ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

২২তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা #থ্রিলার #রোমান্টিক

পর্ব ২২

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

সূর্য উঠতে উঠতে যেন ধীরে ধীরে পুরো গ্রামটাকে ছুঁয়ে যায়। মাটির ঘর, টিনের চাল, কাঁচা রাস্তা সবকিছুর গায়ে লেগে থাকে এক ধরনের নরম সোনালি উষ্ণতা। বাতাসে পাখির ডাক, দূরে কোথাও মোরগের ডাকে নতুন দিনের ঘোষণা।রিভেনের কাছে সকাল মানে ছিল ইতালির শহর ,অ্যালার্মের কড়া শব্দ, ঠান্ডা মার্বেলের মেঝে, কাঁচের জানালায় প্রতিফলিত নির্দয় আলো।আর এখানে সকাল মানে উষ্ণতার শুরু ।

ডান কানে ফোন চেপে, বাম হাত পকেটে রেখে ঘর থেকে বের হয় রিভেন।ইতালিতে তার পুরো পরিবারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা কমেনি। মা… আর রোজেলিয়া দু’জনকেই নিয়ে সে চিন্তিত।রোজেলিয়াকে কেউ টার্গেট করছে এই সত্যটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগেনি। আর সেই কারণেই এত বছর পর আবার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখা।ছোটবেলায় একবার এসেছিল সে। তারপর আর আসা হয়নি।রোজেলিয়ার ক্ষেত্রে আলাদা তার কয়েকবারই আসা হয়েছে ।

রিভেন মায়ের সাথে কথা বলে। এখানকার পরিবেশের কথা জানায়। আর মায়ের কাছ থেকে খবর নেয় ওখানে সব ঠিক আছে কিনা। ফোন কাটার আগে জ্যাককে কল দিয়ে আবারও নিশ্চিত হয়। সতর্কতা এই মুহূর্তে তার একমাত্র ধর্ম।ঘরের ভেতরে রোজেলিয়া এখনো ঘুমাচ্ছে।

ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন শব্দ মিলিয়ে ঘুমটা তার কাছে ধরা দিয়েছে দেরিতে।আর রিভেন?গরম, এসি নেই, অচেনা পরিবেশ ঘুম তাকে স্পর্শ করেও যায়নি।তার ঘুমে ভালোই ব্যাঘাত ঘটেছে।জ্যাকের সাথে কথা শেষ করে ঘরে ফিরতে যাবে ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসে মার্কোর

কন্ঠ। রিভেন সে দিকে এগিয়ে যায়।

“Wait a moment, Grandma! Don't be in a hurry. আমি জাস্ট গুগলে সার্চ করছি যে আপনি আসলে কী বানাচ্ছেন। I need the technical name of this cake!”

মার্কো অস্থির হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।​রোকসানা বেগম মার্কোর কাণ্ড দেখে মিটিমিটি হাসছেন। রিভেনকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি পিঠা উল্টাতে উল্টাতে বললেন,

“ওও নাতজামাই, এই তুমি কারে ধইরা আনলা? এই পোলায় তো দেহি আজব। আমি হেরে কইলাম এইডারে নারকেল পুলি পিঠা কয়, আর হেই দেহি মোবাইলে কী জানি টিপাটিপি করতাছে। ও কি আমার কথা বিশ্বাস করে না?”

​রিভেন মার্কোর দিকে একবার তাকাল। মার্কো অসহায় মুখে রিভেনের দিকে এগিয়ে এল।

“Boss, Grandma is amazing, কিন্তু ওনার ভাষা আর এই Coconut cake আমি ডিকোড করতে পারছি না। ইন্টারনেটও এখানে কচ্ছপের মতো চলে!”

​রিভেন শান্তভাবে মার্কোকে বোঝাল যে এগুলো এ দেশের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। মার্কো সাথে সাথে একটা গরম পিঠা হাতে নিয়ে কামড় দিল।

“ It’s so delicious, Grandma! So yummy and sweet. You’re such a great cook! ইতালির কোনো শেফ আপনার ধারেকাছেও আসতে পারবে না। You are a Legend, Grandma!”

​রোকসানা বেগম ফ্যালফ্যাল করে রিভেনের দিকে তাকালেন।

“কী কয় রে এই ধলা পুতুলটা? গালি দেয় না তো?”

​রিভেন অনুবাদ করে দিল,

“নানি, ও বলছে পিঠা খুব মজা হয়েছে। আর আপনি পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি।”

​রোকসানা বেগম খুশি হয়ে মার্কোর কাছে আরও দুটো পিঠা এগিয়ে দিলেন।

“হেইডা আগে কইবি তো! লও নাতজামাই, তুমিও একটা খাও। একদম গরম গরম।”

​রিভেন ভ্রু কুঁচকে পিছিয়ে এল।

“নো থ্যাঙ্কস নানি। আমি সকালে এসব আনহেলদি আর অয়েলি খাবার খাই না। My body can’t take this sugar spike.”

​

ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠ,

“নানি, তুমি আমাকে দাও। উনি খাদ্য খান না অখাদ্য খান।”

রিভেন ঘুরে তাকায়।রোজেলিয়া ঘুম জড়ানো চোখ, এলোমেলো চুল, নানির পাশে সে এসে বসে পড়ে । ঠাট্টাটা যে তাকে নিয়েই তা বুঝতে একটুও দেরি হয় না।এদিকে এনজো আর সাইলাস এসে পড়ে।মার্কো উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে,

“See! Look how Grandma is cooking! Her style is so unique! I took photos .coconut, amazing taste! Come, come!”

রোজেলিয়া হেসে দেয়।একসময় সবাই চুলার আশেপাশে বসে পড়ে। পিঠা, গল্প, হাসি—সব মিলিয়ে সকালটা পূর্ণতা পায়।শুধু রিভেন একপাশে বসে ফোনে কাজ করছে।কিন্তু একসাথে খাওয়া, গল্প সব দেখে তার ভেতরের নিয়ন্ত্রণটা একটু একটু করে ভাঙে।শেষ পর্যন্ত নানি রোজেলিয়ার হাতে দুটো পিঠা দিয়ে বলেন,

“যা, তোর জামাইরে দে। দুইডা খাইলে কিছু অয়না।”

রোজেলিয়া চুপচাপ রিভেনের পাশে বসে পিঠা বাড়িয়ে দেয়।রিভেন এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে… তারপর খেতে শুরু করে।এই ছোট্ট মুহূর্তটাই রোজেলিয়ার কাছে অমূল্য।

__________

সাইলাস পুকুরপাড়ে বসে আছে।শীতল বাতাস এসে তার গায়ে লাগছে মনে হচ্ছে যেন বাতাসটাও আজ একটু ধীরে বইছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা, দূরে গাছের পাতার মৃদু নড়াচড়া সব মিলিয়ে পরিবেশটা তার কাছে অদ্ভুত রকম ভালো লাগছে।যাই হোক, বাংলাদেশে এই তার প্রথম আসা। এমন খোলা, শান্ত, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো পরিবেশ সে আগে কখনো দেখেনি। তাই চুপচাপ বসে, কিছু না ভেবে, মুহূর্তটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছে।কিছুক্ষণ আগেও তার পাশে মার্কো আর এনজো বসে ছিল। এখন তারা নেই কোথায় গেছে কে জানে।

সাইলাস একা বসে থাকে।ঠিক তখনই নিরবতাটা ভেঙে যায়।ম্যাসেজের শব্দ হয়।সাইলাসের ধ্যান ভাঙে। বিরক্ত চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। অপরিচিত নাম্বার। সে পাত্তা দেয় না।কয়েক সেকেন্ড পর আবার আরেকটা ম্যাসেজের শব্দ হয়।এবার কপাল কুঁচকে ফোনটা হাতে নেয়।মেসেজে লেখা,

"Hi.."

তার ঠিক নিচেই আরেকটা নাম ভেসে ওঠে,

" I'm nyla.."

সায়লাস একটু থমকে যায়।কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে রিপ্লাই দেয়,

"You? Need something?"

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।তারপর,

"Noo…"

আবার থেমে যায় কথোপকথন।পুকুরের পানি ঢেউ খেলায়, বাতাস বইতে থাকে, কিন্তু ফোনের স্ক্রিন নিস্তব্ধ।হঠাৎ আবার নতুন মেসেজ,

"Where are you now?"

"I’m busy at work."

"Are you with roselia mam and sir?"

"No, I’m busy with my work."

"Do you know where they are?"

"No, the boss didn’t tell me."

"Sure?"

"Yeah, I’m sure."

এই ছিল রিভেনের স্পষ্ট আদেশ।কেউ জানবে না তারা কোথায়।ম্যানশনের কেউ না।কেউই না।শুধু একজন জানে রিভেনের মা।এর বাইরে আর কাউকে জানাতে মানা।

"Wow. Busy man. You don’t even ask why I texted. Cold."

"If it’s important, say it. I’m not here for chatting."

"Relax, bodyguard. I was just checking if you’re alive. You disappear faster than my patience."

"I’m alive. Unfortunately for you."

নাইলা রিপ্লাই দেয়,

"Don’t worry. You’re not that lucky."

সাইলাসের মুখে একটা বাকা হাসি ফুটে উঠে ।

__________

মার্কো আর এনজো পুকুর ঘাটে বসে আছে সেই কখন থেকে।মা্দ্রাসার পাশে একটা পুকুর মূলত এখানেই পুরুষেরা সবাই গোসল করে।এনজো আর মার্কো দু’জনেই এমন ভাব করে বসে আছে যেন খুব গভীর কোনো মিশনের প্ল্যান চলছে। কিন্তু আসলে তাদের মাথায় একটায় প্রশ্ন,

“এই ঘোলা পানিতে নামার টেকনিকটা আসলে কী?”

​মার্কো ফিসফিস করে নীরবতা ভাঙল,

“ব্রো...I think you should go first.just taste the water । নিচে যদি কুমির বা অ্যানাকোন্ডা থাকে, তাহলে অন্তত আমার হাতে ব্যাকআপ প্ল্যান থাকবে।”

​এনজো সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে প্রতিবাদ জানাল,

"Are you crazy? You go first. I will... Supervice from here. কোনো বিপদ দেখলে আমি চিৎকার করে পুরো গ্রাম মাথায় তুলব। দ্যাট’স এ মোর ইম্পরট্যান্ট জব!”

​মার্কো চোখ কুঁচকে তাকাল,

“সুপারভাইজ? আই নো ইউ, এনজো। আমি পিছলে পড়ে হাবুডুবু খেলে তুই নির্ঘাত আইফোনে ভিডিও করবি আর ব্যাকগ্রাউন্ডে টাইটানিক মিউজিক দিবি”

​এনজো এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুকুরের শ্যাওলা ধরা পানির দিকে তাকাল।

“ওকে ওকে, কুল ডাউন। বাট সিরিয়াসলি মার্কো, তুই আগে যা। তুই আমার চেয়ে বয়সে বড়, সো ইউ আর দ্য সিনিয়র হিয়ার।”

​মার্কো পানির দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে একটু ঢেউ খেলিয়ে বলল,

“এনজো... এইটা কি ইতালির সেই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার সুইমিং পুল টাইপ কিছু? দেখ সুইমিং পুলেতো আমরা তলা দেখতে পেতাম আর পানি গুলোও পরিষ্কার এমন কী সাগরেরও পানি নীল ছিল। এই টাইপের পানিতেতো কাউকে কখনো গোসল করতে দেখিনি। নিচের কাদা যদি আমাকে টেনে ধরে?”

​এনজো মাথা চুলকালো। একটু আগে রোকসানা নানি তাদের অনেক কিছু বুঝিয়ে গেছেন। সবকিছু তিনি শুদ্ধ বাংলায় হাত নেড়ে নেড়ে বলে গেছেন। আর এই দুই মক্কেলও খুব পন্ডিতের মতো মাথা নেড়ে ইয়েস গ্র্যান্ডমা, আই আন্ডারস্ট্যান্ড এভরিথিং বলে ভাব নিয়ে চলে এসেছে। আসলে তারা এক বর্ণও বোঝেনি।

​এনজো ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

“ডু ইউ রিমেম্বার? উনি কি বললেন প্রথমে কাপড় খুলে নামতে হবে নাকি কাপড় পরে ডুব দিতে হবে?সুইমিংপুলে তো আমরা সর্টস পড়ে নামতাম। এখন এই পানিতে যদি সর্টস ও নোংরা হয়ে যায়?আই অ্যাম টোটালি কনফিউজড!”

​মার্কো গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,

“আই থিঙ্ক শি সেইড পোশাক পড়ে নামতে অর উই মাইট লুজ আউয়ার ডিগনিটি । সো, ডন্ট ইভেন থিঙ্ক অ্যাবাউট টেকিং অফ ইওর প্যান্টস ইন পাবলিক!”

​এনজো ভয়ে পুকুরের কালচে পানির দিকে তাকাল।

“মানে... ভেতরে কি কিছু আছে? হোয়াট ইফ সামথিং বাইটস মাই টো?”

​মার্কো একটা ঢোক গিলে বলল,

“থাকলেও এখন বের হবে না। আমরা তো সেই কখন থেকে স্ট্যাচুর মতো বসে আছি, ওরা হয়তো ভাবছে আমরা রোবট।”

​ঠিক তখনই মাদ্রাসার দিক থেকে দুইটা ছেলে এল। বয়স পনেরোর মতো। মার্কো আর এনজোকে এই অদ্ভুত সাজে বসে থাকতে দেখে তারা থমকে গেল। মার্কো ফিসফিস করল,

“হোয়াই আর দে স্টেয়ারিং অ্যাট আস? ”

​এনজো খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

“মে বি দে হ্যাভ নেভার সিন সচ হ্যান্ডসাম ইতালিয়ান ম্যান বিফোর। দে আর জাস্ট ইন শক, ব্রো!”

​একটা ছেলে ফিসফিস করে তার বন্ধুকে বলল,

“ঐ দেখ, মাইনষের মতো দেখতে কিন্তু কথা কয় ক্যাঁক-ক্যাঁক কইরা। ওরা কই থেইকা আসছে রে?”

অন্যটা উত্তর দিল,

“দেখতে কী ধলা! নির্ঘাত বিদেশি হইবো”

​কথা শেষ হতে না হতেই ছেলেগুলো তাদের হাতের কাপড় সিড়ির পাশে রেখে সোজা পুকুরে লাফ দিল। মুহূর্তের মধ্যেই তারা দুর্দান্ত গতিতে সাঁতার কাটতে শুরু করল। মার্কো আর এনজো হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

​মার্কো চোখ কচলে আবার তাকাল,

“ডিড ইউ সি দ্যাট? দে জাস্ট... জাম্পড ”

এনজো বিড়বিড় করে বলল, “ইয়োহ... ব্রো, দিস ইজ নেক্সট লেভেল স্কিল।”

​একটা ছেলে পানির ভেতর থেকে মাথা তুলে চিৎকার করে বলল,

“আইবেন নাকি? নামবেন নাকি আঙ্কেলরা?”

​এনজো ঘাবড়ে গিয়ে মার্কোর দিকে তাকাল। “ও আমাদের ডাকছে”

​মার্কো গলা খাঁকারি দিয়ে খুব ভাব নিয়ে ইংরেজিতে বলল, “উই আর... থিংকিং। উই আর ক্যালকুলেটিং দ্য পিএইচ লেভেল অফ দিস ওয়াটার”

​ছেলেটা কিছুই বুঝল না। সে ভাবল বিদেশি আঙ্কেলরা হয়তো ভয় পাচ্ছে। সে হেসে আবার একটা ডুব দিল। এনজো এবার জেদ চেপে বলল,

“লিসেন, ওইটুকু বাচ্চা যদি পারছে, আমরা কেন ভয় পাব? ইট’স এ শেম টু আওয়ার বডিগার্ড ইমেজ!”

​মার্কো গম্ভীর মুখে বলল, “দ্যাট’স বিকজ ওরা জন্মসূত্রে অ্যামফিবিয়ান "

​অবশেষে রোদ সইতে না পেরে তারা পানিতে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল। মার্কো একদম ড্রামাটিক হয়ে বলল,

“ব্রো... ইফ আই ডাই হেয়ার বাই ড্রাউনিং, প্লিজ টেল মাই মাদার আই লাভড হার মোর দ্যান মাই ফেরারি।”

এনজো এক চুল না নড়ে বলল,

“ব্রো... ইফ ইউ ডাই, আই অ্যাম নট টাচিং ইওর কাদা মাখা বডি।”

মার্কো রেগে গিয়ে বলল,

“হোয়াট কাইন্ড অফ ফ্রেন্ড আর ইউ? কোনো ইমোশন নেই তোর?”

এনজো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“অ্যালাইভ কাইন্ড! আমি বেঁচে থাকলে তো তোর শোক পালন করতে পারব।”

​ওই দুই ছেলে আবার ঘাটে উঠে এল। একজন মার্কোর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে বলল,

“কি আঙ্কেল, ডরান নাকি? নামবেন না?”

​আঙ্কেল ডাকটা শুনে মার্কোর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে এনজোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল,

“ডিড হি জাস্ট কল মি আঙ্কেল? আই অ্যাম ইন মাই প্রাইম এজ!”

এনজো ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল,

“ওয়েল, উইথ দ্যাট এক্সপ্রেশন, ইউ ডু লুক ইমোশনালি ওল্ড। তোর চেহারা এখন তোর দাদার মতো হয়ে আছে।”

মার্কো দাঁত চেপে বলল,

“আই অ্যাম অনলি ৩০, ড্যাম ইট!”

​সূর্য তখন মাথার ঠিক উপরে। গরমটা অসহ্য পর্যায়ে চলে গেছে। মার্কো ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বলল,

“ব্রো... আই অফিশিয়ালি স্মেল লাইক রিগ্রেট। আমি এই রোদে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।”

এনজো গেঞ্জির কলার টেনে বাতাস ঢুকিয়ে বলল,

“দিস হিট ইজ পার্সোনাল। ইট হেইটস মি।”

​মার্কো পুকুরের দিকে তাকিয়ে এবার সঙ্কল্প করল।

“এনজো, আইদার উই শাওয়ার নাউ... অর উই মেল্ট লাইক আইসক্রিম হিয়ার।”

এনজো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ফাইন। বাট ইফ এনি ফিশ টাচেস মাই লেগ, আই অ্যাম স্ক্রিমিং লাইক হেল। জাস্ট ওয়ার্নিং ইউ!”

​এনজো প্রথমে ধীরে ধীরে এক পা পানির কিনারে ডোবাল।

“ওকে... ওকে...water is actually nice”

মার্কো সাহস পেয়ে এগিয়ে এল।

“সি? পানি আমাদের চিনতে পেরেছে।”

​কথাটা শেষ হতে না হতেই মার্কোর পায়ের নিচে থাকা সিড়িঁর পিচ্ছিল শ্যাওলায় পা হড়কে গেল। সে হাত-পা ছুড়ে

“ওহ ফাক!”

বলে সোজা পুকুরে আছাড় খেয়ে পড়ল। চারদিকে পানি ছিটকে এনজোকে ভিজিয়ে দিল।

এনজো চিৎকার করে উঠল,

“হোয়াই ডিড ইউ ডাইভ লাইক এ ডেসপারেট হোয়েল?!”

​মার্কো পানি থেকে নাক মুখ মুছে মাথা তুলল। চুলের ভেতর একটা ছোট কচুরিপানা আটকে আছে। সে একটা ভোঁতা হাসি দিয়ে বলল,

“ইট ওয়াজ নট এ ডাইভ, ব্রো! ইট ওয়াজ এক্সিডেনট বাট দ্য ওয়াটার ইজ সো গুড!”

​আর দেরি না করে এনজোও নেমে গেল নিজেকে ছেড়ে দিল পানিতে। তপ্ত শরীরের ওপর শীতল পানির স্পর্শ লাগতেই দু’জনের মুখ থেকে যন্ত্রণার ছাপ মুছে প্রশান্তি নেমে এল।

​“ওহ মাই গড,”

মার্কো চোখ বন্ধ করে ডুব দিয়ে বলল,

“দিস ইজ হেভেন"

এনজো হাসতে হাসতে মার্কোর মুখে পানি ছিটিয়ে দিল,

“ইয়োহ! আমরা কেন ফালতু চিন্তা করে এক ঘণ্টা নষ্ট করলাম? দিস ইজ দ্য বেস্ট ফিলিং এভার!”

​দু’জনে মিলে মনের সুখে সাবান মেখে গোসল সারল। মাঝে মাঝে ওই ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে মার্কো এখন আর রাগ করল না। একটা ছেলে হাসতে হাসতে বলল,

“আঙ্কেল, এখন তো ঠিকঠাক নামছেন”

​মার্কো এবার হাত নেড়ে বলল,

“ইয়েস মাই বয়, আঙ্কেলহুড এক্সেপ্টেড। দিস ওয়াটার ইজ ম্যাজিক”

​

গোসল শেষে ভেজা জামা গায়ে, চুল থেকে পানি পড়ছে।কিন্তু মুখে অদ্ভুত শান্তি।এনজো পুকুর ঘাটে বসে বলে,

“Okay… I admit it. This was worth it.”

দু’জনেই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

____________

ঘরে ঢুকতেই রিভেনের কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম সে বিরক্ত ভঙ্গিতে মুছতে থাকে। ল্যাপটপে বসে কাজ করছিল, কিন্তু গরমের জ্বালায় মাথা কাজ করা তো দূরের কথা চোখের সামনে সব ঝাপসা লাগছিল। বাইরে গিয়েও শান্তি নেই।রোদে গা পুড়ে যাওয়ার মত অবস্থা ।ইতালিতে তার সকাল সন্ধ্যা কেটে যায় ঠান্ডা বাতাস আর নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায়। আর বাংলাদেশের গ্রীষ্ম যেন আগুন ছুঁড়ে মারছে শরীরের দিকে।

রিভেন বিরক্তের সাথে রুমে ঢুকে ।চোখে পড়ে ফ্যানের ঠিক নিচে খাটের ওপর শুয়ে আছে রোজেলিয়া।এক দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে আর মাঝে মাঝে ঠোঁট নাড়াচ্ছে । রিভেন এগিয়ে এসে ফ্যানের নিচেই বসে পড়ে। সে একটু ঝুঁকে দেখে রোজেলিয়া ফোনে বই পড়ছে।এই গরমেও বই রিভেনের কণ্ঠটা স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা ভারী, ক্লান্ত আর চাপা রাগ মেশানো,

“ডুবে যাচ্চো বইয়ের ভেতরে… ঘরের কোণে তোমার এই স্বামী নামক মানুষটা যে গরমে বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে, সেদিকে কি তোমার নূন্যতম খেয়াল আছে, রোজ পেটাল?”

রোজেলিয়া চমকে উঠে তাকায়। চোখে তখনো লাইনের রেশ,

“স্বামী সাহেব, আপনি তো এই গরমে নিজেই গলতে বসেছেন। খেয়াল নিলে আমাকেও গলে যেতে হবে।”

রিভেন ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

“মানে?”

রোজেলিয়া ফোনটা পাশে রেখে উঠে বসে।

“মানে, আপনি এসি ছাড়া বাঁচতে পারেন না। আর আমি এই ফ্যানেই দিব্যি।”

রিভেন ঠোঁটের কোণে হালকা একটা বাঁকা হাসি টেনে নেয়। চোখে ক্লান্তি কিন্তু দৃষ্টিটা এখন রোজেলিয়ার দিকেই আটকে গেছে।

“ফ্যানেই দিব্যি?এই ফ্যানটা আমাকে গরমের কথা আরো বেশি মনে করিয়ে দিচ্ছে, আর তুমি… তুমি বসে বসে বই পড়ে যাচ্ছো, একেবারে নির্বিকার।”

রোজেলিয়া কাঁধ ঝাঁকায়।

“অভ্যাস, রিভেন। এই গরমে আমি অভ্যস্ত ।আমি সব পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নিতে পারি আপনি না ।”

“সে যাই হোক, আমি কিন্তু সিরিয়াসলি পুড়ে যাচ্ছি।আমার স্কিন বার্ন করছে, Rose.”

রোজেলিয়া চোখ সরু করে তাকায় রিভেনকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে রিভেনের ফর্সা মুখটা রোদে লাল হয়ে গেছে।

হঠাৎই দুষ্টু একটা হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে।

“আচ্ছা, আপনার যদি এতই কষ্ট হয়, তবে একটা মোক্ষম দাওয়াই দিতে পারি। ট্রাই করবেন?”

“কি দাওয়াত?”

রোজেলিয়া খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

“লুঙ্গি পরুন। আরাম পাবেন।”

রিভেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।তারপর চোখ বড় করে তাকায়,

“What?”

সে সোজা হয়ে বসে।

“লুঙ্গি? আর আমি?Seriously?”

রোজেলিয়া খুব নিরীহ মুখে কাঁধ ঝাঁকায়।

“হ্যাঁ, একদম সিরিয়াস। এইযে মোটা মোটা প্যান্ট পড়ে আছেন ,এতে আরো বেশী গরম লাগছে।”

রিভেন নাক সিঁটকায়।

“আমি ইতালিতে স্যুট পরি, রোজেলিয়া। বোর্ড মিটিং করি।

আর তুমি আমাকে বলছো এই চেক কাটা কাপড় পেঁচিয়ে ঘুরতে? সিরিয়াসলি?”

​রোজেলিয়া হাসি চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।

“দেখুন মিস্টার মাফিয়া এখানে কোনো বোর্ড মিটিং হচ্ছে না। আর আপনার ওই দামী প্যান্টের ভেতরে যে ঘাম জমছে, তাতে আপনি পাঁচ মিনিটের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যাবেন। সো, ইগো সরিয়ে যা বলছি তা করুন।”

রিভেন চোখ রোল করে ফ্যানের দিকে তাকায়।

“Unbelievable…আমার গার্ডরা দেখলে হাসতে হাসতে গুলি চালিয়ে দেবে নিজেদের ওপর”

রোজেলিয়া খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। একেবারে কাছে এসে ফিসফিস করে,

“একবার পরে দেখুন না। আমি কথা দিচ্ছি পাঁচ মিনিটে আপনি বাংলাদেশ আর লুঙ্গি দুইটারই প্রেমে পড়ে যাবেন।”

রিভেন বিরক্ত কণ্ঠে বলে,

“আমি কোনোভাবেই—”

ঠিক তখনই রিভেন কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে চুপ করে ।রোজেলিয়া ব্রু তুলে জিজ্ঞেস করে,

“কি হলো?"

রিভেন দাঁত চেপে বলে,

“…Where is it?”

রোজেলিয়ার চোখ চকচক করে ওঠে।

“নানির আলমারিতে। বাদামী চেক।”

রিভেন ধমকের ভঙ্গিতে আঙুল তুলে বলে,

“শোনো, ঘরের বাইরে যদি কেউ আমাকে এই অবস্থায় দেখে, তবে খবর আছে তোমার!”

​রোজেলিয়া হাত তুলে শপথ করার ভঙ্গি করল।

“কেউ দেখবে না। আমি দরজায় পাহারা দেব। প্রমিজ!”

​রিভেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অত্যন্ত বিরক্ত গলায় বলল,

“Fine বাট... আমি এটা পরতে জানি না। এটার কোনো গিট বা জিপার নেই কেন?”

রোজেলিয়া থমকে তাকায়।

“কি বললেন?”

রিভেনের মুখে এবার একটু অস্বস্তি ফুটে উঠল।

“আমি কখনো এই জিনিস ছুঁয়েও দেখিনি Rose. স্যুটের টাই বাঁধা আমার কাছে সহজ, কিন্তু এটা...”

এই কথাটা শুনেই রোজেলিয়ার মুখে ধীরে ধীরে আবার দুষ্ট হাসি ছড়িয়ে পড়ে। চোখে একধরনের আত্মবিশ্বাস।

“তাহলে তো সমস্যা নেই...আমি পরিয়ে দেব।”

“Excuse me?”

“এটা কোনো স্যুটের টাই না যে নিজে নিজে হয়ে যাবে। দাঁড়ান।”

রোজেলিয়া ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে যায় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘরে ফিরে আসে লুঙ্গি নিয়ে।তারপরই রিভেনকে লুঙ্গি পড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।রিভেন এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ে।কিন্তু গরম লাগলে দাঁত চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে।রোজেলিয়া নিচু হয়ে খুব যত্ন করে লুঙ্গিটা জড়িয়ে ধরে।

“এখানে এমন করে ভাঁজ দিতে হয়,”

সে ফিসফিস করে হালকা হাসিঁ দিয়ে বলে,

“না হলে হাঁটলে খুলে যাবে।”

রিভেন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।কণ্ঠ একটু খসখসে,

“Rose… you’re enjoying this too much.”

রোজেলিয়া হালকা হেসে ভাঁজটা ঠিক করে দেয়।

“চুপ থাকুন। নড়বেন না।”

রোজেলিয়া শেষ ভাঁজটা রিভেনের পেটের কাছে গুঁজে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এক পা পিছিয়ে তৃপ্তির সাথে তাকিয়ে বলল,

“হয়ে গেছে! লুকে তো একদম খাঁটি বাঙালি জমিদার জামাই লাগছে!”

রিভেন নিচে তাকায়।বাদামী চেকের লুঙ্গি।খুবই হালকা আরামদায়ক লাগছে।সে ধীরে শ্বাস ছাড়ে।

“…Annoyingly comfortable.”

রোজেলিয়া বিজয়ের হাসি হাসে।

“বলেছিলাম না?”

রিভেন এবার রোজেলিয়াকে কাছে টেনে নিতে চাইল,

“এই লুঙ্গি পরার কাহিনী যদি কোনোভাবে ইতালিতে পৌঁছায়, তবে মিলানের সব নিউজপেপারের হেডলাইন হবো আমি!”

রোজেলিয়া দুষ্টু স্বরে বলে,

“ছড়াবো না।শুধু মনে রাখবো বাংলাদেশে আমাদের গ্রেট মাফিয়া বস রিভেন কারুসো শেষমেশ বাংলাদেশের লুঙ্গির কাছে হার মেনেছে!”

রিভেন কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে আসে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।

"লিয়া বিইই"

রোজেলিয়া কণ্ঠস্বরটি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর চিনতে পেরেই বাইরের দিকে দৌড় দেয়।

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন