ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

৩৩তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৩৩

#তাসনিম_লিজা

---- কপি নিষিদ্ধ!

---- দোয়া আহমেদ কে প্রিন্সিপাল স্যার ডেকেছেন।

কথাটা বলে পিয়ন চলে গেলেন নিজ কাজে।

দোয়া, ইভা একে অপরের দিকে তাকালো। ইভা বললো,

---- দেখে আয় স্যার কেন ডেকেছেন।

দোয়া ক্লাস টিচারের দিকে এগিয়ে গেলো। অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেলো ক্লাস থেকে। কী বলতে পারেন স্যার?

---- আসবো স্যার?

---- এসো দোয়া।

দোয়া চুপচাপ ভেতরে এসে প্রিন্সিপাল স্যারের সামনে দাঁড়ালো। মৃদুস্বরে বললো,

---- আমায় কেন ডেকেছেন স্যার?

প্রিন্সিপাল স্যার বললেন,

---- তোমাকে আসার পথে একটি ছেলে ডিস্টার্ব করেছিল। তোমাকে এখন থানায় গিয়ে শুধু হ্যাঁ বলতে হবে। পিয়ন আরিফের সাথে থানায় যেতে হবে তোমাকে।

দোয়া থ হয়ে রইলো। অবাক হয়ে বললো,

---- আ-আমি যাবো থানায়? সরি স্যার, আমি যাবো না। আর আমি ছেলেটিকে বুঝিয়ে বলে দিয়েছি, আর ডিস্টার্ব করবে না আমাকে।

প্রিন্সিপাল স্যার শান্ত স্বরে বললেন,

---- দেখো দোয়া, তুমি না যেতে চাইলে তোমার হাসবেন্ড ইন্সপেক্টর দিব্য আহমেদ ছেলেটাকে বাঁচতে দেবে না। এমনিতেই অনেক মারধর করা হয়েছে। আর ছেলেটাও তো তোমার ক্লাসমেট। কলেজ থেকে বের করতে আমার কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু ছেলেটা বেঁচে থাকুক, নিজেকে শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ পাক এটাই চাচ্ছি।

দিব্যর কাজ বলেই তো তার মুখোমুখি হতে চাচ্ছে না দোয়া। স্যারের মুখের উপরও না বলতে পারছে না দোয়া। আর না পার্সোনাল বিষয়ে কোনো কথা, দোটানায় পড়ে হাসফাঁস করতে লাগলো। বললো,

---- আমি যেতে পারবো না স্যার। আপনি কল দিন, আমি বলে দিচ্ছি। তবুও প্লিজ আমায় যেতে বলবেন না থানায়।

---- কিন্তু, তোমার হাসবেন্ড তো যেতে বলেছে। আর যেতে প্রবলেম কোথায়? আপন তো তোমার ক্লাসমেট, হয়তো ভুল করে ডিস্টার্ব করেছে। তার মা-বাবা এসে বসে আছে নিচে, দেখো।

দোয়েল বারান্দা দিয়ে তাকালো নিচে। বকুল গাছের নিচে দুজন চিন্তিত মুখে বসে আছেন। দোয়ার ইচ্ছেই করছে না দিব্যর সামনে যাওয়ার। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? আর কেনই বা দিব্য এত কিছু নজর রাখছে? কে বলেছে? একদিনেই এতো নাটক?

---- আরিফ আসছে, যাও দোয়া।

দোয়া না করার সুযোগ পেলো না। তাকে বাধ্য হয়ে স্যারের অনুরোধে যেতে হলো পিয়নের সাথে। পুরোটা রাস্তা ভাবতে ভাবতে গিয়েছে দোয়া , দিব্য যেন তার সামনে না আসে। হতে চায় না তার মুখোমুখি।

---- আমরা চলে এসেছি।

চমকালো দোয়া। নামলো গাড়ি থেকে থানার সামনে। ভেতরে আসলো দুজনে। থানার ভেতরে আসতেই প্রথমে দিব্যর দেখা মিললো। দোয়া চোখ ফিরিয়ে নিলো দিব্যর থেকে। অন্যদিকে তাকিয়ে পিয়ন আরিফকে বললো,

---- আমি আপনকে মাফ করে দিয়েছি আমার কোনো সমস্যা নেই। ওনাকে বলুন কী বলতে হবে।

তার আগে দিব্য বলে উঠলো,

---- আরিফ ভাই, আপনি চলে যান। মিসেস আহমেদ, আপনি বসুন।

দোয়ার রাগ হলো। সাথে সাথে বলে উঠলো,

---- মিসেস নয়, বলুন মিস দোয়া রাহমান। আমাকে কী করতে হবে বলুন, আমার তাড়া আছে।

দিব্য গম্ভীর স্বরে বললো,

---- বসুন।

শব্দ করে বসলো দোয়া। দিব্য বুঝতে পারলো দোয়ার রাগ। দোয়া ফের বললো,

---- দ্রুত বলুন।

আরিফ চলে যায়। দোয়া হাসফাঁস করছে রেগে।

দিব্য একজন কনস্টেবলকে বললো,

---- আসাদ ভাই, থানার পাশে যে রেস্টুরেন্ট আছে, সেখান থেকে এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসুন তো।

আসাদ আহমেদ চলে গেলেন বাহিরে। দোয়া মাথা ঘামালো না। সে ফের তাড়া দিলো। বললো,

---- প্লিজ আমাকে যেতে হবে। কী বলতে হবে বলুন।

---- সরি বলুন।

দিব্যর এমন কথায় তেতে উঠলো দোয়া। অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,

---- মানে?

দিব্য চেয়ারে হেলান দিলো আয়েশ করে। এই মুহূর্তে কেউ নেই আশেপাশে। বললো,

---- কালকের করা ভুলের কারণে সরি বলবে, দেন বাসায় যাবে আমার সাথে। নয়তো ওই যে জেলের মধ্যে ছেলেটাকে দেখছো না? ওর লাইফ শেষ। তোমায় ডিস্টার্ব করেছে না, আমি ওর লাইফ থেকে সেই ডিস্টার্বনেসটাই মুছে দেবো আমি ।

ওঠে দাঁড়ালো দোয়া। রেগে বললো,

---- না, আমি আপনাকে সরি বলবো, আর না আমি বলেছি এই ছেলেকে থানায় নিয়ে আসতে। এত আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। আর কী বললেন, সরি? জীবনেও না। নিজে অন্যায় করেছেন সরি নিজে না বলে আমায় বলছেন? আমি ওই বাড়িতে কখনোই ফিরবো না। আপনি থাকুন আপনার জীবন ও অতীত নিয়ে, আমাকে বিরক্ত করছেন কেন?

---- বউ তো, তাই। পরনারীকে তো আর বিরক্ত করছি না। নয়তো ছেলেটার জায়গাতে আমিও থাকতে পারতাম।

---- চোরের মায়ের বড় গলা। আমি যাচ্ছি, আপনার যা ইচ্ছে করুন। আমার দেখা কোনো ইচ্ছে নেই।

দোয়া যেতে নিলে পেছন থেকে রিল্যাক্সে বসে থাকা দিব্য বলে উঠলো,

---- ছেলেটার কী হতে পারে, ভেবে দেখেছো? পরে কিন্তু পস্তাতে হবে।

দোয়া চরম বিরক্ত হলো। আপন ছেলেটা তার ক্লাসমেট। তাকে পছন্দ করতো ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে থেকেই। দোয়ার বিয়ে হয়েছে জেনেও মেয়েটাকে দেখলেই কথা বলার তীব্র চেষ্টা করতো।

আজ দিব্যকে না দেখে সাহস করে কথা বলতে চেষ্টা করে এবং বিবেক দিয়ে না ভেবে আবেগের বসে মনের কথা বলে হাতে টাচ করে হাতজোড় করতে লাগলো আপন নামের ছেলেটা। দোয়া অবশ্য তৎক্ষণাৎ হাত ঝাড়ি মেরে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং বুঝিয়ে বলার পর চলে যায় আপন। কিন্তু, কেউ একজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরোটা পর্যবেক্ষণ করে, দেন প্রস্তুতি নিয়েছে, তা জানা ছিল না দোয়ার। এখন সবটা ক্লিয়ার। কিন্তু, আপন তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। এই ছেলেকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দোয়াকে ঘরে ফেরাবার পাঁয়তারা করছে দিব্য, দোয়া বুঝতে পারছে বেশ ভালো করেই।

হারলে চলবে না, যেতেই হবে তাকে। দোয়া ঘুরে দিব্যর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

---- পারলে মেরে ফেলুন। আই ডোন্ট কেয়ার, হুহ্!

দিব্যর ও নির্লিপ্ত কণ্ঠ,

---- ফাইন, তাহলে তাই হোক! মরে যাক, আই ডোন্ট কেয়ার!

কনস্টেবল! কনস্টেবল, ছেলেটাকে মারতে মারতে রক্তাক্ত করে ফেলো।

চমকালো দোয়া। ফের তাকালো জেলের শিকলে দাঁড়িয়ে থাকা ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে আপনের দিকে।

ছেলেটা ভয়ে মাথা নাড়ছে। হাতজোড় করছে দোয়ার কাছে। দোয়া ফেঁসে গেলো দিব্যর জালে। রেগে দিব্যর সামনে চেয়ার শব্দ করে সাথে থাকা ব্যাগটা রাখলো।

সে কোথায় আছে, তা ভুলে বসলো। দিব্যর দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো,

---- নিজেকে কী ভাবেন আপনি? চাইলেই মানুষ মেরে ফেলা যায়? আমি আপনার কাছে কেন, তার চেয়ে উপরমহলে কমপ্লেইন করবো। আমি অভিযোগ করিনি ছেলেটির বিরুদ্ধে, তাহলে কেন মারা হচ্ছে ছেলেটিকে?

এত দয়া আসছে কেন আপনার আমার প্রতি ? তাড়িয়ে দিয়ে শান্তি পাননি? আমি চলে এসেছি তো, আপনাকে মুক্তি দিয়ে। শুধু আইন মোতাবেক কাগজে-কলমে বিচ্ছেদ হলেই সব শেষ। তাও হয়ে যাবে, কিছুদিন অপেক্ষা করুন। তারপর থাকুন আপনি আপনার প্রাক্তনকে নিয়ে।

---- দোয়া!

---- চিৎকার করবেন না। ভুল কী বলেছি আমি?

আমার জীবন, আমি যেটা ভালো মনে করি সেটাই করবো। আমি আপনার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। এতে আপনিই খুশি হবেন। এত নাটক করে যাওয়ার কথা বলার প্রয়োজন নেই। ছেলেটাকে ছেড়ে দিন। আমি চলে যাচ্ছি।

---- আর এক পা ও সামনে যাবে না। খাবার আসছে, খেয়ে বাসায় যাবে আমার সাথে। তারপর শ্রাবণদের বাসায় যাবো দুজন একসাথে।

দোয়া হাসলো। বললো,

---- মনে পড়ছে আর পুড়ছে, ওসব বুঝি আমি। দিব্যও হাসলো। বললো,

---- পড়ছে, এটা স্বাভাবিক। সি ইজ মাই সিস্টার। আর পুড়ছে একজনের জন্য, সে বোঝে না।

---- গিরগিটি একটা।

---- আমি মানুষ দোয়া। সৃষ্টির সেরা জীব। আমার সাথে গিরগিটির তুলনা করছো?

---- আপনার সাথে না, আপনার স্বভাবের সাথে। আপনি মানুষটা মন্দ নন। তবে আপনার মনটা আমাকে বড্ড কষ্ট দেয়, যা আপনার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যাই হোক, ঝামেলা করবেন না। আমাকে আমার মতো বাঁচতে দিন।

---- আমার সাথে বাঁচতে পারবে না?

তীক্ষ্ণ চাহনি দোয়ার দিব্যর দিকে। দিব্য চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষায় আছে দোয়ার উত্তরের।

দোয়া নির্দ্বিধায় বলে উঠলো,

---- মারতে চাওয়া লোক বাঁচতে দেবে আমায়?

দিব্য উঠে দাঁড়ালো। কাউকে ফোন করে বললো,

---- আনতে হবে না, চলে আসুন।

ফের কাউকে ফোন দিলো। খানিকক্ষণ বাদে রিসিভ করে বললো,

---- স্যার, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। আমি বাসায় যেতে চাচ্ছি।

ওপাশ থেকে কী বলছে, কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

লোকটা দিব্যি ভালো আছে, তাহলে মিথ্যা বলছে কেন? হঠাৎ হাসি ফুটলো দিব্যর অধর কোণে।

---- ওকে স্যার!

ফের দোয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

---- সেটা বলা যাচ্ছে না, তবে ভালোবেসে আগলে রাখবো সারা জীবন।

দিব্য তৎক্ষণাৎ হাত ছুঁয়ে দিলো দোয়ার হাতের মুঠোয়। শক্তপোক্তভাবে ধরলো। অতঃপর জেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলকে বললো,

---- ছেড়ে দিন ছেলেটাকে।

---- ওকে স্যার।

আপনকে ছেড়ে দিতেই আপন দৌড়ে চলে গেলো। ভয় পেয়েছে অনেক। মারেনি তেমন ভয় দেখিয়েছে শুধু।

ছোট তো বুঝতে পারেনি।

তার মধ্যে হাত ছুটাতে ব্যস্ত হলো দোয়া। বললো,

---- আমার হাত ছাড়ুন। আপনার ভালোবাসার মানুষ আছে। আমি আপনার থেকে সেই আশা করি না। আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি তাই হবে। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট। আমি আপনার সাথে থাকতে পারবো না।

দিব্য দোয়াকে নিয়ে যেতে যেতে বললো,

---- ওই যে, আই ডোন্ট কেয়ার। আমি যা চাই, তাই হবে।

পারলে ছেড়ে যাওয়ার সাহস করে দেখো।

---- আমার সাহস আছে।

দিব্য বাইকের চাবিটা বের করলো। বললো,

---- সাহস থাকলে ভালো। বাসায় যাবে আমার সাথে, তারপর সবার সামনে আমার নামে অভিযোগ করবে। তারপর সবার যদি মনে হয় আমার সাথে থাকা ইম্পসিবল, চলে যেও। মানা করবো না।

দোয়া রেগে দিব্যর শার্টের কলার চেপে ধরলো। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে বললো,

---- আমাদের মধ্যে কেন ফ্যামিলি আসবে? আমি তো ফ্যামিলিকে দেখে আসিনি। আমি আপনার সাথে এসেছিলাম। আপনার সাথে সংসার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, আপনার মনে অন্য কেউ। আপনি আমায় মেনে নিতে পারেন না। আমি মানিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, আপনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। আমি আপনার জন্য তুচ্ছ হলেও, আমার কাছে আমি অনেক দামি। আমি চাই না আপনার সঙ্গ, যেখানে অন্য কারোর বসবাস। আমাকে ভালোবাসতে পারেননি আপনি। আপনি স্বার্থপর বোকা পুলিশ। বড্ড স্বার্থপর! আই হেইট ইউ! জাস্ট আই হেইট ইউ!

ভাগ্যিস কেউ নেই এই সময়টাতে। আসবে কিছুক্ষণ পর। দিব্য দোয়ার হাত ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। দিব্য ইউনিফর্ম পরা। মেয়েটা বেজায় রেগে গিয়েছে। না পেরে নিজের বক্ষস্থলেই চেপে ধরলো দিব্য। মেয়েটা হাসফাঁস করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য।

---- দোয়া, শান্ত হও। কী করছো তুমি?

---- আমাকে ছাড়ুন আপনি। সাহস হয় কী করে আমাকে টাচ করার? ছাড়ুন আপনি। আপনাকে আমি ঘৃণা করি।

দিব্য মৃদু হাসলো। বললো,

---- আমি তোমায় ভালোবাসি।

---- বলছি তো, ঘৃণা করি।

---- আমিও ভালোবাসি। ভালোবাসবো এবং ভালো রাখবোও।

দোয়া ক্লান্ত হয়ে শান্ত হলো। তবুও বললো,

---- লাগবে না আপনার দয়া। আমি আপনার দয়া নিয়ে বাঁচতে চাই না।

দিব্য দোয়ার চোয়াল আঁকড়ে ধরলো এক হাতে, আরেক হাতে দোয়াকে বেঁধে আছে বলতে গেলে। মেয়েটা বড্ড নড়বড়ে, কখন কী করে বলা যায় না।

নীরব দৃষ্টিতে তাকালো দোয়ার পানে। বললো,

---- আপনার দয়া লাগবে আমার। প্লিজ, আমার সাথে চুপচাপ চলুন, নয়তো অ্যারেস্ট করতে বাধ্য হবো। হ্যান্ডকাফ পরাবো হাতে?

দোয়ার মনে অভিমানের পাহাড়, বড্ড শক্ত মেয়েটা। মেয়েটার মন একটুও গলেনি। বরং বাধ্য হলো যেতে দিব্যর সাথে। তার অভিমান বুঝেনি কখনোই দিব্য। তার প্রতি ফিলিংস তলিয়ে গিয়েছে তার চঞ্চলতায়, তার টুকটাক ভুল কাজে। দোয়া স্বাভাবিক স্বরে বললো,

---- আপনাকে আমি হেইট করি, বোকা পুলিশ। বাধ্য হয়ে যাচ্ছি বলে ভাববেন না সব মেনে নিয়েছি। বাবা-মাকে ডাকা হলে সব অভিযোগ বলে চলে যাবো আপনার জীবন থেকে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। আপনার ভালো সবসময়ই চেয়েছি, আজও তার ব্যতিক্রম হবে না।

দিব্য অবাক হয়ে তাকায়। মেয়েটার মনে বড্ড অভিমান বাসা বেঁধে আছে, যা তার অনেক কষ্টে ভাঙাতে হবে।

দিব্যের পেছনে উঠে বসলো দোয়া। দিব্য ধীরে চালাতে লাগলো বাইকটা। সময়টা যেন শেষ না হয়। কাউকে নয়, নিজেকে নিয়ে ভাবতে চায় সে। আর তার সাথে যে মেয়েটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার ভালো থাকার দায়িত্ব নিতে চায়। নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করতে চায়। মেয়েটির মনের ইচ্ছে পূরণ করতে চায় দিব্য।

_________________

---- আসসালামু আলাইকুম, ভেতরে আসুন আপনারা।

তিনজনে একসাথে মেঘের সালামের উত্তর করলো। অতঃপর রাতুল বললো,

---- কেমন আছো, মেঘ?

---- আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া। আপনারা বসুন।

রাতুল শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,

---- কিরে, তোর এ অবস্থা কেন?

শ্রাবণের অবস্থা খুবই খারাপ। বিনিময়ে শ্রাবণ নিঃশব্দে হাসলো। মেঘ বললো,

---- রাত থেকে উনি কিছুই খাননি। আপনারা বসুন, আমি খাবার বানিয়ে নিয়ে আসছি। সবাই একসাথে খাবেন।

রাতুল, তাসির ওরা বসলো কেবল। তার মধ্যে বারণ করে বলে উঠলো দোয়েল,

---- কোনো প্রয়োজন নেই কিচেনে যাওয়ার। আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি। তাসির, চলুন আমার সাথে।

রিফাত তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,

---- আমরা নিয়ে আসছি খাবার। কাউকে কষ্ট করতে হবে না। বসো সবাই। আমরাও খাইনি, জানতাম শ্রাবণের এমন অবস্থাই হবে। বেচারা একটু বেশিই পসেসিভ মেঘকে নিয়ে। আর মেঘেরও এই সময় না খেয়ে থাকা ঠিক না।

শ্রাবণ ফের হাসলো। দোয়েল খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গেলো সার্ভ করার জন্য। অন্যদিকে ছেলেরা সব গল্প করতে লাগলো।

মেঘও যেতে নিলে দোয়েল বারণ করে বললো,

---- তোকে না বলছি, এই সময় কষ্ট করতে হবে না। কেন শুনছিস না?

মেঘ মুচকি হেসে বললো,

---- মানে কী? আমি সারাক্ষণ শুয়ে-বসে সময় পার করবো? আমি পারবো না বসে থেকে ভোর হতে।

দোয়েল গ্লাসে পানি রাখতে রাখতে বললো,

---- তোর ভালোর জন্যই তোকে এত শাসন করা, বুঝলি? আজ আমরা বারণ করছি, কাল দেখবি তুই নিজেকে নিয়ে সতর্ক হয়ে যাবি।

মেঘ কথা বাড়ালো না। দেখতে লাগলো দোয়েলের কাজ। শ্রাবণ কথা বলার ফাঁকে মেঘের দিকে নজর রাখছে। মেয়েটা অসুস্থ, তবুও কথা শুনবে না, বের হবেই রুম থেকে। ওকে কী করে বুঝাবে, মেঘের একটা ভুল আর মেঘ ও শ্রাবণের জীবন, দুটোই ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। ভাবলেই শ্রাবণ বাবা হওয়ার আনন্দটা ভুলে বসে। মেঘকে নিজের কাছ থেকে হারানো তো দূর, নিজের থেকে ছাড়তেই ইচ্ছে করছে না। সবকিছু সাজানো হলে খাবার টেবিলে বসলো সবাই। যতগুলো খাবার আনা হলো, তাতে গরুর মাংসও রয়েছে। মেঘ শ্রাবণের পাশে বসলো। তার আগে শ্রাবণ সব চেক করলো। মেঘ গরুর মাংস খায় না বলে আলাদা করে মুরগির মাংসের তরকারি আনা হয়েছে। কিন্তু, মেয়েটা নাক-মুখ কুঁচকাচ্ছে। খাবে না বলে উঠে পড়তে নিলে শ্রাবণ আটকালো। সবার খাওয়াও থেমে গেলো। সবার প্ল্যান, একসাথে খাবে। প্লাস শ্রাবণের মন খারাপও দূর হবে। মেঘ ও শ্রাবণ তাদের সাথে মিলে খেতে পারবে। নয়তো টেনশন করবে ছেলেটা। একটু থেকে একটু কিছু হলেই উতলা হয়ে ওঠে শ্রাবণ মেঘের জন্য। মেঘ ও কম না।

রাতুল বললো,

---- মেঘ, আমরা শুধু মাংস বা বড়লোকদের খাবার আনিনি। আমরা সাধারণ খাবার এনেছি। এই যে দেখো, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা-ভাজি থেকে শুরু করে সব এনেছি, যেন কারোর কোনো পছন্দ বাদ না যায়।

তাসির বললো,

---- আমার তো মনে হচ্ছে রেস্টুরেন্টের সব মেনু এখানেই আছে। বাকি কি কিছু রেখেছিস?

হাসলো রাতুল। রিফাত, রামিম খেয়ে যাচ্ছে, তাও মাংস ফেলে ভর্তা দিয়ে। এত ঝাল, কান্না করতে করতে খাচ্ছে।

দোয়েলের হাসি পাচ্ছে। তাসির নিচ্ছে না, রামিমদের অবস্থা দেখে। শ্রাবণকে অনুরোধ করলো মেঘ, বিভিন্ন আইটেমের ভর্তা থেকে তাকে দিতে। শ্রাবণ রাজি হচ্ছে না। হওয়ার কথাও না। রিফাত, রামিম কান্না করছে, তবে জিহ্বায় মজা পাচ্ছে।

---- আমি খাবো না, ওই ভর্তাগুলোই আমার লাগবে। এমন করছেন কেন?

---- মেঘ, এগুলো প্রচুর ঝাল। আমি চাই না তোমার কষ্ট হোক। দেখছো না ওদের কী অবস্থা?

মৃদু রাগ দেখালো মেঘ, বললো,

---- ওরা তো আদরের দুলাল, ঝাল খেয়ে অভ্যস্ত নয়। আমি পারবো। থাক, আপনাকে দিতে হবে না। নিজেও খাচ্ছেন না, আমাকেও খেতে দেবেন না, আবার যেতে দেবেন না। অদ্ভুত লোক।

নিজেই নিলো প্লেটে করে। সবার চোখ মেঘের দিকে। দোয়েল মানা করতে নিচ্ছিল, মেঘ তার আগেই মুখে তুললো এক লোকমা। ঝালের কোনো রিঅ্যাকশনই নেই মেঘের মুখে। শ্রাবণ ব্যাপারটা ক্লিয়ারলি বুঝলেও, সবার কাছে সেটা অদ্ভুত লাগলো। চোখের পানি মুছতে মুছতে রামিম, রিফাত তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। শ্রাবণ বারণ করছে,

---- মেঘ, প্রবলেম হবে তোমার।

মেঘের ভালোই লাগছে। তার কাছে এগুলোই ভালো ও নরমাল খাবার। তাসির, রাতুল, রিফাত, রামিম দেখে যাচ্ছে, মেয়েটির চোখের কোণে এক ফোঁটা পানিও নেই। অথচ দোয়েলও কান্না করার অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে খাবারের প্লেট সামনে থেকে সরিয়ে নিলো শ্রাবণ।

বন্ধুদের সামনে বারণ করাটা ঠিক না, কিন্তু উপায়ও নেই। আর না কাউকে কিছু বলতে পারবে সে। মেঘ অবাক হয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে। এমন করায় লজ্জা লাগলো খানিকটা মেঘের, সবার সামনে।

তাসির বললো,

---- কী করছিস শ্রাবণ?

---- মেঘ, রুমে যাও।

সবার সামনে অপমান করাটা মেনে নিতে পারলো না মেঘ। দোয়েলও বললো,

---- মেঘ, এগুলো যা ঝাল! খাচ্ছিস কিভাবে, তাও না কেঁদে? এগুলো খাওয়া ঠিক না তোর জন্য।

মেঘ কথা না বলে চলে গেলো শ্রাবণের কথামতো রুমে।

মেঘ চলে যেতেই শ্রাবণ বলে উঠলো,

---- মেয়েটা শুধু ঝাল খেতে চায়, কিন্তু ও বুঝতে পারছে না ঝাল খেলে ওর শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। আর তার থেকে...

সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে।

রাতুল বলে উঠলো,

---- কী হবে?

---- কিছু না। তোরা খা। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

শ্রাবণ রুমে গেলো। মেঘ সবার সামনে অপমানিত বোধ করেছে, ব্যাপারটা সকলে বুঝতে পেরেছে। সবাই উঠে পড়লো। যাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন, তারা দুজনেই খাচ্ছে না। তারা খেয়ে কী করবে? ড্রয়িংরুমে এসে বসলো সবাই।

শ্রাবণ ভেতরে এসে দেখলো, মেঘ চুপচাপ বসে আছে বিছানার এক কোণে মুখ ভার করে। শ্রাবণও বসলো মেঘের সামনে। মেঘ কথা বললো না, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করলো।

শ্রাবণ মেঘের হাতের উপর হাত রাখলো। সরিয়ে দিলো মেঘ। বললো,

---- অপমান করে ভালোবাসা দেখাতে হবে না।

শ্রাবণ হাসলো। মেয়েটা বড্ড বোকা। শ্রাবণ ভেঙে বুঝিয়ে বললো,

---- তুমি চাও না আমাদের সন্তান ভালো থাকুক? তুমি ভালো থাকো? আমরা একসাথে বেঁচে থাকি?

মেঘ অভিমান এক পাশে সরিয়ে রেখে হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়লো। বললো,

---- আমার চাওয়ায় তো এইটুকুই।

---- তাহলে কেন এসব ফালতু খাবার খাও? তুমি জানো, ওগুলো তোমার শরীরে কতটা বাজে ইফেক্ট ফেলতে পারে?

মেঘ বোকার মতো বলে উঠলো,

---- আমি কী করবো? আমার খেতে ইচ্ছে করে।

শ্রাবণ হাতজোড় করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

---- তীব্র ইচ্ছে থাকলেও নিজের ভালোর জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। তুমি না হয় ছোট্ট অভ্যাসটা ত্যাগ করো, কালকের অসুস্থতার জন্য এই তীব্র ঝাল খাবারটাই দায়ী। নয়তো আমাকে হারাত...

---- চুপ! কী বলছেন আপনি?

ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়ালো মেঘ। বললো,

---- আমি চেষ্টা করবো নিজেকে ভালো রাখার। আমি জানতাম না, সামান্য কারণে এত ভয় পাবেন। আমি আপনার কথার বাইরে এক পা নড়বো না, কথা দিলাম।

শ্রাবণ হাঁটু মুড়ে বসে মেঘের কোলে মাথা রেখে বললো,

---- গুড গার্ল!

চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন