ফন্ট সাইজ:
থিম:
My witless King

৭ম পর্ব

লেখক: Nasrin akando

অয়ন এভলিনের এসব ফালতু কথায় কান না দিয়ে

ব্যক্তিত্বের সেই কঠোরতা বজায় রেখে ঠান্ডা গলায় বলল—

"আমি এখানে মজা করতে আসিনি, সোজা উত্তর চাই। ওই দিন রাতে ঘটনাস্থলে আপনি ঠিক কী করছিলেন?"

এভলিন যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, "কিসের কথা বলছেন আপনি?"

অয়ন এবার দাঁত চেপে নিজের রাগ সংবরণ করল। মাহিরের দিকে ফিরে তপ্ত স্বরে বলল, "মাহির, তুমি তোমার বোনকে সব বুঝিয়ে বলো। আমি উত্তর চাই, কোনো তামাশা নয়!"

মাহির অপ্রস্তুত হয়ে এভলিনকে সব ঘটনা  খুলে বলল। পুলিশের সন্দেহ, ফরেনসিক রিপোর্ট আর ওই রাতের রহস্য—সবটুকু শোনার পর হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। এভলিনের ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে হুট করে ডুকরে কেঁদে উঠল।

কাঁদতে কাঁদতে সে রাস্তার ওপরই বসে পড়ল। এভলিনের এই আকস্মিক রূপ পরিবর্তন দেখে পার্থ পর্যন্ত হতবাক হয়ে গেল। তাহসিন দ্রুত ছুটে এসে বলল, "

ভাইয়া! কী হয়েছে তোমার? বলো আমাকে, কে কী বলেছে?"

মাহির বোনকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে বিচলিত হয়ে পড়ল। সে এভলিনকে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল এবং মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। মাহিরের চোখেমুখে বোনের জন্য গভীর মমতা ফুটে উঠল।

অয়ন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। এভলিনের এই কান্না তার কাছে এক নিপুণ অভিনয় মনে হলেও, পরিবেশটা এমন হয়ে গেছে যে সে কিছু বলতে পারছে না। এভলিন কাঁদতে কাঁদতেই হেঁচকি তুলে বলল—

"ওরা... ওরা লোকগুলো রাস্তায় খুব ঝামেলা করছিল। আমি তো শুধু ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে দেখা মাত্রই ওরা গুলি করে দিল। আমি ভয়ে জান হাতে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছি। তারপর... তারপর চোখ মেলে দেখি আমি হাসপাতালে। আমি আর কিছু জানি না অফিসার, বিশ্বাস করুন!"

কথাটা শেষ করে সে মাহিরকে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কাঁদতে শুরু করল। অয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এভলিনকে মেপে নিচ্ছিল। এই মেয়েটি কয়েক মিনিট আগেও তাকে ব্যঙ্গ করছিল, আর এখন অবলার মতো কাঁদছে। তার মনের ভেতরের খটকাটা দূর হলো না, বরং আরও ঘনীভূত হলো। সে বুঝতে পারল, মাহিরের সামনে এখন আর জেরা করা সম্ভব নয়।

অয়ন বিরক্তি আর সন্দেহ নিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমার বোনকে বাড়ি পৌঁছে দাও। আজ আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।

এই বলেই অয়ন আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে নিজের গাড়ি নিয়ে ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে চলে গেল। এভলিন মাহিরের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদলেও, চোখে কোনো মায়া নেই _

মাহির এভলিনকে নিয়ে যখন বাড়িতে পৌঁছাল, তখন এভলিনের চোখমুখ ক্লান্তিতে বুজে আসছে। কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলতেই তৃণা (মাহিরের খালা) মাহিরকে দেখে আকাশ থেকে পড়লেন। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, "তুই এখানে কী করছিস রে বাবা?"

মাহির মৃদু হেসে বলল, "খালামণি তুমি তো জানোই আমি এখন পুলিশ অফিসার। এই এলাকার থানাতেই কয়েক মাস ধরে পোস্টিং হয়েছে আমার।"

তৃণা কৃত্রিম রাগে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, "কী! তুই এই শহরে আছিস অথচ একবারও আমাকে বলিসনি?"

মাহির ফুফুর কথার উত্তর না দিয়ে এভলিনের দিকে ইশারা করে বলল, "খালামণি এসব পরে হবে। আগে এভলিনকে একটু সামলাও। ওকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দাও আর একদম একা রেখো না। মেয়েটা আজ খুব ভয় পেয়েছে।"

তৃণা মায়া ভরা চোখে এভলিনের দিকে তাকালেন। পরম মমতায় ডাকলেন, "কী হয়েছে মা?" কিন্তু এভলিন কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো মুখ করে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তৃণার বুকের ভেতরটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। এভলিনের সাথে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের, তবুও মা হিসেবে তার মনটা তো কেঁদেই মরে।

মাহির তৃণার খালামণি  তৃণার সাথে এভলিনের সম্পর্কটা একদমই ভালো নয়। তবে মাহিরকে এভলিন নিজের বড় ভাইয়ের মতোই শ্রদ্ধা করে। মাহির তৃণা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "চিন্তা করো না খালামণি। ও একদিন তোমার ভালোবাসা নিশ্চয়ই বুঝবে। একটু সময় দাও ওকে।"

তৃণা এই বাড়িতে তাহসিনকেও নিজের সন্তানের মতো আশ্রয় দিয়েছেন। এভলিনই তাহসিনকে এখানে জায়গা দিয়েছিল, আর তৃণা তাকে ভালোবেসে আগলে রেখেছেন।

সবাইকে রাতের খাবার খাইয়ে তৃণা একটা থালায় খাবার বেড়ে এভলিনের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ধীর স্বরে বললেন, "এভলিন, মা... খাবার নিয়ে এসেছি। একটু খেয়ে নে মা।

ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। তৃণা দমে গেলেন না, তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই রইলেন। প্রায় এক ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। এভলিন দরজা খুলে দিয়ে কোনো কথা না বলে খাটে গিয়ে বসল।

তৃণার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এটা দুঃখের নয়, বরং পরম তৃপ্তির জল। কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ প্রথম এভলিন তার ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খুলেছে। তৃণা ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকে এভলিনের পাশে বসলেন। নিজের হাতে লোকমা মাখিয়ে এভলিনের মুখের সামনে ধরলেন। এভলিন কোনো আপত্তি করল না, যন্ত্রের মতো খেয়ে নিল।

তৃণার চোখ ছলছল করে উঠল। এভলিনের থেকে এতটুকু সাড়া পাবেন তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। খুশিতে ডগমগ হয়ে তিনি এভলিনকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। খাওয়া শেষে পরম যত্নে এভলিনের মুখটা পরিষ্কার করে দিয়ে তৃণা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

**"আমি রান্না শিখতে চাই।"

তৃণা থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি কি ভুল শুনলেন? এভলিন তার সাথে কথা বলেছে! তাও নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়েছে! তৃণা গভীর আগ্রহ আর আবেগ নিয়ে পেছন ফিরে তাকালেন। এভলিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী বললে মা? আর একবার বলো!"

এভলিন আর কথা বাড়াল না, পুনরায় নিশ্চুপ হয়ে গেল। তৃণা এক বুক আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে এভলিন আবার স্পষ্ট করে বলল—

**"আমি রান্না শিখতে চাই।

তৃণার খুশির আর সীমা রইল না।

সকাল হতেই এভলিন তার চিরচেনা গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে রান্নাঘরে এসে হাজির হলো। তৃণা তখন প্রাতঃরাশ তৈরিতে ব্যস্ত, পাশে কয়েকজন পরিচারিকা হাত বাড়াচ্ছে। বাড়িতে লোকবলের অভাব নেই, তবুও তৃণা নিজের হাতের ছোঁয়া ছাড়া তৃপ্তি পান না। এভলিনকে সেখানে দেখে তিনি থমকে গেলেন। বিস্ময় নিয়ে বললেন, "এখানে কী করছিস মা?"

এভলিন কিছুটা ইতস্তত করে নিচু স্বরে বলল, "রান্না শিখতে চাই।"

তৃণার মুখে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। তিনি কাজের লোকদের ইশারায় সরিয়ে দিয়ে বললেন, "আজ তোরা বিশ্রাম নে, আমি আর আমার মা মিলে রান্না করব।"

তৃণা এভলিনকে কাছে টেনে নিলেন। আগুনের তাপে এভলিন বারবার পিছিয়ে আসছিল, তার চোখেমুখে এক ধরনের জড়তা আর ভয়। ছুরি দিয়ে সবজি কাটতে গিয়ে হাত কাঁপছিল তার। তৃণা পরম মমতায় এভলিনের হাতটা ধরলেন। মিষ্টি করে বুঝিয়ে বললেন, "ভয় পাস না মা, আগুনের সাথে সখ্য করতে হয়। এই দেখ, মশলাটা এভাবে কষাতে হয়।" তৃণার হাতের সেই স্নেহের স্পর্শে এভলিনের ভয়টা ধীরে ধীরে কাটতে লাগল, যদিও রান্নার ব্যাকরণটা তার কাছে তখনো বেশ জটিল মনে হচ্ছিল।

রান্না শেষে এভলিন খুব যত্ন করে একটা ছোট বক্সে কিছুটা খাবার তুলে রাখল। তৃণা সব দেখলেও কোনো প্রশ্ন করলেন না; মেয়ের এই সামান্য পরিবর্তনই তাঁর কাছে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো।

খাবারের টেবিলে আজ উৎসবের আমেজ। এভলিনের নিজের হাতে করা রান্না পরিবেশন করা হয়েছে। তাহসিন প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই 'তু' করে ফেলে দিল। মুখ বিকৃত করে বলল, "তৃণা আন্টি! এটা কী বানিয়েছেন? জঘন্য খেতে!"

তৃণা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহসিনের দিকে তাকালেন। পার্থ বলে উঠল, "আন্টি, এটা কে রান্না করেছে? এই খাবার Queen-কে খেতে দেবেন না প্লিজ।

তৃণা মৃদু হেসে বললেন, "এটা এভলিন নিজে রান্না করেছে।"

কথাটা শোনামাত্র পার্থের চেহারার রঙ বদলে গেল। যে খাবারকে সে একটু আগে বিষ মনে করছিল, এখন তা-ই তার কাছে অমৃত হয়ে উঠল। সে কোনো কথা না বলে তৃপ্তি নিয়ে সেই খাবারই খেতে শুরু করল। **মায়াজ আহমেদ খাবারটার দিকে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের হাতের প্রথম রান্না—হোক না তাতে লবণের পাহাড়, বাবার কাছে তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাদ। তিনি তৃণার দিকে তাকালেন, দুজনের চোখেই তখন খুশির জল। মায়াজ এমনভাবে খাচ্ছেন যেন সত্যিই কোনো স্বর্গীয় সুধা গ্রহণ করছেন।

এভলিন অবশ্য বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকেনি। খাবারের বক্সটা নিয়ে সে সোজা চলে  গিয়েছিল হাসপাতালে। আদ্রিয়ানের কেবিনে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর আদ্রিয়ান ফিরল। অপারেশন থিয়েটার থেকে আসায় সে বেশ ক্লান্ত। এভলিনকে দেখা মাত্রই তার মেজাজ বিগড়ে গেল।

আদ্রিয়ান রুক্ষ স্বরে বলল, "আমার কেবিনটা কি এখন লোকাল বাস হয়ে গেছে? যখন তখন যে কেউ ঢুকে পড়ছে!"

এভলিন সেসব কথায় কান না দিয়ে খাবারের বক্সটা এগিয়ে ধরল। "এটা নিন, আমি আপনার জন্য রান্না করেছি।"

আদ্রিয়ান বিরক্তি চেপে বলল, "তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যান, নইলে আমি আপনাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করতে বাধ্য হব।

এভলিন দমল না। সে একটু এগিয়ে গিয়ে আদ্রিয়ানের মুখের কাছে বক্সটা ধরে কোমল স্বরে বলল, "একটু খেয়ে দেখুন ডাক্তার সাহেব, আমি চলে যাব।"

বাধ্য হয়ে আদ্রিয়ান এক চামচ মুখে নিল। কিন্তু মুহূর্তেই তার চেহারা কুঁচকে গেল। খাবারটা ফেলে দিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, "ছিঃ! এটা কি খাবার নাকি লবণ আর মরিচের পাহাড়? মানুষের অখাদ্য!" রাগের মাথায় সে খাবারের বক্সটা দূরে সরিয়ে দিল।

এভলিনের মুখের সেই মিষ্টি হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "এতটাই খারাপ? ক্ষমা করবেন ডাক্তার সাহেব, আমি রান্না পারি না, তবে চেষ্টা করেছিলাম আপনার জন্য..."

আদ্রিয়ান রাগে ফেটে পড়ে বলল, "চলে যাও এখান থেকে!

এভলিন আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। মাথা নিচু করে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তার দুই ঘণ্টা অপেক্ষা

র ফল যে এমন বিষাদময় হবে, তা হয়তো সে ভাবেনি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন