#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ৩৯
#তাসনিম_লিজা
----কপি নিষিদ্ধ!
দুই মাস পর,
---- কংগ্রাচুলেশনস ডিয়ার এল্ডার ব্রাদার। ফ্রম টুডে, ইউ আর ফ্রি।
বলেই হাসি মুখে ফুলের মালা পড়ালো কিছু গুন্ডা ছেলেপুলেরা। তাদের মধ্যে থেকে একটা ছেলে বলে উঠে,
---- নয়ন ভাই এবার তো প্রতিশোধ নেওয়ার পালা।
এতগুলো দিন যাদের কারনে এই জেলবন্দি জীবন কাটিয়েছেন তারা কি পাড় পেয়ে যাবে?
নয়ন দুহাত দ্বারা চুল গুলো পেছনে ঠেলে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো,
---- মাত্রই তো খোলা হওয়ায় বের হলাম। একটু রেস্ট নিতে দে। কত কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে।
বাই দা ওইয়ে বাবা আসেনি?
ছেলেটি বললো,
---- ওনি আপনার মুখটাও দেখতে চান না। আর বারন করে দিয়েছেন ওই বাড়িতে আপনার বাড়িতে যাওয়া নিষেধ। আংকেল যা অপমানিত হয়েছে। কি আর করবেন।
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো নয়নের। বাবার উপর না
শ্রাবণের উপর। বাবা তো অনেক টাকা খরচ করে আড়ালে থেকে তাকে আজ মুক্ত করলো৷ নয়তো কোথায় যে হারতো কে জানে? দশটি মাস কাটিয়ে ফেলেছে জেলের মধ্যে। কতশত কথা কত মার খেয়েছে সে। অনেক হিসেব নিকেস বাকি। হয়তো ফাঁসিই হয়ে যেতো৷ এখন শ্রাবণের পালা। তবে গরম গরম নয় ধীরে ধীরে করতে হবে যা করার৷ শান্ত হয়ে বললো,
---- যাবো না ওই বাড়িতে। আমাদের আস্তানায় চল।
---- ওকে বড় ভাই।
_____________________
মেঘ খিলখিল করে হাসছে জামিলা বেগম গল্প বলছেন হাসির। মেয়েটা উঠতেই পারে না ঠিক মতো। সাথে সাথে একজন থাকতেই হয়। শ্রাবণের অবর্তমানে জামিলা বেগম এবং জাহিদ আহমেদ
পাশে থাকতে হয়।
শ্রাবণ দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে তার ফুলের হাসি দেখছে। ক্লান্ত চেহেরাটা উজ্জল হয়ে উঠে মেঘের মুখের হাসি দেখে। মেয়েটা শুধুই অসুস্থ হয়ে পড়ে। মনমরা হয়ে থাকে কিন্তু, তারমধ্যে শুধু একটা কারনই তাকে শান্তি দেয় তার দুটো বেবি যখন পৃথিবীর আলো দেখবে কোল জুড়ে হাত পা নাড়িয়ে হাসবে তখন এই দুঃখ কষ্টগুলো কিছুই মনে হবে না।
---- চলে এসেছেন?
মেঘ খুব কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালো সোফা থেকে।
তার ভরা পেটে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভবই না মেঘের জন্য। শ্রাবণ দ্রুত এসে ধরলো। শাসনের স্বরে বললো,
----- কি করো বলোতো?
জামিলা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে শ্রাবণ,
---- আন্টি ওর জন্য কিছু ফল কেটে আনবেন প্লিজ?
জামিলা বেগম হাসি মুখে বলেন,
---- এই মাত্র জোর করে খাইয়ে দিলাম। তুমি আসোনি বলে মেয়েটা রুমে যাচ্ছেই না। তাই সোফায় বসে ছিলো।
শ্রাবণ মেঘকে ধরে রুমে নিয়ে আসলো৷ বেডে বালিশ রেখে আধশোয়া হয়ে বসালো। কপালে দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে চুমু খেলে। অতঃপর হাতের ঘরিটা ও ফোনটা বেড সাইড টেবিলের উপর রেখে
মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
---- আজকে ও তারা ডিস্টার্ব করেছে?
শ্রাবণের নরম স্বরে গলে যায় মেঘ। হ্যা বোধক মাথা নাড়লো সে। শ্রাবণ মেঘের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বলে উঠে,
---- একটু কষ্ট করে নাও ফুল। আমি বুঝতে পারছি তোমার কষ্টটা। কিন্তু কি করার বলো?
মৃদু হাসলো মেঘ৷ বললো,
---- আমার কষ্ট হলেও আনন্দ হয় জানেন ওরা আমার পেটে লাথি মারে না ওরা ভালো আছে। ওরা খেলাধুলা করে। আর আমাকে বোঝায় তারা
ভালো আছে। আমাকে অনুভব করায় এই সুন্দর সময়টা কতটা সুন্দর।
---- আমার সন্তানের জন্য তুমি কষ্টটা বৃথা যাবে না ফুল। তার প্রতিদান হিসেবে আজীবন তোমায় এভাবেই আগলে রাখবো যেভাবে হাজার ব্যাথা সহ্য করে ও আমাদের সন্তাদের যেভাবে আগলে রেখেছো।
মেঘ হাসিমুখে বলে উঠে,
---- যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। আন্টি খাবার দিচ্ছেন।
খেয়ে আসুন।
---- রাতে আর খাবো না। আন্টি আসলে বারন করে দিও।
---- কেন খাবেন না?
---- খেয়ে আসছি। ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং এটেন্ড করেছিলাম রেস্টুরেন্টে সেখানে সবার জোর করায়
না করতে পারিনি।
শ্রাবণ ফ্রেশ হয়ে এসে ল্যাবটপ নিয়ে একপাশে রাখে। অপর পাশে মেঘকে নিজের সাথে নিয়ে তার উদরে আলতো হাত বুলাতে থাকে সাথে কিছু কাজ ও করতে থাকে যা আগেই কমপ্লিট করে রাখলে সামনে মেঘের পাশে থাকতে তার কোনো অসুবিধে হবে না।
মেঘ ঘুমিয়ে যায় একসময়। আলতো হাতে শুইয়ে দেয় পুতুলের ন্যায় যত্ন করে। নিজে ও ঘুমিয়ে পড়ে।
______________________
নির্জন রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতার এমন এক গভীর আস্তরণ, যেনো পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। বাইরে কেবল ঝিঁঝি পোকার ডাক মাঝে মধ্যে এক দুটো গাড়ি যাওয়ার শব্দ হচ্ছে।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে শ্রাবণের কানে ভেসে এলো তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। শব্দের সঙ্গে মিশে আছে কারও দমবন্ধ গুঙানি, চাপা কান্না।
স্বপ্ন ভেবে হঠাৎ এক ঝটকায় উঠে বসলো শ্রাবণ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না সে । তারপর পাশ ফিরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো শ্রাবণের। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- মে.. মেঘ!
বিছানার চাদর দু'হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে মেঘ । কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঠোঁট কাঁপছে, বুকটা অস্বাভাবিক দ্রুত ওঠানামা করছে মেঘের । প্রতিটি শ্বাস যেনো বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। মুখে যন্ত্রণার ছাপ এতটাই গভীর যে তাকিয়েও থাকা যাচ্ছে না মেঘের দিকে। নাক মুখ কুঁচকে ফেলছে যন্ত্রণায়। শ্রাবণ আলতো উদরে হাত রেখে আরেক হাত গালে বুলিয়ে ফের বললো,
---- মেঘ..কী হয়েছে তোমার ? আমার দিকে তাকাও মেঘ? তোমার কষ্ট হচ্ছে? বেবিরা ব্যাথা দিচ্ছে ঠিক হয়ে যাবে এখনই।
শ্রাবণের কাঁপা কণ্ঠেও কোনো সাড়া নেই মেঘের। মেঘ কথা বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দগুলো যেনো গলায় আটকে যাচ্ছে তার । ঠোঁট সামান্য নড়লো, অথচ বের হলো শুধু ভাঙা ভাঙা শ্বাসের শব্দ।
হঠাৎই তলপেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলো মেঘ। নিঃশব্দে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু। ঠোঁট ফাঁক করে অস্পষ্ট স্বরে শুধু বলতে চেষ্টা করলো সে,
---- ব্য... ব্যথা. করছে। পা..রছি না।
বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই আরেক দফা তীব্র যন্ত্রণা শরীর কাঁপিয়ে দিলো তাকে। শ্বাস নিতে গিয়ে যেনো আরোও বেশি কষ্ট হচ্ছে মেঘের। প্রতিটি নিশ্বাসের জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে মেঘ।
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা হিম শীতল হয়ে গেলো।
থরথর করে কাঁপছে শ্রাবণ নিজেই। মেঘের এমন অবস্থা নিজ চোখে দেখা যে কতটা কষ্টের তা বেশ ভালো উপলব্ধি করতে পারছে।
ডাক্তারের কথা স্পষ্ট মনে আছে শ্রাবণের। আরও অন্তত বিশ থেকে ত্রিশ দিন বাকি মানে পুরো একমাস। এই সময়ে এমন ব্যথা, নাকি?
না, এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না।
কাঁপা হাতে মেঘকে নিজের বুকে আগলে নিলো শ্রাবণ। বারবার তার কপালে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছে সে, অথচ নিজের হাতই কাঁপছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। মেঘর মুখে এলোমেলো ভাবে চুমু খাচ্ছে। কিছু হবে না এই শব্দটা হাজারবার বলছে শ্রাবণ। মেঘ কিছু বলার চেষ্টা করে ও পারছে না। শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ বলে উঠে,
---- কিছু হবে না, মেঘ। আমি আছি.. আমি আছি। এক্ষুনি হাসপাতালে যাচ্ছি আমরা। তুমি শুধু একটু সাহস রাখো। কিছুই হবে না আমার ফুলের।
মেঘের চোখে তখন শুধু অসহনীয় যন্ত্রণা ফুটে ওঠছে। চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট ক্রমেই বাড়ছে, আর তলপেটের ব্যথাগুলো আগের চেয়ে অনেক কম সময়ের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে বেড়ে চলেছে।
মেঘের বুকের ওঠানামা যেন প্রতি মুহূর্তে আরও দ্রুত হয়ে উঠছে। প্রতিটি শ্বাস নিতে গিয়ে পুরো শরীরটা কেঁপে উঠছে তার। ব্যথার তীব্রতায় দু'হাতে নিজের তলপেট শক্ত করে চেপে ধরেছে সে। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম, চোখ দুটো ভিজে গেছে অসহ্য যন্ত্রণায় কার্নিশ বেয়ে।
মুহূর্তেই শ্রাবণের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। ছেড়ে যেতে ও ভয় হচ্ছে। মেঘকে ফের বেডে শুইয়ে রেখে বললো,
---- মেঘ! আমার দিকে তাকাও। প্লিজ, একবার কথা বলো। নিজেকে রিলাক্স রাখো কিছু হয়নি ভয় পেয়ো না।
কিন্তু মেঘের ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ বের হলো না। শুধু অসহায় চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। সেই চোখে ছিলো ভয়, অসহনীয় কষ্ট।
মেঘ এমনিতেই ভয় পাই। শ্রাবণকে পাওয়ার পর যেনো মেয়েটা শুধু বাঁচতে চাই। কতবার যে বলেছে যদি তার কিছু হয়ে যায় তাহলে কি শ্রাবণ আরেকটা বিয়ে করবে? এটা মেনে নেওয়া যায় না।
সে মরবে না মরতে চাই না শ্রাবণকে কারোর হতে দিবে না। তার শ্রাবণ শুধু তার। যখন মেঘের মুড সুইং হতো তখন বলতো এগুলো। প্রথমে রাগ করলে ও পরে সেটা অভ্যস্ত হয়ে যায় শ্রাবণের। আর এক সেকেন্ডও আর দেরি করলো না শ্রাবণ।
বিছানা ছেড়ে জাহিদ আহমেদ এর রুমের দরজার দিকে ছুটে গিয়ে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলো শ্রাবণ,
---- বাবা দরজা খুলুন। বাবা.. বাবা! দরজা খুলুন!
মেঘের কষ্ট হচ্ছে আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
শ্রাবণের কণ্ঠের আতঙ্কে যেনো রাতের নিস্তব্ধতাও কেঁপে উঠলো। নিজেই দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না সে কিভাবে মেঘকে সামলাবে? মানুষ শুনলে কি ভাববে? ছেলে মানুষ হয়ে এতোটা নরম হয়?
পরক্ষণেই আবার জামিলা বেগম এর রুমের সামনপ গিয়ে আরও জোরে চিৎকার করে ডাকলো সে,
---- আন্টি! আন্টি! প্লিজ, তাড়াতাড়ি আসুন! মেঘের অবস্থা খুব খারাপ!
সেই কাঁপা গলার আর্তচিৎকারে পুরো বাড়িটাই যেনো এক নিমিষে জেগে উঠলো।
দ্রুত নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন জাহিদ আহমেদ। চোখেমুখে ঘুমের ছাপ থাকলেও শ্রাবণের কণ্ঠ শুনে মুহূর্তেই সব উধাও। তাঁর পেছন পেছন ছুটে এলেন জামিলা বেগম। কথাটা শুনে আতঙ্কে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
---- হসপিটালে নিতে হবে তো। কিন্তু সময় তো আরো পরে।
শ্রাবণের ভেঙে পড়েছে। তবুও বলছে
---- মেঘ শ্বাস নিতে পারছে না। ব্যথায় ছটফট করছে! ওকে বাঁচাতে হবে।
কথাগুলো বলতে বলতেই শ্রাবণের গলা ভেঙে এলো।
জামিলা বেগম আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন না। ছুটে গিয়ে মেঘের কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলেন।
---- হায় আল্লাহ! শরীরটা একেবারে ঘামে ভিজে একাকার।
মেঘ তখনও তীব্র শ্বাস নিতে নিতে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণার ঢেউ এলে পুরো শরীর শক্ত হয়ে উঠছে, আবার নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
জাহিদ আহমেদের বহু বছরের স্থির ব্যক্তিত্বও সেই মুহূর্তে ভেঙে পড়লো । তবুও নিজেকে শক্ত রেখে অস্থির হয়ে বললেন,
---- শ্রাবণ, ওকে কোলে নাও। এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। আমার মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। এই সময় এতো ভেঙে পড়লে চলবে না৷
শ্রাবণ কোনো উত্তর দিলো না। নিজেকে সামলে
সাবধানে, বুকের সঙ্গে আগলে তুলে নিলো তার মেঘকে। এতটাই আলতো করে ধরে আছে, যেন সামান্য ঝাঁকুনিতেও কষ্ট বেড়ে যাবে তার মেঘফুলের।
মেঘ কাঁপা হাতে শ্রাবণের শার্ট আঁকড়ে ধরলো। ঠোঁট নীলচে হয়ে এসেছে। খুব কষ্টে ভাঙা স্বরে শুধু ফিসফিস করে বলতে লাগলো,
---- শ্রা'বণ! আ'আমাকে বাঁচাবেন দ'দয়া করে। আ'মি আ'প নার সা'থে বা'বাঁচতে চাই। আ'মাকে ছেড়ে যা'যাবেন না।
শ্রাবণের নিজেকে সামলতে হিমসিম খাচ্ছে। কি করে বোঝাবে সে মেঘের এমন অবস্থা দেখে শ্রাবণের ভেতরটা যে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
আশ্বাস দিয়ে বললো শ্রাবণ,
---- আমি আছি, মেঘ। আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুমি শুধু চোখ বন্ধ করো না। আমার দিকে তাকিয়ে থাকো প্লিজ।
শ্রাবণের চোখ ভিজে উঠেছে। কিন্তু আজ কান্নার সময় নেই।
লিফটের সামনে এসে দাঁড়াতেই যেনো প্রতিটি সেকেন্ড কয়েক ঘণ্টার সমান দীর্ঘ মনে হতে লাগলো শ্রাবণের কাছে । ডিজিটাল সংখ্যাগুলো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, অথচ কারও ধৈর্য নেই সেই অপেক্ষা সহ্য করার।
'টিং' শব্দে দরজা খুলতেই সবাই দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়লো।
শ্রাবণ মনে মনে তখন শুধু দোয়া করছে,
---- হে আল্লাহ! আমার মেঘ আর আমাদের দুই সন্তানকে আপনি রক্ষা করুন। ওদের কিছু হলে আমি বাঁচব না। ওরা যে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
লিফট নিচে নামছে, কিন্তু শ্রাবণের মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে গেছে।
ভূতলে পৌঁছাতেই জাহিদ আহমেদ এক দৌড়ে গ্যারেজে চলে গেলেন। কাঁপা হাতে গাড়ির দরজা খুলে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। অন্যদিকে জামিলা বেগম পেছনের সিটে বসে মেঘের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে এক হাতে তার কপাল মুছছেন। তিনি সাথে অবিরাম দোয়া পড়ে চলেছেন।
শ্রাবণ মেঘের হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে। প্রতিবার ব্যথার ঢেউ উঠলেই মেঘের আঙুলগুলো তার হাতের মুঠোয় আরও শক্ত হয়ে চেপে বসছে। সেই চাপেই বোঝা যাচ্ছে, কতটা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার মেঘ।
নিশুতি রাত চিরে গাড়িটা ছুটে চললো হাসপাতালের দিকে। চারপাশের ফাঁকা রাস্তাগুলো, নিভু-নিভু স্ট্রিটলাইট, আর গাড়ির তীব্র গতির শব্দ সবকিছু মিলিয়ে যেনো শুরু হয়ে গেলো জীবনের সবচেয়ে কঠিন এক যুদ্ধের পথচলা।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এসে থামলো গাড়িটি।
গাড়ি থামার আগেই হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে ছুটে এলো। দরজা খুলতেই শ্রাবণ সাবধানে মেঘকে কোলে তুলে নামালো। কিন্তু তার কোলে থেকেও মেঘের শরীরটা যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছে। প্রতিটি শ্বাস যেনো বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।
---- ইমার্জেন্সি! রোগী আট মাসের প্রেগন্যান্ট! টুইন বেবি! পালমোনারি হাইপারটেনশন আছে।
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল শ্রাবণ। ফের বলে,
---- ডক্টর রফিকুল ইসলাম আমানকে জানাবেন প্লিজ। আমি ফোন আনতে ভুলে গিয়েছি। ওনি সবই জানেন।
মুহূর্তের মধ্যেই জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সরা মেঘকে স্ট্রেচারে শুইয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ডক্টরকে ও জানানো হলো সেই বিষয়ে।
একজন নার্স দ্রুত আঙুলে অক্সিজেন মাপার যন্ত্র পরিয়ে দিলেন। আরেকজন রক্তচাপ মাপছেন। অন্য একজন নাকে অক্সিজেনের মাস্ক পরিয়ে দিলেন।
মেঘ কষ্টে চোখ খুলে শ্রাবণকে খুঁজলো চারপাশ। সেটা বুঝতে পেরে শ্রাবণ ছুটে এসে তার হাতটা নিজের মুঠোয় নিলো। শান্তনা দিয়ে বললো,
--- আমি এখানেই আছি, মেঘ। তুমি ভয় পেও না।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিউটি অবস্টেট্রিশিয়ান, হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডক্টর এসে পৌঁছালেন। দ্রুত আল্ট্রাসাউন্ড, শিশুর হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ এবং মায়ের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা শুরু হলো।
মনিটরের একের পর এক শব্দে ভারী হয়ে উঠলো কেবিনটা।
কিছুক্ষণ নীরবে রিপোর্ট দেখার পর প্রধান চিকিৎসক গভীর স্বরে বললেন,
---- রোগীর শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে গেছে। পালমোনারি হাইপারটেনশনের কারণে হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। পাশাপাশি জরায়ুর নিয়মিত সংকোচন শুরু হয়েছে। আমরা আর অপেক্ষা করতে পারবো না।
শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠলো। ভাঙা স্বরে বললো,
---- ডাক্তার ও আর আমাদের বাচ্চারা সব ঠিক তো?
ডক্টর কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললেন,
---- আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কিন্তু আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। সিজারিয়ান সেকশন পেশেন্টের জন্য উচ্চ ঝুঁকির হলে ও এখন মা এবং দুই শিশুর নিরাপত্তার জন্য জরুরি সিজারিয়ান করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। এছাড়া কোনো পথ নেই। আপনি একটি সাইন করে দিন।
শ্রাবণের গলা শুকিয়ে গেলো। ভালো আবার খারাপ মানে খারাপ কিন্তু এর চেয়ে ভালো উপায় নেই। সেজন্য এটাকে ভালো বলছেন তারা।
শ্রাবণের হাত থেকে যেনো সমস্ত শক্তি হারিয়ে গেলো।
শ্রাবণ কাঁপা হাতে একটও পেপারে সাইন করলো
যে পেপারে সুন্দর করে বড় বড় অক্ষরে লিখা পেশেন্ট মারা গেলে তার দায়ী ডক্টরের নয়৷
অন্যদিকে নার্সরা মেঘকে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা লাগানো হলো। প্রয়োজনীয় রক্তের নমুনা পাঠানো হলো ল্যাবে । অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মেঘ আধখোলা চোখে একবার শ্রাবণের দিকে তাকালো। অক্সিজেন মাস্কের আড়াল থেকেও চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু স্পষ্ট।
শ্রাবণ এগিয়ে এসে তার কপালে দীর্ঘ একটি চুমু রাখলো। ব্যাথা থাকলে ও কম মনে হচ্ছে নাকি নার্স কিছু করেছে মেঘের জানা নেই। শ্রাবণ মেঘকে বুঝতে না দিয়ে আলতো হেসে বললো,
---- শোনো ফুল তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে আমরা দুজন একসাথে বুড়ো হবো । আজ সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙতে পারবে না বলে দিলাম। তুমি ফিরে আসবে আমাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে হাসবে। আমি অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। তুমিহীন শ্রাবণশূন্য আমার জন্য বেঁচে থাকবে তুমি।
মেঘ দুর্বল হাতে শ্রাবণের আঙুল ছুঁয়ে দিলো শ্রাবণের গালে। সেটুকুই যেনো হাজার কথার সমান মেঘের কাছে।
ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেলো। স্ট্রেচার ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে গেলো।
ভারী দরজাটি বন্ধ হয়ে যেতেই করিডোরজুড়ে নেমে এলো এক অসহনীয় নীরবতা।দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির প্রতিটি সেকেন্ড যেনো আজ ঘণ্টার সমান দীর্ঘ।
শ্রাবণ দু'হাত জোড় করে মাথা নিচু করে বসে রইলো । ঠোঁট দুটো শুধু একটাই প্রার্থনা করছে,
--- হে আল্লাহ আমার মেঘকে ফিরিয়ে দিন। ওকে ছাড়া এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কারন নেই। এই শূন্য শ্রাবণকে আর শূন্য করবেন না।
করিডোরের আলো তখনও জ্বলছে। অপারেশন থিয়েটারের ওপরে লাল বাতিটাও নিভেনি। জাহিদ আহমেদ নিজেই ভেঙে পড়েছেন তার একমাত্র মেয়ে তার জীবন। সব যেনো ঠিক হয়। পাশে শান্তনা দিচ্ছে জামিলা বেগম। কি'বা বলবেন তিনি ডক্টরের অপেক্ষায় সবাই।
সবার অপেক্ষা এখন সেই একটি দরজার দিকে যে দরজার ওপাশে একসঙ্গে লড়াই করছে তিনটি প্রাণ। অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটা অবশেষে নিভে গেলো।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে সেই দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল শ্রাবণ। ঘড়ির প্রতিটি সেকেন্ড যেনো তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কখনো বসছে, কখনো উঠে দাঁড়াচ্ছে, কখনো দু'হাত তুলে আল্লাহর কাছে মিনতি করছে। শুধু যেনো তার মেঘ আর তাদের দুই সন্তান সুস্থ থাকে।
অবশেষে দরজাটা ধীরে ধীরে খুললো।সাদা অ্যাপ্রোনের ওপর সবুজ সার্জিক্যাল গাউন, মুখে ক্লান্তির ছাপ, দুজন ডক্টর ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন। তাদের পেছনে আরও দুজন নার্স ও।
শ্রাবণ প্রায় দৌড়ে গেলো তাদের সামনে। দ্রুত জানতে চাইলো,
---- ডক্টর! আমার ওয়াইফ কেমন আছে? মেঘ ঠিক আছে তো?
ডাক্তার এক মুহূর্ত চুপ থেকে শ্রাবণের কাঁধে হাত রাখলেন। মুচকি হেসে বললেন,
---- মিস্টার শ্রাবণ ফার্স্ট অব অল, কনগ্র্যাচুলেশন। আল্লাহর রহমতে আপনাদের টুইনস বেবি হয়েছে।
একজন নার্স বললো,
--- এক ছেলে এবং এক মেয়ে।
কথাটা শুনেই শ্রাবণের চোখ ভিজে উঠলো আনন্দ সেটা দমিৈ রেখে তড়িৎ জিগ্যেস করলো,
---- আর মেঘ?
ডাক্তার এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
---- ইমার্জেন্সি সি-সেকশন সফল হয়েছে। কিন্তু আপনার ওয়াইফের কন্ডিশন এখনও পুরোপুরি স্টেবল না। পালমোনারি হাইপারটেনশনের কারণে ওর হার্ট আর লাংসের ওপর অনেক প্রেসার পড়েছে। অপারেশনের সময়ও আমরা খুব কেয়ারফুলি এগিয়েছি।
কথাগুলো বলেই তিনি হাতে থাকা রিপোর্টটা একবার দেখলেন। বলেন,
---- রাইট নাউ, শি ইজ ইন আইসিইউ অবজারভেশনে। আগামী চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা আমাদের জন্য খুব ক্রিটিক্যাল। এই সময়টায় আমরা কোনো রিস্ক নিতে চাই না।
শ্রাবণের গলা শুকিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। বললো,
--- ডক্টর আপাতত কোনো টেনশনের কারন নেই তো?
ডাক্তার শান্ত কণ্ঠে বললেন,
---- দেখুন, আমি মিথ্যা আশা দিতে চাই না। শি ইজ আ ফাইটার। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এখন সবচেয়ে বেশি দরকার দোয়া।আপনার এখন উপরওয়ালাকে ডাকুন।
শ্রাবণের চোখ ভিজে উঠলো নীরব কান্নায়। পারছে না ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে। অনুরোধ করে বললো শ্রাবণ ডাক্তারকে,
---- আমি আমি কি ওকে একবার দেখতে পারি ডক্টর?
--- দেখতে পারবেন। তবে খুব অল্প সময়ের জন্য। ও এখনও অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাবে আছে।
হঠাৎই ডাক্তার হালকা হাসলেন। বললেন,
--- আর একটা সুখবর আছে।
শ্রাবণ বিস্মিত হয়ে তাকালো। আগ্রহ নিয়ে তাকায় সে, ডাক্তার বলেন,
--- আপনার ছেলে আর মেয়ে দুজনেই কান্না করেছে। এটা খুব ভালো লক্ষণ। তবে ওরা দুজনই একটু প্রিম্যাচিউর হয়েছে। তাই সেফটির জন্য আমরা ওদের এনআইসিইউ। মানে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে রেখেছি। কয়েকদিন অবজারভেশনে থাকবে।
শ্রাবণের মুখে বহুক্ষণ পর একফোঁটা হাসি ফুটে উঠলো।
ডাক্তার আবারও বললেন,
---- চলুন, দূর থেকে আপনার বাচ্চাদের দেখিয়ে দিই। তবে ছোঁয়া যাবে না। ওদের শরীর এখনও খুব সেনসিটিভ।
কাচঘেরা নিওনেটাল কেয়ার ইউনিটের সামনে দাঁড়াতেই শ্রাবণের নিঃশ্বাস আটকে গেলো।
ছোট্ট দুটি প্রাণ!
একজন গোলাপি কাপড়ে মোড়ানো, অন্যজন হালকা সাদা কম্বলের ভেতর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। এতটুকু হাত... এতটুকু আঙুল...
শ্রাবণের চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
বাচ্চাদের কান্ডিশন তেমন ভালো না বলে দেখানোর প্রয়োজন মনে করেনি নার্স।
কাঁপা হাতে কাচের ওপর আলতো স্পর্শ রেখে ফিসফিস করে বললো শ্রাবণ।
--- তোমরা সুস্থ হয়ে ওঠো আব্বু আম্মু। তোমার যে আমাদের প্রাণ। কবে ছুঁয়ে দেখবো তোমাদের?
তোমাদের বাবার যে আর তর সয়ছে না।
তার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন এই ছোট্ট দুটো মুখের মাঝেই লুকিয়ে আছে।
বাইরে থেকে শ্রাবণের হাসি মুখটা দেখে সস্তি পেলেন জাহিদ আহমেদ। মেয়ে ও নাতি নাতনিরা ঠিক থাকলে সবাই ঠিক এই দোয়ায় করছেন বারংবার তিনি৷
চলবে,,,