ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২৩তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ২৩

#মাকামে_মারিয়া

বাড়ির পিছনে যে খালটা আছে জেরিন ওখানে বসে আছে আনমনে। সমস্ত রাগ অভিমান এখন রওনকের উপর। লোকটা একটু দেখতেও আসলো না তাকে? এই নাকি সে তার আপন মানুষ? আপন মানুষ থাকতেও যদি পর মানুষে ঘরে এনে ঠাঁই দিবে তবে ওমন আপন মানুষের কি বা দরকার!

মেহরিমা এসে ডাকলো, "জেরিন আন্টি নানু তোমাকে ডাকছে খাবে চলো।"

জেরিন মেহরিমাকে কাছে টেনে চুপটি করে কোমর জড়িয়ে ধরে রাখলো। মেহরিমা ছোট হাতটা জেরিনের গালে রেখে বললো,"তোমার কি মন খারাপ হচ্ছে? মন খারাপ করো না। তোমারও আম্মু নেই আমারও তো আম্মু নেই। চিমটি।"

জেরিন অবাক বিস্ময়ে ছোট্ট প্রাণটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এতো ছোট একটা মেয়ে যদি নিজেকে এতো সুন্দর করে সামলে নিতে পারে তবে জেরিন কেনো পারবে না?

সেদিন দাদীকে দাফন করার পর ওই ফাঁকা বাড়িতে জেরিনকে একা থাকতে দেয়নি মালাইকা। সে নিজের সাথে মেয়েটাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। সেই থেকে জেরিন এখানেই আছে। তবে মকবুলের সাথে সাক্ষাৎ হচ্ছে না বললেই চলে। মকবুল সত্যি এখন আর জেরিনকে জ্বালাতন করে না আগের মতো। সে অবশ্য এখন কাজের মানুষ হয়েছে। ভোরে উঠে কাজে বের হয় আর রাতে ফিরে। তার সাথে সাক্ষাৎ কি ভাবেই বা হবে! এদিকে রওনকের সাথে অভিমান পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ফোন বন্ধ করে রেখে দিয়েছে আর যোগাযোগ করবে না ভেবে। জেরিনও দেখতে চায় সে কি ভাবে খোঁজে বের করে তাকে।

_____

প্রায় পঁচিশ দিন পর স্বর্ণা আচমকা মেয়েকে বাড়িতে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,"কি ব্যাপার মেহনাজ? না বলেকয়ে চলে এসেছো সব ঠিকঠাক তো?"

মেহনাজ নাক ফুলিয়ে বললো,"মেয়ে বিয়ে দেওয়ার আগে ছেলের খোঁজ খবর না নিয়ে, ছেলের মা কেমন সেটা দেখতে গিয়ে চারটে বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন। বলেছেন ছেলের মা ভালো নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এখন কিনা আমাকে নিয়ে দুই শাশুড়ীর মাঝে ফেলেছেন। আমি আর ও বাড়িতে যাবো না আম্মু। দুই শাশুড়ীর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব নয়।"

স্বর্ণা রাগান্বিত হয়ে বললো," কি সমস্যা খুলে বলো?"

মেহনাজ চড়াও গলায় বললো," সমস্যা কিছুই না আম্মু। আমি বাপের বাড়ি আসতে পারি না নাকি? সেটার জন্য আমাকে আলাদা করে কারণ আর সমস্যা দেখাতে হবে?"

স্বর্ণা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো," তুমি আমার মুখে মুখে তর্ক করছো মেহনাজ।"

" হ্যাঁ করছি। আপনি কি মনে করেন আমি সেই ছোট্টটিই আছি যে আপনার ভয়ে এখনো চুপটি করে থাকবে?"

স্বর্ণা রাগে ফোঁপাতে ফোপাঁতে মেহনাজের সামনে থেকে চলে গেলো।

তাসফিয়া তখন কলেজে। সামনেই এইচএসসি ফাইনাল পরিক্ষা এবার তো পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হওয়া চাই। কিন্তু সিরিয়াস হতে পারছে না কোনো ভাবেই। অর্পা আর সাদমান মিলে একটু বেশিই বিরক্ত করছে তাকে। তেমনি আজকেও রেগেমেগে কলেজ থেকে এসে দেখলো মেহনাজ এসেছে। যতই রাগ থাকুক বড় বোনকে দেখলে তার রাগ পানি হয়ে যায়।

" আপু তোমার বর না আবার বউকে দেখতে না-পেয়ে পাগল হয়ে ছুটে আসে।" বলেই তাসফিয়া হাসলো।

মেহনাজ কিছু বললো না সে কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখছে। তাসফিয়া মজা করেই বললো," অনেক কাপড়চোপড় এনেছো দেখছি। অনেক দিন থাকবে বুঝি?"

মেহনাজের মন মেজাজ খারাপ না থাকলে সে কখনো বোন আর মায়ের সাথে রেগে কথা বলে না। কিন্তু আজ বোধহয় নিজেকে সামলাতে পারলো না। বললো," বিয়ে পর সবার আগে পর হয়ে যায় বাপের বাড়িটা। এখানে আসতে গেলেই নানান রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ভীষণ বিচ্ছিরি লাগে আমার। আমি আর শশুর বাড়ি যাচ্ছি না। তোমরা আমাকে এখানে থাকতে দিবে নাকি আমি অন্য কোথাও উঠবো সেটা তোমার মায়ের থেকে জেনে আমাকে জানাও দ্রুত।"

তাসফিয়া অবাক হয়ে বললো," আপু রেগে যাচ্ছো কেনো? আচ্ছা শান্ত হও। কি হয়েছে সেসব পড়ে বলিও। এখন রেস্ট না-ও।"

মেহনাজ বিছানা শুয়ে ভাজ করে রাখা কম্বল টা গায়ে টেনে নাকে মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লো। ইতিমধ্যেই স্বর্ণা নাফিজকে কল করলো। কিন্তু নাফিজ কল রিসিভ করলো না, নওয়াজ হাসানকে কল করলো সেও কল রিসিভ করেনি। বাপ ব্যাটা নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত। স্বর্ণা এবার বাড়িতে কল দিলো কোহিনূর কল রিসিভ করেই বললো," মেয়ে ঠিকঠাক পৌঁছাইছে বেয়াইন?"

স্বর্ণা অতিরিক্ত গম্ভীর স্বরে বললো," জি! মেয়ের সাথে কি করেছেন আপনারা?"

" ওমা! আমরা কি করবো? আপনার মেয়েই তো জমিদারের ব্যাটি। তাকে তো কিছু বলা যায়। বললেই চ্যাত চ্যাত করে উঠে। আমার ছেলেকে হাতে করছে। এখন ছেলের সাথে বুদ্ধি করে কি করছে সে তো আমরা জানি না বাপু।"

" সুন্দর করে কথা বলুন। নিসন্দেহে আমার মেয়ে জমিদারেরই মেয়ে। আমার মেয়েকে আমি জানি। আপনারা তাকে ইট না মারলে সে কখনো পাল্টা ইট মারবে না।"

পাশেই শামসুন্নাহার ছিল। সে কোহিনূরের থেকে একধাপ উপরে। ফোনটা কেড়ে নিয়ে বললো," শোনেন আপা। ওতো জমিদারী আমাদের সাথে দেখাইয়া লাভ হবে না। আপনার মেয়েকে বলেন আগে বাচ্চা পয়দা করতে। এরপর তাকে এ বাড়িতে আনা হবে এর আগে নয়। দরকার লাগলে আমাদের ছেলেকে আবার বিয়ে করাবো। আমরাও কম কি!"

স্বর্ণা রাগে অপমানে চোখ মুখ খিঁচে বললো," জি আপনাদের দ্বারা এসবই তো সম্ভব! দুই সতীনের কেউই তো বাচ্চা পয়দা করতে পারেন নাই। এখন আমার মেয়ের সাথে জোর দেখাচ্ছেন। আপনিও নিশ্চয়ই হাজার খানেক বাচ্চা পয়দা করেন নাই। আপনার স্বামীকেও তৃতীয় নাম্বার বিয়েটা করাবেন?"

কথা গুলো বলেই স্বর্ণা কলটা কেটে দিয়ে বিরবির করে আওড়ালো," মূর্খ মানুষ কোথাকার!" ওদিকে শামসুন্নাহার অপমানে চুপ করে গেলো।

স্বর্ণা উঁকি দিয়ে খুজলো মেহনাজ কোথায় আছে। দেখলো মেয়েটা শুকনো মুখে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় বসেছে। বাহিরে এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। খুব ঝড় হবে আন্দাজ করা যাচ্ছে। স্বর্ণার মনে হলো এই প্রথম মেয়ের সামনে দাঁড়াতে তার অপরাধবোধ হচ্ছে। পা অসাড় হয়ে আসছে,নড়তে পারছে না। তবে কি সত্যি সে মেয়ের সঙ্গে অন্যায় কিছু করেছে? কোনো মা তো মেয়ের মন্দ চায় না। স্বর্ণাও এ মেয়ের মন্দ চায়নি তবে কেনো তার নিজেকে অপরাধী লাগছে? কোন মুখে যাবে মেয়ের সামনে? মেয়েও যে আগের মতো নেই। হয়তো মুখের উপর দুটো কথা শুনিয়ে দিবে। এ যে বড় আদরের মেয়ে ছিল তার। এ মেয়ের অভদ্রতা সে মানতে পারে না। ছোটটা বিগড়ে গিয়েছে এতে যে স্বর্ণার আগ্রহ নেই একদমেই। কিন্তু বড় মেয়েটাকে নিয়ে তার বড্ড আগ্রহ যে! ছোট কাল থেকে একেবারে পুতুলের মতো লালন-পালন করেছে। ছোট্ট খাটো ভুলও হতে দেয়নি। হলেই বকাঝকা করে বাড়ি মাথায় তুলেছে। মেহনাজ ভয়ে ভুল করতেও যেন ভুলে গিয়েছিল। স্বর্ণা ভেবে পেলো না এগুলো কি মেয়ের প্রতি তার অন্যায় ছিল? সে তো কেবল ভালোবেসে শাসন করতেছিল।

স্বর্ণাকে দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাসফিয়া বললো," কি হলো দাঁড়িয়ে আছো যে? ভেতরে আসো।"

তাসফিয়ার থেকে পারমিশন পেয়ে কিছুটা সাহস পেলো মনে। একটু একটু করে হেঁটে বারান্দায় এসে থামলো। মেহনাজ শাড়ির আঁচল বিছিয়ে আনমনা হয়ে বসে আছে। দৃষ্টি আকাশে। মনে হচ্ছে কত বিরহ তার। কত দুঃখ কষ্ট পুষে রেখেছে ওই ছোট হৃদয়টাতে। স্বর্ণা পাশে এসে বসতেই মেহনাজের দৃষ্টিতে ব্যঘাত ঘটলো। মেহনাজ আচমকা মা'কে দেখে আঁচল গুটিয়ে নিলো।একটু গুটিশুটি মেরে বসলো। দেখে মনে হচ্ছে মায়ের ভয়ে সে ইতস্তত। কে জানে মা নিশ্চয়ই কোনো কিছু নিয়ে এখন বকাঝকা করবে। কিন্তু মা এবার সত্যি কিছু বললো না। সে পাশে বসেছে ঠিক কিন্তু চুপ করে আছে।

নিরবতা ভেঙে স্বর্ণা মেয়ের দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তোমার কি খুব মন খারাপ মেহনাজ?"

মেহনাজ বিস্ময় নিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। মা এ যাবৎ কালে বহু প্রশ্ন করেছে। কত কত প্রশ্নের জালে বেঁধেছিল সে। অথচ এমন হৃদয়ে ঝড় তুলার মতো প্রশ্ন তো কখনো করেনি। মেহনাজের অভিমানেরা সমুদ্রের উচ্ছাসের মতো বেড়ে উঠলো। মনে হচ্ছে কেঁদেই দিবে। কিন্তু মায়ের সামনে তো সে কখনো কাঁদেনি। এ তো লজ্জার বিষয়, মায়ের সামনে কাঁদা যায় বুঝি?

মেহনাজকে চুপ করে থাকতে দেখে স্বর্ণা আবার ডাকলো, " মেহনাজ?"

মেহনাজ এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো," আমি কি আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরবো আম্মু?"

কথাটা বলতে বলতেই মেহনাজ মাকে বসে থেকেই জড়িয়ে ধরে মুখ লুকালো যেন মা তার চোখের পানি দেখতে না পায়। ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে। স্বর্ণা হতবাক হয়ে তার মেয়ের অবস্থাটা চিন্তা করতে লাগলো। তার এই ছোট মেয়েটা যাকে সে এখনো বাচ্চার মতো লালন করে তার কিনা এতো কষ্ট? এতোই কষ্ট যে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে? কিন্তু স্বর্ণা টের পায়নি কখনো। স্বর্ণা এতোদিন জানতো সে তার মেয়েদের ব্যাপারে সমস্তই খেয়াল রাখে কিন্তু এখন তার নিজেকে ভুল মনে হতে লাগলো। সে বুঝলো এবং মানলো সে তার মেয়েদের মন বুঝেনি কখনো।

কাঁদতে কাঁদতে মেহনাজ একটা সময় পর থামলো। এখন সে মায়ের কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখছে। নিজেকে অনেক হালকা লাগছে। কিন্তু খুব করে মনে হচ্ছে সে বড় কেনো হলো? ছোটই বরং থাকতো। মায়ের কোলে কত নিরাপদ সে! তার জগৎ সংসার ভালো লাগছে না। কত দায়বদ্ধতা! কত দায়িত্ব! কত জনের মন রক্ষা করে চলতে হয় একজন স্ত্রীলোককে! মেহনাজ হাঁপিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যতই এগুলো ভালো না লাগুক। এগুলোই যে জীবন। সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে এই সমস্তই সহ্য করে চলতে হবে।

মেহনাজ ফিসফিস করে মায়ের কাছে বললো," চিন্তা করবেন না আম্মু। আমি ক'টাদিন বাদেই চলে যাবো। একটু বেড়াতে এসেছি।"

স্বর্ণা মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সে খুব শান্ত কিন্তু ধারালো কন্ঠে বললো,"তোমাকে আর যেতে দিচ্ছি না ও বাড়িতে। একদিন ও বাড়ির গণ্ডমূর্খ গুলো এসে তোমাকে নিয়ে যেতে হাতজোড় করবে।"

মেহনাজ বাঁধা দিয়ে বললো," এ ভাবে বলবেন না আম্মু। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী লাগে যে ওরা। আপনি তো শিখিয়েছেন কাউকে ছোট করতে নেই।"

স্বর্ণা খানিক চুপ থেকে বললো," নাহিয়ান কি বললো?"

মেহনাজ মুচকি হেঁসে লজ্জা পেয়ে বললো," বলেছে স্ত্রী সন্তান সহ সে আমায় ঘরে তুলবেন। মির্জা বাড়িতে যে বহু কুসংস্কার রটে। এ কটাদিন তার শাশুড়ী যেন আমাকে উনার বাড়িতে একটু ঠাঁই দেন সে প্রার্থনাই করলেন।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন