#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৩১
#তাসনিম_লিজা
----কপি নিষিদ্ধ!
রাত হয়েছে ফয়সাল সাহেব দোয়ার রুমে এসে বারবার নক করছেন। ফাতেমা খানম সব জানিয়ে দিয়েছেন মেয়ের শশুর বাড়ি থেকে রাগ করে চলে আসার কথা ৷ অতঃপর সন্দেহ থেকে সত্যি হলো দিব্যর ফোন অফ করে ফেলাতে। বাবার কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে বসলো দোয়া। যাবে কি না ভাবছে সে। দরজার ওপাশ থেকে আবার ও ডাক দিলেন ফয়সাল সাহেব আদুরে স্বরে,
---- মামুনি দরজাটা খোল! বাবাকে বল মা কি হয়েছে তোর ? আব্বু! আমরা আজ একসাথে খাবো দরজাটা খোল।
দোয়া ডুকরে কেঁদে উঠলো। ভেতর থেকেই বললো,
---- তোমরা চলে যাও আমার খিদে নেই। আমি একা থাকতে চাই।
ফাতেমা খানম বলে উঠেন,
---- সেই কখন এসেছিস, ছয় সাত ঘন্টা হতে চললো। আরো একা থাকতে চাইছিস? আমাদের কে বল? আমাদের চিন্তা হচ্ছে তোর জন্য।
---- আমি ঠিক আছি আম্মু। শুধু শুধু চিন্তা করছো কেন তোমরা?
---- বাবার কথা শুনবি না মা ?
বাবার কথা শুনে জেদ ধরে বসে থাকতে পারলো না দোয়া। উঠে এসে দরজা খোলে দিলো সে।
ফয়সাল সাহেব তাকালেন মেয়ের দিকে, চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে। কাঁদছিলো তার একমাত্র আদরের রাজকন্যা। ফয়সাল সাহেবের রাগ হলো দিব্যর প্রতি। একজন পুলিশ অফিসার হয়ে তার মেয়ের সাথে নাহ! কি হয়েছে তা জানতে হবে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তিনি নরম স্বরে বলেন,
---- কি হয়েছে মামুনি ? আব্বুকে বল।
দোয়া সাহস করে শুধু বললো,
---- আমি আর ওই বাড়িতে যেতে চাই না আব্বু। তোমরা ও ওই বাড়ির কারোর সাথে সম্পর্ক রাখবা না৷ প্লিজ আমাকে কারন জিজ্ঞেস করো না। আমি
কিছুই বলতে পারবো না। আর না ওনাকে কিছু বলবা। আমার এক্সাম কিছুদিন পর আমি ভালোভাবে পড়তে চাই। আমাকে বিরক্ত করো না
তোমরা। খিদে লাগলে আমি খেয়ে নিবো। তবুও তোমরা এই বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলবা না প্লিজ!
ফের দরজা লাগিয়ে দিলো বাবা মায়ের মুুখের উপর। ফাতেমা খানম ও ফয়সাল সাহেব কিছুই বুঝলেন না। মেয়ে যে ওই বাড়িতে যাবে না সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরছেন। জোর করলেন না ওনারা। মেয়ে যা চাই তাই হবে। এমন ও হতে পারে রাগ ভাঙলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া দুইমাস এর বেশি হবে মেয়েকে দেখেন না। কতদিন পর এসেছে ওনার মেয়ে। থাকুক যতোদিন ইচ্ছে। এটা তো তারই বাড়ি।
ফিরে এলেন দুজনে। কারোর আর খাওয়া হলো না। মেয়ে না খেয়ে থাকলে বাবা মায়ের গলা দিয়ে৷ খাবার নামে? দুশ্চিন্তা কিছুটা রয়েই গেলো দুজনের মনের মধ্যে।
দোয়া সত্যিই বই নিয়ে পড়তে বসলো। পড়তে বসে ও শান্তি লাগাছে না তার। দিব্য মানুষটাকেই মনে পড়ছে বারবার। তার একটা কথায় কানে বাজছে মেরে ফেলতে পারলেই শান্তি পেতাম। হয়তো রাগের মাথায় বলেছে কিন্তু, যাকে বলেছে তার মনের যে কি অবস্থা হয়েছে তা একবার ও ভাবলো না দিব্য। সে তো সব মেনে নিয়েছিলো৷ ছোট্ট মনটা চেয়েছিলো সংসার করতে তার বোকা পুলিশের সাথে। সত্যিই তো বোকা পুলিশ সে । নয়তো প্রিয় মানুষকে এভাবে ছেড়ে দেয় কেউ ? নাকি ভালোবাসি না বলে থাকতে পারে? দোয়া ও তো ইচ্ছে করে বলতো না। মেঘের প্রতি এতোটাই মগ্ন থাকতো দিব্য দোয়াকে সবসময় এড়িয়ে যেতো অবহেলা করতো। দোয়ার উপস্থিতিতে দিব্য বিরক্ত হতো। তাইতো বাধ্য হয়ে বলতো মেঘকে নিয়ে। কেন সে মেঘকে এখনো ভুলতে পারছে না? বিয়েটা করলো কেন? তার জীবনটা নষ্ট করার জন্য? সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এভাবে সুন্দর জীবনটাকে তছনছ করে দিলো দিব্য? দোয়া তো তার জীবন বাঁচিয়েছিলো আর দিব্য দোয়ার জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে জীবন নেওয়ার খেলায় মেতেছে৷
পড়তে বসে ও শান্তি লাগলো না দোয়ার । বিছানায় এসে শুইয়ে পড়লো সে। নয়তো মাথা থেকে ওই তিক্ত বাক্যটা সরে যাবে না। আর না হাজারো জল্পনা কল্পনা বন্ধ হবে।
_________________
---- এই যে স্যার! আপনি কি আজ বাসায় আসতে ভুলে গিয়েছেন? না মানে বাসা কি আজ অফিসেই নিয়ে গিয়েছেন?
শ্রাবণ শব্দহীন হাসলো। বউ যে তার বেজায় রেগে আছে বেশ বুঝতে পেরেছে শ্রাবণ। রাত দশটা বাজে। সে কেবলই বের হয়েছে বাসায় আসার জন্য। শ্রাবণ মৃদুস্বরে বললো,
---- বউ কি বেশি রাগ করেছে? আর এভাবে কথা বলছো কেন? আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না বুঝি?
মেঘ নিজেকে সামলে নিলো। কন্ঠটা কাঠিন্যে করে বললো,
---- না বরং আপনি না আসলে খুশি হবো। থাকুন আপনি আপনার অফিস নিয়ে। টাকা রোজগার করুন বউয়ের কথা শুনে কি করবেন আপনি? আমি এভাবেই কথা বলবো।
---- ঠিকই বলেছো বউ। আমি অফিসেই থাকবো আজ। টাকাই তো দরকার। নয়তো আমার ছেলের কষ্ট হবে না? তার জীবনটা সুন্দর করতে হবে তো।
মেঘ রেগে গিয়েছিলো প্রথমে পরোক্ষণে অবাক হলো। ছেলে আসলো কোথা থেকে? শ্রাবণ তো ছেলে আসার আগে ছেলের ফিউচার নিয়ে বেশ পসেসিভ। হাসি পেলো মেঘের। বললো,
---- আপনি বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন। বাড়িতে আসুন আমার ভালো লাগছে না একা একা। ভয় লাগছে। শরীরটা ও খারাপ লাগছে। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে।
শ্রাবণ বাইক চালাচ্ছে। কথা ও বলছে মেঘের সাথে। শ্রাবণ ও চিন্তিত হলো কিছুটা বললো,
---- বাড়াবাড়ি নয় ম্যাডাম এটাই সত্যি। আমি চলে আসছি। দশমিনিট সময় দাও। তুমি রেস্ট নাও আমি এসেই পড়েছি। ভয় পাওয়ার কিছুই নেই৷
অবাক হলো মেঘ। বললো,
---- আপনি রাস্তায় বাইক চালিয়ে কথা বলছেন?
---- হ্যা না মানে...
---- সত্যিই বড্ড বাড়াবাড়ি করেছেন আপনি। কতবার আপনাকে বারণ করবো আমি? নিজের কথা না ভাবুন আমার কথা ভেবে অন্তত নিজেকে পরিবর্তন করুন। আপনার যেমন ভালো দিক আছে সবচেয়ে ভালো, তেমন এই সবচেয়ে বেশি খারাপ দিকটা আমাকে শান্তি দেয় না। চিন্তা হয় কেন বুঝতেছেন না আপনি আর কতবার বলবো?
রাখছি ফোন।
কল কেটে দিলো মেঘ। শ্রাবণ নিজের উপরই বিরক্ত হলো। কেন যে মেয়েটাকে বলতে গেলো সময়ের কথা কলটা কেটে দিলো। বাইক চালাতে মনোনিবেশ করলো শ্রাবণ। দুপুরে তো ঠিক ছিলো
মেয়েটা। হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করছে। ফাস্ট চালালো শ্রাবণ।
রেগে বসে পড়লো মেঘ। শ্রাবণ অতিরিক্ত করছে৷
যেগুলো করলে নিজের বিপদ আসতে পারে৷ সেগুলোই করবে এই ছেলেটা। মেঘের ভয় হয়,
বাইক চালাতে চালাতে কথা বলছে শ্রাবণ। কতশত গাড়ি চলে রাস্তায় বেখেয়ালিতে যদি অঘটন ঘটে যায় তাহলে মেঘের কি হবে? ভাবতেই গা শিউরে ওঠে মেঘের আসুক আজ হাজারবার বলার পরও একই ভুল করে শ্রাবণ। না রিসিভ করলেই তো হয়।
নিজেরই ভালে লাগে না সাথে শ্রাবণ ও টেনশন দেয়। বেশিই রাগ লাগছে শ্রাবণের প্রতি।
__________________
---- রাতুল, রিফাত রামিম তোরাই ভালো আছিস। আমি কেন যে বিয়ে করতে গেলাম নিজে ও জানি না। সব ভালোবাসা জীবনকে সুন্দর করে তুলে না,
কিছু ভালোবাসা পাগল ও বানিয়ে দেয়। আমি হলাম সেই পাগল। মেয়েটা আমায় এতোদিনেও বুঝলো না। বউয়ের পাশে ঘুমানোর সময়ে ঘুমোতে হয়, ফ্লোরে সোফার পাশে, ড্রেসিং টেবিলের পাশে কি কপাল তোর তাসির। বাহবা দেওয়া উচিত তোকে। নোবেল পুরষ্কার পাবি কিছুদিন পর।
---- কি বিরবির করছেন তখন থেকে? ঘুমোচ্ছেন না কেন?
দোয়েল বিছানর একপাশে শুইয়ে তাসিরকে পর্যবেক্ষণ করছিলো ৷ তাসিরের ঠোঁট নড়ছিলো কিন্তু, শব্দ করছে না। তাসির সোজা থেকে কাত হয়ে শুই দোয়েলের দিকে তাকিয়ে মুখটাকে অসহায় করে বললো ,
---- মনের কষ্টটা নিজের সাথেই শেয়ার করছি। আর ঘুম? ঘুমেরই তো ঘুম নেই আমার ঘুম আসবে কোথা থেকে?
দোয়েলের হাসি পাচ্ছে তাসিরের কথা শুনে বললো,
---- মন আর মানুষটা তো একি তাহলে কিসের শেয়ার? মাথায় সমস্যা হলো না তো আপনার ?
তাসির হাহুতাশ করে বললো,
---- পাগল তো আপনার জন্য হয়েছিলাম দোয়েলপাখি। বাট, মাথায় সমস্যা না, মনে সমস্যা। মন সারাক্ষণ শুধু আপনি আপনি করে।
দোয়েল হাসি দিলো। বললো,
---- খুব শখ না আমাকে আপনার বাড়িতে আনার এখন এনে আফসোস হচ্ছে বুঝি?
তাসির বুকের বা পাশে হাত রেখে হেসে বললো,
---- আফসোস নয় দোয়েলপাখি শান্তি লাগছে আমার এইখানে । নয়তো, এতদিন কতবার যে শশুর বাড়িতে যেতে হতো নির্লজ্জের মতো কে জানে? চোখের শান্তি আপনি, মনের শান্তি আপনি তাহলে কেন আপনি দূূরে থাকলে আমি আফসোস করবো বলুন তো?
দোয়েল স্বাভাবিক ভাবে বললো,
---- কিন্তু, আমি তো আপনাকে শান্তি দিচ্ছিই না। প্রতিশোধ নিচ্ছি কেবল । হাসবেন্ড হওয়ার পর ও আপনি প্রতিদিন আমার থেকে শুধু মানসিক টর্চার পাচ্ছেন। এখানে আমি তো শান্তির শা ও দেখছি না। শান্তিটা কোথায়?
---- ভালোবাসলে এসব টর্চার কিছুই না দোয়েলপাখি। এসব হলো সম্পর্কের প্রথম ধাপ। এমনই হয় বুঝলে?
---- কষ্ট হচ্ছে না নিচে ঘুমোতে? বাবা মা জানলে আমায় কথা শুনাবে নিশ্চয়ই। তাদের আদরের দুলাল কত কষ্ট করে নিচে ঘুমাচ্ছে।
তাসিরের ঝটপট উত্তর,
---- না বললেই তো হয়।
দোয়েল বিছানার একপাশে সরে গেলো তারপর বললো,
---- থাক! আপনার আর কষ্ট করতে হবে না। বিছানায় চলে আসুন। অনেক তো কষ্ট করলেন আমার জন্য। আর কষ্ট করতে হবে না।
বলতে দেরি হলে ও আসতে দেরি হলো না তাসিররে। নিষ্ঠুর রমনীর তাহলে অসহায় তাসিরের প্রতি দয়া হলো। এক লাফে দোয়েলের কাছে চলে আসলো। দূরত্ব বলতে কিছুই রইলো না। দোয়েল সাথে সাথে বলে উঠলো,
---- দূরে যান আরো।
তাসির দুষ্টুমি করে বললো,
---- কাছে আসি?
বুকে ধাক্কা মারলো দোয়েল। বললো,
---- আমার ভুল হয়েছে আপনাকে বিছানায় আসতে বলা। আমার তো মনেই ছিলো না ওনাকে বসতে বললে ওনি শুতে চাই অবস্থা।
বলেই কোলববালিশটা মধ্যে রেখে দিলো। তাসির আফসোস করে বললো,
---- বাবা তো এতো সুন্দর বেড টা বানিয়েছিলো আমি আর আমার বউ থাকার জন্য। কোলবালিশ কেন? থার্ড পার্সন আসলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
এমনিতেই আমাদের মধ্যে সম্পর্কই সৃষ্টি হলো না তার আগেই থার্ড পার্সন চলে আসলো? এটা মানি না আমি৷
দোয়েল কটমট দৃষ্টিতে তাকায় তাসিরের দিকে। তাসির সিরিয়াস ভঙ্গিতেই বললো কথাগুলো।
---- আমি ঠিকই তো বলেছি দোয়েলপাখি।
দোয়েল বললো,
---- এই কোলবালিশই আপনার সাথে ছিলো আমি না সো এটা নিয়েই থাকুন আমাকে ঘুমোতে দিন।
মাথা অব্দি চাদর টেনে নিলো দোয়েল। তাসির সেই দিকে তাকিয়েই মৃদু হাসলো। সে ও ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। নয়তে কথা বাড়বে শুধু শুধু। দোয়েল ঘুমোক তাতেই শান্তি।
_________________
শ্রাবণ সেই কখন থেকে কলিংবেল বাজিয়েই চলছে মেঘ দরজা খুলছেই না। এখন ঘুুমাবার তো কথা না। রাগ করলো না তো আবার মেয়েটা? নিজের কাছে ও তো আজ একস্ট্রা চাবি নেই এখন উপায়?
কল দিলো শ্রাবণ মেঘের ফোনে। বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে ফোনে রিংটোন এর শব্দ কিন্তু, মেঘ কোথায়? এতো শব্দ কি মেয়য়েটার কানে যায় নি? কতক্ষণই বা হলো টেনশনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে শ্রাবণের। মেয়েটা ঠিক আছে তো? বলছিলো তো খারাপ লাগছে। অস্থিরতায় শরীর ও সায় দিচ্ছে না। পাঁচ মিনিট হতে চললো এখনো দরজা খুলছে না। ভাঙার মতো অবস্থা ও না দরজাটার। এদিকে তিনতলায় শুধু তাদেরই ফ্ল্যাট।
শ্রাবণের ইচ্ছে করছে দরজাটা ভেঙে ফেলতে। যাচ্ছিলো কেবল লাথি মারতে রেগে ওমনি৷ মেঘ দরজা খুলে দিলো। শ্রাবণ রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় মেঘের দিকে। ভয়ে তার আত্মা বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছিলো শ্রাবণের। রেগে থাপ্পড় মারতে নিতে গিয়ে হাত তুলে ও মারলো না সে। ভয়ে মেঘ হাত দিয়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করছিলো।
শ্রাবণ চিৎকার করে বললো,
---- কি শান্তি পেয়েছো আমায় টেনশনে ফেলে?
সেই কখন থেকে বেল বাজিয়েই চলেছি কোথায় ছিলে তুমি? আমাকে কি তোমার মানুষ মনে হয় না? মের ফেলতে চাও?
মেঘ চুপ করে রইলো। হাসি মুখটা নিমিষেই অভিমানের চাদরে মুড়িয়ে গেলো মেঘের। ফ্যাল
ফ্যাল করে তাকিয়ে হঠাৎই ডলে পড়লো ফ্লোরে।
শ্রাবণের রাগান্বিত দৃষ্টি মুহুর্তের মধ্যে শীতল হয়ে এলো। ভয় জন্ম নিলো। দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে মেঘকে কোলে তুলে নিলো। মেঘের শরীরটা বড্ড গরম। জ্বর আসলো না তো আবার? এজন্যই এতো তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিলো মেয়েটা ?
---- মেঘ কি হলো তোমার? এই মেঘ? চোখ খুলো। সরি আমি রেগে বলে ফেলেছি। মেঘ!
স্যুটটা খুলে ফেললো দ্রুত কোলে তুলে রুমে নিয়ে আসলো শ্রাবণ। হয়তো চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়েছিলো মেঘ। ফের শ্রাবণ তাড়াহুড়ো করে পানি আনলো। মুখে দিতে লাগলো পানি। না মেঘ চোখ খুলছে না তো। শ্রাবণ ভয়টা আরো জোরালো হলো। কি করবে বুঝতে পারলো না। মেঘকে ডাকতে লাগলো। গাল চাপড়ালো কিছুই হলো না।
চোখে পানি এসে গেলো শ্রাবণের। মেঘের কি হলো হঠাৎ ? উপায়ান্তর না পেয়ে গাড়ির চাবিটা নিয়ে মেঘকে কোলে তুলে লিফ্টে উঠলো। নিচে এসে পার্কিং লটে এসে নিজের গাড়িতে শুইয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে লাগলো। হসপিটালে নিতে হবে। রাস্তায় জ্যাম আর শ্রাবণের অস্থিরতা যেনো
তাকে ধৈর্য্যের পরীক্ষায় ফেলেছে। শ্রাবণ সব পেরিয়ে নিজেকে সামলে চললো সেই হসপিটাল নামক গন্তব্যে। বারবার পিছনে তাকাচ্ছে শ্রাবণ। মেঘের জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষনই দেখছে না সে।
শ্রাবণের সেই দীর্ঘ সময়ের রাস্তার ইতি টানলো হসপিটালের সামনে এসে। ফের সব ফেলে কোলে তুলে নিলো মেঘকে। ছুটলো হসপিটালের ভেতরে।
হঠাৎ নার্সের সাথে দেখা স্ট্রেচারে করে নার্সের সাহায্য নিয়ে গেলো কেবিনে। ডক্টরকে ডাকা হলে তিনি চেকআপ করে কিছু টেস্ট করতে বলেন। নার্সরা টেস্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেঘকে স্যালাইন দেওয়া হলো। অক্সিজেন মাস্ক পড়ানো হয়েছে। শ্রাবণে বাইরে থেকে ছোট্ট গোলক আয়না দিয়ে দেখছে তার মেঘফুলকে। হাত পা কাঁপুনি কমছেই না শ্রাবণের। মেঘ তো ভালোই ছিলো হঠাৎ এমন হবে কে জানতো? ডক্টর বের হতেই অস্থির চিত্তে বলে উঠলো শ্রাবণ,
---- ডক্টর আমার ওয়াইফের কি হয়েছে? ও ঠিক আছে তো?
ডক্টর স্বাভাবিক ভাবে বললো,
---- এখন আপাতত ঠিক আছে। শরীরটা দুর্বল ছিলো। তাছাড়া আমরা কিছু টেস্ট করতে দিয়েছি।
রিপোর্ট না আসা অব্দি কিছুই বলতে পারছি না।
ওয়েট করুন প্লিজ।
---- হুম!
অনেকগুলো টেস্ট করানো হলো। অপেক্ষারত শ্রাবণ কাউকে বলতেই ভুলে গিয়েছে। এতো রাতে কাকেই বা বলবে সে? আগে জানুক কি হয়েছে তারপর। উঁকি দিলো আবার মেঘের কেবিনের সামনে। নার্স যেতে বারণ করেছে। সময় হলে তারাই বলবে। ইমারজেন্সি বিদায় রিপোর্ট সাথে সাথেই দেওয়া হলো। একজন নার্স দ্রুত ডক্টরের নিকট নিয়ে আসলেন রিপোর্ট গুলো। শ্রাবণকে ডাকা হলো ডক্টরের চেম্বারে।
শ্রাবণের ভীত চাহনি ডক্টরের মুখের দিকে। রিপোর্ট চেইক করে ডক্টর প্রথমেই মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো,
---- কংগ্র্যাচুলেশন মিস্টার আপনি বাবা হতে চলেছেন।
শ্রাবণের বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে তাকায় ডক্টরের দিকে। আনন্দে তার চেহেরা উজ্জল হয়ে উঠলো।
---- সত্যি?
ডক্টর ফের বললো,
---- শুধু বাবা না মিস্টার আপনি জমজ সন্তানের বাবা হতে চলেছেন।
শ্রাবণ যেনো আরেক দফায় অবাক হলো।
---- আমি বাবা হবো ডক্টর? তাও দুজনের। সত্যি বলছেন আপনি?
এক মুহূর্তের জন্য শ্রাবণের মনে হলো, পৃথিবীর সব সুখ যেন একসাথে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে বাবা হতে চলেছে, তাও আবার দুই সন্তানের।
কিন্তু, পরের মুহূর্তেই ডাক্তারের গম্ভীর মুখ দেখে শ্রাবণের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। ডক্টর বললো,
---- তবে একটা বিষয় আছে, যা আপনাকে জানাতেই হবে এই আনন্দের মুহুর্তে। পরীক্ষায় আমরা মেঘের পালমোনারি হাইপারটেনশন শনাক্ত করেছি। এই রোগে ফুসফুসের রক্তনালীগুলোতে চাপ অনেক বেশি থাকে।
শ্রাবণ চিন্তিত হয়ে শুধালো,
---- এটা কি খুব খারাপ কিছু, ডাক্তার?
---- রোগটা জটিল। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায়। আর জমজ সন্তান হওয়ায় শরীরের ওপর চাপ আরও বেশি পড়বে। তাই পুরো সময়টা খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে আপনার ওয়াইফকে। প্রসবের সময় ঝুঁকিও সাধারণের চেয়ে বেশি থাকে। লাইফ রিস্কের সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্রাবণের হাত কাঁপতে লাগলো। কিছুক্ষণ আগেও যে খবর তাকে আকাশছোঁয়া আনন্দ দিয়েছিল, সেই খবরের সাথেই এখন জড়িয়ে গেছে গভীর ভয়, আতংক।
শ্রাবনের ঠোঁট থেকে শুধু একটি কথাই বের হলো,
---- ডক্টর বলুন কি করলে ওর কোনো সমস্যা হবে না আমি সেটাই করবো। আচ্ছা বাচ্চা না নিলে সমস্যা হবে? আমার সন্তানের প্রয়োজন নেই। আমার ওয়াইফ যেনো ঠিক থাকে।
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,
---- আপনার ওয়াইফ টু মান্স প্রেগন্যান্ট। সেখানে এভশন করাটা রিস্ক হবে। আর মায়ের ক্ষেত্রে তো জটিল হবে বিষয়টা। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো । তবে আপনাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো সহজ পথ নেই। আবার ভয় ও নেই সুন্দর সহজ ও সতর্কতার সাথে সময়টা পাড় করতে হবে। ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা সবকিছু ফলো করবেন।
শ্রাবণ শুধু মাথা নাড়ালো। মেঘের কিছু না হয় যেনো। মেঘকে কি সামলাবে নিজেকেই তো সামলাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে শ্রাবণের।
কেবিনের সামনে চেয়ারে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলো শ্রাবণ। মেঘের চিন্তা তার মাথায় এমন ভাবে গেঁথে গিয়েছে যে তার চারদিকে কি হচ্ছে খেয়ালই নেই। সন্তানের বাবা হওয়ার আনন্দে হাসবে নাকি তাদের হারনোর ভয়ে কাঁদবে সব শ্রাবণকে অদ্ভুত ভাবনায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। নার্স এসে সেই কখন থেকে ডাকছে।
---- হ্যালো মিস্টার আপনার ওয়াইফের সাথে দেখা করতে পারেন।
---- এই যে শুনছেন?
শ্রাবণ চমকে ওঠে।
---- আপনার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরেছে দেখা করতে পারবেন এখন।
শ্রাবণ একমুহূর্ত ও দেরি করলো না ভেতরে চলে গেলো। মেঘ আধখোলা চোখে তাকিয়ে আছে। শ্রাবণকে দেখে হাত বাড়াতে চাইলো। শ্রাবণ হাত ছুঁইয়ে দিলো সাথে সাথে। মেঘ ধীর গলায় বললো,
---- হঠাৎ মাথাটা ঘুরছিলো। তাই ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গিয়েছিলাম। আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না। আমার তো আপনাকে নিয়ে ভয় হয়। আমি তো আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।
শ্রাবণ মেঘের মাথায় হাত বুলালো। কপালে চুমু খেলো। অতঃপর বারন করলো,
---- এখন এতো কথা বলতে হবে না। চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকো। আমি তোমার পাশেই আছি। চোখ বন্ধ করো।
মেঘ ফের বললো,
---- আপনি খাবেন না? আর আমাকে হসপিটালে আনতে হলো কেন?
শ্রাবণ উল্টো রাগ করলো। বললো,
---- কতবার বলেছি আমার দেরি হলে খেয়ে নিবে। না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ হয় জানো না?
কেন করো এমন? শরীর ঠিক না থাকলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে কিভাবে?
মেঘ ম্লান হাসলো। বললো,
---- আপনাকে ছাড়া একা একা খেতে ইচ্ছে করে না। আপনিই তো অভ্যাস করিয়েছেন। আমার কি হয়েছে বলুন তো? একেবারে হসপিটালে চলে আসতে হলো যে?
মেঘের কথা শুনে ও না শুনার মতো করে বললো,
---- ঘুমোতে বলছি। এই সময় এতো কথা বলতে হয় না। এতো কিছু না ভেবে ঘুমাও। আমি পাশে আছি।
মেঘ কথা শুনলো। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। শরীর ক্লান্ত ও মেডিসিনের কারনে শরীর খানিকক্ষণের মধ্যে ঘুমে তলিয়ে গেলো।
শ্রাবণ মেঘের চুলের ভাঁজে হাত বুলাতে লাগলো। তার ঘুম তো হারাম করে দিয়েছে ডক্টরের বলা কথাগুলো। তার মেঘের যেনো কিছু না হয় এটাই উপরওয়ালার কাছে দোয়া করছে শ্রাবণ।
___________________
সকাল হতেই মেঘকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হলো।
শ্রাবণ মেঘকে নিয়ে বাসায় আসলো সকাল দশটা বাজে। রাত থেকে এই অব্দি এক গ্লাস পানি ও খায়নি টেনশনের কারনে।
কাউকে জানায়নি শ্রাবণ। বাসায় আসার পর জাহিদ আহমেদকে আসতে বলে তাসিরকে কল করে বিষয়টা জানাতেই তাসির কল রেখে দোয়েলকে সব খুলে বলে। দোয়েল খুশি হয় সাথে টেনশন ও হয়। রেডি হয় দ্রুত মেঘের কাছে আসার জন্য।
মেঘ শ্রাবণের চিন্তিত মুখ দেখেও বুঝতে পারে না কি হয়েছে। নাকি তার বড়ো ধরনের কোনো রোগ হলো না তো আবার?
মেঘকে রেস্ট নিতে বলে ডয়িংরুমে এসেছিলো তাসিরকে কল করতে। শ্রাবণ মেঘকে দেখেই বলে উঠলো,
---- অসুস্থ শরীর নিয়ে এখানে আসার দরকারটা কি বলো তো? যাও রুমে যাও। আমি আসছি।
মেঘ বিরক্ত হলো। রাত থেকে ছেলেটা তার উপর একপ্রকার টর্চার করছে। নিজের অবস্থা ও খারাপ করে ফেলেছে। খাওয়াদাওয়া ভুলে বসেছে। ছন্নছাড়া লাগছে শ্রাবণকে আজ। মেঘ গেলো না সোফায় এসে বসলো। বললো,
---- সামান্য অসুস্থ হয়েছি তাই বলে এতো টর্চার করছেন কেন? আমি কি মরে যাবো নাকি হাঁটাচলা করলে?
আজব তো,
---- বাজে কথা না বলে রুমে যাও। বিকেলে বাবা আসবে। আমি দেখছি জামিলা আন্টি আসবে কি না।
---- ওনি তো অসুস্থ।
---- বলছিলো তো আসবে। তোমার পাশে সবচেয়ে বেশি জামিলা আন্টির থাকাটা প্রয়োজন।
মেঘ ফের বললো,
---- আমি ঠিক আছি তো। ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি আছেন তো আমার কোনো ভয় নেই। মানুষ অসুস্থ হতেই পারে তাই বলে এতো কেয়ার?
শ্রাবণ মেঘের সামনে হাঁটু মুড়ে বসলো। বিরক্তিতে মেঘের কপাল কুঁচকে আসে। শ্রাবণ মৃদু হেসে দুই গালে হাত রেখে বললো,
---- তুমি ঠিক আছো কি নেই সেটা আমি জানি মেঘফুল। সময় হোক সবটা জানতে পারবে। শুধু একটু
ধৈর্য্য ধরো ব্যাস!
---- কি জানতে পারবো? এখন বলুন।
চলবে,,,,,,,,