#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________৭
মিথিলা বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় আরিয়ানকে এভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক । আরিয়ানের ওই শান্ত তীক্ষ্ণ চাহনি যেন তীরের মতো ওর দিকে ছুটে আসছে।
মিথিলা কোনোমতে নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পেল যেন। জিজ্ঞেস করল, "আপনি... আপনি এখানে কীভাবে? আর আমার চাবি কোথায় পেলেন?"
আরিয়ান উঠে দাঁড়ায়। হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলো। তারপর খুব ধীর পায়ে মিথিলার দিকে এগিয়ে এল।
মিথিলা এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পিছনে দেয়াল। আরিয়ান খুব দ্রুত ওর একদম কাছে এসে দাঁড়াল। মিথিলা অনুভব করছে আরিয়ানের শরীরের পুরুষালি ঘ্রাণ।
"কেন করছেন এসব আরিয়ান? আপনার জীবনে তো নাতাশা ছিল,। এখন তো আপনি সুস্থ, এখন আমাকে নিয়ে আপনার আর কী প্রয়োজন?" মিথিলার চোখে জল টলমল করছে।
"মিথিলা, আমি জানি আমি তোমার সাথে যা করেছি তার কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার জীবনটা এক নরক ছিল। যে মহিলার কথা তুমি জানো, তিনি আমার সৎ মা। আমার দাদাজীর সব সম্পত্তি আমার নামে হওয়ায় তিনি আমায় শেষ করে দিতে চান। বাবাকেও আমার বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিয়েছেন। ওনার পছন্দ করা মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দেওয়াটা ছিল একটা চাল, যাতে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমার এক্সিডেন্ট এর পেছনে ওনার হাত ছিল। আমি ভেবেছিলাম তুমিও বুঝি ওনারই দাবার গুটি। নিরপেক্ষ ভাবে ভেবে দেখো ঐ মহিলার পছন্দ করা মেয়ের সাথে আমার বিয়ে। তাহলে মেয়েটাকে বিশ্বাস করা আমার জন্য সহজ?? তাই আমি শুরুতেই তোমার ওপর সব ঘৃণা উগড়ে দিয়েছিলাম।"
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, "কিন্তু যত সময় গেছে, আমি বুঝতে পেরেছি তুমি আলাদা। তুমি সহজ-সরল, পবিত্র। আমি যদি তখন তোমার সাথে সহজ হতাম, তবে ওই মহিলা তোমাকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করত না। আমি সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম এরপর নাতাশা ফিরে এলো।
নাতাশার সাথে অভিনয়টাও ছিল আমার পরিকল্পনার অংশ। ও আমার সৎ মায়ের সাথে হাত মিলিয়ে ফিরে এসেছে , আর আমি চেয়েছিলাম ওদের হাতে-নাতে ধরতে। এই চার মাস ধরে হাঁটতে পারি কাউকে বুঝতে দিইনি। আমি চেয়েছিলাম সব কিছু নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াতে।" তবে এরই মাঝে তুমি চলে আসলে।
মিথিলা স্তব্ধ হয়ে আরিয়ানের কথাগুলো শুনছে ।
"আমি এই এক মাস তোমায় বিরক্ত করিনি, চেয়েছিলাম তুমি নিজের মতো থাকো। আমার এই একাকিত্বের জীবনে তুমিই একমাত্র আলো হয়ে এসেছিলে। আমি জানি আমি যা করেছি তা অনেক ভুল,, শুরুতে আমি খারাপ আচরণ করলেও শেষের দিকে আমি তেমন করি নি তুমি ভেবে দেখো মিথি। আমি জানি তোমার মন হয়তো ভেঙে গেছে, কিন্তু আমি তোমাকেই আমার পাশে চাই।"
মিথিলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি তোমাকে জোর করব না মিথি। তুমি সময় নাও। তুমি যা চাও তাই হবে। কিন্তু এটুকু জেনে রেখো, তোমার জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকবে।"
আরিয়ানের এই দীর্ঘ যুক্তিপূর্ণ স্বীকারোক্তি মিথিলাকে এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো নিশ্চল করে দিল। ঘরের গুমোট ভাবটা যেন আরও ঘনীভূত হলো। মিথিলা যেন এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে ।
আরিয়ান আরও বললো - আমি যা করেছি, তা পরিস্থিতির শিকার হয়েই করেছি।"
"তুমি জানো মিথিলা, ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর আমি বড্ড একা হয়ে গিয়েছিলাম। বাবা নিজের জগত নিয়ে ব্যস্ত, চারপাশের সবাই শুধু আমার সম্পত্তির হিসাব করত। কেউ আমার মনের খবর নিত না।"
আরিয়ান থামল। মিথিলা দেখল আরিয়ানের ধূসর চোখে এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। আরিয়ান আবার বলল, "সবাই আমাকে ব্যবহার করেছে, মিথি। কেউ আমার নিঃসঙ্গতা বোঝেনি। শুধু তুমি আমার পাশে ছিলে, সেবা করতে—তখন প্রথমবার মনে হয়েছিল কেউ একজন নিঃস্বার্থভাবে আমার জন্য ভাবছে। কিন্তু আমার ভেতরে জেদ আর পরিস্থিতির চাপ এত ছিল যে, আমি তোমাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছি।"
মিথিলার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে জানে মা না থাকার কষ্ট কী।
হঠাৎ করেই আরিয়ান আর দূরত্ব বজায় রাখল না। সে এক পা এগিয়ে এসে মিথিলাকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ানের শক্তিশালী বুকের মাঝে মিথিলা যেন মিশে গেল।
মিথিলার মস্তিষ্ক যেন এক রণক্ষেত্র। মিথিলার মনে পড়ে যাচ্ছে বিগত দিনগুলোর প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ স্মৃতি। আরিয়ান আজ যা যা বলছে, তার সাথে অতীতের সুতোগুলো যেন ধীরে ধীরে এক হতে শুরু করেছে।
মিথিলা আরিয়ানের বুকের মাঝে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ানের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন মিথিলা নিজের কানে অনুভব করতে পারছে। মনে মনে হিসেব মেলাতে শুরু করল—সত্যিই তো, শুরুতে আরিয়ান যতটা রুক্ষ ছিল, শেষের দিকে সে অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছিল।
মিথিলার মনে পড়ল, ওষুধগুলো নিয়ে সন্দেহ করেছিল ডাক্তারের সাথে কথা বলে আরিয়ানের ওষুধ,, পরিবর্তন করে তারপর থেকেই আরিয়ানের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে শুরু করেছিল। তার বাবাও তো কোনোদিন এসে ছেলের সাথে দেখা করে নি।
মিথিলার চোখে জল চলে এল। বুঝতে পারছে, আরিয়ান যে পরিস্থিতির কথা বলছে, তা । আরিয়ানের মনের ভেতর কতটা লড়াই চলছিল তা আজ স্পষ্ট।
মিথিলা কী করবে বুঝতে পারছে না। আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরবে নাকি নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে।
মিথিলার হাত দুটো আরিয়ানের পিঠ স্পর্শ করতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল। এক বছরের চরম অবহেলা আর আজকের এই আকুলতা—দুটোর মাঝে এক বিশাল পাহাড় সমান দূরত্ব। আরিয়ান যেন মিথিলার মনের সেই দোটানাটা বুঝতে পারছে
আরিয়ান ধীরে ধীরে নিজের বলিষ্ঠ বাহুডোর আলগা করে দিলো । এক কদম পিছিয়ে গিয়ে মিথিলার অশ্রুসিক্ত মুখটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল।
"আমি জানি মিথি, এক বছরে আমি তোমার যে পরিমাণ মন ভেঙেছি, তা সহজে ভোলার মতো না । আমি তোমাকে জোর করতে চাই না, মিথি।
"তুমি সময় নাও। "
কথাগুলো বলে আরিয়ান আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। দরজার খুলে উনি বেরিয়ে গেলো । করিডোরে পায়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই মিথিলার ঘরটা যেন এক অতল নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।
চলবে ~~~