ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ মেঘের উপখ্যান

৩৬তম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম লিজা

#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ৩৬

#তাসনিম_লিজা

---- কপি নিষিদ্ধ!

---- ভাবি আপনার মেয়ে সেই যে শশুর বাড়ি থেকে এলো আর যাবে না ? নাকি ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে আপনার মেয়েকে । আমি বলিকি ডিভোর্স করিয়ে নিন দোয়ার। তারপর দেখেন বউ মারা গিয়েছে কিংবা চলে গিয়েছে এমন বিবাহিত ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। বিবাহিত মেয়েদের কি আর অবিবাহিত ছেলের কাছে বিয়ে দিতে পারবেন বলেন

কথাগুলো বলেন দোয়াদের ফ্ল্যাটের সাথের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী আফিয়া বেগম। মহিলাটা আজ নয়, যতোদিন আসবেন ততোদিন অপমান করে কথা বলবেন।

ফাতেমা খানম চুপ করে আছেন। কি-ই বা বলবেন তিনি কিন্তু, চুপ থাকতে পারলো না দোয়া৷ সে পানি নিতে আসছিলো কিচেনে ফ্রিজ থেকে। কেউ তাকে খেয়াল করেনি বোধহয়।

---- প্রতিদিন অন্যের বাড়ির খোঁজখবর না নিয়ে নিজের ছেলে মেয়ের খোঁজ নিলে ও তো পারেন আন্টি। আপনার মেয়ে তো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এক ছেলের সাথে সময় কাঁটায়। আর ছেলে এই ছোট্ট বয়সেই সিগারেট খাই, মেয়েদের ডিস্টার্ব করে সেদিকে দয়া করে খেয়াল রাখতে পারেন না? এভাবে চলতে থাকলে অন্যকে ঠিক ভাবে অপমান করতে পারবেন না তো। কারন যার ফ্যামিলি ভালো সে-ই অন্যকে অন্যায় করলে বলতে সাহস রাখে। যেখানে আপনার নিজের ছেলে মেয়েই ঠিক নেই সেখানে আমাকে নিয়ে ভাবতে আপনাকে কে বলেছে হুম?

---- দোয়া চুপ কর।

আফিয়া বেগম রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফুঁসছেন। দোয়া মায়ের কথায় পাত্তা দিলো না। আবারও বললো,

---- কেন চুপ করবো শুনি? আমি ওদেরটা খাই না পড়ি? আমি আমার শশুর বাড়িতে যাবো কি না সেটা আমার ও আমার মা বাবার ব্যাপার। সেখানে ওনারা কথা বলার কে? আচ্ছা আন্টি আপনাদের কি স্যালারি দেওয়া হয় ? না মানে বেতনভুক্ত কর্মচারী আপনি? কত টাকা পান প্রতিমাসে কূটনামি করার জন্য?

---- বেশি বলছো তুমি দোয়া?

---- কেন জ্বলছে খুব সত্য বলে ফেলেছি বলে?

---- থাপ্পড় দিবো দোয়া! এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে আমরা? আর ওনি ভুলটা কি বলেছে শুনি? এভাবে যে পড়ে আছিস ওইদিকে দিব্য যদি তোকে ডিভোর্স দেয় তাহলে তো ওনার কথা-ই সত্যি হবে।

আফিয়া বেগম খুশি হলেন। ফের বলেন,

---- ভাবি আপনার মেয়ের যা চুপা সংসার বোধহয় এরজন্যই ভেঙেছে। এসব মেয়েদের কপালে সংসার থাকে না। বাপের বাড়িতেই পড়ে থাকতে হবে।

---- আর একটা বাজে কথাও বলবেন না বেরিয়ে যান আমাদের বাড়ি থেকে। মানুষ বাড়িতে শুধু ঝগড়া বাঁধাতে আসে যতোসব ফালতু মহিলা।

---- দেখছেন ভাবি আপনার মেয়ে আমাকে অপমান করছে। আপনি কিছুই বলবেন না?

ফাতেমা খানম কড়া চোখে তাকান আফিয়া বেগম এর কথা শুনে । দোয়ার রাগ হয় মা হয়ে মেয়ের কথা না শুনে অন্য মহিলার কথা শুনছে। বেশ রেগে এবার বলে উঠলো দোয়া,

---- বেশ করেছি বেরিয়ে যান আপনি। সারাক্ষণ কার কি হলো সব কথা এই বাসা থেকে ওই বাসায় বলে বেড়া...

টাসস! দোয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো মায়ের মুখের দিকে। আফিয়া বেগম ভীষণ খুশি হন। তিনটে মাস যে কতোবার বলেছেন হিসেব ছাড়া। থাপ্পড় মারলেন ফাতেমা খানম। রেগে বলে উঠলেন তিনি,

---- ওনি ভুলটা কি বলেছে বল আমায়? শুধু ওনি কেন প্রতিদিন একই কথা শুনতে হয় আমাকে শুধুই তোর জন্য। কিসের এতো ইগো তোর? ছেলে মানুষের ইগো থাকতেই পারে, কিন্তু মেয়ে মানুষের জেদ ধরতে নেই বরং মানিয়ে নিতে হয়। আর ভালো লাগছে না মানুষের কথা শুনতে শুনতে।

ঝর্নার ন্যায় চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি।

ফ্যালফ্যাল করে খানিক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে এক কাপড়েই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলো দোয়া। রাগের মাথায় বললে ও ফাতেমা খানম মেয়েকে আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হোন৷ তারপর নিজের ও রাগ হয় যাক যেখানে ইচ্ছে সেখানে। নিজের ভালো পাগলেও বুঝে শুধু ওনার মেয়েটায় বুঝতেছে না। মানুষের কথা শুনার চেয়ে স্বামীর বাড়িতে থাকা ঢের ভালো। পরিস্থিতি বেসামাল বলে কেটে পড়লেন মহিলাটি। নিজের ছেলে মেয়ে যাচ্ছে বেলাইনের অন্যের মেয়েকে লাইন শেখাতে আসছেন। ফাতেমা খানম বসে পড়লেন কাঁদতে কাঁদতে। আর ভালো লাগে না মানুষের কথা এবং মেয়ের এমন অবস্থা দেখে। বাড়িতে ফয়সাল আহমেদ ও নেই যে কথা শুনবে মেয়েটা৷ কোথায় যাবে এখন দোয়া? নাহ যাবে না হয়তো কোথাও বা ছাঁদে মুড অফ করে বসে থাকবে। বেশি একটা ভাবলেন না তিনি।

____________________

---- এভাবে কতদিন দিব্য নিয়ে আয় না বউমাকে।

মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। একটা মেয়ের বিয়ে হলে শশুর

বাড়ি না থেকে বাবার বাড়িতে থাকলে মানুষের নানান কথা শুনতে হয়। তুই তো বাসায় আছিস দূরে কোথাও না তাহলে কেন সম্পর্কটাকে তেঁতো করতে চাইছিস? মেয়েটার উপর সব ছেড়ে দিস না। ও চাই তুই ওকে নিয়ে আয় ৷ ওকে একটু যত্ন কর, আগলে রাখার অধিকার দেখাস। ওর অভিমান ভাঙাস। মেয়েরা কেবলই এইটুকুই চাই।

ওর অভিমান কেন বুঝতেছিস না?

দিব্য চুপচাপ রইলো। খাবার টেবিলে কথাগুলো বলছিলেন ফাইজা বেগম পাশে জাহাঙ্গীর আহমেদ

ও রয়েছেন। জাহাঙ্গীর আহমেদ এবার মুখ খুললেন,

---- তুইকি চাস মেঘের মতো দোয়া ও তোর জীবন থেকে হারিয়ে যাক? তাহলে হারিয়েই যাক আমাদের কি?

চমকিত দৃষ্টিতে তৎক্ষনাৎ বাবার মুখপানে তাকায় দিব্য। হারিয়া যাক? কথাটা শুঁকনো ক্ষতে তীব্র ব্যাথার সৃষ্টি করলো ছোট্ট মনে। এক অজানা যন্ত্রণার আভির্ভাব ঘটলো। খাবার খাওয়া থেমে গেলো দিব্যের। কোনো কথা না বলে প্লেটেই হাত ধুয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো দিব্য। ফাইজা বেগম সাথে সাথে বলে উঠলেন,

---- উঠলি যে খাবি না?

---- না খেয়ে থাকলে কিছুই হবে না কিন্তু, হারিয়ে ফেললে অনেক কিছুই হতে পারে। সুতরাং খাওয়ার থেকে পাওয়াটাই জরুরি।

তৎক্ষনাৎ বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো বাড়ির বাহিরে। পরনে টাউজার ও টিশার্ট এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছে ছেলেটা?

জাহাঙ্গীর আহমেদ শব্দ করে হাসলেন। হাসি থামিয়ে ফাইজা বেগমকে বলেন,

---- দেখলে ফাইজা তোমার ছেলে এখন বেশ ভয়ে এবং আতংকে তার জিনিস নিজের কাছে আনতে যাচ্ছে।

অবাক হয়ে শুধালেন ফাইজা বেগম,

---- মানে দিব্য দোয়াকে আনতে যাচ্ছে সত্যি?

---- হ্যা সত্যি। আচ্ছা খাওয়া থামিয়ো না খেয়ে তাদের অপেক্ষা করো। আমি শিউর আমার ছেলে খালি হাতে ফিরবেই না। আনন্দের দিন না খেয়ে চিন্তিত হয়ে থাকা শোভা পাই না বুঝলে।

তবুও চিন্তিত হয়ে বললেন তিনি,

---- দোয়েল তাসির আসলো, তাদের সহ তুমি আমি আমরা সবাই কত বুঝালাম কই তখন তো

আনেনি এখন সামান্য কথাতে নাহ অন্য কাজে যাচ্ছে মনে হয়।

---- আসলেই দেখতে পাবে।

বেশ জোর দিয়েই বললেন জাহাঙ্গীর আহমেদ।

---- সব ঠিকই তো দেখতে চেয়েছিলাম৷ মধ্যে থেকে কি থেকে কি হলো কিছুই বুঝলাম না। মেয়েটা বাড়িতে আসলেই ভালো।

তারা তাদের মতো খেতে লাগলো।

______________________

---- মিস্টার তারছিরা কোথায় আপনি?

তাসির নিজের নামের এমন সমার্থক নাম শুনে থম মেরে চেয়ে রইলো। বাড়িতে তাসিরের মা বাবা কেউ নেই। ওনারা বছরে আট থেকে দশমাসই আমেরিকায় থাকেন। নিজস্ব বাড়ি এবং বিজনেস আছেন ওইখানে। তবে তাসির বারবারই ছিলো দেশ প্রেমি৷ নিজ দেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না সে। আর না ছাড়বে বন্ধুত্ব। তাই বাড়িতে মেম্বার বলতে দুজনই তাসির ও দোয়েল। সাথে গৃহকর্মী তো আছেই।

সারাক্ষণ দুষ্ট মিষ্টি খুনসুটিতেই মেতে থাকে দুজন। কিছু হলেই দোয়েল শশুর শাশুড়ীর কাছে বিচার দিলে আচ্চা মতো বকে দেয় তাসিরকে। বেচারা দোষ না করেও দুদিক থেকেই কথা শুনতে হয়।

কিচেনে আসলো তাসির একবার এসেছিলো সে।

দোয়েল পিটপিট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- আপনি ঠিক আছেন তো? মাথা ঠিক আছে?

তার টার?

বুঝলো না তাসির বললো,

---- কেন কেন আমি আবার কি করলাম শুনি?

দোয়েল হাতে থাকা বক্সটা মেলে ধরলো তাসিরের সামনে। বললো,

---- এটা কি?

তৎক্ষনাৎ জিভে কামড় দিলো তাসির। দোয়েল ফের বললো,

---- বলুন এটা কি? লিখা আছে তো উপরেই বড়ো বড়ো অক্ষরে। ভেতরে দেখার প্রয়োজন আছে কি?

তাসির অপরাধী গলায় বললো,

---- সরি বুঝতে পারিনি আমি। চা পাতার জায়গায়

কালোজিরে নিয়ে এসে পড়লাম। আচ্ছা আবার কিনে আনছি।

---- দাঁড়ান!

দাঁড়িয়ে গেলো তাসির। দোয়েল এগিয়ে গিয়ে হাতে থাকা ফোনটা নিজের কাছে নিয়ে নিলো। অতঃপর সন্দেহ জনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

---- আপনি আবার লটরপটর করছেন না তো কারোর সাথে? এমন বোকার মতো কাজ করছেন

যে, চা পাতা তো বয়ামে নয় প্যাকেটে থাকে।

ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাসির। মেয়েটা তো দিনকে রাত বানিয়ে ছাড়বে দেখছে। তাসির অবাক হয়ে বললো,

---- কি নিয়ে কথা বলছো তুমি?

দোয়েল ফোন চেইক করতে করতে বললো,

---- আজকাল অতি ভালোবাসা ও কিন্তু, লটরপটর করার লক্ষন। তা না হলে কেউ চায়ের জায়গায় কালোজিরে আনে? বায় দা ওইয়ে, আপনি দোকানদারকে কি বলেছেন?

তাসির সোজাসাপ্টা ভাবে বললো,

---- কেন নাম বলতে হবে নাকি? সামনে রাখা ছিলো বিল মিটিয়ে নিয়ে আসছি।

---- এই যে মাস্টার্সের এক্সাম দিলেন, কিছুদিন পর রেজাল্ট দিবে আদৌও পাশ করতে পারবেন?

---- মানে আবার কোথায় চলে গেলে? সামান্য জিনিসের জন্য আমার সতেরো বছরের পড়াশোনাকে অপমান করছো তুমি দোয়েল?

দোয়েল ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো,

---- চোখ ঠিক থাকতে ও অন্ধ কাকে বলে জানেন

আপনি?

---- চোখ ঠিক থাকলে অন্ধ বলবে কেন লোকে?

আজগুবি কথাবার্তা বলছো কেন?

---- চোখ থাকতে অন্ধ মানে অশিক্ষিত যারা তাদের সামনে যদি সব লিখে দিন তারা কিছুই বুঝবে না এখন আমার মনে হচ্ছে আপনি ও তাদেরই দলের

আফসোস তারা আর আপনি এক নন।

তাসির ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে বিরবির করলো,

---- ফুল যেমন গাছে সুন্দর বউ ও তেমন বাপের বাড়িতেই সুন্দর। কেন যে বেঈমান মনটা এতো উতলা হয়ে উঠেছিলো আজ কপালে শনি রবি সব দশাই লেগে আছে।

ফের জিজ্ঞেস করলো,

---- রান্না হয়নি?

---- নাহ! হয়নি। নিজের জন্য ও সাথে আমার জন্য বানিয়ে ফেলুন তো ঝটপট কিছু একটা।

হতাশ হলো তাসির। মেয়েটা তাকে রাধুনি বানিয়ে ছাড়বে। কিছুদিন পর হোটেলের সেইফ এর দায়িত্ব পালন করতে পারবে সে। কথা বাড়ালো না তাসির। যতো কম কথা ততোই ভালো নয়তো বউ রাগ করলে সরি বলতে বলতে জীবন তেজপাতা। নিজেকে প্রস্তুত করে কিচেনে রান্না বসালো তাসির।

__________________

---- ঘুরতে যাবো চলুন না যায়? একই জায়গায় থেকে ভোর হচ্ছি তো। ভালো লাগছে না।

সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় মেঘের কোথাও যাওয়া ঠিক বলে মনে হচ্ছে না শ্রাবণের কাছে৷ অন্য সাধারণ মায়ের মতো নয় যে যেখানে খুশি সেখানে যাওয়া যাবে। শ্রাবণ মেঘের পাশেই বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। মেঘ বিরস মুখে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের মুখের দিকে৷ শ্রাবণ বুঝেছে এবং লক্ষ ও করেছে। মেয়েটার বড্ড মুড সুইং হচ্ছে ইদানীং। এই বাড়িতে দিব্য বাদে সবাই এসে দেখে গিয়েছে মেঘকে। মেঘের এতে ভীষণ খারাপ লাগে। দিব্য আসা না আসাতে কিছুই হবে না তবুও শ্রাবণ বারণ করে। দিব্য ও অবশ্য আসবে না। তবুও বারবার বলে দিয়েছে মেঘ দোয়েলের কাছে। অন্তত বড় ভাই হিসেবে যেনো একদিন আসে৷ মেঘ তো সবার সামনেই একদিন সরাসরি বলে উঠে, যদি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মেঘের কিছু হয় তাহলে তো আর কারোর সাথে দেখা হবে না অন্তত শেষ দেখা মনে করে আসুক একদিন। সেদিন শ্রাবণ বেশ রেগে গিয়েছিলো। দুদিন কথা বলেনি অনেক কষ্টে রাগ ভাঙিয়েছিলো মেঘ ও জাহিদ আহমেদ এবং জামিলা বেগম মিলে৷

---- শুনছেন আপনি আমার কথা?

শ্রাবণ মেঘ পাশ ঘেঁষে বসলো। মেঘের মাথাটা তার বক্ষপটে রাখলো সন্তপর্ণে। চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে দিলো। অন্য হাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করছিলো ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল সাবমিট করতে হবে।

ল্যাপটপ স্ক্রিনে চোখ রেখেই শুধালো সে,

---- নিরুপায় আমি ফুল। এই আবদার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তৎক্ষনাৎ মেঘ এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিলো। হাতটা ও ঝাড়ি মেরে সরালো। শ্রাবণ চোখ রাখলো মেঘের মুখাবয়বে। মেয়েটি মুখ কালো করে বলে উঠলো,

---- যেতে হবে না আপনাকে। করুন আপনি কাজ।

নিজেকে সামলে রুম থেকে বের হয়ে গেলো মেঘ।

শ্রাবণ ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হাসে। তার ফুল রাগ করেছে। দ্রুত কাজ করতে লাগলো শ্রাবণ।

মেঘ রুম থেকে বিরক্ত হয়ে বের হয়ে এলো ডয়িংরুমে। সোফায় ভারি শরীরটা এলিয়ে দিলো। কিছুই ভালো লাগে না। সারাক্ষণ রাগ ওঠে শুধু। মাহিরা ফোন করেছিলো দু'বার সামান্য কথা বলেই রেখে দিয়েছে মেঘ। কথা বলার ও ইচ্ছে করে না।

নিজর উপরই নিজের রাগ হয়।

জামিলা বেগম মেঘকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে পাশে বসলেন। মেঘের কাঁধে হাত রেখে শুধালেন তিনি,

---- মন খারাপ?

---- না আন্টি।

তিনি মুচকি হাসলেন। বললেন,

---- মুখটা ওমন কালো হয়ে আছে কেন? নিশ্চয়ই

শ্রাবণ বাবা মেয়েটার কথা রাখেনি।

মেঘ বলে উঠে,

---- আমার কোনো কথা-ই শুনে না ওনি। আমি সামান্য ঘুরতে চেয়েছিলাম কিন্তু, ওনি চাচ্ছে না আমি একটু ভালো থাকি।

জামিলা বেগম মৃদু হাসলেন। বলেন,

---- চলো আমার সাথে মেঘ আমি তোমায় রেডি করিয়ে দিচ্ছি দেখবে নিশ্চয়ই শ্রাবণ বাবা তোমায়

নিয়ে যাবে ঘুরতে ।

মেঘের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। কোমরে এক হাত গুঁজে উঠে দাঁড়ালো সাথে জামিলা বেগমও সাহায্য করলো। মেঘ বললো,

---- চলুন আন্টি।

জামিলা বেগম মেঘকে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন।

জামিলা বেগম মেঘদের সাথেই থাকেন। শ্রাবণ ও মেঘের কথা ভেবে তিনি না করতে পারেননি।

শ্রাবণ কাজ শেষ করে ডয়িংরুমে এসে মেঘকে না পেয়ে ডাক দিলো,

---- মেঘ কোথায় তুমি?

জামিলা বেগম রুমের ভেতর থেকে জবাব দিলেন,

---- মেঘ আমার কাছে আছে। একটু অপেক্ষা করো

আসতেছে ও।

শ্রাবণ সোফায় বসে রইলো। মেয়েটা এই রাতের বেলা ঘুরতে যেতে চেয়েছে তা-ও এই সময় ভয় হয়

শ্রাবণের। তার কাছে মনে হয় কাল কেটে কুমিরকে

ডেকে আনার মতো। শ্রাবণ কুমির বা বিপদ কোনোটাই চাচ্ছে না।

খানিকক্ষণ বাদে রুম থেকে বেরিয়ে এলো মেঘ।

শ্রাবণ যেনো ঘোরের মধ্যে চলে গেলো মেঘকে দেখে। এই শাড়ি তো জামিলা আন্টিকে দেওয়া হয়েছিলো। শাড়িটা অনেক সুন্দর এবং দামিও।

জামিলা বেগম ও তাদের কাছে ভীষণ দামী একজন মানুষ। কিন্তু তিনি মেঘকে সেই সুন্দর শাড়িটা পড়িয়ে দিয়েছেন। অসম্ভব সুন্দর লাগছে একদম গুলুমুলু পুতুল মনে হচ্ছে। শ্রাবণের স্থির দৃষ্টিতে মেঘের দৃষ্টি পড়তেই মেঘ মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে ফেলে। জামিলা বেগম রুমের ভেতরেই চলে যান ওনার দায়িত্ব শেষ। মেঘ এক পা এক পা করে এগিয়ে আসলো ঠিক শ্রাবণের সামনে।

চিবুক উঁচিয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে। ফিসফিস করে মৃদুস্বরে বললো,

---- কেমন লাগছে আমাকে শ্রাবণ সাহেব?

শ্রাবণের পলকহীণ দৃষ্টি তখনো মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার মেঘফুলকে। ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো,

---- একটা গুলুমুলু শাঁকচুন্নি!

হাসি মুখটা চুপসে গেলো তৎক্ষনাৎ মেঘের। রেগে শ্রাবণের বুকে কিল ঘুষি বসালো। খিটখিটে মেজাজে বলে উঠে,

---- আমি শাঁকচুন্নি? আবার বলেন?

শ্রাবণ হাসলো। আদুরে স্বরে বললো,

---- কে বলেছে শাঁকচুন্নি? তুমি তো আমার পবিত্র এক ফুল। আমার বাবুর আম্মু। লুক লাইক সো বিউটিফুল মিসেস শ্রাবণ শিকদার।

মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।

অভিমানী স্বরে বললো,

---- একদম মিথ্যুক আপনি। একটু আগে শাঁকচুন্নি বললেন, এখন আবার ফুল! চাই না আপনার প্রশংসা।

শ্রাবণ হেসে ফেললো। সেই হাসিতে ছিলো না কোনো তাচ্ছিল্য, ছিল একরাশ মুগ্ধতা। দূরত্ব গুছালো পুরোটা। কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়েই রইলো শ্রাবণ তার ফুলের দিকে। যেন এই মেয়েটাকে দেখার কোনো শেষই নেই শ্রাবণের।

জামিলা বেগমের দেওয়া গাঢ় রঙের শাড়িটায় আজ মেঘকে অন্যরকম লাগছে। মাতৃত্ব তার সৌন্দর্যকে যেনো আরও কোমল, আরও পবিত্র করে তুলেছে। গোল হয়ে ওঠা পেটের উপর আলতো করে রাখা এক হাত, অন্য হাতে আঁচল সামলানোর ভঙ্গিটুকুও শ্রাবণের কাছে অপার্থিব লাগছে।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মেঘের কানের পাশে উড়ে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিলো খুবই

সন্তপর্ণে । ধীর গলায় শুধালো,

---- বিকজ ইউ আর মাই ফেভারিট ভিউ।

মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ক্ষীণ রাগ ফুটিয়েই জিজ্ঞেস করলো,

---- মানে?

শ্রাবণ মৃদু হেসে বললো,

---- মানে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা যদি কেউ আমাকে দেখাতে বলে, আমার কোথাও তাকাতে হবে না। আমি শুধু তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবো। আই ডোন্ট নিড টু সার্চ এনিওয়্যার... ইউ আর ইনাফ।

রেগে থাকা মেয়েটার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু, সে হাসিটা চেপে রেখে ফের বললো মেঘ,

---- তাহলে নিয়ে চলুন আমায়।

শ্রাবণ না বুঝার মতো বললো,

---- হোয়্যার?

মেঘ খুশি হয়ে বললো,

---- কেন ঘুরতে।

শ্রাবণ দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করলো। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,

---- স্টাবর্ন ওম্যান!

মেঘ ও ওভাবেই বললো,

---- হুম। আমি এমনই।

শ্রাবণ ও বললো,

---- আই নো।

এই বলে সে হঠাৎ এক হাঁটু গেড়ে বসলো মেঘের সামনে। মেঘ বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে । শ্রাবণ খুব আলতো করে তার গোল পেটটার উপর হাত রাখলো । স্পর্শে ছিল আনন্দ , ভালোবাসা আর অদ্ভুত এক ভয়।

নরম স্বরে বললো,

---- আব্বু... শুনতে পাচ্ছো তোমরা? তোমাদের আম্মু আমাকে খুব বিপদে ফেলেছে। ও এখনই ঘুরতে যেতে চায়। কিন্তু, তোমাদের দু'জনের একটু-ও রিস্ক নেওয়ার সাহস যে তোমাদের আব্বুর নেই। সো... প্লিজ হেল্প ইয়োর আব্বু।

মেঘ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। হেসে ফেললো। বললো,

---- দেখেছেন? আমার সাথেও কথা বলেন না, এখন আমার বাবুর সাথে জোট বেঁধেছেন!

শ্রাবণ মেঘের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। বললো,

---- তোমার সাথে তো প্রতিদিন প্রেম করি। আমার প্রাণদের সাথে একটু বন্ধুত্ব করছি।

মেঘ এবার সত্যিই লজ্জা পেলো। শ্রাবণ উঠে দাঁড়িয়ে দু'হাতে মেঘের মুখটা আলতো করে ধরে বললো,

---- লিসেন টু মি, ফুল...

শ্রাবণের কণ্ঠে এবার কোনো দুষ্টুমি নেই। সে আবার ও বললো,

---- তুমি ভাবছো আমি তোমাকে আটকাচ্ছি?

মেঘ অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইলো খানিক্ষন।

শ্রাবণ আবার ও বললো,

---- নো... আই'ম প্রোটেক্টিং মাই এনটায়ার ওয়ার্ল্ড।

একটু থেমে সে আবার ও বললো,

---- অফিসে আমি প্রতিদিন কত বড় বড় সিদ্ধান্ত নিই। মানুষ আমাকে শক্ত বলে। কিন্তু তুমি জানো? তোমাকে নিয়ে আমি ভীষণ ভয় পাই। এই ভয়টা হারিয়ে ফেলার ভয়। তোমার কিছু হয়ে যাওয়ার ভয়। আমাদের বাবুর কিছু হয়ে যাওয়ার ভয়।

শ্রাবণের কণ্ঠটা বারবার কেঁপে কেঁপে ওঠছে । কাঁপান্বিত কন্ঠে ফের বলে,

---- আমি চাই না আমার অসাবধানতার জন্য তোমাদের একজনেরও একটুখানি কষ্ট হোক মেঘ।

মেঘের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে বুঝতে পারলো, এই মানুষটা তাকে বারণ করছে না বরং আগলে রাখছে। চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠতেই শ্রাবণ আঙুলের ডগায় সেটা মুছে দিলো।

---- আরে! পাগলি মেয়ে কান্না করছো কেন ?

---- আপনার জন্য...

---- রিয়েলি?

মেঘ মাথা নেড়ে বললো,

---- হুম।

---- তাহলে তোমার পানিশমেন্ট আছে।

মেঘ অবাক হয়ে তাকালো।

---- কী পানিশমেন্ট শুনি ?

শ্রাবণ দুষ্টু হেসে বললো,

---- আজ তোমাকে আমি ঘুরতে নিয়ে যাবো। তবে রাস্তায় নয়।

ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো মেঘ,

---- তাহলে?

হাত বাড়িয়ে দিলো শ্রাবণ। বললো,

---- কাম উইথ মি মাই মিসেস।

মেঘ হাত বাড়াতেই শ্রাবণ খুব সাবধানে মেঘের হাত ধরলো। এমনভাবে, যেন একটু জোরে ধরলে মেঘ ব্যথা পাবে। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে লিফট দিয়ে ছাদে উঠলো। রাতের আকাশে আধখানা চাঁদ। চারদিকে নিস্তব্ধতা। হালকা বাতাসে মেঘের আঁচল উড়ে বারবার এসে লাগছে শ্রাবণের গালে।

শ্রাবণ পেছন থেকে আলতো করে মেঘকে জড়িয়ে ধরলো। এক হাত মেঘের পেটের উপর, আরেক হাত মেঘের হাতের উপর রেখে ফিসফিস করে বললো,

---- সি?

---- কী?

---- পুরো পৃথিবীটা এখানেই।

----কোথায়?

শ্রাবণ মেঘের কাঁধে থুতনি রেখে মৃদুস্বরে বললো,

---- আমার সামনে। আমার স্ত্রী... আমার বাবুর আম্মু... আর আমার ছোট্ট বাবুরা।

মেঘ মুগ্ধ হয়ে তাকায় শ্রাবণের কথা শুনে।

একটু থেমে হাসলো শ্রাবণ। আবার বললো,

---- আই ডোন্ট নিড এনিথিং এলস।

মেঘের চোখ ভিজে এলো। ছলছল দৃষ্টি তার।

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে শ্রাবণের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেললো। অপরাধী গলায় বললো,

---- সরি...

শ্রাবণ মেঘের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,

---- নেভার সে সরি ফর ওয়ান্টিং হ্যাপিনেস। সুখ চাইতে হয়, কখনো ক্ষমা চাইতে নেই, মেঘফুল।

মেঘ আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো শ্রাবণকে।

---- তাহলে কবে নিয়ে যাবেন?

---- আর কয়েকটা মাস। আমাদের প্রিন্স ওর প্রিন্সেসরা পৃথিবীতে আসুক। তারপর আমি তোমাদের তিন'জনকে নিয়ে এমন ঘুরবো, যেনো পুরো পৃথিবীটাই ছোট মনে হয়।

মেঘ মুখ তুলে তাকালো। বললো,

---- প্রমিস?

শ্রাবণ তার কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দিয়ে বললো

---- ক্রস মাই হার্ট... আই প্রমিস, মিসেস শ্রাবণ শিকদার।

মেঘ মুচকি হেসে বললো,

---- আপনি না...

---- কী আমি?

---- খুব ভালোবাসেন আমাকে?

শ্রাবণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেঘের দিকে।

বললো,

---- ভালোবাসি?

শ্রাবণ মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললো,

---- না, শব্দটা ছোট হয়ে যায়। আমি তোমাকে নিঃশ্বাসের মতো আগলে রাখি, ফুল। তুমি পাশে থাকলে মনে হয় পৃথিবীটা ঠিক আছে। তুমি হাসলে আমার দিনটা সুন্দর হয়। তুমি কাঁদলে আমার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়।

একটু থেমে দুষ্টু হেসে আবার বললো শ্রাবণ ,

---- আর একটা কথা...

---- কী?

---- আজকে তোমায় এতো সুন্দর লাগছে যে...

মেঘ আগ্রহ নিয়ে তাকালো। বুকের ভেতরটা কেমন উথালপাথাল করছে। কৌতূহল হয়ে বললো,

---- যে?

শ্রাবণ মেঘের নাকের ডগায় আলতো টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বললো,

---- আই'ল ফল ইন লাভ উইথ ইউ... অল ওভার অ্যাগেইন।

মেঘ লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো । ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল প্রশান্ত এক হাসি। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে শ্রাবণ মনে মনে শুধু একটাই দোয়া করলো,

---- আল্লাহ... আমার এই ফুলটার হাসিটা কখনো কেড়ে নিও না। ওর হাসির বিনিময়ে প্রয়োজন হলে আমার সব সুখ নিয়ে নিও। শুধু ও আর আমাদের সন্তানকে সুস্থ রেখো। ওরা-ই যে আমার পৃথিবী, ওরাই আমার সব।

---- চলেন ঘুরাফেরা শেষ বাসায় ফেরা যাক।

মেঘ হাসলো খুব সুন্দর ছিলো মুহূর্তটা।

---- চলুন মিস্টার।

_____________________

----- অ্যাই মেয়ে তুমি এখানে কি করছো? সারাক্ষণ কি মরণের ভুত মাথা চেপে বাইরে আসো নাকি?

---- মরে গেলে আপনার কি? মরতেই এসেছি দয়া করে শান্তিতে মরতে দিন। আর মরা শেষ হলে একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে আমার বাড়িতে সুখবরটা পৌঁছে দিবেন সাথে আমার শশুর বাড়িতে ও যেনো লোকটা আরেকটা বিয়ে করে শান্তিতে থাকতে পারে গুড বাই!

চলবে,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন