#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ৫
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
রোজেলিয়া অবশেষে পুরোপুরি রেডি হলো। সাদা গর্জিয়াস শাড়ি, তার উপর ঝকমকে হিরের গয়না সে যেন চারপাশের আলোকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। চুল খোলা নয়, বরং মেইডরা সুন্দর করে গুছিয়ে বেঁধে দিয়েছে,ঠোঁটে হালকা রঙ অন্যরকম এক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে রোজেলিয়া।মেইডরা ধীরে ধীরে তাকে হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিয়ে আনল। বিশাল হলরুম নিস্তব্ধ, সব আলো যেন শুধু তার দিকে ফোকাস করছে।
রিভেন তখন সোফায় বসে ছিল, হাতে সি'গারেট ধরা, গম্ভীর চোখে চারপাশ লক্ষ্য করছিল। রোজেলিয়াকে দেখা মাত্র তার দৃষ্টি থেমে যায়। চোখের দৃষ্টি এতটা গভীর হয় যে মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে।সে মনে মনে বিড়বিড় করে,
"সাদা রঙটা বরাবরই আমার দুচোখের বি'ষ ছিল রোজেলিয়া, বড্ড প'বিত্র শোনায়। কিন্তু আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, পবিত্রতা বুঝি এভাবেই কোনো পা'পি'ষ্ঠের দরবারে নিজের ইচ্ছায় আ'ত্মসম'র্পণ করতে আসে।এই সৌন্দর্য শুধু আমার অ'ন্ধ'কারের জন্য তোলা ছিল। আজ থেকে তুমি আমার সেই সুন্দর অভিশাপ, যাকে আমি কোনোদিন মুক্তি দেব না"
সাদা শাড়ির সেই সরল অথচ রাজকীয় রূপে রোজেলিয়া আজ তার কাছে আরও রহস্যময় লাগছে।
ধীরে ধীরে রিভেনের ঠোঁটে এক ফিকে, সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে।রোজেলিয়া সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার কাছে আরও ভারী হয়ে উঠছিল। চারপাশের মেইডরা নিস্তব্ধ।সোফায় বসে থাকা রিভেনের চোখ একটুও সরেনি তার দিক থেকে। সাদা শাড়ি আর হিরের গয়নায় মোড়া রোজেলিয়াকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ তৃপ্তির ছাপ খেলে গেল।
কিন্তু পাশে বসা কাজী সাহেবের মুখে অন্যরকম অস্বস্তি। দু’দিন আগেও তিনি ছিলেন বাংলাদেশে, হঠাৎ এক অচেনা দলের লোক তার বাড়িতে গিয়ে জানায়, তাকে সঙ্গে সঙ্গে ইতালি যেতে হবে। প্রথমে ভেবেছিলেন, এটা অসম্ভব কীভাবে এত অল্প সময়ে সম্ভব? কিন্তু রিভেনের লোকেরা যখন ব্যক্তিগত জেট নিয়ে হাজির হলো, তখন না যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। এখন তিনি ইতালির এক অচেনা প্রাসাদে, এক মাফিয়া ডনের বিয়ের আসরে, আর নিজের ভেতরে দমচাপা ভয়ের সঙ্গে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছেন।
রোজেলিয়ার বাবা-মাকেও রিভেন গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে এসেছে। বাবার চোখে অনিশ্চয়তা, মায়ের মুখে দমচাপা কান্না সবকিছু মিশে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছিল।
এই পুরো আয়োজনের মাঝে, রোজেলিয়া বুঝতে পারছিল এটা তার বিয়ে, কিন্তু তার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সবই যেন আগে থেকে লেখা নাটক, যেখানে সে কেবল প্রধান চরিত্র, অথচ নিজের সংলাপ বলার অধিকারটুকুও তার নেই।
রোজেলিয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। সাদা শাড়ি আর ঝলমলে গয়নায় সাজানো, কিন্তু মুখে এক ফোঁটা হাসি নেই। রোজেলিয়া যখন রিভেনের সামনে এসে দাঁড়ায়, রিভেন এক টানে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে নেয়।
চারপাশে চাপা গুঞ্জন থেমে যায়। সবাই অপেক্ষা করে আছে কেবল কাজীর ঘোষণার জন্য।কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে, বই আর কলম হাতে নিয়ে বলেন,
"তাহলে এখন বিয়ে পড়ানো শুরু করি?”
সবাই প্রস্তুত। কিন্তু হঠাৎ রিভেন ঠান্ডা, অথচ কঠোর কণ্ঠে বলে ওঠে,
"না।”
এক মুহূর্তে পুরো হলঘরে শীতল নীরবতা নেমে আসে। মেইডরা চমকে একে অপরের দিকে তাকায়। রোজেলিয়ার চোখ বড় হয়ে যায় অবাক হয়ে।কাজী সাহেব থমকে গিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠেন,
"ইয়া মাবুদ।আবার কোন জামেলায় পড়লাম। সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে কি শেষমেশ আমার জা'নটা ক'বজ করার জন্য নিয়ে এল? বিয়ে পড়াতে এসে যদি জা'না'জা পড়ার উপক্রম হয়, তবে এই মাফিয়া প্রাসাদে আমার হা'ড়গো'ড়ওতো খুঁজে পাওয়া যাবে না!"
তিনি হালকা করে ঘাম মুছে চারপাশে তাকান, যেন বুঝতেই পারছেন না এখন আসলে কী ঘটতে চলেছে।সবাই নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। রিভেনের “না” উচ্চারণের পর যেন কারও শ্বাস নেওয়ার সাহস নেই। রোজেলিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, কাজী সাহেবের হাতের কলম মাঝআকাশে স্থির হয়ে আছে।
ঠিক তখনই প্রধান ফটক খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করেন এক মহিলা। তার পরনে অফ-হোয়াইট রঙের রাজকীয় শাড়ি, গলায়-মাথায় সোনার অলংকার, আর তার ভঙ্গিতেই ফুটে ওঠে এক অভিজাত শাসনক্ষমতা। গায়ের উজ্জ্বল শ্যামলা রং আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই ঘরের সবাইকে মুগ্ধ করে ফেলে।
তার পাশে এক তরুণী, নিস্তব্ধভাবে পিছনে পিছনে আসছে। পেছনে রয়েছেন এক দেহরক্ষী, যার চোখ সর্বক্ষণ সতর্কভাবে চারপাশে ঘুরছে।ঘরে প্রবেশ করে মহিলা সোজা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালেন। মুহূর্তেই পরিবেশটা যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো।রিভেন হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, ঠোঁটে অল্প হাসি খেলে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলে উঠল,
"মম, এদিকে এসো, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম "
কিন্তু মিসেস মেহরিন কারুসো বসেন না। বরং তার তীক্ষ্ণ চোখ সরাসরি ছেলের চোখে গিয়ে আটকে যায়।তার ঠোঁটে বিরক্তির আভা, কণ্ঠে শীতল দৃঢ়তা।
"রিভেন, আজকেই আমাকে কল করে আসতে বললে, আর আজকেই জানালে যে তোমার বিয়ে,Do you even realized what you are doing?"
রিভেন সামান্য চুপ করে থাকে, ঠোঁটে সেই স্বভাবসিদ্ধ হালকা হাসি। যেন মায়ের রাগকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
মিসেস কারুসো আরেক ধাপ সামনে এগিয়ে আসেন, শাড়ির আঁচল মেঝেতে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার গলার স্বর আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
"রিভেন বিয়ে কোনো খেলা না. You never informed me you never took my opinion সবকিছুই তুমি নিজের মতো ফিক্স করে ফেলেছো, এসবের মানে কী ."
রোজেলিয়া চুপচাপ বসে আছে। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। সে বুঝতে পারছে, রিভেনের মা শুধু ক্ষমতাবানই নন, তিনিই আসল নিয়ন্ত্রক।রিভেন ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়,
" মম, আমার সব ডিসিশন আমার নিয়ন্ত্রণে,এই ফ্যামিলিতে আমি রুল করি,বিয়ে আমার পারসোনাল মেটার "
মিসেস ক্যারুসো ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, কিন্তু আর কিছু বললেন না। এবার তাঁর চোখ ঘুরে স্থির হলো রোজেলিয়ার ওপর।রোজেলিয়া নার্ভাস হয়ে বসে আছে। মেহরিন কারুসোর চোখ তীক্ষ্ণভাবে তাকে স্ক্যান করলো, যেন ভেতরটা পর্যন্ত পড়তে চাইছে। কিছুক্ষণ নীরবে পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ ফেরালেন।
হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল আফসার চৌধুরীর ওপর।সোফায় বসা আফসার চৌধুরী স্পষ্টতই অস্বস্তিতে, কপাল ভাঁজ হয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মিসেস ক্যারুসোর ঠোঁটের কোণে এক হালকা অথচ শীতল হাসি ফুটে উঠলো।তিনি মানুষটিকে চিনে গেছেন।রিভেনের মায়ের মতো প্রভাবশালী নারী যে আফসার চৌধুরীর অতীত সম্পর্কে জানেন, সেটা স্পষ্ট।এবার তিনি সোজা রিভেনের দিকে ফিরে বললেন
"তুমি তো সব কিছু নিজের ইচ্ছেমতো ঠিক করে ফেলেছো, রিভেন। তাহলে আর আমার অপেক্ষা করছো কেন? বিয়ে শুরু করো।”
এ কথা বলেই তিনি নিঃশব্দে গিয়ে সোফায় বসলেন।ঘরের আবহাওয়া যেন আরও ভারী হয়ে গেল। কাজী সাহেব কাগজপত্র নিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন, কিন্তু মনে মনে ভাবলেন,
"আহারে, এ কেমন নাটকের মধ্যে পড়লাম আবার!"
কাজী সাহেব গলা পরিষ্কার করলেন।টেবিলে রাখা কাগজপত্র গুছিয়ে নিলেন। রোজেলিয়া একবার মায়ের দিকে তাকালো, তারপর নিচু করে চোখ নামিয়ে নিল। রিভেন ঠান্ডা, গম্ভীর দৃষ্টিতে বসে আছে। চারপাশে এক অদ্ভুত চাপা টেনশন।
কাজী সাহেব হালকা কণ্ঠে বলে
"আচ্ছা, তাহলে বিয়ের কার্যক্রম শুরু করা যাক। কাবিননামা এখানে প্রস্তুত আছে। বর পক্ষের নাম মিস্টার রিভেন আরওয়াইন কারুসো। কনে পক্ষের নাম মিস রোজেলিয়া চৌধুরী।”
কাজী কাগজে চোখ বুলিয়ে নিলেন, তারপর মাথা তুলে রোজেলিয়ার দিকে তাকালেন
"মিস রোজেলিয়া, আপনাকে জিজ্ঞেস করছি আপনি কি মিস্টার রিভেন আরওয়াইন কারুসোকে কাবিন মোতাবেক স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলেন?”
রোজেলিয়া থমকে গেল। বুকের ভেতর তীব্র ধুকপুকানি, চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।তার সামনে রিভেনের ঠাণ্ডা, গভীর চোখ যেন এক অচল শপথ।
এক মুহূর্ত নীরবতা… তারপর রোজেলিয়া চোখ নামিয়ে , কাঁপা কণ্ঠে বললো,
"জি… ক…করলাম।”
কাজী আবার বললেন, নিয়মমাফিক, গম্ভীর স্বরে—
"আমি আবার জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি কবুল করলেন?”
রোজেলিয়া এবার চোখ বন্ধ করে, নিঃশ্বাস নিয়ে স্পষ্ট করে বললো—
"জি, কবুল করলাম।”
তৃতীয়বারেও কাজীর গলা ঘরের ভারি নিস্তব্ধতা ভেদ করে উঠলো—
"শেষবার বলছি, আপনি কি কবুল করলেন?”
রোজেলিয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো, কিন্তু শব্দ দৃঢ়
"কবুল করলাম।”
রিভেনের ঠোঁটে ঠাণ্ডা এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো।তার চোখে অদ্ভুত এক জ্যোতি যেন জয়, যেন অধিকার।
এবার কাজী সাহেব মুখ ঘুরিয়ে রিভেনের দিকে তাকালেন।
"মিস্টার রিভেন আরওয়াইন কারুসো, আপনি কি মিস রোজেলিয়া চৌধুরীকে কাবিন মোতাবেক স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন?”
রিভেন পিঠ সোজা করে বসল।তার কণ্ঠ গাঢ়, ধীর, নিয়ন্ত্রিত—
"ইয়েস… আমি কবুল করলাম।”
কাজী তিনবারই পুনরাবৃত্তি করলেন, আর প্রতিবার রিভেন একই অচঞ্চল স্বরে উচ্চারণ করলো,
"কবুল করলাম।”
কাজী দ্রুত সাক্ষীদের ডাকলেন। দু’জন সাক্ষী এসে কাগজে সই করলো। তারপর রিভেনও সই করলো। রোজেলিয়ার হাত কাঁপছিল, তবুও তাকে সই করাতে হলো।
কাজী অবশেষে ঘোষণা দিলেন
"এখন থেকে রিভেন আরওয়াইন কারুসো এবং রোজেলিয়া চৌধুরী স্বামী-স্ত্রী। আল্লাহ তাদের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ দান করুন।”
রিভেনের ঠোটে এক বিজয়ের হাসি ফুটে উঠেছেরোজেলিয়া শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে বসে আছে, চোখের কোনা ভিজে। বুকের ভেতর এখনও তীব্র ধুকপুকানি চলছে।
রিভেন ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকল। ঠাণ্ডা, হিং'স্র চোখে তাকিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বললো
"এবার তুমি আমার, রোজেলিয়া… চিরদিনের জন্য। তুমি পালাতে চাইলেও, এই পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই আমার হাত তোমাকে খুঁজে না পাবে তা কখনো হবে না।”
রোজেলিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল। সে বুঝল, তার জন্য এখানে কেউ নেই। শুধু এই ভয়ংকর মানুষটা, যার ছায়ার নিচে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে।রোজেলিয়া তার মা-বাবার দিকে তাকিয়ে থাকল চোখে ভরা অনুরোধ, হাহাকার। বাবার কাঁধ কুঁচকে উঠল, মা হালকা করে হাঁপিয়ে কাঁদতে চাইছিলেন, সবটাই একটুখানি বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক এক ছবিতে রুপান্তরিত হলো।
রিভেন শান্ত, ঠাণ্ডা কণ্ঠে তার গার্ডদের দিকে তাকাল এবং বলল,
“Send him back to Bangladesh "
কাজী এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।কাজী যখন বিদায় নিলেন, রিভেন সবকিছুকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে রোজেলিয়ার দিকে তাকাল। নরম, হালকা ফিসফিস কণ্ঠে বলল,
"রাতে তৈরি হয়ে থেকো…রোজ পেটাল"
রোজেলিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল, আর সে কিছু বলতে পারেননি।রিভেন তখন বাঁকা হেসে কেবল মাথা নাড়ল এবং ধীরে ধীরে সেই ধোঁয়াশা ভরা উপস্থিতি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।রিভেন চলে যাওয়ার পর রোজেলিয়া ধীরে ধীরে স্বস্তি অনুভব করল। তার বাবা-মা তাকে পাশে ডেকে শান্তভাবে বিদায় জানালেন। বাবা চোখে মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বললেন।
"সাবধানে থাকিস,মা"
মা হালকা হাসি দিয়ে যোগ করলেন,
"হ্যাঁ,রোজে, সাহস রাখো। হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।"
রোজেলিয়া তাদের আশ্বস্ত বচন শোনার পর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।রোজেলিয়ার বাবা-মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে, মেহরিন কারুসো আর কিছু না বলে তার নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।চারিদিক হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। রোজেলিয়া নিজের রুমে ফিরে এল। বিছানার পাশে এসে হঠাৎ ভেঙে পড়ল মেঝেতে। বুকটা হালকা করে কান্নায় ভরে উঠছিল, কিন্তু সে জানত কান্না করে লাভ নেই, দুর্বল হওয়া যাবে না। তাকে শক্ত হতে হবে।এই কয়েকদিনেই সে রিভেনকে অনেকটা চিনে ফেলেছে। অথচ কোনো মানুষকে ভালোভাবে জানার আগেই আজ তাকে সেই মানুষটার স্ত্রী হতে হয়েছে। সে তো এমন কিছু চায়নি। হয়তো সে চেয়েছিল, তার জীবনে একদিন এমন কেউ আসবে, যাকে সে নিজে থেকে আপন করে নেবে ভালবাসবে, নিজের মনের মানুষ হিসেবে মেনে নেবে। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল!চোখের পানি অজান্তেই গড়িয়ে পড়ছিল। রোজেলিয়া চাইলেও থামাতে পারছিল না কান্না।ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল আভা। রোজেলিয়াকে এভাবে কাঁদতে দেখে তার বুকটা হু হু করে উঠল। কিছুটা নরম স্বরে বলল,
"ম্যাম… দয়া করে কাঁদবেন না। আসুন, আগে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি একটু পরেই খাবার নিয়ে আসছি।"
এতটুকুই বলে আভা চুপচাপ বেরিয়ে গেল।রোজেলিয়া ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে ফ্রেশ হলো। কিন্তু যখন আভা খাবার নিয়ে এলো, তখনো তার কোনো ক্ষুধা ছিল না। চুপচাপ খাওয়া ছেড়ে দিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর অশ্রুভেজা চোখেই ঘুমিয়ে গেল রোজেলিয়া।
______________
রাত গভীর। মেনশনের চারপাশ যেন নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবরণে ঢেকে গেছে। কারো ঘরে আলো জ্বলছে না, কারো নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। কেউ ঘুমে আচ্ছন্ন, কেউ বা নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। কেবল নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরে চাপা অস্থিরতা।
রোজেলিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল বারান্দার দিকে। সেখানে একটি চেয়ার রাখা ছিল সামনে একটি ছোট কাচের টেবিল, তার ওপরে দুটো ক্রি'স্টালের বোতল, একটিতে ম'দ, আরেকটিতে পানি। রোজেলিয়া ধীরে বসল চেয়ারে। মুখটা তুলে তাকাল ওপরে আকাশের দিকে।
কালো আকাশে আজ কোনো চাঁদ নেই, কোনো তারা নেই। আলোহীন, প্রাণহীন, একেবারে শূন্য এক আকাশ। চারপাশের শহরও অস্বাভাবিক নীরব, যেন অন্ধকারকেও ভয় পেয়েছে। রোজেলিয়ার মনে হলো আজকের রাতটা শুধু বাইরের পৃথিবীর নয়, তার জীবনেরও সবচেয়ে অন্ধকার রাত। কি থেকে কি হয়ে গেল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে জড়িয়ে গেল এমন এক খেলায়, যেখান থেকে বেরোনোর উপায় নেই।
চোখে জমা জল সামলানোর চেষ্টা করছিল সে। ঠিক তখনই বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলো এক পরিচিত গন্ধ কড়া, দামি পারফিউমের ঘ্রাণ। রোজেলিয়া জানত, কে এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। তবু পেছন ফিরল না।পুরুষালি এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তার কানে,
“Are you waiting for me,wife??”
রোজেলিয়া নিঃশব্দে বসে রইল, কোনো উত্তর দিল না। যেন তার চুপ থাকাটাই উত্তর।সামান্য বিরতির পর আবার শোনা গেল সেই গলা,
“No need to wait for me anymore, i'm already here for you love।.”
কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিশে ছিল আত্মবিশ্বাস, মালিকানার ঘোষণা, আর একরাশ বিদ্রূপ। সাথে সাথে রিভেনের ঠোঁটে ফুটল এক বাঁকা হাসি।হঠাৎই সে ঝুঁকে পড়ল, জোরে টে'নে তু'লে নিল রোজেলিয়াকে কো'লে। রোজেলিয়া ভয় আর বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল, শরীরটা যেন মুহূর্তেই জমে গেল। প্রতিরোধ করার কথা মনে এলেও হাত-পা কাজ করল না।
রিভেন কোনো কথা বলল না, শুধু দৃঢ়ভাবে হাঁটতে লাগল রোজেলিয়াকে বুকে চেপে ধরে। নিয়ে গেল তার ঘরে। দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে দিল। রুমের ভেতরের নরম আলোয় রোজেলিয়ার চোখে জল চিকচিক করে উঠল।
আজ সে আর লড়াই করল না। প্র'তিরো'ধের শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। হয়তো প্রমাণ করার চেষ্টা যে রোজেলিয়া এখন তার শুধু তার। আর হয়তো, কোনো অদ্ভুত, অজানা ভালোবাসাও লুকিয়ে আছে এই হিং'স্র মালিকানার ভেতর।রোজেলিয়ার চোখ থেকে নিরবধি গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। কিন্তু সে জানত আজ কাঁ'দলেও কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাই সে নীরবে সব মেনে নিল। নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের নি'য়'তি সবকিছুই ছেড়ে দিল ভা'গ্যের হাতে।
চলবে,,,,,