ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

২১তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)

#লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক

পর্ব ২১

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

গ্রামের রাস্তা ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে।শহরের পিচঢালা মসৃণ রাস্তার বদলে এখানে কাঁচা মাটির পথ দু-পাশে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝেমাঝে তালগাছ আর খেজুরগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। দূরে কোথাও মুরগির ডাক। বাতাসে মাটির গন্ধ, সাথে হালকা কাঁচা ঘাসের সোঁদা ছোঁয়া।এই নীরব গ্রামীণ পথে দুটো কালো মার্সিডিজ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। ড্রাইভিং সিটে এনজো। চোখ দুটো সোজা রাস্তার দিকে, হাত শক্ত করে স্টিয়ারিংয়ে ধরা। পাশে সামনের সিটে বসে আছে মার্কো, জানালার বাইরে তাকিয়ে পরিবেশটা পর্যবেক্ষণ করছে।এত শান্ত জায়গায় তাদের উপস্থিতিটাই যেন বেমানান।পেছনের সিটে সাইলাস বসে আছে। চুপচাপ, দুই হাত বুকে ভাঁজ করা। চোখ আধা বন্ধ, কিন্তু পুরোপুরি ঘুম নয়। এনজো হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বলে,

“Damn..It’s so peaceful here… almost no one comes around.”

মার্কো ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে,

“Don’t get fooled by the beauty, Enzo. এই শান্ত পরিবেশটাই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। This is usually where things start to feel strange and unpredictable.”

গাড়ি এগিয়ে চলে গ্রামের ভেতরের দিকে।চারপাশে শান্ত। গাড়িটা গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই চারজনেরই চোখে আলাদা এক বিস্ময় ফুটে ওঠে। তারা এই পরিবেশ দেখে ভীষণ অভাক হচ্ছে। চারপাশে শুধু সবুজ ধানক্ষেত, ছোট ছোট পুকুর, কাঁচা রাস্তা, দূরে টিনের চালের ঘর। শহরের কোলাহল থেকে দূরে তারা কেউই আগে আসেনি। এনজো হালকা হাসি দিয়ে বলে,

“Oh… this looks just like a movie set.”

মার্কো জানালার বাইরে তাকিয়ে অবাক গলায় বলে,

“See? no signals… just trees everywhere. And the open spaces here are surprisingly large.”

পেছনে বসে থাকা সাইলাস জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। হালকা বাতাসে ধানের শীষ দুলছে। সে শান্ত গলায় বলে,

“Strangely… it’s peaceful here”

মার্কো বলে,

“This is called pure nature "

“Exactly"

"But this isn’t new to me..I’ve seen Bangladesh before."

মার্কোর কথায় সবার চোখ তার দিকে যায়। সবার জানামতে মার্কোর অবস্থাও তাদের মতো। তারা সবাই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এ। সেই অনুযায়ী মার্কোর এমন পরিবেশ আগে দেখার কথা না।এনজো বলে,

“Wait, what? তুই তো আমাদের সাথেই বড় হয়েছিস মার্কো। This is your first time in Bangladesh, right? সো, এসব আগে দেখলি কীভাবে?

মার্কো হালকা ভাব নিয়ে জানালার বাইরে চোখ রেখে বলে,

“I searched about this place on Google and YouTube before coming here. ল্যান্ড করার আগে আমি হোমওয়ার্ক করে নিয়েছিলাম।”

মার্কোর কথায় গাড়ির ভেতরে হালকা হাসির রোল ওঠে। এই শান্ত গ্রাম, এই নিঃশব্দ পথ… সবকিছুই কেমন শান্ত। দেখলেই একটা ভালো লাগা কাজ করে। গাড়িগুলো ধীরে ধীরে আরও ভেতরে ঢুকে যায়। সবুজের মাঝে হারিয়ে যেতে থাকে শহরের মানুষগুলো। গাড়িগুলো একটু ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের দৃশ্য আরও বদলে যেতে থাকে। কাঁচা মাটির পথ, দু’পাশে খাল, কলাগাছ, কাঁচা ঘর, মাঝে মাঝে ছাগল-গরু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ছে। গাড়ির ভেতরের হাসিটা ধীরে ধীরে কমে আসে। মার্কো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“Bro, the signal’s terrible here.”

"Ahh, how could you even Google it?"

এনজোর কথায় সবাই হেসে ফেলে। কিন্তু পেছনের সিটে সাইলাস চুপচাপ বসে থাকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে ধানের ক্ষেতে চোখ আটকে থাকে তার।গাড়ি আবার আপন মনে চলতে থাকে। মার্কো ধীরে বলে,

“Do you think we’ll ever really settle in here?”

সামনের সিটে বসে থাকা এনজো গম্ভীর গলায় উত্তর দেয়,

“পারতেই হবে। বসের আদেশ। আর না পারলে উপরে যাওয়ার জন্য তৈরী থাকো। ভুলে গেছ? কিভাবে অর্ডার করেছিলো এক ঘন্টায় তৈরী হতে?"

মার্কো চুপসে যায়। আসলেই রিভেন তাদের জোর করেই নিয়ে এসেছে। প্রথমে তারা কেউই আসতে চায়নি কিন্তু রিভেন এর ভয়ে সবাই আসতে বাধ্য হয়।

_____________

সামনের গাড়িটা মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। রিভেন এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাস্তার বাঁকগুলোতে থাকলেও অবচেতন মন বারবার পাশে পড়ে থাকা মানুষটির দিকে ছুটে যাচ্ছে। রোজেলিয়া গভীর ঘুমে মগ্ন। বাতাসের হালকা ঝাপটায় তার কয়েক গাছি চুল কপালে এসে পড়ছে। রিভেন দেখল, ঘুমের ঘোরেও রোজেলিয়ার ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে আছে, যেন অবচেতন মনেও সে কোনো এক অজানা আশঙ্কায় ধুঁকছে।

​হঠাৎ রোজেলিয়ার চোখের পাতা নড়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল, কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা। জানালার ওপাশে তাকিয়ে সে প্রথমে কিছুই মেলাতে পারল না। বড় বড় দালান নেই, নিওন আলো নেই, আছে শুধু আদিগন্ত সবুজ আর মাটির সোঁদা ঘ্রাণ। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল।

​“এটা... এটা কোথায় রিভেন? আমরা কোথায় এসেছি?”

​রোজেলিয়ার কণ্ঠে এক আশ্চর্য বিস্ময় আর অস্ফুট চিৎকার। সে জানালার কাঁচের ওপর হাত রেখে অপলক চেয়ে রইল। কাঁচা মাটির রাস্তা, দুপাশে ধানের ক্ষেত বাতাসে দুলছে, দূরে টিনের চালের ওপর দুপুরের রোদ ঝিলমিল করছে। বড় কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই কোনো কোলাহল। রোজেলিয়া নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে আস্তে আস্তে সব বুঝতে পারলো। সে যেনো তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার চোখ দুটো ভিজে ওঠে, কিন্তু সে কিছু বলে না। শুধু ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রিভেনের দিকে তাকায়। রিভেন তখনও ড্রাইভ করছে। কিন্তু তার চোখের কোণ দিয়ে সে রোজেলিয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখ মিলতেই সে হালকা একটা হাসি দেয়। রোজেলিয়া কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে তার দিকে, যেন নিজের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলোকে সামলাতে চেষ্টা করছে।গাড়ি এগিয়ে চলে গ্রামের পথ ধরে। আর সেই নীরবতার ভেতরেই জন্ম নিতে থাকে নতুন কোনো গল্প।গ্রামের চেনা রাস্তাগুলো দেখতেই রোজেলিয়ার বুকটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে বারবার চোখ মুছে নেয়। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, এ সত্যি সত্যিই তার দেশ। হঠাৎ সে কাঁপা গলায় বলে ওঠে,

“রিভেন… গাড়িটা থামাও প্লিজ।”

রিভেন এক মুহূর্ত তাকায় তার দিকে। সে আর প্রশ্ন করে না। ধীরে গাড়ির গতি কমিয়ে মাটির রাস্তার পাশে থামায়। গাড়ি থামতেই রোজেলিয়া দরজা খুলে নেমে যায়। মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সে থমকে দাঁড়ায়। যেন পায়ের নিচের মাটিটুকু স্পর্শ করতেই বুকের ভেতর হাজারো স্মৃতি একসাথে আছড়ে পড়ে। ধুলো, ঘাস, বাতাস সবকিছুর গন্ধ তার চেনা। খুব

"আমার গ্রাম… ”

কথাগুলো ফিসফিস করে বের হয় তার মুখ থেকে।রিভেন গাড়ি থেকে নেমে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে এটা এমন একটা মুহূর্ত, যেখানে কথা বলা বেমানান। শুধু উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট।রোজেলিয়া মাটির দিকে তাকিয়েই ফিসফিস করে বলে,

“এত বছর পর… আমি আবার এখানে।”

হালকা বাতাসে তার চুল উড়ে যায়। দূরে একটা পাখি উড়ে যায় আকাশের দিকে। চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি। রিভেন ধীরে এগিয়ে আসে, কিন্তু তাকে ছোঁয় না। শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নীরব প্রহরীর মতো। রোজেলিয়া হঠাৎ চোখের জল মুছে ফেলে হেসে ওঠে। একদম শিশুর মতো, অবাধ, নির্ভার। পরমুহূর্তেই সে আচমকা রাস্তার পাশের ধানক্ষেতের দিকে দৌড় দেয়।

“রোজ!”

রিভেন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ডাকে, কিন্তু সে আর শোনে না। হালকা বাতাসে ধানের শিষ দুলছে। সবুজের ভেতর দিয়ে ছুটে যেতে যেতে রোজেলিয়ার শাড়ির আঁচল উড়ে যায়। পায়ের নিচে কাঁচা মাটির স্পর্শ, চারপাশে মাটির গন্ধ। সব মিলিয়ে তার বুকটা ভরে ওঠে এক অদ্ভুত আবেগে। বহু বছর পর সে আবার নিজের শেকড় ছুঁয়েছে।সে দুই হাত ছড়িয়ে দেয়, ধান ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগোয়। হাসতে হাসতে বলে ওঠে,

“এটা… এটা সত্যি! আমি স্বপ্ন দেখছি না, তাই তো?”

রিভেন ধীরে ধীরে তার পেছনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে বিস্ময়, সাথে একটুখানি অবাক মুগ্ধতা। সে কখনো রোজেলিয়াকে এমন দেখেনি এতটা খোলা, এতটা জীবন্ত। রোজেলিয়া হঠাৎ থামে, ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। তবুও ভীষণ মায়াবী লাগছে রিভেন এর কাছে।

“তুমি জানো, ছোটবেলায় আমি ঠিক এইভাবে দৌড়াতাম জমির মাঝখানে”

রিভেন কিছু বলে না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মুহূর্তটা মনে গেঁথে নিতে চায়। হালকা বাতাসে ধানক্ষেতের শব্দ, দূরে গ্রামের নিস্তব্ধতা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ। নিজের শিকড়ে ফিরে পাওয়া, আর প্রকৃতি তার ফিরে পাওয়াটার নীরব সাক্ষী। রোজেলিয়া দৌড়াতে থাকে। খোলা মাঠ, বাতাসে উড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল, হাসির শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। রিভেন পিছন পিছন ছুটছে, প্রথমে বিরক্ত মুখে, তারপর অনিচ্ছায় ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি।

​“রোজেলিয়া, থামো! পড়ে যাবে কিন্তু! এই রাস্তা পিচ্ছিল!”

​রোজেলিয়া হাসতে হাসতে পেছনে ফিরে তাকাল।

“আপনি বড্ড বেরসিক রিভেন! আসুন না, একবার এই মাটিতে পা ফেলে দেখুন, সব ক্লান্তি মুছে যা-”

হঠাৎ রোজেলিয়ার পা পিছলে যায়। রিভেন সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে যায়, কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পেরে দু’জনেই একসাথে পিছলে পড়ে যায় কাদামাখা জমিতে। আর মুহূর্তেই কাদা ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রিভেন নিচে, রোজেলিয়া তার উপর পড়ে আছে। দুজনের জামা কাপড় কাদায় একেবারে মাখামাখি। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর,

“হা—হা—হা—হা!"

রোজেলিয়া হেসে গড়াগড়ি দিতে শুরু করে। শিশুর মতো নির্ভার, খোলা হাসি। চোখে জল চলে এসেছে, কিন্তু সে থামছে না। রিভেন ধীরে তাকায়। নিজের জামার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে নাক কুঁচকায়।

“Great… just great,”

সে দাঁত চেপে বলে

“এই কাদা… এই জায়গা… Disgusting.”

রোজেলিয়া তখনো হাসছে, একেবারে থামতেই পারছে না। সে উঠে বসে কাদায় ভেজা হাত দিয়ে রিভেনের হাত ধরে বলে

“Thank you, Riven!”

“why?”

রোজেলিয়া হেসেই বলে,

"বাংলাদেশ নিয়ে আসার জন্য "

রিভেন চোখ ঘুরিয়ে নেয়।

“রাখো তোমার থ্যাংক ইউ… আর উঠো এখান থেকে। কাদা মাথা পর্যন্ত উঠে গেছে,damnn।”

রোজেলিয়া আবার হাসিতে ভেঙে পড়ে।আর রিভেন বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থেকেও, নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি লুকিয়ে রাখতে পারে না। রিভেন আর রোজেলিয়া কষ্ট করে কাদামাখা জমি পেরিয়ে অবশেষে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। দুজনের অবস্থা এমন যে চিনতে কষ্ট।কাপড়ে, হাতে, মুখে কাদা লেগে একেবারে যুদ্ধফেরত সৈনিকের মতো। ঠিক তখনই সামনে থামানো কালো গাড়ির দরজা খুলে যায়।এনজো, মার্কো আর সাইলাস একসাথে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষন চুপ থেকে বুঝার চেস্টা করে।তারপর চারজনের চোখ বড় হয়ে যায়।কারো মুখে কোনো কথা নেই। রিভেনের শার্টে কাদা, প্যান্টে কাদা, চুলেও কাদা। আর রোজেলিয়া তার অবস্থা আরও করুণ। শাড়ির পাড়, চুল, হাত সব কাদায় মাখামাখি। মার্কো চোখ কচলায় যেন ঠিকমতো দেখছে কি না। এনজো ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করে। সাইলাস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার চোখেও স্পষ্ট বিস্ময়। ​রিভেন তাদের থমকানো মুখ দেখে গর্জে উঠল,

“এভাবে স্ট্যাচুর মতো তাকিয়ে থাকার মানে কী? শো দেখতে এসেছ নাকি? পানি নিয়ে এসো জলদি!”

​এনজো অপ্রস্তুত হয়ে তুতলিয়ে বলল,

“ওহ... ইয়েস বস! এখনই আনছি!”

সে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে পানির বোতল নিয়ে এল।

​রিভেন গজগজ করতে করতে মুখ ধুতে ধুতে রোজেলিয়াকে বলল,

“এই গ্রামটার মাটি এত নরম কেন? এক পা ফেললে দুই পা ভেতরে ঢুকে যায়!”

​রোজেলিয়া কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে মিষ্টি হেসে বলল,

“এটাই তো মাটির টান রিভেন। শহর আমাদের পাথর বানায়, আর গ্রাম আমাদের নরম হতে শেখায়"

“ আজ তোমার জন্য আমি নিজেকে কী অবস্থায় ফেলেছি দেখছো?”

রোজেলিয়া হালকা হাসে।

“আপনিই তো দৌড়ালেন।”

রিভেন কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। মুখটা শক্ত রাখলেও চোখে একরাশ অসহায়তা আর অদ্ভুত মমতা জমে থাকে। রোজেলিয়ার কাদামাখা মুখ, ভেজা চুল, চোখে একধরনের উজ্জ্বলতা। এই অবস্থাতেও রোজেলিয়াকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তার কাছে। সে কিছু বলে না, শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। এনজো গাড়ির দরজা খুলে বলে,

“বস, সব ঠিক আছে। চলা যাক।”

রিভেন মাথা নেড়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। রোজেলিয়া একটু পিছনে পিছনে আসে। গাড়িতে উঠতে উঠতে সে আবার চারপাশের সবুজ মাঠ, খোলা আকাশ সবকিছু চোখ ভরে দেখে। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে।

ভেতরে নীরবতা। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর বাইরে গ্রামের বাতাসের হালকা সোঁ সোঁ আওয়াজ।রিভেন একবার সাইড মিররে তাকিয়ে দেখে রোজেলিয়া জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি।

_________________

রাত অনেক গভীর। বাতাসে শুধু পাতার মর্মর একটা পরিত্যক্ত স্টোররুমের ভেতরে আলো জ্বলছে। ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে বাঁধা একজন মানুষ। মুখে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। এভানো শান্ত কণ্ঠে বলে,

“তুমি জানো… আমি সাধারণত চিৎকার পছন্দ করি না।”

লোকটা কাঁপতে থাকে। মুখ খুলতে গিয়েও পারে না।এভানো সামনে দাঁড়িয়ে তার চিবুকটা আঙুল দিয়ে তোলে।

“একটা প্রশ্ন করবো। ঠিকঠাক উত্তর দিলে…হয়তো ব্যথাটা কম হবে।”

লোকটা কাঁপা গলায় বলে,

“আমি... আমি তো শুধু আদেশ পালন করেছি। আমাকে যা বলা হয়েছে, আমি শুধু সেটুকুই করেছি, স্যার...”

এই কথাটাতেই এভানোর চোখের দৃষ্টি বদলে যায়।

সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

“আদেশ পালনের আগে তোমার ভাবা উচিত ছিলো তুমি বন্দুক কার উপর তাক করেছো,,”

বলেই এভানো সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। পাশেই রাখা একটা কাঠের টেবিল থেকে ভারী একটি হাতুড়ি তুলে নিলেন তিনি। কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। যেন তিনি খুব সাধারণ কোনো কাজ করছেন। হঠাৎ করেই কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই তিনি হাতুড়িটা সজোরে লোকটার হাঁটুতে আছড়ে ফেললেন।

​“আআআআহহহহ!”

এক তীব্র চিৎকারে গুদামঘরের ছাদ যেন ফেটে পড়ল। হাড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার সেই বীভৎস শব্দটা এভানোর কানে যেন কোনো ধ্রুপদী সংগীতের মতো শোনাল।

​লোকটা যন্ত্রণায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম করলে এভানো এক বালতি নোনা পানি তার ক্ষতবিক্ষত শরীরে ঢেলে দিলেন। নুনের ছোঁয়ায় লোকটার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। এভানো এবার তার পকেট থেকে একটা ধারালো ছোট ছুরি বের করলেন। লোকটার আঙুলের নখের ডগায় ছুরির অগ্রভাগটা বসিয়ে ধীরলয়ে বলতে লাগলেন,

​“ব্যথাটা অনুভব করছো? এটা তো কেবল শুরু। আমি তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি এমনভাবে আলাদা করব যে, মৃত্যু তোমার কাছে তখন পরম আরাধ্য মনে হবে। কিন্তু আমি তোমাকে এত সহজে মরতে দেব না। তোমাকে ধুঁকতে হবে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে পস্তাতে হবে কেন তুমি জন্মেছিলে।”

পরবর্তী কয়েক মিনিট সেই ঘরের ভেতর কেবল হাড় ভাঙার শব্দ, চামড়া কাটার ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ আওয়াজ আর লোকটার অবর্ণনীয় গোঙানি শোনা গেল। এভানো অত্যন্ত নিপুণভাবে, ঠিক একজন সার্জনের মতো লোকটার ওপর নৃশংসতা চালালেন। তার সাদা শার্টের হাতায় ফিনকি দিয়ে আসা রক্ত লেগেছে, কিন্তু তার চোখের পলক একবারের জন্যও কাঁপল না।

____________________

রোদ ঝলমলে দুপুর। গ্রামের শান্ত পরিবেশে শুধু মুরগির ডাক আর দূরে গাছের পাতার মর্মর শোনা যাচ্ছে। রোকসানা বেগম উঠোনে বসে হাঁস-মুরগিগুলোকে খাবার দিচ্ছিলেন। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে, তবু চোখে এখনো এক ধরনের শক্ত ভাব। মাঝে মাঝে উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখছেন। আজ কেন যেন মনটা অস্থির। ভেতরে, খড়ির চুলায় খুন্তি নাড়ছে খাদিজা। রান্নার গন্ধে ঘর ভরে গেছে। মাঝে মাঝে সে দরজার দিকে তাকাচ্ছে ।আরোশ কোথায় গেল, এখনও ফিরল না কেন।ঠিক তখনই...দূর থেকে ধুলো উড়তে দেখা গেল।একটার পর একটা। মোট দুইটা কালো গাড়ি ধীরে ধীরে এসে বাড়ির সামনে থামল। গাড়ির শব্দে রোকসানা বেগম থমকে গেলেন।

“গাড়ি… আমাগো বাড়িতে?”

তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।খাদিজাও শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার।

"কার গাড়ি গো আম্মা?”

গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে নামল কয়েকজন সুঠামদেহী লোক। প্রথম গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে এক লম্বা, গম্ভীর মানুষ,, রিভেন। তার পরপরই নেমে আসে রোজেলিয়া। রোকসানার হাত থেকে খাবারের পাত্রটা মাটিতে পড়ে যায়।কয়েক সেকেন্ড সময় যেন থমকে দাঁড়াল। বৃদ্ধা ঝাপসা চোখে তাকালেন সেই চেনা অবয়বটার দিকে।

​“রো... রোজেলিয়া? "

রোজেলিয়া আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলাতে পারল না। সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে দৌড়ে গিয়ে নানিকে জড়িয়ে ধরল।

“নানি…!”

রোকসানার চোখ ছলছল করে ওঠে। কাঁপা হাতে সে নাতনিকে জড়িয়ে ধরে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

"আমার সোনা… তুই সত্যিই আইছস?”

রোজেলিয়া কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ায়।

“হ্যাঁ নানি… আমি এসেছি।”

একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিভেন, সাইলাস, এনজো আর মার্কো নীরবে দৃশ্যটা দেখছিল। রিভেনের চোখেও অদ্ভুত এক নরমতা ফুটে ওঠে।এমন দৃশ্য সে সচরাচর দেখে না। খাদিজা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায়।

“আম্মা…এইডা রোজেলিয়া…?”

আংগুল তুলে রোজেলিয়ার দিকে দেখিয়ে দেয়। রোকসানা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,

“হ এইডা… আমার রোজেলিয়া।”

খাদিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। রোজেলিয়া আর তার বাবা মা দেশ ছেড়েছে সেই কবে।রোজেলিয়াকে বুকে টেনে নেয়।

“তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস!”

রোকসানা বেগম চোখের জল মুছলেন। তারপর তাঁর গলায় একরাশ অভিমান আর অভিযোগ ফুটে উঠল,

​“ক্যান আইছস এখন? এই বুড়িটারে তোরা তো ভুলেই গেছিলি। কত বছর পার হয়ে গেল, একটা খবর নেওয়ার সময় তোদের হয় নাই? বিদেশে গিয়া কি তোদের দেশের রক্ত পানি হয়ে গেছে? তোদের বাবা-মা কি ভুইলা গেছে যে এই গাঁয়ে একটা বুড়ি মা এখনো পথ চেয়ে বইসা থাকে? তোরা তো আমাদের ভুইলাই গেছস!”

​রোজেলিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে নানিকে আবার জড়িয়ে ধরল।

“না নানি, একদম না! পরিস্থিতি এমন ছিল যে চাইলেও আসতে পারিনি। বিশ্বাস করো, তোমাকে অনেক মিস করেছি”

রোকসানা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

​

“ তা তোর মা কেমন আছে রে?”

“ভালো আছে নানি। একদম ভালো।”

“আর তোর বাপ?”

“উনিও ভালো আছে।”

রোকসানা নিশ্চিন্তির নিশ্বাস ছাড়েন।

“আল্লাহর রহমত।”

রোজেলিয়ার চোখ ঘুরে চারপাশে পড়ে। তখনই তার খেয়াল হয়। রিভেন, সাইলাস, এনজো আর মার্কো এখনো একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

“আহ্… নানি, মামি,৷ আমি তো কাউকে পরিচয়ই করিয়ে দেইনি!”

সে একে একে সবার দিকে ইশারা করে বলে,

“এই যে… উনি রিভেন।"

হালকা হেসে বলে,

"আমার…আমার স্বামী”

রোকসানা চোখ কুঁচকে রিভেনকে দেখে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার মেপে নেয়।

“ওহ্… এইডা নাত-জামাই! তোর জামাই তো দেখতে মাশাল্লাহ "

রোজেলিয়া লাজুক হাসি দিয়ে একে একে বাকিদের পরিচয় করায়,

“ও সাইলাস,… আর ওরা এনজো, মার্কো আমাদের সাথেই এসেছে।”

রোকসানা সবার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রিভেন আর রোজেলিয়ার গায়ে লেগে থাকা শুকনো কাদা চোখে পড়তেই ফিক করে হেসে ওঠেন।

“আচ্ছা…তোদের অবস্থা ক্যান?”

রোজেলিয়া কিছু বোঝার আগেই রোকসানা হাসতে হাসতে বলে ওঠেন,

“তোরা কি জামাই–বউ দুইডা গ্রামে ঢুইকাই এমন কাণ্ড করছস? কুকুরের দৌড়ানি খাইয়া কাদায় পড়ছস নাকি?

দুইডারে তো দেখা যাইতেছে যুদ্ধের ময়দান থাইকা আইছস!”

এক মুহূর্তের নীরবতার পর। হাসিতে ফেটে পড়ে সবাই। খাদিজা মুখ চাপা দিয়ে হাসে।এনজো আর মার্কো মুখ চেপে হাসছে, আর রিভেন বিরক্ত মুখে নিজের কাদা মাখা জুতো দেখছে। রোজেলিয়া লজ্জায় নানির পেছনে মুখ লুকাল।

“নানি! তুমিও না...”

​রোকসানা বেগম হাসতে হাসতে খাদিজাকে বললেন,

“বউমা, হাঁ কইরা চাইয়া আছস ক্যা? আমার নাতনি আর নাত-জামাই আইছে। যা, জলদি কইরা মুড়ি মাখা আর নারিকেল নাড়ু নিয়া আয়। আর এই সাদা সাদা পুতুলগুলারে ঘরের ভেতর নিয়া যা। রোদ্রে তো লাল হইয়া গেছে সব!”

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন