#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান — ৪০
#তাসনিম_লিজা
----কপি নিষিদ্ধ!
রাত পেরিয়ে ভোরের হালকা আলো পড়তেই শ্রাবণের চোখ মুখ কুঁচকে এলো। সাথে মানুষের কোলাহল তো আছেই। বাড়ি নয় এটা হসপিটাল, এখানে মানুষের আনাগোনা চব্বিশ ঘণ্টাই থাকে। জোর করে জাহিদ আহমেদ ও জামিলা বেগমকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলো শ্রাবণ। এতো এতো পেশেন্ট যে কোনো কেবিন ও খালি নেই। অতিরিক্ত টাকা ব্যায় করলে কেবিন বুক করা যেতো কিন্তু, সেই সময় কিংবা কথা বলার মতো অবস্থা ও শ্রাবণের নেই।
সেই যে মেঘের কেবিনের সামনে চেয়ারে বসে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো মেয়েটার কখন জ্ঞান ফিরবে মেঘের আর কখন তার সাথে কথা বলতে পারবে শ্রাবণ। তার সেই খেয়াল নেই যে সে কোথায় আছে বা কি করছে। নিজের দিকে ভালো ভাবে তাকালে বুঝতে পারতো যার পরনে এলোমেলো ভাঁজ ভাঙা কুঁচকে যাওয়া এ্যাশ কালারের শার্ট চুলগুলো এলোমেলো এমন যে পাগলের ন্যায় লাগছে ছেলেটাকে। সেদিকে শ্রাবণ ফিরে ও তাকাচ্ছে না।
মন মস্তিষ্ক কেবল মেঘ মেঘ করছে। তার মেঘফুল বেঁচে থাকুক। এটাও তার মিনতি উপরওয়ালার কাছে।
ঘুম কিসের তার? রাত তিনটের দিকে অতিরিক্ত টেনশন ও ক্লান্ত হওয়ায় কবে যে দুচোখ লেগে এসেছিলো ঠাহরই করতে পারেনি শ্রাবণ। নার্সকে বেরিয়ে যেতে দেখা গেলো, মূলত তার হয়তো কিছু লাগবে বা ডক্টরের কাছে যাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে দাঁড়ালো শ্রাবণ। খানিকটা জোরে ডাক দিলো সে,
---- এসকিউস মি নার্স আমার মেঘ কেমন আছে?
সুস্থ আছে তো? ওর জ্ঞান ফিরছে না কেন?
নার্স সামনের দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসলেন। এই যুগে এমন হাসবেন্ড পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কতটা ডেস্পারেট সে মেঘের জন্য। ছেলে মানুষ হয়ে কতটা কান্না করেছে, নির্ঘুম রাত্রিযাপন করেছে। বারবার উঁকি দিচ্ছিলো মেঘের দেখা পাওয়ার জন্য। সারাক্ষণ বিরবির করছে একাকি কি যেনো। মানে নিজের দিকে সন্তানের দিকে খেয়াল আছে? নাকি বউয়ের জন্যই শুধু পরান পুড়ছে। হারানোর ভয়ে কাঁপছে? নার্সটি শ্রাবণের মুখোমুখি হয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো,
---- আপনার ওয়াইফ আপাতত বিপদমুক্ত। তবে সময় লাগবে সুস্থ হতে। ওনার কান্ডিশন আর পাঁচটা মায়ের মতো নয়। আমরা ওনাকে প্রপার ট্রিটমেন্ট দিচ্ছি। আমরা ও চাই ওনি দ্রুত সুস্থ হয়ে দুটো ছোট্ট প্রাণকে বুকে আগলে নিক।
সস্থির নিঃশ্বাস ফেললো শ্রাবণ। মুখে আলতো হাসি টেনে কৃতজ্ঞতা জানালেন নার্সের প্রতি,
---- ধন্যবাদ আপু।
মুচকি হাসলেন নার্স। বললেন,
---- ধন্যবাদ দিতে হবে না এটা আমার দায়িত্ব।
নার্স মেয়েটি চলে যান। তার মধ্যে ডক্টর একবার এসে চেকআপ করে যান মেঘের। তবে শ্রাবণকে কিছুই বলেনি ডক্টর।
শ্রাবণ উদাসীন ভঙ্গিতে কখনো মেঘের কেবিনের বাইরে আবার কখনো বেবিদের কেবিনের বাইরে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে। তাদের দেখা মিলে না।
সময় গড়ালো তার নিজস্ব গতিতে। তাসির একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছিলো রাত থেকে যখন তার কানে খবরটা আসে নয়ন জেল থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। মূলত নয়ন কখনোই শুধরাবে না তারা দলবল নিয়ে শ্রাবণের ক্ষতি করার চেষ্টা করবেই, তাই সাবধানে থাকার জন্য কল দিচ্ছিলো পাইনি বলে দোয়েলকে সাথে করে শ্রাবণদের বাসায় আসে তারা দুজন। আবার তাদের কোনো বিপদ হলো না তো এই ভয়ে।
বাসায় আসতে না আসতেই দেখলো রেডি হয়ে জাহিদ আহমেদ ও জামিলা বেগম কোথায় যেতে নিচ্ছিলেন। তাসির ও দোয়েলকে দেখেই জাহিদ আহমেদ বলে উঠেন,
---- তোমরা এসেছো?
দোয়েল তৎক্ষনাৎ বলে উঠে,
---- কোথায় যাচ্ছো চাচ্চু? মেঘ আর শ্রাবণ ভাইয়া কোথায়?
জামিলা বেগম বলেন,
---- ওরা তো হসপিটালে। মেঘের দুটো ছেলে ও মেয়ে হয়েছে।
হাসি মুখেই বলেন তিনি। কিন্তু জাহিদ আহমেদ বলেন,
---- আমার মেয়েটার অবস্থা বেশি ভালো না। তাড়াতাড়ি যেতে হবে কি অবস্থা ওদিকের কিছুই জানি না।
হাসি মুখটা মুহুর্তের মধ্যে চুপসে গেলো তাসির ও দোয়েলের। দোয়েল বললো,
---- আমরা তো জানতামই না। এতো তাড়াতাড়ি কি থেকে কি হলো?
তাসির দোয়েলকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
---- আপনারা চিন্তা করবেন না চাচ্চু। মেঘ সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আপাতত আমাদের হসপিটালে যেতে হবে।
এমনিতেই মেঘকে নিয়ে টেনশনে আছে সবাই তার মধ্যে যদি নয়নের জেল থেকে মুক্তি হওয়ার কথা শুনে তাহলে তো ভয়ে আরো অবস্থা নাজেহাল হবে সরল মানুষগুলোর। চুপ করে গেলো তাসির। মেঘ ও বেবিরা সুস্থ হলে তারপর না হয় জানানো যাবে। তাসির বন্ধুদের টেক্সট করে জানিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো একসাথে।
________________________
---- চলুন না যায় আমরা? এখনো তাদের উপর রেগে আছেন আপনি?
---- আমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই দোয়া। তারা সবাই আছে তো মেঘের পাশে। শ্রাবণ আমায় ওখানে দেখলে উল্টাপাল্টা রিয়াক্ট করতে পারে। ও ভাবে আমি এখনো মেঘেের অপেক্ষায় আছি। কোনো অযুহাতে ওকে নিয়ে নিতে পারি শ্রাবণের কাছ থেকে।
---- আপনি কি এখনো মেঘ আপুক...
---- নাহ!
দোয়া মৃদু হেসে দিব্যর এক হাত জড়িয়ে বলে উঠে,
---- শ্রাবণ ভাইয়া জানে না বোকা পুলিশের বউ আছে। বোকা পুলিশ তার বউকে বড্ড ভালোবাসে। তার কোনো মেঘ চাই না। মেঘ তো শ্রাবণের হয়। শ্রাবণের বুকেই তো মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ে। আর দিব্যর বুকে কেবলই দোয়া আছে। বুঝলেন পুলিশ অফিসার?
দিব্য কিঞ্চিত হাসলো। অবাক ও হলো বটে। মেয়েটা কিছুদিন আগে ও মেঘকে হিংসা করতো৷ মেঘকে নয় মানে দিব্যের মেঘকে। মেঘ তো অনেক দূরে ৷ কিন্তু মানস্পটে যে মেঘ থাকতো যার কারনে দুজনের দূরত্ব ছিলো সেই মেঘকে। দিব্য দোয়ার গালে আলতো হাত বুলিয়ে বললো,
---- অবশ্যই যাবো। আমরা এক জোড়া চড়ুইদের অবশ্যই দেখতে যাবো। তাদের না দেখলে মনে শান্তি পাবো না তো।
খুশি হলো দোয়া। বললো,
---- তাহলে আমি আগে বাবা মাকে বলে আসি।
ওনারা ও যাবেন। আর আমি ও রেডি হচ্ছি। একসাথে যাবো সবাই।
---- আচ্ছা যাও।
দিব্য নিজের ইউনিফর্ম পড়ে নিলো। আগে সবার সাথে মেডিকেল যাবে সে। প্রায় আটটি মাস পর দিব্য মেঘকে চোখের সামনে দেখতে পাবে। এবং শ্রাবণ মেঘের ছোট্ট ছানাপোনাদের দেখার আগ্রহে প্রহর গুনছে সে।
_____________________
রাত থেকে নিজের খেয়ালে নেই শ্রাবণ। অপেক্ষায় আছে মেঘের দেখা পাওয়ার। কবে ফিরবে তার সেন্স? বার বার যেনো অনুরোধ করছে ছোট্ট গোলাকার কাঁচটায়।
ভেতরে ডিউটিরত নার্স রয়েছেন। তিনি বার বার চেইক করছেন মেঘের কান্ডিশন। সাথে শ্রাবণের এই অস্থিরতা দেখে মুচকি হাসেন। মেয়েটির ভাগ্যটা কতটা সুন্দর তা তিনি বেশ ভালো বুঝতে পেরেছেন। যতোবার বের হয়েছে ততোবারই জিজ্ঞেস করেছে তার মেঘ কেমন আছে? নিজের কথা ভেবে আফসোস করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নিজের কাজ করেন।
---- শ্রাবণ তুই ঠিক আছিস ভাই?
---- মেঘ কেমন আছে শ্রাবণ ভাইয়া ?
---- তুই টেনশন করবি না সব ঠিক হয়ে যাবে।
---- বাবুরা কেমন আছে?
---- সবাই ঠিক তো?
তাদের পিছু আসছে জাহিদ আহমেদ ও জামিলা বেগম। তাসির, দোয়েল, রাতুল, রামিম ও রিফাত একসাথে প্রশ্ন করে উঠলো। শ্রাবণ যেনো সস্থি পেলো। একা একা ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলছিলো। তারমধ্যে তাসির শ্রাবণের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠে,
---- আরে কাঁদছিস কেন? মানুষ কি ভাববে বল? আর আমার মেয়ের জামাই কোথায় বলতো? আবার আমাদের ছোট্ট মেঘ ও এসেছে। কোথায় তারা?
শ্রাবণ চেয়ে ও হাসতে পারলো না। তার মধ্যে নার্স
এসে বললো,
---- পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে মিস্টার শ্রাবণ আপনাকে ডাকছে আপনার ওয়াইফ। প্লিজ ওনার সাথে দেখা করুন।
সবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। শ্রাবণ তাসিরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। উৎসাহিত হয়ে বললো,
---- তুই শুনেছিস আমার মেঘ আমায় ডাকছে। আমি আসছি ভাই।
কথা বলার সুযোগ দিলো না তাসরিকে শ্রাবণ। সে দ্রুত আই সি ইউ রুমের ভেতরে গেলো। নার্স বের হয়ে আসলো দুজনকে একা করে দিলো৷
শ্রাবণ ভেতরে গেলো তার আনন্দে চোখে পানি চলে আসছে। শরীর কাঁপছে, ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেঘের দিকে হালকা ঝুঁকলো কপালে ছুঁয়ে দিলো উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ। হালকা কেঁপে উঠলো মেঘ। কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ায় চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে মেঘের৷ বার কয়েক ডানা ঝাপটিয়ে তাকালো পিটপিট করে। চোখের সামনে শ্রাবণ মুখাবয়ব ভেসে উঠলো৷ সত্যি নাকি তার ভ্রম? এই নিয়ে বার বার মনে হতো হয়তো শ্রাবণ তার পাশে যতোবার নিজের অস্তিত্ব টের পেতো ঠিক ততোবার। হাতটা অনেক চেষ্টা করলো শ্রাবণের গাল ছুঁইয়ে দিতে। পারছে না সে। শ্রাবণ বুঝতে পেরে নিজেই আলতো হাতে হাত ছুঁইয়ে দিলো। মুঠোয় বন্দি করে নিলো মেঘের হাত খানা। চুমু খেলে কয়েকবার।
মৃদু স্বরে মেঘের চোখের দিকে দৃষ্টি রেখে শুধালো,
---- কেমন লাগছে এখন? কষ্ট হচ্ছে তাই না?
মেঘ দু'দিকে মাথা নাড়ালো যার মানে কষ্ট হচ্ছে না
মেঘের। সস্থি পেলো শ্রাবণ। কষ্ট তো হচ্ছেই মেয়েটা বলবে না। তবুও শান্তি লাগলো। ফের বললো,
---- তুমি জানো আমাদের কোল জুড়ে এক জোড়া চড়ুই পাখি এসেছে তুমি কবে তাদের বুকে আগলে নিবে, কবে আমরা সবাই একসাথে হবো ফুল? দ্রুত সুস্থ হয়ে যাওনা মেঘ?
করুন ও আনন্দ মিশ্রিত স্বরে বললো শ্রাবণ। মেঘ নিষ্পলক চোখে শ্রাবণের চোখের কোণের আনন্দ টুকু খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখছিলো। বা হাতটা খুব কষ্টে অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেললো মেঘ। জোরে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে আধভাঙ্গা স্বরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠে মেঘ,
---- আ'আপনি খুশি তো? আ'আমাদের স'সন্তান কোথায়? আ'আমার কাছ এনে দিবেন?
শ্রাবণ একমুহূর্ত সময় নষ্ট করলো না। অক্সিজেন মাস্ক পড়িয়ে দিলো। অতঃপর মাথায় হাত বুলিয়ে
বললো,
---- ওরা ভালো আছে মেঘ। আগে তুমি সুস্থ হও তারপর ওরা তোমার কাছে আসবে৷
দুদিক মাথা নাড়ালো মেঘ। মানে পড়ে না এখনই।
শ্রাবণ বুঝানোর চেষ্টা করলো।
---- তুমি সুস্থ হও আগে। ওরা ঠিক আছে।
হাত চেপে ধরলো মেঘ শ্রাবণ। শ্রাবণ তপ্ত শ্বাস ফেলে মেঘের হাতের উপর হাত রেখে বললো,
---- ওরা আসবে মেঘ তোমার কাছেই আসবে। আমি নিয়ে আসবো ওদের।
শ্রাবণ মেঘের চোখে সন্তানদের কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা স্পষ্ট দেখতে পারছে। এইদিকে সময় শেষ নার্স ভেতরে প্রবেশ করেছে সাথে ডক্টর ও।
ডক্টর রফিকুল ইসলাম আমান হাসি মুখে শ্রাবণের কাঁধে হাত রাখেন। মেঘর প্রথম থেকে সমস্যার কথা জানেন এবং ট্রিটমেন্ট তিনিই করে যাচ্ছেন ৷ বলেন,
---- মিস্টার শ্রাবণ আপনার ওয়াইফ কিন্তু বেশ
ভালো রেসপন্স করেছে। মানে এই ধরনের পেশেন্ট
গুলো আমাদের কাছে ভয়ের কারন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা তো মনে মনে.. থাক যায় হোক আপনার ওয়াইফ এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত। জাস্ট কয়েকদিন রেস্ট নিলে এবং মেডিসিন গুলো ঠিকঠাক ভাবে খেলেই ভালো হয়ে যাবেন।
শ্রাবণের মনটা হালকা হলো। শ্রাবণ ধন্যবাদ জানালো। রফিকুল ইসলাম আমান আবার ও বলেন,
---- ওনাকে কেবিনে নিয়ে যেতে হবে ৷ নার্স আপনি
কেবিনে শিফ্ট করার ব্যবস্থা করুন।
---- ইয়েস ডক্টর।
তিনি চলে যান। ডক্টর ও বেরিয়ে যান আই সি ইউ রুম থেকে। শ্রাবণ মেঘের মাথায় আলতো হাত বুলাতে লাগলেন। মেঘের চোখ বন্ধ হয়ে এলো। তার কারন নার্স ইনজেকশন পুশ করেছে।
_____________________
নার্স বের হতেই উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠে দোয়েল,
---- এসকিউস'মি বেবিরা কোথায়? তাদেরকে দেখা যাবে তো?
নার্স হাসি মুখে বললেন,
---- অবশ্যই দেখতে পারবেন। ওয়েট আমি নিয়ে আসছি।
সকলে খুশি হলো। একেকজন বসে পড়লো একেক জায়গায়। জাহিদ আহমেদ বেশ চিন্তিত মেয়ের জন্য। সবার চোখ এড়ালো না বিষয়টা, দোয়েল তার চাচ্চুর পাশে এসে বসলো। নরম স্বরে আশ্বাস দিয়ে বললো,
---- চাচ্চু টেনশন করো না। মেঘ সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আর ওর তো জ্ঞান ফিরেছে। ভয় কিসের?
জাহিদ আহমেদ হাহাকারময় স্বরে বললো,
---- আমার মেয়ে যতোক্ষণ না আমার সাথে হেসে হেসে কথা না বলছে ততক্ষণ আমার শান্তি নেই রে মা। রাতে ওর অবস্থা দেখে শ্রাবণ নিজেই ভেঙে পড়েছিলো। কিভাবে যে রাত কেটেছে একমাত্র আমিই জানি। ছেলেটা ও ঘুমাইনি আমি জানি। আমি তো শুধু ওদেরকে সাহস দেওয়ার জন্য কঠোর হয়ে ছিলাম নয়তো আমারই বোধহয় কলিজা শুঁকিয়ে আসছিলো।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সবাই। তাড়াহুড়ো করে তাদের কাউকেই জানানো হয়নি। রাতে অনেকবার তাসির ফোন করেছিলো কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি। করবে কিভাবে তখন তো শ্রাবণ মেঘকে নিয়ে হসপিটালে ছিলো। উপায় না পেয়ে চিন্তিত হয়ে তাসির দোয়েলকে নিয়ে শ্রাবণদের বাসায় যেতেই সব জানতে পারে। সাথে তাসির রাতুল, রিফাত ও রামিমকে জানিয়ে দেয়।
আইসিইউর বাইরে অপেক্ষা করছিলো সবাই।
হঠাৎই দুজন নার্স ছোট্ট দুটি বেবি কট নিয়ে এগিয়ে এলো। করিডোরজুড়ে মুহূর্তেই যেনো আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো। সবার মুখে হাসির রেশ। সবাই উঁকি দিলো দোয়েল আনন্দে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠলো,
---- আল্লাহ... কী যে মিষ্টি দুটো ছানা!
রামিম ঝুঁকে ছোট্ট মুখ দুটো দেখার চেষ্টা করলো।
চোখমুখ অবাকে চেয়ে গেলো। বললো,
---- এত ছোট্ট! মনে হচ্ছে তুলোর পুতুল। কোলেই তো নেওয়া যাবে না আঙুলের ফাঁক গলিয়ে পড়ে যাবে না তো আবার?
সকলের শব্দ করে হেসে উঠলো। রাতুল আঙুল ছুয়ে দিলো বেবিদের ছোট্ট হাতের মুঠোয়। হেসে বললো,
---- দেখলেই তো কোলে নিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু, যদি পড়ে যায় শুধু এই ভয়ে নেওয়া যাবে না।
রিফাত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। বললো,
---- আল্লাহর অপরুপ সৃষ্টি কত সুন্দর মানুষ। এজন্যই বলে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।
জামিলা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁপা হাতে আগে নাতনির কপালে, তারপর নাতির ছোট্ট কপালে চুমু খেলেন। শ্রাবণ মেঘকে নিজের ছেলে মেয়ের মতোই ভাবেন। মনে হচ্ছে ওনারই পুত্রের দুটো রাজকুমার ও রাজকন্যা। সহাস্যে বলে উঠেন,
---- আলহামদুলিল্লাহ... আল্লাহ আমার ছেলে মেয়ের সুখ ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার কাছে শুকরিয়া রব।
জাহিদ আহমেদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
চোখদুটো টলমল করছে ওনার। রাতের ভয়টা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি৷ জীবনে বহুবার তিনি কেঁদেছেন। কিন্তু আজকের কান্নাটা অন্যরকম। আনন্দের কান্না। চোখ মুছে তাকালো ভালো করে চশমাটা ঠিক করে। কাঁপা হাতে দুটো ছোট্ট মুখ ছুঁয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
---- আল্লাহ... আমার মেয়েকে আর আমার নানাভাইদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শুকরিয়া।
তারপর মাথা নিচু করে দুজনের কপালে আলতো করে চুমু খেলেন। তাসির এগিয়ে এসে হেসে বললো,
---- চাচ্চু আপনি তো আজ থেকে অফিসিয়ালি নানা হয়ে গিয়েছেন! আমাদের মিষ্টি কোথায়?
জাহিদ আহমেদ হেসে ফেললেন অশ্রুভেজা চোখ নিয়েই। বললেন,
----- হ্যাঁ বাবা... এই ডাকটার জন্যই তো এতোদিন অপেক্ষা করছিলাম। আমার নানাভাই সুস্থসমেত দুনিয়ার আলো দেখেছে, আমার মেয়েটা ও সুস্থ হয়ে যাক তারপর মিষ্টির দোকানে নিয়ে যাবো তোমাদের যতো ইচ্ছে খাবে তোমরা।
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেলো। ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বললেন,
----- পেশেন্টকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। এখন বেবিদের নিয়ে যেতে পারবেন মায়ের কাছে।
----- এই চলেন সবাই মা বেবিদের সুন্দর মুহুর্তের সাক্ষী হতে হবে না?
দোয়েল হাসতে হাসতে যেতে লাগলো সবাইকে নিয়ে মেঘের কাছে।
চলবে,,,,