তুমি একদম ছাড়বে না শ্রাবণ ভাইয়া। যাদের কারনে তুমি এতিম হয়েছো।
মেঘ এক পলক তাকালো কনকের দিকে। কনক শ্রাবণের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বুঝতে বাকি নেই কনকের এই প্রখর দৃষ্টির ব্যাখ্যা। তবে সে আজ এই ভাবনায় নেই। তার তো তার চেয়ে প্রিয় দুজন মানুষ হারিয়ে গেলো জীবন থেকে। যারা থাকলে আজীবন শ্রাবণ মেঘ একসাথে থাকবে। এখনও থাকবে তবে আর একটু বেশি সুন্দর হতো। যা মনে মনে কল্পনায় বুনন করেছিলো মেঘ।
খেতে জোর করেছিলো অনেকে মা বাবার লাশ যেখানে কবর দেওয়া হয়নি তাদের কে কাটাছেঁড়া করতেছে। তাদেরকে বীনা কারনে জীবন দিতে হয়েছে কত কষ্ট পেয়েছে তার মা বাবা শ্রাবণের ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কান্না করতে। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে তাদের কি অপরাধ ছিলো কেন তারা আল্লাহর ডাকে যেতে পারলেন না? তখন তো এতোটা আফসোস থাকতো না। মানুষ মরনশীল মরবেই তবে এইভাবে মরন মেনে নেওয়া কঠিন। দোয়েল মেঘকে রুমে নিয়ে গেলো।
কনক থাকার চেষ্টা করেছিলো পারলো না। শ্রাবণের সাথে কথা বলার তীব্র চেষ্টায় ব্যর্থ হলো।
আফসার খন্দকার মেয়ের এমন আচরনে এমন পরিস্থিতিতে না থাকাটায় ভালো মনে করেছেন তাই জোর করে নিয়ে যান মেয়েকে।
_______________
বিকেলের দিকে লাশ আনা হলো বাড়িতে। দেখার মতো অবস্থা নেই। শ্রাবণ মেঘ সাহস করলো না দেখতে তবু একপলক দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো। চোখের সামনে লাশ নয় পুরনো কিছু সুন্দর স্মৃতি ভাসছে। যা শান্তি দিয়েছিলো তাদের। তাই বলে এইটুকুই ছিলো তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সুখ? একে একে অনেকে দেখলো দুজনের ফ্যাকাশে মুখখানা। অতিদ্রুত লাশ দাফন করার জন্য জাহিদ আহমেদ ও জাহাঙ্গীর আহমেদ মিলে তদারকি শুরু করেন। শ্রাবণের বাবার বাড়ির তেমন কেউ নেই। আর রইলো মামার বাড়ি! সে তো
জায়গা জমি নিয়ে তারাই তাদের সাথে কথা বলতো না। উচিত কথা বলায় সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন তারা। সেই থেকে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ। গতকাল যাওয়ার কথা ছিলো কেবল কিছু ইম্পর্ট্যান্ট দলিলে সাইন করার জন্য। কে জানতো তাদের যাওয়াটা শেষ যাওয়া হবে?
একসাথে বাবা মায়ের লাশ বোধহয় সন্তানের জন্য
কতটুকু যন্ত্রণা বহন করে তা কেবল সেই সন্তানই বুঝে। চার বন্ধুসহ শশুর ও চাচা শশুর মিলে শ্রাবণের দাদুর কবরের পাশে কবর খনন করেন। সেখানে চির সায়িত হলেন শ্রাবণের বাবা মা। সবার যাওয়ার পরে চিৎকার করে কান্না করে শ্রাবণ। বন্ধুরা ও কাঁদছে তারা থামাবে কি করে , জাহিদ আহমেদ জোর করে নিয়ে এলেন। ওনারা শুধু ছোটদের কারনে নিজেদের শক্ত করে রেখেছেন। মনটাকে পাথর বানিয়ে সবটা সামলানোর চেষ্টা করছেন। শ্রাবণের পাগলামিতে জাহিদ আহমেদ নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন শ্রাবণকে। শ্রাবণ কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,
---- বাবা ওরা আমায় এতিম করে দিলো বাবা। আমি তাদের মা বাবা ডাকতে পারবো না। কত না চেষ্টা করেছিলাম একসাথে করার। আপনারা এক করে দিলেন ঠিকই কিন্তু, তারা আবার ও ফাঁকি দিলো। আমি কি খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি যার শাস্তি স্বরুপ আমার এই করুন পরিনতি হলো। আমার সাথেই কেন এমন হলো বাবা? কেন ওরা আমার কাছে না থেকে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে। বলুন না বাবা ওনাদের ওঠতে। আমার কষ্ট হচ্ছে বাবা। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার ভুলের কারনে তারা আমার থেকে হারিয়ে গেলো আমি কি অভিযোগ করবো বাবা? আমার অভিযোগ করার মতো মুখ রইলো না। আমি বলতে পারবো না তোমরা আমায় দূরে ঠেলে দিয়েছো। ওরা আমায় বলবে তুই আমাদের মেরে ফেলেছিস। তোর কারনে আমাদের মরতে হয়েছে। তোকে বলেছিলাম আমাদের বাঁচাতে আ....
---- শ্রাবণ শান্ত হও। কাঁদলে তোমার বাবা মা কষ্ট পাবে। এভাবে বলো না। হয়তো ওনাদের আয়ুকালই ছিলো এতোটুকু সময়। আমরা আছি তো। আমি তোমার বাবা না? বাবা আছি সবসময়। একবাবা নেই তো কি হয়েছে আমি আছি না। কখনো নিজেকে একা মনে করো না। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে বাড়িতে চলো। এখানে থাকা ঠিক না।
---- জাহিদ ঠিকই বলেছে শ্রাবণ। তুমি একা নও আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। হয়তো বাবা মায়ের মতো না তবে পাশে থাকবো সবসময়। কষ্ট পেয়ো না বাবা।
---- আমার মা বাবা একা থাকবে কি করে বাবা? আমার থাকা দরকার। আমি একা রেখে যেতে পারবো না তাদের। আমাকে থাকতে দিন বাবা।
শ্রাবণকে জোর করে নিয়ে গেলো বাড়িতে। তাসির,
রামিম, রাতুল ও রিফাত তারা বাড়িতে এসে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে তাদের বাসার দিকে রওনা দিলো। জাহাঙ্গীর আহমেদ ও দোয়েল ও চলে যায়। থেকে যান শুধু জাহিদ আহমেদ। ছেলে মেয়েকে একা রেখে যাওয়া সম্ভব না। এসময় তো না-ই।
শ্রাবণ, মেঘ ও জাহিদ আহমেদ শাওয়ার নিয়ে নিলেন। সারাদিন না খাওয়া, পাশের বাসা থেকে খাবার দিয়ে গেলেন। জোর করে ও খাওয়ানো গেলো না তাদেরকে। পরিস্থিতি এমন যে গলা দিয়ে এক ফোঁটা পানি ও যেতে পারছে না। জাহিদ আহমেদ জোর করলেন না। জামিলা বেগম আজ আসেননি কেন জানি।
মেঘ শ্রাবণের কাঁধে মাথা রেখে আফসোসের স্বরে বলে,
---- এমনটা কেন হলো বলুন তো? কত সুন্দর ছিলো আমাদের জীবনটা, সংসারটা । এতো ভালো দুজন মানুষ কেন হারিয়ে গেলো? তাদের কেন এমন করলো? কি ক্ষতি করেছিলো তারা?
শ্রাবণের মুখ শুঁকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। কথা বলতে গেলে কেবল কান্না আসছে। শক্ত করে আগলে নিলো মেঘকে। নিস্তেজ গলায় বললো,
---- আমাদের কেউ রইলো না মেঘ। আমরা কেবল তুমি আর আমি। আমাদের একা করে নীরবে পাড়ি জমিয়েছেন তারা। তুমি কখনো চলে যেওনা মেঘ তাহলে আমি মরে যাবো। বাবা মা বিহিন শ্রাবণকে
একটু আগলে রেখো। তুমি ছাড়া তার যে কেউ নেই।
শব্দ করে কান্না করে দিলো মেঘ। শ্রাবণের চোখে ও পানি। সময়টা এতোটায় ভয়ংকর ছিলো বোঝানোর মতো নয়। একসময় ক্লান্ত শরীরটা হেরে যায় ঘুম নামক শব্দটার কাছে।
__________________
সময় গড়ালো নিঃশব্দে। তিনটে দিন কেটে গেলো। তার মধ্যে অনেকে এসে দেখা করে যায়। আজকে কিছু এতিম বাচ্চাদের খাওয়ানো হলো। তার দায়িত্ব জাহিদ আহমেদ নিয়েছেন। দিন যায় মনের ক্ষত ধীরে ধীরে শুঁকায় তেমনই শ্রাবণ কিছুটা শান্ত হয়েছে। সুন্দর অ াীীাী চেহেরাটা ফ্যাকশে রুপ ধারণ করেছে। মেঘ জামিলা বেগম এর সাথে মিলে রান্না করছে। খাওয়া দাওয়া নেই এই ক'দিন। মেঘকেই দেখতে হবে সবটা শ্রাবণের সাথে ভেঙে পড়লে শ্রাবণ আরও কষ্ট পাবে। কষ্ট পেলে কি হবে তারা তো আর ফিরে আসবে না। কিচেনে ও একজন মানুষকে খুব মনে পড়ছে যার ছোঁয়া আজ ও মিশে আছে কিচেন রুমটাতে। যার স্মেল টস মেঘ।
মনে হলে কান্না পায় ভীষণ। জামিলা বেগম জানতে পেরে অনেক কষ্ট পায় কান্না করে। মানুষটা ভালো ছিলো কখনোই কষ্ট দিয়ে কথা বলেনি। শ্রাবণ ও জাহিদ আহমেদ একসাথে বাড়িতে আসেন। জাহিদ আহমেদ কঠিন গলায় হুশিয়ারি দিলেন,
---- দেখো শ্রাবণ এভাবে না খেয়ে থাকলে জীবন চলবে? তোমার হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিয়েছি তোমাকে ভরসা করে আজ তুমি এমন করলে আমার মেয়ের কি হবে? যদি আমি মারা যেতাম তাহলে মেঘ এমন করলে তুমি মানতে পারতে? মেঘের কিছু হলে সহ্য করতে পারতে তুমি? মেঘ কষ্ট পাচ্ছে শ্রাবণ।
শ্রাবণ তাকালো তৎক্ষনাৎ মেঘের দিকে। মেঘের মতোই অন্ধকার মেঘের মুখশ্রী। শ্রাবণ দ্বিমত করলো না। খেতে বসলো জাহিদ আহমেদ এর সাথে। মেঘ খাবার বেড়ে দিলো দুজনকে। মেঘ খুশি হয় হয়তো কথাগুলো বলা ঠিক হয়নি কিন্তু,
সে না খেয়ে থাকলে তো আর মা বাবা ফিরে আসবে না। যদি এমনটায় হতো তাহলে তো পৃথিবীতে সব সন্তানরা-ই বোধহয় এমন করতো।
খাওয়া শেষ হতেই জাহিদ আহমেদ পিটে হাত বুলিয়ে বলেন,
---- কষ্ট পেয়ো না বাবা। তুমি আমার ছেলের মতো।
আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও। ভাইজান ভাবি তো আর ফিরে আসবে না৷ নিজেদেরকে সামলাতে হবে। সামনে অনেক কাজ বাকি। শ্রাবণ এভাবে ভেঙে পড়বে ভাবিনি আমি।
---- আমি আমার কাজ কমপ্লিট করবো বাবা। আমি আমার বাবা মায়ের খুনিকে খুঁজে বের করবো। শুধু কিছু প্রমান হাতে পাওয়ার অপেক্ষা। ওরা আমার কলিজায় আঘাত করেছে আমি ওদের শরীর থেকে রহুটা কেঁড়ে না নেওয়া অব্দি থামবো না। শ্রাবণ শিকদার যতোটা ভালো ততোটায় ভয়ংকর।
শ্রাবণ ওঠে রুমে চলে যেতে যেতে মেঘকে বললো,
---- খেয়ে একটু রুমে আসো।
---- আপনি যান আমি আসছি।
শ্রাবণ চলে গেলো। জাহিদ আহমেদ ও ওঠে দাঁড়ায়
মেঘকে বলে,
---- খেয়ে নে আম্মাজান।
---- জ্বি বাবা।
জাহিদ আহমেদ চলে যান৷ মেঘ জামিলা বেগমকে বলে,
---- আন্টি আমার সাথে খেতে বসুন। খেয়ে তারপর খাবার নিয়ে যাবেন।
জামিলা বেগম বলে,
---- না মেঘ মা আমি খাবো না। আমাকে দিয়ে দিলেই হবে।
---- না আন্টি আপনার সাথে খাবো বলেই তাদের সাথে খাইনি। বসুন আন্টি।
জামিলা বেগম খুশি হয়ে বসলেন। একসাথে খেয়ে উঠলেন। জামিলা বেগমকে খাবার বক্সে করে দিয়ে সদর দরজা লক করে রুমে আসলেন। বাড়িটা অদ্ভুত ফাঁকা মেঘের জন্য। তার আসার পর থেকে বাবা মা দুজনকেই এই বাড়ির আনাচে কানাচে দেখেছে। একয়েকদিন নেই অদ্ভুত নীরব লাগে মেঘের। মনে হয় তারা আছে। অবাধ্য মনটা মানতে নারাজ তারা নেই।
---- মেঘ আমি একটু বের হবো। বাবাকে জানাতে হবে না। আমি ব্যাথিত অন্য কেউ আসলে দরজা খুলবে না। আমি কল করবো আসার সময়৷
মেঘের ভয় লাগলো৷ সাথে সাথে বললো,
---- কোথায় যাবেন আপনি? আবার ও বিপদ ডেকে আনবেন? আমাকে একটু শান্তি দিন প্লিজ। আমার ভয় করছে আপনাকে নিয়ে। আপনি যাবেন না।
হাত ধরলো মেঘ। অনুরোধ করলো অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
শ্রাবণ মেঘের চোয়াল আঁকড়ে ধরলো। কপালে চুমু খেলো। অতঃপর বললো,
---- তুমি কি চাও না বাবা মায়ের খুনি শাস্তি পাক?
আমার বাবা মাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে তারা মাটির উপর হাসিখুশিতে মেতে আছে। কিভাবে সন্তান হয়ে তা মেনে নিবো বলো?
---- আমি চাই শাস্তি পাক যে এমন কুৎসিত একটা কাজ করেছে। কিন্তু, আমি চাই না আপনি আমার থেকে দূরে চলে যান। আমার ভয় হয় আপনাকে নিয়ে। আপনি পুলিশ নিয়ে যাবেন সাথে করে। একা একা কোথাও যাবেন না।
---- পুলিশ যাবে। ভয় পেয়ো না। আমি তোমায় ছাড়ছি না এতো সহজে। আসি।
মেঘকে ছেড়ে দিলো শ্রাবণ। মেঘ দরজা অব্দি এগিয়ে দিলো শ্রাবণকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে ধরনীর বুক ছিঁড়ে। শ্রাবণকে দেখা অব্দি তাকিয়ে রইলো মেঘ। শ্রাবণ লিফ্টে ওঠে নিচে নেমে গেলো। শ্রাবণ দরজা লক করে ভেতরে চলে আসলো। এই যে টেনশন বাড়িয়ে দিলো ছেলেটা মেঘ যতোক্ষণ না শ্রাবণ বাড়িতে আসবে ততোক্ষণ অব্দি টেনশনে ছটফট করবে। এই দু'দিন যাবত এমনটায় হচ্ছে মেঘের সাথে। ভয় হয় যে মানুষটা তার বাবা মাকে মারতে পারে সে অবশ্যই শ্রাবণকে মারতে পারে। সেখানেই মেঘের যতো ভয়। পুলিশ ও খুঁজে বের করতে পারেনি এখনো। সব প্রমানই কায়সার মির্জাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। ঘান থেকে লোকজন সবই ছিলো কায়সার মির্জার লোক। টাকা খাইয়ে অকাজ কুকাজ গুলো করায় চুপিচুপি। কিন্তু, তিনি নারাজ এই যে, তিনি শুধু হুমকি অব্দিই সীমাবদ্ধ তার থেকে বেশি নয়। কিন্তু, তার কথার অবাধ্য হয়ে কে যে মেরে পালিয়ে গেলো চিনতেই পারলো না কেউ। কালো মাস্ক পড়া ছিলো ছেলেটার। নিজের ছেলের সাথে নিজেও বেকায়দায় পড়ে গেলেন কায়সার মির্জা। আমিরা মির্জা দিশেহারা হয়ে ঘুরছে এখানে ওখানে। আজ সত্যিটা ও মিথ্যা সবার কাছে। সবাই ভাবছে বাবার থেকে দেখেই ছেলে এমন হয়েছে। বাবা গোপনে আর ছেলে পাবলিকলি।
____________________
---- হেই ছ্যাকা খোর সয়তান পুলিশ আসসালামু আলাইকুম।
দিব্য আগুনের ফুলকির ন্যায় দৃষ্টিতে তাকালো পাশে।
বাধ্য হয়ে আজ পাত্রি দেখতে এসেছিলো বাবা মা ও বোনের সাথে। ফাইজা বেগমকে বাড়িতে আনা হয়েছে। তিনি সবার কাছে মাফ চেয়েছেন। ওই যে একবার মনের মধ্যে কষ্ট দিলে আগের মতো আর সেই সম্মানটা পাওয়া যায় না সেটাই হয়েছে ফাইজা বেগমের সাথে। কত আদর করছেন ছেলে মেয়েকে। স্বামীর খেয়াল রাখছেন কিন্তু, তারা প্রয়োজন এর চেয়ে কোনো কথা বলে না। এতে কষ্ট পেয়ে ও চুপ করে থাকেন তিনি। দিব্য ও পাত্রিকে একা ছাঁদে পাঠানো হয় কথা বলতে। দিব্য ফাজিল মেয়েটাকে দেখে রেগেন৷ হ। । । । ম,্,ৃ,চ্্,৷৷ ন , ফেটে পড়ে। মাথার আঘাতটা ও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে৷ যেনো শুঁকিয়ে যাওয়া ক্ষতটা আবার ও তাজা হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
---- মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ ফাজিল মেয়ে। এ্যাই তুমি এখানে কি করছো?
দোয়া বেক্কলের মতো হাসলো। বললো,
----আপনি দেখতেছেন না আমি এখানে নাচতেছি।
নাচবেন আমার সাথে?
রেগে এগিয়ে যেতে নিলে খানিকটা ভয়ে দূরে সরে গেলো দোয়া। দিব্য আগের ন্যায় হাত দুটো মুঠোবন্দি করে বললো,
---- ফাজিল মেয়েকে আমার কাঁধে ঝুলানোর তাহলে এতো চেষ্টা ? জানলে আজীবনও আসতান না। বিয়ে না করে দিন কাটিয়ে দিবো তবুও ফাজিল ঝগরুটে মেয়েকে বিয়ে করবো না।
মুখ ভেঙছি দিলো দোয়া। অপমানের প্রতিশোধ নিতে বললো,
---- হুহ! আসছে বিয়ে করতে। আমি আপনাকে এখন এই মুহুর্তে রিজেক্ট করলাম। আপনি দুটো ছ্যাঁকা খেয়েছেন। যান বাসায় যান। না হয় আবার ও সুইসাইড করবেন নাকি বোকা পুলিশ?
---- এ্যাই মেয়ে...
---- খবরদার তেড়ে আসবেন না। সেই রাইট আপনার নেই। কাছে আসার পারমিশন কে দিয়েছে আপনাকে হুহ? কি হন আপনি আমার?
দিব্য বুঝলো না মেয়েটার কারসাজি। রেগে বললো,
---- বড্ড বাড়াবাড়ি করছো তুমি।
্কপ
ঠোঁট চেপে জয়ের হাসি হাসলো দোয়া বললো,
---- আমি যাই, আপনি রিজেক্ট। আপনাকে বিয়ে করা মানেই ছ্যাকা খোরের বউ হওয়া।
যেতে নিলে দোয়ার হাত চেপে ধরলো দিব্য। রেগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো দিব্য,
---- আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো? আজকের মধ্যে তোমার কাছে আসার পারমিশন আমি নিজেই ক্রিয়েট করবো। লেটস গো...
---- না না ছাড়ুন আমার হাত। আমি ফান করেছিলাম।
চলবে,,,