#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ৪
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
রিভেনের কড়া নিষেধ অমান্য করে রোজেলিয়া আস্তে করে রুমের দরজা খোলে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে করিডর একেবারে ফাঁকা। বুকের ভেতরে ভয় হলেও কৌতূহল তাকে আটকে রাখতে পারে না।ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। বিশাল বাড়িটা যেন নিরবতায় ডুবে আছে। দেয়ালে ঝোলানো বড় বড় ছবির দিকে তাকিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায়, তারপর আবার পা বাড়ায়। হঠাৎ পিছন থেকে কড়া গলায় ডাকে কেউ
“তুমি এখানে কী করছো? তোমাকে তো রুম থেকে বের হতে মানা করা হয়েছিল।”
চমকে ঘুরে দাঁড়ায় রোজেলিয়া। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী মেইড। ওর বাদামি চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মুখভরা কড়া ভাব। সে রোজেলিয়ার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিলো, যেন মাপঝোক করছে।রোজেলিয়া একটু থমকে গিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি… আমি আভাকে খুঁজছিলাম।”
রিকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ঠোঁটে একচিলতে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠলো
“আভাকে খুঁজছো? নাকি বাড়ি ঘুরে ঘুরে অন্য কিছু জানার চেষ্টা করছো?”
রোজেলিয়া চোখ নামিয়ে নিলো, কিছু বলল না। ওর নীরবতায় রিকার সন্দেহ আরও গভীর হলো।রিকা় এবার একটু কাছে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
“শোনো, আমি জানি তোমার জন্য এই বাড়ির নিয়ম মানা সহজ নয়। কিন্তু ভুলেও বেশি লাফালাফি কোরো না। এই বাড়ির চোখ–কান অনেক জায়গায় আছে। তুমি বুঝতেও পারবে না, কবে কার কানে কী খবর চলে গেল।”
রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে। রিকা ছোট্ট নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“এভাবে দাড়িয়ে না থেকে রুমের দিকে যাও। আমি শুধু চাই তুমি বিপদে না পড়ো। তোমার জন্য যদি কোনো ঝামেলা হয়, আমাদের সবার ওপরই সেটা গিয়ে পড়বে। তাই সাবধানে থেকো।”
রোজেলিয়ার চোখে একটুখানি কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠলো।
“ধন্যবাদ”
রিকা় একটু কড়া মুখ করে বলল,
“ধন্যবাদ বলার সময় এখন না। বরং রুমে ফিরে যাও। আমি যদি চাই, এই মুহূর্তেই স্যারের কানে তোমার অভিযোগ পৌঁছে দিতে পারি।”
রোজেলিয়া একবার চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে আবার ওপরতলার রুমের দিকে হাঁটা দিল।সে পিছনে তাকিয়ে দেখে মেইডটা চলে গেছে। ডাই রোজেলিয়া সেখানেই থেমে যাই আর চারপাশে দেখতে থাকে।
রোজেলিয়া সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে পেছনের অর্ধখোলা দরজার সামনে এসে থামল। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন তীব্র হতে লাগল যেন প্রতিটি স্পন্দন তাকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে। কুয়াশায় ভেজা রাতের বাতাস ভেতরে ঢুকে তার গালে লাগছিল। স্বাধীনতার গন্ধ যেন কাছে এসে ফিসফিস করছে।সে একবার চারপাশে তাকাল। করিডর নিস্তব্ধ। শুধু দেয়ালে টাঙানো ঝাড়বাতির আলো মৃদু কাঁপছে। আর কোনো মেইড চোখে পড়ছে না।এক নিঃশ্বাসে সিদ্ধান্ত নিল এই সুযোগটা হারালে আর বাঁচা যাবে না।ধীরে ধীরে পা বাড়াল দরজার দিকে। হাত বাড়িয়ে ঠেলে দিল কাঠের দরজাটা কিঞ্চিৎ কট করে শব্দ হতেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। মুহূর্তের জন্য জমে গেল, যেন কেউ পেছন থেকে ডাকবে। কিন্তু না, সব শান্ত।
সে দরজার ফাঁক গলিয়ে বাইরে পা রাখল। ঠান্ডা বাতাস তার মুখে ছুঁয়ে গেল, ভেজা মাটির গন্ধে নাকে এক অদ্ভুত সাহস এলো। সামনে জঙ্গলের পথ, অন্ধকারে গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো।রোজেলিয়া জুতো হাতে নিয়ে খালি পায়ে দৌড়াতে শুরু করল, যেন মাটির প্রতিটি ধুলো তাকে গিলে ফেলতে চাইছে। পেছনে বাড়িটার বিশাল দেয়াল দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল, শুধু অন্ধকার আর পাতার খসখসে শব্দ তাকে ঘিরে ধরল।কিন্তু যতই ভেতরে ঢুকছে, ততই মনে হচ্ছে এই জঙ্গলটা নিস্তব্ধ না। দূরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।তার বুকের ভেতর কেবল একটাই শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছিল,
“দৌড়াও… দৌড়াও… দৌড়াও…”
রিকা একপাশে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখছিল। চোখে একটা বাকা শয়তানি হাসি ফুটে উঠল ।সে ইচ্ছে করেই রোজেলিয়াকে থামায়নি। কারণ, রোজেলিয়া না চাইতে ও রিভেনের নজর কেড়ে নিয়েছে এ নিয়ে তার হিংসার আগুন জলছে। এতদিন সে চেষ্টায় ব্যর্থ, কখনো রিভেনের নজর কাড়তে পারেনি, আর এই মেয়ে একমাত্র সে যা চেয়েছিল, তা এখন পেয়ে গেছে।রিকার চোখে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ চিকচিক করে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল,
"যাও মেয়ে, অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে যাও। ধ্বংস হয়ে যাও"
এদিকে রোজেলিয়া প্রাণপনে জঙ্গলের গভীরে দৌড়াচ্ছিল। পায়ের ত'লায় কাঁ'টা, শিক'ড়ে ফ'সকে পড়া সব কিছুই তাকে থামাতে পারল না। বাতাসে ভেজা গাছপালার ফিসফিস, দূরের অজানা পশুর আওয়াজ, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল সে এক অচেনা, অন্ধকারপূর্ণ জগতে প্রবেশ করেছে।হঠাৎই রোজেলিয়া কানে শোনে অস্বাভাবিক শব্দ পাতা নড়ার মতো নয়, গাছ ভাঙার মতো নয় বরং গর্জন আর ঘেউ ঘেউ করার মিলিত আওয়াজ। তার বুক কেঁপে ওঠে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে কয়েকটা কু'কু'র বেরিয়ে আসে। তাদের চোখ লালচে অ'গ্নিশি'খার মতো জ্ব'লছে, দাঁ'তের ফাঁ'ক দিয়ে গ'র্জন বেরোচ্ছে। তারা নিচু হয়ে শিকারীর ভঙ্গিতে রোজেলিয়ার দিকে ঝাঁপ দিতে উদ্যত।
রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে। তারপর প্রাণপণে আবার দৌড় শুরু করে। শ্বাস দ্রুত, বুক কাঁপছে, কিন্তু থামার উপায় নেই। তার চুল উড়ছে বাতাসে, পায়ের শব্দ শুষ্ক পাতার সাথে মিশে প্রতিধ্বনি তুলছে।পেছনে কুকুরগুলোর ঘে'উ ঘে'উ ক্রমেই জোরে শোনা যাচ্ছে। তারা দৌড়ে আসছে, যেন প্রতিটা মুহূর্তে ফারাকটা কমে আসছে।
রোজেলিয়ার গলার ভেতর চেপে বসা ভয় একসময় তাকে আ'র্তনাদ করতে বাধ্য করে না, বরং বাঁচার প্রবল ইচ্ছা তাকে আরও দ্রুত ছুটতে বাধ্য করে। জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথে, শেকড়ের উপর হোঁচট খেয়েও সে উঠে দাঁড়ায়, যেন এক ইঞ্চিও ছাড়তে চায় না।রোজেলিয়া প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে এক বিশাল পুরনো গাছের তলায় গিয়ে থেমে যায়। হাঁ'পাতে হাঁ'পাতে সে গাছের কাণ্ডের সাথে হেলে বসে পড়ে। বুকটা যেন ভেঙে বেরিয়ে আসবে এমনভাবে দ্রুত উঠানামা করছে। কপাল ভিজে গেছে ঘামে, ঠোঁট শুকিয়ে খসখসে হয়ে উঠছে।
চারপাশে গভীর জঙ্গল, নীরবতায় ভরা। শুধু তার নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দটা গুমগুম করে বাজছে।হঠাৎ করেই সে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে ঝোপের ভেতর কোথাও থেকে শুকনো ডালের ভাঙার শব্দ ভেসে আসে। মনে হলো যেন কেউ বা কিছু তাকে অনুসরণ করছে। চোখ বড় বড় করে সে চারপাশে তাকায়।মনে হয় যেন অন্ধকারে অসংখ্য চোখ তাকে ঘিরে তাকিয়ে আছে।
রোজেলিয়া কষ্টে কষ্টে উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎই আবার দূর থেকে ভেসে আসে সেই ভয়ঙ্কর কুকুরগুলোর গর্জন আর ডাক। আতঙ্কে তার শরীর কেঁপে ওঠে।
“না… না, আবার না…”
নিজেকেই যেন ফিসফিস করে বলে সে।পরক্ষণেই প্রাণপণে আবার দৌড় শুরু করে। গাছের ডালপালা তার গায়ে আঁ'চড় কাটছে, মাটি কাঁ'পিয়ে দৌড়াচ্ছে সে। ঘড়ির কাঁ'টায় হয়তো আধঘণ্টা কেটে গেছে তবু যেন শেষ নেই এই জঙ্গলের। চারপাশে শুধু অন্ধকার, গাছ আর ভৌতিক নীরবতা।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুক জ্বালা করছে, যেন আর চলতে চাইছে না তবুও সে থামে না। কারণ থামলেই হয়তো কুকুরগুলোর দাঁতে ছিঁড়ে যাবে সে।কিন্তু যতই দৌড়াচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে সে গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। ডান দিকে গেলে আবার বাঁ দিক থেকে সেই ডাক শোনা যায়, সামনে গেলে পিছন থেকে পাতার খসখস শব্দ ভেসে আসে।চোখে পানি চলে আসে ভয় আর ক্লান্তিতে।
“এ জঙ্গল…যেন শেষই হচ্ছে না"
হঠাৎ পিছন থেকে এক ক'র্কশ গলা ভেসে এলো—
“come on, ti'gers! Stand down "
রোজেলিয়া চোখ বড় বড় করে স্থির দাঁড়িয়ে গেল। কুকুরগুলো মুহূর্তেই ঘে'উ ঘে'উ করতে করতে অন্যদিকে ছুটে গেল, যেন অদৃশ্য কোনো ইশারায় নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।সে দিশেহারা হয়ে দৌড় থামালো আর দ্রুত একটা বিশাল গাছের আড়ালে গিয়ে লুকোল। বুকের ভেতর যেন ঝড় বইছে। কিন্তু কানে আসা সেই কণ্ঠস্বরটা চেনা। খুবই চেনা।
“না… এটা হতে পারে না…”
নিজের মনে ফিসফিস করলো রোজেলিয়া, ভয় আর অবিশ্বাস মিশে।গভীর নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই ভারী বুটের শব্দ ভেসে এলো। ধীরে ধীরে সেই শব্দ গাছটার কাছাকাছি আসতে লাগল। রোজেলিয়া নিশ্বাস আটকে রাখল, আশায় যে হয়তো সে এ যাত্রায় অদৃশ্য থাকবে।
কিন্তু হঠাৎ কারও শক্ত হাত তার বাহু চে'পে ধ'রল আর প্র'বল টা'নে তাকে আড়াল থেকে টে'নে বের করে নিল। রোজেলিয়ার মুখ থেকে তীব্র এক চি'ৎকার বেরিয়ে এলো।সে হোঁ'চট খেয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ল এক কঠিন বুকের ওপর। ভয়ে ও বিস্ময়ে চোখ বড় করে ওপর দিকে তাকাতেই সেই হ্যাজেল চোখের সঙ্গে চোখ আটকালো। ঘামে ভেজা চুলের আড়ালে ঠান্ডা নির্মম এক মুখ।
রিভেন ঠান্ডা গলায়, নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“পালানোর চেষ্টা করছিলে, রোজ পেটাল? সত্যিই ভেবেছিলে আমার এই সাম্রাজ্য থেকে আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাবে?”
রোজেলিয়া আড়মড় করে তার হাত ছেড়ে পালাতে চাইল তবে রিভেন এক ঝটকায় তার পাশ ফিরে এসে শক্ত করে ধরল। গাছের সাথে তাকে টে'নে জো'রে চাপিয়ে দিল। তারপর এক তী'ব্র থা'প্প'ড় বসিয়ে রোজেলিয়ার চো'য়া'ল চেপে ধরে তী'ক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
"তোর সাহস তো দেখি কম না, প্রথমে আমার নিষেধ ভেঙে ঘর থেকে বের হয়েছিস, তার পর আবার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালানোর চেষ্টা…!"
সে হঠাৎ করেই এক অট্টহাসি দিয়ে উঠল। হাসিটা এতটাই অন্ধকার আর ভয়ঙ্কর ছিল যে চারপাশের বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল।
“এই জঙ্গলটা দেখছিস? এটা আমার ব্যক্তিগত ন'রক। এখানে একটা শুকনো পাতাও আমার অনুমতি ছাড়া নড়ার সাহস পায় না। আর তুই ভেবেছিস এখান দিয়ে পালিয়ে যাবি?”
রিভেন মাথা ঝাঁকিয়ে কাছে ঝুঁকল, তার ঠোঁটের কোনায় শীতল এক বিদ্রূপী হাসি।
“শোন ছোট পাখি, এই জঙ্গলের শেষ প্রান্তে এক বিশাল দেওয়াল আছে। ওটা টপকানো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তুই যতই দৌড়াস না কেন, শেষমেশ তোকে ওই দেওয়ালের সামনেই আ'ছা'ড় খেয়ে পড়তে হবে। আর আমার এই কু'কু'রগুলো?”
সে চোখের ইশারায় দূরের কুকুরগুলোর দিকে তাকাল। ভয়ঙ্কর চাহনিতে তাদের চোখ লালচে হয়ে জ্বলছিল।
“ওরা শুধু আমার হুকুম শোনে। তুই যদি আর এক কদমও ভুল দিকে বাড়াস, তবে আমার হুকুম ছাড়াই ওরা তোকে জ্যা'ন্ত ছিঁ'ড়ে খা'বে"
_______________________
রিভেন তার ভয়'ঙ্কর রা'গ আর তী'ব্র ক্রো'ধ নিয়ে টেনে টেনে রোজেলিয়াকে আবার বাড়ির ভেতর নিয়ে এলো। তার কব্জিতে রিভেনের আঙুলের চাপ এতটাই শক্ত ছিল যে ত্ব'ক লা'ল'চে হয়ে উঠল।শরীরজুড়ে ক্লান্তি, চোখে ভয়ের ছাপ রোজেলিয়া যেন আর এক পা ফেলতেও পারছিল না। তবুও রিভেন এক ঝট'কা'য় তাকে টেনে নিজের বিশাল বেডরুমে ঢুকিয়ে দিল।
রোজেলিয়া মেঝেতে পড়ে গেল, ব্য'থায় হালকা গো'ঙা'নি বে'রিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে। রিভেন দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভারী শব্দে সেটা আটকে দিল। পুরো ঘর যেন মুহূর্তে আরও আঁধারে ঢেকে গেল।তারপর ধীরে ধীরে রিভেন ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে অদ্ভুত হিং'স্র আলো জ্ব'ল'জ্বল করছিল, ঠোঁটের কোনায় জমে থাকা হিংস্র হাসি তাকে আরও শীতল করে তুলল।সে এক পা, দু’পা করে এগিয়ে আসছিল রোজেলিয়ার দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝেতে ভ'য়ার্ত প্রতিধ্বনি উঠছিল।রোজেলিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল, বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন কানে বাজছিল। সে জানত, পালানোর কোনো পথ আর বাকি নেই।রিভেন ধীরে ধীরে রোজেলিয়ার কাছে এসে দাঁড়াল। তার ছায়া পুরোটা ঢেকে দিলো রোজেলিয়ার ছোট্ট শরীর।
হঠাৎই সে ঝুঁকে রোজেলিয়ার থু'তনিটা শ'ক্ত করে চে'পে ধরল, এতটাই শ'ক্ত যে রোজেলিয়া ব্য'থায় শ্বাস আটকে গেল।সে আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
"রোজ পেটাল… মনে রাখিস, আমার অনুমতি ছাড়া তুই নিঃশ্বাস নিতেও পারবি না। আমার জগতে তুই শুধু আমার।"
রিভেনের হ্যাজেল চোখ ভয়'ঙ্কর লা'ল'চে হয়ে উঠল ক্রোধে। হঠাৎই সে তার চোয়ালে আরও চাপ দিলো আর কণ্ঠস্বর ঝড়ের মতো গর্জে উঠল ,
"আবার পালানোর চেষ্টা করলে… আমি শুধু তোকে না,তোমার বাবা-মাকেও জ্যা'ন্ত ক'ব'র দেব আমি "
রোজেলিয়া ভয়ে শিউরে উঠল। রিভেন রোজেলিয়ার কাছ থেকে মুখ সামান্য সরাল, কিন্তু আঙুলের শক্তি কমাল না।তারপর শীতল স্বরে আবার বলল,
"এখন তুই বুঝ আমার কথার বাইরে গেলে কী হয়। তুই আমার কাছে বন্দি… আর বন্দি হয়েই বাঁচবি।"
রিভেন তার প্যা'ন্টে'র বে'ল্ট খুলল। রোজেলিয়া চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল, মনে মনে ভয়ে জড়িয়ে ধরে।কিন্তু রিভেন খুবই শান্তভাবে, অথচ হিমশীতল চোখে, বে'ল্ট'টা হাতে ধরে তার দিকে এগিয়ে এল। মুহূর্তের মধ্যেই বেল্টের শেষটা রোজেলিয়ার কাছে ছুঁয়ে গেল।রোজেলিয়া হঠাৎ চমকে উঠল ,তীব্র ব্যথা করে উঠলো তার পিঠে। রোজেলিয়ার মুখ থেকে তীব্র আ'র্তনা'দ বেড়িয়ে এলো। তার চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করলো।
"আর করবি পালানোর চেষ্টা?"
তার শব্দে রোজেলিয়ার বুক ভরানো ভয়ের ঢেউ আরও তীব্র হয়ে উঠল। রিভেনের বে'ল্টর আঘাত আরো জো'রে জো'রে তার পিঠে ক্র'মশ পড়'লো।রোজেলিয়া যেন শরীরের বল হারিয়ে ফেলছে। সে আরেক মুহূর্তও স'হ্য করতে পারল না, এবং শেষ পর্যন্ত শি'থি'ল হয়ে,অ'জ্ঞা'ন হয়ে যায়।
রোজেলিয়ার শরীর মেঝেতে ঝুকে যেতেই রিভেন থামল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। রাগে সে তখনও ফুঁসছিল। রিভেন হাতের বেল্টটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে রোজেলিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।
তারপর, রেগে, রিভেন ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রোজেলিয়া অ'জ্ঞা'ন অবস্থায় সেখানে পড়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পর রিভেন আবার ঘরে প্রবেশ করল। রোজেলিয়ার তখনো জ্ঞান ফিরেনি।রিভেন সেখানে দাড়িয়ে রোজেলিয়ার দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে থাকলো। সে রোজেলিয়ার শরীর খেয়াল করল দৌড়ানোর চেষ্টায় পায়ের ক্ষ'ত আর শরীরের ওপর বে'ল্টে'র বারির দা'গগুলো লা'ল ছো'প ছো'প দাগ হয়ে আছে।রিভেন ধীরে ধীরে তার হাতে থাকা ওয়েন্টমেন্ট নিল। সে আলতো হাতে তা রোজেলিয়ার পায়ের উপর লাগাল, যেন রোজেলিয়ার অ'স্ব'স্তি আর ব্যথা কমানোর চেষ্টা করছে।
“কেন আমাকে বাধ্য করো এমন হতে, রোজ? কেন সহজভাবে আমার কাছে ধরা দাও না? এই জখমগুলো যেমন তোমার গায়ে, তেমনি আমার বু'কে'ও বিঁ'ধ'ছে।”
সে রোজেলিয়ার কপালে আলতো করে হাত রাখল। জ্বরে আর যন্ত্রণায় মেয়েটির শরীর পুড়ছে। রিভেন তার শীতল আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার চোখের তলার জল মুছে দিল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটি দা'নবে'র মতো আচরণ করছিল, এখন সে এক অদ্ভুত মমতায় রোজেলিয়ার সেবা করছে।
সে ঝুকল এবং রোজেলিয়ার কপালে এক দীর্ঘ চু'ম্ব'ন এঁকে দিল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“ক্ষ'ত'গুলো আমি সারিয়ে দেব, কিন্তু দাগগুলো থেকে যাবে। যাতে তুমি প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখো তুমি শুধু আমার, কেবলই আমার।”
_______________________
সময় কেটে গেল, রোজেলিয়ার ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এলো। সে চারপাশে তাকায় কিন্তু কাউকেই দেখতে পাচ্ছিল না। পুরো শ'রীর ব্য'থা করছে, বিছানায় নড়'তে চাইলেও আর শক্তি নেই। চোখে পানি জমছিল, মন ও দেহ দুটোই দুর্বল।রোজেলিয়া লক্ষ্য করল, তার পায়ের ক্ষতস্থানগুলোর ওপর কেউ ব্যান্ডেজ দিয়েছে ছোট ছোট চিহ্ন আর লাল দাগগুলো স্পষ্ট।হঠাৎ দরজা হালকা শব্দ করে খোলার সাথে সাথে আভা ঘরে প্রবেশ করল। হাতে একটি খাবারের ট্রে আর কিছু ব্যথা কমানোর ঔষধ।
"রোজেলিয়া, খেয়ে নাও। খেয়ে ঔষধ নাও, ভালো হয়ে যাবে,"
আভা ধীরভাবে বলল।রোজেলিয়া আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। কাঁদতে শুরু করল, বুক ভরে শ্বাস ফেলতে লাগল।আভা আলতোভাবে রোজেলিয়ার হাত ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল।
"চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের স্যার একটু বেশি রাগি। তাঁর কথা কেউ উপেক্ষা করলে তিনি কঠোর শা'স্তি দেন। এখন খেয়ে নাও,"
আভা ধীরে বলল।বলা শেষ হতেই আভা ঘরে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে বাইরে চলে গেল। রোজেলিয়া কাঁদ'তে কাঁদ'তেই বিছানায় বসে রইল, চোখে অজানা ভয় আর শরীরে অদৃশ্য চাপ অনুভব করে।
______________________
দুই দিন কেটে গেল। রোজেলিয়া ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করল। এই দুই দিন রিভেনকে একবারও দেখা যায়নি সে অধিকাংশ সময় অফিসে ব্যস্ত থাকত। রিভেন না থাকায়, রোজেলিয়ার দিনগুলো তুলনামূলকভাবে শান্ত কেটে যাচ্ছিল। সে কেবল নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছিল, কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছিল।
এই সময়ে রোজেলিয়া কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মুহূর্তগুলো কিছুটা স্বাভাবিক করে তুলেছে তার জন্য। রিভেন না থাকায় তার দিনগুলোও শান্তিপূর্ণ কেটে যাচ্ছে।
একদিন রোজেলিয়া ঘরে বসে কিছুটা বই পড়ছিল। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হল, এবং আভা প্রবেশ করল। তার পেছনে আরও কয়েকজন মেইড ঢুকল, হাতে হাতে বিভিন্ন রকমের শাড়ি, গহনা এবং অ্যাকসেসরিজ।
আভা ঘরে ঢুকেই রোজেলিয়াকে বলল,
"স্যার এগুলো পাঠিয়েছেন। তোমার পছন্দমতো বেছে নাও।"
রোজেলিয়া কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"এগুলো কেন?"
আভা হালকা হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
"আজই তোমার বিয়ে। তাই বিয়ের জন্য শাড়ি পছন্দ করার আদেশ দিয়েছেন স্যার।"
রোজেলিয়ার চোখে অদ্ভুত একটা মিশ্র অনুভূতি ভয়, উত্তেজনা । সে চুপচাপ পরাজয় মেনে নেই। বুঝতে পারে তার কিছু করার নেই।রোজেলিয়া শাড়িগুলো একে একে দেখছে, তার মন ঠিকঠাক মনযোগ দিতে পারছে না। ভেতরের ভয়, অসহায়ত্ব আর অজানা উ'ত্তে'জনা সব মিলিয়ে সে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাই সে চুপচাপ, নীরবে শাড়িগুলো পরখ করতে থাকে।শেষমেষ, তার চোখ পড়ে একটিতে সাদা কালারের একটা গর্জিয়াস শাড়ি। নিঃশ্বাস ধরে রেখে সে সেটি হাতে তুলে নিল।মেইডরা কিছুটা অবাক হয়ে দেখল, কিন্তু কেউ মুখ খুলল না। চুপচাপ তারা রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বুঝতে পারছে এ মুহূর্তে তার নিজের ইচ্ছার চেয়ে বড় কিছু নেই।রোজেলিয়া শাড়ীটি মেইডের দেখিয়ে বলে
" আমি এটাই পড়বো "
মেইডরা ধীরে ধীরে রোজেলিয়াকে শাড়ি পরিয়ে দিল। রোজেলিয়া একটু নার্ভাস, একটু অচেনা কিন্তু বাইরে পালানোর কোনো সুযোগ নেই।তারপর তারা রোজেলিয়ার গলায়, কানে, হাতের কব্জিতে ঝকঝকে ডায়মন্ড জুয়েলারি পরাতে লাগল। প্রতিটি ছোটখাটো আভরণ যেন রোজেলিয়ার ভঙ্গিমাকে আরও সুন্দর এবং ঝকঝকে করে তুলছিল।মেইডরা খুব যত্ন নিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক সাজাল শাড়ি, গয়না, চুলের স্টাইল, সবকিছু। রোজেলিয়া নিজেকে আয়নাতে দেখল, একেবারে নতুন রূপে, কিন্তু ভেতরের ভয় আর উত্তেজনা এখনও অদৃশ্য ছায়ার মতো তার সঙ্গে লেগে আছে।শেষমেষ, সে চুপচাপ বসে রইল, মনের মধ্যে অচেনা অস্থিরতা নিয়ে, যখন মেইডরা তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে সব ঠিক করছে।
চলবে,,,