ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

২৭তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ২৭

#তাসনিম_লিজা

---- কপি নিষিদ্ধ!

মেঘের প্রতি দিব্যর দুর্বলতা এবং মেঘকে ভুলে যাওয়ার জন্য দ্রুত দিব্যর বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন জাহাঙ্গীর আহমেদ। দোয়াকে দেখতে আসার মূল কারন হলো দিব্যকে মেয়েটা নিঃস্বার্থ ভাবে বাঁচিয়েছিলো ।

দোয়েলের অনেক পছন্দ হয়েছে দোয়াকে। তাই কোনো ভনিতা না করে সরাসরি তার বাবাকে জানিয়ে দেয়। মেঘ শ্রাবণকে ও ডাকেনি। মেঘকে দেখলেই দিব্য অন্যরকম হয়ে যায় তা জাহাঙ্গীর আহমেদ সেদিনই বুঝতে পেরেছিলো।

ছেলেটা বাধ্য হয়ে চলে এসেছিলো শ্রাবণদের বাসা থেকে। কেন এসেছে সেটাও বুঝার বাকি নেই ওনার। দোয়াদের ছোট্ট ডয়িংরুমে দোয়েল তার বাবা মা ও দোয়ার বাবা মা বসে আছেন। দোয়ার বাবা প্রথমে বারণ করলে ও ছেলে দেখে রাজি হয়ে যান তিনি। এমন সরকারি জব করে দেখতে ও মাশাল্লাহ রাজি হবেই তো বাবারা। সবাই অপেক্ষা করছে দোয়া ও দিব্যর জন্য।

দ্রুত দিব্য নিয়ে আসলো দোয়ার হাত ধরে। সবার সামনে এসে আলগোছে হাত ছেড়ে দিলো দিব্য। রাগে সে কাঁপছে। ভেতরে জেদ চেপেছে দিব্যর না চাইলে ও করবেই বিয়েটা। শান্ত স্বরে নিরদ্বিধায় বলে উঠলো দিব্য,

---- আমি এই বিয়েতে রাজি এন্ড দোয়া ও রাজি।

দোয়া বড়ো বড়ো চোখে তাকায় দিব্যর দিকে। কিছু বলতে নিলে ফের দিব্য বলে,

---- বাবা আমি চাচ্ছি আজই বিয়েটা হোক। আমি ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই যদি কারোর আপত্তি না থাকে।

দোয়েল অবাক হয় খুশি ও হয়। কেউ আপত্তি জানালো না। ফাতেমা খানম মিষ্টি আনতে গেলেন।

দোয়ার বাবা ফয়সাল সাহেব হাসিমুখে মিষ্টি খাইয়ে দেন জাহাঙ্গীর আহমেদকে। তারপর বলেন,

---- শুভ কাজে দেরি করতে নেই বিয়াই সাহেব। আমি কাজীর ব্যবস্থা করছি। আপনার একটু সময় দিন আমায়।

---- অবশ্যই আমার ছেলে যেহেতু রাজি আর দেরি কিসের?

---- ফাতেমা ওনাদের আপ্যায়নের যেনো কোনো কমতি না হয়।

---- আপনি চিন্তা করবেন না।

ফাইজা বেগম ও খুব খুশি হয়েছেন। ওনি চাইনি মেঘকে, মেঘ ওনার না চাওয়াকে পূর্ণ করেছে। আজ অন্য মেয়েকে ছেলের বউ রুপে দেখে খুশিই হয়েছেন।

দোয়া রেগে নিজের রুমে চলে গেলো। দিব্যর ঠোঁটে খেলে গেলো বিশ্বজয়ের হাসি। মেয়েটা বড্ড বাড় বেড়েছে। কেবল তো শুরু পদে পদে কত অপমানিত হতে হবে কে জানে? দিব্য আহমেদকে অপমান করা?

ঘরোয়া ভাবে এই কজন মানুষ মিলেই বিয়ের আয়োজন শুরু করেন।

___________________

মেঘের অপেক্ষার শেষ নেই। রাত দশটা বাজতে চলেছে, এখনো আসছে না কেন শ্রাবণ? রুমে না গিয়ে সোফায় বসে রইলো সে। ভয় লাগছে তার মনটা শুধু কু ডাকছে আবার না বিপদ হয়। ফোন দিচ্ছে বার বার রিসিভ করছে না শ্রাবণ। জাহিদ আহমেদ ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমান। তাই ডাকেনি মেঘ। অস্থির চিত্তে চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করতো লাগলো সে।

__________________

---- শ্রাবণ ওকে ছেড়ে দে ভাই। আমরা আছি তো৷ ওর মুখ থেকে কিভাবে কথা বের করতে হয় তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।

আইন নিজের হাতে তুলি নিস না।

মরে যাবে তো।

ছাড় শ্রাবণ।

ও মরে গেলে আসল খুনি অব্দি পৌঁছাতে পারবো না আমরা৷

শ্রাবণ বেধড়ক ভাবে মারছে এলোপাতাড়ি। অবস্থা খুবই খারাপ ছেলেটার। শ্রাবণ, তাসফিয়া এবং ওসি সাহেব মিলে অনেক চেষ্টা করেছে কোনো ক্লু পাওয়ার। দিব্য স্ব শরীরে উপস্থিত না থাকলে ও ওসি সাহেব এর সাথে মিলে যতোটুকু সম্ভব সাহায্য করছে খুনিকে ধরার জন্য। পুরনো বাড়িটার পাশে অন্য একটা বাড়িতে পুরো বাড়ির চারপাশে অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিলো। বাড়িতে কেউ থাকেনা। তারা মূলত কানাডা প্রবাসী। তবে কেয়ারটেকার রাখা আছে। তার সাহায্যে সিসিটিভি ফুটেজ কালেক্ট করে কিছু তথ্য পায়।

এই যে, ছেলেটাকে চোখ বন্ধ করে এলোপাতাড়ি মেরে নিজের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করছে শ্রাবণ ওই ছেলেটাকেই হাতে ঘানসহ ভয়ার্ত চেহেরায় পালাতে দেখা গিয়েছে বাড়িটার পিছনের দিকে। ভুল তার একটায় মাস্ক খুলে ফেলেছিলো সে বাইরে এসে। কিন্তু, ঘান ফেলতে বা লুকাতে ভুলে যায়। মরে যাচ্ছে তবুও স্বীকার করছে না ছেলেটা। শ্রাবণ নিজের মধ্যে নেই, হিংস্র হয়ে উঠেছে সে। তাসফিয়া ও ওসি সাহেব মিলে জোর করেও ছাড়াতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ওসি সাহেব ঘান তাক করলো শ্রাবণের মাথায়। ছেলেটার অবস্থা এমন আর কয়েক মিনিট মারলে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন,

---- শ্রাবণ ওকে ছাড়ুন বলছি। নয়তো আমরা আপনাকে স্যুট করতে বাধ্য হবো।

শ্রাবণ মারতে মারতেই বললো,

---- ওকে ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না স্যার। ও আমার মা বাবাকে আমার কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছে। আমি ওকে ওর মা বাবার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিবো।

তাসফিয়া শ্রাবণের হাত ধরে টানতে লাগলো। জায়গাটা একটা আড্ডাখানা। কেউ নেই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে আছে কয়েকজন। তার মধ্যে এই ছেলেটা ও ছিলো। অনেক খোঁজার পর সন্ধান মিলেছে। তাছাড়া সে টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করে। তাই তাসফিয়া চাচ্ছে না শ্রাবণ কোনো ভুল কাজ করুক। তার পেছনে অন্য কেউ আছে। যে শ্রাবণকে কষ্ট দিতেই এই খেলাটা খেলেছে।

---- শ্রাবণ তুই চাস না ফুপির আর আংকেলের আসল খুনি শাস্তি পাক? ওর তো এমনিতেই ফাঁসি হবে তার সাথে যে টাকা খাইয়ে ওকে ইউস করেছে তাকে তো ধরতে হবে আমাদের। তা না হলে জানবি কি করে তোর এতো প্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীটা কে!

ওসি সাহেবের ঘান তাকে নয় বরং তাসফিয়ার কথাতে থেমে গেলো শ্রাবণ। মাথা কাজ করছে না তার। ছেলেটার গালে থাপ্পড় মারলো দুটো। বললো,

---- বল কেন মেরেছিস আমার মা বাবাকে? কে পাঠিয়েছে তোকে? সে কত দিয়েছে তার থেকে ডাবল টাকা আমি দিবো।

ছেলেটা এক কথার মানুষ। বলবে না মানে বলবেই না। ঠোঁটের কোণ বেয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। হাত দিয়ে মুছে এতো মার খেয়ে ও হাসছে সে। নাম জিসান। বলে,

---- যার নুন খেয়েছি তার গুন গাইবো কিন্তু, তার বদনাম ছড়াবো এমন মানুষ জিসান নয়।

আমি মরে যাবো তবুও বলবো না। যা খুশি তার করেন নো প্রবলেম।

তৎক্ষনাৎ নাক বরাবর ঘুষি পড়লো। শ্রাবণ মেরেছে। রেগে চিৎকার করে বলে উঠলো সে,

---- তাহলে তুই মর। তোর এটাই পানিশমেন্ট। আর বাকিটা আমরা বের করবো কার হাত ছিলো।

---- শ্রাবণ শান্ত হন। আমরা ওর পেট থেকে কথা বের করবো। ও এভাবে বলবে না এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের হাতে তুলে দিন।

---- স্যার ও মরে গেলেই ভালো হবে।

জোর করে তাসফিয়া শ্রাবণকে টেনে সরালো সেই জায়গা থেকে। ঝটপট করে জিসানকে গাড়িতে তুলে নিলো ওসি সাহেব।

শ্রাবণ চেঁচিয়ে উঠলো। বললো,

---- আপু ছাড়ো আমায়। ওকে আমার হাতে মরতে দাও।

---- তুই বাড়ি যা শ্রাবণ। বাকিটা আমাদের হাতে ছেড়ে দে। মেঘ তোর জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটার কথা অন্তত ভাব।

শ্রাবণ ছাড়ার চেষ্টা করলো তিনজনের সাথে পেরে উঠছে না। তাসফিয়ার সাথে দুই সহযোগি ও ধরে রেখেছে। শ্রাবণের রাগ বেড়েই চলেছে। বলছে,

---- আপু আমাকে ছাড়ো। আমার জায়গায় থাকলে বুঝতে পারতে আমার অবস্থাটা ঠিক কেমন।

---- আমি বুঝতে পারছি ভাই তোর অবস্থাটা। তুই বাসায় যা। আমি কথা দিচ্ছি জিসানের মুখ থেকে কথা বের করবোই। যা বাসায় যা। মেঘ টেনশন করছে। ওকে চল আমি ড্রপ করে দেই।

---- লাগবে না।

শ্রাবণকে ছেড়ে দিলো তাসফিয়া। শ্রাবণ নিঃশব্দে চলে গেলো নিজের বাইক নিয়ে। তাসফিয়া অবাক হলো। এতোক্ষণ কত রাগ এখন শান্ত হয়ে গেলো। তাসফিয়া ভাবলো না তাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠলো সে।

____________________

---- আপনি আমায় কেন বিয়ে করেছেন আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি বোকা পুলিশ।

দিব্য ভ্রুঁ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- কেন?

দোয়া দাঁতে দাঁত পিষে রেগে বললো,

---- যাতে দ্বিতীয় বার ছ্যাঁকা খেতে না হয় তাই জোর করে বিয়েটা করেছেন নেহাৎ বাবা মায়ের ভয়ে আপনার নামে কবুল বলছি নয় তো কনফার্ম রিজেক্ট হতেন। তবুও আপনি রিজেক্ট। আমি আপনাকে কখনোই হাসবেন্ড বলে মানবো না মানি না।

দিব্য তাচ্ছিল্যের হাসলো। বললো,

---- বয়েই গেছে আমার তোমার মতো একটা ফাজিল মেয়েকে বউ বলে মানতে। তোমার মতো মেয়েকে ভালোবাসতে নয় বরং অপমানের প্রতিশোধ নিতে বুঝলে? খুব শখ অপমান করা দিব্য আহমেদকে তাই না? রিজেক্ট কে কাকে করে সেটা না হয় কিছুদিন পরই টের পাবে।

দোয়া বুঝলো না৷ বললো,

---- মানে?

বাঁকা হাসলো দিব্য বললো,

---- অন্যকে রিজেক্ট করার বেশ শখ আপনার তাই না? ফিলিংসটা কেমন তা আপনার জানতে হবে না? সেটাই উপলব্ধি করাবো বুঝলেন মিসেস দিব্য

জাস্ট এ ওয়েট!

---- আপনি আমায় ডিভোর্স দিবেন?

দিব্য হাসলো বললো,

---- বাহ! বুদ্ধিমান মেয়ে দেখছি। সময় হোক পেয়ে যাবা সেই বিউটিফুল ফিলিংস।

সাথে হেঁসে উঠলো দোয়া ও। বললো,

---- বোকা পুলিশ। দেন ডিভোর্স আপনার সাথে সংসার করতে বয়েই গেছে আমার। আচ্ছা জবটা আপনার থাকবে তো?

দিব্যর পাগলামিতে এক কাপড়ে বাবা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে দিব্যদের বাড়িতে আসতে হয়েছে দোয়াকে। দোয়েল আবার সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছে। দিব্য বারণ করেছে তবুও বিয়ে তো আর বারবার হয় না এজন্যই সাজানো। দিব্য নিজে একটা বালিশ নিয়ে রুমের মধ্যে থাকা সোফায় শুইয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে বললো,

---- জবের ভয় দিব্য করে না। তবে আত্মসম্মান বেশ তার। আত্মসম্মানের জন্য জবটা না হয় বিসর্জন দিবো।

দোয়া বসে গালে হাত দিয়ে আফসোস করে বললো,

---- প্রতিশোধস্পৃহা যদি আগে থাকতো তাহলে মেঘ আপুকেইপেতেন। অন্তত ছ্যাঁকা খেতেন না। ইস এতো সুন্দর ছেলে ও ছ্যাক....

সেকেন্ডের মধ্যে এসে থাপ্পড় পড়লো দোয়ার গালে

কিছু বুঝে উঠার আগেই । তাকালো দিব্যর দিকে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনা পানি। বুঝ হওয়ার পর এই প্রথম কেউ মারলো দোয়াকে। বাবা তার ভীষণ রাগী কিন্তু কখনোই গায়ে হাত তুলেনি। আর এই লোকটা অধিকারবোধ দেখাতে আসছে মেরে? দোয়া কিছু বলার আগেই দিব্য রেগে হুংকার দিয়ে বললো,

---- ডোন্ট ইউ ডেয়ার ড্র্যাগ মেঘ ইনটু দিস। শি ইজ সামওয়ান এলস'স ওয়াইফ নাউ। ইফ ইউ আটার ইভেন ওয়ান মোর ওয়ার্ড অ্যাবাউট হার, ইউ উইল সি আ সাইড অব মি ফার ওয়ার্স দ্যান ইউ ক্যান ইম্যাজিন। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?

দোয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

---- আপনি আমায় মারলেন? আপনার নামে আমি নারী নির্যাতনের মামলা করবো। আমি ভুল কি বলেছি? ভালোবাসতে পারেন মরতে পারেন। পারেন না শুধু নিজের করে আগলে রাখতে কি দেখে বাবা আমায় আপনার হাতে তুলে দিলো বুঝে পাচ্ছি না আমি। আমি চলে গেলে ও ছেড়ে দিব...

---- শাট আপ, ফাজিল মেয়ে কোথাকার।

---- আপনি ফাজিল ছেলে৷

রাগ নিয়ন্ত্রণ করার তীব্র চেষ্টা করলো দিব্য। দোয়া থাপ্পড় খেয়ে ও একইভাবে কথা বলছে। তাই কথা না বলাই শ্রেয়। শুইয়ে পড়লো আগের ন্যায়। দোয়া রাগে গটগট করে শুইয়ে পড়লো।

----- আমার উপর এখনো রেগে আছিস তাই না রে দোয়েল?

দোয়েল তাকালো না ফাইজা বেগম এর দিকে। তাসির বারবার কল দিচ্ছিলো। দোয়েল রিসিভ না করে বার বারই কেটে দিচ্ছিলো। বিয়ের পর থেকেই এভয়েড করে দোয়েল তাসিরকে। মূলত তাসিরের বন্ধমহলকে। তার যথাযথ একটায় কারন সেটা হলো মেঘ। এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলো তারা যার কারনে তার প্রিয় মেঘ ও প্রিয় ভাই আলাদা হয়েছে। তার ভাই মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ওঠেছে আর সেটা শুধুই দোয়ার জন্য।

এখন দোয়াকে ভাইয়ের বউ হিসেবে আনলে ও কোথাও একটা শূন্যতা থেকেই যায় দোয়েলের মনে।

তার ভাইয়ের কষ্ট হাহাকার সে বুঝতে পারে। তাই তো ইচ্ছে করলে ও যোগাযোগ রাখে না মেঘের সাথে। ভালো থাকুক তারা। আর তার ভাই ও ভালো থাকুক। এখন শুধু দোয়াকে দিব্য মেনে নিলেই শান্তি। সব ঠিক থাকলে ও দোয়েল তাসির কে মানতে পারছে না। তাই তো কথা বলতে ও ইচ্ছে করে না। মায়ের দিকে তাকালো নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে। বললো,

---- আমার রাগ করার কি আছে? রাগের কোনো দাম আছে কারোর কাছে?

ফাইজা বেগম দোয়েলের হাত আঁকড়ে ধরলো। মায়াময় স্বরে বললো,

---- আমার সাথে এভাবে কথা বলিস না দোয়েল।

সব সহ্য করতে পারি তোদের এই এড়িয়ে যাওয়াটা সহ্য করতে পারছি না। বাড়িতে আসার পর কেউ আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলছিস না।

আলতো করে সরিয়ে নিলো ফাইজা বেগম এর মুঠোবন্দি থেকে নিজের হাত। বললো,

---- আপনি শিখিয়েছেন আমাদের এমন আচরণ।

আমরা জানতাম না তো। সবার কেন্দ্র বিন্দু ছিলেন আপনি। আর আজ সবার থেকে বাদ। থাকুন আপনি আপনার মতো। আমরা তো আপনাকে বিরক্ত করছি না। আর আপনার ইচ্ছেটাই পূর্ণ হলো। ভাইয়ার বউ মেঘ হয়নি হয়েছে অন্য কেউ।

যা আপনি মনে প্রাণে চেয়েছিলেন।

আহত দৃষ্টিতে তাকালেন ফাইজা বেগম। বলেন,

---- আমি সব ভুলে তোদের নিয়ে সুন্দর করে বাঁচতে চাই দোয়েল। আমাকে একটি বার সুযোগ দে। আমি তোদের মতের বিরুদ্ধে কখনোই যাবো না।

দোয়েল হাসি মুখে বললো,

---- আমরা আর কিছুই চাই না। আমাদের কোনো ইচ্ছে নেই। আপনার মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো কোনো ওইয়েই নেই। আসছি।

দোয়েল প্রস্থান করলো তৎক্ষনাৎ সেই জায়গা থেকে। ফাইজা বেগম উদাস দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে বিরবির করে বলেন,

---- তোদের কি বলবো? নিজের ভুলের কারনে নিজেই নিজেকে সহ্য করতে পারছি না। অতিষ্ঠ আমি নিজের প্রতি।

তিনি চলে যান রুমের দিকে। জাহাঙ্গীর আহমেদ আলাদা থাকেন। ফাইজা বেগমকে বাড়িতে জায়গা দিলে ও নিজের পাশে নিজের রুমে জায়গা দিতে পারেনি। সেই হাহাকার আরোও পোড়াচ্ছে ওনাকে। সত্যিই সেই ভুলের ক্ষমা নেই যেই ভুল না করেও মরতে হয়েছে সামিয়া শিকদারকে। সেটা কেবলই অন্যায়। এতোটা দয়া করেছে জাহিদ ভাবতেই ফাইজা বেগম কেঁদে উঠেন। অথচ তিনি তাদের সহ্যই করতে পারতো না।

________________

---- আপনি জানতেন আমি অপেক্ষা করবো তবুও আপনি আমাকে অপেক্ষা করাবেন কেন? আমার কি কষ্ট হয় না?

শ্রাবণ মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ খানিক্ষন তাকিয়ে বললো,

---- এক গ্লাস পানি দিবে?

মেঘ চুপচাপ কিচেনে গেলো ফ্রিজ খুলে পানির বোতল বের করে গ্লাসে করে নিয়ে আসলো। এগিয়ে দিলো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ পুরো গ্লাস শেষ করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বললো,

---- হারাবো না আমি মেঘফুল। খেলা তো কেবল শুরু। খেলার মাঠ থেকে খেলা না শেষ হওয়া অব্দি না পিছপা হওয়ার মতো ছেলে শ্রাবণ না। এর শেষ আমি দেখেই ছাড়বো।

মেঘ শ্রাবণের পাশে বসলো। হাত দুটো মুঠো করে বললো,

---- এর সাথে যে বা যারা জড়িত আছে তারা যদি আপনার কোনো ক্ষতি করে তাহলে?

শ্রাবণ মেঘকে নিজের সাথে আগলে নিলো। বললো,

---- ওরা আমায় মারবে না। আমায় মারার হলে কবেই মারতো। ওরা আমার দুর্বলতায় আঘাত করেছে। যাতে আমি কষ্ট পাই।

---- কে হতে পারে সে? কেন আপনার ক্ষতি করছে?

মেঘের চিন্তিত চাহনিতে চোখ রাখলো শ্রাবণ। বললো,

---- যেই হোক তাকে আমি খুঁজে বের করবোই।

ফোন বেজে উঠলো। শ্রাবণ ধরলো সাথে সাথে,

ওপাশ থেকে তারাহুরো করে বললো,

---- জিসান সুইসাইড করেছে। সে কারোর নাম বলেনি। শুধু এইটুকুই বলেছে এখানে নাম বলে বাঁচতে পারলেও জেল থেকে বের হলেই তার মরন হবে। তার চেয়ে নিজেকে মেরে ফেললেই ভালো হবে।

শ্রাবণ রেগে ফোনটায় আছাড় মারলো ফ্লোরের মধ্যে। চমকে উঠলো মেঘ। ভয়ে শ্রাবণের শার্ট কামছে ধরলো।

---- ক'কি হয়েছে?

---- ড্যাম ইট! জিসান সুইসাইড করেছে। আসল খুনি অব্দি পৌঁছাতে গিয়ে ও পারলাম না। ইচ্ছে করছে সব শেষ করে দেই।

শ্রাবণ রেগে ফুঁসে ওঠে। সামনে থাকা টি-টেবিলটায় লাথি মারে, ফ্লাওয়ার ভাসটা আছাড় মারে। মেঘ ভয়ে ছিটকে দূরে সরে যায়। আটকাতে গিয়ে ও পারছে না। এটা ওটা ছুঁড়ে মারছে ভয়ে যেতে ও পারছে সে। ফ্লোরে কাঁচের টুকরো ভর্তি হয়ে গিয়েছে। মেঘ দূর থেকে কান্নারত কন্ঠে বলতে লাগলো,

---- কি করছেন আপনি? শান্ত হন। এমন করলে সব ঠিক হবে না।

শ্রাবণ রাগের তোপে বলতে লাগলো,

---- আমাকে আটকিও না মেঘ আমি ছাড়বো না তাকে। ওরা আমার সাথে খেলছে আমার মা বাবার প্রাণ নিয়ে আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। সব শেষ করে দিবো আমি শে..

---- আহ্

তড়িৎ তাকালো শ্রাবণ। এই মুহুর্তে তার হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলা ভাঙা শোপিস এর কাঁচের টুকরো মেঘ এর হাতে এসে বিঁধলো। একদম গেঁথে গিয়েছে জামার হাতার উপর দিয়েই রক্ত বের হচ্ছে। শ্রাবণের এমন কান্ডে ভয় আর আতংকে এমনিতেই মেঘ ভীত ছিলো এমন অবস্থায় মেঘ যেনো আর ভয় পেয়ে যায়। চিৎকার দিয়ে ওঠে।

শ্রাবণ কোনোকিছু না ভেবেই ভাঙা কাঁচের উপর দিয়েই দৌড়ে মেঘের কাছে আসলো। শ্রাবণের চোখে মুখে আতংক ছড়িয়ে পড়লো। নিজেকে অপরাধি মনে হলো। বারবার ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করছে,

---- মেঘ বেশি ব্যাথা হচ্ছে? কিছুই হবে না। এই তো,

শ্রাবণ এক টান মেরে কাঁচটা বের করে ফেলে। মেঘ চোখমুখ খিঁচে ফেলে কেঁদে উঠে। শ্রাবণ জড়িয়ে ধরে তৎক্ষনাৎ। নিজেই কষ্ট পায়। আহত স্বরে বলে,

---- সরি মেঘ আমি বুঝতে পারিনি আমার কারনে তুমি কষ্ট পাবে। রাগের বসে কি থেকে কি করে ফেলেছি আমি।

মেঘ নিজেকে সামলে নিলো। শক্ত হলো সে। বললো,

---- আমি ঠিক আছি। লাগেনি বেশি ।

---- চলো আমার সাথে।

রুমে এসে হাত বেন্ডেজ করে দিলো শ্রাবণ। আবার ও বললো সে,

---- সরি মেঘফুল আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি।

---- না চেয়েই তো কষ্ট দিচ্ছেন। আমার কথা কেন শুনছেন না আপনি? পুলিশ আছে তো। আপনি কেন আবার জড়াচ্ছেন নিজেকে ? আমার ভয় করে। যদি আবার ওরা আমার উপর আঘাত করে। আপনার শেষ আর আপন বলতে তো আমিই আছি।

শ্রাবণ জড়িয়ে নিলো মেঘকে শক্তপোক্ত করে। যেনো কেউ নিয়ে যেতে চাইছে মেঘকে। শ্রাবণ মনে মনে সত্যিই ভয় পাচ্ছে। মেঘকে হারানোর ভয়।

---- বাজে কথা একদম বলবে না। আমার থেকে তোমাকে উপরওয়ালা ব্যথিত কেঁড়ে নেওয়ার মতো সাধ্য কারোর নেই।

মেঘ ছুটতে চেষ্টা করে বললো,

----- ছাড়ুন তো। আমার খিদে লেগেছে খুব। আগে দুজন মিলে একসাথে খাবো। তারপর আপনার কথা শুনবো।

মেঘ নিজের হাতের ব্যাথা ভুলে শ্রাবণকে জোর করে নিয়ে গেলো ডাইনিং টেবিলের দিকে। সাবধানে পা বাড়ালো দুজন। শ্রাবণ নিজের কাজে নিজেই লজ্জিত। তার জন্য মেঘ কষ্ট পাচ্ছে। তবুও মেয়েটা ব্যাথা সহ্য করে ভালো থাকার চেষ্টা করছে। শ্রাবণ আবার ও অনুতপ্ত স্বরে বলে,

---- আমার এসব করা উচিত হয়নি মেঘ। আমার জন্য..

----- কেন এক কথা বারবার বলছেন বলুন তো?

---- তোমার কষ্ট হচ্ছে তো।

---- আমি ঠিক আছি তো। আপনি বসুন আমি খাবার আনছি।

শ্রাবণকে বসিয়ে মেঘ খাবার গরম করতে লাগলো।

শ্রাবণ অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে মাথা নুইয়ে রাখলো।

মেঘ খাবার আনলো। শ্রাবণের গলা দিয়ে খাবার নামবে না। ইচ্ছে ও নেই কিন্তু মেঘের খুব খিদে লেগেছে।

---- খেতে শুরু করুন।

শ্রাবণ মেঘকে খাইয়ে দিতে নিলে বারণ করলো মেঘ। বললো,

---- আপনি খাবেন আগে। তারপর আমি।

মেঘের কথা রাখলো শ্রাবণ।

---- বাহ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো তোমাদের লাভ স্টোরিটা। বেশিদিন থাকবে তো শ্রাবণ মেঘ একসাথে ?

আমি থাকতে তোমাদের ভালো থাকা হবে কি করে?

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন