#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ১০
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
সকালের হালকা সোনালি আলোয় প্যারিসের আকাশ যেন গলিত সোনার মতো ঝলমল করছে। দূরে কোনো অচেনা পাখির ডাক, আর বাতাসে হালকা ফুলের গন্ধ পুরো দৃশ্যটা শান্ত ।রোজেলিয়া বারান্দার কারুকার্য করা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা বাতাসের ঝাপটায় তার অবাধ্য বাদামি চুলগুলো মুখে আছড়ে পড়ছে।
তিনটি দিন কেটে গেছে এই মায়াবী শহরে। কিন্তু এই তিন দিনে রোজেলিয়ার জগতটা এই বিশাল রাজপ্রাসাদের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ। রিভেন সকাল থেকে রাত অবধি তার অন্ধকার সাম্রাজ্যের হিসাবনিকাশ নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে এনজোর সাথে বাগানে হাঁটে রোজেলিয়া। এনজো এখন আর শুধু একজন দেহরক্ষী নয়, তার শান্ত আর মার্জিত আচরণ রোজেলিয়াকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দেয়। অন্তত এই বিশাল গুমোট প্রাসাদে কথা বলার মতো একজন মানুষ সে পেয়েছে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো রিভেনের পরিবর্তন। যে মানুষটা ইতালিতে আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলত, প্যারিসে আসার পর সে যেন এক শান্ত সমুদ্র। তার কণ্ঠে সেই কর্কশ গর্জন নেই, নেই কোনো অহেতুক অপমান। এই মৌনতা রোজেলিয়াকে আরও বেশি অস্থির করে তোলে।
রোজেলিয়া যখন দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আইফেল টাওয়ারের চূড়াটা দেখার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো বলিষ্ঠ আর শক্ত হাত সাপের মতো তার সরু কোমর জড়িয়ে ধরল। রোজেলিয়া চমকে উঠল, তার হৃৎ'পিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রিভেনের শরীরের সেই চিরচেনা উগ্র পারফিউম আর তামাকের ঘ্রাণ মুহূর্তেই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
রিভেন তার চওড়া বুকটা রোজেলিয়ার পিঠের সাথে মিশিয়ে দিয়ে ঝুঁকে এল। তার তপ্ত আর ভারী নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার ঘাড়ের নরম চামড়ায় আগুনের মতো বিঁধছে। রিভেন কোনো কথা না বলে অত্যন্ত ধীরলয়ে রোজেলিয়ার গলার রেখায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ চুমু।
রোজেলিয়ার সারা শরীর এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল। তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে, চোখের পাতা দুটো বোজা। রিভেনের কণ্ঠস্বর আজ ভোরে ভাঙা, একটু আদুরে অথচ সেই আদিম গভীরতা তাতে অমলিন।
“এখানে কী করছো, রোজ পেটাল? হ্ম? আমাকে কি খুব বেশি বড় মনে হচ্ছিল?"
রোজেলিয়া ধীরে ধীরে তার বাহুবন্ধনের ভেতরেই ঘুরে দাঁড়াল। রিভেনের অবিন্যস্ত চুল আর নেশাক্ত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সে ম্লান কণ্ঠে বলল,
“ঘুম আসছিল না... এই শহরটা বাইরে থেকে দেখতে খুব শান্ত লাগে, তাই বারান্দায় এসেছিলাম”
রিভেন কোনো উত্তর দিল না। সে রোজেলিয়ার কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিল,রিভেনের ঠোঁ'ট এখন রোজেলিয়ার ঘাড় বেয়ে ওপরের দিকে উঠে আসছে, কানের লতি ছুঁয়ে চুলের গোড়ায় গিয়ে থামল। রোজেলিয়া এক অদ্ভুত সমর্পণের ঘোরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
রিভেন তার আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার চিবুকটা সামান্য উঁচু করল, যাতে তাদের চোখাচোখি হয়। রিভেনের হ্যাজেল চোখ দুটোতে এখন এক ধোঁয়াটে জ্বলন। সে রোজেলিয়ার একদম চোখের মণির দিকে তাকিয়ে শীতল কিন্তু তীব্র কণ্ঠে বলল,
“আমার ভোরের আলো... My dawn. জানো রোজ, সারা রাত র'ক্ত আর বারু'দের মাঝে থাকার পর যখন আমি তোমার কাছে ফিরি, তখন মনে হয় আমার সব পা'প এই এক মুহূর্তের শান্তিতে ধুয়ে যাচ্ছে। তুমি কি জানো তুমি কতটা বিপ'জ্জ'নক হয়ে উঠছো আমার জন্য।Do you even have any idea how much you are ruining me my fucking wife?"
_____________
“Come in.”
মার্কো ভেতরে ঢুকল। তার চোখেমুখে রাতের সেই নৃশং'সতা শেষ করার এক প্রশান্তি। সে নিচু হয়ে রিপোর্ট দিল,
“বস, সব ঠিকঠাক শেষ হয়েছে। ইলমোর শরীর এখন সাত ফিট মাটির নিচে। ওর বিশ্বাস'ঘাতকতা ওর সাথেই চাপা পড়ে গেছে।”
রিভেন সিগারের এক দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়ল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে মিশে অদৃশ্য হয়ে গেল, ঠিক যেমন ইলমোর অ'স্তিত্ব আজ নিশ্চিহ্ন। রিভেনের চোখ জানালার বাইরে। প্যারিসের রাস্তাগুলো তখন রোদে ভিজে উঠছে, কিন্তু রিভেনের মনে তখন অন্য খেলা।
“পলিটিক্যাল কন্ট্র্যা'ক্টটার কী খবর?
রিভেন ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল।
“সাইন হবে আজ রাতেই, বস। ডোমিনিক স্কারলেট এর এই ব্রাঞ্চটা এখন পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে। প্যারিসের বাজারে আমাদের ক্ষম'তার ভাগ বসানোর সাহস আর কারো নেই,”
মার্কো উত্তর দিল।
রিভেন ধীরে হেসে উঠল সেই নিচু, পৈশা'চিক হাসি যা শুনলে যে কারো শির'দাঁড়া দিয়ে হিম'স্রোত বয়ে যায়।
“Perfect. সবকিছু নিজের জায়গায় বসছে... ঠিক যেভাবে আমি চেয়েছিলাম। Paris… they call you the city of love. But under my rule, you’ll learn to bleed before you bloom.”
ঠিক সেই মুহূর্তে লরেঞ্জো ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটি ছোট কিন্তু মার্জিত পার্সেল।কালো সিল করা আর সোনালি ফিতেতে বাঁধা। সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পার্সেলটি রিভেনের সামনে রাখল।
রিভেন তার লম্বা আঙুল দিয়ে পার্সেলটির ওপর আলতো স্পর্শ করল। সে লরেঞ্জোর দিকে তাকিয়ে আদেশ দিল,
“লরেঞ্জো, এই পার্সেলটা এখনই মেনশনে পাঠিয়ে দাও। রোজেলিয়ার হাতে পৌঁছে দিও। আর শোনো, শহরের সেরা বিউটিশিয়ান আর পার্লারের মেয়েদের ব্যবস্থা করো। আজ সন্ধ্যায় রোজেলিয়াকে যেন একটা অপার্থিব সেরা সুন্দরীর মতো দেখায়। She must be perfect tonight.”
একটু থেমে রিভেন সিগারের শেষ টানটা দিয়ে ছাইদানিতে ওটা পিষে দিল। তার কণ্ঠ এখন আরও গাঢ়, আরও কর্তৃত্বপূর্ণ।
“Make sure she shines tonight"
___________
মেনশনের লিভিং রুমে সোফায় বসে আছে রিভেন। তার পরনে নিখুঁত ব্ল্যাক টাক্সিডো, সাদা শার্টের কলারটা ঘাড়ের কাছে তলোয়ারের মতো ধারালো। তার চোখ বারবার হাতের দামী ঘড়ির দিকে যাচ্ছে। শান্ত ঘরের নিস্তব্ধতায় তার বুট জুতার ঠক-ঠক শব্দটা যেন কোনো যুদ্ধের ড্রাম বাজছে। রিভেন আরওয়াইন সাধারণত কারো জন্য অপেক্ষা করে না, কিন্তু আজ তার প্রতিটি স্নায়ু এক অদ্ভুত অস্থি'রতায় কাঁ'পছে।
হঠাৎ, ওপরের সিঁড়িতে হিলের মৃদু শব্দ শোনা গেল। রিভেন মাথা তুলে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হলো, সময়ের চাকা থমকে গেছে।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে রোজেলিয়া। তার পরনে রিভেনের পাঠানো সেই কালো মখমলের ড্রেস। মখমলের সেই গভীর কালো রঙ যেন রাতের অন্ধকারকেও হার মানায়। ড্রেসের গায়ে বসানো হাজার হাজার সূক্ষ্ম ডায়মন্ডে মতো পাথরের কাজ মোমবাতির আলোয় নক্ষত্ররাজির মতো জ্বলজ্বল করছে। পোশাকটি তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে এক রাজকীয় মহিমায় ফুটিয়ে তুলেছে। গলায় একটি সাধারণ কিন্তু মহামূল্যবান ডায়মন্ড নেকলেস, যা তার ফর্সা ত্বকে আগুনের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তার ডার্ক ব্রাউন চুলগুলো ঢেউ খেলে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। হালকা মেকআপে তার চোখের চাউনি আজ রহস্যময় লাগছে।
রিভেনের নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে সম্মোহিতের মতো সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক আদিম, হিংস্র মুগ্ধতা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল সিঁড়ির শেষ ধাপের কাছে। রোজেলিয়া যখন তার সামনে এসে দাঁড়াল, রিভেন কয়েক মুহূর্তের জন্য কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। তার কন্ঠস্বর আজ অন্যদিনের চেয়েও গভীর, এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় ভেজা,
“...Breath-taking. I knew you were beautiful, but tonight... you are dangerous, Rose petal”
রিভেন তার শক্ত, উষ্ণ হাতটি বাড়িয়ে দিল। রোজেলিয়া দ্বিধাভরে তার হাত ধরতেই রিভেন এক হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের বুকের একদম কাছে নিয়ে এল। রোজেলিয়ার নরম শরীর রিভেনের শক্ত দেহের সাথে মিশে গেল। রিভেন ঝুঁকে পড়ে রোজেলিয়ার কপালে একটি দীর্ঘ, তপ্ত চুম্বন এঁকে দিল যেন পৃথিবীর সামনে সে তার মালিকানা সিলমোহর করে দিল। তার ঠোঁট রোজেলিয়ার কানের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে উঠল,
“Gorgeous… so fucking gorgeous. আজকের পর এই প্যারিস শহর কেবল তোমার রূপের গল্প করবে।”
রোজেলিয়া কোনো কথা বলতে পারল না, তার ঠোঁটে কেবল এক ম্লান, লজ্জিত হাসি ফুটে উঠল। রিভেন সেই হাসির দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির থাকল, তারপর তার কোমর জড়িয়ে ধরে বাইরের দিকে পা বাড়াল।
“Let’s go, then. আজ রাতটা কেবল আমাদের।”
বাইরে দাঁড়ানো Rolls Royce Boat Tail এর রাজকীয় নীল রঙ রাতের আলোয় চকচক করছে। রিভেন নিজেই ড্রাইভারের সিটে বসল। ইঞ্জিনের গর্জন শুনে মনে হলো কোনো ক্ষুধার্ত বাঘ জেগে উঠেছে। পেছনের সারিবদ্ধ কালো SUV তে এনজো, মার্কো আর লরেঞ্জোর নেতৃত্বে সশস্ত্র গার্ডরা নিঃশব্দে রিভেনের গতি অনুসরণ করতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল বিশ্ববিখ্যাত Le Cinq রেস্তোরাঁয়। সোনালি আলোয় মোড়ানো সেই স্থাপত্যটি যেন কোনো স্বপ্নপুরী। রিভেন নেমে রোজেলিয়ার হাত ধরে তাকে বের করে আনল। বডিগার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে সেই এরিয়া ঘিরে ফেলল।
ভেতরে পা রাখতেই রোজেলিয়া থমকে গেল। বিশাল হলরুম, ক্রিস্টালের ঝাড়লতি, টেবিলের ওপর দামী রুপালি পাত্র আর কয়েকশ লাল গোলাপের স্তূপ কিন্তু কোথাও কোনো মানুষ নেই। শুধু একদল ওয়েটার রোবটের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
“পছন্দ হয়েছে?”
“খুবই সুন্দর... কিন্তু রিভেন, রেস্তোরাঁটা এত খালি কেন? আর কেউ নেই কেন এখানে?”
রোজেলিয়া অবাক হয়ে ফিসফিস করল।
রিভেন তাকে চেয়ার টেনে বসিয়ে দিয়ে তার বিপরীত পাশে বসল। মোমবাতির আলোয় তার হ্যাজেল চোখ দুটো আজ আরও বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে। সে গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে ঢালতে বাঁকা হাসল।
“Because the thought of anyone else seeing you tonight… is intolerable to me, Roselia. আমি চাই না অন্য কোনো পুরুষের দৃষ্টি তোমার এই রূপ স্পর্শ করুক। আজকের জন্য এই পুরো রেস্তোরাঁ আমি বুক করেছি। Only you and me.”
রোজেলিয়া নিশ্বাস আটকে ফেলল।
“আপনি... আপনি পাগল!”
“Yes, I am. Your beauty made me one,”
রিভেন শান্ত গলায় বলল।
টেবিল ভরে উঠল ফরাসি রাজকীয় খাবারে।লবস্টার, ট্রাফল পাস্তা, সুগন্ধি স্যুপ আর দামী ওয়াইন। রোজেলিয়া বিভ্রান্ত হয়ে একটা চামচ হাতে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। সে রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“এত কিছুর কী দরকার ছিল? আপনি সবসময়ই কী এরকম জেদী?”
রিভেন ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিয়ে সামান্য সামনে ঝুঁকে এল। মোমবাতির আলো তার চোয়ালের রেখাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। তার কন্ঠস্বর এখন নিচু,
“Because you need to understand one thing, Rose petal. You are mine… and what is mine, I don’t share with the world. তোমার এই প্রতিটি নিশ্বাস, এই প্রতিটি হাসির ওপর কেবল রিভেন আরওয়াইনের অধিকার। So, don't look around. Just look at me.”
রোজেলিয়া রিভেনের সেই সম্মোহনী চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই মানুষটির অধিকারবোধ থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। প্যারিসের এই জাদুকরী রাতে সে কেবল রিভেনের এক সুন্দর বন্দিনী।
To be continue,,,,,,