ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

৩৪তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৩৪

#তাসনিম_লিজা

-----কপি নিষিদ্ধ!

দিব্য ও দোয়াকে একসাথে দেখে ভীষণ খুশি হন ফাইজা বেগম। যাক বাবা তাহলে মান অভিমান ভাঙলো দুজনের। ভেতরে আসতে বললে দিব্য দোয়াকে ফাইজা বেগমের কাছে এগিয়ে দিয়ে দোয়ার হাত ছেড়ে বলে উঠলো,

---- ওকে বলবেন বাবা মাকে কল করে আমাদের বাসায় আসতে বলতে। সাথে বাবাকে ও অফিস থেকে আসতে বলবেন। জরুরি কথা আছে সবার সাথে।

অতঃপর গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা দোয়ার দিকে নজর দিলো দিব্য। বললো,

---- এই মেয়ে যেনো এই বাড়ি থেকে এক পা ও বাইরে না রাখে। না হলে হাসবেন্ডের অধিকার ফলাতে বাধ্য হবো।

গটগট পায়ে শিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো দিব্য।

দোয়া দিব্যের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো রাগান্বিত দৃষ্টিতে। রাগ থরথর করে বাড়ছে কেবল। একেই তো নিজে অন্যায় করেছে তার উপর তাকেই অপরাধী বানাচ্ছে। হঠাৎ ভালোবাসা উথলিয়ে পড়ছে কোথা থেকে? সেটার উৎসই বা কোথায়?

দোয়ার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বুঝার বাকি নেই দোয়া যে দিব্যর উপর বেজায় ক্ষেপে আছে। নিশ্চয়ই কলেজ থেকে নিয়ে আসছে মেয়েটাকে। তিনি হাসি মুখে নরম স্বরে বলেন,

---- দোয়া ভেতরে এসো মা।

দোয়া ভেতরে আসলো। চুপচাপ নিজেকে চিপকে সোফার এক কোনে চুপটি করে বসে পড়লো। যেন মেয়েটা আজ প্রথমবার আসলো এই বাড়িতে। ফাইজা বেগম দোয়ার পাশে বসলেন। নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলেন না বলে উঠলেন তিনি,

---- কি হয়েছে দোয়া? কেন সবাইকে ডাকা হচ্ছে?

তুমি অভিমান করে চলে গিয়েছো তাই না?

দোয়া মাথা নিচু করে মিনমিনে স্বরে বললো,

---- কিছু হয়নি আম্মু। আমি আপনার ছেলের জন্য

সঠিক মানুষ নয়। বলতে পারেন ওনার অযোগ্য, তাই দূরে সরে যেতে চেয়েছিলাম। আমি কারোর কাছে ছোট হয়ে থাকতে চাই না।

হতবাক দৃষ্টিতে তাকালেন ফাইজা বেগম। সাথে সাথে বলে উঠলেন,

---- আমার ছেলে তোমায় বলেছে এসব কথা?

দোয়া ম্লান হাসলো। বললো,

---- বলতে হয় না আম্মু। ছোট হলে ও বুঝি ওনার ব্যবহারেই তা প্রকাশ পায়। আমাকে নয় অন্য কাউকে চেয়েছিলেন তিনি। তার মতে তো আমি অযোগ্যই ওনার জন্য। যাকে চাইতেন তিনি তার জায়গায় অন্য কাউকে দিলে কি সেই মানুষটা হওয়া যায়?

কথাগুলো তীরের মতো বিঁধলো ফাইজা বেগমের বুকের মধ্যে। তাহলে যে এতোদিন কত সুন্দর সংসার করলো তারা। কোনো মনোমালিন্য তো হয়নি। উল্টো কত বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে দিব্য। আগুন লাগতে নিয়েছিলো জেনে ছেলেটার চোখেমুখে যে ভয় দেখেছিলো সব কি তাহলে মিথ্যা নাকি দায়িত্ববোধ থেকে শুধু। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে দোয়ার হাতের উপর হাত রাখলেন তিনি। নরম এবং মায়াময় স্বরে অনুরোধ করলেন,

---- এমন করে বলো না মা। তোমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক নয় বিয়ে হয়েছে। আর বিয়ে ভাঙলে সয়ং আল্লাহ কষ্ট পান। জিতে যান সয়তান৷ বিয়ে একটা পবিত্র সম্পর্ক সময় দাও দুজন দুজনকে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু মানিয়ে গুছিয়ে নাও না আমার ছেলেটাকে? ভুলিয়ে দাও মেঘকে দিব্যর মন থেকে। আমি চাই তোমরা ভালো থাকো যেভাবে ভালো আছে শ্রাবণ মেঘ ও তাসির দোয়েল। এইটুকুই রিকোয়েস্ট করছি তোমার কাছে প্লিজ এমন করো না মা।

দোয়া চুপচাপ বসে রইলো। বলতে তো অনেক চাই সে কিন্তু ঠোঁট দুটোতে মনে হচ্ছে তালা লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। অভিমান অভিযোগের শেষ নেই তো। লোকটা তার প্রতি বিরক্ত, দিব্যের জীবনে দোয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে জোর করে কেন থাকবে সে? তার চেয়ে দূরত্ব সুন্দর!

ফাইজা বেগম বুঝতে পারেন দোয়ার তীব্র অভিমান। যা বলার দোয়ার বাবা মাকে বলতে হবে। নয়তো ছেলেটা আবার ও কষ্ট পাবে৷ তিনি শান্ত হয়ে বলেন,

---- ঠিক আছে তোমায় আমার কথা রাখতে হবে না। তোমার বাবা মাকে কল দাও। বলো চলে আসতে।

দোয়া ও তাই করলো। চুপচাপ কল দিয়ে বাড়তি কথা না বলে দিব্যদের বাড়িতে আসার কথা বলে কল রেখে দিলো। ফাইজা বেগম ও জাহাঙ্গীর আহমেদকে জানিয়ে দেন বাড়িতে আসার জন্য।

ফাইজা বেগম দিব্যকে আসতে দেখে রুমে চলে গেলো। মূলত দুজনকে একা ছেড়ে দেওয়াটাই ঠিক

মনে হয়েছেন ওনার। যদি সব ঠিক করার চেষ্টা করতে পারে।

দিব্য নিঃশব্দে দোয়ার অপর পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসলো। হাতে ফোন সে চাপতে ব্যস্ত। তার খেয়ালই নেই দোয়ার দিকে। হালকা শব্দেই তাকালো দোয়া। দিব্যকে দেখেই রাগ বেড়ে গেলো।

চিটার লোক! মিথ্যা কথা বলে তাকে নিয়ে এসেছে।

আবার নিজের অন্যায় তার কাঁধে চাপিয়ে তাকে দিয়েই সরি বলাতে চেষ্টা করছে কতটা বজ্জাত ছেলেটা। পুলিশ নামের কলঙ্ক একটা।

মনে মনে হাজার খানিক শব্দ খরচ করলো দিব্যর নামে। যা একটা ও ভালো নই। দিব্য আড়চোখে তাকিয়ে খেয়াল করলো দোয়ার রাগে লাল হওয়া কটমট করা চেহেরা। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললো,

---- ঝগড়া করার জন্য মুখটা বেশ ছটফট করছে দেখছি। শান্ত হয়ে বসে থাকা যায় না? ঝগড়া করার জন্য তো সারাজীবন পড়েই আছে। রিলাক্স ঝগরুটে মেয়ে।

রেগে বলে উঠলো দোয়া,

---- যেখানে আপনার সাথে আমি এক মিনিট ও থাকতে পারছি না, সেখানে সারাজীবনের কথা মাথায় আসলো কিভাবে আপনার?

---- আমার বউ আমার সাথেই তো থাকবে। বাবার বাড়িতে রাখার জন্য বিয়ে করেছি নাকি?

দোয়ার ইচ্ছে করছে আচ্চা মতো বকতে। লোকটা তাকে না রাগালে শান্তি পায় না । শান্ত হ দোয়া রাগিস না নিজেকে নিয়ন্ত্রণ কর। নিজের মনকে নিজেই বুঝাচ্ছিলো দোয়া কিন্তু, আগুনে ঘি ডালার মতো দিব্য ফের বলে উঠলো,

---- বাবা মা আসলে আমার নামে অভিযোগটা কি বলবে বলো তো?

দোয়ার প্রশ্নবোধক চাহনি, দিব্য ফিচেল হাসলো। বললো,

---- না মানে বাবাকে বলতে পারবে আমি তোমায়

ভালোবাসি না বলে অভিমান? পারবে তুমি?

দোয়া লজ্জা পেলো সাথে কটমট দৃষ্টি। এভাবে কথা বলছে নিরামিষ ছেলেটা? নাকি খোলশ ছেড়ে আসল রুপে চলে এসেছে। সত্যি তো তার প্রতি অবহেলা কি নাহ! তাকে আজ মারতে চেয়েছিলো,

সবসময় বকাঝকা করে, ধমক দেয় তার প্রতি বিরক্ত এগুলোই তো অভিযোগ। হ্যা! নিজেকে ধাতস্থ করলো। আমতা আমতা করে বললো দোয়া,

---- আ'আমি জানি আমি কি বলবো আমাকে রাগাবেন না একদম। আর রাগালে ও প্রবলেম নেই

আজকেই আপনার সাথে আমার শেষ কথা, শেষ দেখা।

দিব্য হাসলো। মেয়েটা একটুতেই ডিসিশন নিয়ে নেই কি হবে না হবে।

---- ফাইন! শেষ কথা, নাকি শুরু সেটা পরে দেখা যাবে। এখন শান্ত হয়ে বসো তো। এতো রাগলে হার্টে প্রবলেম হবে তো।

---- আমি ঠিক আছি আপনার মুখ বন্ধ করুন।

---- ঠিকই তো রাখতে চাই নয়তো আমাকেই তো কষ্ট করতে হবে বউকে সুস্থ করার জন্য।

বলতে গিয়ে ও চুপ করে রইলো দোয়া। তাকে সত্যি

লোকটা চাই না। তার অনুপস্থিতিতে লোকটার কিছুই যায় আসে না। সবই নাটক আর তার মূল কারন হলো আজ সব শেষ হয়ে যাবে। নিজেকে বড্ড ইনোসেন্ট বানাতে চাইছে সে। দোয়ার অভিমান আজ আকাশ সমান হলো তার কথার হেরফের হবে না মানে হবে না।

মেয়েটা কিছু ভাবছে দিব্য তা বেশ বুঝতে পারলো।

মেয়েটাকি বুঝলো না তার মনের অবস্থা? সময়টা কি খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছিলো? কষ্ট পায়নি তো

তাই দিব্যর অবস্থা বোঝার ও কথা না। ধৈর্য্য নেই মেয়েটার। নয়তো খুব করে কাউকে চেয়ে না পেলে

তার অবস্থা ঠিক হতে পারে তার সামান্য ধারনা পেতো। আচ্ছা তার কি দোয়াকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে? সেকি তার প্রতি দুর্বল? ভালোবাসে? নাকি মেয়েটা বিরক্ত তার প্রতি নাহ! তার কাজে তো দিব্যর প্রতি যত্ন সম্মান এবং ভালোবাসায় প্রকাশ পেয়েছে তাহলে কি মেয়েটা চাইছে দিব্য তাকে নিজের করে নিক। মেয়েটাকে যেতে বারণ করুক। সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে এবং অধিকার দেখাক। দিব্য আর ভাবলো না। সবাই আসুক তারপর না হয় সবার মনের অবস্থাই বুঝতে পারবে সে।

দুজনের নীরবতার মধ্যে কলিংবেল বাজলো। দোয়া তৎক্ষনাৎ উঠে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। দরজা খুলতেই বাবা মায়ের মুখ ভেসে উঠলো। ফয়সাল সাহেব মেয়েকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

---- কি হয়েছে আবার এসেছিস কেন এই বাড়িতে?

---- থামুন তো আপনি আগে ভেতরে যান তারপর কথা হবে।

ফাতেমা খানম ও ফয়সাল সাহেব ভেতরে আসতেই দিব্য সালাম দিলো। অত্যন্ত রাগের সাথে সালামের উত্তর দিয়ে প্রশ্ন করলেন ফয়সাল সাহেব,

---- আমার মেয়েকে কাঁদিয়ে আবার কি চাও তুমি দিব্য? কেন আমার মেয়ে তোমার জন্য কাঁদলো বলো? তোমার কাছে আমার মেয়েকে দিয়ে কি আমি অন্যায় করে ফেলেছি? একজন পুলিশ অফিসার হয়ে তুমি আমার মেয়েকে টর্চার করছো?

দিব্য দোয়ার দিকে তাকালো। দ্রুত পায়ে ছুটে আসেন ফাইজা বেগম। তিনি কিছু বলতে নিবে তখন দিব্য বলে উঠলো,

---- আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন তো আমি তাকে ঠিক কিভাবে টর্চার করেছি? জিজ্ঞেস করুন আমি কেন কাঁদিয়েছি তাকে?

দিব্যর কথা শুনে কি বলবে বুঝে পাচ্ছিলো না দোয়া। কিভাবে কি বলবে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সে জীবনেও বাবা মা এবং শশুরের সামনে এসব কথা বলতে পারবে না। বাবা তো নিশ্চয়ই ধমক দিবেন।

কিন্তু কিছু তো বলতেই হবে। হুট করে বলে উঠলো দোয়া,

---- বাবা আমি এখানে থাকবো না। আমি বাসায় চলে যাবো। আমি শান্তি পাচ্ছি না এখানে।

দিব্য সবার সামনে বলে উঠলো,

---- দেখেছেন শশুর আব্বা আপনার মেয়ে শুধু শান্তির অভাবে আমার থেকে, নিজের স্বামীর বাড়ি থেকে চলে যেতে চাচ্ছে এমন মেয়ে দেখেছেন আপনি কখনো?

---- চুপ করুন আপনি। সব আপনার জন্য। আপনিই তো সবকিছুর মূল। আপনার জন্যই তো শান্তি পাচ্ছি না।

দোয়া রেগে বললো কথাগুলো। দিব্য বললো,

---- তো আমি চলে যাবো? তাহলে আমি চলে যায় অন্তত আমার বউ শান্তিতে থাকুক।

উপস্থিত সকলে ভড়কে গেলো। কি হচ্ছেটা কি?

তাদের মধ্যকার ঝগড়ার মূল কারনটাই তো জানা হলো না। ফয়সাল সাহেব বলেন,

---- দোয়া তুই কেন কাল চলে এসেছিলিস? কেন কান্না করেছিস শুধু কারনটা বল?

সাথে জাহাঙ্গীর আহমেদ ও বলেন,

---- বলো মা আমার ছেলে কি করেছে আমি শাস্তি দিবো ওকে।

দোয়া চুপ করে আছে। ফাতেমা খানম সবার উদ্দেশ্যে বলেন,

---- স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা, মনমালিন্য হতেই পারে। স্বাভাবিক ব্যাপার। দেখছেন তো ও বলতে চাচ্ছেনা নিশ্চয়ই বলার মতো নই। আপনারা ওদেরটা ওদেরকেই মিটমাট করতে দিন। আর দোয়া তুই এখানেই থাকবি। দিব্য যদি অন্যায় কিছু করতো তাহলে নিশ্চয়ই তুই চুপ থাকতি না।

হাফ ছাড়লেন ফাইজা বেগম। ভয় হচ্ছিলো মেঘকে না এখানে টেনে আনে। আবার না দিব্য কষ্ট পাই।

ফাতেমা খানম এর কথায় যুক্তি আছে। তাই সবাই গম্ভীর হয়ে রইলেন। দোয়া মায়ের দিকে তাকায়

করুন দৃষ্টিতে। ফাতেমা খানম শক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন। সংসারে ঝামেলা হবেই তাই বলে বাবার আদুরে হয়ে সংসার ছেড়ে দেওয়া মোটেও ঠিক না। কিন্তু তার মধ্যে দিব্যর কথাতে সবাই চমকে ওঠে। মানে যে চেয়েছিলো দোয়া থাকুক সে-ই চাচ্ছে দোয়ার চলে যাক।

---- আমি চাই না দোয়া কষ্ট পাক আমার জন্য। বাবা মা তোমরা আমার কথাতে রাগ করো না।

ফের দোয়ার বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

---- বাবা মা আপনাদের মেয়ে আমার সাথে থাকতে

চাচ্ছে না। আমি ও চাই না জোর করে কেউ থাকুক। আবার আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ও চাই না।

ওর যদি এই বাড়িতে থাকতে ভালো না লাগে আপনাদের সাথে নিয়ে যান ওকে। যখন ওর মনে হবে এই বাড়ি আর আমায় ওর প্রয়োজন তখন না-হয় চলে আসবে। আমি কখনোই ওকে বারণ করবো না।

দোয়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায়। মানে এই মুহুর্তে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। সে তো এতো সব করলো দিব্য তাকে জোর করে রাখুক। তার প্রতি অধিকার কাটাক। আগলে রাখুক। কিন্তু সে ও ছলে বলে কৌশলে তার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আর রইলো না এই বাড়িতে থাকার কোনো উপায়।

দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না তীব্র অভিমান নিয়ে ছলছল চোখে এক পলক তাকালো দিব্যের মুখপানে। দিব্যর নির্লিপ্ত দৃষ্টি বরাবরই দোয়ার দিকেই ছিলো। না আছে অনুশোচনা আর না হারানোর কষ্ট। পাবেই বা কিভাবে সে তো অন্য কাউকে...

চোখ নামিয়ে নিলো দোয়া।

এক মুহুর্ত ও দাঁড়ালো না দিব্য উপরে চলে গেলো।

দোয়া বাবার উদ্দেশ্যে শান্ত স্বরে বললো,

---- বাবা চলো।

জাহাঙ্গীর আহমেদ বাঁধা দিলেন। বলেন,

---- আরে বললেই কি হয় নাকি? দোয়া মা যেয়ো না। বেয়াই সাহেব ওকে নিয়ে যাবেন না। ও মন থেকে বলেনি।

---- বেয়ান আপনি দোয়াকে নিয়ে যাবেন না। আমার ছেলে কষ্ট পাবে তো। ওরা ভালো থাকবে না কেউ।

তীব্র অভিমানে বাবা মায়ের কথা উপেক্ষা করে নিজেই বলে উঠলো দোয়া,

---- আমি কারোর কথাতে না নিজেই যেতে চাচ্ছি।

আমাকে আটকাবেন না আপনারা৷ কোনো ভুল করে থাকলে প্লিজ মাফ করে দিবেন।

প্রথমে মেয়েকে রেখে যাওয়ার কথা বললে ও এখন ফাতেমা খানম ও মেয়ের হাত ধরলেন শক্তপোক্ত ভাবে। স্বামীর উদ্দেশ্য বলেন,

---- চলুন দোয়ার বাবা। আমাদের এখানে না থাকায় শ্রেয়।

---- আসছি ভাই সাহেব। আপনার ছেলের কাছে এমনটা কখনোই আশা করিনি। ভুল করেছিলাম আমি আজ বুঝতে পারছি।

এই চলো তোমরা৷

জাহাঙ্গীর আহমেদ ও ফাইজা বেগম থম মেরে রইলেন। জাহাঙ্গীর আহমেদ ছেলের কাজে নিজেই

আশ্চর্য হন। অন্যদিকে ফাইজা বেগম তো চাননি এমনটা হোক। তবে কি দিব্য চাই না দোয়ার সাথে সংসার করতে? সোফায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন। ফের বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। জাহাঙ্গীর আহমেদ বিরবির করে আওড়ালেন,

---- কাকে কি বলবো আমি? ছেলের এই দশা তো আমরাই তৈরি করেছি। কেন যে মেঘকে নিজের ছেলের জন্য চাইলাম না কেন আমার ছেলেটা কষ্ট পাবে? আমাকে কি এভাবেই শাস্তি পেতে হবে?

আর তো পারছি না আমি।

____________________

অনেকক্ষণ থেকে তাসির দোয়ােল বাসায় চলে যায়, সাথে বন্ধুরা ও। সময় মতো জামিলা বেগম চলে এসেছেন। জাহিদ আহমেদ ও কাছাকাছি আছেন ফোন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। জামিলা বেগম এসেই খুশিতে কত কথা বললেন। দোয়া করলেন। কতশত উপদেশ দিলেন এই সময় সতর্ক থাকার জন্য। তারপর সেই যে কাজে লাগলেন, বাড়ি পরিষ্কার করলেন পুরোটা নিজ হাতে। শ্রাবণ হেল্প করতে চেয়েছিলো মানা করে দেয় জামিলা বেগম। ওনি যেনো খবরটা পেয়ে চাঙা হয়ে গিয়েছেন। কাজের প্রতি তীব্র আগ্রহ জন্মেছেন। ওনার লক্ষ এখন পুরোটা ফ্ল্যাট পরিষ্কার করে তারপর মেঘের জন্য তার পছন্দের খাবার রান্না করা। মেয়েটার যত্ন নিতে হবে। শ্রাবণ মেঘের কঠিন ক্রাইসিসের কথা জানিয়েছেন জামিলা বেগমকে। মায়ের মতো বোঝেন তিনি। তাই জানানোটাই ঠিক মনে করেছে শ্রাবণ। তাই তো জামিলা বেগমের এতো তাড়া। নিজেই সব দায়িত্ব নিয়েছেন সবার ভালো থাকা। নিজে ভালো থাকতে পারেনি তো তাই কারোর খারাপ থাকা সহ্য করতে পারেন না।

মেঘ জামিলা বেগমের কান্ড দেখে শ্রাবণকে বলে উঠলো,

---- আপনি দেখছেন আন্টি অসুস্থ ছিলো কালকে ও, আর আজই এতো বড় ফ্ল্যাট পরিষ্কার করতে উঠে পড়ে লেগেছে ঠান্ডা লাগবে তো আরো বেশি করে।

শ্রাবণ মুচকি হেঁসে বলে,

---- আন্টিকে আটকানোর সাহস আমার নেই। ওনি যে ভীষণ খুশি সেটা আমি জানি। মাতৃত্ব কতটা সুন্দর সেটা ওনি জানেন কিন্তু ওনার ভাগ্যে ছিলো না। তাই ওনি চান না তোমার কোনো সমস্যা হোক।

আর যে মানুষটা এমনিতেই সারাক্ষণ কোনটা করলে ভালো হবে সেই দিকেই খেয়াল রেখে সময় পার করে তাকে আটকিয়ে রাখবে কিভাবে মেঘফুল?

মেঘকে বলে দিয়েছেন জামিলা বেগম রুম থেকে না বের হতে। শ্রাবণ মেঘ রুমেই বসে আছে। পুরো ফ্ল্যাট তিনি ধুয়ে মুছে ফকফকা ঝকঝকা করে ফেলেছেন। এখন হাতমুখ ধুয়ে রান্নার কাজে লেগে পড়েছেন।

এই দিকে শ্রাবণ মেঘের চুলগুলো আঁচড়ে দিচ্ছে।

লম্বা চুলে হালকা তেল দিয়ে দিলো। মেয়েটা তেল দেওয়া একদম পছন্দ করে না তবুও জোর করে দিতে লাগলো। একসময় হঠাৎ কি ভেবে মেঘের কাঁধে থুতনি ঠেকালো শ্রাবণ। ধীর গলায় বলে উঠলো সে,

---- আচ্ছা আমাদের যদি একটা ছেলে একটা মেয়ে হয় তাহলে কেমন হয়? তাদের কি নাম রাখা যায় বলো তো মেঘ?

মেঘের অনুভূতি আকাশ ছুঁই। তবে শ্রাবণের শুঁকনো মুখের দিকে তাকালে চিন্তা হয় মেঘের। কিছু একটা লুকাচ্ছে না তো তার থেকে? মেঘ মৃদু হেসে বললো,

---- সেটা না হয় তাদের আগমনের পরই ঠিক করবেন।

শ্রাবণের বুকটা ধক করে উঠলো। সময়টা বেশ ভালোই কাটবে কিন্তু, যখন তাদের পৃথিবীতে আসার সময় হবে তখন? নাহ ডক্টরের সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে হবে।

---- কি ভাবছেন?

---- ঠিক বলেছো তুমি।

---- আপনার মন খারাপ? আমার সাথে কথাই তো বলেন না৷ চুপচাপ থাকেন কেন?

---- তেমন কিছু না পাগলি মেয়ে।

---- হুম আপনার পাগলি।

হেসে উঠলো মেঘ। শ্রাবণ মাথায় চিরুনি চালিয়ে বিনুনি করে দিলো। অতঃপর বললো,

---- তোমার কখনো খারাপ লাগলে আমাকে বলবে আর সাবধানে থাকবে বুঝেছো?

---- ঠিক আছে শিকদার সাহেব। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।

কলিংবেল বাজলো। জামিলা বেগম দরজা খুলতেই জাহিদ আহমেদ দ্রুত ভেতরে ডুকলেন। বললেন,

---- শ্রাবণ মেঘ কোথায় জামিলা আপা?

জামিলা বেগম বলেন,

---- ভাইজান এতো মিষ্টি?

---- ধরেন এগুলো। আমি নানা হবো আমার নাতি নাতনি আসতে চলেছে মিষ্টি না আনলে চলে?

কোথায় শ্রাবণ মেঘ?

বাবার কথা শুনে শ্রাবণকে রেখেই মেঘ দৌড়ে আসতে নিয়ে হোটচ খেতে নিতেই শ্রাবণ ছোঁ মেরে

আগলে নিলো। সাথে সাথে থাপ্পড় বসলো মেঘের গাল বরাবর। রেগে বলে উঠলো সে,

---- কালকের কথা ভুলে গিয়েছো মেঘ? কেন বারবার একই কাজ করো? এখন যদি কোনো বিপদ হতো তাহলে কি হতে পারতো ভাবতে পেরেছো তুমি? এতো তারাহুরো কিসের তোমার?

বাবা এসেছেন এখানেই থাকবেন চলে তো আর যাচ্ছেন না। সুন্দর ভাবে আসা যেতো না?

মেঘ ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। জাহিদ আহমেদ শ্রাবণের এমন কান্ডে রেগে যান। মেয়েকে আঁকড়ে ধরে তেতে উঠে বলেন,

---- কি করছো তুমি শ্রাবণ? আমার মেয়ের গায়ে আমার সামনেই হাত তুলছো তুমি? এই তোমার আমার মেয়ের প্রতি ভালোবাসা?

শ্রাবণ যেনো সম্পর্ক, বড় ছোট ভুলে বসলো। রেগে আগের ন্যায় বলতে লাগলো,

---- চুপ করুন আপনি। আমাকে শেখাতে আসবেন না আপনার মেয়েকে আমি ভালোবাসি কি না! আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই কিছু একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো তখন কি করতেন আদর করতেন? ওর কিছু হলে আমার কি হবে ভাবতে পারছেন? ও আপনার মেয়ে ছিলো ও এখন আমার। মানে শ্রাবণ শিকদারের ওয়াইফ। আপনার চেয়ে আমার দায়িত্ব বেশি। আমার টেনশন হয়।

মেঘ শ্রাবণের এরুপে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। সে এতোটা উগ্র আচরণ করবে ভাবতে পারেনি মেঘ।

সে তো অনেকদিন পর বাবাকে দেখবে ভেবে আনন্দে দ্রুত পা চালিয়ে আসছিলো। কিন্তু, হঠাৎ

সেল্ফের কোণে পা লেগে ফ্লোরে হালকা পানি থাকার কারনে পা স্লিপ খেতে নিচ্ছিলো বুঝতে পারেনি সে। শুঁকনো ডুগ গিলে বাবার আগেই বলে উঠলো মেঘ,

---- স'সরি আমি বুঝতে পারিনি।

শ্রাবণের রাগের কারনে তার কপালের রগ ফুলে উঠেছে। ভয়ের চেয়ে রাগের তীব্রতা প্রচুর। কালকের ঘটনার কথা ভাবলেই শ্রাবণের অস্থির লাগে। ভয় বাসা বেঁধে আছে মনে। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিলো। শ্রাবণ মেঘের হাত টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো। শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে বললো,

---- হাজারবার বলেছি হুটহাট কিছু করবা না। তুমি একা নও এখন। আমাকে টেনশনে ফেলতে তোমার বেশ ভালো লাগে? চলো আমার সাথে রুমে চুপচাপ বসে থাকবে। আর বাবা আপনি অনেক দূর থেকে এসেছেন রেস্ট নেন।

জাহিদ আহমেদ শাসন করবেন নাকি খুশি হবেন বুঝলেন না। জামাইয়ের কথা মতে রেস্ট নিতে চলে যান তিনি আসলে ওনি যে রুমে থাকেন সেই রুমেই। জামিলা বেগম জানেন মেঘের অবস্থা ভয় তো তিনি ও পেয়েছেন অনেক। শ্রাবণের রাগ করাটা অস্বাভাবিক নয়। তিনি ফের নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

শ্রাবণ সোফায় বসে কিছুক্ষণ নিজেকে শান্ত করে তারপর রুমে আসে। মেঘ কাঁদছে। থাপ্পড়টা বেশ জোরে লেগেছে গালে পাঁচ আঙ্গুলের লাল দাগ বসে গিয়েছে।

---- সরি বেশি লেগেছে? আমি আইস কিউব এনে দিচ্ছি।

মেঘ গাল ফুলালো। বললো,

---- লাগবে না।

শ্রাবণ হতাশ ভঙ্গিতে বললো,

---- কেন করো এমন? আমার ভয় হয় তোমার জন্য।

মেঘ অভিমানী স্বরে বললো,

---- জানি তো আমি। আর আমায় নিয়ে এতোটা ভয় পান কেন বলুন তো? পৃথিবীতে আর কেউ মা হচ্ছে না? কই তারা তো এতোটা যত্ন পায় না। এমনিতেই সব ঠিক থাকে। আপনি জানেন আপনার এই অদ্ভুত বাড়াবাড়ি আচরনে আমাকে ভয় পেতে বাধ্য করে। কাল থেকে দেখছি আপনার

এই অদ্ভুত আচরন। মাঝেমধ্যে বিরক্ত লাগে। মনে হয় আমি হারিয়ে যাবো সেইজন্যই এতো যত্ন ভালোবাসা। আমার কপালে দুঃখের ছিটেফোঁটা ও নেই।

শ্রাবণ নিজেকে ঠিক রাখতে চেয়ে ও পারছে না। কেন ডক্টর বললো এমন বিপদের কথা? কেন শ্রাবণকে ভেঙে পড়তে হচ্ছে। ছেলে মানুষ এমন হয়? এতোটা ভীতু হলে মেঘ নিজেই তো হাসবে তার অবস্থা দেখে। শ্রাবণ বসলো মেঘের পাশে।

নিজেকে স্বাভাবিক করলো সে। মেঘের গালে হাত আলতো ছুঁইয়ে দিয়ে করুন চোখে তাকিয়ে বললো,

----- অদ্ভুত হতেই পারে। এই সময়টা আমাদের সতর্ক থাকাটা জরুরি। যেমন তুমি ভালো থাকবে ঠিক তেমন আমাদের বেবি ও। আমি কারোর বিপদ চাই না। মেঘ এখন তুমি একা নও আগের মতো যেটা ইচ্ছে সেটা করতে পারবে না। নিজেকে

বুঝাতে হবে। এমন বাজে কথা বলো না৷ আমি তোমায় ভালেবাসি বলেই আগলে রাখি। দুঃখ পাওয়ার জন্য নয়৷ তুমি ছাড়া আর কাকে যত্ন করবো আমি?

মেঘ সামান্য হাসলো বললো,

---- মনে ছিলো না তো তাই...

শ্রাবণ মেঘের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠলো,

---- মনে রাখতে হবে মিসেস। নয়তে দেখা যাবে আমাদের সন্তানকে ভুলে চলে আসবে একা একা বলবে আমাদের সন্তান ছিলো?

লজ্জা পেলো মেঘ। বড়দের মতো করে বললো,

---- কখনোই না। মা কখনোই সন্তানকে ফেলে আসতে পারে না। আর আমি ভুল করলে আপনি আছেন তো সবসময় আগলে রেখে শুধরে দেওয়ার জন্য। থাকবেন না?

মেঘ শ্রাবণের বুকে মাথা রেখে বললো কথাগুলো।

শ্রাবণ যত্ন করে আগলে নিলো। বললো,

---- পাশে নয় একসাথে থাকবো বুঝলেন মিসেস?

চলবে,,,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন