ফন্ট সাইজ:
থিম:
কৃষ্ণচূড়া

১৮তম পর্ব

লেখক: নুসরাত সুলতানা সেজুথি

#কৃষ্ণচূড়া🍂

নুসরাত সুলতানা সেজুথি

পর্ব--১৮(ক)

বন্ধ চোখের পাতা খুলতেই নিজেকে হাত পা বাধা অবস্থায় আবিষ্কার করলো ইরফান। মূলত কোনও কাঠের চেয়ারের সাথে বুক অব্ধি মোটা দড়ি দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেধে রাখা হয়েছে তাকে। যার দরুন ইচ্ছে হলেই শরীর নাড়ানোর এতটুকুও সুযোগ নেই তার হাতে।

জায়গা টা ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে একটু উজ্জ্বল। জানলার সুক্ষ্ণ ফাক দিয়ে হুমড়ে আসা কিঞ্চিৎ আলোতে ঘরের কাঠামো কোনও মতে ঠাওড়ে পাওয়া যায়।

ঠিক কি ঘটে গিয়েছে নিজের সাথে এখনও অজ্ঞাত ইরফানের। তার মত লোক কে এভাবে কে বেধে রাখতে পারে?? নিজের কৌতুহল মেটাতে কোনও মতে ঘাড় ঘুরিয়ে বাম দিকে তাকালো ইরফান। একই বর্নের ফরমাল পোশাকে আবৃত অচেনা কয়েকজন লোক কে দেখে এক মুহুর্তের জন্য অনুভূত হলো,,হয়তো সে অপহরিত হয়েছে...

পরক্ষনেই ডান দিকে ঘুরতেই পূর্বের ভাবনা পাল্টে বিষ্ময় দানা বাধলো তাৎক্ষণিক।

অতি চেনা পরিচিত মুখ হিসেবে গম্ভীর দৃষ্টিতে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব। মুখে কোনও কথা নেই তার। যেন এই মুহুর্তে অভ্যন্তরীণ কুলুপ এটে আছে সেখানে।

হুট করে নিজের সম্মুখে কারো উপস্থিতি বোধ হলো ইরফানের। রাজীবের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঘাড় সহ চোখ ঘুরিয়ে ভেসে আসা শব্দের উৎসের দিকে ফিরতেই আরেক দফা চমক এসে ভিড় করলো ইরফানের মুখমন্ডলে।

কঠিন ভাবমূর্তি বহন কারি কাব্য মাত্রই এসে টুল টেনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে পরেছে ইরফানের সামনে। আর তার পেছনে মলিন মুখস্রি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছবি।

দুজন কে দেখামাত্রই খানিকক্ষণ আগে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বৃত্তান্ত মস্তিষ্কে নাড়া দিতে শুরু করলো একে একে।

_______________

________

_____

ঘন্টা দুয়েক আগে....🍁

ক্রমাগত ধীর পা চালিয়ে ছবির দিকে এগোচ্ছে ইরফান। চোখে মুখে তার স্পষ্ট ফুটে আছে কামনার তীব্র ছাপ।

এসির ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও কপালের ভাজে ভাজে ঘামের সুক্ষ্ণ দানা গুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে ছবির। ইরফান কে নিজের দিকে এগোতে দেখে ভয়ে জর্জরিত হয়ে পেছাতে শুরু করলো সে।

-- আপনি দরজা কেনো বন্ধ করেছেন ইরফান?? আর এভাবে এগিয়ে আসছেন ই বা কেনো.??

-- আই থিংক তুমি এতোটাও বাচ্চা নও ছবি। দরজা বন্ধ করার কারণ এখন তোমাকে হাতে খড়ি দিয়ে শেখাতে হবে?? বেশ আমি তাতেও রাজি। তৈরি,,,,, তো??

-- না,,,, ইরফান। এগোবেন না। দাড়িয়ে যান। আমি দাড়িয়ে যেতে বলেছি তো....

আমি কিন্তু চিৎকার করবো....

-- করো... আরে আমিও তখন থেকে এটাই ভাবছি তুমি চিৎকার কেনো করছোনা..?? করো করো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করো। তবেই না মজা জমবে আমার....

-- ইরফান,,,,আমি কিন্তু প্রেস মিডিয়া কে সবটা জানিয়ে দেবো....

দাড়িয়ে যান বলছি

ছবির দেয়া আতঙ্কে আতঙ্কিত হলোনা ইরফান। উল্টে মিচকে হাসিতে উড়ে দেয়ার ভঙিমা করে বলে উঠলো...

-- পারবেনা পারবেনা,এ কাজ অন্তত তোমার দ্বারা হবেনা ছবি। আর যাই হোক তোমার মত ঘরকুনো মেয়ে ঘরের ঐ কোনায় গুটিয়ে থাকতেই পছন্দ করে। নিজের সন্মান হানীর কথা জনে জনে জানানো,, নাহ এসবের ক্ষমতা তোমার নেই.... ইরফান রাহমান কি আর জেনে বুঝে এরকম রিস্ক নেয়???

( একটু থেমে)

চলো আমার টাইম ওয়েস্ট করোনা। আমি দাড়িয়ে যাচ্ছি। তুমি নিজেই না হয় এগিয়ে এসো আমার দিকে....

ইরফানের হাত থেকে আজ বাঁচার রাস্তা বড়ই সংকীর্ন ছবির,,, ব্যাপারটা বুঝতে খুব একটা সময় লাগলোনা তার। পুরো ছক কষেই ইরফান আটকিয়েছে তাকে। আর কাব্য.?? সেতো বলেছিলো ছবির নিরাপত্তার ভার তার। তাহলে?? এখন তো সে নিরাপদ নয়।

"""এমন ভরসা কেনো দিয়েছিলেন মিস্টার রেয়ান যা আপনি রাখতেই পারবেন না। আপনার কথায় চলে আসা আমার কত বড় ভুল ছিলো ওপর ওয়ালা আমাকে হাড়েহাড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে।

আপনি পারলেন না আমাকে বাচাতে,,,

আচ্ছা পারলেও কি বাচাতো লোকটা?? ইরফান তো ওনারই বন্ধু ছিলেন। আচ্ছা কোথাও এমন তো নয়,,,,যে উনিও ইরফানের সাথে যুক্ত?? আর তাই সকালে মিথ্যে বলে আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন?? শুধুমাত্র ইরফানের কু -মতলব কে চরিতার্থ করতে??

অনেকক্ষন ছবির কোনও সাড়া না পেয়ে কপাল কোচকালো ইরফান।

-- কি ভাবছো??? বাঁচার রাস্তা?? উহু,আজ যে আর আমার হাত থেকে রেহাই নেই তোমার। এই ইরফানের দৃষ্টি একবার যার দিকে পরে তার নিঃশেষ সে নিজেই করে। আর আজ তোমার টার্ন।

শেষ চেষ্টা হিসেবে এতক্ষনের কাঠ চেহারায় এবার বিনয়ী ভাব ফুটে এলো ছবির। অনুরোধসূচক স্বরে বলে উঠলো....

-- দেখুন। আমার মত এতো সাধারণ একটা মেয়ের সন্মানহানি করে কি লাভ হবে আপনার....?? প্লিজ আমাকে যেতে দিন। প্লিজ.....

ছবির কথা শেষ না হতেই ওর এক হাত ধরে হ্যাচকা টানে নিজের দিকে টেনে নিলো ইরফান। অন্য হাতে ছবির কোমড় জড়িয়ে ক্রমাগত স্লাইড করতে শুরু করলো ওর গালের দিকটায়।

-- সাধারণ?? কে বলেছে তুমি সাধারণ?? আরেহ তুমি জানো..আমার লাইফে আসা অর্ধেক মেয়েদের পটাতে আমার যতটুকু সময় ব্যায় হয়েছে তার পুরোটাই লেগে গিয়েছে শুধু তোমাকে এখান অব্ধি নিয়ে আসার জন্যে।

তবে এতে কিন্তু আমার কোনও দোষ নেই। যা হওয়ার তোমার জন্যেই হচ্ছে। তুমি যদি অন্য সবার মত সহজে ধরা দিতে ব্যাপারটা আপোসে হয়ে যেতো। টাকাও পেতে। কিন্তু নাহ।

তোমাকে

কোনও ভাবেই বাগে আনতে পারছিলাম না। আর তাই আজ এই নাটক ফাটক করে এখানে নিয়ে এসেছি তোমাকে। অবশ্য জোর জবর দস্তি করে কিছু পাওয়ার মজাটাই আলাদা।

ইরফানের স্পর্শ বিষের মতো অনুভুত হচ্ছিলো ছবির কাছে,। যতোই ছোটাছুটি করে ইরফানের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় রত হয়ে পরছিলো সে ঠিক ততটাই শক্তপোক্ত ভাবে ইরফান বেধে নিচ্ছিলো তাকে।

আচমকা ছবির খেয়াল পরলো নিজের গালের ওপর স্লাইড করতে থাকা ইরফানের হাতের দিকে। কিছু একটা ভেবে এক টানে ইরফানের হাত নিয়ে কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দাঁত বসিয়ে দিলো কব্জির কিছুটা ওপর দিকে।

ব্যাথায় একেবারে চেঁচিয়ে উঠে ছবিকে ছেড়ে নিজের হাত,,, অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরলো ইরফান।

সুযোগ বুঝে ছবি দ্রুত গামি পা বাড়ালো দরজার দিকে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত হাত উচিয়ে সিটকিনিতে টান বসানোর আগেই পেছন থেকে ওর চুলের মুঠি পেচিয়ে ধরলো ইরফান।

প্রায় সাথে সাথেই অনেক টা ছুড়ে ফেলার মত বিছানার ওপর ছবিকে ছিটকে ফেলে দিলো ইরফান।

-- তোর এত বড় সাহস তুই আমাকে কামড়ে দিয়েছিস?? এর শাস্তি তো এখন দ্বিগুন হিসেবে তুলবো আমি। ইরফান রাহমান কে কামড়ানো..???

ভয়ার্ত চোখে দু হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে পেছাতে থাকা ছবির দিকে এগিয়ে যেতে উদ্যত হতেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এলো ।তাৎক্ষণিক পায়ের কদম থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো ইরফান।

-- এখানে কে আসতে পারে এখন....

ইরফানের ভাবনার ফাকেই দরজায় টোকা পড়ার শব্দ গাঢ় থেকে আরো গাঢ় রুপ ধারন করছে। এক সময় দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম হতে নিতেই অনিচ্ছাস্বত্তেও দরজার দিকে এগিয়ে গেলো ইরফান।

নিস্তেজ হওয়া মনে আবারো এক ফালি আশার আলো পেয়ে মুখ চকচক করে উঠলো ছবির। তবুও এবার আরো প্রগাঢ় ভাবে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করতে হবে তাকে।

ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পরলো ছবি।ইরফানের চোখ এড়িয়ে এতক্ষন পর নজরে আসা ফল কাটা ছুড়ি টা ঝুড়ি থেকে নিজের হাতে তুলে নিলো সে। আত্মরক্ষার জন্যে দরকার পরলে এবার প্রান নিয়ে নেবে।

হাতের আঙুল গুলো একবার থুতনিতে বুলিয়ে কিছু একটা ভেবে নিলো ইরফান। ওদিকে দরজায় কড়াঘাতের শব্দ বেড়েই চলেছে।

না পারতে অবশেষে সিটকিনি টেনে দরজা খুলে দিলো সে।

পকেটে দু হাত গুজে দরজার এক পাশের দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে কাব্য।

ঝটকার মাত্রা কাটিয়ে অনেকটা আটকে আসার মত করে আওয়াজ বেরিয়ে এলো ইরফানের মুখ থেকে....

-- কা...কাব্য...ত...তুই... এখা....

পুরোটা বলার আগেই কাব্য বুট পরিহিত পা দিয়ে বেশ জোড়েশোড়ে এক লাথি বসালো ওর বুকের ওপর দিকে।

ফলশ্রুতিতে অনেকটা দূরে ছিটকে গিয়ে পরলো ইরফান। সাথে সাথেই বুকের ব্যাথা হ্রাসকরনে হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে মৃদূ আওয়াজ করে উঠলো সে।

দ্রুতগামি পা চালিয়ে ভেতরে এসে দাড়ালো কাব্য। এতক্ষনে কাব্যকে দেখে প্রান ফিরে পাওয়ার মত অনুভূত হলো ছবির। ছবির দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে ইরফানের দিকে এগিয়ে গেলো কাব্য।

নিচু হয়ে এক হাটু গেড়ে দিলো ইরফানের বুকের ওপর,, একই জায়গায় পরপর দুবার আক্রমনের দরুন ব্যাথায় একেবারে কুকিয়ে উঠলো ইরফান।

-- কাব্য?? তুই এসব কি করছিস?? পাগল হয়ে গিয়েছিস??

সাথে সাথেই দু হাতে ইরফানের কলার চেপে ওকে

সামান্য উচিয়ে ধরলো কাব্য।

-- ভেবেছিলাম তোকে আরো সময় দেবো। কিন্তু তুইতো জানোয়ারের থেকেও নিচে নামিয়ে ফেলেছিস নিজেকে।

-- কাব্য... এর পরিনতি কিন্তু ভালো হবেনা বলে দিচ্ছি....

-- প্রথমে তুই নিজের পরিনতি নিয়ে ভাব।

পকেট থেকে ইঞ্জেকশনের ন্যায় কিছু একটা বার করলো কাব্য। ইরফান কিছু বলতে নেয়ার আগেই সেটির সূচালো প্রান্ত মিশিয়ে দিলো ওর মাংসপেশিতে।

খানিক বাদেই নিস্তেজ হয়ে মেঝেতেই নিজের মাথা এলিয়ে দিলো ইরফান।

ইরফান বেহুশ হতেই ওকে রেখে দাঁড়িয়ে পরলো কাব্য।

ছবির কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে

একটা সাদা রুমাল ওর দিকে এগিয়ে দিলো সে।

-- কাঁদবেন না। নাউ ইউ আর সেফ,,,বলেছিলাম তো কাব্য রেয়ান থাকতে আপনার কিছু হবেনা।

চলবে..

#কৃষ্ণচূড়া🍂

নুসরাত সুলতানা সেজুথি

পর্ব--১৮(খ)

সারা মুখে আকষ্মিক পানির ঝাপটা এসে পরায় ধ্যান ভাঙলো ইরফানের। আগের থেকে তুলনামুলক বেশি ভয় চেহারায় মেখে কাব্যর দিকে তাকালো সে।

ইরফানের এমন ভীতিকর মুখ দেখে এক প্রসস্থ হাসি খেলে গেলো কাব্যর মুখমন্ডলে।

-- ভয় পাচ্ছিস ইরফান??

-- কাব্য,,এসব কি?? এভাবে আমাকে বেধে রেখেছিস কেনো???

---- তোর মত পশুকে তো বেধেই রাখা উচিত। নাহলে কখন,, কার ওপর ঝাপিয়ে পরবি কে বলতে পারে??

--- কাব্য...,,তোর কি হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ করে আমার সাথে কি শুরু করেছিস তুই??

-- বলবো ... তার আগে তুই আমাকে এটা বল,,,, আরাবি কোথায়??

-- আরাবি??

-- ইয়েস,,,আরাবি রাহমান।

প্রথম বার নাম শুনলি বোধ হয়..... অচেনা লাগছে??

-- না চিনবো না কেনো... কিন্তু ও কোথায় সেটা তুই আমাকে কেনো জিজ্ঞেস করছিস??

-- কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি,,,যে উনি কোথায় সেটা একমাত্র তুই -ই জানিস।

-- আমি? আমি কি করে জানবো,,,আর ও এভাবে লা পাত্তা হয়ে যাওয়াতে আমাদের দুজনের- ই তো কত্ত গুলো টাকার প্রজেক্ট লস হয়েছিলো তাইনা।তাহলে আমি জানলে নিশ্চয় বলতাম তোকে।

---- তাই??

-- হ্যা,,,,,,

--- তাহলে তুই বলতে চাইছিস যে তুই সত্যিই জানিস না আরাবি কোথায়....??

--- না,,,,,আমি...আমি সত্যিই জানিনা। বিশ্বাস কর।

-- বুঝলাম। কিন্তু তুই এতো ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেনো ইরফান?? যদি তোর অজানাই থাকে তবে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই। সো চিল ম্যান।

-- ক...কই নাতো..ভয় কেনো পেতে যাবো....

-- কি বলতো ইরফান,,,,ভয় তো সেই পায় যার মধ্যে পাপ থাকে। আর সেই পাপ তোর নিজের মধ্যেও আছে। বড্ড প্রকট ভাবে আছে।

-- কি..... কি বলতে চাইছিস কি তুই...??

-- আচ্ছা তোকে একটা ইনফরমেশন দেই , আই থিংক তুই জানিস না,,যে আরাবি রাহমান যেই ফ্ল্যাটে থাকতেন,,,,,যেখানে তুই একদিন বাদে বাদে আসা যাওয়া করতি,,,,

, সেটা আমারই দেয়া....!!

-- কিহ????( অবাক হয়ে)

-- হ্যা,,,, ইনফ্যাক্ট,,,যেদিন থেকে আরাবি নিখোজ ঠিক সেদিন সকাল দশটায় আমার ফ্ল্যাটের দোরগোড়ায় তোর সাদা রংয়ের গাড়িটা পার্ক হয়। তারপর গাড়ি থেকে তুই নেমে বাইরে আসিস। কিছুক্ষন বাদে আরাবিও পৌছায় সেখানে,,,আর তারপর তোরা দুজনেই গাড়িতে উঠে সাই করে চলে যাস। কি ঠিক বললাম তো.....

-- ..তুই কি করে জানলি...??

--- বোকা,,,ওই পুরো ফ্ল্যাট এর চারিপাশ টা আমি সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত রেখেছিলাম। তোর মত বোয়াল মাছ ধরার মোক্ষম জাল হিসেবে। এই যে দ্যাখ ঠিক ধরে ফেললাম। এবার তুই- ই ভাব,,,, এতক্ষন ধরে যে জানিনা জানিনা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিলি,,,সেটার কোনও মূল্য রইলো?? উহু রইলো না। সব প্রমান নিয়ে তবেই না প্রশ্ন তুলেছি আমি?

নে এবার ঝটপট বলে ফ্যাল কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ওনাকে....

কাব্যর কথায় ইরফানের থেকেও বড্ড বেশি হতবাক হয়ে গিয়েছে ছবি। তার মানে কাব্যর জানা ছিলো আগে থেকেই?? এই জন্যেই এতোটা নিশ্চিত ভাবে বারবার ইরফানের কথাই বলতো..? যে ইরফান জানে আরাবি কোথায়??

ছবির ভাবনায় ছেদ ঘটলো পূর্বের মতোই কাব্যের জোড়ালো আওয়াজে।

-- অনেক সময় নষ্ট করেছিস ইরফান..আর আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না। ভালোয় ভালোয় বল আরাবি কোথায়...??

-- আমি জানিনা। আমাকে ছেড়ে দে কাব্য।

--- উত্তর দিবি,,,তারপর ভেবে দেখবো...

--ভালো হবেনা বলে দিচ্ছি কাব্য। আমিও ইরফান রাহমান,,,,আমি কিন্তু তোকে দেখে নেবো....

---- হাহ( হেসে)তুই ভয় দেখাচ্ছিস আমাকে?? ভেরী ফানি।

আগে এখান থেকে ছাড়া তো পা। তারপরের টা পরে ভেবে দেখিস...

-- দ্যাখ,, আমিতো বললাম আমি জানিনা ওই মেয়ে কোথায়।

---- তুই জানিস না??আরাবির তোর সাথে বের হবার পর থেকে ফ্ল্যাটে আর ফিরে না আসা,বরাবরের মতো নিখোজ হয়ে যাওয়া,,, আর তুই বলছিস তুই জানিস না??

কি সুন্দর ভাবে সব টা অস্বীকার করে যাচ্ছিস...?? এবার তো আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে তুই ই আরাবিকে কোথাও রেখেছিস।

এক মিনিট,,,,, তুই আবার,খারাপ কিছু করিস নি তো ওর সাথে.?

--- আমি.?? আমি কি করবো। ওই দিন ও আমার সাথে বের হয়েছিলো ঠিক-ই,,,কিন্তু ওতো ওখান থেকে চলে এসেছিলো। আচ্ছা এটাও তো হতে পারে ও ওর পরিবারের কাছে চলে গিয়েছে?

--- না সেটা পারেনা।

আর তার কারণ উনি....

ছবির দিকে আঙুল ইশারা করে দেখালো কাব্য। কিন্তু বিষয়টা বুঝে উঠতে পারলোনা ইরফান।

--- উনি মানে.....

--- উনি কে জানিস??

-- কে??

-- উনি আরাবির বড় বোন ছবি।আরাবিকে খুজে পেতে আমার হেল্প নেয়ার জন্যে এসেছিলেন। এবার তুই-ই বল,,,,বোন যেহেতু এখানে সেহেতু আরাবি পরিবারের কাছে কিভাবে যাবে??

শুধু শুধু এতো কথা না বাড়িয়ে বলে দে আরাবি কোথায়..??

-- আমি বললাম তো আমি জানিনা,,,আর জানলেও বা?? তোকে বলার প্রয়োজন বোধ করছিনা। যাস্ট একবার এখান থেকে বের হতে দে আমাকে,,,,তোকে তো আমি...

-- বুঝেছি ভালোয় ভালোয় কথা শোনার মানুষ তুই নোস...

কথাটা বলে নিয়ে রাজীবের দিকে তাকালো কাব্য। কিছু একটা ইশারা করতেই রাজীব প্রস্থান নিলো নিশব্দে।

কাব্য ঠিক কি করতে চাইছে?? জিজ্ঞাসায় মোড় নিলো ইরফান,,, ছবি দুজনার মুখস্রীই।

সবার কৌতুহল মেটাতে মিনিট খানেকের মধ্যেই হাজির হলো রাজীব৷ বাম হাতে বয়ে নিয়ে আসা লোহার প্লাস মেশিনটা এগিয়ে দিলো কাব্যের দিকে।

ইরফানের দিকে একবার শক্ত চোখে চেয়ে প্লাস মেশিন নিয়ে নিলো কাব্য।

ভয়ার্ত চোখে ওকে দেখে যাচ্ছে ইরফান....কি করবে কাব্য এটা দিয়ে...??

ইরফানের উত্তর হিসেবে,,,চেয়ারে আটশাট ভাবে বেধে রাখা ওর এক হাতের আঙুলের ওপর প্লাস মেশিন চেপে ধরলো কাব্য।

মুহুর্তেই এক গগন বিদারি চিৎকার বেরিয়ে এলো ইরফানের ভেতর থেকে। নখ সহ আঙুল থেতলে,,রক্তে মাখামাখি হয়ে আঙুল থেকে কব্জিসন্ধি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করলো চোখের পলকে।

এমন বিভৎস্য দৃশ্য দেখে শরীরে কেপে উঠলো ছবির। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো সাথে সাথে।

কাব্য স্থির দৃষ্টি স্থাপন করে চোয়াল শক্ত রেখে একভাবে মেশিন চেপে রেখেছে। রাজিব সহ সবার অবস্থা কাহিল হয়ে এলেও বিন্দুমাত্র হেলদোল তার মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছেনা।

--- ভেবে নে এবার বলবি কি না....

জবাবে ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে বলে উঠলো ইরফান.....

-- বলবো বলবো. আমি সব বলবো....

ইরফানের আকুতিভরা স্বরে হাতের আঙুল মুক্ত করে দিলো কাব্য। সাথে সাথেই একটু হলেও প্রান ফিরে আসার মত অনূভুত হলো ইরফানের। কিন্তু আঙুলের যাচ্ছেতাই অবস্থা একেবারে।

--এটাই আমার শেষ বার জিজ্ঞাসা হবে,,ইরফান।,পরেরবার আরো ভালো কিছু ভেবে রেখেছি তোর জন্যে।এর থেকেও ভয়ানক ভালো কিছু..

বল...এবার...কোথায় আরাবি??

---- আরাবি....আরাবি নেই....( কাতরে উঠে)

-- নেই মানে...( ভ্রু কুচকে)

--- ,,আমি ওকে,,,,, আমি ওকে...খুন করেছি।

ইরফানের এহেন কথা পুরো পরিবেশে যেনো বজ্রপাতের মতো আঘাত হানলো মুহুর্তেই।...বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ছবি....গলা দিয়ে বিন্দুমাত্র আওয়াজ তার বের হচ্ছেনা।

পেছন ঘুরে ছবির মুখের দিকে একবার তাকালো কাব্য। চেহারায় থমথমে ছাপ স্পষ্ট তার। সেদিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে কাব্য পুনরায় আবারো ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো...

-- কেনো খুন করেছিস?? কি করেছিলেন উনি??

-- ও আমাকে ব্ল্যাক- মেইল করছিলো.....

--ব্ল্যাকমেইল?? কি নিয়ে....?

--,, আমার আর ওর ঘনিষ্ঠ মুহুর্তের একটা ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিলো ও।আর সেটা আমার অজান্তেই। কিন্তু পরে আমাকে ওই ভিডিও নিয়ে হুমকি দিতে শুরু করেছিলো.....ও। আমার সব সিনেমায় ওকে নিতে হবে নাহলে ও নিজেকে হাইড করে আমার ভিডিও ভাইরাল করে দেবে। এছাড়া যখন তখন মোটা এমাউন্টের টাকা তো নিচ্ছিলোই।

পরবর্তীতে নতুন ফিল্মের জন্যে যখন আমি অন্য হিরোইন নিতে চাইছিলাম সেটা ও জানতে পেরে যায় আর আগের মতোই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে৷

শেষ মেষ ওর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে আমি ভেবেই নেই যে ওকে মেরে দেবো। আর তাই সেদিন শপিং করিয়ে দেয়ার বাহানা দেখিয়ে আমার বাঙলো তে নিয়ে যাই।

---তারপর ??

-- তারপর,,,, সেখানে আমার ভাড়া করা কয়েক জন সিরিয়াল কিলার ছিলো,,,,ওদের হাতে আরাবিকে তুলে দিয়ে আমি চলে এসেছিলাম। বলেছিলাম এক্সিডেন্ট কেসের মত মনে হবে এরকম ভাবে মারতে।কিন্তু...

--- কিন্ত??

-- কিন্ত ওরা সব গুলো আরাবিকে পেয়ে পালাক্রমে ধর্ষন করে। ফলে রক্ত ক্ষরনে ওখানেই আরাবির মৃত্যু হয়। আর তারপর ওরা আমাকে ফোন করে জানায় ব্যাপারটা।

--- ডেড বডি কোথায়...??

---মাটিতে পুতে দিয়েছি।

কাব্যর চাহনী দেখে ভয়ে ভয়ে কথাটা বলে উঠলো ইরফান।

কথা টা শুনেই মুহুর্তেই দাঁড়িয়ে গিয়ে কাব্য আবারো এক জোড়ে সোড়ে লাথি বসালো ওর পায়ের মাংসপেশি বরাবর।

ভারসাম্য রাখতে না পেরে চেয়ার সমেত উল্টে পরলো ইরফান।পুনরায় ওর দিকে এগিয়ে যেতে ধরলো কাব্য। কিন্তু তার আগেই পাশ থেকে রাজীবের আওয়াজে থেমে গেলো সে...

-- স্যার ম্যাডাম,,,স্যার ছবি ম্যাডাম।

রাজীবের চোখ অনুসরন করে ছবির দিকে তাকাতেই ঘাবড়ে গেলো কাব্য। মৃতপ্রায় মানুষের মতো মেঝেতে পরে আছে ছবি।

ধড়ফড় করে দৌড়ে ছবির কাছে গেলো কাব্য।

-- ছবি?? এই ছবি?.? কি হলো আপনার?? তাকান...শুনতে পাচ্ছেন আমাকে??

-- স্যার ম্যাডাম বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে পরেছেন...

-- পানি নিয়ে এসো ফার্স্ট....

রাজিব গ্লাস ভর্তি পানি এনে দিতেই তাতে হাতের আঙুল ডুবিয়ে পানির ফোটা ছিটিয়ে ছবির মুখে দিতে শুরু করলো কাব্য। কিন্তু এতেও জ্ঞান ফিরছিলোনা ছবির। এমন কি চোখের পাতাগুলোও নূন্যতম নড়ছিলোনা।

এবার বেশ হতভম্ব হয়ে গেলো কাব্য। বোনের এমন নির্মম মৃত্যুর কথা শুনে ওনার আবার উল্টো পাল্টা কিছু না হয়ে যায়.....!

-- রাজীব তুমি এখানে থাকো,,,,আর ওই জানোয়ার টাকে এমন মার মারতে থাকো যেনো কাউকে খুন করার মজা হাড়েহাড়ে টের পায় ও।

আমি ওনাকে রেখে আসছি....

রাজীব সসম্মতিসূচক মাথা দোলালো কাব্যের কথায়। আর কাব্য দুবাহুতে ছবিকে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।

🍁

🍁

🍁

নেতিয়ে পরেছে ইরফান। সারা গায়ে মারের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। মাথা তুলে রাখার শক্তিটুকুও পাচ্ছেনা নিজের মধ্যে।

খানিক ক্ষনের ভেতরে কাব্য আবারো হাজির হলো সেখানে। আগের মতোই ইরফানের সামনে বসে ওর ঝুলে যাওয়া মাথার চুল গুলো মুঠোতে নিয়ে মুখ টা উচু করে নিলো....

--- কুকুরের লেজ কোনও দিনও সোজা হয়না। অনেক সুযোগ দিয়েছি তোকে। তুই পাল্টাস নি। মেরেই ফেললি নিজের হাটুর বয়সী একটা মেয়েকে??

জবাবে দু এক বার ঘন আকারে নিশ্বাস ফেললো ইরফান। বেশ বেগ নিয়ে বলে উঠলো...

--- মেরেছি বেশ করেছি।ও আমার ওপর ডাবল গেম খেলছিলো। কিন্তু তুই একটা অচেনা অজানা মেয়ের জন্যে তোর বন্ধুর সাথে বেঈমানি করছিস এতে তোর বাধছেনা???

ইরফানের কথায় শব্দ করে ধিক্কার মুলক হাসি হেসে উঠলো কাব্য।

--- বন্ধু?? কিসের বন্ধু..? বন্ধুত্বের বাইরে তো তোকে আমি সেদিনই রেখে দিয়েছি যেদিন আমার স্ত্রী কে নিজের লালসার স্বীকার বানাতেও তুই দুবার ভাবিস নি....

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন