#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৩০
#তাসনিম_লিজা
----- কপি নিষিদ্ধ!
মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছেন আফসার খন্দকার। মোনাজাতে নিজের মেয়ের জন্য দোয়া করছেন তিনি ৷ মেয়েটা নিজের জেদের কারনে আজ কতদূর। একদম ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভুল মানুষের জন্য পাগলামি করতে গিয়ে ভুল ডিসিশন নিয়ে নিজের জীবনটায় শেষ করে দিলো
কনক। আপন বলতে একমাত্র মেয়ে ছাড়া কেউ নেই আফসার খন্দকার এর। এতো এতো টাকা পয়সা সব তো মেয়ের জন্যই ছিলো। আজ কেউ নেই ওনার। একদম একা তিনি। কনকের এমন পরিনতির জন্য একমাত্র কনকই দায়ী। জেদের বশে কোনটা ঠিক, কোনটা অন্যায় তার মাথাতেই আসেনি।
সবকিছু আগে থেকে না জানলে ও তিনি মেয়ের
মুখে শুনে তাজ্জব বনে গেলেন। আদুরে আহ্লাদি মেয়েটা তার এতো ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে তা ওনার ভাবনার ও বাহিরে ছিলো। তাই তিনি এই মৃত্যু খেলা আটকাতে মেঘকে সব জানিয়ে দেন কনকের করা কুকর্মের কথা। তারপর মেঘ কনককে ধরার জন্য পুলিশের সাহায্যে মিথ্যা নাটক করে। নয়তো মেয়েটা এমন ভাবে খেলাটা সাজিয়েছে যে, প্রমানহীন ভাবে সব কিছু করছে পুলিশ ও বুঝে উঠতে পারেনি। তাই তো একমাত্র রাস্তা ছিলো অহেতুক নাটক করা। কনক এতো চালাক হয়ে ও ফেঁসে গেলো দুটো মিথ্যে কথার জালে। মেয়েটার রাগ বেশি। ধৈর্য্য ও আছে নয়তো কবেই শ্রাবণকে জোর করে বিয়ে করার চেষ্টা করতো। কিন্তু কিছুই করেনি সে। চাইনি শ্রাবণ কষ্ট পাক। নিজ থেকে আসবে একদিন শ্রাবণ এই আশায় ছিলো কনক।
আফসার খন্দকার মেয়ের শোকে অসুস্থ হয়ে যান।
মোটামুটি এখন সুস্থতাবোধ করছেন তিনি । ওনার প্রোপার্টির পঞ্চাশ পার্সেন্ট তিনি বিভিন্ন এতিমখানা
ও মসজিদে দান করেন। এবং দেশ ছাড়ার জন্য
সব কাগজপত্র রেডি করেন। এখানে থাকলে মেয়ের জন্য মন খারাপ থাকবে। সারাক্ষণ মেয়ের কথা মনে পড়বে। এভাবে তিনি কষ্ট পেতে পেতে মরে যাবেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশ ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি জমাবেন স্থায়ী ভাবে।
_______________________
---- লাস্ট এক্সাম আপনার কেমন হলো মিস্টার শ্রাবণ সাহেব?
শ্রাবণ এসেই সোফায় গা এলিয়ে দিলো। মেঘ হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাসটা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
শ্রাবণ পানি খেয়ে গ্লাসটা রাখলো টি-টেবিলের উপর। মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
---- আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে।
মেঘ ও বিনিময়ে হাসলো। বললো,
---- ফ্রেশ হয়ে খেতে আসুন একসাথে খাবো। আজ আমি রান্না করেছি আপনার জন্য।
অবাক হলো শ্রাবণ। বললো,
---- জামিলা আন্টি আসেনি আজ?
---- নাহ হয়তো অসুস্থ। কিছুই তো জানায়নি আমাকে।
শ্রাবণ ফোন দিলো তৎক্ষনাৎ জামিলা বেগম এর ফোনে। কোনো বিপদ হলো কি না জানার জন্য। মানুষটা মায়ের মতো পাশে ছিলো এবং এখনো আছে। কল তুলছে না কেন। শ্রাবণের জানামতে ওনার কেউ নেই। কারন জামিলা বেগম এর কোনো সন্তান হয়নি বলে ওনার স্বামী ওনাকে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তারপর কোথাও ঠাঁই হয়নি ওনার। অনেক বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। শেষে শ্রাবণের বাসায় কাজ করার পর থেকে শ্রাবণ জামিলা বেগম এর অবস্থা দেখে বারণ করে দিয়েছিলেন অন্য বাসায় কাজ করতে।
সে-ই টাকা দিবে যতো টাকা পেতো অন্য বাসায় কাজ করে । টেনশন হলো শ্রাবণের। মেঘ শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো শ্রাবণ চিন্তিত বেশ। উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো,
---- কি হয়েছে আন্টি কল রিসিভ করেনি?
---- হয়তো কি....
ফোন বেজে উঠলো শ্রাবণের তৎক্ষনাৎ রিসিভ করলো শ্রাবণ। ওপাশ থেকে ভাঙা গলায় বলে উঠলো জামিলা বেগম,
---- আমার একটু ঠান্ডা জ্বর ছিলো তাই আসতে পারিনি। কালকে চলে আসবো।
শ্রাবণ সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলো,
---- আসতে হবে না আন্টি৷ খাবার খেয়েছেন? মেডিসিন নিয়েছেন? আসবো আমরা? আছে সব..
জামিলা বেগম শান্তি পেলেন শ্রাবণের অস্থিরতা দেখে। বললেন,
---- আমি ভালো আছি শ্রাবণ বাবা। আসতে পারবাম কালকা। আমার জন্য ভাবছো এটাই অনেক।
শ্রাবণ বারণ করলো ফের,
---- কালকে আসতে হবে না আন্টি। দুদিন রেস্ট করুন। বলেছিলাম তো পার্মানেন্ট থেকে যান আমাদের সাথে। শুনলেন না তো। বাবা মা নেই আপনিই তো আমাদের গুরুজনের মতো। মায়ের মতো ছায়া হয়ে পাশে আছেন। হারাতে চাই না আমরা আপনাকে।
মুচকি হাসলেন জামিলা বেগম। বলেন,
---- আমার পাওয়ার চেয়ে বেশি দিয়েছো বাবা। আমি কখনোই তোমাদের ছেড়ে যাবো না কিন্তু,
আমি আমার বাড়ি ছাইড়া কোথাও যাবো না। মা বলে মেনেছো আমি সবসময় তোমাদের পাশে থাকবো মায়ের মতোই।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে শ্রাবণ। স্বামীর একটু জায়গা দয়া করে ছেড়ে দিয়েছে জামিলা বেগমকে৷ একটা ছোট্ট ঘরে থাকেন তিনি। আর নিজের স্বামী বউ সন্তান নিয়ে অট্টালিকায় থাকে। জীবন সুন্দর ওনার ও ছিলো আফসোস মাতৃত্বের জন্য সব হারালো। শ্রাবণের জোড়াজুড়িতে ও রাজি হয়নি থাকার জন্য জামিলা বেগম।
---- ঠিক আছে আন্টি। আপনার ইচ্ছে হলে আসবেন নয়তো রেস্ট নিয়েন। পুরোটাই আপনার
উপর নির্ভর করছে।
---- তোমরা খেয়েছো তো? আমি তো রান্না করিনি।
মেঘ মা কি করেছে একা একা? বাইরে থেকে আনিয়ে নিও নয়তো,
শ্রাবণ মেঘের দিকে তাকালো। বললো,
---- আপনার মেয়ে কিন্তু সব শিখে গিয়েছে আপনার কাছ থেকে । রান্না সেই করেছে৷
অবাক হলেন জামিলা বেগম। বলেন,
---- ওমা তাই নাকি? মেঘ মা রান্না করেছে? আমি তো ওকে রান্না করতেই দিতাম না৷
---- দেখি খেয়ে কেমন রান্না করেছে । আচ্ছা আন্টি রাখছি তাহলে।
---- আচ্ছা বাবা ভালো থেকো।
---- কি বললো আন্টি?
মেঘের কথায় শ্রাবণ বললো,
---- বলছে ওনার মেয়ে তো রান্না পারে না খাওয়া যাবে তো?
মেঘ মিছে রাগ দেখালো। বললো,
---- কেন খাওয়া যাবে না শুনি? আন্টি একথা কখনোই বলবে না। আপনি মিথ্যা বলছেন৷
শ্রাবণ হেসে উঠলো। বললো,
---- আরে রাগ করছো কেন? আন্টি অবাক হয়েছে কেবল। আচ্ছা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি তার পর দেখবো কেমন রান্না শিখেছো এতোদিনে।
---- আসছে জাজমেন্ট আমার৷ যান তো,
শ্রাবণ যেতে নিলে ফের পিছু ডাকলো মেঘ। এগিয়ে আসলো শ্রাবণের কাছে। বললো,
---- আপনার বুক পকেটের ফুলটা কি অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য এনেছেন? আমকে দিবেন না?
ভুলেই বসেছিলো শ্রাবণ। মেঘের কথায় মৃদু হাসলো সে। ফুলটা নিছকই সামান্য। এক টুকরো সাদার শুভ্রতায় ঘেরা স্নিগ্ধ সচ্ছ বেলি ফুল। এটা ছিলো মেঘের ছোট্ট একটি আবদার যা পূরণ করতে শ্রাবণ এতো দিনেও ভুলেনি৷ একটি করে বেলি ফুল এনে দিতে হবে। না পেলে অন্তত সাদার মধ্যে যতো ফুলই থাকুক একটি ফুল আনতেই হবে। ফুলটা এগিয়ে মেঘের কানের পাশে গুঁজে দিলো যত্ন করে। কপালে চুমু খেলো। মেঘ নিঃশব্দে হাসলো৷ শ্রাবণ মেঘের গাল টেনে বললো,
---- অদ্ভুত আবদার তোমার আমায় অনেক ভাবায় মেঘফুল। মেয়ে মানুষ তো জানতাম টাকা পয়সা
দামি জামাকাপড় জুয়েলারি চাই আর তুমি সামান্য ফুলের জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করো, রাগ করো।
মেঘ ছোট্ট বিড়ালের মতো শ্রাবণের বুকে মাথা রাখলো। শ্রাবণ ও সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। এক হাতে আগলে নিলো। মেঘ ফুলটা নাকের কাছে নিয়ে মন ভরে শ্বাস নিলো। অতঃপর বললো,
---- মিস্টার শ্রাবণ সাহেব আপনি এই যে প্রতিদিন আমার জন্য মনে করে ক্লান্ত হয়ে ও ফুলটা খুঁজে
আনেন এটাই আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা। আমাকে প্রায়োরিটি দেওয়া, আমাকে নিয়ে ভাবা,
আমি আপনার জন্য কতটুকু দামি সেটাই আপনি প্রমান করেন। আপনি তো কবেই পাস করে গিয়েছেন কিন্তু, আপনি জানেন আপনার থেকে এই ছোট্ট স্নিগ্ধ ফুলটা আমাকে কতটা আনন্দ দেয়। আপনার থেকে পাওয়া ফুল শুধু ফুল নয় আমার জন্য সেটা ভালোবাসার প্রতিক। কখনোই মিস করা যাবে না। বুঝলেন আপনি?
---- পাগলি একটা। আমার শাওয়ার নিতে হবে। আবার অফিসে যেতে হবে তো।
মেঘের মন খারাপ হলো। মাত্রই আসলো তারউপর বাড়িতে সে একা৷ শ্রাবণ ইদানীং ভীষণ ব্যস্ত। অফিস ও সামলাতে হচ্ছে। অফিসের প্রিয় একজন মানুষ আব্দুল্লাহ মাহমুদ তিনি ছুটি নিয়েছেন ভীষণ অসুস্থ। কখন সুস্থ হবে তার ঠিক নেই। শ্রাবণের সবচেয়ে ভরসা যোগ্য মানুষ ছিলেন ওনি। তাই শ্রাবণ নিরদ্বিধায় ছুটি দিয়ে দেন। এমনকি যতোদিন সুস্থ না হচ্ছে আসার দরকার নেই। মাস শেষে স্যালারি পেয়ে যাবেন তিনি। দেখে ও এসেছে শ্রাবণ হসপিটালে গিয়ে। তার সাধ্যমতে
পার্সোনাল ভাবে কিছু টাকা ও দিয়েছে শ্রাবণ। রোগটা কঠিনই। ব্লাড নিতে হয় কয়েকমাস পর পর এবার একটু বেশিই অসুস্থ ব্লাড দেওয়ার পর ও। শরীর ব্লাড নিচ্ছে না। কি হয় কে জানে,
শ্রাবণ হতাশ হলো মেঘের মন খারাপ দেখে। বললো,
---- এসেই তো পড়বো রাত্রে। কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। মুড অফ করে রেখেছো কেন? আব্দুল্লাহ ভাই সুস্থ থাকলে তিনি আমার দায়িত্বই পালন করতেন কিন্তু,
---- রাগ করিনি আমি। আপনি যান আমি খাবার বেড়ে রাখছি।
শ্রাবণ মেঘকে ছেড়ে দিলো। রুমে চলে গেলো সাওয়ার নিতে। মেঘ কিচেনে গেলো রান্না করা খাবার গুলো ডাইনিং টেবিলের উপর রাখছে।
______________________
---- দোয়া মা দিব্যকে কফিটা দিয়ে এসো তো।
মুহুর্তের মধ্যে দোয়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
দোয়ার যেতে ইচ্ছে করছে না, গেলেই শুধু ঝগড়া হয়। না করতে পারলো না সে। নিয়ে নিলো ঠোঁটে হাসি টেনে।
এগিয়ে যেতে লাগলো রুমের দিকে। ফাইজা বেগম এর সাথে পরিবারের সবাই একটু স্বাভাবিক হয়েছে এখন। তিনি রান্না করছিলেন ছেলের জন্য। যাওয়ার সময় বলে ছিলো দিব্য, কফি দেওয়ার জন্য তাকে। তাড়াহুড়ো করে দিতে চেয়েছিলো বলে দিব্য বলেছিলো, হাতের কাজ সেরে তারপর দিতে। কারন দিব্য গোসল শেষে তারপর কফি খাবে। তাই দোয়াকে দেখতে পেয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। তাদের মধ্যাকার সম্পর্কটা যেনো ভালো হয়।
দোয়া দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো রুমের মধ্যে। কিছুক্ষণ আগে তর্কবিতর্ক করে বের হয়েছিলো দোয়া। এখন মিষ্টি কথা মুখ দিয়ে জীবনে ও বের হবে না। তাই অনুমতি না নিয়েই ভেতরে এসে পড়ে সে। তৎক্ষনাৎ চিৎকার করে উঠলো দোয়া সাথে কফিটা ও পড়ে গেলো হাত থেকে।
---- নাআআআআআআ!
আমাকে মারবেন না। আমি আর ঝগড়া করবো না
আপনাকে আর ছ্যাঁকা খোর বলবো না আ...
---- হেই ইস্টুপিট! চিৎকার করছো কেন?
বন্দুক বেডের মধ্যে ফেলে দিয়ে দেয়ার ঠোঁট চেপে ধরলো দিব্য। দোয়া সাথে সাথে হাত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। ছেড়ে দিলো দিব্য ও । দ্রুত বুকে থুথু দিলো দোয়া। ভয়ে আৎকে উঠেছে সে। ভয়ার্ত গলায় বললো দোয়া,
---- মানছি আমি সামান্য তর্ক করি তাই বলে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবেন? এতোটা নিষ্ঠুর আপনি আগে জানতাম না। ও বুঝেছি আমাকে তো আপনি পছন্দ করেন না। এখনো তাকেই ভালোবাসেন। সেই কারনে পথের কাটা দূর করতে চাচ্ছেন। মেরে ফেলতে চাচ্ছেন আমায়।
দিব্য বরাবরের মতোই বিরক্ত হলো। মেয়েটা এক লাইন বেশি বুঝে সবসময়। বন্দুকে গুলি নেই সে শুধু বন্দুকে থাকা জ্যাম ঠিক করছিলো। যেদিকে তাক করেছিলো দিব্য সেদিকেই দোয়া এসে সামনে দাঁড়ালো। বললো,
---- মেরে ফেলতে পারলে অন্তত শান্তি পেতাম।
কাঁটার মতো গলায় বিঁধে আছো তুমি। সবসময় অবুঝের মতো বিহেভিয়ার করো। সারাক্ষণই একই কথা। কি চাও তুমি? তোমার জন্য বাসায় এসেও এক মুহুর্ত শান্তি পাই না। আস্তো একটা ঝামেলা।
রেগে বললো দিব্য। দোয়া কষ্ট পেলো। এভাবে একদিন ও বলেনি দিব্য। রাগ জমলো মনে। চুপচাপ লাগেজ বের করে নিজের কিছু জামাকাপড় গুছাতে লাগলো। এই কয়েকমাসে বাবার বাড়িতে একবারের বেশি যেতে দেইনি দিব্য। নিজেও সবসময় এড়িয়ে চলেছে। দোয়া চঞ্চল স্বভাবের বলে মজার ছলে বলে কেবল, কষ্ট দিতে নয়। কিন্তু, দিব্য প্রতিদিনই তাকে অপমান করেছে।
রুম থেকে তাড়িয়ে ও দিয়েছে অনেকবার। সব হাসি মুখে মেনে নিয়েছে সে। কিন্তু আজ মেরে ফেলার কথা বলছে? সে মরলে শান্তি পাবে দিব্য তাহলে তার থাকা না থাকাতে দিব্যর কিছুই যায় আসে না। চলেই যাবে সে। ঠিক মরে গেলে যেমন মানুষ ফিরে আসে না তেমন ভাবে।
দিব্য কোনো রিয়াক্ট করলো না। চলে যাক মেয়েটা, গেলেই শান্তি পাবে দিব্য। নিজের রাগের কারনে শুধু বিয়েটা করেছে সে তাছাড়া তাদের মধ্যকার কোনো সম্পর্কই নেই। অফিস থেকে এসেই মেয়েটার বকবক শুনতে হয়। শুধু কথার কাজ করে। এভাবে যেতে বললে ওভাবে যাবে। শান্তশিষ্ট ভাবে না বাড়িটাকে মাথায় তুলে ফেলবে একদম। যা দিব্য একদম পছন্দ করে না। নিজের পড়াশোনা ফেলে রান্না ঘরে পাকনামি করে রান্না করতে যাবে তারপর দেখা যাবে হাত পুড়িয়ে ফেলেছে। একদিন তো নিজের উড়নাতেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলো। ফাইজা বেগম না দেখলে মেয়েটা তো পুড়তো সাথে তাদেরকে জেলে যেতে হতো। সবাই বলতো মেয়েটাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে মেয়ের শশুরবাড়ির লোকজন। বেজায় বিরক্ত দিব্য। আটকাতে ইচ্ছেই করছে না। সে তার কাজে মনোযোগ দিয়েছে।
অন্যদিকে দোয়া অভিমান করে রেডি হয়ে লাগেজ নিয়ে বের হয়ে যায়। একবার ফিরে ও তাকায়নি
দিব্য৷ তার শান্তি লাগছে অন্তত এখন তাকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না। আর না এটা সেটা করা থেকে বারণ করতে হবে ধমকাতে হবে।
ডয়িংরুমে আসতেই সামনে পড়লো ফাইজা বেগম
কে। জাহাঙ্গীর আহমেদ অফিসে, আসবেন তিনি একেবারে রাত্রে। দোয়েল শশুরবাড়িতে। বাড়িতে শুধু ফাইজা বেগম ও দিব্য আছে। দোয়া নিচু স্বরে বললো,
---- আম্মু আমি একটু বাবার বাড়িতে যাবো। তাদের কথা খুব মনে পড়ছে। আপনার ছেলেকে বলে আসছি। আসি আমি।
ফাইজা বেগম কি বলবেন বুঝে পেলেন না। মাত্রই তো কফি নিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। দশমিনিট ও হলো না বোধহয়। তিনি হতবাক হয়ে শুধালেন,
---- হঠাৎ কেন? তুমি না বললে আমরা বিকেলে ছাঁদে গল্প করবো। চুলে তেল দিয়ে দিবো তাহলে?
দোয়ার কান্না পেলো ভীষণ। জোরে কয়েকটা শ্বাস নিলো। অতঃপর জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললো,
---- আমার হঠাৎই খুব করে ইচ্ছে করছে আব্বু আম্মুর সাথে দেখা করতে। আমি যাই আম্মু?
বারণ করলেন না তিনি।
---- যাও। তাড়াতাড়ি চলে আসবে। দিব্য তো তোমায় যেতে দিতো না হঠাৎ ও অনুমতি দিলো?
দোয়া কথা বাড়ালো না দ্রুত বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোটা নোনাপানি গড়িয়ে পড়লো। আর আসবে না সে। কারোর গলগ্রহ হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই তার। তাকে নাকি মেরে ফেললে শান্তি পেতো।
রিকশা নিয়ে চললো বাবার বাড়ির দিকে। মনে মনে স্থির হলো আসবে না সে। এইটা আদোও কোনো সম্পর্কের মধ্যে পড়ে? প্রতিনিয়ত শুধু অপমান করে গিয়েছে দিব্য। আর না, এখানেই সব শেষ করা উচিত।
চোখের পানি মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো দোয়া। যে মানুষের মনে অন্য কেউ সেই মানুষের সাথে সারাজীবন থাকলে ও আপন হওয়া
যায় না। দিব্য মানুষটা ও এমনই৷ নয়তো লোকটা তাকে আটকাতে পারতো অন্তত। সে তো তার অনুপস্থিতিতেই শান্তি। থাকুক তাহলে আমিহীন সে।
ফাইজা বেগম শিড়ি দিয়ে উপরের দিকে যেতে নিলেন। মেয়েটার কিছু একটা হয়েছেই চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছেন তিনি। দিব্যর কাছে জানতে হবে।
রুমের সামনে দাঁড়িয়ে নক করলেন তিনি। দরজা ভেতর থেকে লক করা। দরজা খুললো না দিব্য।
জোরে ডাক দিলেন তিনি,
---- দিব্য এই দিব্য দরজাটা খোল বাবা। দোয়া কোথায় যাচ্ছে? কি হয়েছে আমায় বল প্লিজ?
দিব্য রুম অন্ধকার করে সিগারেট ধরিয়ে নিঃশব্দে
গিলে খাচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া। মায়ের কথা শুনে হাসে দিব্য। যে হাসিতে মিশে আছে না পাওয়ার বেদনা৷
কত সুন্দর করে বলছেন তিনি কি হয়েছে? সব শেষ করে দিয়েছেন ওনি। জানার প্রয়োজন আছে কি? নিজেই তো ফেঁসে যাবেন আবার। জবাব দেওয়ার চেষ্টা ও করলো না দিব্য।
ফের শুধালো ফাইজা বেগম। বললেন,
---- দিব্য আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি। দোয়া মন খারাপ করে চলে গেলো কেন?
ভেতর থেকে ভেসে এলো দিব্যর গম্ভীর কন্ঠস্বর।
---- আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি। আপনি অযথা টেনশন করবেন না। আমি একটু শান্তি চাই। প্লিজ লিভ মি এলন!
ওনার সন্দেহ সত্যি হলো তাদের মধ্যে হয়তো কিছু একটা হয়েছেই। কেউই তো কিছু বললো না। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন তিনি। কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারলেন না। ওরা যদি ভালো থাকতো তাহলে মেঘের প্রতি ও দিব্যর প্রতি করা অন্যায় কিছুটা লাঘব হতো। তা আর হচ্ছে কই?
____________________
----- ও বউ! এই বউ! রাগ করেছো?
দোয়েল রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় তাসিরের দিকে। দোয়েল কিটকিটে কন্ঠে বলে উঠলো,
---- একদম নাটক করবেন না নাটকবাজ কোথাকার। আর ভুলে ও বউ শব্দটা উচ্চারণ করবেন না। বিরক্ত লাগে একদম। আসছে রাগ করছো? না হাসছি আমি। রাগিয়ে দিয়ে নাটক করছে এখন৷
তাসির গোলাপের বুকে এনে দোয়েলের সামনে মেলে ধরলো হাঁটু মুড়ে। বললো,
---- সরি দোয়েলপাখি। আজ লাস্ট এক্সাম তো তাই
ভুলেই গিয়েছিলাম আজ তোমার বার্থ ডে। সবার আগে উইশ করবো, সারপ্রাইজ দিবো ভাবছিলাম কিন্তু, তা আর রইলো কই, শশুরের ঘরের বউ এসে আমার সারপ্রাইজ নষ্ট করে দিলো।
দোয়েল রাগ দেখালো। বললো,
---- বার্থডে কে বলছে পালন করতে? আপনি আমার শাড়ির একি অবস্থা করেছেন? মা আমায় কেবলই শাড়িটা পড়িয়ে দিলো।
তাসির শাড়ি নয় বরং শাড়ি পড়া রমনীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়ালই ছিলো না তার হাতে থাকা জুসের গ্লাসটা বেখেয়ালিতে দোয়েলের সাথেই ধাক্কা লেগে পড়ে যায় দোয়েলের শাড়ির উপর। মাত্রই এনে দিয়েছিলো তাসিরকে দোয়েল। কিন্তু, তাসির যেই না দোয়েল সামনে থেকে যেতে নিবে ওমনিতেই সামনে এসে দাঁড়ালো তাসির। দোয়েল তাসিরের বুকে এসে বারি খেলো। তারপরই চেচিয়ে উঠে দোয়েল। সরি বলার পর ও রাগ কমেনি দোয়েলের।
তাসির ভেবেছিলো বার্থ ডে উইশ করার জন্য মেয়েটা রেগে আছে। বোকা বনে গেলো সে। যেই মেয়ে তাকে পছন্দই করে না সে আবার রাগ করবে। কানে ধরে সরি বললো তাসির,
---- সরি বউ।
---- আপনার সরির গুষ্টি কিলাই। মা কত যত্ন করে শাড়িটা পড়িয়ে দিয়েছে আপনাকে দেখা....
দোয়েলের কথা থেমে গেলো। মুখ ফসকে সত্যি কথা বেরিয়ে গেলো। তাসির তাকিয়ে রইলো দোয়েলের দিকে ভ্রুঁ জোড়া নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- ডিয়ার বউজান আপনাকে দেখতে গিয়েই তো এমন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেললাম।
দোয়েল একপলক তাকালো অতঃপর দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করলো।
তাসির মাথা চুলকে হাসলো। মেয়েটা মনে মনে ঠিকই তাসির নামক পুরুষের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। শুধু উপরে উপরে রেগে ফায়ার হয়ে থাকে মেয়েটা।
__________________
---- আমি আপনাকে কখনোই ক্ষমা করবো না বোকা পুলিশ। আমাকে বাজে ভাবে ঠকালেন
আপনি। আমার জীবনটা শেষ করে দিলেন। কেন
করলেন আপনি? আর কখনোই ফিরবো না আমি আপনার নীড়ে। আপনি খুব খারাপ
---- দরজা খোল দোয়া। কি হয়েছে তোর হঠাৎ করে এলি তারপর সেই যে রুম বন্দি হলি খেয়ে তো
রেস্ট নে।
---- বলছি তো খাবো না। আমি ঠিক আছি। আমাকে বিরক্ত করবা না তো।
বাইরে থেকে ফাতেমা খানম আবারও বলেন,
---- কি হয়েছে বলবি তো, জামাইকে বলে আসছিস তো? হঠাৎ করে,
---- আমি কি এই বাড়িতে আসতে পারবো না?
এই কয়েক মাসেই আমি তোমাদের কাছে পর হয়ে গিয়েছি আমি? ঠিক আছে আমি চলে যাবো।
ফাতেমা খানম বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন,
---- আমি ওভাবে বলিনি। কেন রাগ করছিস বলতো? তোর মন খারাপ মায়ের কাছে শেয়ার করতে পারিস।
দোয়া তাচ্ছিল্যের হাসলো। শেয়ার করবে কিভাবে সে? তারাই তো জোর করে বিয়েটা দিলো। তার কি
এই বাড়িতে থাকা খাওয়ার অভাব পড়েছিলো?
সবে তো ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। পড়াশোনা করলেই তো হতো। আসার পর ফাতেমা খানম এর সাথে একটা বাক্য ও উচ্চারণ করেনি দোয়া। এড়িয়ে নিজের রুমে এসে সেই যে দরজা লক করেছে আর খোলেনি দরজা দোয়া। ফাতেমা খানম জোর করলেন না দোয়ার বাবা ফয়সাল সাহেব আসলেই দিব্যর সাথে কথা বলে জানতে পারবেন তিনি।
দোয়া নিজেকে গুটিয়ে নিলো একাকিত্বে। কারোর প্রতি না নিজের প্রতিই ভীষণ রাগ ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। নিজেকেই অসহ্য লাগছে। সে তো এমন মানুষ চাইনি। যে একজনকে মন প্রান দিয়ে ভালোবেসে অন্যজনকে বিয়ে করবে।
_____________________
একই প্লেটে শ্রাবণ নিজে খাচ্ছে মেঘকে ও খাইয়ে দিচ্ছে। জামিলা বেগম থাকলে হাসি মুখে নিজে ও তাদের সাথে খেতেন আর শ্রাবণ মেঘের মিষ্টি খুনসুটি পূর্ন সম্পর্ক দেখতেন। ভীষণ প্রিয় ওনার শ্রাবণ মেঘের জুটিটা। এই যে মাতৃত্বের সাধ তিনি পাননি এটা ওনাকে ভুলিয়ে দিয়েছে শ্রাবণ মেঘ। সারাক্ষণ সন্তানের মতো আবদার করবে। খারাপ থাকলে যত্ন করবে। কাজের মহিলা না মা কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না।
---- আমি অপেক্ষায় থাকবো তাড়াতাড়ি চলে আসবেন কিন্তু।
---- যেতেই ইচ্ছে করে না আবার মন খারাপ করছো?
মেঘ হাসলো। বললো,
---- সাবধানে যাবেন।
---- আসছি বাই।
মেঘের থেকে বিদায় নিয়ে শ্রাবণ বেরিয়ে গেলো।
মেঘ ফের একা হয়ে গেলো। মুখটা ভার করে দরজা লাগিয়ে দিলো। একা একা সময় কাটাতে হবে তার।
______________________
---- ভালো থাকতে চাইলেই কি ভালো থাকা যায়?
অনেক তো নিজেকে বুঝালাম, নিজের সাথে
জেদ ধরলাম, ভুলে থাকার চেষ্টা করলাম, কিন্তু, আমি সত্যিই ব্যর্থ! আমাকে মাফ করে দিও দোয়া।
আমি ভালো থাকতে চেয়ে থাকতে পারছি না ভালো । ভালো রাখতে পারছি না তোমায়। আমার জন্য তোমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেলো। কি করবো আমি? এতো বড়ো অপরাধ কি করে তোমার সাথে করতে পারলাম? আমার কি করা উচিত? ভালো থাকতে চাই আমি। সবাইকে ভালো রাখতে গিয়ে আজ নিজের ভালো থাকা নষ্ট হয়ে গেলো।
ফোন বাজছে দিব্যর। জানে সে কে কল করেছে। ধরতে ইচ্ছে করছে না দিব্যর। দোয়ার বাবা কল দিয়েছে। কি বলবে সে? বলার মতো কিছুই নেই।
ফোনটা অফ করে দিলো দিব্য৷
---- ফোন তো অফ বলছে। কি হলো তাদের মধ্যে?
আমার মেয়েটাকে কি তাহলে আমি ভুল মানুষের হাতে তুলে দিলাম? আমার কলিজার টুকরা মেয়েটা ভালো নেই কষ্ট পাচ্ছে। কি করবো আমি?
চলবে,,,,