#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ২২
#মাকামে_মারিয়া
হঠাৎ করেই এক শুক্রবারে জেরিনকে বড় একা করে দিয়ে জেরিনের দাদী মৃত্যুবরণ করলো। এই তো রাতেই দিব্যি ঘুমাচ্ছিল সে। জেরিন রাত জেগে রওনকের সাথে কথা বলেছে। রাত তিনটে কি চারটে ওমন সময়ে একবার কাশি দিয়েছে। জেরিন একবার জিজ্ঞেস করেছিল,"দাদী আজ ঔষধ খাওনি? বার বার কাশি দিচ্ছো যে?"
দাদী প্রতিত্তোর করেনি। কি জানি হয়তো তখনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। সকালে যখন জেরিন টের পেলো ফজরে তার দাদীর চিল্লাফাল্লা কানে যাচ্ছে না ওমনি মনটা কেমন করলো। প্রতিদিন সকালে দাদীর চেঁচামেচিতেই তো ঘুম ভাঙে তার। আজ তো কোনো সাড়াশব্দ নেই। জেরিন সময় দেখে অবাক হয়ে গেলো সকাল নয়টা বাজে। অথচ দাদীকে রাতে ঠিক যে ভাবে দক্ষিণ মুখী হয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছে ঠিক সে ভাবেই শুয়ে আছে। দাদী এতো বেলা অব্দি শুয়ে থাকার মানুষ না। জেরিনের হৃদয়ে মোচড় দিলো সে বার কয়েক ডাকলো দাদী দাদী করে। কিন্তু যে চলে যায় সে কি আর ফেরে?
কারনে অকারণে জেরিনকে খুব বকাবকি করতো মানুষটা কিন্তু তাতে কি? পৃথিবীতে আপন বলতে তো জেরিনের সেই একটাই মানুষ ছিল। খুব ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়ে এই দাদীর কাছে মানুষ হয়েছে। এখন জেরিনকে কে দেখেশুনে রাখবে? প্রচন্ড আহাজারিতে মেয়েটা ভেঙে পড়লো।
গতরাতে মকবুলের ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। এখন আর সেভাবে ঘুম হয়না তার। ভোরে মসজিদ থেকে ফেরার পথে একবার জেরিনদের বাড়িটার দিকে তাকিয়েছিল। বুড়ীর সাড়াশব্দ থাকার কথা, কিন্তু পেলো না। না পেয়ে একটু চিন্তিত হয়েছিল বটে কিন্তু সে চিন্তা আর বেশিক্ষণ টিকেনি। এরপর বেলা ন'টাতে এসে যখন মসজিদের মাইকে মৃত্যু সংবাদ পেলো মকবুল প্রাণপণে দৌড়ে আসলো জেরিনদের বাড়ি। পাড়াপ্রতিবেশি থেকে কিছু মহিলা এসে ভিড় করেছে। কারো মুখে তেমন শোকের চিহ্ন নেই। কেউ কেউ ফিস ফিস করে বলছে," বয়স হয়েছে মরে গেছে। কি আর করার! সবাইকেই তো মরতে হবে। কিন্তু এই হতভাগী মেয়েটার কি যে হবে!"
বুড়ীর মরে যাওয়া সবার মেনে নিতে সহজই হলো। কেবল কঠিন হয়ে পড়লো জেরিনের জীবন। মকবুলকে দেখতে পেয়েই জেরিন এলোমেলো পায়ে সামনে এসে আওড়ালো,"মকবুল ভাই দাদী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমার ঘরদোর আর এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ রইলো না।"
মকবুল জেরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,"কাঁদিস না জেরিন। আমরা আছি তো।"
জেরিন মকবুলের কথা শুনলো না। সে মকবুলের বুকে মাথা ঠেকিয়ে খুব কাঁদল। মকবুল চুপটি করে শূন্যে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না। সে যে নিরুপায়, অসহায়, একটা মেয়ের না হওয়া প্রেমিক। যে চাইলেও অধিকার দেখাতে পারে না।
__________
শামসুন্নাহার প্রায় বারো দিন পর বাপের বাড়ি থেকে ফিরলেন। সাথে করে নিয়ে এলেন মেহনাজের জন্য এক বোতল পড়া পানি সাথে একটা তাবিজ। এসেই হন্তদন্ত করে মেহনাজের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,"পানি টা তিনবেলা করে খাবে বউ। আর তাবিজটা কোমরে বেঁধে নাও।"
মেহনাজ অবাক হয়ে বললো,"এসব কেনো ছোট মা?"
" ওতো প্রশ্ন করছো কেনো বউ? বিয়ের তো আর কম দিন হলো না। এখনো নাতিনাতকুরের মুখ দেখলাম না। তোমার মায়েরও দেখি ওদিকে মাথা ব্যথা নেই। আমাদের বাপু অনেক মাথা ব্যথা। বংশে এমনিতেই সন্তানের সংখ্যা বেজায় কম।"
রাগে দুঃখে লজ্জায় মেহনাজের মাথা নিচু হয়ে আসলো। শামসুন্নাহারের মুখে মুখে তর্ক না করে কিছুটা অধিকারবোধ নিয়ে কোহিনূরের দ্বার প্রান্তে উপস্থিত হলো। কোহিনূর ওমন বিমূঢ় মুখখানা দেখে জিজ্ঞেস করলেন," কি হয়েছে বউ? মুখখানা ওমন করে রেখেছো কেনো?"
মেহনাজ হেঁচকি তুলে কেঁদে ফেললো। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো," ছোট মা কি সব তাবিজ-কবচ দিচ্ছে আমায়। আপনি কিছু বলুন বড় মা "
কোহিনূর মুখ গোমড়া করে বললো," আমি কি বলবো গো? ছোট তো খারাপ কিছু দেয়নি। আর আমিই তাকে বলে দিয়েছিলাম তার বাপের বাড়িতে এক নামকরণ কবিরাজ আছে তার থেকে এগুলো নিয়ে আসতে। তুমি এসেছো অভিযোগ করতে?"
শামসুন্নাহারের নিকট যতটা না দুঃখ পেলো তারচে টের বেশিই দুঃখ পেলো কোহিনূরের কথায়। প্রতিটা কথার আঘাতে মেহনাজের হৃদয় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। কার কাছে অভিযোগের স্বর নিয়ে যাবে সে? এ বাড়িতে সবাই যে পর। আপন বলতে কেউ নেই। কি জানি হয়তো বাচ্চা না হওয়া নিয়ে নিজের স্বামীও ওমন রুপ দেখিয়ে দিতে পারে। প্রচন্ড ভয়ে মেহনাজ চুপসে গেলো।
নাফিজ আজ আর রাতের অপেক্ষা করলো না। বিকেলে চলে আসলো বাড়িতে। বললো শরীর খারাপ করছে। বাড়িতে এসে দেখলো তার নিজ স্ত্রীর মুখশ্রীতে যেনো কালবৈশাখীর ঝড় নেমেছে। জিজ্ঞেস করলো, " কিছু হয়েছে মেহনাজ?"
অপমান, অভিমান আর অভিযোগে মেহনাজ হুহু করে কেঁদে উঠলো। আচমকা এমন কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে নাফিজ ভড়কে গেলো। মেহনাজকে বার দুয়েক জিজ্ঞেস করেও কারন উদ্ধার করতে না পেরে বাড়ি মাথায় তুলে সবাইকে ডাকলো। মারজানা পাশের রুমে থাকাতে দ্রুত ছুটে আসলো। সে আজ রুম থেকে তেমন একটা বের হয়নি বিধায় মেহনাজের সাথে কি ঘটেছে সেটা আন্দাজ করতে পারলো না। নাফিজ মায়েদের ডাকলো। কোহিনূর এসে পরম স্নেহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো," চিৎকার করছো কেনো বাবা? কিছু হয়েছে? বউমা ঠিক আছে তো?"
নাফিজ চেঁচিয়ে বললো,"ঠিক আছে কিনা সেটা তো আপনাদের জানার কথা বড়মা।"
শামসুন্নাহার এসে ব্রু কুঁচকে বললো," কি এমন হয়েছে বউ! ওমন কেঁদে বুক ভাসাচ্ছো?"
নাফিজের রাগ এবার কিছুটা বাড়লো। সে কিছুটা তেজী কন্ঠে বললো,"ছোট মা আপনার কথার ওমন ধরণ পাল্টে ফেললে নিশ্চয়ই খুব ক্ষতি হবে না। মেহনাজ আপনাদের মেয়ের মতো। কিন্তু আপনারা তাকে সব সময় পুত্রবধূর চোখে দেখে এসেছেন। মেয়ের চোখে দেখা কি অন্যায়?"
মারজানা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো," পেটে ধরেনি তো তাই বোধহয় মেয়ে হিসেবে মানতে পারছে না।"
শামসুন্নাহার আর কোহিনূর দুজনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। শামসুন্নাহার তেড়ে এসে বললো," তোমাকে কি মেয়ে হিসেবে মানি নাই মারজানা? তাহলে ওমন কথা বলছো কেমনে?"
মারজানা অস্ফুট স্বরে বললো,"পেটে তো ধরেন নাই ছোট মা।"
নাফিজ দেখলো পরিস্থিতি হাতের বাহিরে চলে যাচ্ছে। সে সবাইকে চলে যেতে বললো। সবাই যে যার মতো চলে গেলো। নাফিজ চুপটি করে মেহনাজের পাশে বসে স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম আদরে জিজ্ঞেস করলো," কি হয়েছে মেহনাজ?"
মেহনাজ মৃদু স্বরে বললো,"ভয় পেয়েছি।"
"ভয়? কিসের জন্য? কি হয়েছে?"
সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মেহনাজ জিজ্ঞেস করলো," আপনি আমায় ছেড়ে দিবেন না তো মির্জা সাহেব?"
নাফিজ উতলা হয়ে বললো,"এসব কথা কেনো আসছে মেহনাজ?"
" ছোট মা ওসব দেওয়ার পর আমার খুব ভয় করছে। কেবল মনে হচ্ছে আমার সন্তান না হলে আপনি আমায় ছেড়ে দিবেন।"
নাফিজ হাতের বন্ধনটা আরেকটু শক্ত করে বললো," ভয় পেয়ো না মেহনাজ। সন্তান হওয়ার সময় আছে তো। আমার মায়েরা পুরনো দিনের মানুষ। তাদের কথা শুনে ভয় পেলে তো চলবে না। জানোই তো আমাদের বংশে সন্তানের সংখ্যা খুবই কম। আমার বাবা চাচাদের হাতেগোনা একটা দুটো করে সন্তান হয়েছে। কারো কারো কোনো সন্তানও নেই। পাড়ার লোকদের মুখে শুনা যায় মির্জা বাড়িতে নাকি দোষ পড়েছে। যে কারণে এ বাড়ির বউ ঝিয়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা কম।কিন্তু আমি ওসব বিশ্বাস করিনা মেহনাজ। আমার বিশ্বাস তুমি মা হবে, আমার সন্তানের মা।
মেহনাজ চোখ মুছতে মুছতে বললো," তবে যে বললেন আপনাদের বংশে দোষ পড়েছে।"
" ওটা কথার কথা। কিছুটা কুসংস্কারও বটে। তাছাড়া আমি এ বংশের ছেলেও নই। তুমি ওতো ভয় পেয়ো না। তোমাকে আমি কোনো কালেই ছাড়ছি না এলিন।"
চলবে.........