ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

১৪তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)

#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক

পর্ব ১৪

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

মিলানের সকালের সেই পরিচিত স্নিগ্ধতা যেন আজ রোজেলিয়ার বাবার বাড়িতেও হানা দিয়েছে। জানালার কাঁচের গায়ে জমে থাকা কুয়াশার বিন্দুগুলো ভোরের প্রথম আলোয় হিরের দানার মতো চিকচিক করছে। পর্দার ফাঁক গলে আসা সোনালি রোদের রেখা ঘরের মেঝেতে এক মায়াবী আল্পনা এঁকে দিয়েছে। দূরে কোথাও ভোরের পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে, যা শহরের যান্ত্রিকতার মাঝেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে আনছে।

​রোজেলিয়া ধীরে ধীরে চোখ মেলল। ঘুমের রেশ তখনও কাটেনি, কিন্তু অবচেতন মনে সে অনুভব করল এক বিশাল ভরসা। সে নড়াচড়া করতে গিয়েই থমকে গেল। তার কোমরের ওপর এক জোড়া শক্ত, উষ্ণ এবং পেশীবহুল বাহু লতার মতো জড়িয়ে আছে। গলার খাঁজে আছড়ে পড়ছে কারো উত্তপ্ত ও নিয়মিত নিঃশ্বাস।

​রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তো রাতে একা শুয়েছিল! ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​ট্যাটুতে ঢাকা সেই শক্তিশালী হাত দুটি তাকে এক নিবিড় মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে। রিভেনের চোখ বন্ধ, দীর্ঘ চোখের পাপড়িগুলো তার গালের ওপর ছায়া ফেলেছে। ঘুমের ঘোরে তার চেহারার সেই চিরচেনা নিষ্ঠুরতা আর আভিজাত্য যেন কিছুটা থিতিয়ে গিয়ে এক দুর্লভ কোমলতা ফুটে উঠেছে। রোজেলিয়া কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মানুষটা কি তবে সত্যিই তাকে ছাড়া থাকতে পারে না? সে বলেছিল কয়েকঘন্টার মধ্যে এসে নিয়ে যাবে তার ভয়ে রোজেলিয়া তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু রাতে কখন চুপিচুপি এসে তার পাশে শুয়ে পড়েছে, সে টেরও পায়নি।

​অত্যন্ত সন্তর্পণে রিভেনের ভারী হাতটি সরিয়ে সে বিছানা থেকে নামল। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতেই রাতের সেই অস্পষ্ট অনুভূতিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে দ্রুত নিচে নেমে এল। রান্নাঘরে তার মা শারমিন চৌধুরী তখন নাস্তার তোড়জোড় করছেন। ভাজা পরোটা আর তরকারির ঘ্রাণে পুরো বাড়ি ম ম করছে।

​রোজেলিয়াকে দেখে শারমিন মৃদু হাসলেন।

“উঠেছিস মা? আয়, বোস।”

​রোজেলিয়া মায়ের পাশে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“আম্মু, রিভেন... রিভেন কখন এসেছে? "

​শারমিন পরোটা উল্টে দিতে দিতে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

“রাত তখন প্রায় দুইটা। কলিং বেলের শব্দে তোর বাবা উঠে দরজা খুলল। রিভেনকে দেখে আমরাও অবাক হয়েছিলাম। ও বলল, কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গেছে আর তুই ঘুমে ছিলি তাই তোকে আর জাগাতে দেয়নি। বেচারা খুব ক্লান্ত ছিল মনে হয়, ঘরে ঢুকেই তোর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।”

​রোজেলিয়া মাথা নিচু করে রইল। মনের ভেতর এক গোপন খুশির ঢেউ খেলে গেল। শারমিন এবার একটু চিন্তিত গলায় বললেন,

“কিন্তু একটা ব্যাপার মা... কাল রাত থেকে দেখছি আমাদের বাড়ির সামনে কয়েকটা কালো রঙের বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটা যমদূতের মতো লোক সারারাত বাইরে টহল দিচ্ছিল। কিছু হয়েছে নাকি?”

​রোজেলিয়া মাকে আশ্বস্ত করে বলল,

“ভয় পেও না আম্মু। ওগুলো রিভেনের বডিগার্ড। রিভেন যেখানেই থাকে, ওরা পুরো এলাকা কব্জায় নিয়ে নেয়। ওটাই ওদের নিয়ম। আমায় নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময়ও দেখলাম ওরা পেছনে পেছনে আসছিল।”

​শারমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“ক্ষমতা আর টাকা থাকলেই যে শান্তি পাওয়া যায় না, এই গার্ডগুলোই তার প্রমাণ। যাই হোক, তুই ওপরে যা। রিভেনকে ডেকে তোল। তোর বাবা ফ্রেশ হতে গেছে, এখনই নাস্তার টেবিলে চলে আসবে। সবাই মিলে আজ অনেকদিন পর একসঙ্গে খাব।”

