#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ১২
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
প্যারিস আজ অদ্ভুত শান্ত।লালচে গোলাপি আলোয় আকাশ যেন রঙিন শিকে মোড়ানো। সূর্য ডুবে যেতেই মেঘগুলো নীলচে আভা ছড়িয়ে দিয়েছে যেন কেউ আঙুল দিয়ে আঁকা জলরঙের ছায়া | নরম গোলাপি আলো ধীরে ধীরে দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে ঠান্ডা, মিষ্টি ফুলের গন্ধ। মেনশনের বাগানটা যেন অন্য জগত ঝোপঝাড়ের ওপর ঝুলে থাকা ছোট ছোট লণ্ঠনের আলো ঝিলমিল করছে। প্রতিটা ফুলের পাপড়ি সেই আলোয় রহস্যময় হয়ে আছে।রোজেলিয়া কাঠের বেঞ্চে বসে আছে। হাঁটুর ওপর হাত রাখা, চোখ আটকে আছে দিগন্তে কিন্তু মন দূরে কোথাও।এনজো তার পাশেই, নিঃশব্দে পাহারাদারের মতো বসে আছে। রোজেলিয়া যখন বাইরে থাকে, এনজো আরেকটা ছায়ার মতো তার পাশে থাকে নিঃশব্দ, সতর্ক| দু’জনের নীরবতার মধ্যে দূর থেকে পাতায় পাতায় বাতাসের শব্দ।
হঠাৎ রোজেলিয়া নরম গলায় বলল,
“Enzo…”
এনজো অবিলম্বে সোজা হয়ে বসে,
“জি ম্যাম, কিছু বলবেন?”
রোজেলিয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। যেন বলার মতো কিছু আছে, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।এনজো আবার নম্রভাবে বলে,
“ম্যাম... কিছু কি প্রয়োজন?”
রোজেলিয়া মাথা নাড়ল,
“না… এমনি।”
আবার নীরবতা।বাতাসে ফুলের গন্ধ ভাসে, কোথাও একটা ফড়িংয়ের ডানা ঝটপট শব্দ।
তারপর রোজেলিয়া আস্তে বলে,
“তুমি... তুমি তো রিভেনকে অনেকদিন ধরে চেনো, তাই না?”
এনজো এক মুহূর্ত থামল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
“হ্যাঁ, ম্যাম. খুব ছোটবেলা থেকেই। যখন বসের বয়স ১৭… ঠিক তখন থেকেই আমি উনার সাথে আছি।”
রোজেলিয়া অবাক হয়ে তাকায়,
“ও আচ্ছা…”
এনজো সামনে তাকিয়ে বলে,
“বসের নিরাপত্তার দায়িত্বে আমাকে বসের বাবা… ইভানো কারুসো… নিজে হায়ার করেছিলেন। তখন আমার বয়স ছিল… মাত্র ২১। নতুন, কাঁচা বয়স… তবুও কাজটা নিয়েছিলাম ”
রোজেলিয়া ধীরে উচ্চারণ করল,
“Evano Caruso…”
এনজো মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়,
“জি, উনি বসের বাবা।”
রোজেলিয়ার কণ্ঠে কৌতূহল মিশে যায়,
“উনি… কি বেঁচে আছেন?”
এনজো সরলভাবে বলে,
“হ্যাঁ ম্যাম. তিনি বেঁচে আছেন। আপনার এখনো তাঁর সাথে দেখা হয়নি।”
রোজেলিয়া একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করে,
“রিভেনের সাথে… তাঁর বাবার সম্পর্ক আছে?”
এনজো মুখ নিচু করে মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ, আছে… কিন্তু সম্পর্কটা খুব একটা ভালো না।বস মাঝে মাঝে তাঁর বাবার সাথে দেখা করেন, কিন্তু… দূরত্বটা সবসময় থাকে।ইভানো কারুসো এখনো ইতালিতেই থাকেন।”
“ইতালির যে বিশাল বাড়িটায় রিভেন থাকে, ওটা কী ওনার বাবার সম্পত্তি?”
এনজো মাথা না না করে,
“না। ওটা বসের নিজের। উনি তাঁর বাবার কোনো সম্পত্তি নেননি। সব শূন্য থেকে বানিয়েছেন। বস যখন ২০, তখন থেকেই crime worldএর সঙ্গে যুক্ত।”
রোজেলিয়া হতভম্ব,
“…Crime world?”
এনজো ধীরে বলল,
“তার বাবার জায়গায় উত্তরসূরি হিসেবে বস এর প্রচণ্ড demand ছিল |বস ২০ বছর বয়স থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ইভানো কারুসো ছিলেন ‘মাফিয়া কিং’। সেই কারণে বসের ওপর শুরু থেকেই অনেক চাপ ছিল অনেক প্রত্যাশা, অনেক দৃষ্টি।"
রোজেলিয়ার শরীর কেঁপে ওঠে সামান্য। এনজোর চোখ দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।
“বস তাঁর প্রথম খুন করেন ২০ বছর বয়সেই।তারপর… কতগুলো হয়েছে তার হিসেব কারো কাছে নেই।”
রোজেলিয়ার আঙুল শক্ত হয়ে যায়। হৃদপিণ্ডটা ধীরে ভয় আর বিস্ময়ে ধুকপুক করে।
এনজো আবার বলে,
“বসের trust issue… খুব গভীর। তিনি কাউকে বিশ্বাস করতেন না। সবাইকে দূরে রাখতেন। কিন্তু… আমি তাঁর পাশে ছিলাম বহু বছর। ধীরে ধীরে… তিনি আমাকে বিশ্বাস করেছেন।”
“ইভানো কারুসোর… সঙ্গে রিভেনের মায়ের কি divorce হয়েছিল?”
এনজো চুপ হয়ে গেল।বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠল যেন।দীর্ঘ নীরবতার পর এনজো বলল,
“না… divorce হয়নি। ম্যাডাম মেহরিন চলে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে… তাদের আর দেখা হয়নি।”
রোজেলিয়া আস্তে বলল,
“…ও।”
হঠাৎ তাদের দু’জনের কথোপকথন থেমে যায় বাগানের দূরের গেটের কাছে কালো SUV থামে। গাড়ির দরজা খুলে রিভেন নামছে।সুটের ওপর রাতের আলো পড়ে তাকে যেন আরও শীতল, আরও ধূসর করে তুলেছে।
তার হ্যাজেল চোখের দৃষ্টি সোজা রোজেলিয়ার দিকে।
রিভেনের ধীর পায়ে এগিয়ে আসে তার ঠিক পিছনেই আরেকটা লম্বা ছায়া এগিয়ে আসে গাঢ় কালো পোশাকে, ঠান্ডা চোখে সাইলাস। এতোদিন রিভেনের পাঠানো কাজে লন্ডনে ছিল।এনজো তাকে দেখে মুহূর্তেই উঠে দাঁড়ায়।
“স্বাগতম তোমাকে,”
এনজোর কণ্ঠে পুরোনো পরিচয়ের উষ্ণতা।সাইলাস ধীরে এনজোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে একটি ছোট সম্মতি, কোনো কথা নয়। তারপর তার দৃষ্টি সরে যায় রোজেলিয়ার দিকে এক সেকেন্ডের জন্য চোখ আটকে যায় পরক্ষণেই সে চোখ ফিরিয়ে নেয় যেন রোজেলিয়ার দিকে তাকানোটা তার অনুমতির বাইরে।রিভেনের হাল্কা গম্ভীর কণ্ঠ,
“সাইলাস।”
সাইলাস আর কিছু না বলে মাথা ঝুকায় । এনজো তাকে নিয়ে বাগানের দিক থেকে সরে যায়।দুইজনের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।রিভেন এগিয়ে আসে।রোজেলিয়া এক পলকও চোখ না ফিরিয়ে বসে আছে কিন্তু তার নিঃশ্বাস ভেতরে ভেতরে কাঁপছে।রিভেন বেঞ্চে বসে তাকে হাত ধরে নিজের কাছে টানে।রোজেলিয়া হঠাৎ ভারসাম্য হারায় আর রিভেনের কোলে এসে পড়ে।রিভেন তার কাঁধে মুখ রেখে গভীর, ক্লান্ত একটা নিশ্বাস ফেলে যেন দিনের সমস্ত রাগ, তীব্রতা আর বন্য উন্মাদনা তার শরীর থেকে ঝরে যাচ্ছে,
“কি করছিলে একা একা? Were you missing me,?"
রোজেলিয়া আড়ষ্ট হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এমনি... আকাশ দেখছিলাম।”
রিভেন ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে তুলল। রোজেলিয়ার কানের লতি ছুঁয়ে তার তপ্ত নিঃশ্বাস বয়ে গেল
"এমনি? "
সে তার হাতে থাকা কালো চামড়ার ফাইলটা রোজেলিয়ার কোলের ওপর রাখল।
“এটা খোলো।”
রোজেলিয়া ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কি?”
“খুললেই দেখতে পাবে। Open it.”
রোজেলিয়া কাঁপাকাঁপা আঙুলে ফাইলের ফিতে খুলল। ভেতরে একটি চকচকে লিগ্যাল ডকুমেন্ট। প্রথম পাতার ওপর সোনালি হরফে বড় বড় করে লেখা ‘LE CINQ Ownership Transfer Document’। আর তার ঠিক নিচে লিগ্যাল ওনারের জায়গায় স্পষ্টাক্ষরে লেখা ‘Roselia arwain'। ইতালিয়ান রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর পদবি গ্রহণ করে, তাই রোজেলিয়া এখন আর চৌধুরী নয়, সে এখন রোজেলিয়া আরওয়াইন।
রোজেলিয়ার নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“এ... এখানে আমার নাম কেন? রিভেন, এটা কি সত্যি?”
রিভেন তার কাঁধে মুখ ঘষে অত্যন্ত শীতল অথচ গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ। এখন থেকে ওই রেস্টুরেন্ট তোমার। The whole place belongs to you.”
রোজেলিয়া স্তম্ভিত হয়ে ঘুরে তাকাল।
“কিন্তু কেন? এত দামী একটা প্রপার্টি আমাকে কেন দিচ্ছেন?”
রিভেন তার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তার হ্যাজেল চোখ দুটোতে এখন আগুনের শিখা,
“কারণ তুমি রিভেন আরওয়াইনের স্ত্রী। You are my queen, Roselia. এখন থেকে এই সুন্দর চোখ দুটো যা দেখবে, যা পছন্দ করবে, তাই তোমার হয়ে যাবে। আমি তোমাকে পুরো প্যারিস কিনে দিতে পারি।”
রোজেলিয়া নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে নিল। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত শিহরণ আর লজ্জার সংমিশ্রণ। রিভেন তার হাতে হাত রাখল,সেই চিরচেনা দাবিদার স্পর্শ। সে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের বিয়ের রাতে তোমাকে কোনো উপহার দেওয়া হয়নি। Consider this as your wedding gift.”
রোজেলিয়া কী বলবে ভেবে পেল না। রিভেন ধীরে ধীরে তার মুখের কাছে ঝুঁকে এল এবং তার কপালে একটি গভীর, দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল। তার ঠোঁটের কোণে এখন এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি।
“কি হলো? Aren’t you happy, Rose petal?”
রোজেলিয়া লাজুক হেসে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ... মানে... অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”
রিভেন তার চোখের গভীরে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“শুধু মুখে ধন্যবাদ দিলে চলবে না। Give me a kiss instead, that’ll be a better payment.”
রোজেলিয়া লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে মাথা নিচু করল। রিভেন তাকে আর অস্বস্তিতে না ফেলে হঠাৎ বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“আইফেল টাওয়ার দেখতে যাবে? "
রোজেলিয়ার চোখে বিস্ময় আর রোমাঞ্চ খেলা করে উঠল। প্যারিসে এসেও আইফেল টাওয়ার সামনে থেকে দেখা হয়নি তার।
“যাবে?”
রিভেন আবার এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
রোজেলিয়া ছোট্ট করে হেসে বলল,
“হ্যাঁ, যাবো।”
রিভেন তার ঠোঁটের কোণে সেই সিগনেচার বাঁকা হাসিটা দিল।
“তাহলে যাও, রেডি হয়ে আসো। Be quick. I don’t like to wait"
______________
গাড়ি হালকা আওয়াজে শহরের রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। রিভেন তার Royce Boat Tail-এর হালকা লাল লেদারের সিটে বসে রোজেলিয়াকে পাশে নিয়েছে। সামনে কালো SUV-তে এনজো ড্রাইভ করছে, সাইলাস আর লরেঞ্জো বসে আছে। পেছনের SUV-তে আরও কয়েকজন বডিগার্ড ধীরে ধীরে ট্র্যাফিক মেলাচ্ছে। সাইলাস জিজ্ঞেস করে,
“বস কখন বিয়ে করলো? আমায় জানালে না যে?”
এনজো সামান্য মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়,
“বস চেয়েছিলেন বিয়ে পুরোপুরি প্রাইভেট রাখতে, আর তুই তখন কাজে ব্যস্ত ছিলে, তাই ডিস্টার্ব করিনি।”
সাইলাস জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
“বিয়েটা কি arrange marriage ছিল?”
Enzo স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“না, force marriage , আফসার চৌধুরীর মেয়ে।”
সাইলাস হালকা চমকিত মুখে বলে,
“আফসার চৌধুরী ? ওকে চিনতে পেরেছি"
পেছনের সিটে লরেঞ্জো এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। সে এবার সামনে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে যোগ করল,
“কিন্তু তোরা কি খেয়াল করেছিস? বস ইদানীং কেমন যেন বদলে যাচ্ছেন! কেমন যেন সফট হয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না?”
এনজো রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে লরেঞ্জোর দিকে ভ্রু কুঁচকাল।
“বদলে যাচ্ছেন মানে? তোর এমন কেন মনে হলো?”
লরেঞ্জো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তির স্বরে বলল,
“আরে ভাই, তুই দেখছিস না? বস এখন প্যারিসে কাজ করতে এসে ম্যামের সাথে ডেটিং নিয়ে ব্যস্ত! আজ রাতে আমাদের সেই বড় ড্রাগ ডিলটা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বস কী করলেন? ডিলটা এক লাথিতে ক্যানসেল করে দিলেন কারণ ম্যামের নাকি এখন আইফেল টাওয়ার দেখার মুড হয়েছে"
এনজো এবার শব্দ করে হেসে উঠল।
“লরেঞ্জো, আসলে সমস্যাটা তোর না। তুই তো সিঙ্গেল ব্রো এই যে ফোর্সড ম্যারেজের আড়ালে যে কী পরিমাণ ইনটেন্স রোমান্স লুকিয়ে থাকে, সেটা বুঝতে গেলে তোকে আগে একটা গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে নিতে হবে।”
লরেঞ্জো পেছনের সিটে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বলল,
“আরে ভাই, আমরা তিনজনই তো এক নৌকার যাত্রী। বস ইতালির সবচেয়ে বড় মাফিয়া ডন হয়েও ঘরসংসার শুরু করে দিলেন, আর আমরা তিনজন এই লৌহমানব হয়ে এখনো একে অপরের কোম্পানি দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। প্রেমের খেলায় আমরা সবাই এখনো সেই বিগ জিরো”
এনজো হেসে যোগ করল,
“একদম ঠিক বলেছিস। আমরা হচ্ছি ইন্টারন্যাশনালি সার্টিফাইড প্রফেশনাল সিঙ্গেলস। আমাদের ডিউটি হলো বসের রোমান্টিক ডেট পাহারা দেওয়া আর নিজেদের মধ্যে পরনিন্দা-পরচর্চা করা!”
লরেঞ্জো আবারও হেসেই খুন।
“হ্যাঁ ভাই, বসের রোমান্স আমাদের কপালে সইবে না। আমাদের নিয়তি হলো সারা জীবন এই বডিগার্ডগিরি করেই কাটানো। "
______________
গাড়ির দরজা নরম ক্লিক শব্দে খুলে যায়।রিভেন প্রথমে নামে কালো সুটের ঝলমলে রেখাগুলো রাতের আলোয় আরও ধারালো, আরও ঠান্ডা দেখায়।রোজেলিয়া আলতো করে পা নামায় লম্বা নীল রংয়ের একটা গ্রাউন পড়া যা পা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। তার ড্রেসের প্রান্ত গাড়ির দরজার ধাতুর ওপর হালকা ঘষে যায় । বাতাসে তার চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে ওঠে।সামনে স্বপ্নের মতো আলোয় ভাসছে আইফেল টাওয়ার।নিচ থেকে ওপরে তাকালে মনে হয় তার হাজারো আলো যেন সোনালী বৃষ্টির মতো ঝরছে। রিভেন ধীরে পেছনে ফিরে রোজেলিয়ার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, অথচ নরম… possessive, কিন্তু তাতে একটা অদ্ভুত কোমলতা লুকিয়ে আছে।সে এক পা এগিয়ে যায়।তার হাত রোজেলিয়ার হাত খুঁজে পায় ঠান্ডা আঙুলগুলোকে নিজের উষ্ণ আঙুলে বন্দি করে।রিভেন নিচু গলায় বলে,
“Look at that Eiffel Tower, Rose… প্যারিসের সব আলো মিলেও আজ তোমার এই সৌন্দর্যের সামনে ফিকে পড়ে যাচ্ছে। You look dangerously beautiful tonight.”
রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। লজ্জার এক গাঢ় আভা তার ফর্সা গালে মেখে গেল। রিভেন সাইলাসের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা চোখে আদেশ দিল,
“এরিয়াটা পুরো সিকিউর রাখো। আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি ডিসটারবেন্স।”
"Yes boss " সাইলাস মাথা ঝুঁকিয়ে সরে দাঁড়াল।
রিভেন রোজেলিয়ার হাত শক্ত করে ধরে টাওয়ারের দিকে পা বাড়াল। তার সেই দখলদারিত্বের স্পর্শে রোজেলিয়া আজ আর ভয় পাচ্ছে না, বরং এক অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব করছে। রোজেলিয়া আইফেল টাওয়ারের ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি লিফটে নয়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাই।”
রিভেন এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল,
“সিঁড়ি? মাঝপথে গিয়ে আবার হাঁপিয়ে উঠবে না তো? My rose petal is quite fragile, you know.”
রোজেলিয়া একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, “ক্লান্ত হয়ে গেলে তো আপনি আছেনই... আমাকে সামলে নেওয়ার জন্য।”
মুহূর্তেই নিজের কথা বুঝতে পেরে জিভে কামড় দিল,
“না… মানে… আমি বলতে চেয়েছিলাম”
রিভেন ওই অপ্রস্তুত লজ্জার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোনে নীরব, গা-ছমছমে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।রোজেলিয়ার গাল লজ্জায় আরও গোলাপি হয়ে গেল। সে মুখ সরিয়ে সিঁড়ির দিকে হেঁটে গেল। রিভেন তার হাত শক্ত করে ধরে পাশে পাশে উঠতে লাগল।ধীরে ধীরে তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলো। বাতাস ঠান্ডা, আলো গাঢ়। আইফেল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে রোজেলিয়া হাঁফিয়ে গেল।সে সিঁড়ির ধাতব রেলিংয়ের পাশে বসে পড়ল।রিভেন চোখ সরু করে তাকাল।
“বলে দিয়েছিলাম হাফাবে।”
রোজেলিয়া নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“অল্প… একটু… বিশ্রাম। আমার এমনিতেও লো-আয়রন শরীর… তাই…”
"লো-আয়রনের অজুহাতে কি এখন সারারাত এখানেই বসে থাকবে?”
রোজেলিয়া কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রিভেন কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই তাকে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
“আরেহ! রিভেন... কী করছেন? নামান আমাকে, লোকজন দেখছে!”
রোজেলিয়া আঁতকে উঠে তার কাঁধ খামচে ধরল।
রিভেন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল।
“তুমিই তো বললে আমি আছি। সো, জাস্ট রিল্যাক্স। তোমার মতো এই পাতলু খানকে কোলে নিয়ে হাজারটা সিঁড়ি বেয়ে উঠা আমার জন্য কফির কাপ তোলার মতোই সহজ। Don’t argue with your husband, Rose.”
“পাতলু খান! আপনি আমাকে এই নামে ডাকলেন?”
রোজেলিয়া অবাক হয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। রিভেন এবার প্রাণখুলে হাসল সেই রুক্ষ অথচ দামী হাসি।
“হ্যাঁ, পাতলু খান। Now stop talking . শ্বাস নাও। আর বাকিটা আমাকে করতে দাও।”
রোজেলিয়া চুপ।শুধু তার হাত রিভেনের কোটের কলারে ধরে আছে সামান্য, তবুও অসহায়ভাবে।রিভেনের পদক্ষেপ Eiffel Towerএর স্টিলের সিঁড়িতে ধীরে ধীরে বাজতে থাকে প্রতি শব্দেই মনে হয় যেন পুরো Paris শুনছে তাদের রাত্রির অদৃশ্য, অঘোষিত উত্তেজনা।রিভেনের ঠোঁটে সেই পরিচিত, ঠান্ডাধাঁধাময় হাসিটা ফুটে ওঠে যে হাসি রোজেলিয়ার বুকের ভেতর ধক করে কেঁপে ওঠে।রোজেলিয়া গলা শুকনো হয়ে যায়।
তার হৃদস্পন্দন রিভেনের বুকের সঙ্গে ঠেকে কঠিন, steady তাল।রোজেলিয়া মৃদু স্বরে বলে,
“লোকজন দেখছে…”
রিভেন চোখের কোনা দিয়ে তাকায়,
“Let them.”
একটা ছোট বিরতি তার কণ্ঠস্বর নিচু, possessive, ও গভীর,
“তোমাকে বহন করা আমার right. তোমার দিকে তাকানো কারও না।”
রোজেলিয়া আর কিছু বলতে পারে না।হাওয়া ঠান্ডা, কিন্তু রিভেনের বাহুর শক্ত উষ্ণতায় সে নিরাপদ অনুভব করে লজ্জা আর এক অজানা অনুভূতি মিলেমিশে তার গাল লালচে জ্বলে ওঠে।রিভেন অবশেষে থামে সে রোজেলিয়াকে মসৃণভাবে ধাতব ফ্লোরের ওপর নামিয়ে দেয়। পুরো শহর যেন নীল অন্ধকারের ভেতর জ্বলজ্বল করছে। প্যারিসের রাতের সেই রহস্যময় আলো রোজেলিয়ার মুখে পড়ে তাকে এক অচেনা ছায়া-সৌন্দর্যে মুড়ে দিচ্ছিল।রিভেন শান্ত গলায় বলল,
“এখান থেকে ৩৬০° ভিউ দেখা যায়।”
রোজেলিয়া নিঃশব্দে রেলিংয়ের কাছে গেল। হালকা রাতের হাওয়া তার গাঢ় ব্রাউন চুলগুলোকে এলোমেলো করে উড়িয়ে দিচ্ছিল। চুলগুলো তার গাল ছুঁয়ে গেলে সে বুঝতেই পারে না মুখ নরম হাসি… তবুও যেন বাতাসের সাথে মিলেমিশে একটু নরম হয়ে যায়।সে ধীরে ধীরে হাত দু’টো ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য সব ভয়, সব শ্বাসরোধ করা টেনশন, সব অন্ধকার যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল।রিভেন দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাকে।
তীব্র দৃষ্টি, অন্ধকারের মতো গভীর… যেন তার নীরবতায় ডুবে যাচ্ছে।তারপর খুব ধীরে, শব্দ না তুলে এক পা… আরেক পা…সে রোজেলিয়ার পিছনে এসে দাঁড়াল।
হঠাৎ তার শক্ত বাহু দু’টো রোজেলিয়ার কোমর ঘিরে ফেলল।রোজেলিয়ার দম আটকায় সে চোখ খুলে ফেলতে চায়, কিন্তু রিভেনের স্পর্শে পুরো শরীর জমে যায়।
রিভেনের ঠান্ডা নিঃশ্বাস তার ঘাড়ের পাশে ছুঁয়ে যায়।তারপর তার গলার পেছনে, ঠিক কানের নিচে…
রিভেন খুব ধীরে… খুবই ধীরে একটা চুমু রাখল।
শহরের হাজার লাইটের মাঝেও যেন সমস্ত কিছু এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে যায়।রোজেলিয়ার হাত দু’টো কাঁপতে থাকে
কিন্তু সে সরে যায় না। রিভেন চোখ বন্ধ করে,
“রোজ... আমি যদি বলি প্যারিসের এই সৌন্দর্য দেখার জন্য সারাজীবন আমি শুধু তোমাকেই পাশে চাই. Would you believe that this monster has finally found his cage?”
রোজেলিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সে কাঁপা গলায় ডাকল,
“...রিভেন...”
রিভেন তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরল।
“আবার বলো। আমার নামটা তোমার গলায় শুনতে খুব নেশাক্ত লাগে। Call me again, Rose.”
রোজেলিয়া চোখ বন্ধ করে প্রায় শ্বাসের সাথে মিলিয়ে বলল, “রি...ভেন...”
রিভেনের ঠোঁটে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল
To be continue,,,,,,,,