#কৃষ্ণচূড়া 🍂
নুসরাত সুলতানা সেজুথি
পর্ব--১৯
সোফার হাতলে দুহাত প্রসস্থ করে বসে আছে কাব্য। এতোদিনে পুষে রাখা গুপ্ত ইচ্ছে পূরন হয়েছে তার। পেরেছে অবশেষে ইরফান কে নিজের মনের মত করে শাস্তি দিয়ে কাস্টাডিতে পাঠাতে।
ধরিত্রীর আলো বাতাস হারাম করে দিয়েছে ইরফানের জন্যে। যতদিন বাচবে চৌদ্দ শিকের ভেতরে থেকেই বাঁচতে হবে ওকে।
একজন খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালকের নিকট এর থেকে যন্ত্রনার কি আছে??
কাব্যের ঠিক সামনে বরাবর বিছানায়
অচেতন অবস্থায় পরে আছে ছবি। পুরো একদিন ধরে জ্ঞান ফেরেনি তার। শরীরের মাত্রাতিরিক্ত দূর্বলতা কাটাতে আবারো তরল রুপি স্যালাইন সরল রেখার ন্যায় প্রবেশ করছে তার শিরা উপশিরায়।
ঘরোয়া ভাবেই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ছবির চিকিৎসা নিয়েছে কাব্য।
গত বার হাসপাতালে ছবিকে এডমিট করার ব্যাপারটা অল্পের জন্যে লিক হয়ে যায়নি। তাই এবার আর কোনও রুপ বাড়তি ঝুকি নিজের কাধে নেয়নি কাব্য।
হিসেব মত আজ কালের মধ্যে ছবির চেতনা ফিরে আসার কথা।
তবে এখনো কাব্যর আঁচে আসেনি বোনের মৃত্যু তে ছবির ব্রেনের ওপর পড়ন্ত চাপের মাত্রা কতটুকু। আর যাই হোক মেয়েটা নিজের বোন কে তো অনেক বেশিই ভালোবাসতো।
কাব্যর ভাবনা চিন্তার মাঝেই ওপাশ থেকে কিঞ্চিৎ নড়ে উঠলো ছবি।
সেদিকে লক্ষ্য করতেই ধড়ফড় করে উঠে এগিয়ে গেলো কাব্য।
পিটপিট করে চোখ খুলে কাব্যকে নিজের সামনে ঝুকে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলো ছবি। ছবি উঠে বসার চেষ্টা করতেই সাহায্য করে একধাপ এগিয়ে দিলো কাব্য।
ছবির মলিন মুখশ্রী দেখে কোনও কিছু না বলে পানির গ্লাস ওর দিকে এগিয়ে দিলো কাব্য। কাপাহাতে গ্লাস ধরে পুরোটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিলো ছবি।
---- শরীর কেমন লাগছে এখন...??
ঠিক আছেন??
কাব্যর দিকে কিছুক্ষন নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থেকে ডুকরে কেদে উঠলো ছবি। এক পর্যায়ে কান্নার বেগ বেড়ে রুপ নিলো আহাজারি মূলক শব্দে।
--- আমার বোন... আমার বোন আর নেই মিস্টার রেয়ান....আমার বোন আর আমাকে আপু বলে ডাকবেনা। আমার কাছে ছুটে আসবেনা। আমাকে জড়িয়ে ধরবেনা। কোনও কিছু নিয়ে আর বায়না ধরবেনা। আমার বোন কে ও শেষ করে দিলো.... (কাঁন্নায় ভেঙে পরে)
ছবির কান্নাভেজা স্বরে কাব্যের মুখেও অন্ধকারের ঘনঘটা নেমে এলো এবার। আপন জন হারানোর মত কষ্টের গভীরতা অনেক আগেই যে মাপা হয়ে গিয়েছে তার। এর স্বাদ যে বড়ই তিক্ত।
--- এভাবে কাদবেন না ছবি। মানুষের মৃত্যু তে কারো হাত আছে বলুন?? আরাবির আয়ু হয়তো ঐ অব্ধি লেখা ছিলো.....
আপনি নিজেকে সামলান।
----- আমি বারবার ওকে নিষেধ করেছিলাম। বারবার। আমার মনে হয়েছিলো এতে ওর খারাপ বৈ ভালো কিছু হবেনা। কিন্তু ওতো ওর জেদ নিয়েই ছিলো....সেদিন যদি একবার আমার কথা মেনে নিতো আজ আমার বোন আমার কাছেই থাকতো। এমন নির্মম মৃত্যু হতোনা তো....!!
---- যা হবার হয়ে গিয়েছে। আসলে একটা কথা আছেনা?? লোভে পাপ পাপে মৃত্যু?? শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে আরাবির মৃত্যুর কারণ ওর অতিরিক্ত লোভ ছিলো।
আর দেখুন কি থেকে কি হয়ে গিয়েছে।
তবে আপনি ভাববেন না,,আরাবির খুনের শাস্তি ইরফান পাবে। খুব ভালো করে পাবে।
---- আমি আমার মায়ের কাছে কি জবাব দেবো মিস্টার রেয়ান?? আমার মা যে সহ্য করতে পারবেনা। মরেই যাবে।
---- বলতে হবেনা। যেমন চলছে চলতে দিন। কারো ভালোর জন্যে কোনও সত্য লুকিয়ে রাখা পাপের কিছু নয়।
ছবি একিভাবে কাদছে। অনেক বেশিই কাদছে। যবে থেকে ছবির এ বাড়িতে পদার্পন কিংবা কাব্যের নৈকট্যে আসা তবে থেকে এমন কোনও দিন বাদ যায়নি মেয়েটা কাঁদেনি। কখনও বোনের কথা ভেবে,,কখনও নিজের নিয়তির কথা ভেবে।কিন্তু এই নিয়তি আর বেশিক্ষন স্থায়ি হতে দেবেনা কাব্য।
ছবির নিচু হয়ে আসা থুতনি হাত দিয়ে ওপর দিকে তুলে ধরলো কাব্য। দু হাতের আজোল দিয়ে কান্নায় ভিজে আসা চোখ গুলো বেশ যত্ন সহকারে মুছিয়ে দিয়ে বলে উঠলো...
---- আমার একটা কথা ছিলো...শুনবেন..??
জবাবে মৃদূ ভাবে মাথা নাড়লো ছবি।
হ্যা বোধক উত্তর পেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো কাব্য। টেবিলে রাখা কাগজের ওপর থেকে ভারি পাথরের ন্যায় চকাচকা বস্তুটি সরিয়ে কাগজ টি নিজের হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো ছবির দিকে।
--- এটা এগ্রিমেন্টের কাগজ। চিনতে পেরেছেন??
একিভাবে নিশ্চুপ হয়ে আবারো হ্যা -বোধক মাথা নাড়লো ছবি।
কোনও কিছু না বলেই কাগজ টিকে তুলে ধরে এক টানে ছিড়ে নিলো কাব্য। মুহুর্তেই প্রবল বিষ্ময় এসে দানা বাধলো ছবির চোখে- মুখে।
---- ছিড়ে ফেললেন ??
---- হ্যা। তার কারণ,,, আপনি আজ থেকে মুক্ত। আমার হয়ে আর কাজ করতে হবেনা আপনাকে।
--- কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন সিনেমার কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া অব্ধি আমাকে এগ্রিমেন্ট অনুযায়ি চলতে হবে। আরাবির ব্যাপারে জানতে পারলেও সিনেমার কাজ এখনও বাকি আছে যে....
---- বললাম তো আপনি মুক্ত। আর আমি একবার বলেছি মানে আপনি সত্যিই মুক্ত,,,,তাতে যা কিছু বাকি থাকুক না কেনো। সিনেমা তো শুধু একটা নিছক বাহানা ছিলো আমার। আসলে তীর বিধানোর চান্স খুজছিলাম আমি। আর আপনি সেই সুযোগ আমার হাতে এনে দিয়েছেন। এতেই আমি সন্তুষ্ট...
---- আমি সুযোগ আপনার হাতে এনে দিয়েছি.?? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা...
--- বুঝতে হবেনা। কাল আমার জন্যে আপনার অনেক বড় ক্ষতি হতে যাচ্ছিলো । আমি চাইনা এর পুনরাবৃত্তি আবারও হোক। তাই আজ থেকে আপনাকে মুক্ত করে দিলাম। আপনি আগের মতোই নিজের জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
---- আর আগের জীবন?? আমার বোন টাইতো নেই।( দীর্ঘশ্বাস ফেলে)
---- কি জানেন তো ছবি।নিজের মানুষ চির জীবন নিজের হয়ে থাকেনা। ধরে নিন আপনার ও ছিলোনা।
এনি ওয়ে,,,আপনি এখনও সুস্থ নন। আজ বিশ্রাম নিন। সুস্থ হলে আপনার মায়ের কাছে চলে যাবেন।
ছবি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। উত্তর পেয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে নিতে নিতে আবারো পিছু ফিরলো কাব্য।
--- ওহ হ্যা আরেক টা কথা। আমি চাই আপনারা বরাবরের মতো আমার ফ্ল্যাটেই থাকুন।
---- না সেটা সম্ভব নয় মিস্টার রেয়ান....
আপনার এই কথা আমি রাখতে পারবোনা...
আমি মাকে নিয়ে চলে যাবো। কিন্তু আমাকে দুদিন সময় দিতে হবে,,নতুন করে বাসা খোজার জন্যে একটু সময়।
---- বেশ। আপনার যা মর্জি.....
🍁
🍁
🍁
🍁
🍁
ছাদের মাঝবরাবর রকিং চেয়ার সমেত বসে আছে কাব্য। চোখ জোড়া মুক্ত,,,খোলা আকাশের দিকে। আজ একটু বেশিই জ্বলজ্বল করছে তারা গুলো।
সেই সাথে চাঁদের আলোতে উজ্জ্বল চারিদিক। সব কিছু একিরকম। নতুনত্ব কিছু নেই। শুধু মাত্র আজ ছাদে সে একা এইটুকু বাদ দিয়ে।
অন্য সময় ছবি থাকে। শান্ত মেয়েটা ছাদের খোলা প্রান্তরে পা রাখলেই কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। বকবক করার নূন্যতম বিষয়বস্তুও ছাড় দেয়না সে।
প্রথম প্রথম ছবির এহেন বকবক শুনতে গেলে কান ধরে আসতো কাব্যর। পরক্ষনে আবার ভালো ও লাগতো,,,,অন্তত কথা বলার একটা মানুষ তো রয়েছে।
কথাগুলো ভাবতেই হেসে উঠলো কাব্য। তাৎক্ষণিক পূর্নিমার আলোতেও আমাবস্যা ভিড় করলো তার মুখস্রীতে।
ছবি আজ সকালে চলে গিয়েছে রেয়ান ভিলা ছেড়ে। দুদিন বাদে ফ্ল্যাট থেকেও প্রস্থান ঘটবে তার।আর তারপর?? কাব্য তার রাস্তায় আর ছবি নিজের রাস্তায়। আদৌ কখনও দেখা হবে কিনা কে জানে??
এতোদিন নিজের চারপাশ টা কিঞ্চিৎ মুখরিত মনে হলেও আজ বড্ড বেশি কোলাহল শুন্য মনে হচ্ছে। আগের মতোই তার আলিশান মহল ফাকা শূন্য আর নির্জিবতায় ছেয়ে রইলো.......
---- ছবি... আমি আপনাকে ভীষণ মিস করছি...আপনিও কি একিভাবে মিস করছেন আমায়??
কাব্যের কথাগুলো এতো রাতে কারো কান পর্যন্ত পৌছায়নি। শুধুমাত্র অন্ধকারে ঘিরে থাকা এই রাত বাদে।
তাই কেউ জানতেও পারেনি এই নিস্তব্ধতায় তারও কাউকে মনে পড়ছে....
আচমকা এমন থমথমে পরিবেশের সমাপ্তি ঘটলো কাব্যের ফোনের ভাইব্রেটের শব্দে । পাশ থেকে ফোন উঠিয়ে চোখ বোলাতেই বেশ অবাক হলো কাব্য। বাম হাতে পরিহিত ঘড়িটা উচিয়ে সময় টা দেখে নিলো একবার। রাত দশটা বেজে পাচ মিনিট।
এই সময় ছবির নাম্বার স্ক্রিনে দেখে অবাক হওয়াটা অতিমাত্রায় স্বাভাবিক।
বেশি দেরী না করে ফোন উঠিয়ে কান ধরলো কাব্য। মুহুর্তেই ওপাশ থেকে ছবির কান্নারত কাপা কাপা গলার স্বর ভেসে আসতে শুরু করলো,,,,যা কাব্যকে ঘাবড়ে দিতে যথেস্ট ছিলো।
---- মি....মিস্টার রে...রেয়ান.....
--- ছবি কি হয়েছে?? আপনার আওয়াজ এরকম শোনাচ্ছে কেনো...
--- মিস্টার রেয়ান আমার মা.......
--- হ্যা কি হয়েছে??
---আমার মা কথা বলছেনা....মিস্টার রেয়ান....
ছবিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ফোনের লাইন কেটে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো কাব্য। তড়িঘড়ি করে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতেই ডেকে উঠলো রাজীব কে.....
_______________
____
__________
______
______________________________
"
"
"
সাদা রংয়ের মেঝেতে দু পা গুটিয়ে বসে আছে ছবি। লম্বা চুল গুলো এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে। পাশেই হতাশ ভঙ্গিতে বসে আছে কাব্য। ছবির এমন থমথমে চেহারা বড্ড ভাবাচ্ছে তাকে।
তার সাথে আরো একটা বিষয় ভাবাচ্ছে যে আরাবির মৃত্যুর খবর কে লিক করেছে প্রেসের কাছে?? সেতো করেনি... তবে কি এটা ইরফানের কোনও শত্রুপক্ষের কাজ?? কিন্তু আখেরী ক্ষতি তো এই মেয়েটার ই হলো.....
ছবির মায়ের ফ্ল্যাটে নিউজ পেপার সাপ্লাই বন্ধ করে দিলেও টেলিভিশনের ব্যাপারটা মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলো কাব্য ছবি দুজনেরই।
ফফলশ্রুতিতে শেষ মেষ ছবির ভয়টাই সত্যি হয়ে দাড়ালো।
এখন ঠিক কি ভাবে ছবিকে শান্ত্বনা দিলে লাভ হবে মাথাতে আসছেনা কাব্যের। একিদিনে দুজন কাছের মানুষের মৃত্যুর খবর আদৌ কি কোনও সান্ত্বনা পেলে লাঘব হয়?
খানিকক্ষণ আগেই কাব্যে এসে পৌঁছেছে এখানে। আর ততক্ষনে সব শেষ। নূবায়রা আর নেই। হৃদস্পন্দন এখানেই থেমে গিয়েছে তার।
রাতের দিকে টেলিভিশন চালু করতেই মেয়ের মৃত্যুর খবর ব্রেকিং নিউজে দেখে
ট্রমাট্রিক ব্রেন ইঞ্জুরি অর্থাৎ মস্তিষ্কে তীব্র চাপ প্রয়োগের দরুন আকষ্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তিনি। এসে থেকে ছবিকে মায়ের লাশের পাশেই দেখেছিলো কাব্য। অনেক কাঁদছিলোও
হুট করেই অনেকক্ষন যাবত এভাবে চুপচাপ শান্তভাবে বসে রইলো তারপর।
কাব্যের চিন্তার মাঝেই পাশ থেকে রাজীব বলে উঠলো....
---- স্যার ম্যাডাম কে সামলান স্যার।একেবারে পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে বসে আছে যে....
রাজীবের দিকে একবার তাকিয়ে ছবির কাধে হাত রাখলো কাব্য।
--- ছবি..?? শুনতে পাচ্ছেন। উঠুন,,,,আর কতক্ষন এভাবে বসে থাকবেন.??.
আপনার মায়ের লাশ দাফনের ব্যাবস্থা করতে হবে তো।
কাব্যের শেষের কথায় এতক্ষনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ছবি। বেশ শব্দ করে চেঁচিয়ে বলে উঠলো....
--- আমার সাথে এরকম কেনো হলো?? আমার মা ও আমাকে ছেড়ে চলে গেলো মিস্টার রেয়ান..আমার যে আর কেউ রইলো না। আমি যে একেবারে একা হয়ে গেলাম।(কাঁদতে-কাঁদতে)
ছবিকে সামলাতে ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো কাব্য। পাশাপাশি কাব্যের বুক আশ্রয় হিসেবে পেয়ে একিভাবে আকড়ে ধরলো ছবি। সেই সাথে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরায় কিঞ্চিৎ ভিজতে শুরু করলো কাব্যের শার্টের ওপরের প্রান্ত।
হুট করে ছবির কান্নার শব্দ না পেয়ে ভ্রু ক্রুটি করলো কাব্য। টেনে ছবির মুখ তুলতেই বুঝতে পারলো আবারও জ্ঞান হারিয়েছে ও।
--- কি হলো স্যার ??
--- ছবি বেহুশ হয়ে গিয়েছে। রাজীব তুমি,,,,ওনার মায়ের লাশ নেবার বন্দোবস্ত করো,,, আমি ওনাকে সামলাচ্ছি।
কথাটা বলে আবারো ছবিকে তুলে নিলো কাব্য। কি আছে তাদের ভবিষ্যতে কে জানে??
চলবে....