ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

১৯তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)

#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক

পর্ব ১৯

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

সকালটা ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল।রিভেনের ম্যানশনের চারপাশে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে নরম সোনালি আবরণে। বাগানের শিশিরভেজা পাতাগুলো আলো ছুঁয়ে ঝিলমিল করছে, দূরে ফোয়ারার পানির শব্দ একটানা শান্তির সুর তুলছে। আকাশ আজ পরিষ্কার।হালকা নীল, কোথাও কোনো তাড়া নেই। জানালার পর্দা ফাঁক গলে আলো ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতরে, বিছানার সাদা চাদরে আঁকছে মৃদু ছায়া।এই বাড়িতে সকাল মানেই নিখুঁত শৃঙ্খলা।

এরই মাঝে কেটে গেছে পাঁচটা দিন।ইভানোর বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকে রোজেলিয়া যেন নিজেকে অন্য এক ভূমিকায় ঢেলে দিয়েছে।মেহেরিনের প্রতিটি ওষুধ সময়মতো দেওয়া, ব্যান্ডেজ বদলানো, খাবার খাওয়ানোর সময় পাশে বসে থাকা।সবকিছুই রোজেলিয়ার হাতে। কেউ তাকে দায়িত্ব দেয়নি, তবুও সে নিয়েছে। নিঃশব্দে, নিষ্ঠার সাথে।আজও সে হাতে ট্রে নিয়ে ধীরে ধীরে মেহেরিনের রুমের দিকে এগোচ্ছে। ট্রের ওপর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।রোজেলিয়াকে চা হাতে আসতে দেখে মেহেরিনের ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে।রোজেলিয়া কাছে এসে নরম স্বরে বলে,

“মম… আপনার হাতের এখন কী অবস্থা? ব্যথা আছে?”

মেহেরিন চায়ের কাপ হাতে নেয়। এক চুমুক দেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে,

“ব্যথা অনেকটাই কমে গেছে।”

রোজেলিয়া ধীরে ধীরে বিছানার পাশে বসে। বসার আগমুহূর্তে তার ভেতরে এক ধরনের সংকোচ কাজ করে।তার এখনো সংকোচ দুর হয়নি।তবুও সংকোচ ভেঙে সে বসে পড়ে।মেহেরিন হঠাৎ বলে ওঠে,

“আমি একটা জিনিস প্রথম থেকেই খেয়াল করছি।”

রোজেলিয়ার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে।সে বিভ্রান্ত হয়ে তাকায়।

“কী মম? আমি… আমি কি কোনো ভুল করেছি?”

মেহেরিন আবার চায়ে চুমুক দেয়। তারপর খুব মেপে মেপে কথাগুলো বলতে শুরু করলেন,

“ভুলের কথা বলছি না। আমি অবাক হচ্ছি এটা দেখে যে, তুমি কী করে ভুলে গেলে তুমি একজন বাঙালি? তোমার রক্তে যে সংস্কৃতি মিশে আছে, তার প্রতিফলন তো তোমার পোশাকে অন্তত থাকা উচিত ছিল।”

রোজেলিয়া চুপ করে থাকে।মেহেরিন একটু থেমে আবার বলে,

“বিয়ের পর থেকে আমি তোমাকে সবসময়ই এসব ওয়েস্টার্ন পোশাকে দেখছি। আমি ইতালির এই অভিজাত সমাজে অনেক বছর ধরেই আছি। ইভানোর ঘর করেছি, এখানকার ভাষা-সংস্কৃতি সব জানি। কিন্তু আমি আমার শিকড়কে কোনোদিন ছিঁড়ে ফেলিনি। আমি আমার দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবাসি, সম্মান করি।”

মেহরিন সোজা হয়ে বসে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে যোগ করলেন,

“আমি চাই আমার ছেলের বউও সেই বাঙালি আভিজাত্য বজায় রেখে চলুক। আমাদের ঐতিহ্যের একটা আলাদা মর্যাদা আছে। ইতালির মিলান শহরেই একটা বিখ্যাত বাঙালি ফ্যাশন আউটলেট আছে ‘দ্য ঢাকা হেরিটেজ’। রিভেনকে বোলো, ও যেন ওখান থেকে তোমার জন্য কিছু ভালো শাড়ি আর ট্র্যাডিশনাল ড্রেস নিয়ে আসে।"

ঘরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভারী হয়ে ওঠে।রোজেলিয়া মাথা নিচু করে থাকে। তারপর আস্তে করে বলে,

“আচ্ছা মম… আমি ট্রাই করবো।আমি চেষ্টা করব নিজেকে আপনার মনের মতো করে সাজিয়ে নিতে।”

মেহেরিন সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।চা শেষ হলে কাপটা রোজেলিয়ার হাতে তুলে দেয়।রোজেলিয়া সেটা নিয়ে নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

_____________________

রিভেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়ির স্ট্র্যাপ ঠিক করছে। কালো শার্ট, হাতের রগ স্পষ্ট, চোখে সেই চেনা ঠান্ডা মনোযোগ।রোজেলিয়াকে দেখতে পেয়ে সে ঘুরে আসে।একটু এগিয়ে গিয়ে এক টানে কাছে টেনে নেয়।রোজেলিয়ার কপালে খুব হালকা, প্রায় ছোঁয়ার মতো চুমু খায়।রোজেলিয়া অজান্তেই হেসে ফেলে।রিভেন তার গালটা হালকা টেনে বলে,

“কিছু বলবে?”

রোজেলিয়া চমকে ওঠে।সে সত্যিই কিছু বলতে এসেছিল।রিভেন আগেই বুঝে ফেলেছে—এই ব্যাপারটা তার অদ্ভুতভাবে ভালো লাগে।সে মাথা নেড়ে বলে হ্যাঁ।রিভেন তার সামনের চুল কানের পেছনে সরিয়ে দেয়।নাকের ওপর জমে থাকা ঘামের বিন্দু নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে বলে,

“বলো।”

“আমার আসলে…”

রোজেলিয়া থেমে যায়। কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।

রিভেন তার চোয়ালটা আলতো করে উপরে তোলে।দৃষ্টি সরাসরি চোখে।

“আসলে কী?”

লজ্জা আর অস্বস্তি একসাথে চেপে বসে রোজেলিয়াকে।সে তাকাতে পারছে না।আর কথা বলার জন্য একটু দূরত্ব দরকার।হঠাৎ করে দুই হাত দিয়ে রিভেনের বুকে ধাক্কা দেয়।রিভেন এক পা পিছিয়ে যায়।এই সুযোগে রোজেলিয়া বলে,

“আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে। কিছু জিনিস কিনতে।”

রিভেন কপাল কুঁচকায়।আবার কাছে এগিয়ে এসে বলে,

“বুঝলাম। কিন্তু সেটা বলার জন্য ধাক্কা কেন দিতে হলো?”

তার চোখে ঠাট্টা আর হালকা রাগ মিশে আছে।রোজেলিয়া চোখ নামিয়ে ফেলে। আমতা আমতা করে বলে,

“আ... আসলে আপনি এত সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে আ... আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, আর কথাগুলো গলায় আটকে যায়।”

রিভেন বাকা হাসে। কিছু বলে না।চুপচাপ কালো সার্টের উপর জ্যাকেট পরে নেয়।তারপর শুধু বলে,

“চলো।”

“কোথায়?”

রিভেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলে,

“যেখানে তুমি যেতে চাও।”

রোজেলিয়া অবাক হয়ে বলে,

"আপনি তো এখন অফিসে যাবেন বললেন। জাস্ট আমাকে একটা গাড়ি আর গার্ড দিয়ে দিলেই হবে।”

রিভেন এগিয়ে আসে।দুই হাতে রোজেলিয়ার গাল ধরে তাকে নিজের মুখোমুখি করে।তার কণ্ঠ গভীর, স্থির অপ্রতিরোধ্য।

“অফিস আর কাজ তো সারাজীবনের রোজ। কিন্তু তোমার সাথে কাটানো এই সময়টুকু আমার কাছে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি দামি। You are more important to me than my office, my work, or anything else in this goddamn world... Rose petal.”

__________

ম্যানশনের বাইরের সকালটা আজ অদ্ভুতভাবে শান্ত।রোদটা গাছের পাতার ফাঁক গলে নামছে, আলো ছায়ার খেলায় পাথরের পথটা কখনো উজ্জ্বল, কখনো ম্লান। বাতাসে কাঁচা ঘাসের গন্ধ, দূরে ফোয়ারার পানির শব্দ—সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন বাইরে থেকে শান্ত, ভেতরে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য টানাপোড়েন।

নাইলা তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে ম্যানশনের দিকে আসে। কালো-সাদা ইউনিফর্মটা গায়ে, হাতের ব্যান্ডেজটা আজও ঠিকমতো বাঁধা। হাঁটার সময় সে আশপাশটা চোখ বুলিয়ে নেয় ।ম্যানশনের পাশেই সে দেখতে পায় একটা ছোট ছেলে গাড়ি পরিষ্কার করছে। বয়স বড়জোর চৌদ্দ পনেরো। এই বাড়িতে এমন অনেক ছেলেই কাজ করে কেউ বাগানে, কেউ গাড়ির গ্যারেজে, কেউ স্টোররুমে।

নাইলা একটু থেমে দাঁড়ায়।ছেলেটার কাজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে একদম নতুন। ব্রাশ ধরার ভঙ্গি এলোমেলো, কোথাও বেশি জোর, কোথাও একেবারেই না। গাড়ির গ্লাসে দাগ থেকে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ নীরবে দেখে নাইলা বলে ওঠে,

“তুমি কি এই কাজটা আজই প্রথম করছো? এভাবে করলে তো গাড়ির বারোটা বাজিয়ে দেবে”

ছেলেটা চমকে উঠে তাকায়। হাতে গাড়ি পরিষ্কার করার ব্রাশ।

“হ... হ্যাঁ ম্যাম। আমি নতুন।কিছুদিন হলো জয়েন করেছি। কাজ শিখছি।”

নাইলা ঠোঁট বাঁকায়।

“হুম... তোমার আনাড়ি কাজ দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছে। নাম কী তোমার?”

“রিকো।”

নাইলা মাথা নাড়ে।

“আচ্ছা রিকো, ওটা আমাকে দাও। তোমার দ্বারা আজ এই গাড়ি পরিষ্কার হবে না।”

বলেই সে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যায়। ব্রাশটা নিজের হাতে নেয়।

রিকো অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

“না ম্যাম, এটা আমার কাজ। আমাকেই করতে দিন, প্লিজ।”

নাইলা শান্ত গলায় বলে,

“It’s okay. তুমি যাও। আমি করছি।”

ছেলেটা আবার আপত্তি করলে নাইলা এবার একটু কড়া স্বরে বলে,

“যাও তো।”

রিকো আর কিছু না বলে সরে যায়।নাইলা ব্রাশটা সাবানের বালতিতে ডুবিয়ে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির কাঁচ পরিষ্কার করতে থাকে হাতের ব্যথা উপেক্ষা করেই। সাবানের ফেনা কাঁচে ছড়িয়ে পড়ে, সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে।

ঠিক তখনই,পেছনের পথ ধরে হেঁটে আসছিল সাইলাস।হাতে জ্বলা সিগারেট, মুখে ধোঁয়ার অলস রেখা। প্রথমে অন্যমনস্ক থাকায় সে নাইলাকে খেয়ালই করেনি। একটু কাছে আসতেই থেমে যায়।সে দাঁড়িয়ে থাকে,চুপচাপ,নাইলার দিকে তাকিয়ে।তারপর সিগারেটটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে বলে,

“এই মেয়ে, এই। কী করছো এখানে?”

নাইলা না ঘুরেই উত্তর দেয়,

“With due respect, sir,ঈশ্বর তোমাকে দুটো চোখ দিয়েছেন। তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না আমি কী করছি?”

সাইলাসের ঠোঁটে একপাশে বাকা হাসি।তারপর সে খেয়াল করে সাবানের পানিতে নাইলার হাতের ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে।

“এইসব তোমার কাজ না,”

সে ঠান্ডা গলায় বলে।

“কিন্তু হাতের এই অবস্থা থাকার পরে তুমি কেনো এসব করছো?”

নাইলা এবার তাকায়।

"তোমার সমস্যা কোথায়?”

সাইলাস তার হাতের দিকে ইশারা করে,

“ব্যান্ডেজ ভিজে যাচ্ছে। তার ওপর সাবানের পানি। ইনফেকশন হলে?”

নাইলা ব্রাশটা বালতিতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

“সমস্যা হলে আমার হবে। তাতে তোমার কী, হ্যাঁ?”

সাইলাস সিগারেটে একটা গভীর টান দেয়।

“আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”

নাইলা চোখ সরু করে,

“উপদেশ অনেক হয়েছে। আর শোনো, তোমার এই সস্তা সিগারেটের গন্ধ আমার জঘন্য লাগে। দয়া করে আমার সামনে থেকে বিদায় হও।”

সাইলাস তার দিকে তাকিয়ে থাকে।চোখে সেই অদ্ভুত, বিপজ্জনক কৌতুক।তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে আসে।নাইলা প্রথমে খেয়াল করে না।এক মুহূর্ত পর বুঝতে পারে সাইলাস চুপচাপ তার খুব কাছে চলে এসেছে।দু’জনের চোখে চোখ।নাইলার চোখে আগুন।সাইলাসের মুখে পৈশাচিক, অলস হাসি।সে সিগারেটে আরেকটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াটা সোজা নাইলার মুখের দিকে ছাড়ে।

নাইলা সঙ্গে সঙ্গে কাশতে শুরু করে।ধোঁয়া সরাতে সরাতে সাইলাসের বুকে জোরে ধাক্কা দেয়,

“আরে অসভ্য asshole! কী করলে তুমি এটা!”

নাইলা কাশতে থাকে।চোখ জ্বলে ওঠে।সাইলাস একচুলও নড়ে না।বরং ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসিটা আরও স্পষ্ট হয়।সে কিছু বলে না।শুধু দাঁড়িয়ে থাকে,যেন এই পুরো দৃশ্যটাই তার কাছে নিছক একটা বিনোদন।নাইলা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না।কাশিটা কোনোমতে থামিয়ে সে বালতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। সাবানের পানিতে ভেজা ব্রাশটা শক্ত করে হাতে নেয়। চোখে তখন আগুন।আর কিছু না ভেবে সোজা ঘুরে ব্রাশটা তুলে পুরো শক্তিতে সাইলাসের দিকে ছুড়ে মারে।সাবানের পানি ছিটকে গিয়ে সাইলাসের কোটের উপর পড়তে থাকে।সাইলাস থেমে যায়।তার মুখের সেই বাঁকা, খেলাচ্ছল হাসিটা মিলিয়ে যায় এক মুহূর্তে। চোখ দুটো সংকুচিত হয়ে যায় রাগে, অপমানে, সাইলাস গর্জে ওঠে

“কী করলে তুমি এটা? জানো এই স্যুটটার দাম কত?”

নাইলা একচুলও নড়ে না।সোজা তাকিয়ে থাকে।চোখে বিন্দুমাত্র ভয় নেই।

“দাম দিয়ে আমি কী করব? তোমার নোংরা ধোঁয়ার পে-ব্যাক দিলাম। এখন কেমন লাগছে মিস্টার সাইলাস?”

সাইলাস কোটের উপর থেকে পানি মুছতে মুছতে এগিয়ে আসে। হঠাৎ করেই নাইলার হাত থেকে ব্রাশটা টেনে নেয়। এক ঝটকায় সেটা আবার বালতিতে ডুবিয়ে সাবানের পানি সহ ছুড়ে মারে নাইলার গায়ে।নাইলা চমকে ওঠে,

“আরে!”

ভেজা কাপড় গায়ে লেগে যায়। ঠান্ডা পানি শরীর বেয়ে নেমে আসে।সাইলাস ঠান্ডা, খোঁচামারা গলায় বলে,

“এখন কেমন লাগছে মিস নাইলা? খুব তো তেজ দেখাচ্ছিলে।শোধবোধ হলো তো?”

নাইলা চোখ বড় করে তাকায়

“তোমার এত বড় সাহস। তুমি আমার গায়ে নোংরা পানি দিলে?”

সাইলাস এক কদম এগিয়ে এসে বলে

“তোমার এত বড় সাহস?!”

নাইলা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে ওঠে

“কি করলে তুমি এটা!”

“তুমি যে পুণ্য কাজ করেছো,”

সাইলাস ব্যঙ্গ করে বলে,

“তার পে-ব্যাক দিলাম।”

“অসহ্য!”

“তুমিও।”

সে আবার ব্রাশটা পানিতে ডুবিয়ে জোরে নাইলার দিকে ছুড়ে মারে।নাইলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।চিৎকার করে ওঠে

“Bastard!!!”

সাইলাস শুধু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।নাইলা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“Fuck this damn smirk of yours!”

সাইলাস চোখে চোখ রেখে বলে,

“Fuck you too.”

নাইলা চারপাশে তাকায়।হঠাৎ তার চোখে পড়ে পানির পাইপ।ঠোঁটে একচিলতে ক্রুদ্ধ হাসি।

“দাঁড়া… মজা দেখাচ্ছি।”

সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পাইপটা হাতে নেয়। এক ঝটকায় উঁচু করে ধরে সোজা সাইলাসের দিকে পানি ছেড়ে দেয়।ঝরঝর করে পানি এসে সাইলাসের মুখে লাগে।সে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে

“আরে থামো! পাগল নাকি? স্টপ ইট"

কিন্তু নাইলা থামে না।এক মুহূর্তের জন্যও না।পানি এসে সাইলাসের মুখ, চুল, স্যুট সব ভিজিয়ে দেয়। কালো স্যুটটা ভারী হয়ে শরীরে লেপ্টে যায়।কিছুক্ষণ পর নাইলা অবশেষে পাইপটা নামায়।সাইলাস পুরো ভিজে গেছে।সে মুখ থেকে পানি মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে তখন নিখাদ ক্রোধ, জমাটবাঁধা।নাইলা বুক ফুলিয়ে বলে,

“কেমন লাগছে এখন? আর আসবে আমার সাথে লাগতে? নেক্সট টাইম তোমাকে এই ফোয়ারার পানিতে চুবিয়ে মারব!”

সাইলাস কিছু বলতে গিয়েও বলে না।শুধু নাইলার দিকে তাকিয়ে থাকে রাগান্বিত চোখে।তারপর হঠাৎ ঘুরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে।কিছুদূর গিয়ে আবার একবার ফিরে তাকায়। যেন কিছু বলবে।ঠিক তখনই,নাইলা ঠোঁট বাঁকিয়ে তার দিকে মিডেল ফিংগার দেখায়।

_____________

সোনালি ইতালির রাস্তা বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পাথরের তৈরি পুরনো রাস্তার উপর সূর্যের শেষ রোদ তির্যকভাবে পড়ছে। দুই পাশে সারি সারি ক্যাফে, জানালার ধারে ঝোলানো ফুলের টব, হালকা বাতাসে উড়ছে সাদা পর্দা। কোথাও কফির তীব্র সুবাস, কোথাও আবার গরম ব্রেড আর অলিভ অয়েলের মিশ্র গন্ধ। দূরে কেউ ভায়োলিন বাজাচ্ছে সুরটা বাতাসে ভেসে এসে রাস্তার কোল ঘেঁষে মিলিয়ে যাচ্ছে।শপিং মল থেকে মাত্র বেরিয়েছে রোজেলিয়া আর রিভেন।

রিভেনের দুই হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ দামী ব্র্যান্ডের কাগজে মোড়া, কিন্তু তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই। চারপাশে কোনো গার্ড নেই। রোজেলিয়ার অসংখ্য অনুরোধের পর আজ সে একা থাকতে রাজি হয়েছে। দু’জনেই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছে, তবে রোজেলিয়ার ড্রেসের ভেতরে ঢোকানো জ্যাকেটটা তাকে একটু… বেশিই গোলগাল দেখাচ্ছে।রোজেলিয়া সেটা বুঝেই বারবার মুখ ফুলিয়ে রিভেনের দিকে রাগ দেখানোর চেষ্টা করছে।

রিভেন অবশ্য বুঝেও না বোঝার ভান করে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে ব্যাগগুলো রাখছিলো।তখনক রোজেলিয়া ডাকে,

“রিভেন।”

“হুম।”

“আমি… আমার খিদে পেয়েছে।”

রিভেন থেমে তাকায় রোজেলিয়ার দিকে।

“খিদে পাচ্ছে? আচ্ছা, সামনে একটা রেস্টুরেন্ট আছে খাবারের মান ভালো। সেখানে চলো।”

সে হাত ধরতে গেলে রোজেলিয়া একটু ইতস্তত করে বলে—

“উম্… আসলে এই খিদেটা… সেই খিদে না।”

রিভেন ভ্রু উঁচু করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ কিছু বুঝে ফেলে।

তার গলা নেমে আসে, চোখে খোঁচা খোঁচা দৃষ্টি,

“তোমার মাথা ঠিক আছে? এটা রাস্তা।”

রোজেলিয়া অবাক চোখে তাকায়।

“মানে?”

রিভেন তার কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নেয়। গলার কাছে ঠোঁট এনে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে,

“হঠাৎ এত রোমান্টিক মুড কেন? যেখানে-সেখানে এসব প্রস্তাব দিচ্ছো?”

এক ভ্রু উঁচু।

“কাহিনি কী, হ্যাঁ?”

রোজেলিয়া এবার সব বুঝে যায়।

“আল্লাহ!”

সে এক ঝটকায় রিভেনকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়।

"Seriously! আপনি আস্ত একটা অসভ্য, নির্লজ্জ আর বেহায়াগিরির শিরোমণি! আমি কী বলছি আর আপনি কী ভাবছেন!”

বলে পেছন ফিরে সোজা হাঁটা ধরে।রিভেন কয়েক সেকেন্ড থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে রোজেলিয়ার হাত ধরে টেনে নিজের দিকে ফেরায়।হালকা হাসি, কিন্তু চোখে কৌতূহল,

“আচ্ছা সরি। কী হয়েছে বলো? তুমি কিসের কথা বলছিলে?”

রোজেলিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নরম গলায় বলে,

“আমি আইসক্রিম ক্রেভিং করছিলাম… আর আপনি কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছেন ছিঃ”

রিভেন চোখ ছোট করে।

“আইস ক্রিম?”

রোজেলিয়া মাথা নাড়ে।রিভেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।

“তুমি আইসক্রিম খেতে চাও?”

আবার মাথা নাড়া।

“আমার খুব শখ অনেকগুলো আইসক্রিম নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাবো।”

রিভেন আকাশের দিকে একবার তাকায়।

“রোজ, seriously? আজকের ওয়েদার দেখেছো? এমনিতেই ঠান্ডা পড়ছে, তার উপর আইসক্রিম?”

রোজেলিয়া ঠোঁট কামড়ে বলে,

“রিভেন...প্লিজ.”

রিভেন একদম কঠোর।

“না। কোনো আইসক্রিম না।”

রোজেলিয়া তার হাত চেপে ধরে। চোখে অনুরোধ, গলায় নরম জেদ,

“প্লিজ জাস্ট একটা রিকোয়েস্ট করলাম। প্লিজ না কোরো না…”

রিভেনের আপত্তি দেখে রোজেলিয়া আর সময় নেয় না।সে হঠাৎ রিভেনের হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে আনে। কাছাকাছি এসে, কণ্ঠ একেবারে নরম করে,

"প্লিজ...হাবি.”

রিভেন যেন বিদ্যুৎ খায়।এক ঝটকায় তাকিয়ে ফেলে।

“কি বললে?”

রোজেলিয়া চোখ নামিয়ে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি—

“Hubby…”

রিভেন এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে।

“Fuckk!!”

একটু থেমে হাল ছেড়ে দেওয়া স্বরে বলে,

“আচ্ছা, চলো। আইসক্রিম কিনে দিচ্ছি।”

কয়েক মিনিট পর ছোট্ট একটা জেলাতো শপ থেকে রিভেন এক বক্স আইসক্রিম কিনে নেয়। রাস্তায় বেরোতেই রোজেলিয়া আর অপেক্ষা করে না। সে আইসক্রিম হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খাচ্ছে।মুখে নিখাদ আনন্দ।আর রিভেন কালো জ্যাকেট, হাতে আইসক্রিমের বক্স, নিঃশব্দে তার পেছনে হাঁটছে।বিরক্ত নয়, বরং অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার চোখে।হঠাৎ রোজেলিয়া থেমে যায়।এক মুহূর্তে ঘুরে রিভেনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আপনি ও একটু টেস্ট করে দেখুন।”

রিভেন তাকায়।প্রথমে রোজেলিয়ার চোখে, তারপর তার হাতে থাকা আইসক্রিমের দিকে।কিন্তু কিছু বলে না।হঠাৎ সে রোজেলিয়ার হাত ধরে।ধীরে আইসক্রিমটা তুলে তার ঠোঁটের কাছে ছুঁইয়ে দেয়।রোজেলিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিভেন ঝুঁকে পড়ে।তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় রোজেলিয়ার ঠোঁটে।

ঠান্ডা আইসক্রিম আর উষ্ণ নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যায়।রিভেন ঠোঁটের পাশেই লেগে থাকা আইসক্রিমটুকু আলতো করে খেয়ে নেয়।চুম্বনটা ছোট, কিন্তু গভীর।সে সরে এসে, রোজেলিয়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু গলায় বলে,

“আইসক্রিমের স্বাদ কখনো এত ভালো লাগেনি, রোজ…কারণ এটা শুধু ভ্যানিলা না এটার সাথে মিশে আছে আমার স্ত্রীর ছোঁয়া,তার নিঃশ্বাস,আমার দুর্বলতা আর নেশা।”

রোজেলিয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে।কান দুটো লাল হয়ে যায়।হালকা কাঁপা গলায় রোজেলিয়া আমতা-আমতা করে বলে,

“আ…আমার পা…পানির পিপাসা পাচ্ছে।”

রিভেন বাঁকা হাসি হাসে।চোখে সেই চেনা আত্মবিশ্বাস, কণ্ঠে নিশ্চিন্ত ভর,

“আচ্ছা, আমি পানি আনছি।তুমি গাড়ির কাছে যাও।”

বলেই সে পাশের শপের দিকে এগিয়ে যায়।রোজেলিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।রাস্তাটা তখন অদ্ভুত রকম শান্ত।ইতালির সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, বাতাসে হালকা ঠান্ডা। দূরে ক্যাফেগুলোর আলো জ্বলছে, কিন্তু এই পাশটা তুলনামূলক ফাঁকা।হাতে ধরা আইসক্রিমটা শেষ করে সে ফয়েলটা ভাঁজ করে।

ঠিক তখনই,পেছন থেকে কেউ তার বাহু চেপে ধরে।রোজেলিয়ার শরীর ঝাঁকুনি খায়।সে ঘুরে তাকায়।একজন মধ্যবয়সী লোক ,চোখ আধখোলা, দৃষ্টি এলোমেলো।পায়ে টালমাটাল ভর।তার শরীর থেকে তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ উঠে এসে। রোজেলিয়ার শ্বাস আটকে দেয়।রোজেলিয়া বিরক্তি আর আতঙ্কে হাত ঝেড়ে ফেলে,

“কি করছেন! হাত ছাড়ুন।”

লোকটা অস্পষ্ট, মাতাল কণ্ঠে হেসে বলে,

“Darling… don’t be shy,”

হাসিটা বিকৃত, দাঁতে মদের দাগ।সে আরও কাছে আসে।

রোজেলিয়া এক কদম পিছিয়ে যায়,

“শরুন। এখনই।”

লোকটা থামে না।

“Come to me, babygirl.”

এই শব্দে রোজেলিয়ার বুক কেঁপে ওঠে।সে কিছু বোঝার আগেই লোকটা আবার তার হাত শক্ত করে ধরে।

“Ahh get off me!”

রোজেলিয়া ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে।কিন্তু মাতাল লোকটার গ্রিপ অদ্ভুতভাবে শক্ত।

“Come to me, babygirl,”

সে আবার বলে কণ্ঠে বিকৃত হাসি।রোজেলিয়া এক পা পিছিয়ে যায়,কণ্ঠে ঘৃণা জমে ওঠে,

“Touch me again and I’ll scream.”

লোকটার চোখ চিকচিক করে ওঠে।হুমকিটাকে মজা ভেবে নেয়।

“Scream?”

সে কাঁধ ঝাঁকায়,

“People scream all the time, amore.”

তার হাত রোজেলিয়ার কবজিতে চেপে ধরে, চাপটা অস্বস্তিকর, জোরাজুরি ভরা।

“Come on…Pretty girls shouldn’t walk alone.”

রোজেলিয়ার বুকের ভেতর আতঙ্ক আর রাগ একসাথে জ্বলে ওঠে।সে দাঁত চেপে বলে

“Get. Off. Me.”

লোকটা জবাব দেয় না।রোজেলিয়ার বুক ধক করে ওঠে। সে ব্যাগে হাত ঢোকায় এক মুহূর্তও নষ্ট না করে পারফিউমের বোতল বের করে লোকটার চোখের দিকে স্প্রে করে দেয়।

“Ahhh!”

লোকটা পিছিয়ে যায়, চোখ চেপে ধরে গালি দিতে থাকে।

"you slut "

এই সুযোগে রোজেলিয়া দৌড় দেয়। বুক ধকধক করছে, পা কাঁপছে, নিশ্বাস ঠিকমতো আসছে না।মোড় নিতেই সামনে শপের আলো দেখে সে আরও জোরে দৌড়ায়।ঠিক তখনই,সে কারো শক্ত বুকের সাথে ধাক্কা খায়। ভারসাম্য হারিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু শক্ত দুটি হাত তাকে ধরে ফেলে।রোজেলিয়া চোখ তুলতেই দেখে ,রিভেন।এক সেকেন্ডের জন্য সে কিছু বুঝতে পারে না। পরের মুহূর্তেই সে ভেঙে পড়ে, দুহাতে রিভেনের কোট চেপে ধরে, শরীর কাঁপছে।

“রি… রিভেন…”

রিভেন স্তব্ধ হয়ে যায়।তার চোখে বিস্ময়, দুশ্চিন্তা একসাথে।

“রোজ? কী হয়েছে?”

রোজেলিয়া কিছু বলতে পারে না। শুধু তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। নিঃশব্দে, দম আটকে আসা কান্না।রিভেন চারপাশে দ্রুত তাকায় রাস্তা প্রায় ফাঁকা। সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে থাকে। তারপর এক সেকেন্ড দেরি করে না।রোজেলিয়াকে আলতো করে কোলে তোলে আর গাড়ির দিকে নিয়ে যায়।গাড়িতে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে।ইঞ্জিন স্টার্ট হয়।কিছুক্ষণ নীরবতা।

রোজেলিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ ভেজা।রিভেন একবার তাকায়, তারপর ধীরে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখে।

“আমি পানি কিনতে গিয়ে কল আসায় দেরী হয়ে গিয়েছে …”

কণ্ঠে অপরাধবোধ স্পষ্ট।

“কিছু কী হয়েছে তোমার সাথে”

রোজেলিয়া কোনো উত্তর দেয় না। রিভেন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কোনো রেসপন্স না পেয়ে ভারী নিশ্বাস ছেড়ে গাড়ি চালাতে থাকে।গাড়ি এগিয়ে চলে শহরের আলো পেছনে ফেলে,আর ভিতরে জমে থাকা ভয় ধীরে ধীরে নীরবতায় মিশে যায়।

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন