#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ১৭ (প্রথমাংশ)
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
রিভেন অফিসে বসে আছে। টেবিলের উপর ছড়ানো কালো ফাইল, নিস্তেজ আলোয় তার ধারালো চোখ দুটো আরও বেশি কঠোর দেখাচ্ছে।ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।স্ক্রিনে ভেসে উঠে Evano caruso. রিভেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে থেকে অত্যন্ত ধীরগতিতে রিসিভ করল,
“কী,চাই”
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক অত্যন্ত ধীর কণ্ঠস্বর। ইভানো কারুসো মানুষটা কথা বলার সময় প্রতিটি শব্দ যেন মেপে মেপে উচ্চারণ করে।
“এটা কী বাবার সঙ্গে কথা বলার ধরণ রিভেন? ইতালির মাফিয়া প্রিন্স কি কেউ গ্রীটিং দেওয়া শেখায়নি? অন্তত একটা হ্যালো তো আশা করতে পারি।”
রিভেন বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে চেয়ারের হেডে মাথা ঠেকালো।
“যদি তোমার সস্তা ড্রামা শেষ হয়ে থাকে, তবে মূল কথায় এসো। আমি ব্যস্ত, অহেতুক সময় নষ্ট করার মতো বিলাসিতা আমার নেই।”
ওপাশে একটা হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল তাচ্ছিল্য আর উপহাসে ভরা।
“ব্যস্ত? তোমার মতো ছেলের ব্যস্ততার খবর আমার ভালো করেই জানা আছে। যাই হোক... কাজের কথাই বলি। আজ রাত ৯টায় তুমি কারুসো ম্যানশনে আসবে।”
রিভেন ভ্রু কুঁচকে যায়।
“ কেন?”
ইভানো গম্ভীর হয়ে বলল,
“একটি বড় ডিল চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। Moreno Syndicate এর সাথে আমাদের একটা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হবে। তাদের প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত থাকবে। আমি চাই তুমি নিজে থেকে সবটা হ্যান্ডেল করো।”
রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
“ডিলটা তোমার স্বার্থে হচ্ছে, সো তুমিই সামলাও। আমার কাজ আছে, তোমার ওই পুরোনো সিন্ডিকেটে আমার কোনো আগ্রহ নেই। ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম।”
ওপাশে ইভানোর স্বর এবার গম্ভীর থেকে হিমশীতল চাপে পরিণত হলো। “এই ডিলটা শুধু আমার নয়, এটা পুরো কারুসো সাম্রাজ্যের।আর তুমি ভুলে যেও না রিভেন, তোমার ধমনীতে এখনো আমারই রক্ত বইছে যতই তুমি নিজেকে আলাদা করার ভান করো না কেন তোমার শরীরে এই পাপিষ্ঠ রক্তই বইছে। তাই তুমি আসবে কারণ আমি আদেশ দিয়েছি।”
রিভেনের চোখের দৃষ্টি এখন পাথরের মতো নিথর। ইভানো কিছুক্ষণ থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে যোগ করল,
“আর শোনো... একা আসবে না। সাথে তোমার স্ত্রীকেও নিয়ে আসবে। রোজেলিয়া, তাই তো? এখনো তো আমার পুত্রবধূর সাথে সামনা-সামনি আলাপটাই হলো না। কারুসো পরিবারের অন্দরমহলে কে ঢুকছে, সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”
এক মুহূর্তে রিভেনের মুখের সব রঙ বদলে গেল। হাতের ধরা ফোনের বডিটা যেন তার আঙুলের চাপে মড়মড় করে উঠল। তার কপালে নীল শিরাগুলো টানটান হয়ে ভেসে উঠেছে।
রিভেন হিমশীতল, দমিয়ে রাখা রাগে কড়মড় করতে করতে বলল,
“...রোজেলিয়াকে তোমার ওসব নোংরা খেলার মধ্যে একদম টানবে না আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি।তোমার মতো একজন মানুষের সামনে আমার স্ত্রীকে দাঁড় করানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই।”
ইভানো নির্বিকার স্বরে জবাব দিল,
“ সে এখন কারুসো পরিবারের পুত্রবধূ তাকে দেখার অধিকার আমার আছে। তাছাড়া তাকে আড়ালে রাখা মানে কারুসোদের অপমান।Take her with you. It’s an order, Riven. And you know I don't like to repeat my orders.”
রিভেনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। তার গলার নিচু স্বর এখন ঘূর্ণিঝড়ের আগের সেই গুমোট নীরবতার মতো।,
“আমার জীবনের সব নিয়ম কী তুমি নির্ধারণ করবে। ওকে এই অন্ধকার জগতের ছায়াও ছুঁতে দেব না আমি।”
ইভানো ঠান্ডা সুরে বলে উঠল, “নিয়ম আমি ঠিক করি বলেই কারুসো নামটা এখনো মাথা উঁচু করে টিকে আছে রিভেন। রাত ৯টা। মনে থাকে যেন।”
ফোনটা কেটে গেল। রিভেন এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর সর্বশক্তি দিয়ে ফোনটা মার্বেল টেবিলের ওপর ছুঁড়ে মারল। প্রচণ্ড ধাতব শব্দে পুরো রুমটা যেন কেঁপে উঠল। তার ভেতরে তখন আগ্নেয়গিরি ফুটছে।
___________
রুমের হলুদাভ আলোয় রোজেলিয়ার মুখটা আয়নার কাচে বড্ড ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। সারাটা দিন এক অসহ্য মাথাব্যথায় সে কুঁকড়ে ছিল। নাইলার দেওয়া ডালিমের জুসটা খেয়ে একটু আরাম বোধ করলেও শরীরটা এখনো অবসন্ন। ঠিক তখনই দরজার বাইরে সেই সুপরিচিত ধীর এবং ভারী পায়ের শব্দ।
আয়নায় প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল রিভেনের। পরনে কুচকুচে কালো শার্ট, চোখমুখ পাথরের মতো শক্ত। সে রোজেলিয়ার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি হলো।
“রেডি হয়ে নাও, আমাদের বেরোতে হবে,”
রিভেনের কণ্ঠস্বর আজ স্বাভাবিকের চেয়েও গম্ভীর।
রোজেলিয়া চিরুনিটা হাতে নিয়েই আয়নার দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত স্বরে বললো,
“কোথায় যাব আমরা? শরীরটা আজ খুব একটা ভালো লাগছে না।”
রিভেন দৃষ্টি সরাল না। কেবল ছোট করে উত্তর দিল,
“গেলেই দেখতে পাবে। দ্রুত করো।”
রোজেলিয়া এবার পুরোপুরি ঘুরে বসল। রিভেনের চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে, যেন ভেতরে কোনো এক আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ার অপেক্ষায়।
“আপনার আজ হয়েছেটা কী? এত গম্ভীর কেন? কোনো সমস্যা কি হয়েছে?”
প্রশ্নটা শোনামাত্র রিভেনের চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সব কথায় কি তোমাকে আমার কৈফিয়ত দিতে হবে রোজ? তোমাকে যা বলেছি, সেটুকুই করো। অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল আমার পছন্দ নয়।”
রোজেলিয়া পরিস্তিতি বুঝতে না পেরে ঠোঁট উল্টে বিরক্তির সাথে বলল,
“আপনার মুড সুইং তো দেখি আজকাল প্রেগন্যান্ট মহিলাদেরও হার মানায়। এই ভালো, তো এই একদম আকাশ থেকে পড়া বজ্রপাত। হঠাৎ কী হলো আপনার?”
রিভেনের শীতল চাউনি রোজেলিয়ার ওপর স্থির হলো।
চোখে কড়কড়ে শীতলতা।
“কি বললে তুমি?”
রোজেলিয়ার হাসি মিলিয়ে যায়।
“…না… মানে, কিছু না।”
রুমে এক ভয়াবহ নীরবতা নেমে এল। রোজেলিয়া আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চিরুনিটা রেখে ড্রেসিং রুমের দিকে প্রায় দৌড় দিল।
________
সন্ধ্যায় গাড়িটা যখন কারুসো ম্যানশনের বিশাল গেটের সামনে থামল, রোজেলিয়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। কালো লোহার ওপর স্বর্ণমণ্ডিত কারুসো ক্রেস্টটা হেডলাইটের আলোয় ঝলমল করছে। ভেতরকার রাস্তাটা সাইপ্রেস গাছে ঘেরা, ঠিক যেন কোনো রাজকীয় দুর্গের প্রবেশপথ। সামনে দাঁড়ানো অফ-হোয়াইট মার্বেলে তৈরি এক সুবিশাল প্রাসাদ।
গাড়ি থামতেই রিভেন নেমে এসে রোজেলিয়ার জন্য দরজা খুলে দিল। তার শক্ত হাতের মুঠোয় রোজেলিয়ার ছোট হাতটা বন্দি। সিঁড়ির দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেইডরা মাথা নিচু করে বলল,
“ওয়েলকাম স্যার।”
রিভেন কোনো প্রতিত্তর না দিয়ে রোজেলিয়াকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
দশ ফুট উঁচু সিলিং থেকে ঝুলন্ত ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর দেয়ালে ঝোলানো প্রাচীন অয়েল পেইন্টিং দেখে রোজেলিয়ার শ্বাস যেন আটকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল সামনের আইভরি সোফায় বসা সেই মানুষটির ওপর। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স হলেও শরীরে এক অদ্ভুত পৌরুষদীপ্ত তেজ। তীক্ষ্ণ হ্যাজেল চোখ ঠিক রিভেনের মতো। ঠোঁটের কোণে এক হিসেবি, ঠান্ডা হাসি।
এভানো কারুসো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। । সে রিভেনের সামনে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বললো ,
“Welcome home son"
কণ্ঠস্বর নরম কিন্তু নরমতার নিচে আছে পাথরের ঠান্ডা।
রিভেনের মুখ তৎক্ষণাৎ শক্ত হয়ে যায়।জড়ানো হাত থেকে নিজেকে আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়েছে সে।
“কি ব্যাপার?”
ইভানো ধীরে ধীরে বলে,
“এখনো কি বাবার আলিঙ্গনটা সহ্য হয় না তোমার?নাকি অফিসে এত ‘ডিল’ সামলে এসেছো যে আবেগ হজম করতে পারছো না?”
রিভেন দাঁত চেপে বলে,
“অনর্থক মন্তব্য রেখে দাও।”
ইভানো দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলে,
"আমি অনর্থক মন্তব্য করছি?"
সে দু’কদম এগিয়ে আসে।
“তোমার কাছে আবেগ বিলাসিতা হতে পারে রিভেন, কিন্তু রক্ত কোনোদিন মিথ্যা বলে না। তুমি যতই অস্বীকার করো, এই দেয়ালগুলো জানে তুমি কার উত্তরসূরি।”
রিভেন গলা আরও নিচু করে বলল,
“পুরোনো কাহিনী নিয়ে এখানে ঘাঁটতে আসিনি। সোজা কথায় আসো। সেই ডিলটা কী?”
এভানো দু’পা এগিয়ে এল। মার্বেল মেঝেতে তার জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
“মরেনো সিন্ডিকেট আমাদের সাথে হাত মেলাতে চাইছে। বিশাল শিপমেন্ট, নতুন রুট আর ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। আর এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে আমার ছেলের উপস্থিতি অনিবার্য ছিল।”
রিভেন চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আমি তোমার উত্তরসূরি নই । আমি কেবল রিভেন আরওয়াইন।”
ইভানো হো হো করে হেসে উঠল, তবে সে হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
“নাম পরিবর্তন করা যায় রিভেন, কিন্তু জিন নয়। এই যে তোমার চোখের ওই খুনি দৃষ্টি সেটা আমারই দান এমন কী এই হ্যাজেল রংটা ওতো আমার ।”
এরপর ইভানোর চোখ ঘুরে গেল রোজেলিয়ার দিকে। সেই মূল্যায়নকারী দৃষ্টিতে রোজেলিয়া অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেল। ইভানো এগিয়ে এল তার সামনে।
“এটাই নিশ্চয় তোমার স্ত্রী?”
“জি… আমি রোজেলিয়া।”
এভানো তার দিকে এক ধাপ এগিয়ে এসে অত্যন্ত মাপা স্বরে বলল,
“বসো মা। আজ অনেক দিন পর এই প্রাসাদে প্রাণ ফিরে এসেছে। তুমি কারুসো ফ্যামিলির বউ, তোমার সাথে পরিচয় হওয়াটা তো কেবল শুরু। রিভেন হয়তো তোমাকে আগলে রাখতে চায় কিন্তু মনে রেখো কারুসোদের রক্তে যা আছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। বসো আমরা পরিচিত হই।”
“Enough.”
রিভেম ঠান্ডা গলায় ঘরটা জমিয়ে দেয়।
“আমরা এখানে পরিবারিক নাটক করতে আসিনি।তোমার মরেনো সিন্ডিকেটের অতিথিরা কোথায়?”
এভানোর ঠোঁটে আরেকটা হাসি খেলে যায় তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক।
“ তাই তো, আজকাল ব্যবসায়িক আলোচনা ছাড়া তোমার আর কিছুই সহ্য হয় না। গেস্টরা উপরে কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছে। তবে তোমার এই স্নিগ্ধ স্ত্রীকে তো আর ওই রক্তমাখা আলোচনার টেবিলে নেওয়া যাবে না।”
রিভেন পাশেই দাঁড়ানো এক মেইডকে নির্দেশ দিল,
“ওকে আমার রুমে নিয়ে যাও।”
রিভেনের ভারি বুটের শব্দ মেঝের মার্বেলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে যখন সে এভানো ক্যারুসোর পাশে দিয়ে সিঁড়ির দিকে ওঠে।রোজেলিয়া পেছনে দাঁড়িয়ে দেখে রিভেন আর তার বাবা দু’জনেই একসাথে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে গ্র্যান্ড সিঁড়ির মোড়ে…আর মেইড নরম স্বরে বলে,
“Please, ma’am… this way.”
____________
মেনশনের দ্বিতীয় তলার সেই বিশাল কাচ-ঘেরা কনফারেন্স রুমটি এখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। দেয়ালে ঝোলানো ইউরোপীয় পেইন্টিংগুলোর প্রাচীন আভিজাত্যও রিভেনের ভেতরের উত্তাপ কমাতে পারছে না। সিলিংয়ের ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়া ঠান্ডা আলোয় গোল টেবিলের চারপাশে বসা কালো স্যুট পরা মানুষগুলোকে যমদূতের মতো দেখাচ্ছে।
এভানো ক্যারুসো ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে প্রধান চেয়ারে বসলেন, আর রিভেন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল বসার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করল না সে। টেবিলের ঠিক ওপাশে বসে আছে মোরেনো সিন্ডিকেটের প্রধান ডোনাটো মোরেনো। তার হাতে জ্বলন্ত সিগার, চোখে এক ধূর্ত শিকারির কুটিল চাউনি।
ডোনাটো সিগারের ধোঁয়া রিভেনের দিকে উড়িয়ে দিয়ে বিদ্রূপের স্বরে বলল,
“অবশেষে... ক্যারুসো সাম্রাজ্যের সেই বহু প্রতীক্ষিত রাজপুত্রের দেখা মিলল। তবে শুনেছি রাজপুত্রের মেজাজ নাকি তার বাবার চেয়েও বেশি চড়া?”
রিভেন কোনো অভিবাদন জানাল না। তার দৃষ্টি ডোনাটোর গলার কাছে স্থির, যেন শিকারের ধমনী খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে পাথর শীতল কণ্ঠে বলল,
“সময় নষ্ট করার জন্য আমি এখানে আসিনি, ডোনাটো। তোমার প্রস্তাব কী, সেটা স্পষ্ট করো।”
ডোনাটো সিগারটা এসট্রেতে ঘষে হাসি চেপে বলল,
“আমাদের ডিলটা খুব সহজ। তোমাদের পূর্ব ডক্সের নিয়ন্ত্রণ এক মাসের জন্য আমাদের সিন্ডিকেটকে ছেড়ে দেবে। তার বদলে তোমরা পাবে আমাদের আন্তর্জাতিক অস্ত্রের রুট ব্যবহারের অবাধ সুযোগ। কী বলো? ডিলটা কি খুব খারাপ?”
রুমের তাপমাত্রা যেন নিমিষেই শূন্যের নিচে নেমে গেল। রিভেন এক পা এগিয়ে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার দুচোখে তখন খুনি অন্ধকারের ছায়া।
“পূর্ব ডক্স? আমার রক্তের বিনিময়ে গড়া এলাকা তুমি ভাড়ায় চাইছ? ডোনাটো, তুমি কি ভুল করেছ নাকি তোমার মৃত্যুঘণ্টা বাজার সময় হয়েছে? আমাকে কি তোমার ভিখারি মনে হয় যে অন্যের উচ্ছিষ্ট রুটের বদলে নিজের সাম্রাজ্যের চাবি তুলে দেব?”
ডোনাটো এবার শব্দ করে হেসে উঠল, যা ছিল স্পষ্ট অপমান। “আরে রিভেন, এত গরম হয়ে লাভ কী? সবাই জানে ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি কার হাতে। এভানো সিনিয়র এখনো জীবিত, আর তুমি স্রেফ তার ছায়া। বাবা রাজি থাকলে ছেলের মতামত কি খুব বেশি জরুরি? You are just a name, kid. The real power sits right beside you.”
রিভেনের ধৈর্যের বাঁধ ছিঁড়ে গেল। অপমান আর ক্রোধের এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল তার ভেতরে। সে বজ্রগতিতে ক্রিস্টাল টেবিলের ওপর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে থাবা মারল। ভয়ংকর সেই শব্দে ঘরের প্রতিটি কোণ কেঁপে উঠল। মোরেনোর গার্ডরা আতঙ্কিত হয়ে কোমরে হাত রাখল, কিন্তু রিভেনের সেই উন্মাদ রাগ দেখে কেউ এক পা এগোনোর সাহস পেল না।
রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“আর একটা শব্দ ডোনাটো... আর একবার যদি আমার আর আমার বাবার ক্ষমতার তুলনা করার দুঃসাহস দেখাও, তবে কথা দিচ্ছি কাল সকালে তোমার সিন্ডিকেটের প্রতিটি সদস্যের লাশ ওই ডক্সের নোনা পানিতে ভাসবে। আমি ড্রয়িংরুমে বসে রাজনীতি করি না, আমি সরাসরি জাহান্নামে পাঠিয়ে হিসেব চুকাই”
রিভেনের কণ্ঠস্বর তখন কেবল রাগ নয়, এক অমানবিক খুনের নেশায় কাঁপছিল। তার হ্যাজেল চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে, আর কপালে ফুটে ওঠা নীল শিরাগুলো তার চরম উত্তেজনার সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
ডোনাটো মোরেনো কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলতে শুরু করল,
“রিভেন, আমি তো জাস্ট একটা ফ্যাক্ট বলছিলাম... বিজনেস ওয়ার্ল্ডে সবাই জানে ”
“চুপ!”
রিভেন বাঘের মতো গর্জে উঠল। সে টেবিলের ওপর রাখা ডোনাটোর কাঁচের গ্লাসটা এক ঝটকায় ফ্লোরে আছাড় মারল। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
“ফ্যাক্ট? ফ্যাক্ট হলো এই যে, তুমি আমার বাবার সাথে ডিল করার নাম করে আমার এলাকায় ঢুকতে চাইছ। তুমি ভাবছ ইভানো ক্যারুসোকে রাজি করালেই ডক্স তোমার হয়ে যাবে? ভুল করছ ডোনাটো, বড় ভুল করছ!”
সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে ডোনাটোর কলারটা এক হাতে শক্ত করে জাপটে ধরল। রিভেনের চোখে তখন এক ভয়াবহ উন্মাদনা।
“ইভানো ক্যারুসো হয়তো এই সাম্রাজ্যের পত্তন করেছে, কিন্তু এই সাম্রাজ্যের যমদূত আমি। আমার পারমিশন ছাড়া ডক্সের একটা বালুকণাও নড়ে না। তুমি আমার ইগোকে আঘাত করেছ, আমার নামকে ছোট করেছ এখন এর খেসারত দিতে তৈরি হও।”
এভানো ক্যারুসো এবার শক্ত গলায় বললেন,
“রিভেন! ওকে ছেড়ে দাও! বিজনেস মিটিং-এ এসব কি হচ্ছে?”
রিভেন তার বাবার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল।
“বিজনেস মিটিং? ড্যাড, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না এই লোকটা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার ছেলেকে ইনসাল্ট করছে? সে ভাবছে তুমি থাকলে আমি স্রেফ একটা পুতুল! আই এম নট ইওর শ্যাডো"
সে ডোনাটোকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চেয়ারে ফেলে দিল। ডোনাটোর বুক ধকধক করছে, সে বুঝতে পেরেছে রিভেনের সীমার বাইরে চলে যাওয়া মানেই তার মৃত্যু নিশ্চিত।
রিভেন দরজার দিকে দু'পা গিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল। সে পেছন ফিরে পুরো রুমের সবার দিকে এক নজর তাকাল,
“আজকের পর যদি কোনোদিন মোরেনো সিন্ডিকেটের কোনো কুত্তার ছায়াও আমার এলাকায় পড়ে, তবে আমি কথা দিচ্ছি আমি নিজে হাতে তোদের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেব। আর ড্যাড...”
সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “এই ডিল যদি তুমি কন্টিনিউ করো, তবে আমাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হবে। এন্ড আই প্রমিজ ইউ, আই উইল বার্ন এভরিথিং ডাউন বিফোর আই লেট হিম টাচ মাই ডকস!”
রিভেন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে কনফারেন্স রুমের বিশাল ওক কাঠের দরজাটা এক প্রচণ্ড লাথিতে খুলে ফেলল। দরজার পাল্লা দুটো দেয়ালের সাথে লেগে বিকট শব্দ হলো। করিডোর দিয়ে সে যখন ঝড়ো গতিতে হাঁটতে শুরু করল, তার ভারী বুটের শব্দে পুরো ম্যানশন যেন থরথর করে কাঁপছিল।তার শরীরের প্রতিটি পেশি তীরের মতো টানটান, নিশ্বাস থেকে যেন আগুনের হল্কা বেরোচ্ছে। ভেতরে জমাটবদ্ধ অপমান আর ক্রোধ যখন আর সহ্য হলো না, তখন সে দাঁতে দাঁত চেপে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।
করিডোরের মোড় ঘোরার সময় সামনে যে ফুলদানিটা ছিল, সেটাকে সে এক ঘুষিতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল।তারপর
তার ডান হাতের সর্বশক্তির আঘাত গিয়ে লাগল শক্ত মার্বেল দেয়ালে। মার্বেলের মসৃণ গায়ে চওড়া ফাটল ধরে গেল। রিভেনের হাতের রক্তাক্ত গাঁট থেকে লাল রক্ত চুইয়ে মার্বেলের ওপর গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে থামল না।তার মাথা নিচু, কপালে ঘাম আর রক্তের মাখামাখি। ঠিক সেই মুহূর্তেই রোজেলিয়া করিডোরের ওপাশ থেকে এই হাড়হিম করা শব্দ শুনে ছুটে এল।
রক্তাক্ত দেওয়াল আর রিভেনের এই বন্য রূপ দেখে রোজেলিয়ার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে দেখল রিভেন এক হিংস্র জন্তুর মতো ফুঁসছে। রোজেলিয়া এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল, তারপর বুকভরা উদ্বেগ নিয়ে ধীরে ধীরে রিভেনের দিকে এগিয়ে এল।
সে অত্যন্ত কোমল স্বরে ডাকল,
“রিভেন...”
রিভেন মাথা তুলল না। তার কণ্ঠ থেকে এক ভয়ংকর গর্জন বেরিয়ে এল,
“Stay back, Rose! পিছু হটো!”
রোজেলিয়া থামল না। সে আর এক কদম এগিয়ে এল। “তোমার হাত... রিভেন, তোমার হাত থেকে রক্ত পড়ছে।”
রিভেন এবার ঝটকা দিয়ে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো টকটকে লাল । সে রোজেলিয়ার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে ভুলে গেছে রোজেলিয়া কে। তারপর দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“কাছে এসো না। এখন নয়,দূরে থাকো আমার থেকে। এই মুহূর্তে আমার ভেতরে যে দানবটা আছে, সে কাউকেই চেনে না। এমনকি তোমাকেও না।”
রোজেলিয়া আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা ফুলদানির টুকরোর ওপর দিয়ে পা টিপে টিপে সে এগিয়ে গেল। রিভেন তখন পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভারী নিশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করছিল। রোজেলিয়া অসীম সাহসে তার পেছনে গিয়ে রিভেনকে আস্তে করে জড়িয়ে ধরল।
এক সেকেন্ডে রিভেনের পাথরখচিত শরীর শক্ত হয়ে গেল। রোজেলিয়া কোনো কথা বলল না, শুধু তার উষ্ণ নিশ্বাস রিভেনের পিঠের ওপর এক প্রশান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিতে লাগল। রিভেনের কাঁধ দুটো কেঁপে উঠল সে প্রাণপণে চেষ্টা করছিল নিজের দানবীয় সত্তাকে দমন করতে।
পর মুহূর্তেই রিভেন খুব ধীরে তার রক্তাক্ত হাতটা তুলল এবং রোজেলিয়ার ছোট হাত দুটোর ওপর রাখল। তার কণ্ঠস্বর এখন অতি নিচু, ভাঙা আর আবেগে রুদ্ধ,
“রোজ...”
সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় ঘুরে রোজেলিয়াকে নিজের বুকের গভীরে টেনে নিল। রিভেনের হৃদস্পন্দন তখন কোনো উন্মাদ ঝড়ের মতো বাজছে। সে রোজেলিয়ার কোমর জাপ্টে ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলল, যেন রোজেলিয়া তার একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন।
সে চোখ বন্ধ করে রোজেলিয়ার কানের কাছে অতি নিচু, তীব্র অথচ কাঁপা স্বরে বলল,
“Don’t touch me when I’m like this... আমি তোমাকে আঘাত করে ফেলতে পারতাম। আমার এই বিষাক্ত ছায়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখো, রোজ।”
রোজেলিয়া তার ভিজে শার্টটা খামচে ধরে রিভেনের বুকে মাথা রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি জানি আপনি আমাকে কক্ষনো আঘাত করবেন না। আপনার এই রাগ আমাকে নয়, আপনাকে পোড়াচ্ছে। আমি আপনার সেই ক্ষতটা ছুঁতে চাই, রিভেন।”
রিভেনের নিঃশ্বাস থমকে গেল। সে রোজেলিয়ার ঘাড়ের কাছে নিজের চিবুক রেখে আর্তনাদের মতো স্বরে ফিসফিসাল,
“তুমি জানো না রোজ... যখন আমার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায়, তখন আমি আমার মাঝে থাকি না। আমি চাই না আমার এই অন্ধকার তোমাকে স্পর্শ করুক। তুমি এই পৃথিবীর একমাত্র বিশুদ্ধ জিনিস যা আমার কাছে আছে।”
রোজেলিয়া চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“কোনো কথা নয়, রিভেন। আজ কোনো দোহাই শুনব না। শুধু আমাকে শক্ত করে ধরে রাখুন...।”
রিভেনের শরীর সেই মুহূর্তে তুষারের মতো গলে গেল। তার হাতের রক্ত রোজেলিয়ার সুন্দর ড্রেসে দাগ কেটে দিচ্ছে, কিন্তু তাতে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার হিংস্র ক্রোধ এখন নিঃশব্দ শান্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।করিডোরে কেবল দু’জনের নিঃশ্বাস শোনা যায়।
চলবে,,,,,,
#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
পর্ব ১৭ (দ্বিতীয়াংশ)
ডাইনিং হলটা ঝকঝকে সোনালি আলোয় ডুবে থাকলেও পরিবেশটা ছিল নিস্তব্ধ। দীর্ঘ টেবিলের মাঝখানে রাখা তাজা সাদা লিলিগুলোও যেন এই গুমোট আবহাওয়া সহ্য করতে পারছে না।
রিভেন টেবিলের বাঁ দিকের মাথায় বসে আছে। তার ডান হাতের সাদা ব্যান্ডেজটি এখন রক্তের ছোপে লালচে হয়ে উঠেছে, যা একটু আগের সেই ভয়াবহ ক্রোধের নীরব সাক্ষী। রোজেলিয়া তার পাশেই বসা। সে নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল রিভেনের ওই ক্ষতবিক্ষত হাতের দিকে। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধকধক করছে।
টেবিলের অপর প্রান্তে এভানো ক্যারুসো অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে স্যুপ খাচ্ছেন। তার চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরণের নিষ্ঠুর প্রশান্তি। তিনি চামচটা নামিয়ে রেখে শান্ত স্বরে বললেন,
“তোমার রক্ত এত সহজে ঝরলে কারুসো সাম্রাজ্য চালানো কঠিন হয়ে পড়বে, রিভেন। একজন লিডারের প্রথম গুণ হলো নিজের আবেগকে শেকলে বেঁধে রাখা।”
রোজেলিয়ার হাতের কাঁটা চামচটা থমকে গেল। রিভেন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার হ্যাজেল চোখ দুটো এখন মৃত আগ্নেয়গিরির মতো শীতল কিন্তু ভয়াবহ।
এভানো নির্বিকার ভঙ্গিতে স্যুপের বাটিটা সরিয়ে স্টেকের প্লেট কাছে এনে স্টেক কাটতে কাটতে যোগ করলেন,
“মোরেনো ডিলটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে এভাবে মেজাজ হারানোটা স্রেফ বোকামি। তারাতো তোমাকে সম্মান”
“স্টপ।” রিভেনের কণ্ঠস্বর ডাইনিং হলের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। ঘরজুড়ে এক অসহ্য স্তব্ধতা নেমে এল। রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“মরেনো ডিল নিয়ে একটা শব্দও আর উচ্চারণ করবে না। তারা আমার এলাকায় থাবা বসাতে চেয়েছে, আর আমার ডিকশনারিতে সেটাকে সম্মান বলে না। এই ডিল হবে কি হবে না, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক একমাত্র আমি। তোমার কোনো নাটক শোনার মুড আমার নেই।”
এভানো একটা চতুর হাসি হাসলেন।
“মেজাজ দেখিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, রিভেন। এটাকে জেদ বলে, নেতৃত্ব নয়।”
রিভেনের মুঠি শক্ত হয়ে এল, ব্যান্ডেজের থেকে নতুন করে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। সে গর্জে ওঠার আগেই তার ফোনের তীব্র কম্পন নীরবতা ভেঙে দিল। রিভেন ফোনটা কানে নিতেই তার পাথুরে মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওপাশে সাইলাসের হাহাকারের মতো শোনানো ফিসফিসানি,
“বস... মেনশনে আক্রমণ হয়েছে। সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে”
রিভেন এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
“কী বলছো তুমি?”
“প্রায় বিশ জনের একটা সশস্ত্র দল ছোট গেট দিয়ে ঢুকে পড়েছে। আমাদের গার্ডরা সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক বেশি। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ফায়ারিং শুরু করেছে... বস, টার্গেট কী ছিল এখনও বুঝতে পারছি না।”
সাইলাসের গলায় এক ধরণের হাহাকার।
রিভেনের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল “mom?”
ওপাশে সাইলাসের কণ্ঠস্বর একদম নিচু হয়ে এল।
“ম্যাডাম... তিনি আহত হয়েছেন। বাহুতে বুলেট লেগেছে। তবে আমরা ওনাকে সেফ রুমে নিয়ে যেতে পেরেছি।”
রিভেনের চোখে মুহূর্তেই রক্তের ঝিলিক খেলে গেল। তার ভেতরের সেই অবদমিত দানবটা যেন এক নিমিষেই জেগে উঠল। সে হিংস্র স্বরে বলল,
“আমি এখনই আসছি। যারা এই কাজ করেছে, তাদের একজনও আমি ছাড়বো না”
সাইলাস দ্রুত বাধা দিয়ে বলল,
“বস, একটা কথা। রোজেলিয়া ম্যামকে সাথে আনবেন না। এই মুহূর্তে আমাদের মেনশন নিরাপদ নয়। টার্গেট ঠিক কে, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ওনাকে এখানেই রাখুন।”
রিভেন ফোনটা কেটে দিয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকাল। সেই রোজেলিয়া রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল যে কোথাও একটা বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। রিভেন এক মুহূর্তও নষ্ট না করে রোজেলিয়ার হাতটা প্রায় হ্যাঁচকা টান দিয়ে ধরল।
এভানো ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে?”
রিভেন কোনো উত্তর দিল না। সে রোজেলিয়াকে নিয়ে ঝড়ের বেগে ডাইনিং হলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। রোজেলিয়ার হাত কাঁপছে, কিন্তু সে কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না। রিভেন তাকে নিজের পুরোনো রুমের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন হাজারো আগুনের স্ফুলিঙ্গ।
“এই রুমের ভেতর থাকবে। যা-ই হোক না কেন, রুম থেকে এক পা-ও বাইরে বের হবে না। দরজা ভেতর থেকে লক করো"
রিভেনের স্বর এখন রাগে কাঁপছে।
রোজেলিয়া তার শার্টের হাতা ধরে বললো,
“রিভেন কিছু কী হয়েছে? আমাকে একা ফেলে যাবেন না! আমাকেও সাথে নিন, প্লিজ!”
রিভেন চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করল। সে রোজেলিয়ার গাল দুটো দুহাতে ধরে কপালে একটা তপ্ত চুমু দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“তোমার জন্য এই মুহূর্তে কোনো কিছুই নিরাপদ নয় রোজ। ম্যানশনে আক্রমণ হয়েছে আমার সেখানে যাওয়া প্রয়োজন। এই বাড়িটা সুরক্ষিত, এখানে কেউ আসতে পারবে না। যা বলছি করো... প্লিজ।”
রোজেলিয়ার ঠোঁট কাঁপছে।
“রিভেন...”
কিন্তু রিভেন আর ফিরে তাকাল না। সে এক মুহূর্তের জন্য পিঠ ফিরিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“লক দ্য ডোর। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কারও জন্য দরজা খুলবে না।”
পরক্ষণেই করিডোরে তার ভারী বুটের হিংস্র শব্দ দ্রুত মিলিয়ে গেল। রোজেলিয়া স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে দরজার ছিটকিনিটা আটকে দিল। বিশাল রুমটা এক নিমিষেই এক অদ্ভুত নিঃশব্দ হয়ে গেল, যেখানে কেবল রোজেলিয়ার চাপা কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
____________
মেনশনের সামনে বাতাস এখনো গানপাউডারের কটু গন্ধে ভারী হয়ে আছে। ধুলো আর রক্তের মিশ্র এক ভ্যাপসা গন্ধে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাগানের কয়েকটা নিভু নিভু আলোয় দেখা যাচ্ছে বিভীষিকার চিহ্ন মেঝেতে ছড়ানো ভাঙা কাঁচ, বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা হয়ে যাওয়া দেয়াল, আর স্ট্রেচারে শোয়ানো কয়েকজন গার্ডের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি।
ভেতরে আভা মেহরিন কারুসোর পাশে পাথরের মতো বসে আছে। মেডিকেল টিম দ্রুত হাতে মেহরিনের বাহুর বুলেটের ক্ষতের চিকিৎসা করছে।
এক কোণে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে নাইলা। তার হাতটা রক্তাক্ত হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে চামড়া ছিঁড়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। সে ভেতরে ভেতরে থরথর করে কাঁপছে কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে হার না মানার এক অদ্ভুত জেদ। সাইলাস ধীর কিন্তু ভারী পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, চুলে ধুলোবালি। এই প্রথম সাইলাসের চোখে এক বিজাতীয় উদ্বিগ্নতা ধরা পড়ল। সে নাইলার সামনে নিচু হয়ে বসল।
“দেখি... হাতটা দেখি। কী হয়েছে তোমার?”
সাইলাসের কণ্ঠস্বর অনেক বেশি নিচু।
নাইলা চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে এলেও গলা শক্ত করে বলল,
“একদম ছোঁবে না আমাকে। নিজের কাজ করো গে, আমার কিছুই হয়নি।”
সাইলাস এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর আরও কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“এটা জেদ দেখানোর বা ঝগড়া করার সময় না । তোমার হাত থেকে রীতিমতো রক্ত ঝরছে। আমাকে দেখতে দাও।”
সে হাত বাড়িয়ে নাইলার কব্জি ধরতে চাইল।
নাইলার চোখের মণি কাঁপছে, তবু সে জেদ ধরে হাত সরিয়ে নিতে নিতে বলল, “না বলছি না! আমি নিজে সামলে নিতে পারব।তুমি গিয়ে অন্যদের সামলাও অন্যদের সাহায্য করুন।”
সাইলাস এবার দুই আঙুল দিয়ে নাইলার কব্জিটা লোহার মতো শক্ত করে ধরে ফেলল। তার চোখ নামানো, ভয়াবহ শান্ত স্বরে সে বলল,
“রক্ত তোমার আঙুল বেয়ে নামছে আর তুমি অভিনয় করছ যে তুমি ভালো আছো? ডোন্ট পুশ মি, Stubborn woman। তুমি ব্যথা পেয়েছ এবং সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি।”
নাইলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ব্যথার তীব্রতায় তার কণ্ঠ বুজে এল, সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“...প্রচণ্ড ব্যথা করছে।”
সাইলাস মুখ তুলল। তার ধূসর চোখে এক ধরণের রাগ। “জানি। ভালোই আঘাত পেয়েছ তুমি। ক্ষতটা বেশ গভীর।”
সাইলাস হাতের ক্ষতটা খুঁটিয়ে দেখল। তারপর কিছু না ভেবেই সে তার শক্তিশালী বাহু নাইলার কোমরে রাখল এবং নিমেষেই তাকে পাঁজকোলে তুলে নিল।
নাইলা ভয়ে আর বিস্ময়ে সাইলাসের শার্ট খামচে ধরল।
"কী করছো তু...তুমি! নামাও আমাকে!”
সাইলাস কোনো উত্তর দিল না। তার নিঃশ্বাস স্থির সে হাঁটতে শুরু করে কেবল বলল,
“তোমার ইমিডিয়েট চিকিৎসা দরকার। এভাবে মেঝেতে বসে থাকলে ইনফেকশন হয়ে যাবে। জাস্ট চুপ করে থাকো।”
নাইলা লজ্জায় আর অবিশ্বাসে মুখ লুকিয়ে সাইলাসের বুকে মাথা ঠেকাল। মেনশনের করিডোর তখন নীরবতায় ডুবে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে গেট দিয়ে রিভেনের গাড়িটা ঢুকে পড়ল। টায়ারের ঘর্ষণে চারপাশের ধুলো উড়ল। রিভেন গাড়ি থেকে নেমেই বজ্রপাতের মতো ক্ষিপ্রতায় বাড়ির ভেতরে ঢুকল। তার কালো শার্টের কলার মুচড়ে আছে, চোখে টকটকে লাল রঙের ক্রোধ । কেউ তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পেল না।
মেহরিন কারুসোর রুমের দরজাটা এক প্রচণ্ড ধাক্কায় খুলে রিভেন ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরকার অ্যান্টিসেপটিকের কড়া গন্ধ তার বুক চিরে দিল। সে দেখল তার মা বিছানায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন, বাহুতে ব্যান্ডেজ যা দিয়ে এখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
রিভেন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত গিয়ে মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর এখন ধরা-ধরা, ভাঙা,
“মম.. আমি আসতে দেরি করে ফেললাম। আই অ্যাম সো সরি।”
তার কাঁপা আঙুলগুলো মায়ের হাত স্পর্শ করল। মেহরিন ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। ছেলের এই বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তিনি দুর্বলভাবে একটু হাসলেন।
“আমি ঠিক আছি বাবা। শুধু সামান্য একটু চোট... তুমি এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন?”
রিভেন কোনো কথা বলল না। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল, কপালে শিরাগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে সেই ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে তখন কেবল একটাই চিন্তা।যারা তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে স্পর্শ করার সাহস দেখিয়েছে, তাদেরকে সে কঠিন শাস্তি দিবে।
মেহরিন রিভেনের হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বললেন, “শান্ত হও বাবা । আমার কিছু হয়নি।”
রিভেন হঠাৎ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। সে কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। তার এই নীরবতা ঘরের মরণশীল স্তব্ধতার চেয়েও বেশি ভয়ংকর। সে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেবল অস্ফুট স্বরে বলল,
“তারা ভুল মানুষকে টার্গেট করেছে, মম।"
ড্রয়িং রুমে রিভেন নেমে আসামাত্রই পুরো রুম জমে যায়।এনজো, লরেঞ্জো, জ্যাক, সাইলাস, মার্কো আরো কয়েকজন আহত গার্ড দাঁড়িয়ে আছে।কেউ শ্বাস ফেলতেও সাহস করছে না।রিভেনের চোখ ছুরির ধার মতো ঠাণ্ডা।
“এ সব কীভাবে হলো?কার এত সাহস… আমার বাড়িতে আক্রমণ করার?”
এনজো গম্ভীর হয়ে এগিয়ে আসে।
“বস… ওরা পরিকল্পনা করে এসেছে।ছোট গেটের গার্ডদের চুপচাপ মেরে ভেতরে ঢোকে।সংখ্যায় বেশি ছিল…আমাদের গার্ডরা বুঝে ওঠার আগেই ওরা গুলি চালায়।”
রিভেনের মুঠি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে।সাইলাস সামনে এসে দাঁড়ায়।
“আমরা দু’জনকে ধরতে পেরেছি, বস, উপরে স্নাইপার থাকায় নীচের রুট দিয়ে পালাতে পারেনি।দু’জনই বেসমেন্টে আছে।”
দু'সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।তারপর রিভেন কোনো কথা বলে না। শুধু হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়।তার ধাপগুলো তীক্ষ সিঁড়ি পেরিয়ে সে সরাসরি বেসমেন্টের দিকে হাঁটতে থাকে।সাইলাস ও এনজো দ্রুত পেছন পেছন যায়। নীচের বেসমেন্টের লোহার দরজা ঠেলে রিভেন ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেঘরটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে যায়।সিলিং এর হলুদ আলো দুলে উঠছে,দেয়ালে ছায়ারা কাঁপছে।দুইজন হামলাকারী হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রাখা। একজনের মুখে শুকনো রক্ত, আরেকজন হাঁপাচ্ছে।যেই মুহূর্তে দু’জন রিভেনকে দেখে তাদের মুখেই আতঙ্ক জমে ওঠে।রিভেন ধীরে হাঁটে তার বুটের তীক্ষ্ণ শব্দ বেজে ওঠে টক… টক… টক…সে কোনো কথা বলে না।কোনো ব্যাখ্যা চায় না।কোনো প্রশ্ন করে না।সে শুধু থামে…প্রথম লোকটার সামনে।এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা।তারপর,
রিভেন হঠাৎ ঝুঁকে লোকটার কলার চেপে ধরে হাওয়ায় তুলে ফেলে মাটিতে ছুঁড়ে মারে।।লোকটা ব্যথায় কাঁদতে শুরু করে। রিভেন আবার লোকটাকে কলার ধরে তুলে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। তারপর লোকটার মুখে ঝড়ের মতো ঘুষি মারতে শুরু করে।একেরপর এক ঘুষি মেরে লোকটার মুখ রক্তাক্ত করে দেয়। রিভেনের হাতের ব্যান্ডেজ বেদ করেও রক্ত পড়ছে। কিন্তু সে থামে না
ঘরের ধাতব দেয়ালে আঘাতের শব্দ প্রতিধ্বনি তোলে।
দ্বিতীয় লোকটা কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু বাঁধা পা তাকে সরতে দেয় না।রিভেন মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। প্রথম লোকটাকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলেসে এগিয়ে যায়,ধীরে…যেন শিকারি পশুর হাঁটা।লোকটার চোখে ভয়। কপাল দিয়ে ঘাম ঝড়ছে
রিভেন লোকটার চুল চেপে ধরে মাথা তুলে টেনে আনে একটুও দয়া নেই।তারপর হঠাৎ হাঁটু তুলে লোকটার মুখে সজোরে আঘাত করে।মেঝেতে ধাক্কা লেগে যন্ত্রণায় লোকটি গড়াগড়ি খায়।এনজো আর সাইলাস দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনের চোখেই রাগ।রিভেন আবার ঝুঁকে লোকটার জামার কলার মুঠো করে ধরে,ধীরে ধীরে তাকে দেয়ালের দিকে ঠেলে নিয়ে মুখে জোরে ঘুষি মারে।
মুখটা এক ইঞ্চি দূরে এনে বরফের মতো স্বরে বলে,
“কে পাঠিয়েছে তোদের। নাম বল।”
লোকটা ঠোঁট কামড়ে ধরে, মুখ শক্ত করে।কিছু বলে না।রিভেন চোখ সরু করে,ধীরে ধীরে তার গালে হাত বুলিয়ে,এক মুহূর্তে ঠকাস করে চড় মারে।লোকটা পড়ে যেতেই রিভেন আবার টেনে তুলে দেয়ালের সাথে শক্ত করে ঠেসে ধরে।
“আমি ভালোভাবে জিজ্ঞেস করেছি...কে.পাঠিয়েছে তোদের।”
তবুও লোকটা চুপ।রিভেনের চোয়াল শক্ত হয়।সে একদম শব্দ না করে মুঠি তোলে। পরপর তিনটা ঘুষি লোকটার পাঁজরে লাগে।লোকটা কেঁপে ওঠে, কিন্তু মুখ খোলে না।রিভেন মুখ ঘুরিয়ে এনজোর দিকে তাকায়,
" ড্রয়ার থেকে ছুড়িটা নিয়ে আসো "
এনজো মাথা নেড়ে এগিয়ে গিয়ে ছুড়ি এনে রিভেনের হাতে দেয়। রিভেন লোকটার দিকে তাকায়,
" শেষবার জিজ্ঞেস করছি,নাম বল"
লোকটি ভয়ে ডোক গিলে কিন্তু মুখ খুলে না।রিভেনের ধৈর্য ফুরিয়ে যায় সে সজোরে ছুড়িটি লোকটির বাহুতে ঢুকিয়ে দেয়। লোকটির চিৎকার পুরো বেসমেন্টে প্রতিধ্বনি হয়।
রিভেন গর্জন করে বলে,
" শুয়োরের বাচ্চা, মুখ খোল নাহলে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবো"
লোকটা ভাঙা গলায় বলে,
“Kill me if you want… I still won’t talk.”
তার কণ্ঠ কাঁপছে,কিন্তু অদ্ভুতভাবে দৃঢ়।যেন মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছে।রিভেন থেমে যায়।চোখের কোণায় হালকা হিংস্রতা সে ধীরে সামনে ঝুঁকে লোকটার মুখের কাছে বলে,
“So brave, huh?”
লোকটা চোখ বন্ধ করে ফেলে যন্ত্রণায়, ভয়ে, তবু মুখ বন্ধ।রিভেন তার গালের পাশে ঠান্ডা ভঙ্গিতে বলে,
“তুই মরতে চাস, তাই তো?”
লোকটা দাঁত চেপে বলে,
“Yes. Better than betraying our master”
সাইলাস পিছনে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে এনজো পরিস্থিতি দেখছে।রিভেন ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।গলার রগ টান টান।তারপর ছুরিটা মাটিতে ফেলে দেয় একটা টক শব্দ হয়।সে পাশের টেবিল থেকে লোহার রড তুলে নেয়। রিভেন রড দিয়ে লোকটার হাঁটুতে আঘাত করে লোকটা তীব্র চিৎকার করে ওঠে।আরেকটা আঘাত হাড় ভাঙার শব্দ পরিষ্কার শোনা যায়।তবুও সে মুখ খোলেনা।রিভেনের চোখের পলক নড়ে না যেন প্রতিটা আঘাত সে অনুভবই করছে না।সে ধীরে ধীরে পাশে হাঁটে,ম্লান আলোয় তার হ্যাজেল চোখ দুটো সম্পূর্ণ অন্ধকার।তারপর, খুব শান্তভাবে বলে,
“তোরা দুইজনই আমার কোনো কাজের না।”
হঠাৎ সে রডটা টুক করে ফেলে দেয়,ফ্লোর থেকে আবার ছুরিটা তুলে নেই ,রিভেন এর মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠে ,
“যেহেতু মুখ খুলবি না…তাহলে মর কিন্তু এতো সহজ মৃত্যুতো আমি দিবো না।”
লোকটা কুঁকড়ে পড়ে আছে,শ্বাস টানছে ভাঙা হাড়ের যন্ত্রণায়,তবু চোখে সেই অদ্ভুত জেদ মুখ খুলবে না, মরবে হলেও।রিভেন ধীরে হাঁটা দেয় তার চারপাশে,যেন শিকারির মতো শিকারকে ঘিরে রাখা।তার হ্যাজেল চোখ এখন প্রায় কালো গভীর অন্ধকারে ডুবে যাওয়া।
“মুখ খুলবি না?ঠিক আছে…কিন্তু শরীরটা আমি খুলে ফেলব।”
লোকটার চোখ বড় হয়ে যায়।সে মাথা নাড়তে থাকে,কিন্তু দড়িতে বাঁধা শরীর নড়তেও পারে না।রিভেন ছুরিটা লোকটার ডান হাতের ওপর রাখে আঙুলের গাঁটে চাপ দিতেই লোকটা কেঁপে
"Kill me ple…”
রিভেন তার কথা শেষ করতে দেয় না।সে ছুরির ধার ঠান্ডাভাবে বসিয়ে এক ঝটকায় আঙুলটা কেটে ফেলে।রক্ত ছিটকে দেয়ালে লাগে।লোকটা গলা ভেঙে চিৎকার করে ওঠে,
“আহহহহহহহহহ—!!!”
রিভেন কাটা আঙুলটা মাটিতে ছুড়ে ফেলেশীতল স্বরে বলে,
“সাহসী?এটাই সাহস?পরেরটা কাটা হবে তোর নীরবতার দামে।”
লোকটার মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে,চোখ থেকে পানি বের হচ্ছে,রিভেন আরেকটা আঙুল কেটে নেয় ।লোকটির চিৎকারের মাএা আরো বেড়ে যায় ।রিভেন এবার কিছু বুঝে উঠার আগে ছুরির দাড়ালো অংশ লোকটির চোখে ডুকিয়ে দেয়।
লোকটা যেন পুরো দুনিয়া ভেদ করে চিৎকার করে ওঠে । রিভেন ছুরি দিয়ে লোকটির চোখ উপড়ে ফেলে।চোখটি গিয়ে ফ্লোরে পড়ে।রক্ত ছিটকে রিভেনের কালো শার্টে লাগে ।লোকটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তার চিৎকারে মেঋেতে পড়ে থাকা লোকটি থরথর করে কাপতে থাকে । সামনে এতো ভয়ানক দৃশ্য দেখে তার পেটের ভিতর সব যেন গুলিয়ে আসছে।
রিভেন কিছুক্ষণের জন্য থামে ।তার ভিতরের ক্রোধ এখনো কমে নি সে কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নেই তারপর কোনো কথা না বলে দ্রুত ছুরিটি লোকটির ঘাড়ের উপর নৃশংসভাবে চালাতে থাকে ।লোকটা নিঃশ্বাস হারিয়ে অর্ধমৃতের মতো কাঁপতে থাকে।ছুরি শরীরের নানা স্থানে ঢুকছে আর বের হচ্ছে ।কাটা চামড়ার শব্দ,মাংস বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ানক আওয়াজ বেসমেন্টের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে।লোকটা ব্যথায় ছটফট করতে না পারায়। দেয়ালের সাথে থরথর করে কাঁপছে গলা ফেটে যাচ্ছে,
“আআআআআ!
রিভেন যেন আর মানুষই ছিল না তার ভেতরকার দানবটা পুরোপুরি খুলে বেরিয়ে এসেছিল।লোকটার হু-হু করে চিৎকার, তারপর গলা ভেঙে আসা আর্তনাদ সবকিছু মিলেমিশে যেন এক বিকৃত, অমানুষিক সিম্ফনি।রিভেন থামেনি।এক মুহূর্তও নয়।চোখে মুখে ওই একই ঠান্ডা, নিষ্ঠুর আগুন।তার ছুরিটা যখন শেষবারের মতো লোকটার গলায় ঢুকলো,লোকটা চেষ্টা করল নিঃশ্বাস নিতে,কিন্তু শ্বাসটা বের হলো ভাঙা সুরের মতো,
“Ghhh… aa”
তার চোখদুটো কেঁপে উঠল।মাথা এক পাশে ঢলে পড়ল।এক মুহূর্ত দুই মুহূর্ত তারপর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেল।চাপা একটা ফট শব্দে হাত থেকে ছুরি পিছলে মাটিতে পড়ল।রিভেন দাঁড়িয়ে রইল নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে শ্বাস ভারী, রক্তে ভেজা হাত,মুখে এখনও আগুনের মতো জ্বলন্ত, পৈশাচিক সেই হাসি।সেই মুহূর্তে রিভেনকে মানুষ বলে মনে হয়নি।পুরোপুরি পশু।না, তার থেকেও ভয়ংকর কিছু।একটা শিকারি যে শিকার শেষ না করা পর্যন্ত থামে না।কোনো পাপবোধ নেই,কোনো দয়া নেই,কোনো বিরাম নেই।সাইলাস আর এনজো পিছন থেকে শুধু তাকিয়ে ছিল নিঃশব্দ, থমথমে অন্ধকারের ভেতর।রিভেনের চোখ তখনও দাউ দাউ করে জ্বলছিল।
মৃত মানুষটার ওপর শেষবারের মতো তাকিয়ে সে ধীরে বলে,
“Next.”
তার কণ্ঠে ছিল মৃত্যুর ঠান্ডা।রিভেন আরেকটা লোকের দিকে যায় ,লোকটা মেঝেতে উপুড় হয়ে আধমরা অবস্থায় পড়ে আছে মুখে রক্ত, চোখে জল, বুক দুলছে ভয়ে।রিভেন যখন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যায়,লোহার বুটের শব্দটা টক…টক… করে বেজে ওঠে প্রতিটা ধাপ যেন মৃত্যুর কাউন্টডাউন।লোকটা হঠাৎ দুই হাত তুলে কেঁপে কেঁপে বলে,
“Please… don’t kill me… please ”
রিভেন কোনো কথা বলে না।ভ্রু সামান্য নামায়।চোখদুটি একদম ফাঁকা দয়া নেই,লোকটা গিলতে না পেরে জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে,তার গলা কাঁপছে,
“I-I swear… I know nothing…The man your guys killed he knew everything!”
তার চোখ বড় একদম আতঙ্কে বিকৃত।
“I was just following orders!We all were!”
রিভেন ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে এক হাত লোকটার চুল মুঠি করে ধরে মাথা তুলিয়ে দেয়।লোকটা যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করে ওঠে।রিভেন নীচু, ঠান্ডা গলায় বলে,
“Order from who.”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে মাথা ঝাঁকায়।
“I don’t know! I swear!”
রিভেনের চোখ সরু হয়ে আসে।লোকটা মরিয়া হয়ে দ্রুত বলে,
“We never saw the face never!We got paid… got instructions… that’s it!A masked man always masked!”
রিভেন আরেকটু জোরে চুল টানে লোকটার মুখের ত্বক টানটান হয়ে যায়।
“Location.”
লোকটা ফুঁপিয়ে ওঠে,
“Th-the drop point changed every time!I don’t know who he is… I don’t know anything about him!”
তার শরীর থরথর করছে,শ্বাস নিতে পারছে না।
“Please… please I’m telling the truth…”
রিভেন কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থাকে।কোনো শব্দ নেই শুধু লোকটার দমবন্ধ কান্না।তারপর রিভেন মাথাটা ছেড়ে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।লোকটা মেঝেতেই ধপ করে পড়ে যায় মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে মারা যাবে।রিভেন তার ওপর ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে…ঠান্ডা, স্থির, ভয়ানক।
“You’re useless.”
লোকটা থমকে যায় চোখ দপদপিয়ে ওঠে ভয়ে।
“No no please I have fami-!”
রিভেন কথা শেষ করার সুযোগ দেয় না ।পিছন থেকে বন্ধুক বের করে লোকটার মাথা বরাবর শুট করে দেয় ।বন্ধুকের আওয়াজ পুরো বেজমেন্টে একবার বেজে উঠে আর লোকটার নিথর দেহ ফ্লোরে পড়ে থাকে।রিভেন এনজোর দিকে তাকায় খুব শান্ত গলায়, কিন্তু ভিতরে বজ্র চাপা রাখা কণ্ঠে আদেশ করল,
“লাশ দুটোকে তিবেরে নদীতে ফেলে আসবে। কোনো চিহ্ন যেন না থাকে?”
সাইলাস মাথা নুইয়ে বলল, “ওকে, বস।”
এনজো ইতিমধ্যেই গ্লাভস পরে লাশ তুলতে শুরু করেছে।
রিভেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে শুধু রক্তের টান আর মৃত্যুর ঠান্ডা নিস্তব্ধতা পড়ে রইল।
চলবে,,,,,