#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক
পর্ব ২০
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
রিভেন তার অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।ঘরটা আধো অন্ধকার। কেবল ডেস্ক ল্যাম্পের হলদেটে আলো ছড়িয়ে আছে টেবিলজুড়ে। সামনে ছড়ানো কিছু ফাইল,কিন্তু তার চোখ কোনো পাতাতেই স্থির নেই।ডান পাশে রাখা হুইস্কির বোতলটা থেকে গ্লাসে ঢেলে নেয় সে।এক চুমুক নেয়।তারপর আরেকটা।ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ে।
“Come in.”
দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে এনজো। হাতে একটা ল্যাপটপ।
“Boss,”
এনজো গলা পরিষ্কার করে একটু নিচু হয়ে বলল,
“নোভেন্তা ডি পিয়াভে-র সেই রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ রিট্রিভ করা হয়েছে। আপনি যা দেখতে চেয়েছিলেন...”
রিভেন চেয়ার থেকে একচুলও নড়ল না। শুধু চোখের মণি জোড়া ধীরলয়ে এনজোর দিকে ঘোরাল। সেই চাহনিতে কোনো মায়া নেই।
“স্ক্রিনটা এদিকে ঘোরাও।”
এনজো টেবিলের ওপর ল্যাপটপ রেখে স্ক্রিনটা রিভেনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে প্লে বাটন চাপল। ভিডিওটা শুরু হতেই রিভেনের হাতের গ্লাসের ওপর তার আঙুলগুলোর চাপ বাড়তে লাগল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে,রোজেলিয়া একা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে আইসক্রিমের বক্স। তারপর সেই মাঝবয়সী মাতাল লোকটা টলতে টলতে এগিয়ে এল। লোকটা যখন রোজেলিয়ার বাহু খামচে ধরল আর বিকৃতভাবে হাসল, রিভেনের চোয়ালের হাড়গুলো দপদপ করে উঠল।
ভিডিওতে রোজেলিয়ার সেই আতঙ্কিত মুখ, তার ছটফটানি আর লোকটার অশালীন অঙ্গভঙ্গি দেখে রিভেনের ভেতরের জানোয়ারটা খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। ভিডিওটা শেষ হওয়ার আগেই রিভেন হাতের হুইস্কির গ্লাসটা পুরো শক্তিতে দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারল।
দামী কাঁচের টুকরোগুলো হীরের কণার মতো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। এনজো অবচেতনে দুই পা পিছিয়ে গেল। রিভেন এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন অনিয়মিত, বুকটা রাগে কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
“মাদারফাকার”
রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল। সে দুই হাতে নিজের চুল মুঠো করে ধরল, যেন মাথার ভেতরের উত্তাপটা সহ্য করতে পারছে না।
“এই জানোয়ারের জন্য... এই একটা নর্দমার কীটের জন্য আমার রোজেলিয়া কাল সারারাত আতঙ্কে ঘুমাতে পারেনি। সে সারারাত আমার বুকে মুখ লুকিয়ে থরথর করে কেঁপেছে। ওই শুয়োরের বাচ্চা আমার স্ত্রীকে স্পর্শ করার সাহস পেল কোত্থেকে?”
রিভেন হঠাৎ ঘুরে এসে এনজোর কলারটা এক হাতে খামচে ধরল। তার চোখ দুটো এখন টকটকে লাল, ঠিক যেন নরকের আগুন জ্বলছে সেখানে। সে একদম ফিসফিস করে কিন্তু বরফ শীতল স্বরে বলল,
“এনজো, আমার কথাগুলো কানে গেঁথে নাও। আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে ওই আবর্জনাটাকে আমার পায়ের নিচে চাই। ও কোথায় লুকিয়ে আছে, কোন গর্তে মুখ গুঁজে আছে আই ডোন্ট গিভ আ ফাক। যদি দুই ঘণ্টার মধ্যে ও আমার সামনে না থাকে, তবে তোমার কপালে দুঃখ আছে।”
এক সেকেন্ড থামল রিভেন, তারপর কন্ঠস্বর আরও এক ধাপ নামিয়ে বলল,
“ওকে মৃত আনবে নাকি জ্যান্ত, সেটা তোমার ওপর। কিন্তু আমি চাই ওর ওই হাত দুটো যেন আস্ত থাকে। যে হাত দিয়ে ও রোজকে ছুঁয়েছে, সেই হাত আমি নিজে ছিঁড়ে নেব।”
এনজো মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল,
“ইয়েস বস। দুই ঘণ্টার মধ্যে ও আপনার ডেরায় থাকবে।”
এনজো ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। রিভেন একা দাঁড়িয়ে রইল। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে পিশাচি হাসিতে বিড়বিড় করে বলল,
“তুই আমার দুনিয়ায় হাত দিয়েছিস... তুই আমার একমাত্র দুর্বলতাকে ভয় পাইয়েছিস। তোকে এমন মৃত্যু দেব যে শয়তানও তোকে নরকে জায়গা দিতে ভয় পাবে, শুয়োরের বাচ্চা!”
_
ঘরের ভেতর গভীর নীরবতা।মাঝরাত পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের ফ্যাকাসে আলো এসে বিছানার এক কোণে পড়ে আছে।রিভেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু তার অবচেতন মন সবসময়ই রোজেলিয়ার প্রতি সজাগ। রোজেলিয়া তার বুকের একপাশে মুখ গুঁজে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল।
হঠাৎ করেই রোজেলিয়ার শান্ত শরীরটা এক তীব্র ঝটকায় কেঁপে উঠল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে, কপালে জমে উঠেছে হিমশীতল ঘামের বিন্দু। বন্ধ চোখের পাতায় যেন কোনো বিভীষিকা তাড়া করছে তাকে। আচমকা সে এক আর্তনাদ করে বিছানায় উঠে বসল।
“না...!”
রোজেলিয়ার বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। চোখের মণি দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে, যেন অন্ধকারের মাঝেও সে সেই দুঃস্বপ্নটাকে দেখতে পাচ্ছে। রিভেন এক সেকেন্ডের ব্যবধানে জেগে উঠল। তার পেশাদারী সতর্ক সত্তা মুহূর্তেই সক্রিয়।
“রোজেলিয়া? রোজ!”
রিভেন দ্রুত উঠে বসে তার কাঁধ আঁকড়ে ধরল।
“কী হয়েছে? তাকাও আমার দিকে"
রোজেলিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে দুহাতে বিছানার সাদা চাদরটা এমনভাবে খামচে ধরে আছে যে তার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে। তার দৃষ্টি শূন্য, থরথর করে কাঁপছে ঠোঁট দুটো। রিভেন অত্যন্ত সযত্নে তার মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে মায়াবী গলায় সুধাল,
“কী দেখেছ রোজ? কোনো খারাপ স্বপ্ন? আমি এখানে আছি তো তোমার পাশে।”
রোজেলিয়া এবার রিভেনের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে টলটল করছে নোনা জল। সে ধরা গলায় শুধু মাথা নাড়ল। রিভেন পাশের সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিল। নিজের হাতে গ্লাসটা রোজেলিয়ার ঠোঁটের কাছে ধরে নরম স্বরে বলল,
“একটু পানি খাও। গলাটা শুকিয়ে গেছে তোমার। জাস্ট টেক এ সিপ।”
রোজেলিয়া দু-তিন চুমুক পানি খেল, কিন্তু তার হাত তখনও কাঁপছে। রিভেন গ্লাসটা সরিয়ে রেখে রোজেলিয়াকে এক নিবিড় আলিঙ্গনে নিজের কাছে টেনে নিল। এক হাত তার পিঠে পরম মমতায় বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে বলো কী দেখেছ। মনের ভেতরে চেপে রেখো না। আমি থাকতে কোনো অন্ধকার তোমাকে ছুঁতে পারবে না।”
রোজেলিয়া কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রিভেনের বুকের ধকধকানি শুনল। তারপর ভাঙা, রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
“আমি... আমি নানুকে দেখছিলাম..”
রিভেন একটু থমকে গেল।
“নানু?
রোজেলিয়ার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে রিভেনের শার্ট ভিজিয়ে দিল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“কী অদ্ভুত একটা সপ্ন.. দেখ..দেখলাম নানুর বাড়িতে গিয়েছি নানু বিছানায় শুয়েঁ আছেন।আমি যেতেই হঠাৎ পিছন থেকে কে যেনো এসে নানুর পেটের একপাশে ছুড়ি ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়। র..রক্ত দেখলাম আমি চিৎকার করছিলাম। খুব ভয়ানক সপ্ন রিভেন। অনেক বছর দেশে যাওয়া হয়নি। আমি ওনাকে অনেকদিন দেখি না রিভেন... ওনার কথা খুব মনে পড়ছে। আমার খুব ভয় করছে।”
রিভেন রোজেলিয়াকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। তার এক হাত রোজেলিয়ার মাথায়, অন্য হাত পিঠে। সে রোজেলিয়ার কপালে তপ্ত এক চুমু দিয়ে গম্ভীর অথচ শান্ত স্বরে বলল,
“শান্ত হও আমার জান। ওটা শুধু একটা স্বপ্ন ছিল। তোমার নানু ভালো আছেন এটা একটা সপ্ন মাএ”
রোজেলিয়ার শ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।তার হাত শক্ত করে রিভেনের জামা আঁকড়ে ধরে।রিভেন এতক্ষণ গতরাতের কথা ভাবছিল। রোজেলিয়ার কথা ভাবতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। যার কারণে রোজেলিয়া ভয় পেয়েছে তাকে সে ছাড়বেনা। কিছুতেই না।রিভেন শান্ত থাকতে পারছেনা। লোকটাকে খুজে বের করে তারপর কি করবে রিভেন জানেনা। রিভেন চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে।
________________
হোটেল রুমটা আধো অন্ধকার।মৃদু হলুদ আলো দেয়াল বেয়ে নামছে।বাইরে শহরের আলো ঝিলমিল করছে কাচের জানালার ওপার থেকে।মার্কো বিছানার কিনারে বসে আছে।গায়ে শার্ট নেই, শক্ত কাঁধ আর বুক খোলা। লম্বা চুলগুলো পেছনে বেঁধে রাখা,ঘাড়ের কাছে হালকা ঘাম জমে আছে।এক হাত পাশে বসে থাকা মেয়েটার কোমর আলগাভাবে জড়ানো।
মেয়েটা হাসতে হাসতে গ্লাসটা মার্কোর ঠোঁটের কাছে এগিয়ে দেয়।মার্কো একটু ঝুঁকে এক চুমুক নেয়। তারপর মেয়েটার কোমরে হাতটা আরেকটু শক্ত করে রাখে।মেয়েটা তার বুকে হাত বুলিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।মার্কোর ভ্রু কুঁচকে যায়।সে বিরক্তির সঙ্গে মেয়েটাকে আলতো করে সরিয়ে ফোনটা তোলে।
“Yeah?”
ওপাশ থেকে এনজোর কণ্ঠ
“Bro, where the hell are you?”
মার্কো হালকা হেসে বলে,
“At a hotel. Why ? Are you missing me?”
এনজো ওপাশ থেকে ত্যক্ত হয়ে বলল,
“অবশ্যই হোটেলেই থাকবে! I swear মার্কো, তোর মতো চরিত্রহীন লোক এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা নেই।”
মার্কো শান্ত গলায় বলল,
“রিলাক্স এনজো। কাজের কথা বল, কী চাই তোর?”
এনজোর গলা এবার একদম নিচে নেমে এল, যা শুনে মার্কোর কৌতুকমাখা মুখটা মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।
“ Boss need you now। কোনো অজুহাত চলবে না।”
মার্কোর দৃষ্টি জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে স্থির হয়ে গেল। মেয়েটি তখনো তার কাঁধে মাথা রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মার্কো তাকে শক্ত হাতে সরিয়ে দিল।
“এখনই? "
“হ্যাঁ মার্কো, এখনই। নট লেটার, নট টুমরো। বস আজ একদম খুনের মেজাজে আছেন। সো, নিজের এই ‘ওমেনাইজার’ অবতারটা দয়া করে বিসর্জন দিয়ে দ্রুত হেডকোয়ার্টারে আয়।”
মার্কো একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল।
“ফাক ”
সে উঠে দাঁড়িয়ে তার কালো জ্যাকেটটা টেনে নিল। বিছানায় পড়ে থাকা মেয়েটি ঠোঁট উল্টে করুণ চোখে তাকাল, কিছু একটা বলতে চাইল অনুযোগের সুরে। কিন্তু মার্কো সেদিকে ফিরেও তাকাল না। এক পলকেই তার চোখের সেই মোহময় দৃষ্টি বদলে গিয়ে এক ঠান্ডা, পেশাদার আর খুনি অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত হলো।
“সরি ডার্লিং, duty call। আর বসের ডাক মানেই হচ্ছে মৃত্যুর পরোয়ানা হয় অন্যের জন্য, না হয় নিজের জন্য।”
_________________
সাতটার বিষণ্ণ সন্ধ্যা তখন মিলানের আকাশে ডানা মেলছে। রোজেলিয়া গোসল সেরে সবেমাত্র বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আলগা ভেজা চুলগুলো থেকে চুঁইয়ে পড়া জলের ফোঁটাগুলো তার কাঁধের ওপর এক শীতল শিহরণ জাগিয়ে যাচ্ছে। হালকা বাতাসে চুলগুলো অবাধ্যের মতো উড়ছে, আর সেই সাথে রোজেলিয়ার মনটাও যেন বারবার গতদিনের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিতে ফিরে যেতে চাইছে। সেই মাতাল লোকটার পৈশাচিক হাসি আর তার কব্জিতে সেই অশুভ স্পর্শের কথা মনে পড়তেই সে শিউরে ওঠে।
সেই কালো ছায়াটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার এক আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। নিজেকে শান্ত করতে সে দ্রুত ঘরে ঢুকে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে রিভেন নামটা দেখে তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল। দু-তিনবার রিং হতেই ওপাশ থেকে সেই গম্ভীর অথচ চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“রোজ?”
রোজেলিয়া একটু ইতস্তত করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল।
“রিভেন... উম... আজকে কি আপনি একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবেন বাসায়? মানে অফিস থেকে কি একটু জলদি আসবেন?”
রিভেন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার কণ্ঠে বিস্ময় আর প্রচ্ছন্ন কৌতূহল,
“কী বললে? হঠাৎ আজ এই অসময়ে সূর্য কোন দিকে উঠল যে আমার রোজ আমাকে এত আগে ফিরে পাওয়ার আবদার করছে?”
রোজেলিয়া জানালার কাঁচের ওপর আঙুল দিয়ে অদৃশ্য কোনো নকশা আঁকতে আঁকতে বলল,
“কেন? আমি কি আপনাকে একটু আগে আসতে বলতে পারি না? আসলে... আজকে আপনাকে একটু বেশিই দরকার।”
রিভেনের গলার স্বরটা মুহূর্তেই বদলে গেল।
“ওহ? আমার রোজ হঠাৎ এত মিষ্টি আর লাজুক কেন হচ্ছে বলো তো? কোনো বিশেষ কারণ? নাকি কালকে সারারাত পাওয়া আমার বুকের উষ্ণতা খুব বেশি মিস করছো?”
রোজেলিয়া লজ্জায় চোখ বুজে ফেলল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঠিকই ফুটে উঠল।
“বেশি কথা বলবেন না! আসবেন কি না সেটা বলুন?আচ্ছা আমি কী আপনাকে এখন ডাকতেও পারবো না ?”
রিভেন হালকা হেসে নিঃশ্বাস ছাড়ে।
“ডাকতে পারবে না কেন… আমি তো বরাবরই তোমারই।”
তারপর একটু থেমে যোগ করে,
“কিন্তু এমন করে ডাকলে আমি কাজ শেষ না করেই ছুটে যাব, বুঝলে?”
রোজেলিয়া ফোনটা কানে চেপে ধরে।
“তাড়াতাড়ি আসবেন… প্লিজ।”
কলটা কেটে দিতেই রোজেলিয়ার হৃদস্পন্দন অকারণেই দ্রুত হতে লাগল। সে দ্রুত আলমারি খুলে সেই নতুন কেনা বাঙালি শাড়িগুলোর দিকে তাকাল। তার আঙুলগুলো শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে ঘুরতে ঘুরতে নীল রঙের একটা গাঢ় সিল্কের ওপর স্থির হলো। ঠিক যেন সন্ধ্যার মেঘমুক্ত আকাশের রঙ।
কিন্তু শাড়ি পরতে গিয়েই বাধল বিপত্তি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে বারবার কুঁচি করার চেষ্টা করছে, আঁচলটা কাঁধে বসাতে গিয়ে বারবার সেটা লুটিয়ে পড়ছে মেঝের ওপর। যতই চেষ্টা করছে, ততই জট পাকিয়ে যাচ্ছে সব। গতরাতের সেই মানসিক ধাক্কার কারণে হয়তো তার হাতদুটো এখনো একটু অবশ লাগছে। বিরক্তি আর চোখে জল নিয়ে সে বিছানার ধারে বসে পড়ল।
হঠাৎ তার মেহরিনের কথা মনে পড়ল। এই মানুষটার গাম্ভীর্যকে সে ভয় পেলেও আজ কেন জানি ওনার কাছেই যেতে ইচ্ছে করল। রোজেলিয়া শাড়িটা কোনোমতে শরীরের সাথে জড়িয়ে নিয়ে টিপটো করে হেঁটে মেহরিনের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“ম... মম?”
রোজেলিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকল।
মেহরিন কিছু জরুরি কাগজ দেখছিলেন। মাথা তুলে রোজেলিয়াকে এই আলুথালু অবস্থায় দেখে তার চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় খেলে গেল।
“বলো রোজেলিয়া, কোনো সমস্যা?”
রোজেলিয়া ঘরের ভেতর ঢুকে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আসলে মম... আমি শাড়িটা পরার অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু কুঁচিগুলো কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না। বারবার সব গুলিয়ে ফেলছি। আপনি কি... আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন?”
মেহরিন কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে রোজেলিয়াকে দেখলেন। ওনার সেই পাথুরে গম্ভীর মুখে খুব সূক্ষ্ম একটা মমতাময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি হাতের কাগজগুলো সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন।
“কাছে আসো,”
মেহরিন শান্ত স্বরে বললেন।
“বাঙালি মেয়ে হয়ে শাড়ি পরতে না পারাটা লজ্জার কিছু নয়, কিন্তু না শেখাটা অপরাধ। আজ আমি পরিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু খুব মন দিয়ে দেখবে। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে এক ধরণের আভিজাত্য লুকিয়ে থাকে, যেটা তোমাকে আয়ত্ত করতে হবে।”
রোজেলিয়া একরাশ স্বস্তি নিয়ে মেহরিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মেহরিন যখন পরম যত্নে রোজেলিয়ার কোমরে শাড়ির ভাঁজগুলো গুঁজছিলেন, তখন রোজেলিয়ার মনে অদ্ভুত প্রশান্তি হচ্ছিল। সে মেহরিনের গাম্ভীর্যের আড়ালে থাকা এক কোমল মায়ের ছায়া খুঁজে পেল।
_________________
রিভেন গাড়ির পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। শহরের আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। আজ তার মাথার ভেতর একটাই ভাব,রোজেলিয়া। এতদিন পর ওর চোখে এমন আগ্রহ, এমন অপেক্ষা… সেটা সে উপেক্ষা করতে পারেনি বলেই সব মিটিং বাতিল করে বেরিয়ে পড়েছে।হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে।রিভেন একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কলটা রিসিভ করে।
“হ্যাঁ?”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কথা শোনার পর তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
“ঠিক আছে,”
একটু থেমে সে বলে,
“আমি আসছি।”
কল কেটে যায়।রিভেন সামনের দিকে ঝুঁকে ড্রাইভারকে বলে,
“ল্যাম্ব্রো নদীর দিকে নাও।”
গাড়ি ঘুরে যায়। চারপাশ ধীরে ধীরে নির্জন হয়ে ওঠে। শহরের আলো পেছনে ফেলে তারা ঢুকে পড়ে অন্ধকার, নিরব রাস্তায়।কুড়ি মিনিটের মধ্যেই তারা নদীর ধারে পৌঁছায়।রিভেন গাড়ি থেকে নামতেই দেখে,মার্কো আর এনজো আগেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনের মুখ গম্ভীর, চোখে অস্বস্তি।
মার্কো সামনে এগিয়ে এসে নীরবে ইশারা করে।রিভেন ধীরে ধীরে সামনে এগোয়।নদীর ধারে, ঝোপের আড়ালে একটা নিথর দেহ পড়ে আছে। শরীরের অবস্থা দেখে বোঝা যায়, মৃত্যুর আগে মানুষটা ভয়াবহ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছে।লোকটার শরীর বিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। পোশাক ছেঁড়া, শরীরের ওপর নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন। হাত দুটো কা*টা এক পাশে আলাদা করে রাখা, যেন কাউকে কিছু দেখানোর জন্যই রেখে যাওয়া হয়েছে। বাতাসে কেমন একটা ভারী, পচা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।রিভেনের চোখ শক্ত হয়ে আসে।
এনজো নিচু গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“স্যার... এটাই সেই জানোয়ার। সেই মাতাল লোকটা, যে ওই রাতে ম্যামের গায়ে হাত দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিল।”
রিভেন কিছু বলে না। শুধু দৃষ্টিটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
“কে করেছে?”
তার কণ্ঠ নিস্তেজ, কিন্তু ভেতরে আগুন জ্বলছে।মার্কো মাথা নাড়ে।
“এখনো নিশ্চিত নই বস। যেভাবে ক্ষতগুলো করা হয়েছে, তা কোনো প্রফেশনাল কিলার বা কোনো গ্যাংস্টারের কাজ
তবে আমাদের লোক না।”
রিভেন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। নদীর পাশের ঠান্ডা বাতাসে তার কোটের পেছনটা হালকা নড়ে ওঠে। চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে কঠিন হয়ে আছে।সে ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে যায়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।
এনজো আবার বলে,
“যেভাবে শরীরটা ফেলা হয়েছে… এটা কাউকে ভয় দেখানোর জন্য। একটা মেসেজ।”
মার্কো এক পা এগিয়ে এসে বলে,
“স্যার… আমরা জায়গাটা সিল করেছি। মিডিয়ার কেউ জানে না এখনো।”
রিভেন ধীরে এগিয়ে যায়।মাটিতে পড়ে থাকা কাটা হাতটার দিকে একবার তাকায়—চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু ঘনীভূত ঘৃণা।সে পা বাড়ায়, বুটের তলা দিয়ে হাতটার উপর চাপ দেয়।এতো জোরে বুটের তলা দিয়ে চাপ দেয় যে হাতটা থেথলিয়ে যায় ।রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমার দুনিয়ায় হাত দেওয়ার সাহস করেছিলি না? এই সেই হাত, যা দিয়ে তুই আমার পবিত্র ফুলটাকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলি!”
রিভেনের কণ্ঠে তখনো কঠিন দৃঢ়তা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে।নদীর ধারে হালকা বাতাস বইছে।হঠাৎ পেছন থেকে ইঞ্জিনের গর্জন শোনা যায়।একটা কালো মোটরসাইকেল দ্রুত এগিয়ে এসে থামে।ধুলো উড়ে যায় চারদিকে।রিভেন ঘুরে তাকায়।হেলমেট খুলে সাইলাস নামল। মুখে ক্লান্তি, চোখে চাপা উত্তেজনা।
“বস…”
সে কাছে এসে হাতে থাকা ফাইলটা এগিয়ে দেয়।রিভেন ফাইলটা নেয়।সাইলাস গলা পরিষ্কার করে বলে—
“লোকটার মৃত্যুটা… একটু সন্দেহজনক লাগছিল। তাই আমি নিজে খোঁজ নিয়েছি।লোকটার মৃত্যুটা যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, আসলে ততটা নয়। একটু বেশিই সন্দেহজনক,”
সাইলাস বিরতি দিয়ে আবার শুরু করল,
“নাম পাওলো মার্তিনি। বয়স ছত্রিশ। ছোটখাটো একটা কাপড়ের ব্যবসা আছে। বড় কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই, এমনকি পাড়ার মাস্তানদের সাথেও ওর কোনো ওঠাবসা ছিল না।”
রিভেন ধীরে ফাইলটা খুলে দেখে। চোখ কুঁচকে আসে।
সাইলাস বলতে থাকে,
“যেদিন ম্যাডামকে সে বিরক্ত করেছিল, সেদিন রাতে সে বাড়ি ফেরেনি। শেষবার তাকে দেখা গেছে Via Marco Polo, 30020 Noventa di Piave এলাকায়”
রিভেনের চোখ ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে।
“তারপর?”
কণ্ঠে অস্বাভাবিক স্থিরতা।
সাইলাস একটু থেমে বলে
“তারপর আর কোনো খোঁজ নেই। মোবাইল বন্ধ। কোনো শত্রু নেই, কোনো পুরোনো ঝামেলাও না। সাধারণ মানুষ ছিল।”
এই কথাটা রিভেনের কানে ঢুকে যেন আটকে যায়।সে ধীরে মাথা তোলে।চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে।রিভেন কিছুক্ষণ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
চোখের পাতা না নড়েও যেন হাজারটা হিসাব করছে সে।তারপর ধীরে মাথা তোলে।
“বিষয়টা…সন্দেহজনক।”
কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা স্পষ্ট।এনজো এক ধাপ এগিয়ে আসে। মুখে চিন্তার রেখা।
“বস… আপনি মনে করতে পারছেন? যেদিন আপনি প্যারিস যাচ্ছিলেন, সেদিনই আমাদের গাড়িতে অ্যাটাক হয়েছিল। ঠিক সেই দিনই ম্যাডামকে কেউ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।”
রিভেনের চোখ ধীরে সংকুচিত হয়।
“আর আজ..”
এনজো থামে, তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
“আজ আমরা দেখি সেই লোকটাই খুন হয়ে পড়ে আছে। যাকে শেষবার ম্যাডামের কাছাকাছি দেখা গিয়েছিল।”
রিভেন এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে।শ্বাসটা ভারী হয়ে ওঠে।
“মানে,” সে ধীরে বলে,
“কেউ খুব পরিষ্কারভাবে আমাদের চারপাশে ঘুরছে।”
এনজো মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
“হ্যাঁ, বস। আর যেভাবে খুনটা করা হয়েছে…এতো নৃশংসভাবে বিষয়টা আমার কাছে সাধারণ মনে হচ্ছে না”
রিভেন নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।চোখের সামনে ঢেউগুলো ধীরে ভাঙছে, কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় উঠেছে।
“সবকিছুর মাঝেই… কেন জানি রোজেলিয়াই জড়িয়ে পড়ছে।”
এনজো মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ বস… ঘটনাগুলো খুব কাছাকাছি ঘটছে। কাকতালীয় মনে হচ্ছে না আর।”
রিভেন আর কিছু বলে না।নদীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে থাকে—যেন সেখানেই উত্তর লুকিয়ে আছে।রিভেন এর হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায় ।কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ গলা শক্ত হয়ে ওঠে।
“সাইলাস।”
“জি, বস।” সাইলাস এক পা এগিয়ে আসে।
“এক ঘণ্টার মধ্যে ফ্লাইট রেডি করো।”
রিভেন ধীরে ঘুরে তাকায় সবার দিকে,
“তুমি, এনজো আর মার্কো.. আমার আর রোজেলিয়ার সাথে আসছো।”
সাইলাস মাথা ঝাঁকায়।
“আচ্ছা বস।”
রিভেন আবার বলে,
“লোরেঞ্জো আর জ্যাক এখানেই থাকবে আর সব সামলাবে।”
রিভেন শেষবারের মতো পেছনে ফিরে তাকায়।মাটিতে পড়ে থাকা নিথর দেহটার দিকে তাকায় আর ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে
“এটাকে গভীর জঙ্গলের কোথাও পুঁতে ফেলো যেখানে সূর্যের আলোও পৌঁছায় না। ওর ডিএনএ-র একটা বিন্দুও যেন অবশিষ্ট না থাকে।”
এনজো মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানায়।সাইলাস একবার নীরবে লাশটার দিকে তাকায়, তারপর লোকদের ইশারা করে দেয় কাজ শেষ করার জন্য।রিভেন আর কিছু বলে না।
পিছনে না তাকিয়েই সে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।বুটের তলায় কাঁকর পিষে শব্দ ওঠে।গাড়ির দরজা খুলে সে ভেতরে বসে পড়ে মুখে পাথরের মতো কঠিন ভাব।
_______________
রিভেন বাড়িতে ঢুকেই হঠাৎ থমকে যায়। তার মন খেয়াল করে, আজ রোজেলিয়া তার কাছে কতটা আগ্রহী হয়ে কল করে তাড়াতাড়ি আসার আবেদন করেছে কিন্তু আজও আসতে দেরী হয়ে গেছে । একটু খারাপ লাগলেও, দ্রুত নিজের মনকে স্থির করে রিভেন ছুটে যায় বেডরুমের দিকে।
দরজা খোলার সাথে সাথেই চোখে পড়ে রোজেলিয়া। ফ্লোরে বসে আছে, মাথা বিছানার পাশে ঠেকানো। ঘুমের মধ্যে, অচেনা স্বপ্নের মতো ভিজে থাকা তার রূপ যেন ধরা দিচ্ছে রিভেনের চোখের সামনে। রিভেন লক্ষ্য করে রোজেলিয়ার পরনে একটি নীল রঙের শাড়ি হালকা নীল, সরল ডিজাইন, কিন্তু বাঙালি রূপে তার সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠেছে। রিভেন ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে, পুরো শরীরে এক নজরে রোজেলিয়াকে স্ক্যান করে। বিয়ের দিন সাদা শাড়িতে দেখেছিল, কিন্তু আজ নীল শাড়িতে সে যেন আরও কোমল, আরও রহস্যময়।
হঠাৎ রিভেন জুকে রোজেলিয়াকে কোমলভাবে কোলের মধ্যে তুলে নেয়। রোজেলিয়ার মাথা ধীরে ধীরে তার বুকের সাথে ঠেকতে থাকে। রিভেন তাকে আলতোভাবে বিছানায় শুইয়ে দেয়।রোজেলিয়া হঠাৎ জেগে ওঠে, চোখে অচেনা আশ্চর্য্য, তারপর কণ্ঠে ভোরের মিশ্রিত উত্তেজনা—
“রিভেন…”
রিভেন ধীরে রোজেলিয়ার কপালে একটি সূক্ষ্ম চুমু রাখে।
“এজন্যই আমাকে আজ তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিলে?”
রোজেলিয়া অভিমানি সুরে উত্তর দেয়,
“হম… কিন্তু আপনি তো আসলেন না। আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজ দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার শখ গুলোর কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে।”
রিভেন ধীরে, কোমল স্বরে বলে,
"সরি,,রোজ পেটাল…”
রোজেলিয়া শোয়া থেকে উঠে বসে, কিন্তু রিভেনের কথায় একদম পাত্তা দেয় না। সে রেগে আছে, মনে কষ্টে ফেটে যাচ্ছে,একটু সময় চেয়েছিল, তাও দিতে পারলো না। রোজেলিয়ার জন্য এটা একরকম অবিশ্বাস্য বেদনাদায়ক। এত কষ্ট করে নিজেকে পরিবর্তন করেছে রিভেনের জন্য, আর রিভেন কিনা আসলোনা!
রোজেলিয়া বিছানার ধারে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু রিভেন এক টান মেরে তাকে কোলে বসিয়ে নেয়। তারপর বাম হাতে ধীরে তার কপালের দিকে চুলগুলো কানে পেছনে সরিয়ে দেয়। রোজেলিয়া কিছু বলতে চাইলে রিভেন তার আঙুল দিয়ে ঠামিয়ে রাখে। রোজেলিয়া চিবুক নিচু করে তাকায়, রিভেন এক হাতে তার চোয়ালে উচু করে চোখে চোখ রেখে, কোমল এবং অদ্ভুত স্বরে বলে,
“সরি... সত্যি খুব অন্যায় করে ফেলেছি। এবার অন্তত এই অপরাধীটাকে ক্ষমা করা যায় না?”
রিভেনের স্বর শুনে রোজেলিয়া কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়। তবে দীর্ঘস্থায়ী হয় না,সে খামোখা খোলা মন দিয়ে রিভেনকে ক্ষমা করতে চায় না। তাই সে রিভেনের কোল থেকে নেমে গটগট করে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল।
“আমি এই শাড়ি এখনই পাল্টে ফেলব। যার জন্য পরা, সেই যখন দেখল না, তখন এটা পরে থাকার কোনো মানে হয় না।”
“শাড়ী চেঞ্জ করো না।”
“করব, তাতে আপনার কি?”
রোজেলিয়া জিজ্ঞেস করে।
“আমার অনেক কিছু। তুমি এই শাড়ি বদলাতে পারবে না।”
রিভেন তাকে সামনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, মাথা হালকা নিচু করে বলে,
“সারপ্রাইজ আছে, চলো দেখবে।”
সারপ্রাইজ কথাটি শুনে রোজেলিয়ার রাগের সব স্মৃতি মুহূর্তে মুছে যায়। রিভেন তাকে ছেড়ে দেয় এবং টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যায়, যেন সে গোসল করতে পারে।পিছন থেকে রোজেলিয়া হালকা হেসে বলে,
“শাড়ি চেঞ্জ করব না কেন? শাড়িতে ভালো লাগছে???”
রিভেন দরজার আড়ালে যাওয়ার আগে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল
“খুব বাজে লাগছে। একদম জঘন্য! জাস্ট লাইক এ ক্রিপি রোজ পেটাল।”
রোজেলিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জিভ ভেঙাল।
“লায়ার! মিথ্যাবাদী লোক একটা! নিজে তো চোখ সরাতেই পারছেন না, আবার বলছেন বাজে লাগছে!”
সে কিছুক্ষণের জন্য মুখ বন্ধ করে রাখে, এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে শুরু করে। নিজের প্রতিফলনে তাকিয়ে বলে,
" কতো সাহস আছে আমাকে বলে, বাজে লাগছে?”
কিছুক্ষণ পর রিভেন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে, কোমরে টাওয়েল পেচানো। সে রোজেলিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে, আয়নায় রোজেলিয়ার প্রতিফলন দেখে। সে চোখ ফেরাতে পারছেনা। রিভেনের এভাবে তাকানো দেখে রোজেলিয়া বিরক্ত হয়ে বলে,
“লাইয়ার। আয়নায় কী দেখছেন? বাজে জিনিস কি কেউ এতক্ষণ তাকিয়ে দেখে?”
রিভেন রোজেলিয়ার কথায় একদম পাত্তা না দিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। তার মুখে সেই পরিচিত কঠিন ভাব, চোখে যেন কোথাও দূরে হারিয়ে যাওয়া কিছু। সে লাগেজ গুছাতে থাকে। আর রোজেলিয়াকে বলে,
“রেডি হও,আমাদের বেরোতে হবে।”
রোজেলিয়া অবাক হয়ে তাকায়।
“কোথায় যাচ্ছি?”
রিভেন উত্তর দেয় না। শুধু ঘড়ির দিকে একবার তাকায়। রোজেলিয়া একটু বিরক্ত হয়, আবার কৌতূহলও বাড়ে।
“রিভেন… বলছ না কেন? হঠাৎ করে কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
রিভেন কেবল বলে,
“দেশের বাইরে।”
এইটুকু বলেই থেমে যায়।
রোজেলিয়া অবাক।
“দেশের বাইরে? কোথায়? কেন?”
কোনো উত্তর নেই। রিভেন কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।পেছনে রোজেলয়াকে উদ্দেশ্য করে লাগেজ গুছিয়ে নিতে বলে। রোজেলিয়া বিরক্ত হয়ে লাগেজ গুছানো শুরু করে। কিন্তু মনটা ভার হয়ে থাকে।গাড়িতে বসার পরও রোজেলিয়া বারবার প্রশ্ন করে,
“ইতালি ছেড়ে কোথায় যাচ্ছি?”
“কতদিনের জন্য?”
“আমাকে কিছু তো বলো, প্লিজ…”
রিভেন গাড়ি চালাতে চালাতে কেবল একবার চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে আবেগ আছে, চিন্তা আছে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
“তুমি শুধু আমার সাথে চলো,এখন এটাই যথেষ্ট।”
রোজেলিয়া চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। শহরের আলো পেছনে ছুটে যায়, আর তার ভেতরে অজানা আশঙ্কা আর অজানা উত্তেজনা একসাথে জমে ওঠে।সে বুঝতে পারে এই যাত্রা সাধারণ কোনো ভ্রমণ নয়। আর রিভেন… কিছু লুকাচ্ছে। হয়তো সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছে। রিভেনের কথার পর রোজেলিয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক দ্বিধা থাকলেও সে চুপচাপ জানালার পাশে বসে পড়ে। প্লেন টেক অফ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখ ভারী হয়ে আসে। মাথাটা ধীরে ধীরে সিটের পাশে হেলে পড়ে। চোখ বুজে আসে।
রিভেন পাশ থেকে সব দেখছিল। সে নিজের সিটে হেলান দিয়ে বসে, এক হাত কপালের কাছে ঠেকিয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকায়। ঘুমের মধ্যে তার মুখটা শান্ত, নির্ভার, যেন পৃথিবীর কোনো ঝামেলা নেই। এই শান্ত মুখটাই রিভেনের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা জাগিয়ে তোলে। সে খুব সাবধানে তার মাথাটা নিজের কাঁধের দিকে টেনে নেয়।রোজেলিয়া নড়ে না। বরং আরও গভীর ঘুমে ডুবে যায়।রিভেন জানালার বাইরে তাকায়, তার চোখে তখন চিন্তার ছায়া, আর মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
চলবে,,,,,,,