ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

২৪তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ২৪

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

"ড্যাড আর কতক্ষন লাগবে? আমি আর ওয়েট করতে পারছি না "

ছোট রিভেন তার বাবা ইভানো কারুসোকে উদ্দেশ্য করে অধৈর্য গলায় কথাটা বলল। ইভানো তখন কম্পিউটারে জরুরি কাজ সামলাতে ব্যস্ত। রিভেন তার হোম অফিসের চেয়ারে বসে অস্থিরভাবে পা নাচাচ্ছে। সে কোনোভাবেই আর চুপ করে থাকতে পারছে না।

ছেলের এমন অস্থিরতা দেখে ইভানো কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল,

"আহা রিভেন, একটু ধৈর্য ধরো। আমি কাজ করছি, আমাকে এখন একদম বিরক্ত করো না।"

ডমিনিকের স্কুলে আজ প্যারেন্টস মিটিং ছিল। ইভানোর কাজের চাপ থাকায় মেহেরিন একাই গেছে সেই মিটিংয়ে। এদিকে রিভেনের শরীরটা আজ খুব একটা ভালো নেই, তাই সে স্কুলে যায়নি। কিন্তু শরীর খারাপের চেয়েও বড় সমস্যা হলো রিভেনের জেদ। সে তার মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। বাসায় মেইডরাও তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল, কারণ রিভেন জেদ ধরেছে যে সে এই মুহূর্তেই ডমিনিকের স্কুলে যাবে। উপায় না দেখে ইভানো তাকে শান্ত রাখার জন্য নিজের হোম অফিসে নিয়ে বসিয়ে রেখেছে, কিন্তু রিভেনের এক কথা সে মায়ের কাছে যাবে।

"Dad!"

রিভেন আবারও ডাকল।

ইভানো এবার কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আবার কী? বললাম না একটু ধৈর্য ধরো"

রিভেন এবার তার বড় ভাইয়ের দোহাই দিয়ে বলল,

"ডমিনিক ভাইয়া তো লাকি! ও ওখানে মাম্মির সাথে আছে। ডমিনিক ভাইয়া হয়তো এতক্ষণে মাম্মিকে পটিয়ে আইসক্রিমও খেয়ে নিয়েছে, আর আমি অসুস্থ বলে এখানে বন্দি? ডমিনিক ভাইয়ার মিটিং কি শেষ হবে না কোনোদিন?"

ইভানো এবার কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে ছেলের দিকে তাকাল। রিভেনের গাল দুটো অভিমানে ফুলে আছে। তিনি জানেন, এই বয়সের জেদ আর তার ওপর শরীর খারাপ দুটো মিলে রিভেনকে সামলানো এখন পাহাড় ঠেলার মতো কঠিন।রিভেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল,

"ডমিনিক ভাইয়া সবসময় এমন করে। যখনই মাম্মির সাথে থাকার সুযোগ পায়, সে আর আসতেই চায় না। আর তুমিও তাকে সাপোর্ট করছো! তুমি জানো ও এখন মিটিংয়ের বাহানা দিয়ে মাম্মিকে দিয়ে কত কিছু আবদার করিয়ে নিচ্ছে? আমার তো মনে হয় ডমিনিক ভাইয়া ইচ্ছা করেই দেরি করছে যাতে আমাকে বেশিক্ষণ তোমার সাথে থাকতে হয়।"

ইভানো মৃদু হেসে বললেন,

"রিভেন, ডমিনিক ওখানে মিটিং করছে,

আইসক্রিম পার্টি নয়। আর ও তোমার বড় ভাই, ও কেন চাইবে তুমি এখানে আটকে থাকো?"

"কারণ ও জানে আমি অসুস্থ হলে মাম্মি শুধু আমার দিকেই খেয়াল রাখে!"

রিভেন হাত নেড়ে বলতে লাগল,

"এখন ও একা পেয়ে মাম্মির সব অ্যাটেনশন নিয়ে নিচ্ছে। ড্যাড, প্লিজ, চলো না আমরা গিয়ে ওদের নিয়ে আসি। ডমিনিক ভাইয়াকে একা ছাড়লে ও নির্ঘাত মাম্মিকে বলবে আজ রাতে বাইরে ডিনার করতে, আর আমি বাসায় বসে স্যুপ খাব!"

রিভেনের এই কিউট কিন্তু হিংসুটে যুক্তি শুনে ইভানোর হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে পড়ল। তিনি গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন,

"আচ্ছা,বুঝলাম। ডমিনিক খুব বিপজ্জনক চাল চালছে। কিন্তু আমি যদি এখন বের হই, তবে আমার এই কাজটা শেষ হবে না। আর সেটা না হলে ডমিনিক তো বটেই, তোমার জন্যও নেক্সট উইকে যে গিফটটা কেনার কথা ছিল, সেটা ক্যান্সেল করতে হবে।"

রিভেন একটু থমকে গেল। ডমিনিকের প্রতি হিংসে একদিকে, আর নিজের গিফট অন্যদিকে। সে মুখটা আরও বাংলা পাঁচের মতো করে বলল,

"এটা ঠিক না! ডমিনিক ভাইয়া ওখানে মজা করবে, আর আমাকে এখানে ব্ল্যাকমেইল সহ্য করতে হবে?"

ঠিক তখনই ইভানোর ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। মেহেরিন একটা ছবি পাঠিয়েছে।ইভানো তখন কাজের ফাঁকে মেহরিনকে ছবি পাঠাতে বলেছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ডমিনিক খুব গম্ভীর মুখে টিচারদের কথা শুনছে।

ইভানো ফোনটা রিভেনের দিকে ঘুরিয়ে ধরে বললেন,

"এই দেখো তোমার ভাইয়ের মজা। বেচারা ডমিনিক তো বোরিং লেকচার শুনতে শুনতে ঝিমোচ্ছে। দেখে তো মনে হচ্ছে না ও কোনো আইসক্রিম বা ডিনারের সুযোগ পাচ্ছে।"

রিভেন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ডমিনিকের শুকনো মুখটা দেখল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল।

"ওকে ফাইন। ডমিনিক ভাইয়াকে দেখে একটু মায়া লাগছে। কিন্তু মাম্মি ফিরলে আমাকে বেশি আ্যটেনশন দিতে হবে, ডমিনিককে নয়। এটা মনে রেখো!"

"ডান। ডমিনিককে আমিই দূরে সরিয়ে রাখব, হ্যাপি?"

ইভানো মুচকি হেসে আবারও কিবোর্ডে আঙুল চালাতে শুরু করলেন। রিভেন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে পায়ের আঙুল দিয়ে কার্পেটের ওপর আঁকিবুঁকি কাটছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ শান্ত থাকা তার স্বভাববিরুদ্ধ।সে হঠাৎ চেয়ারটা টেনে ইভানোর আরও কাছে নিয়ে এল।

"ড্যাড, ডমিনিক ভাইয়া তো সবসময় তোমার মতো হতে চায়, তাই না? কিন্তু দেখো, ও মিটিংয়ে কেমন গম্ভীর হয়ে বসে আছে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ও মনে মনে ভাবছে কখন বাসায় এসে আমার সাথে ফিফা খেলতে বসবে আর আমাকে হারাবে।"

ইভানো স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,

"সেটা তো ভালো কথা। ভাইয়ে ভাইয়ে খেলাধুলা করা তো আনন্দের।"

"মোটেই না!"

রিভেন নাক কুঁচকে বলল।

"ডমিনিক ভাইয়া জিতলে এমন ভাব করে যেন ও ওয়ার্ল্ড কাপ জিতে নিয়েছে। আর আমি হারলে মাম্মির কাছে গিয়ে বলে, রিভেন তো খেলতেই পারে না'। ও আসলে খুব পচা।"

ইভানো এবার কাজ ছেড়ে রিভেনের দিকে ফিরলেন। ছেলের এই অবান্তর কিন্তু মিষ্টি অভিযোগগুলো না শুনে আর কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি রিভেনের মাথায় হাত রেখে বললেন,

"আচ্ছা রিভেন, তুমি কি সত্যিই ডমিনিককে এত হিংসে করো? নাকি ওকে ছাড়া তোমার একদম ভালো লাগছে না বলে এসব বলছো?"

রিভেন একটু থতমত খেয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলল,

"আমি হিংসে করি না... কিন্তু ও থাকলে আমাকে একা বোর হতে হয় না আমি ভাইয়াকে ছাড়া থাকতে পারি না ।কিন্তু মাম্মি ওর সাথে গল্প করলে আমার কেন হিংসে লাগে।"

ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেলের শব্দ শোনা গেল। রিভেনের চোখ দুটো চট করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"মাম্মি এসেছে! ডমিনিক ভাইয়াও নিশ্চয়ই সাথে!"

সে অসুস্থতার কথা ভুলে একছুটে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই দেখল মেহেরিন আর ডমিনিক ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসছে ।মেহেরিনকে দেখামাত্রই রিভেন তাকে জড়িয়ে ধরল।

"মাম্মি! তুমি এত দেরি কেন করলে? ডমিনিক ভাইয়া কি তোমাকে আটকে রেখেছিল?"

মেহেরিন হেসে রিভেনের কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখল।

"আরে না বাবা, মিটিং একটু লম্বা হয়ে গিয়েছিল। ডমিনিক তো বরং বারবার বলছিল, 'মা চলো, রিভেন একা আছে"

ডমিনিক সোফায় হেলান দিয়ে বসে রিভেনের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল।

"শুনলে তো? আমিই মাকে তাড়াতাড়ি আসার জন্য বলছিলাম। আর তুই নিশ্চয়ই ড্যাডের মাথা খেয়েছিস আমার নামে বদনাম করে?"

রিভেন মেহেরিনের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ডমিনিককে জিভ ভ্যাংচালো। ইভানো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি হেসে বললেন,

"ডমিনিক, তোমার ভাই তো নিশ্চিত ছিল যে তুমি ওখানে আইসক্রিম পার্টি করছো আর ওকে ভুলে গেছো।"

ডমিনিক হাসতে হাসতে বলল,

"আইসক্রিম? মিটিংয়ে তো শুধু তেতো কফি আর টিচারদের বকা ছিল! রিভেন, তুই বেঁচে গেছিস আজ না গিয়ে।"

মেহেরিন দুজনকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

"আচ্ছা অনেক হয়েছে। এখন সবাই ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি তোমাদের খাবারগুলো টেবিলে দিচ্ছি।"

রিভেন খুশি মনে ডমিনিকের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ঠিক আছে ভাইয়া, আজ খাওয়ার পর ফিফা খেলব। কিন্তু জেতার পর আমাকে পচানো যাবে না, প্রমিজ?"

ডমিনিক ওর চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল,

"দেখা যাবে! আগে খেয়ে তো নে।"

ডিনার টেবিলের দৃশ্যটা ছিল বেশ জমজমাট। মেহেরিন সবার প্রিয় পাস্তা আর চিকেন রোস্ট তৈরি করেছেন। রিভেন অসুস্থতার বাহানায় একটু বেশিই আদর আদায় করে নিচ্ছিল। সে মেহেরিনের একদম গা ঘেঁষে বসেছে, যেন ডমিনিক তার ধারেকাছেও আসতে না পারে।

ইভানো গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বললেন,

"তা ডমিনিক, তোমার রেজাল্ট কার্ডের কী খবর? টিচাররা তো মেহেরিনকে একা পেয়ে নিশ্চয়ই অনেক গোপন কথা ফাঁস করেছেন?"

ডমিনিক একটু আমতা আমতা করে বলল,

"তেমন কিছু না ড্যাড। শুধু ম্যাথ টিচার বলছিলেন আমি নাকি ক্লাসে একটু বেশি কথা বলি।"

রিভেন সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ পেয়ে গেল। মুখে এক চামচ পাস্তা পুরে দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,

"আমি জানি! ডমিনিক ভাইয়া এমনিতে ও বকবক করতে করতে আমার মাথা খেয়ে ফেলে নিশ্চয়ই ক্লাসেও অনেক কথা বলে, মাম্মি, তুমি ওকে বকা দাওনি?"

মেহেরিন মৃদু হেসে ডমিনিকের দিকে তাকালেন।

"আমি তো বকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার ডমিনিক ভাই এমন ইনোসেন্ট চেহারা বানিয়ে রেখেছিল আর বললাম না "

খাওয়া শেষ করে সবাই ড্রয়িংরুমে এসে বসল।

এখনো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামেনি, জানলার বাইরে রোদের আভাটা বেশ মিষ্টি হয়ে আছে। রিভেনের শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটা চনমনে লাগছে। বিকেলের এই সময়টা সাধারণত ওদের খেলার সময়।লিভিং রুমের বড় টিভিটার সামনে বসে রিভেন আর ডমিনিক কন্ট্রোলার নিয়ে একদম যুদ্ধংদেহী অবস্থানে। ইভানো আর মেহেরিন সোফায় বসে কফি খাচ্ছেন আর এই দুই ভাইয়ের কাণ্ড দেখছেন।

"রেডি তো? হারার পর কিন্তু কান্নাকাটি করা চলবে না,"

ডমিনিক কন্ট্রোলারে আঙুল বোলাতে বোলাতে টিপ্পনী কাটল।

রিভেন চোখ সরু করে বলল,

"কান্না আমি করব না, তুমি করবে যখন দেখবে আমার স্ট্রাইকার তোমার গোলকিপারকে নাচিয়ে গোল দিচ্ছে! ড্যাড, তুমি কিন্তু খেয়াল রেখো, ও যেন চিটিং না করে।"

খেলা শুরু হলো। পুরো লিভিং রুমে টানটান উত্তেজনা। রিভেনের আঙুলগুলো কন্ট্রোলারের ওপর ঝড়ের গতিতে চলছে। সে বারবার ডমিনিকের ডিফেন্স ভাঙার চেষ্টা করছে।

"ইয়েস! গোল! গোল!"

হঠাৎ চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল রিভেন। তার প্রথম গোলটা হয়ে গেছে। সে সোফার ওপর দাঁড়িয়ে একটা ছোটখাটো নাচও দিয়ে দিল।

ডমিনিক হাসল, কিন্তু তার চোখে এখন সিরিয়াস ভাব।

"বেশি খুশি হোস না ছোটু, ম্যাচ এখনো বাকি আছে।"

পরের ১০ মিনিটে ডমিনিক খুব ঠান্ডা মাথায় খেলে পরপর দুটো গোল শোধ করে দিল। রিভেনের মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বলছে,

"না না, এটা হতে পারে না! ডমিনিক ভাইয়া, তুমি নির্ঘাত কোনো সিক্রেট ট্রিক ইউজ করছো।"

ইভানো কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন,

"রিভেন, মেজাজ হারিও না। ডমিনিক ডিফেন্স খুব ভালো করছে, তুমি উইং দিয়ে অ্যাটাক করো।"

মেহেরিন মুচকি হেসে বললেন,

"তোমরা দুজনেই খুব ভালো খেলছো। কিন্তু রিভেন, মনে রেখো তোমার কিন্তু রেস্ট নেওয়ার কথা ছিল। বেশি উত্তেজিত হয়ে যেও না।"

রিভেন মেহেরিনের কথা কানেই নিল না। তার এখন একটাই লক্ষ্য ডমিনিককে হারানো। খেলার শেষ মুহূর্ত। রিভেন একটা দারুণ পাস পেল। সে চিৎকার করে উঠল,

"এবার দেখো!"

সে যখন শট নিতে যাবে, ঠিক তখনই ডমিনিক তাকে হালকা করে সুড়সুড়ি দিয়ে দিল। রিভেনের আঙুল ফসকে গেল আর বলটা গোলপোস্টের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

"চিটিং! এটা ঘোরতর চিটিং!"

রিভেন কন্ট্রোলার ফেলে দিয়ে ডমিনিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।ডমিনিক হাসতে হাসতে রিভেনকে জাপটে ধরল।

"আরে না, ওটা তো ট্যাকটিকস ছিল, আমি চিটিং করি না।"

দুই ভাই কার্পেটের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। জেতা হারার কথা ভুলে গিয়ে ওরা এখন একে অপরকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর হাসছে। মেহেরিন ওদের এই পাগলামি দেখে হাসতে হাসতে বললেন, "ইভানো, দেখো এদের। কিছুক্ষণ আগে রিভেন তো ডমিনিকের নামে বিচার দিচ্ছিল, আর এখন ওকেই জড়িয়ে ধরে আছে।"

রিভেন হঠাৎ ডমিনিককে বলল,

"দাঁড়াও! ডমিনিক ভাইয়া, তুমি কি আজ স্কুলে মাম্মির জন্য কোনো চকলেট কিনেছিলে? আমি ব্যাগে একটা লাল প্যাকেট দেখেছি।"

ডমিনিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মেহেরিন অবাক হয়ে বললেন, "কই? আমাকে তো কিছু বলেনি!"

ডমিনিক লাজুক হাসল। ব্যাগ থেকে একটা ছোট ডার্ক চকলেটের বার বের করে মেহেরিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

"আসলে মিটিং শেষ হওয়ার পর ক্যান্টিনে গিয়েছিলাম। ভাবলাম তোমার মাথা ব্যথা করছে, ডার্ক চকলেট খেলে হয়তো ভালো লাগবে। রিভেনকে দেইনি কারণ ও অসুস্থ, চকলেটে ওর কাশি বাড়তে পারে।"

রিভেনের চোখ ছোট ছোট হয়ে গেল।

"দেখো ড্যাড! ও ঠিকই একা একা মজা করেছে আর এখন ভালো সাজার নাটক করছে!"

মেহেরিন ডমিনিককে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। রিভেন এটা দেখে একটু গম্ভীর হয়ে গেল, কিন্তু মেহেরিন অন্য হাত দিয়ে রিভেনকেও কাছে টেনে নিলেন।

"তোমরা দুজনই আমার জান। একজন আমার খেয়াল রাখে, আর একজন আমাকে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হতে দেয় না। আমার আর কী চাই?"

রিভেন মেহেরিনের কাঁধে মাথা রেখে ডমিনিকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল। ডমিনিকও হাসল। দিনটা ঝগড়া আর অভিমান দিয়ে শুরু হলেও, শেষটা হলো একরাশ উষ্ণতায়।

ইভানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, "অনেক হয়েছে, এবার দুই বাঁদরই রুমে যাও ।ডমিনিক এখন পড়তে বসো আর রিভেন বিশ্রাম নাও "

_________________

রাত তখন বেশ গভীর। সারা বাড়ির কোলাহল থিতিয়ে এসেছে। মেহেরিন রিভেন আর ডমিনিকের ঘরে গিয়ে তাদের ঘুম পাড়িয়ে এসেছে। রিভেন তার স্বভাবসুলভ জেদ ধরেছিল সে আজ শরীর খারাপের অযুহাতে বাবা মায়ের রুমেই ঘুমাবে। অন্যদিকে ডমিনিকও একা ঘুমাতে পারে না, রিভেনকে তার পাশে চাই ই চাই। শেষমেশ মেহেরিন দুজনকে গল্প পড়ে শুনিয়ে শান্ত করে। অনেক কাহিনী করে দুই ভাইকে ঘুম পাড়িয়ে সে নিজের রুমে ফিরে আসে।

মেহেরিন যখন রুমের দরজাটা খুলল, একটা মৃদু খটখট শব্দ হলো। ইভানো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগে সিগারেট টানছিলেন। দরজার আওয়াজ পেতেই তিনি তড়িঘড়ি করে আধপোড়া সিগারেটটা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন। মেহেরিন ধোঁয়া অপছন্দ করে, আর ইভানোও চান না তার সামনে ধূমপান করতে।

ইভানো ঘুরে তাকিয়ে বিছানায় এসে বসলেন। মেহেরিনও ক্লান্ত শরীরে তার পাশে এসে বসল।

"ছেলেরা ঘুমিয়েছে?"

ইভানো নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।

"হ্যাঁ, অনেক কষ্টে,"

মেহেরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইভানোর কাঁধে মাথা রাখল।

"রিভেন তো কিছুতেই মানছিল না। ও বলছিল তোমার সাথে আজ অনেক জরুরি কথা বাকি আছে।"

ইভানো মৃদু হাসলেন। রিভেনের জরুরি কথা মানেই হলো নতুন কোনো আবদার অথবা ডমিনিকের বিরুদ্ধে জমানো এক গাদা নালিশ। তিনি মেহেরিনের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। ঘরের ভেতর হালকা একটা সিগারেটের গন্ধ তখনও ভাসছিল, যা মেহেরিনের তীক্ষ্ণ নাকে ধরা পড়তে দেরি হলো না।মেহেরিন মাথা না তুলেই নিচু স্বরে বলল,

"আবার শুরু করেছ? আমি না করেছি না এসব না করতে?"

ইভানো একটু অপ্রস্তুত হয়ে ধরা গলায় বললেন,

"সরি মেহেরিন, কাজের চাপের পর একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছিলাম।promise , আর হবে না।"

মেহেরিন মুখ তুলে ইভানোর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে রাগ নয়, বরং এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর মমতা মিশে আছে।

"রিভেন তোমার মতো একদম জেদি হয়েছে। আর ডমিনিক? ও তো বাইরে থেকে গম্ভীর হওয়ার ভান করে, কিন্তু মনে মনে ও ও তোমার মতোই নরম।"

ইভানো মেহেরিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন।

"আজ সারাদিন রিভেন তোমার জন্য পাগল হয়ে ছিল। আমাকে কাজ করতে দেয়নি এক মুহূর্ত। ও আসলে তোমাকে ছাড়া একদম অসহায়। জানো, ও বলছিল ডমিনিক নাকি তোমাকে পটিয়ে সব অ্যাটেনশন নিয়ে নিচ্ছে?"

মেহেরিন খিলখিল করে হেসে উঠল।

"ও কি জানে না যে আমার কাছে ওরাই আমার পৃথিবী? ডমিনিক বড় হচ্ছে, ও এখন অনেক কিছু বোঝে। আজ মিটিংয়েও ও খুব ম্যাচিওর ব্যবহার করেছে। কিন্তু রিভেন যেন সারাজীবন এই ছোট্টটিই থেকে যাবে।"

ইভানো জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, মেহেরিন। এই তো সেদিনের কথা, ওরা কত ছোট ছিল। আর এখন ওরা নিজেদের মধ্যে ফিফা খেলছে, তর্ক করছে। এক সময় হয়তো ওরা এই ঘর ছেড়ে নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যাবে।"

মেহেরিন ইভানোর বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,

"যতই বড় হোক, ওরা সবসময় আমাদের ওই ছোট রিভেন আর ডমিনিকই থাকবে। দেখো না, আজও তো রিভেন একা ঘুমাতে পারল না। আর ডমিনিকও ভাইকে ছাড়া থাকতে পারে না।"

রাতের নিস্তব্ধতায় ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ইভানো মেহেরিনকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন। সারা দিনের ক্লান্তি যেন এই মুহূর্তের শান্তিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে।

হঠাৎ ইভানোর কিছু একটা মনে পড়তেই মুখ গম্ভীর হয়ে পড়ে ।

"মেহরিন "

মেহেরিন ইভানোর গম্ভীর মুখ দেখে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছে ইভানো? হঠাৎ এমন সিরিয়াস হয়ে গেলে কেন?"

ইভানো মেহেরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আজ তুমি একাই ডমিনিকের স্কুলে গিয়েছিলে। সাথে কোনো গার্ড নাওনি,মেহেরিন, তুমি কি ভুলে যাচ্ছো যে তুমি এখন একা নও? তুমি তিন মাসের প্রেগন্যান্ট। এই অবস্থায় তোমার নিজের এবং আমাদের অনাগত সন্তানের শরীরের ওপর আরও বেশি খেয়াল রাখা উচিত। তোমার এই লাগামহীনভাবে চলাফেরা করাটা একদম ঠিক হচ্ছে না।"

মেহেরিন একটু প্রতিবাদ করতে চাইল,

"আহা ইভানো, স্কুলটা তো কাছেই। আর দিনের বেলা এমন কী হতে পারে..."

ইভানো তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না। তিনি মেহেরিনের কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফেরালেন। তার কণ্ঠস্বরে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ ফুটে উঠল।

"দিন হোক বা রাত, মেহেরিন তুমি জানো আমি কে। ইভানো কারুসো একজন মাফিয়া লিডার, যার শত্রুর অভাব নেই এই শহরে। আমার একটা ভুলের মাশুল আমার পরিবারকে দিতে হতে পারে, এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। যে কেউ, যেকোনো সময় আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে। আর তুমি এখন সবচেয়ে বেশি সেনসিটিভ অবস্থায় আছ।"

ইভানো একটু থামলেন, মেহেরিনের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে আবার বলতে লাগলেন,

"আমি তোমাকে বন্দি করে রাখতে চাই না। কিন্তু আমার শত্রু পক্ষ যদি জানতে পারে তুমি একা বাইরে বের হচ্ছো, তবে তারা সেটাকে সুযোগ হিসেবে নেবে। আজ থেকে তুমি যখনই বাইরে যাবে, আমার পার্সোনাল গার্ডদের সাথে নিয়ে যাবে। এটা অনুরোধ নয় মেহেরিন, এটা আমার কড়া নির্দেশ।"

মেহেরিন ইভানোর চোখের গভীরে তাকালে বুঝতে পারল, এটা শুধু রাগ নয়, বরং হারানোর প্রচণ্ড ভয়। সে ইভানোর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ধীর গলায় বলল,

"i am sorry ইভানো। আমি আসলে এত কিছু ভাবিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম ডমিনিকের দিনটা স্পেশাল হোক। তবে এরপর থেকে তোমার কথা মেনে চলব।"

ইভানো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহেরিনকে কাছে টেনে নিলেন। তার কপালে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন,

"তোমাদের ছাড়া আমার আর কিছু নেই। প্লিজ, আমাকে আমার এই দুর্বলতাটুকু হারানোর সুযোগ দিও না।"

________

ঘরের নিস্তব্ধতা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। ইভানোর হাতের জ্বলন্ত সিগারেট থেকে পাতলা ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। ঘরের জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের শহরের টিমটিমে আলো এসে পড়ছে তার পাথরের মতো স্থির মুখে। ইভানোর দৃষ্টি শূন্য, কিন্তু চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

এতক্ষণ যা কিছু ঘটল তা ছিল ইভানোর গভীর এক স্মৃতি ।বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর।ইভানো ধীরলয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন। আগুনের লাল আভাটা তার অন্ধকার মুখে ক্ষণিকের জন্য একটা ভয়ার্ত আভা ছড়িয়ে দিল। তার চোখ দুটো এখন সম্পূর্ণ আবেগহীন । যে মানুষটা একসময়

একজন যত্নশীল বাবা বা প্রেমিক স্বামী ছিল

সেই খোলসটা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এক ঠান্ডা মাথার মাফিয়া ডন।

ইভানো জানেন, তার এই জগতটা কল্পনাপ্রসূত সুখের চেয়ে অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী। শত্রুরা চারদিকে ওত পেতে আছে, আর তিনি একা এই অন্ধকারে বসে তাদের চালগুলো মাপছেন।

তিনি জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন, যা ধোঁয়ার সাথে মিশে মিলিয়ে গেল। তার চোখে কোনো জল নেই, কোনো অনুশোচনা নেই আছে শুধু এক ভয়ানক শূন্যতা। কল্পনার সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একজন মাফিয়ার জীবনে শান্তি শব্দটা কেবল একটা মরীচিকা।

সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে তিনি চেয়ারে হেলান দিলেন। অন্ধকার ঘরটায় শুধু তার নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ইভানো কারুসো আবার তার নিজের গাম্ভীর্যের চাদরে নিজেকে ঢেকে নিলেন।

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন