#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ৩
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
বিরাট এক মেনশন যেন অন্ধকারের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্য।মেইন গেট জুড়ে সারিবদ্ধ অসংখ্য গার্ড, প্রত্যেকেই কালো পোশাকে, চোখেমুখে কঠোরতা। গেট পার হতে হতেই দু’পাশে বিস্তৃত বাগান, কিন্তু সেটা স্রেফ ফুলের নয় সামনে ঝলমলে ওয়াটার ফাউন্টেন আলো ছায়ার খেলায় ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
মেনশনের পেছনে ঘন জঙ্গল, তার সঙ্গে মিশে আছে বিস্তৃত বাগান। যেন প্রকৃতি নিজেই বাড়িটাকে ঘিরে অদৃশ্য কারাগার তৈরি করেছে। পুরো বাড়িটিই ধূসর আর কালো রঙের মিশ্রণ গভীরতা আর ভয় একসাথে মিশে আছে প্রতিটি দেয়ালে।গাড়ির কনভয় একে একে প্রধান ফটকে এসে থামল। ফটকে দাঁড়ানো চারজন গার্ড রিভেনকে দেখা মাত্রই একসাথে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল।
রিভেন গাড়ি থেকে নেমে এল। এক হাতে নি'স্তে'জ রোজেলিয়াকে কাঁধে তুলে নিলো তার অ'চে'তন শরীরটা যেন কেবল একখণ্ড পুতুল। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, সে পা ফেলল ভারী ভঙ্গিতে।মেনশনের বিশাল দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল, আর রিভেন সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করল, যেন এই দালানের প্রতিটি ইট শুধু তার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে।অন্ধকারে মোড়া সেই ঘর দেয়ালজুড়ে কালো আর ধূসর শেডের সমন্বয়। আলো জ্বললেও ঘরটিতে সবসময় যেন এক ধরনের দমবন্ধ অন্ধকার ভেসে বেড়ায়।ঘরের মাঝখানে বিশাল এক কিং-সাইজের বিছানা, ভারী কালো চাদরে ঢাকা। পাশেই বিলাসবহুল ড্রেসিং রুম, যা ঘরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। চারপাশে সাজানো বিরল ও মূল্যবান শোপিস, প্রতিটি যেন রিভেনের অদ্ভুত রুচি আর ক্ষমতার প্রতীক।
রিভেন তার কাঁধে ঝুলে থাকা নি'স্তেজ রোজেলিয়াকে ধীরে ধীরে এনে বিছানার ওপর ফেলে দিল। রোজেলিয়ার অচেতন শরীর নি'থর হয়ে রইল, যেন নিঃশ্বাস নিলেও সেটি শোনা যায় না।কিছুক্ষণ রিভেন স্থির দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা। তারপর একটিও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
_______________
ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে রোজেলিয়া নিজের চেতনা ফিরে পেতে লাগল। মাথার ভেতর প্রচণ্ড চাপা ব্য'থা, চোখ খুলতেই চারপাশটা ঝাপসা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন দৃষ্টি পরিষ্কার হলো, তখনই সে বুঝতে পারল সে এক অচেনা, ভৌতিক ঘরে রয়েছে।তার শরীর অ'বশ, হাত-পা কাঁপছে। সিলিং থেকে ঝুলে থাকা হালকা আলোয় রোজেলিয়ার মুখটা আরও ফ্যাকাশে লাগছিল। তার লম্বা কালচে-বাদামি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল বেয়ে নেমে এসেছে, চোখের কোণে জমে থাকা পানির ফোঁটা তার আ'তঙ্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত গতিতে, যেন প্রতিটি শ্বাস তার জন্য যুদ্ধে টিকে থাকার মতো।
সে বিছানার নরম অথচ শীতল চাদরের ওপর ধীরে ধীরে উঠে বসতে চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরের দুর্বলতা তাকে আবার নিচে ফেলে দিল। ভয়ের ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে।ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল।
রিভেন বের হয়ে এলো তার ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে প্রশস্ত কাঁধ বেয়ে। কোমরে কেবল একটি সাদা তোয়ালে জড়ানো। তার চোখে সেই একই ঠান্ডা হিংস্রতা, কিন্তু ভেজা চেহারার জন্য আরও ভয়ঙ্কর লাগছিল তাকে। প্রতিটি পদক্ষেপে ঘরের নীরবতা কেঁপে উঠছিল, আর রোজেলিয়ার বুকের ভেতর আতঙ্কের ঝড় আরও বেড়ে যাচ্ছিল।
রিভেনের দুই বাহুই ট্যাটুতে ভরা। কালো ও গাঢ় নীল রঙের আঁকিবুঁকি, কোথাও ড্রাগনের আঁ'চড়, কোথাও শি'কল ভা'ঙা আগুনের ছবি। তার শরীরের ফর্সা রঙের সঙ্গে সেই কালো ট্যাটুগুলো আরও উ'গ্র ও হিং'স্র লাগছিল, যেন তার প্রতিটি শ্বাসে বিপদের গন্ধ মিশে আছে।ভেজা চুল চোখের ওপর গড়িয়ে পড়ছিল, কপালে জমা ফোঁটাগুলো মাটিতে ঝরে যাচ্ছিল কিন্তু তার দৃষ্টি একদম অচল। সোজা তাকিয়ে আছে রোজেলিয়ার দিকে। ঘরের নীরবতায় কেবল তার পায়ের শব্দ আর ভয়ের ভারী নিঃশ্বাস গুমরে বাজছিল।
রোজেলিয়া বিছানায় সঙ্কুচিত হয়ে বসে ছিল, বুক ওঠানামা করছিল অস্বাভাবিকভাবে। রিভেনের প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তার আতঙ্ক আরও গভীর হতে লাগলো
রিভেন ধীরে ধীরে রোজেলিয়ার দিকে এগোল, চোখে ঠাণ্ডা আগুন আর ঠোঁটে অর্ধেক বিদ্রূপমাখা হাসি,
“Finally, you are awake rose petal?"
রোজেলিয়া প্রথমবারের মতো তার দিকে ভালো করে তাকালো। রিভেনের জেট ব্ল্যাক চুলগুলো আঁ'চড়ের মতো উলম্ব হয়ে কপালের দিকে ঝুলে আছে, আর হ্যাজেল চোখের সঙ্গে মিশে তার মুখকে আরও গাঢ় এবং রহস্যময় করে তুলেছে। চোখে ঠাণ্ডা আ'গুন, শরীরে শক্তি আর হিং'স্র সৌন্দর্যের মিশ্রণ সবকিছু মিলিয়ে রোজেলিয়ার নজর যেন আটকানো গেল।
রোজেলিয়া নিঃশ্বাস থামিয়ে গিলল। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল, হাতের তল পা কেঁ'পে উঠল। রিভেনের উপস্থিতি ঠাণ্ডা, ভ'য়ঙ্ক'র, কিন্তু একধরনের কষ্টিপূর্ণ সৌন্দর্য তার মনকে কাঁপিয়ে দিল।ঘরের অন্ধকারে এই মুহূর্তে, রিভেন এবং রোজেলিয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তির মিলন অনুভূত হলো আতঙ্ক আর অনিচ্ছার সঙ্গে এক অদ্ভুত টান, যা রোজেলিয়ার শরীর জুড়ে ঘনীভূত হয়ে ওঠে।
রিভেন স্থির হয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“Did you like the view rose petal?”
শেষের অংশ, সেই নিকনেইম, রিভেন একটু ঠাণ্ডাভাবে তার ঠোঁটে টেস্ট করল।রোজেলিয়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল, চোখ ভিজে এল। লজ্জা আর ভয় মিশ্রিত তার চোখ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরিয়ে ফেলল।রিভেন ধীরে ধীরে তার দিকে এগোল, হ্যাজেল চোখে এক অদ্ভুত হিং'স্র আবেগ। রোজেলিয়ার ছোট চোয়াল কাঁপতে লাগল সে চুপচাপ চোখ নামিয়ে বসে থাকল।রিভেন কণ্ঠে গভীর, কম্পিত সুরে বলল,
“Eyes on me sweetheart .”
রোজেলিয়া কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কেনো নিয়ে আসলেন আমায় এখানে? আমি তো স্পষ্টই বলেছি আমি আপনাকে বিয়ে করব না। আমায় জোর করছেন কেনো?”
রিভেন হঠাৎ আবার রে'গে গেল। তার হ্যাজেল চোখগুলো আরও ভ'য়ং'করভাবে ঝলসতে লাগল।অন্য হাতে সে রোজেলিয়ার গালে একটি তীব্র থা'প্প'ড় বসিয়ে দিল।রোজেলিয়ার ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেল, চোখের কোণে পানি জমে পড়তে লাগল। তার শরীর কেঁপে উঠল, হৃদস্পন্দন অচল।রিভেন তার হাত দিয়ে রোজেলিয়ার চু'লের মু'টা ধরল এবং গম্ভীর গলায় বললো,
“তোর সম্মতিতে আমার কিছু আসে-জায় না। আমি ভালোভাবেই তোকে সুযোগ দিয়েছিলাম…কিন্তু যখন তুই আমাকে এভাবে রিজেক্ট করলি, তখন এর শাস্তি তো তোকে পেতেই হবে।”
রোজেলিয়া কেঁপে উঠল রিভেনের রুক্ষ কণ্ঠ আর চোয়ালে করা সেই নির্দয় আঁ'ট'কায়। সে মরিয়া হয়ে মুখ সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু রিভেনের হাত যেন লোহার শেকল একচুলও নড়ল না।কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে বলল,
“আমার বাবা মায়ের কপালে গুলি ঢেকানোকে আপনি ভালোভাবে বলা বলেন? আপ..আপনি একটা মনস্টার…”
এরপর বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে সাহস করে গর্জে উঠল,
“আমি কোনোদিনও আপনাকে বিয়ে করব না। কোনোদিনও না!”
রিভেনের হ্যাজেল চোখ হঠাৎই অগ্নিশিখার মতো জ্ব'লে উঠল। মুহূর্তেই তার ভেতরের ক্রো'ধ ছড়িয়ে পড়ল, সে আরও জো'রে রোজেলিয়ার চো'য়াল চে'পে ধরল। ঠাণ্ডা, কাঁটাতারের মতো কণ্ঠ ভেসে এলো,
"তুই কি সত্যিই মনে করিস… তোর কোনো মতামতের আমি কেয়ার করি?
এক সেকেন্ড থেমে, কণ্ঠ আরও গাঢ় করে সে ঝুঁকে এল রোজেলিয়ার মুখের কাছে।
“তোর বাবা আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল এমন এক ঋণ, যা সে কোনোদিনও শোধ করতে পারবে না। তাই আমি তাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। তার মেয়ে যদি আমার হয়… তবে হয়তো আমি ওদের বাঁচতে দেব।”
রোজেলিয়া কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“কীসের ঋণ?”
রিভেন ঠোঁটের কোণে একটুখানি বাঁকা হাসি টেনে নিয়ে ধীর গলায় উত্তর দিল,
“দুই বছর আগে… আফসার চৌধুরীর কোম্পানির বড় লঞ্চের সময়, তোমার বাবা আমার কোম্পানি থেকে তিন বিলিয়ন
ডলার নিয়েছিল। সবকিছু কাগজে-কলমে বৈধই ছিল। কিন্তু পরের দিকে ওদের ব্যবসা ধস নামল, কোম্পানি লোকসানে গেল, আর টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো উপায় রইল না।”
সে কয়েক মুহূর্ত থেমে রোজেলিয়ার চোখে চোখ রাখল। ঠান্ডা হ্যাজেল চোখগুলোয় এক অদ্ভুত ভয়ঙ্কর ঝলক জ্বলে উঠল।রিভেন আবার বলে উঠল,
“সেদিন থেকে তোমার বাবা পালাচ্ছে। ভেবেছিল, লুকিয়ে থেকে দায় এড়াতে পারবে। কিন্তু কতদিনই বা লুকিয়ে থাকা যায়, রোজেলিয়া? যতদিনই পালাক না কেন… শেষমেশ সবাইকেই আমার সামনে আসতেই হয়।”
তার কণ্ঠে কোনো অনুতাপ নেই শুধু শীতল হিসেব আর অপ'রাধী জোর। রোজেলিয়ার সামান্য দমে সে একটু কং'ক্ষিত হেসে যোগ করল,
“ওই তিন বিলিয়নের ঋণ আর কখনোই শোধ হবে না । তুই জানিস, কেন আমি তোকে এখানে এনেছি। এটা আর ন্যায় নয়; এটা লেনদেন। তোর বাবার ঋণ,তার একটাই ফেরত: তুই ।”
রোজেলিয়ার ভিতর ঘৃ'ণার উৎপওি হলো সে কিছুটা সাহস জোগাড় করে জোর দিয়ে বলল,
“তো আপনি এখন আমকে পরিশোধ হিসেবে ব্যবহার করতে চান? আমি একটা মানুষ কোনো বস্তু নই।”
রিভেন হঠাৎ আরেকবার রেগে গেল। অবলকিত বিষাক্ত সুরে সে সতর্ক করে বলল,
“watch your tongue before i cut it out"
তার ঠাণ্ডা কণ্ঠে স্পষ্ট হুমকি ছিল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পরে সে কণ্ঠ আরও নীচু করে বলল,
“তুই কেবল একটা মেয়ে আর তোদের একটাই ব্যবহারের উদ্দ্যেশ্য। তুই আমাকে বিয়ে করবি, এবং সংসারে আমার সন্তান জ'ন্ম দি'বি।”
রিভেন এটা বলেই রোজেলিয়ার হাত ছেড়ে দিল আর ড্রেসিংরুমের দিকে চলে গেল। রোজেলিয়া মোমবাতির নীরবতার মতো নিজের মধ্যে ডুব দিল চুপচাপ বসে ভাবতে লাগল। অজান্তেই নিজের ভেতর কেমন এক অসহায় ক্ষীণতা ঢুকে পড়ল, কণ্ঠে কোনো শক্তি নেই।কিছুক্ষণ পর রিভেন ড্রেসিংরুম থেকে বের করে এলো কালো কট প্যান্ট পরে, চেহারায় আবার সঠিক ও শান্ত-নির্বিক। সে রোজেলিয়াকে একদম পাত্তা না দিয়ে দরজার দিকে এগোল। তখন হুট করেই রোজেলিয়া বলল, কণ্ঠ কেঁপে,
“শুনুন… এখানে তো আটকেই রেখেছেন। অন্তত আমাকে একটা ফোন দিন আমি শুধু মা-বাবার সঙ্গে একটু কথা বলব।”
রিভেন পেছন ঘুরে তার দিকে তাকালো চোখে থাকা রাগ যেন আরও গভীর হল। এক ঝিনুক নীরবতার পর সে ধীরে, গলায় কণ্ঠ ভাঙে না রেখে বলল,
“না।”
রোজেলিয়ার আশা মুছে গেল। চোখে এক আকুল করুণতা ভরে উঠল। সে কণ্ঠচেপে আরেকবার অনুনয় করল,
“দয়া করে, অন্তত আমাকে মা-বাবার সাথে একটু কথা বলার সুযোগ দিন "
রিভেন কিছু না বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগ মুহূর্তে কণ্ঠটা ঠান্ডা অথচ হুমকিময় হয়ে উঠল
“এই রুম থেকে এক পা-ও যেন বাইরে না যায়"
দরজা বন্ধ হতেই রুমের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। রোজেলিয়া বিছানায় বসে দরজার দিকে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর ভয়ের সাথে সাথে এক অসহায় ভার জমে উঠল। চোখের কোণে পানি এসে ঝাপসা করে দিল সবকিছু। মনে হচ্ছিল, চারপাশের দেওয়াল যেন তাকে আটকে রেখেছে।কিছুক্ষণ পরেই দরজায় হালকা শব্দ হলো। ভেতরে ঢুকল এক তরুণী মেইড। তার হাতে একটা খাবারের ট্রে। ভদ্র স্বরে সে বলল,
“ম্যাম, আমি আভা। এখন থেকে আমি আপনার পার্সোনাল মেইড হব। এই নিন, আপনার খাবার।”
আভা ট্রেটা সাইড টেবিলের ওপর সাবধানে রাখল। সেখানে ছিল ধোঁয়া ওঠা স্যুপের বাটি, কিছু হালকা খাবার আর এক কাপ গরম চা।রোজেলিয়া কেবল চুপচাপ তাকিয়ে রইল, কোনো কথা বের হলো না। কণ্ঠে ক্লান্তি আর ভাঙা স্বর নিয়ে সে আস্তে বলল,
“ধন্যবাদ…কিন্তু আমার এখন ভালো লাগছে না”
আভা তার দিকে সহানুভূতির চোখে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি, ম্যাম। কিন্তু কিছু না খেলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে পড়বেন। অন্তত অল্প খান।”
রোজেলিয়া আভাকে ভালো করে লক্ষ্য করল। বয়সে খুব বেশি বড় নয়, দেখতে কোমল আর তরুণী। তার সোনালি ব্লন্ড চুল কাঁধে ঝরে পড়েছে, আর চোখ দুটি গভীর সবুজ—যেন অরণ্যের ভেতর থেকে টেনে আনা কোনো রঙ। রোজেলিয়ার মনে হলো, আভা বাঙালি নয়, তার উচ্চারণেও এক ধরনের ভিন্নতা আছে।রোজেলিয়া কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি ইটালিয়ান?!”
আভার চোখ একটু বড় হয়ে গেল, সে হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“না, আমি মেক্সিকান। তবে হয়তো আপনি অবাক হচ্ছেন"
রোজেলিয়া তাড়াতাড়ি কথার মাঝেই বলে উঠল
“আমাকে ম্যাম বা আপনি বলে ডাকো না। আমি তো তোমারই বয়সি। নাম ধরে ডাকবে, আমার নাম রোজেলিয়া।”
আভা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“কিন্তু… আপনাকে নাম ধরে ডাকতে ‘স্যার’ শুনে ফেললে রেগে যাবেন। আমাদের জন্য সেটা নিষিদ্ধ।”
রোজেলিয়া মুখটা কষে ধরল, কিন্তু তারপরও আস্তে হাসল।
“ও আচ্ছা… ঠিক আছে। তবে অন্তত যখন স্যার থাকবেন না, তখন নাম ধরে ডাকবে। আচ্ছা, তুমি বাংলা জানো কীভাবে?”
আভা এবার মুখে কোমল হাসি ফুটিয়ে বলল
“স্যার-এর মা, মিসেস মেহরিন কারুসো, বাঙালি। তিনি নিজে বাংলায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাই এই বাড়ির সব মেইডকেই বাংলা শিখতে হয়েছে।”
রোজেলিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“ওহ… আচ্ছা। তোমাদের স্যার-এর মা এখন কোথায়? উনি কি এখানেই থাকেন?”
আভা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, তিনি এখানেই থাকেন। তবে কয়েকদিনের জন্য ফার্মহাউসে গেছেন। এই উইকেই ফিরবেন। আচ্ছা, ম্যাম—মানে, রোজেলিয়া, আপনি এখন খাবার খেয়ে নিন। আমাকে যেতে হবে। আর আপনার কোনো প্রয়োজন হলে বিছানার পাশে যে সুইচটা আছে, সেটা প্রেস করলেই আমি চলে আসব।”
রোজেলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আস্তে মাথা নেড়ে আভাকে ধন্যবাদ দিল।
______________
অফিসঘরটা বিশাল, দেয়ালজুড়ে কালো কাঠের বুকশেলফ আর ভারি ফাইলভর্তি আলমারি। লম্বা টেবিলের চারপাশে বসে আছে রিভেনের শীর্ষ লোকেরা এনজো, মারকো, লরেঞ্জো সহ আরও ক’জন। সবার সামনে খোলা ফাইল আর টানটান উত্তেজনা।ঠিক তখনই ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজা ঠেলে ঢুকল রিভেন আর তার চোখজোড়া ঝ'ড়ের মতো রাগে জ্বলছে। তার উপস্থিতি ঘরটাকে মুহূর্তেই জমাট বরফের মতো থমথমে করে তুলল।
সে কোনো কথা না বলে টেবিলের একদম মাথায় গিয়ে বসল। আঙুলের রুপালি রিংটা টেবিলের ওপর ছন্দহীনভাবে ঠকঠক করে বাজাতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড সেই নিস্তব্ধতা চলল, যা উপস্থিত সবার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হঠাৎ শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় রিভেন বলে উঠল,
"কে বলতে পারবে আমার কার্গো শিপের কনটেইনারগুলো এখন কোথায়?"
কেউ কথা বলল না। লরেঞ্জো শুধু ঢোক গিলল। রিভেন আবারও বলল,
"আমি কি কোনো ভূতের সাথে কথা বলছি? নাকি তোমরা সবাই রাতারাতি বোবা হয়ে গেছ?"
মারকো কাঁপাকাঁপা গলায় জবাব দিল,
" বস... শিপমেন্টটা মাঝপথে ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে। পুলিশ নয়... ওরা জ্যাকালের লোক ছিল। ওরা আমাদের রুট জানত। ঠিক যেখানে ব্যাকআপ কম ছিল, সেখানেই ওরা অ্যা'টাক করেছে। আমাদের ছয়জন লোক মা'রা গেছে,আটজন আ'হত হয়েছে আর এক বিলিয়নের মাল এখন জ্যাকালের গুদামে।"
রিভেনের হাত থেমে গেল। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, বি'ষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে মার্কোর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মার্কোর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
"জ্যাকাল? ওই ছিঁ'চকে চো'রটা আমার নাকের ডগা দিয়ে মাল নিয়ে গেল? সে জানত আমি ঠিক কোন সময়, কোন বাঁক দিয়ে কার্গো পাঠাব?"
রিভেনের এবার কণ্ঠ আরও শীতল হয়ে গেল,
"পুলিশের ভয় আমি পাই না, ওটা ডিল করার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু আমার ঘরের ভেতরে কেউ বসে জ্যাকালকে আমার খবর দেবে এটা আমি হজম করতে পারছি না। মার্কো, এর মানে একটাই..."
সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে সবার চোখের দিকে তাকাল।
"এই টেবিলে আমার সাথে যারা বসে , তাদের মধ্যেই কেউ একজন রেট। কেউ একজন আমার নুন খেয়ে জ্যাকালের হয়ে কাজ করছে।"
এনজো আমতা-আমতা করে বলল,
"বস, আমরা সবাই আপনার জন্য জান দিতে রাজি। কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি..."
চুপ!
রিভেনের গ'র্জনে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। সে টেবিলের ওপর রাখা ও'য়াইন গ্লাসটা সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারল। কাঁচের টুকরো আর লাল ও'য়াইন ছিটকে পড়ল লরেঞ্জোর মুখে।
"জান দিতে রাজি? আমার ছয়জন লোক মারা গেছে কারণ তাদের লোকেশন লিক করা হয়েছিল! তোমরা যদি বলতে না পারো সেই বি'শ্বাসঘা'তক কে, তবে আমি ধরে নেব তোমরা সবাই এর সাথে জড়িত। আর রিভেনের শত্রুদের কী অবস্থা হয়, সেটা তোমাদের অজানা নয়।"
সে পুনরায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল এবং ড্রয়ার থেকে একটা ছোট রুপালি রি'ভল'ভার বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
"আগামীকালের সূর্যাস্তের আগে যদি সেই কু'লা'ঙ্গার আমার সামনে না থাকে, তবে এই টেবিলের প্রতিটি চেয়ার খালি হয়ে যাবে। আমি শুধু তাকে মারব না তাকে দিয়ে আমি নিজের হাতে তার ক'বর খুঁ'ড়াব। তার জি'ব কে'টে আমি কু'কু'রকে খা'ও'য়াব যেন পরকালেও সে কাউকে খবর দিতে না পারে।"
রিভেন ঠান্ডা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটি বলল,
"এখন যাও। খুঁজে বের করো সেই ইঁদু'রটাকে"
চলবে,,,,