​রোজেলিয়া সম্মতিতে মাথা নেড়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। রুমে ঢুকে দেখল রিভেন তখনও একই ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। জানালার রোদে তার ডার্ক ব্রাউন চুলগুলো চকচক করছে। রোজেলিয়া খাটের কিনারায় বসে আলতো করে রিভেনের কাঁধে হাত রাখল।

​“এই যে... শুনছেন? উঠুন এবার। অনেক বেলা হয়েছে।”

​রিভেনের কোনো সাড়া নেই। সে যেন এক গভীর নেশায় আচ্ছন্ন। রোজেলিয়া এবার একটু ঝুঁকি নিয়ে তার কাঁধ ধরে হালকা ঝাঁকুনি দিল।

“রিভেন, উঠুন। মা নাস্তা তৈরি করে অপেক্ষা করছেন। সবাই টেবিলে বসে আছে।”

রিভেনের তখনও কোনো প্রকারের সাড়া নেই রোজেলিয়া আবার ডাকতেই ​হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে রিভেনের হাত রোজেলিয়ার কব্জি চেপে ধরল। এক নিমেষেই রোজেলিয়া টাল সামলাতে না পেরে রিভেনের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।

রিভেন তখনও পুরোপুরি চোখ মেলেনি। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা, গাঢ় এবং অদ্ভুত রকমের নেশাক্ত। সে রোজেলিয়ার কব্জিতে তার আঙুলের চাপ আর একটু বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করল,

“কি হয়েছে? Can’t you let me sleep in peace for a few more minutes?”

​রোজেলিয়া তার বুকের ওপর ছটফট করতে করতে বলল, “শান্তিতে তো ঘুমাচ্ছিলেনই কিন্তু মা নাস্তা বানিয়ে নিচে সবার জন্য অপেক্ষা করছেন। রিভেন এখন উঠুন, মা ডাকছে সবাইকে।”

​রিভেন এবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার হ্যাজেল রঙের চোখে তখন ভোরের প্রথম আলোর ঝিলিক আর একরাশ কামুক আলসেমি। সে রোজেলিয়ার রক্তিম মুখের দিকে এক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা, পৈশাচিক অথচ মোহময় বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল।

​সে আরও নিবিড়ভাবে রোজেলিয়াকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল এবং নেশাতুর গলায় বলল,

“If you want me to get out of this bed, then pay the price first, wife. First, give me a morning kiss.”

​রোজেলিয়া চমকে উঠে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার চোখের মণি বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।

“কি? আপনি... আপনি এসব কী বলছেন?

​রিভেন এক ভ্রু উঁচু করল। তার চোখে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক। সে খুব আয়েশ করে বালিশে মাথা রেখে বলল,

“ওহ, আই সি ইংরেজি বোধহয় খুব কঠিন মনে হচ্ছে তোমার কাছে। আচ্ছা, আমি তোমার মাতৃভাষাতেই বলছি যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না থাকে।”

​সে হুট করে রোজেলিয়াকে আরও কাছে টেনে নিল। তার উষ্ণ ও নিয়মিত নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার গালে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে, প্রায় ঠোঁট স্পর্শ করার ভঙ্গিতে বলল,

“আমি বললাম, প্রথমে আমাকে একটা সকালের মিষ্টি চুমু দাও, তারপর আমি নিচে যাব। নয়তো আজ সারাদিন আমি তোমাকে এই বিছানা থেকে উঠতে দিচ্ছি না। Choice is yours, Rose petal.”

রিভেনের সেই নির্লজ্জ দাবিতে রোজেলিয়ার সারা শরীর যেন মুহূর্তেই আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল। সে ছিটকে সরে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাছে দাঁড়াল, তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।

​“না সকাল সকাল এগুলো কী শুরু করলেন আপনি? লজ্জা লাগে না আপনার? নিচে মা-বাবা যদি কিছু শুনে ফেলে, তবে আমি লজ্জায় মুখ দেখাব কীভাবে?”

​রিভেন বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। তার চোখে সেই চেনা ঠান্ডা, নির্লিপ্ত অথচ সম্মোহনী দৃষ্টি। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল,

“লজ্জা কিসের রোজ? তাদের মেয়ে এখন বিবাহিতা? A husband demanding a kiss from his wife is the most natural thing in the world. এতে আকাশ ভেঙে পড়বে না।”

​রোজেলিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে উঠেছে। রিভেন এবার একটু এগিয়ে এসে বিছানার কিনারে বসল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ গভীর এবং গম্ভীর হয়ে এল,

​“And don’t forget Rose, you stole my first kiss on our wedding night. সেই রাত থেকে ওই ঠোঁট দুটো আমার নেশা হয়ে গেছে। That’s my addiction now.”

​সকালের সোনালি আলো রিভেনের ধারালো চোয়ালে পড়ে তাকে আরও বেশি পৌরুষদীপ্ত আর রহস্যময় করে তুলছিল। রোজেলিয়া অপ্রস্তুত হয়ে শুকনো ঢোক গিলল। সে কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“আ-আমি নিচে যাচ্ছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে জলদি উঠে আসুন।”

​সে পা বাড়াতেই রিভেন বিদ্যুৎগতিতে হাত বাড়িয়ে তার কব্জিটা ধরে ফেলল। রোজেলিয়া থমকে দাঁড়াল।

​“কী হলো? সকাল সকাল স্বামীর কাছ থেকে এভাবে পালাচ্ছ কেন? Am I that scary, or are you just too shy?”

​“পালাচ্ছি না! মা ডাকছে, নিচে নাস্তা দিতে হবে,”

রোজেলিয়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল।

​রিভেন এক ঝটকায় তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তার সেই বিখ্যাত পৈশাচিক অথচ আকর্ষণীয় হাসিটা ঠোঁটে ঝুলছে।

“ঠিক আছে... নিচেই তো যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে ‘টোল’ দিয়ে যাও।”

​রোজেলিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“টোল মানে? কিসের টোল?”

​“Morning kiss. এটাই আমার এনার্জি ড্রিংক,”

রিভেন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।

​রোজেলিয়া কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল।

“আপনার বয়স কত? পাঁচ? বাচ্চাদের মতো বায়না করছেন কেন?”

​রিভেন সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে মুখটা শক্ত করল।

“পাঁচ হলে তো ভালোই হতো রোজ এত নাটক না করে এতক্ষণে ডিরেক্ট আদায় করে নিতাম। বাচ্চাদের তো কেউ মানা করে না!”

​“উঠুন এখন! অনেক হয়েছে!”

​রিভেন এবার উঠে দাঁড়িয়ে রোজেলিয়ার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ ছায়া রোজেলিয়াকে ঢেকে দিল। সে রোজেলিয়ার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,

“একটা ছোট্ট চুমু দিলে কি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে? Is it that much to ask for?”

​“হ্যাঁ, হবে! কারণ আমার মা-বাবা নিচে বসে আছেন"

রোজেলিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

​“তারা কি ওপরে এসে চুমু গুনে যাবে? আর সবসময়তো জোড় করেই নি আজ ভালোভাবে বলছি দেখে এমন করছো?”

রিভেন কৌতুকমাখা স্বরে বলল।

​রোজেলিয়া আর সহ্য করতে না পেরে বিছানা থেকে একটা বালিশ তুলে সজোরে রিভেনের মুখে ছুঁড়ে মারল। রিভেন খিলখিল করে হেসে উঠল সেই ভরাট, গভীর হাসি যা সে খুব কম মানুষের সামনে প্রকাশ করে তার এই হাসিটা দেখে রোজেলিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

“আচ্ছা, আচ্ছা... হার মানলাম। এখনই চুমু চাইছি না।”

​রোজেলিয়ার ঘোর কাটলো সে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার সেই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী। রিভেন হঠাৎ আরও কাছে ঝুঁকে এল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার কানে আছড়ে পড়ল। সে মখমলের মতো নিচু গলায় বলল,

​“কিন্তু মনে রেখো... নিচে নাস্তার টেবিলে, যখন কেউ আমাদের দিকে খেয়াল করবে না... ওই সুযোগটা কিন্তু আমি মিস করব না। তোমার ঠোঁট আমার প্রাপ্য, ওয়াইফ। I’ll collect my debt soon.”

​রোজেলিয়া এক মুহূর্তও দেরি করল না। রিভেনের কথার রেশ শেষ হওয়ার আগেই সে প্রায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।সে নিচে নেমে এল, গালের সেই রক্তিম আভাটা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে। রান্নাঘর থেকে শারমিন চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে এল,

“বসো রোজি। রিভেনকে ডাকলিনা? ও কি উঠছে?”

​রোজেলিয়া কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল, “হ-হ্যাঁ আম্মু, আসছে ও।”

​ঠিক তখনই সিঁড়ির ধাপে ধীর আর ভারী পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। রিভেন নেমে এল কালো শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো, চুলে হালকা জলকণা, আর চোখে সেই আভিজাত্যমাখা আলসেমি। রিভেন ডাইনিং রুমে প্রবেশ করলো।

​আফসার চৌধুরী খবরের কাগজ সরিয়ে স্মিত হেসে বললেন,

“শুভ সকাল রিভেন। আশা করি আমার এই ছোট বাড়িতে তোমার ঘুমের কোনো অসুবিধে হয়নি?”

​রিভেন চেয়ার টেনে বসার আগে রোজেলিয়ার দিকে আড়চোখে এক পলক তাকাল। তারপর বেশ শান্ত গলায় উত্তর দিল,

"না বাবা একদমই না। ইভেন ঘুমটা অত্যন্ত পিসফুল ছিল।আপনার মেয়ে পাশে থাকলেতো মরুভূমির বালিতেও স্বর্গীয়

ঘুম হবে।”

শারমিন আর আফসার একে ওপরের দিকে তাকিয়ে নীরবে হাসলো। এদিকে ​রোজেলিয়া মনে মনে প্রার্থনা করল, “হে মাটি, তুমি দুই ভাগ হও, আমি ভেতরে ঢুকে যাই!”

​শারমিন চৌধুরী হাসিমুখে বললেন,

“বসো বাবা, নাস্তা শুরু করো।”

​রিভেন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে রোজেলিয়ার ঠিক পাশের চেয়ারটিতে গিয়ে বসল। রোজেলিয়া অস্বস্তিতে চেয়ারের একদম শেষ প্রান্তে সরে গেল। রিভেন ঝুঁকে এসে অত্যন্ত নিচু স্বরে, কেবল রোজেলিয়া শুনতে পায় এমন ভঙ্গিতে বলল,

“এভাবে সরে গিয়ে দূরত্ব বাড়ালে কিন্তু সবাই বুঝে ফেলবে।”

​রোজেলিয়া দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করল, “কী বুঝে ফেলবে?”

​রিভেন ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“এই যে আমাদের মধ্যে এখন গভীর রোমান্স চলছে।”

​লজ্জা ঢাকতে রোজেলিয়া দ্রুত চায়ের কাপে চুমুক দিতে গেল, কিন্তু চা ছিল ফুটন্ত গরম। জিভ পুড়ে যাওয়ায় সে অস্ফুট একটা শব্দ করে উঠল। শারমিন চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,

“কী হলো রে রোজি? পুড়ে গেছে নাকি?”

​রোজেলিয়া তোতলাতে লাগল,

“না আম্মু... কিছু না... চা-টা একটু বেশি গরম।”

​রিভেন শান্ত গলায় যোগ করল,

“আমি তো আগেই বলেছিলাম ধীরে খেতে। তোমার সব কিছুতেই তাড়াহুড়ো রোজ তাছাড়া স্বামীর পাশে এতো অসস্তি ফিল করার কী আছে।”

​রোজেলিয়া রাগে টেবিলের নিচ দিয়ে তার পা দিয়ে রিভেনের পায়ে জোরে একটা খোঁচা মারল। রিভেনের চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আবার ফিসফিস করল

,

“সবার সামনে গায়ে হাত দিচ্ছ? মানে পায়ে পা মেলাচ্ছ? রাতের বেলা সুদেআসলে হিসেব বুঝে নেব কিন্তু।”

​রোজেলিয়ার শ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। শারমিন চৌধুরী প্রসন্ন চিত্তে জিজ্ঞেস করলেন,

“রিভেন বাবা, কাল রাতে তো অনেক দেরি করে ফিরলে। শরীর ঠিক আছে তো?”

​রিভেন এক মুহূর্ত আফসার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আবার রোজেলিয়ার দিকে ফিরল। অত্যন্ত নির্দোষ মুখে বলল, “আসলে কাজের চাপ ছিল মম, কিন্তু রোজেলিয়ার কাছে না ফিরলে আমার ঠিক ঘুম আসে না।তাই এত রাতেও চলে এলাম”

​রোজেলিয়া বিষম খেল।

“কী... কী বললেন?"

সে টেবিলের নিচে আবার রিভেনের পায়ে লাথি মারল।

​কিন্তু এবার রিভেন পা সরাল না, বরং নিজের শক্ত পা দিয়ে রোজেলিয়ার পা-টাকে পুরোপুরি লক করে দিল।

রোজেলিয়া ফিসফিসিয়ে আর্তনাদ করল,

“পা ছাড়ুন আমার!”

​“এক শর্তে। যদি একটা কিস দাও,” রিভেন নির্ভীকভাবে বলল।

​“কখনোই না! পাগল হয়েছেন?”

​“তবে পা এভাবেই আটকে থাকবে।”

​শারমিন চৌধুরী অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালেন।

“কী ফিসফিস করছো দুজনে মিলে”

​রোজেলিয়া দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“না আম্মু! কিছু না! রিভেন... আসলে ও বলছিল যে মিলানের উওর দিকের তুলনায় এখানকার আবহাওয়াটা অনেক বেশি উষ্ণ!”

​রিভেন এবার শব্দ করে হেসে উঠল গভীর আর পৌরুষদীপ্ত হাসি। সে কফির কাপ তুলে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে বলল,

“হ্যাঁ, আবহাওয়া... গত রাতের সেই শান্ত হাওয়া আর সকালের এই উত্তাপ সবই একদম পারফেক্ট ছিল।”

​রোজেলিয়া কাশতে শুরু করল। আফসার চৌধুরী গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন,

“রিভেন, আমাদের অফিসের নতুন প্রজেক্টের ফাইলগুলো আমি কাল চেক করেছি। তুমি কি চাও ওগুলো আজই ফাইনাল করি?”

​রিভেন সাথে সাথে প্রফেশনাল মোডে ফিরে এল, যদিও তার পায়ের চাপ রোজেলিয়ার ওপর তখনও কমেনি।

“অফিসে গিয়ে কথা বলব বাবা। আপনি আজ একটু রিল্যাক্স করুন। আপনার মেয়েকে পাশে পেয়ে আফটার অল আমিই তো সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছি।”

​আফসার চৌধুরী তৃপ্তির হাসি হাসলেন। রিভেন আবার রোজেলিয়ার দিকে ঝুঁকে এল।

“একটুও চুপ থাকতে পারেন না?” রোজেলিয়া হিসহিস করে বলল।

​রিভেন নিস্পাপ চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল,

“তুমি যদি তোমার ওই সুন্দর ঠোঁট দুটো দিয়ে আমাকে চুপ করাও... তবেই আমি থামতে পারি।”

​রোজেলিয়া তার পা ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু রিভেন তাকে এক চুলও নড়তে দিল না। টেবিলের ওপর রিভেন তখন খুব স্বাভাবিকভাবে কফি খাচ্ছে, আর টেবিলের নিচে রোজেলিয়াকে নিজের প্রেমের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি করে রেখেছে।

​রোজেলিয়া মনে মনে ভাবল, “এই লোকটার সাথে থাকা মানেই প্রতি মুহূর্তে হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে চলা!”

নাস্তা শেষ করেই রোজেলিয়া এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের রুমে চলে এল।

​রুমে ঢুকেই রোজেলিয়া অপ্রস্তুতভাবে বিছানার চাদর টানটান করতে শুরু করল। রিভেন ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে দরজার কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এক বিচিত্র কৌতুক।

​“আপনি... আপনি বসুন না। আমি জাস্ট রুমটা একটু গুছিয়ে নিচ্ছি,”

রোজেলিয়া না তাকিয়েই বলল।

​রিভেন কোনো কথা না বলে ঘরের কোণে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসল। তার তীক্ষ্ণ হ্যাজেল চোখ জোড়া ঘরটি মেপে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল দরজার পাশের একটি ছোট্ট বইয়ের তাকে। সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল এবং তাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

​“আমার বউ যে আস্ত একটা বইয়ের পোকা, সেটা তো জানা ছিল না। "

​রোজেলিয়া বিছানা গোছানো থামিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“না... মানে... ছোটবেলা থেকেই টুকটাক পড়ার অভ্যাস আছে আরকি।”

​রিভেন বইগুলোর ওপর আঙুল বোলাতে লাগল।

“কী কী পড়ো দেখি? কোন ধরণের হিরো তোমার পছন্দ? What kind of man captures your imagination, Rose? আমার মতো কোনো নিষ্ঠুর লোক নাকি গল্পের বইয়ের সেই শান্ত, ভদ্র আর নরম স্বভাবের রাজপুত্ররা?”

​সে কয়েকটা ক্লাসিক উপন্যাসের পাতা উল্টালো। ঘরের নিস্তব্ধতায় কাগজের খসখস শব্দটা যেন রোজেলিয়ার হৃদস্পন্দনের সাথে তাল মেলাচ্ছিল। হঠাৎ রিভেনের হাতটা থেমে গেল। তাকের একদম কোণে রাখা কয়েকটি কালো আর গাঢ় লাল রঙের কভারের বই তার নজরে এল। রিভেন খুব ধীরগতিতে একটি বই তুলে নিল। কভারের আর্টওয়ার্ক আর কয়েক লাইন পড়তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হ্যাজেল চোখে নিমিষেই নেমে এল সেই পরিচিত গা শিরশির করা অন্ধকার।

​“Roselia... what the hell is this?”

রিভেনের কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো ঠান্ডা।

​রোজেলিয়া পেছনে ফিরে রিভেনের হাতে বইটা দেখেই পাথরের মতো জমে গেল। তার বুক ধক করে উঠল।

“ও-ওটা... ওটা জাস্ট একটা ফিকশন"

​রিভেন বইটা বন্ধ করে রোজেলিয়ার দিকে এক পা এগিয়ে এল।

“ফিকশন? You are reading Dark Romance? This stuff is filled with obsession, violence, and fifty shades of pure madness. Really, Rose? এগুলো তোমার ভালো লাগে?”

​প্রতিটি শব্দের সাথে রিভেন এক পা করে এগিয়ে আসছে আর রোজেলিয়া পিছু হটছে। একসময় তার পিঠ দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল। রিভেন তার এক হাত রোজেলিয়ার মাথার পাশে দেয়ালে ঠেকিয়ে তাকে বন্দি করল।

​“এর মধ্যে ঠিক কী খুঁজছো তুমি? Which part of this twisted fantasy attracts you? এই ডমিন্যান্ট মেল ক্যারেক্টারগুলো, নাকি তাদের এই অবসেসিভ ভালোবাসা?”

​রোজেলিয়া চোখ নামিয়ে প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল,

“আমি... আমি তেমন কিছুই খুঁজছি না। শুধু গল্প হিসেবে ভালো লাগে তাই পড়ি।”

​রিভেন আরও ঝুঁকে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস এখন রোজেলিয়ার কানের লতিতে কাঁপন ধরাচ্ছে। সে মখমলের মতো নিচু অথচ হুমকিস্বরূপ গলায় ফিসফিস করে বলল,

“ডার্ক রোমান্স পড়া খারাপ কিছু নয়, রোজ। কিন্তু সমস্যাটা হলো, আমার বউ অন্য কোনো কাল্পনিক পুরুষের ফ্যান্টাসিতে মুগ্ধ হবে তা কি তুমি সত্যিই মনে করো আমি মেনে নেব? Do you think I’ll allow another man, even if he is just ink on paper, to occupy your thoughts?”

​তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে বইটা রোজেলিয়ার চোখের সামনে তুলে ধরল।

“If you want darkness, Rose, look at me. If you want obsession, look at me. তোমার এই বইয়ের হিরোরা যা করে, আমি তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হতে পারি। Don’t let these stories distract you from the reality standing right in front of you.”

রোজেলিয়া কোনোমতে অস্ফুট স্বরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

“রিভেন, ওগুলো তো কেবল কাল্পনিক চরিত্র... স্রেফ লেখকের কল্পনা মাত্র। বাস্তবের সাথে তো এদের কোনো মিল নেই।”

​রিভেন এক মুহূর্ত থামল, তারপর তার দৃষ্টি আরও গাঢ় হয়ে এল। সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,

“কাল্পনিক? তাহলে শোনো রোজ তোমার এই বইয়ের হিরোরা আমার কাছে স্রেফ বাচ্চা। তারা যা বইয়ের পাতায় লিখে করে, আমি তা বাস্তবে করার ক্ষমতা রাখি। তুমি কি সত্যিই চাও আমি তোমার এই সব ডার্ক ফ্যান্টাসি সত্যি করে দিই? তখন হাড়েমজ্জায় টের পাবে ডার্কেস্ট রোমান্স আসলে বইয়ের পাতায় নয়, কতটা ভয়ংকর হতে পারে আমার আলিঙ্গনে”

​রোজেলিয়া দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। রিভেনের মুখ এতটা কাছে যে, তার গরম নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার ঠোঁটে কাঁপন ধরাচ্ছে। হঠাৎ রিভেনের ঠোঁটে সেই রহস্যময় বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল।

​“কী হলো? ভয় পেলে? নাকি কেবল ভাবনার জগতেই তুমি সাহসী আর সামনে ভীত?”

​রিভেন ধীরে ধীরে সরে গিয়ে রোজেলিয়াকে মুক্তি দিল। তার শরীরের সেই তীব্র উষ্ণতা সরে যেতেই রোজেলিয়া একটু হাঁফ ছাড়ল, কিন্তু রিভেনের পরের কথাগুলো তাকে আবার পাথরের মতো জমিয়ে দিল।

​“এখন থেকে,”

সে নিচু অথচ অটল স্বরে বলল,

“এই ধরনের আজেবাজে বই তোমার হাতে যেন আর না দেখি। আর এগুলো... এখনই এই মুহূর্তেই আবর্জনার বাক্সে ফেলে দেবে। I don’t want any other man, even a fictional one, to mess with your head.”

​রোজেলিয়া চোখ বড় বড় করে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল,

“কী! না... এগুলো ফেলা যাবে না। এগুলো আমার সংগ্রহের বই আমার শখের জিনিস আজব!”

​রিভেন এক ভ্রু উঁচিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

“রোজ, তুমি কি এই মাফিয়াকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছো? Do you really want to test my patience?”

​রোজেলিয়ার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“না... মানে... আমি বোঝাতে চাচ্ছিলাম যে বই তো বই-ই। এটা তো স্রেফ শখ...”

“ভালো। তাহলে এগুলো ফেলে দাও। এখনই। আমি নিচে যাচ্ছি, মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি তোমাকে। এই বইগুলো যেন আর আমার চোখের সামনে না থাকে। বোঝা গেছে?”

​রিভেন দরজার দিকে পা বাড়াতেই রোজেলিয়া হঠাৎ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এগিয়ে গিয়ে রিভেনের দুই হাত নিজের ছোট ছোট দু’হাতে শক্ত করে জাপটে ধরল। তার চোখ দুটো ছলছল করছে, কণ্ঠে মিনতি।

​“রিভেন... প্লিজ! আমার কথা একটু শুনুন। ফেলে দেবেন না এগুলো”

​রিভেন থেমে গেল। সে নিজের হাতের ওপর রোজেলিয়ার কোমল হাতের স্পর্শ দেখল, তারপর তার চোখে এক অদ্ভুত ধূর্ততা খেলে গেল। তার ঠোঁটের কোণে অল্প এক পৈশাচিক হাসি উঠে এল। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

​“এত জরুরি এগুলো? কেন এই বইগুলো তোমার কাছে এত দামী রোজ পেটাল?”

​রোজেলিয়া নার্ভাস গলায় একগাদা এক্সকিউজ দিতে লাগল “আসলে এগুলো অনেক আগে থেকে আমার সাথে আছে... এগুলো পড়ার সময় আমি অন্য এক জগতে হারিয়ে যাই... আমার এই টাইপের বই ভালো লাগে আর তাছাড়া বই ফেলে দেওয়া তো ভালো কাজ নয়...”

​রিভেন রোজেলিয়ার কোমরে এক হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে এক ঝটকায় টেনে নিল। তার চোখে এখন এক শয়তানি বুদ্ধি চকচক করছে। সে রোজেলিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে মখমলের মতো মোলায়েম স্বরে বলল,

​“ঠিক আছে রোজ। তোমার কথা আমি রাখতে পারি। ইন ফ্যাক্ট, আমি তোমাকে আরও হাজার হাজার বই কিনে দেব। আমার ম্যানশনে একটা বিশাল লাইব্রেরি আছে, আমি সেখানে তোমার পছন্দের সব ডার্ক রোমান্স বই দিয়ে সাজিয়ে দেব। এমনকি তোমাকে পড়ার অনুমতিও দেব... কিন্তু আমার একটা ছোট্ট শর্ত আছে।”

​রোজেলিয়া কিছুটা আশার আলো দেখে কৌতূহলী চোখে তাকাল।

“কী শর্ত?”

​রিভেনের হাসিটা এবার আরও গভীর আর মদির হয়ে উঠল। সে রোজেলিয়ার গলার খাঁজে নিজের নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,

​“শর্ত হলো তুমি তোমার ওই ডার্ক রোমান্স বইয়ের যে যে সিন বা দৃশ্য পড়বে, সেগুলো এক এক করে আমার সাথে রিয়েল লাইফে রিক্রিয়েট করতে হবে। বইয়ের নায়ক যা যা করবে, আমি তার চেয়েও বেশি তীব্রভাবে তোমার সাথে তা-ই করব। আর তোমাকে সেটা হাসিমুখে মেনে নিতে হবে। রাজি?”

​রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি রিভেন এতটা শয়তান হতে পারে। রিভেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল,

​“বলো রোজেলিয়া আরওয়াইন... ডিল অর নো ডিল? তোমার কাল্পনিক ফ্যান্টাসি কি আমার সাথে বাস্তবে রূপ দিতে তুমি তৈরি?”

রোজেলিয়া রিভেনের বুকের ওপর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। তার গাল এখন লজ্জায় আর অপমানে টকটকে লাল। রিভেনের এই অদ্ভুত আর শয়তানি শর্ত শুনে সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

​“না! কক্ষনো না!”

“আপনি... আপনি দিন দিন জঘন্য হয়ে উঠছেন! এগুলো স্রেফ বইয়ের গল্প, বাস্তবে কি কেউ এসব করে? আর আমি আপনার সাথে ওসব রিক্রিয়েট করতে যাব কেন? অসম্ভব!”

​রিভেন এক চুলও নড়ল না। তার শক্ত বাহুবন্ধন রোজেলিয়াকে লোহার খাঁচার মতো আটকে রেখেছে। সে খুব শান্তভাবে, প্রায় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“ওহ রিয়েলি? জঘন্য? ডার্ক রোমান্স পড়ার সময় তো লেখকের কল্পনাকে খুব এনজয় করো, রোজ। তাহলে সেই একই জিনিস বাস্তবে তোমার স্বামীর সাথে করতে এত আপত্তি কেন? Are you afraid that the reality will be much more addictive than your books?”

​রোজেলিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“আমি কোনো তর্কে যাব না। আমি আপনার এই ফালতু শর্তে রাজি নই। এখন আমাকে ছাড়ুন!”

​রিভেন এবার তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা শীতল আর রহস্যময় হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সে রোজেলিয়ার হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খুব ধীরগতিতে বইগুলোর দিকে হাত বাড়াল।

​“ফাইন। ডিল বাতিল। যেহেতু তুমি আমার শর্ত মানলে না, সেহেতু এই বইগুলোর আর এই ঘরে থাকার কোনো অধিকার নেই।”

​সে বইগুলো হাতে তুলে নিয়ে রুমের জানালার দিকে হাঁটা শুরু করল। রোজেলিয়া আতঙ্কিত হয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল।

​“রিভেন, থামুন! কী করছেন আপনি? এগুলো জানালা দিয়ে ফেলে দেবেন?”

​রিভেন থামল। সে একদম নিচু হয়ে রোজেলিয়ার চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল,

“হয় আমার শর্ত মেনে নাও, নয়তো এক মিনিটের মধ্যে এই সব ফ্যান্টাসি চিরতরে বিদায় করো। I am a businessman, Rose. আমি বিনা লাভে কোনো ডিল করি না। It’s either my way or the trash way. Choice is yours.”

​রোজেলিয়া দেখল রিভেন এক পা-ও নড়বে না নিজের জায়গা থেকে। সে জানে রিভেন কতটা একগুঁয়ে সে যা বলে তা করেই ছাড়ে। একপাশে তার প্রিয় বইগুলো হারানো, আর অন্যপাশে রিভেনের সেই বিপজ্জনক আর লজ্জাজনক শর্ত।

​সে অসহায়ভাবে রিভেনের দিকে তাকাল। রিভেন ঘড়ির দিকে ইশারা করে বলল,

“টিক টক, রোজ... তোমার সময় শেষ হয়ে আসছে। What’s it gonna be? আমার লাইব্রেরির রানি হবে, নাকি এই বইগুলোর কবরের সাক্ষী?”

​রোজেলিয়ার বুক ধকধক করছে। সে দেখল রিভেন জানালার পাল্লা খুলছে। বইগুলো বাতাসের তোড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগেই রোজেলিয়া অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

“দাঁড়ান! আমি... আমি ভাবছি...”

​রিভেন থামল। এক চিলতে বিজয়ের হাসি তার ঠোঁটে।

“ভাবার সময় শেষ। হ্যাঁ না না?”

রোজেলিয়া মাথা নিচু করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার বুকের ভেতরটা যেন একটা রণক্ষেত্র একদিকে প্রিয় বইগুলো হারানোর ভয়, অন্যদিকে রিভেনের সেই ভয়ংকর নেশাক্ত শর্ত।

​দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর রোজেলিয়া খুব ক্ষীণ, প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল,

​“ঠিক আছে... আমি... আমি রাজি।”

​রিভেনের হাতের আঙুলগুলো বইয়ের কভারের ওপর স্থির হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে জানালার পাল্লাটা বন্ধ করে রোজেলিয়ার দিকে ঘুরল। তার চোখে এখন এক বিজয়ী শিকারির তৃপ্তি। সে এক পা এগিয়ে এসে রোজেলিয়াকে আবার দেয়ালের সাথে তার বাহুবন্ধনীতে বন্দি করে ফেলল।

​“খুবই বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছ, রোজ পেটাল”

রিভেন ফিসফিস করে বলল “I knew you couldn't resist the temptation.”

​রোজেলিয়া মুখ না তুলেই বলল,

“কিন্তু আপনার শর্তটা খুব অন্যায়। আমি শুধু রাজি হয়েছি যাতে আপনি বইগুলো ফেলে না দেন।”

​রিভেন তার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যাতে রোজেলিয়া বাধ্য হয় তার ওই সম্মোহনী হ্যাজেল চোখের দিকে তাকাতে।

​“অন্যায় না কি ন্যায়, সেটা পরের ব্যাপার। এখন থেকে তোমার প্রতিটি বইয়ের পাতা হবে আমাদের স্ক্রিপ্ট। And remember, wifey, I am a very demanding director. তোমার বইয়ের হিরোরা হয়তো এক চ্যাপ্টারে একবারই ডমিন্যান্ট হয়, কিন্তু আমি তোমাকে প্রতিটা সেকেন্ডে মনে করিয়ে দেব যে তুমি কার দখলে।”

​রোজেলিয়া কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আপনি এখন নিচে যান”

​রিভেন একটু বাঁকা হাসল। তার দৃষ্টি রোজেলিয়ার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে স্থির হলো।

​“নিচে তো যাবই। তবে ডিল যখন সই হয়ে গেছে, তখন একটা অ্যাডভান্স তো আমার প্রাপ্য, তাই না?”

​রোজেলিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিভেন তার হাতের বইটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিল এবং বিদ্যুৎগতিতে রোজেলিয়ার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

​“কী করছেন?”

রোজেলিয়া অস্ফুট স্বরে আপত্তি করার চেষ্টা করল।

​রিভেন তার কানের পাশে মুখ নিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,

“তোমার ওই বইয়ের নাম যেন কী ছিল? ‘Bound by Obsession’? চলো, তার প্রথম সিনটা একটু ট্রায়াল দেওয়া যাক। Don’t close your eyes, Rose. Look at the man who is going to make your fantasies a living nightmare... or a beautiful dream.”

​রোজেলিয়ার সারা শরীর জমে গেল। রিভেনের এই ডার্ক রোমান্সের নেশা তাকে কোন অতল গভীরে নিয়ে যাবে, তা ভেবেই তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

​রিভেন তার ঠোঁটের খুব কাছে এসে ফিসফিস করল,

“এখন থেকে তোমার ওই কাল্পনিক হিরোদের ভুলে যাও। From now on, I am your only hero... and your only villain.”

To be continue,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন